বাঙালির খাদ্যতালিকার অন্যতম উপাদান মরিচ। এর তীব্র ঝাল ও গন্ধের কারণে খাবারের স্বাদ বাড়াতে মসলা হিসেবে রান্নায় মরিচ ব্যবহার করা হয়। এছাড়া আলাদা খাদ্য হিসেবে এটি খাওয়া হয়। কেবল আস্ত একটি মরিচ ও সামান্য পেঁয়াজ দিয়ে পুরো এক থালা পান্তা ভাত সাবাড় করা গ্রাম-বাংলার সাধারণ একটি দৃশ্য। আলু ভর্তাসহ বিভিন্ন ধরনের ভর্তা ও ডালে মরিচ পোড়ার ব্যবহার এগুলোর স্বাদকে অনন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যায়। খাবার খেতে বসে মরিচ না পেলে অনেকের মনটাই খারাপ হয়ে যায়। তাই বাড়ির উঠানে, ঘরের বারান্দায় কিংবা ব্যালকনিতে টবে মরিচের গাছ লাগান অনেকেই। খাওয়ার সময় ঘরের লাগোয়া এসব গাছ থেকে মরিচ ছিঁড়ে এনে তাতে কামড় বসানোর মজাই আলাদা। আবার হোটেল এবং রেস্তোরাঁগুলোয় সালাদের সঙ্গে মরিচ থাকার বাধ্যবাধকতা যেন এক প্রকার অলিখিত নিয়মেই পরিণত হয়েছে। শিঙাড়া, সমুচা, পেঁয়াজু ইত্যাদি যেকোনো ধরনের তেলে ভাজার সঙ্গে মরিচ যেন স্বর্গীয় এক আমেজে ভরিয়ে দেয় রসনাবিলাসীদের মন। তাই মরিচের অভাবে এসব খাবারের দোকানগুলোয় ঝগড়া, এমনকি মারামারির ঘটনাও বিরল নয়। সাধারণত যখন মরিচের দাম বেড়ে যায়, তখন এ ধরনের ঘটনা ঘটে। আবার মূল্যের ঊর্ধ্বগতি সত্ত্বেও যেসব খাবারের দোকানে না চাইতেই মরিচ দেয়া হয়, খদ্দেরদের কাছে সেগুলো আলাদা সমাদর লাভ করে। মানুষের কাছে এতটা জনপ্রিয় যে মরিচ বাংলাসহ বিপুলা ভারতবর্ষে তার আগমন কীভাবে ঘটল, সে ইতিহাসের খোঁজ কয়জনই বা আমরা রাখি। অথচ মানুষের যেমন ইতিহাস আছে, তেমনি প্রত্যেক প্রাণী ও উদ্ভিদ প্রজাতিরও যার যার নিজস্ব ইতিহাস আছে। চলুন সে ইতিহাসের আলোকে বাংলাসহ সমগ্র ভারতে মরিচ কীভাবে প্রবেশ করল, তা সংক্ষেপে জেনে নেয়া যাক।

প্রথমে পাঠকের কাছে কিছু বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। ভারতবর্ষে মরিচের আগমনের বহু আগে থেকে এখানকার মানুষ উদ্ভিদটির ভিন্ন জাতের কিছু ফল ব্যবহার করত। এগুলো ছিল ‘পিপারেচি’ বা ‘পিপার’ গোত্রের। তারা তাদের রান্না ঝাল করার জন্য এগুলো ব্যবহার করত। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হলো ‘ব্ল্যাক পিপার’ বা গোলমরিচ এবং ‘পিপ্পলি’ বা লঙ্কা মরিচ। গোলমরিচ এক প্রকার লতাজাতীয় উদ্ভিদের ফল। মালাবার অঞ্চলে এগুলো উত্পন্ন হতো। লঙ্কা মরিচ পূর্ব বাংলা ও উড়িষ্যার বনাঞ্চলে জন্মাত। সাধারণ পরিভাষায় এসব মরিচজাতীয় ফল ‘পিপ্পলি’, ‘পিপলি’ কিংবা ‘পিপুল’ নামে অভিহিত হয়। ভারতীয় আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে এ দুই ধরনের মরিচের কথাই উল্লেখ আছে। আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় ওষুধ ও পথ্য হিসেবে এগুলো সুপারিশ করা হয়। মরিচের তীব্র ঝাল এবং রসাল ফলের মতো স্বাদের বিপরীতে পিপলি অনেকটা স্বাদবিহীন। তবে তা গলায় কটু একটি অনুভূতি তৈরি করে।

