১৯৭৯ সাল। ক্যাডেট কলেজের ক্ষুদ্র ঘেরাটোপ ছেড়ে খোলামেলা, বিপুলা ঢাকায় এসেছি সবে। উদ্দেশ্য প্রকৌশলবিদ্যায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ। থাকি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পলাশী বাজারসংলগ্ন স্থাপত্যসুন্দর, উদ্যানশোভিত সোহরাওয়ার্দী হলে। সেখানে কোনো হাউজ মাস্টারের সার্বক্ষণিক নজরদারি নেই, নেই কোনো অ্যাডজুট্যান্ট মেজরের কড়া চোখরাঙানি। তার বদলে চারপাশে কেবলই মুক্তির হাওয়া আর স্বাধীনতার হাতছানি। সেই শেকলভাঙা, অবারিত উড়ানের প্রতিশ্রুতিমাখা মায়াবী হাতছানিতে ভুলে, পড়াশোনা শিকেয় তুলে, শিল্পের সদর রাস্তায় বেরিয়ে পড়তে খুব একটা দেরি হলো না তাই। ‘অবয়ব’ নামে একটা নাটকের দল ছিল তখন বুয়েটে, প্রথমে জুটলাম তাদের সঙ্গেই। সেখানেই পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা আমাদের রসায়নের শিক্ষক ড. ইনামুল হকের সঙ্গে। তিনি তখন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম গ্রুপ থিয়েটার নাট্য আন্দোলনের পথিকৃত্তুল্য, নেতৃস্থানীয় দল নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের একজন ডাকসাইটে অভিনেতা। নাগরিক সেই মুহূর্তে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালাপাহাড়ি নাটক অচলায়তনকে মঞ্চে আনার কথা ভাবছে। তাদের কজন তরুণ কুশীলবের দরকার পড়েছিল এ নাটকের জন্য। ইনামুল হক স্যার তখন আমাদের কয়েকজনকে—আমি, মাসুদ, রাফু, পিন্টু আর আমাদের এক বছরের অগ্রজ মারুফ ভাইকে বগলদাবা করে এক সন্ধ্যায় নিয়ে তুললেন নাগরিকের মহড়াকক্ষে, দলনেতা খোদ আলী যাকেরের জহুরি চোখের আতশকাচের নিচে। তিনি শুরুতে কিঞ্চিৎ জিজ্ঞাসাবাদ আর আমাদের শিল্পরুচির শুলুকসন্ধান করলেও মূল পরীক্ষাটা ছিল নির্বাচিত কিছু রবীন্দ্রগদ্য থেকে পাঠ। আমি সেই পরীক্ষায় সসম্মানে উতরে গেলে পত্রপাঠ দলে টেনে তো নিলেনই, সেই সঙ্গে আমার জন্য বরাদ্দ করলেন অচলায়তন নাটকের সেই ছোট কিন্তু অতীব গুরুত্বপূর্ণ সুভদ্র চরিত্রটি; নিষিদ্ধ উত্তরের জানালা খুলে দিয়ে যে খোলা হাওয়া বইয়ে দিয়েছিল শতাব্দীর অন্ধকার আর কুসংস্কারে ঢাকা, রুদ্ধদ্বার অচলায়তনের গোটা অঙ্গন ও অধিবাসীদের চেতনাজুড়ে।
সেই যে শুরু, তারপর থেকে তো আমার জীবনের গতিমুখটাই পাল্টে গেল আমূল, সেখানে প্রকৌশলী অভিধা অর্জন, বড় চাকরি, বিত্ত আর বাড়িগাড়ির প্রলোভন সব গৌণ হয়ে গেল। কেননা ‘নাগরিক’,
