সময়ে-অসময়ে মরিচের দাম বেড়ে যাওয়া আমাদের পরিচিত ঘটনা। মরিচ আমাদের খাদ্য প্রস্তুতির অন্যতম উপাদান। খাদ্য প্রস্তুতে তো নানা ধরনের মসলার ব্যবহার হয়, তার মধ্যে মরিচ একটি অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ। এ মরিচের আবার নানা রূপ—কাঁচা ও শুকনা এ দুটি প্রকারই বেশি ব্যবহার হয় আমাদের রান্নায়। এছাড়া আছে গোলমরিচ। তবে সাধারণভাবে মরিচ বলতে যে দ্রব্যটির রূপ চোখের সামনে আসে, তার সঙ্গে গোলমরিচের তফাত আছে। এখানে চেনা মরিচের সম্পর্কেই আলাপ করব। মজার ব্যাপার মরিচ আমাদের নিত্যব্যবহার্য হলেও এ মরিচ আমাদের অঞ্চল অর্থাৎ ভারতবর্ষের নিজস্ব নয়। মরিচের আদি নিবাস আমেরিকা। সেখান থেকেই ভ্রমণ করে মরিচ ছড়িয়েছে বিশ্বে।

উদ্ভিদবিজ্ঞানের হিসাবে মরিচকে শনাক্ত করতে গেলে বলতে হয় এটি ক্যাপসিকাম (Capsicum) গণের সোলানেসি (Solanaceae) পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। এর রয়েছে বেশকিছু ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতি। তবে সাধারণভাবে ‘চিলি’ নামেই এটি পরিচিত। চিলি নামটি থেকেই মরিচের উৎপত্তি বা আদি নিবাসের পথে হাঁটা যায়। মেক্সিকান ‘চিলি’ মূলত ‘ঝিলি’ থেকে আসা। এটি পুরনো অ্যাজটেক সভ্যতার ভাষা থেকে আসা। ক্যাপসিকাম বলতে এখন সাধারণত মিষ্টি জাতের মরিচকে (বেল/বেল পেপার) বোঝানো হয় এবং ঝাল মরিচের নাম চিলি। ক্রিস্টোফার কলম্বাস মরিচের নাম দিয়েছিলেন ‘পেপার’ কিন্তু আসলে চিলি ও পেপার দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস। মরিচের পাঁচটি জাত (C. annum, C. frutesescens, C. baccatum, C. chinese, C. pubescens) মূলত ঘরোয়াভাবে রান্নায় ব্যবহার হয় এবং এগুলো বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের পাশাপাশি মেক্সিকোয়ও বিখ্যাত।

মরিচের উৎপত্তি নিয়ে গবেষণা করেছেন ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া-ডেভিসের উদ্ভিদ বিশেষজ্ঞ পল গেপ্ট। ঐতিহাসিক ভাষা, বাস্তুতান্ত্রিক তথ্য, বর্তমানে ব্যবহূত মরিচের বংশগতিবিদ্যা বিশ্লেষণ করে তারা দেখেছেন মরিচের জন্মস্থান মধ্য ও পূর্ব মেক্সিকো। এ সিদ্ধান্তে যেতে তারা কয়েক স্তরের গবেষণার মধ্য দিয়ে গিয়েছেন। এ গবেষণায় পল গেপ্টের সহকারী ছিলেন গ্যারি পি নাভান। তিনি বলেন, ‘একাধিক সূত্র ও প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে এ গবেষণার মাধ্যমে বৈশ্বিক এ উদ্ভিদের (মরিচ) উৎপত্তি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।’ ২০১৪ সালের ২১ এপ্রিল ন্যশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেসের অধিবেশনে তারা এ গবেষণার ফল প্রকাশ করেন।