স্বাদ যেমনই হোক, মসলা হিসেবে ভারতীয় পিপলির ব্যাপক কদর ছিল বহির্বিশ্বে, বিশেষত ইউরোপীয়দের কাছে। তাদের কাছে তা পরিচিত ছিল ‘পিপার’ নামে। আরব বণিকদের মাধ্যমে ভারত ও মিসরের মধ্যে মসলার বাণিজ্য চৌদ্দ শতকের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ মসলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাহিদা ছিল ‘পিপলি’ বা ‘পিপার’ তথা গোলমরিচের। মিসর থেকে তা যেত ইউরোপে। রোমানদের হাত থেকে মিসরের অধিকার তখন মুসলমানদের কাছে চলে গেছে। তাই মিসর হয়ে ভারতে আসাটা ইউরোপীয় বণিকদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ভারতীয় মসলার বড় বাজারকে নিজেদের হস্তগত করতে ইউরোপীয় বণিকরা ভারতে আসার বিকল্প পথ খুঁজতে থাকে। এ উদ্দেশ্যে ক্রিস্টোফার কলম্বাস স্পেন থেকে যাত্রা করেছিলেন। তবে ভারতবর্ষে আসার পরিবর্তে তিনি ভুল করে আমেরিকা মহাদেশ আবিষ্কার করে ফেলেন। সেখানে তিনি প্রথম মরিচের সাক্ষাৎ পান। সেখানকার আদিবাসী মেসো-আমেরিকান জনগণ এক ধরনের মরিচ খেত। তারা এটিকে বলত ‘আজি’। কলম্বাস কেবল আমেরিকাকেই ভারতবর্ষ বলে ভুল করেননি, তিনি এ ‘আজি’-কে ভারতীয় ‘পিপার’ তথা গোলমরিচ বলেও ভুল করেছিলেন। তাই তিনি তার ডায়েরিতে এটিকে ‘চিলি পিপার’ হিসেবে উল্লেখ করেন। আর এভাবে চিলি ‘চিলি পিপার’ নামে পরিচিত হলো। তিনি এই চিলি পিপার স্পেনে নিয়ে আসেন। সেখানে এটি মসলা হিসেবে জনপ্রিয়তা লাভ করে। কলম্বাসের পরই সারা বিশ্বে মরিচের আবাদ শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে ইউরোপ থেকে মরিচ দ্রুত ভারত, চীন ও জাপানে ছড়িয়ে পড়ে। শুরুর দিকে ইউরোপের স্পেন ও পর্তুগালে বিভিন্ন ধর্মীয় মঠের বাগানগুলোয় জীববৈজ্ঞানিক কৌতূহল থেকে মরিচ চাষ শুরু হয়েছিল। কিন্তু সন্ন্যাসীরা রান্নার ক্ষেত্রে এর সম্ভাব্যতা যাচাই করেন। তারা আবিষ্কার করেন এ মরিচগুলো ভারতীয় গোলমরিচের চেয়ে স্বাদে ও গন্ধে অনেক উন্নত। তখন গোলমরিচের এতটাই দাম ছিল যে অনেক দেশে মুদ্রা হিসেবে সেগুলোর প্রচলন ছিল। তাই গোলমরিচের সস্তা একটি বিকল্প হিসেবে তারা এ মরিচ ব্যবহার করা শুরু করেন। তারপর মরিচের বীজ মুসাফির সন্ন্যাসীদের মাধ্যমে সমগ্র স্পেন ও ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। সেখান থেকে পর্তুগিজ ও স্প্যানিশ ব্যবসায়ীদের দ্বারা তা আফ্রিকা ও এশিয়ায় প্রবেশ করে।