নামে একটি নাটকের দল হলেও সেখানে সমাবেশ ঘটেছিল বাংলাদেশের সেই সময়ের তাবৎ নক্ষত্র ও জ্যোতিষ্করাজির; অগ্রসর, অসাম্প্রদায়িক, সাম্যবাদী চিন্তা ও মুক্তিযুদ্ধের অন্তর্নিহিত চেতনার আলোয় আলোকিত একঝাঁক সুসংস্কৃত মানব-মানবীর। সেখানে আলী যাকের ও ইনামুল হক স্যারের পাশাপাশি নাগরিকের অন্যান্য সদস্য আসাদুজ্জামান নূর, আতাউর রহমান, আবুল হায়াত, জামালউদ্দিন হোসেন, আবুল কাশেম, সারা যাকের, লাকি ইনাম, সালেক খান, খালেদ খানরা তো ছিলেনই। এছাড়া নিয়মিত আনাগোনা ছিল ওয়াহিদুল হক, সৈয়দ শামসুল হক, বাদল রহমান, ইখতিয়ার উমর, নাদিরা উমর, জাঁ নেসার ওসমান, সৈয়দ জামিল আহমেদ প্রমুখের মতো সমৃদ্ধ সংস্কৃতিজনদের। কিন্তু সবাইকে যেন ছাপিয়ে যেতেন আলী যাকের, আমাদের সবার ছোটলু ভাই, যেমন তার দৈহিক উচ্চতা ও শালপ্রাংশু শরীরের প্রশস্ততায়, তেমনি রসবোধ ও প্রাণশক্তিতে, মেধা ও মননের ঔজ্জ্বল্যে, বুদ্ধির দীপ্তিতে, সহজাত নেতৃত্ব-ক্ষমতায়, বাংলা ও ইংরেজি দ্বিভাষিক বাকবৈদগ্ধ্যে, সর্বোপরি পরিপূর্ণ এক শৈল্পিক সুষমায়।
প্রচুর পড়াশোনা করতেন আলী যাকের। সাহিত্য, শিল্প, রাজনীতি, ইতিহাস সবকিছুতেই ছিল তার দুর্মর আগ্রহ। মনে আছে একদিন তার বাসগৃহের ব্যক্তিগত প্রক্ষালনকক্ষে এন্তার মূল্যবান বইয়ের সমাহার দেখে আমরা, মফস্বলাগতরা কেমন ভড়কে গিয়েছিলাম। পরে নিজের পাঠতৃষ্ণা ও সাহিত্যাকাঙ্ক্ষা তীব্র হয়ে উঠলে তার কাছ থেকে বহু বই ধার নিয়েছি পড়ার জন্য। মনে পড়ছে আমার সেই ছাত্রাবস্থাতেই তার কাছ থেকে আনা আধুনিক জার্মান কবিতার একটি সংকলন থেকে অনুবাদ করে ফেলেছিলাম আত্মঘাতী, যুদ্ধবিরোধী কবি গেয়র্গ ট্রকলের একগুচ্ছ কবিতা, যেগুলো বেশ যত্ন করে ছাপিয়েছিলেন সেই সময়ের জাঁদরেল সম্পাদক কবি আহসান হাবীব, তার দৈনিক বাংলা পত্রিকার সাহিত্য পাতায়। আরেক বিকালের কথা মনে আছে। আমি বোধহয় মহড়ার নির্ধারিত সময়ের বেশ একটু আগেই পৌঁছে গিয়েছিলাম সেদিন। ছোটলু ভাই আমাকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিলেন তার নিজের ঘরে। সেখানে তখন উপস্থিত ছিলেন মেধাবী অভিনেত্রী, সুপ্রভাত চলচ্চিত্রখ্যাত রিনি রেজা। তারা দুজনে তখন সমাজতন্ত্র, সাম্যবাদ, সাম্রাজ্যবাদবিষয়ক এক গভীর তাত্ত্বিক আলোচনায় মগ্ন ছিলেন। আমি এক নীরব কিন্তু মনোযোগী শ্রোতা হয়ে মুগ্ধ বিস্ময়ে প্রত্যক্ষ করেছিলাম সেদিন, ইতিহাস ও রাজনীতি বিষয়ে তার সুগভীর প্রজ্ঞা ও পাণ্ডিত্য। আরো একবার দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল তার এক ভিন্নতর রূপ। সেবার আমরা জার্মান নাট্যকার কার্ল শ্যুকমায়ারের সমরতন্ত্রবিরোধী বিখ্যাত প্রহসন কোপেনিকের ক্যাপ্টেন নাটকের কল শো করতে বগুড়া গিয়েছিলাম দলবেঁধে। ফেরার পথে দীর্ঘ নৌযাত্রায়, জ্যোত্স্নাঢালা পূর্ণিমার রাতে, ফেরির ছাদে গোল হয়ে বসে আমরা সবাই মেতে উঠেছিলাম গান আর কবিতার এক অবিস্মরণীয়, অপার্থিব আড্ডায়। যথারীতি সেখানেও তিনিই ছিলেন মধ্যমণি। সেবার তার মুখে বুদ্ধদেব বসুর রচনায় ফেরিঘাটের সুস্বাদু ইলিশ রান্নার রসাল বর্ণনা, বেগম আখতারের ঠুমরি ‘জোছনা করেছে আড়ি’র সুরেলা গুনগুনানি আর নীরেন চক্রবর্তী, শঙ্খ ঘোষ প্রমুখের কবিতার দরাজ পাঠ শুনে বুঝেছিলাম সরস্বতীর বরপুত্র কথাটির অর্থ আসলে কী।