এ জাতের মরিচের কিছু বুনো জাত এখনো উত্তর আমেরিকায় দেখা যায়। সেপ্টেম্বর-জানুয়ারিতে দক্ষিণ অ্যারিজোনার মরুভূমিতে মরিচের দেখা মেলে। তবে মরিচের উদ্ভব বহু আগে। এ অঞ্চলের বিভিন্ন ধ্বংসস্তূপ থেকে মরিচের বীজ পাওয়া গিয়েছে। এ থেকে মরিচের আদিমতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। বর্তমানে গবেষণা করতে গিয়ে দেখা গিয়েছে হিস্পানিক পূর্ব সময়ে মরিচের ব্যবহার হতো। সেখানে গার্হস্থ্য ব্যবহারের পাশাপাশি বিভিন্ন ঐতিহাসিক সম্পদে ভরা পুরাকীর্তি অঞ্চলেও মরিচের বীজ পাওয়া গিয়েছে। তবে মরিচকে যে সবজির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে রান্নার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যায় তা বুঝতে মানুষের সময় লাগে। এরপর কোনো এক সময় মরিচ বিনিময় মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহার হতো।

মরিচের আদি অবস্থা খুঁজতে গেলে দেখা যায়, মেক্সিকো ও উত্তর আমেরিকায় প্রচুর পরিমাণে মরিচ উৎপাদন হতো। এ ধরনের মরিচ সবই ক্যাপসিকাম গণের অন্তর্গত। শুরুর দিকে মেক্সিকো ও আমেরিকার প্রধান ফসল ও সবজি ছিল ভুট্টা, শিম ও স্কোয়াশ। এরপর মরিচ ব্যবহার হতে শুরু করলে খাবারের স্বাদ বৃদ্ধি পায়। বলা হয়, বর্তমান মরিচের পূর্বসূরি চিলটেপিনের আদি নিবাস মধ্য ও পূর্ব মেক্সিকোর নার্সারিতে। প্রাথমিকভাবে খাবার প্রস্তুতের পর এতে ঝাঁঝালো স্বাদ তৈরির ক্ষেত্রে মরিচ ব্যবহার করা হতো। তবে সেটা খুব সামান্য পরিমাণেই। কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন প্রমাণ করে মরিচের চাষ আমেরিকায় দশম শতাব্দীতে জনপ্রিয় ছিল। প্রধান খাদ্য হওয়ার সুযোগ ছিল না, কিন্তু প্রচুর পরিমাণে চাষ হতো আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে।

আর্কিওবোটানিক্যাল রেকর্ড অনুসারে উত্তর-পশ্চিম মেক্সিকো ও দক্ষিণ-পূর্ব আমেরিকায় মরিচের নিদর্শন পাওয়া যায় না। এ অঞ্চলে মরিচকে পরিচিত করিয়েছিল স্প্যানিশরা। এখানে একটি কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য দিয়েছেন নৃতত্ত্ববিদ পল মিনিস ও মাইকেল হালেন। তারা বলেন, এ সময় মরিচ মূলত ধনী বা নেতা পর্যায়ের কৃষকদের জমিতে চাষ হতো। এর মানে মরিচের একটি আভিজাত্য তৈরি হয়েছিল। এছাড়া সে সময় খাদ্য বা ফসল মূলত বিনিময়ের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। মেক্সিকোর চিহুয়াহুয়া প্রত্নতাত্ত্বিক সাইটে কাসা গ্যান্দেতে কেবল বিক্ষিপ্তভাবেই নয়, ক্রিস্টালের মধ্যেও মরিচের সন্ধান পাওয়া যায়। সেগুলো এমন সব বস্তু, যা সাধারণ মানুষের নাগালে ছিল না।