এটি ব্যাপকভাবে গৃহীত মতামত যে দক্ষিণ এশিয়ায় মরিচের আগমন ঘটেছে পর্তুগিজ অভিযাত্রী ভাস্কো দা গামার মাধ্যমে। কলম্বাসের অভিযানের কয়েক বছর পর ১৪৯৮ সালে পর্তুগিজ অভিযাত্রী ভাস্কো দা গামা ভারতবর্ষের মালাবার উপকূলের কালিকট বন্দরে এসে নামেন। কলম্বাস যেখানে ব্যর্থ হয়েছিলেন, দা গামা সেখানে সফল হলেন। ঐতিহাসিক লিজি কলিংহামের মতে, ভারতের মালাবার উপকূলে কখন মরিচের উপস্থিতি ঘটল তা হলফ করে বলা সম্ভব নয়। তবে ভাস্কো দা গামা ভারতের মাটিতে পা রাখার ৩০ বছর পরে দেখা গেল, গোয়ায় বিভিন্ন প্রজাতির মরিচ জন্মাচ্ছে। গোয়াতে মরিচকে বলা হতো ‘পারনামবুকো পিপার’। ব্রাজিলে পর্তুগিজদের কুঠি ছিল ‘পারনামবুকো’ নামক শহরে। সেখান থেকে লিসবন হয়ে এ মরিচ এখানে এসেছিল বলে এমন নামকরণ করা হয়। মুম্বাইতে তাদের নাম হলো ‘গোয়াই মিরচি’, অথবা ‘গোয়া পিপার’। এ থেকে বোঝা যায় গোয়া ছিল ভারতবর্ষে মরিচের প্রবেশদ্বার। সেখান থেকে কালক্রমে মরিচ সারা ভারতে ও বাংলায় বিস্তৃতি লাভ করে।

পিপলি ও মরিচকে ইউরোপীয় বণিকরা একই নামে ডাকত। তবে ভারতীয়দের কাছে এ দুটো ভিন্ন নামে পরিচিত। পিপলি ভারতীয়দের কাছে ‘কালি মিরচি’ এবং মরিচ ‘হরি মিরচি’ নামে পরিচিত। তামিলদের কাছে এ দুটো যথাক্রমে ‘মিলাগু’ ও ‘মিলাগাই’ নামে পরিচিত। ভারতীয়রা মরিচকে পিপলির অধিকতর শক্তিশালী রূপ হিসেবে দেখেছিল। এছাড়া গোলমরিচের চাষ যেখানে কেবল কেরালার দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল, সেখানে মরিচ যেকোনো স্থানে জন্মাত। যদিও ভারতীয় অঞ্চলের রান্নায় গোলমরিচ এখনো সহযোগী ভূমিকায় থাকে, কিন্তু মুখ্য ঝাল সরবরাহকারী হিসেবে ষোল শতকে এটি মরিচের কাছে তার অবস্থান হারায়। আর মরিচের ব্যবহার এ অঞ্চলে এতটাই ব্যাপকতা লাভ করে যে এটি এখানকার নিজস্ব উপাদান হিসেবে গণ্য হতে থাকে। প্রাথমিকভাবে কেবল রসনাবিলাসের জন্য এখানকার অধিবাসীরা মরিচকে গ্রহণ করেনি। বরং এর পেছনে ছিল অর্থনৈতিক কারণ। যেহেতু এটি সহজে ও সস্তায় উৎপাদন করা যেত, সেহেতু মরিচ পিপলির স্থান দখল করে নেয়। ষোল শতকে ভারতে মরিচের চাষাবাদ শুরু হয়। তারপর থেকে এটি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর খাবার তালিকায় গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে। পিপলির তুলনায় মরিচ ছিল অনেক সস্তা। তাই নিম্ন আয়ের লোকদের কাছে মরিচের গ্রহণযোগ্যতা সবসময়েই ছিল। ভারতবর্ষের দলিত সম্প্রদায়ের কাছে এর আবেদন ছিল বেশি। অন্য কোনো মসলা সংগ্রহ করা তাদের পক্ষে সম্ভব হতো না। তাই রান্নার স্বাদ বাড়ানোর জন্য মরিচই ছিল তাদের একমাত্র উপায়। তারা ‘ওয়াজদি’ নামে একটি খাবার রান্না করে। গরু কিংবা ছাগলের ভুঁড়ি দিয়ে এটি রান্না করা হয়। শুধু তেল, লবণ ও মরিচের গুঁড়া দিয়ে এটি তারা রান্না করে। রান্নার স্বাদ বাড়ানো ছাড়াও এসব সুবিধা বঞ্চিত জনগণের ভিটামিন সির অন্যতম উৎসও মরিচ। রান্নায় গোলমরিচ, লঙ্কা মরিচ, এলাচ ইত্যাদি মসলার ব্যবহার কেবল উচ্চবিত্তের রসুইঘরে সীমাবদ্ধ ছিল। এক্ষেত্রে মরিচ এক সাম্যবাদী চরিত্র নিয়ে হাজির হয়েছে। ১৫৪০-এর দশকে ইউরোপীয় জীববিজ্ঞানীরা যখন ভারতবর্ষের বন্য ও আবাদি উদ্ভিদকূল নিয়ে গবেষণা করতে শুরু করেছে, ততদিনে মরিচ ভারতীয়দের কাছে এত ব্যাপকভাবে গৃহীত হয়েছিল, এটিকে তারা এখানকার নিজস্ব উদ্ভিদ বলেই ভুল করেছিল।