তারপর আমার বুয়েটের পাট চুকল। আমি গ্লাক্সো কোম্পানির কাজ নিয়ে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে এলাম চাটগাঁয়। প্রথম কিছুদিন চিঠিপত্রে যোগাযোগ থাকলেও পরে তা কালের নিয়মেই শিথিল হয়ে আসে। ১৯৮৭তে অতঃপর আমি দেশান্তরী হলে সেই সংযোগটুকু একেবারেই ছিন্ন হয়ে যায়। কিন্তু কিমাশ্চর্যম! এর কয়েক বছর বাদে ৯২ কি ৯৩ সালে আবারো তার সঙ্গে দেখা হলো খোদ নিউইয়র্কের মাটিতে। যেখানে সদলবলে আমন্ত্রিত হয়ে গিয়েছিলেন তারা সুবিখ্যাত নূরলদীনের সারাজীবন নাটকটি মঞ্চায়ন করতে, যে নাটকটির এক সাহেব চরিত্রে একদা অভিনয় করার সুযোগ হয়েছিল আমার, তার সঙ্গে একই মঞ্চে একাধিক প্রদর্শনীতে! তো, কোনো এক ছুিটর দিন দুপুরে তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম কুইন্সের এক বাড়িতে। মনে আছে আমার সংগ্রহ থেকে তার জন্য হাতে করে নিয়ে গিয়েছিলাম নিউইয়র্কের এক বিখ্যাত পুরনো বইয়ের দোকান থেকে কেনা মার্কিন নাটকের দুর্লভ একটি সংকলন। কী খুশিই না হয়েছিলেন আমার এই বিনম্র উপহারটুকু পেয়ে চিরকালের এক বইপাগল আলী যাকের! শেষ দেখা এই চাটগাঁয়,
বছর কয়েক আগে নাট্যজন আহমাদ ইকবাল হায়দার ভাইয়ের আমন্ত্রণে থিয়েটার ইনস্টিটিউট চট্টগ্রামে আয়োজিত এক নাট্য সংলাপে। তখনো তিনি বেশ ভালো রকম অসুস্থ, লাঠি ভর দিয়ে চলেন। তবু নাটকের মানুষ, নাটক নিয়ে কথা বলার ডাক পেলে কি আর থামিয়ে রাখা যায় তাকে? চিনতে পেরেছিলেন আমাকে এবং কথা দিয়েছিলেন আমাদের বিস্তার-এর বার্ষিক শিল্পোৎসবে আসবেন নতুন প্রজন্মকে তার জীবনের গল্প শোনাতে, মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রে তার সাহসী শব্দসৈনিকের ভূমিকার কথা জানাতে, মঞ্চনাটক নিয়ে তার নতুন স্বপ্নের সন্ধান দিতে, সর্বোপরি প্রিয় বাংলাদেশকে নিয়ে তার উদ্বেগ, উত্কণ্ঠা, ভাবনা ও ভালোবাসাটুকু ভাগ করে নিতে আমাদের সঙ্গে। হায়, সেই দিন আর কোনোদিন আসবে না! কঠিন কর্কটব্যাধি অবশেষে কেড়ে নিয়ে গেল বটবৃক্ষসম আমার সেই প্রথম যৌবনের বিস্ময়জাগানিয়া, বৃষস্কন্ধ, বাকিবদগ্ধ সহ-‘নাগরিককে’,
সারা বাংলা যাকে এক নামে চেনে, নাম তার আলী যাকের।
আলম খোরশেদ: প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও শিল্পসংগঠক










