লাটভিয়ার নির্মাতা গিন্টস জিলবালোডিস। তার নির্মিত অ্যানিমেশন ‘ফ্লো’। সিনেমাটি ২০২৪ সালের ২২ মে কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রিমিয়ার হয়। তখন কেউ ভাবতে পারেনি যে শুধু একটি চরিত্র, একটি কালো বিড়ালকে নিয়ে নির্মিত এ নির্বাক চলচ্চিত্রটি অচিরেই সিনেমার ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে উঠবে। ওপেন-সোর্স সফটওয়্যারে অ্যানিমেটেড এবং গিন্টস জিলবালোডিসের নিখুঁত নির্দেশনায় নির্মিত ফ্লো পরের বছর আরো এক ধাপ এগোয়। ২০২৫-এর ৯৭তম একাডেমি অ্যাওয়ার্ডসে ‘সেরা অ্যানিমেটেড ফিচার ফিল্ম’ বিভাগে অস্কার জিতে ইতিহাস গড়ে। এখানেই শেষ নয়, সিনেমাটি ‘সেরা আন্তর্জাতিক ফিচার ফিল্ম’ বিভাগেও মনোনয়ন পেয়েছিল।

সিনেমার প্রথম দৃশ্যে দর্শক এক ডুবে যাওয়া পৃথিবীর সাক্ষী হয়। বিশাল বন্যা শহরগুলোকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, মানুষের উপস্থিতির শেষ চিহ্নগুলো মুছে দিচ্ছে। ঠিক তখন ধ্বংসস্তূপের ভেতর ভাসমান একটি ভঙ্গুর কাঠের ভেলায় দাঁড়িয়ে আছে একটি কালো বিড়াল—ছোট, সতর্ক, কিছুটা ভীত, কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে জীবন্ত। দর্শক জানত না, এ ক্ষুদ্র প্রাণী কি শুধু দৃশ্যের অংশ নাকি পরিবর্তনের মূল হোতা। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কালো বিড়ালকে ঘিরে বোনা হয়েছে কুসংস্কার—অমঙ্গলের দূত, অভিশাপের বাহক বা নীরব ছায়া। সিনেমার শুরুতে দর্শক তাই ভেবেছিল হয়তো এসব ধ্বংসের কারণ এ কালো বিড়াল। কিন্তু ঠিক তখনই বিড়ালটি শ্বাস নিল, তার অস্তিত্বেই যেন কুসংস্কারের পুরনো গল্পগুলোকে প্রথম প্রশ্নবিদ্ধ করল।

বিড়ালটির যাত্রা ধীরলয়ে এগোয়, কোনো সংলাপ নেই, শুধু নড়াচড়া এবং ছোট ছোট অনুভূতির প্রকাশ। বন্যার পানিতে ভেসে যাওয়া শহর পেরিয়ে বিড়ালটি এগোয় অনন্য সৌন্দর্যে—দ্বিধাগ্রস্ত, কিন্তু অভঙ্গুর; ভীত, কিন্তু স্থির। পথে তার সঙ্গী হয় একটি কুকুর, লেমুর, ক্যাপিবারা এবং এক বিশাল পাখি, যারা স্বাভাবিক অবস্থায় একে অন্যের প্রতিদ্বন্দ্বী। এ সিনেমায় কালো বিড়ালকে প্রচলিত ভয়ের ধারণার বাইরে দাঁড় করানো হয়েছে। বিড়ালটি নেতৃত্ব দেয় নীরবতা, পর্যবেক্ষণ ও স্থির সাহসিকতার মাধ্যমে, একটি অশুভ কালো বিড়ালের কাছে যা দর্শক আশা করেনি।

সিনেমাটি পৃথিবীব্যাপী মুক্তি পাওয়া এবং পরবর্তী সময়ে অস্কার জয়ের পর দর্শক কালো বিড়ালকে নতুনভাবে আবিষ্কার করে। পুরনো কুসংস্কারের ছায়া ধীরে ধীরে ভেঙে যেতে শুরু করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ প্রতিক্রিয়া জানাতে লাগল। কেউ নিজের কালো বিড়ালের ছবি পোস্ট করে লিখল, ‘মাই লিটল ফ্লো হিরো’। আরেকজন লিখল, ‘কালো বিড়াল অমঙ্গলজনক না, তারা সহজ সুন্দর জাদু নিয়ে আসে।’ নির্মাতা গিন্টস জিলবালোডিসও এসব প্রতিক্রিয়া তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করেন, যা ভিন্নধর্মী প্রচারণার মতো কাজ করল। এ প্রতিক্রিয়াগুলো শুধু মন্তব্য নয়, এগুলো ছিল কুসংস্কারের ভাঙন-ধ্বনি।

পৃথিবীর বিভিন্ন শেল্টারেও পরিবর্তন দেখা দিয়েছিল। যেখানে কালো বিড়ালগুলো সাধারণত উপেক্ষিত হতো, সেখানে মানুষ বিশেষভাবে কালো বিড়াল দত্তক নিতে শুরু করল ফ্লোর কোমল অনুপ্রেরণায়।

ফ্লোর জাদু ছিল তার সংযমে। বিড়ালটিকে অতিপ্রাকৃত দেখানো হয়নি; না সে শুভ, না অশুভ, না অভিশপ্ত। সে কেবল একটি জীবন, বিশৃঙ্খলার মাঝে ধৈর্য ও প্রবৃত্তি নিয়ে এগিয়ে চলা।

অস্কার জয়ের অনেক পরে করতালির ধ্বনি স্তব্ধ হওয়ার পরও ফ্লোর কালো বিড়াল ভ্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে মানুষের মনে এবং তাদের ঘরে, যারা অবশেষে কালো বিড়ালকে তার প্রকৃত স্বরূপে দেখছে। এ সিনেমার প্রভাবে পুরনো কুসংস্কার পুরোপুরি মুছে যায়নি ঠিকই, কিন্তু তাতে ফাটল ধরেছে তা স্পষ্ট। সে ফাটল দিয়ে ঢুকে পড়েছে সহানুভূতি ও বিশ্বাস।