দাক্ষিণাত্যে ব্যাপক উৎসাহের সঙ্গে মরিচকে বরণ করে নেয়া হয়। মরিচ উৎপাদন ও খাওয়ার ক্ষেত্রে শুষ্ক আবহাওয়া সহায়ক। পিপলির তুলনায় সেগুলো সস্তায় উৎপাদন এবং সংরক্ষণ করা যেত। ‘ইন্ডিয়ান ফুড ট্র্যাডিশন: আ হিস্টোরিক্যাল কম্প্যানিয়ন’ বইয়ে বিখ্যাত খাদ্য বিশারদ কে টি আচায়া দক্ষিণ ভারতীয় কবি ও দার্শনিক পুরন্দর দাসের কথা উল্লেখ করেছেন। পুরন্দর দাস মরিচ নিয়ে কবিতা লিখেছেন। সেখানে তিনি ভুট্টার রুটির সঙ্গে মরিচ খাওয়া এবং মরিচের সবুজ থেকে লালে বিবর্তিত হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন।

বর্তমানে উপমহাদেশজুড়ে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে মরিচের শত শত প্রজাতি উৎপাদন হয়। ভূত জোলোকিয়া, নাগা মরিচ, গুনটুর সান্নাম, সালেম গুন্ডু, মাথানিয়া, কাশ্মীরি, জওয়ালা ও কানথারি সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রজাতির মরিচের উদাহরণ।

বাংলাদেশেও ব্যাপকভাবে মরিচের চাষ করা হয়। মূলত শীতকালীন শস্য হিসেবে কুমিল্লা, নোয়াখালী, ফরিদপুর, বরিশাল, পটুয়াখালী ও বগুড়ায় মরিচের চাষাবাদ হয়। বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে উত্পন্ন বিভিন্ন প্রজাতির মরিচের মধ্যে বালিজুরি, বোনা, বাইন, সাইতা, সূর্যমুখী, পাবা, হালদা, ধানী, শিকারপুরী ও পাটনাই উল্লেখযোগ্য।

১৫১১ সালে থাইল্যান্ডের সঙ্গে পর্তুগালের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়। এ সময় তাদের মাধ্যমে সেখানে মরিচ প্রবেশ করে। ভারতের মতো থাইল্যান্ডের জনগণও মরিচকে সাদরে বরণ করে নেয়। ১৫৪৩ সালে পর্তুগিজ ও জাপানিদের মধ্যে ব্যবসায়িক সম্পর্ক স্থাপিত হওয়ার পর জাপানে মরিচের প্রবেশ ঘটে। সর্বশেষ পর্তুগিজরা কোরীয় উপদ্বীপে তাদের ঘাঁটি স্থাপন করে। ষোলো শতকের মাঝামাঝি সেখানে মরিচ ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। ভারতবর্ষে মরিচের আগমনের ২০০ বছর পরে ভারতীয় তীর্থযাত্রী ও ব্যবসায়ীদের দ্বারা এটি স্থলবেষ্টিত রাজ্য ভুটানে প্রবেশ করে। ভুটানের জনগণ মরিচের প্রতি এতটাই আসক্ত হয়েছে, এটি ছাড়া তারা কোনো খাবারই কল্পনা করতে পারে না। বর্তমানে ভুটানে বিভিন্ন প্রজাতির মরিচের চাষ হয়।

তবে এশিয়ার অন্যান্য দেশের মতো চীনে মরিচের যাত্রা এতটা সরলরৈখিক নয়। চীনে কীভাবে মরিচ প্রবেশ করল, এ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিতর্ক আছে। বর্তমানে চীনের বিশেষ প্রশাসনিক অঞ্চল ম্যাকাও আগে পর্তুগিজদের উপনিবেশ ছিল। তবে ম্যাকাও থেকে পর্তুগিজদের দ্বারা চীনে মরিচ প্রবেশ করেছে কিনা এ বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে সমুদ্রপথে মরিচ প্রবেশ করলেও চীনে তা স্থলপথে প্রবেশ করেছে বলে অনুমান করা হয়। চীনের সিচুয়ান ও হুনান প্রদেশের মানুষ সবচেয়ে বেশি মরিচ খায়। চীনের দক্ষিণ অংশের এ দুটি প্রদেশ স্থলবেষ্টিত। তবে তারা পাশাপাশি নয়। এখানে মরিচ কীভাবে এল, তা নিয়ে নানা ধারণা আছে। তবে অধিকাংশের মতে, স্থলপথে ভারত ও মিয়ানমার হয়ে এ প্রদেশগুলোয় মরিচের বিস্তার ঘটেছে। আরেকটি অনুমান হলো মধ্যপ্রাচ্যের বণিকদের মাধ্যমে এখানে মরিচের আগমন ঘটেছে। প্রাচীন সিল্ক রোড ব্যবহারের মাধ্যমে সিচুয়ান ও হুনান প্রদেশের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের একটি বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল। এ বণিকরা মসলার বিনিময়ে চায়না সিল্ক, তৈজসপত্র ও চা কিনে নিয়ে যেত। ঐতিহাসিক চার্লস পেরির মতে, খোরাসানের পারস্য ব্যবসায়ীরা কাশ্মীর ও নেপালে মরিচকে পরিচিত করেছিল। তাই এ দুটি ভূখণ্ডে মরিচের স্থানীয় নাম হলো ‘খোরাসানি’। এখান থেকে ভারতের উত্তর-পূর্ব অংশ এবং মিয়ানমারের উত্তর অংশ হয়ে তারা সিচুয়ানে প্রবেশ করত। তবে হুনানের ক্ষেত্রে এ সম্ভাবনা কম। চীনের দক্ষিণ-পূর্ব অংশে অবস্থিত প্রদেশটির ভৌগোলিক অবস্থান থেকে একটি সম্ভাবনা আছে, সমুদ্রপথে এখানে মরিচ প্রবেশ করেছে। ম্যাকাও থেকে মরিচ উত্তর দিকে ভ্রমণ করে চীনের গুয়াংডং প্রদেশ হয়ে হুনানে গিয়েছে। অথবা ফুজিয়ান বন্দর হয়ে পশ্চিমে জিয়াংঝি প্রদেশ হয়ে সেখানে গিয়েছে। যেভাবেই প্রবেশ করুক, চীনে মরিচ সাদর অভ্যর্থনা ও ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে। প্রাচীনকাল থেকে লাল রঙ চীনে মঙ্গলজনক হিসেবে বিবেচিত। এটি তাদের কাছে জীবন, স্বাস্থ্য ও উদ্দীপনার প্রতীক। তাই টকটকে লাল মরিচকে তারা স্বাগত জানাতে দ্বিধা করেনি। মরিচের প্রতি চীনের বিপ্লবী জনগণের ভালোবাসা বিখ্যাত বিপ্লবী নেতা মাও সে তুংয়ের এ বাণীতে যথার্থ ফুটে উঠেছে—‘যদি তুমি মরিচ না খাও, তবে তুমি বিপ্লবী হতে পারবে না।’

 

নিজাম আশ শামস: লেখক ও অনুবাদক