এর বাইরেও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন রয়েছে। মরিচের নমুনা পাওয়া গেছে বিভিন্ন পাত্রের ভেতরে। এ থেকে বোঝা গেছে মরিচ খুব সুন্দর করে কেটে প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে পাত্রবন্দি করে রাখা হতো। এর মধ্যে কোনো কোনোটি আবার বেটে রাখাও হতো। খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ থেকে ৩০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়ের মেক্সিকোয় মরিচের ব্যবহার নিশ্চিত হওয়া গিয়েছে এবং এই সময়ে গার্হস্থ্য ব্যবহারেই মরিচের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এ সময়ে ব্যবহার্য মরিচ বিভিন্ন উপায়ে স্পাউটেড জারের মধ্যে সংরক্ষণ করা হতো। প্রত্নতাত্ত্বিকরা মনে করেন, এ পাত্রগুলো ডিক্যানটার হিসেবে ব্যবহার করা হতো। এখান থেকে ‘চিলি সস’ তৈরি বা সে আমলে চিলি সস ব্যবহারের একটি তত্ত্ব তুলে ধরা হয়। ডিক্যানটারের মতো পাত্রে নিশ্চয়ই আস্ত মরিচ রাখা হতো না।

ওলমেক ও মায়ান সভ্যতায়ও মরিচের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এ দুই সভ্যতার হিসাব অনুসারে মেসো-আমেরিকায় এক-তৃতীয়াংশে মরিচ ব্যবহারের রেকর্ড পাওয়া যায়। মায়ানরা তাদের প্রতিবেশীদের সঙ্গে নিজেদের খাদ্যাভ্যাস ভাগ করে নিত। চিলি পেপারের আগমনের মধ্য দিয়ে ভুট্টা, স্কোয়াশ ও শিমের মধ্যে এর নতুন আগমনর তারা ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। এল সালভাদরের একটি স্থানে এর নমুনা মিলেছে। ৯৫০ খ্রিস্টাব্দে একটি আগ্নেয়গিরি বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে এ অঞ্চল ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। Joya de Ceren অঞ্চলটিতে খাদ্যদ্রব্যের পাওয়া নমুনায় টমেটো ও মরিচের অস্তিত্ব দেখতে পেয়েছেন প্রত্ন বিশেষজ্ঞরা। ধারণা করা হয়, তেরো শতকের দিকে মায়ান সভ্যতা ধ্বংস হওয়ার পরপর অ্যাজটেকরা তাদের উত্তরাধিকার বহন করা শুরু করে। অ্যাজটেকদের লিখিত ইতিহাসের পাশাপাশি রয়েছে স্থাপনা, শিল্পদ্রব্য ইত্যাদি। সেখান থেকে তাদের খাদ্যদ্রব্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। অ্যাজটেকদের খাদ্যাভ্যাস ইউরোপীয়দের তুলনায় ভিন্ন ছিল। তবে তারা তাদের খাবারের স্বাদ বাড়াতে লবণ ও মরিচ ব্যবহার করত। Bernardino de Sahagún (প্রথম এনসাইক্লোপেডিয়া তৈরি করেন বলে কথিত) তার Florentine Codex-এ অ্যাজটেকদের খাদ্যাভ্যাসের প্রসঙ্গ এনেছেন। সেখানে উল্লেখ রয়েছে—

The good chili seller sells mild red chilies, broad chilies, hot green chilies, yellow chilies, cuitlachilli, tenpilchilli, chichioachilli. He sells water chilies, conchilli; he sells smoked chilies, small chilies, tree chilies, thin chilies, beetle-like chilies. He sells hot chilies, earlyseason chilies, hollow-based chilies. He sells green chilies, sharppointed red chilies, late-season chilies, chilies from Atzitziuacan, Tochmilco, Huaxtepec, Michoacan, Anauac, the Huaxteca, the Chichimeca. Separately he sells strings of chilies, chilies cooked in an olla [a broad-bellied cooking pot], fish chilies, white fish chilies.

মরিচের সঙ্গে বহুদিনের যোগাযোগের কারণে আমেরিকানদের ধর্ম ও রোজকার জীবনাচরণে মরিচ বিশেষ জায়গা নেয়। তাদের বিশ্বাস অনুসারে মরিচ মানুষের জন্ম ও মৃত্যুর সঙ্গেও জড়িত। অ্যামাজনের টুপি জাতির মানুষের বিশ্বাস হলো মৃত্যুর পর দুটি দৈত্য মানুষের পাকস্থলী ও অন্ত্র খেয়ে ফেলে। এরপর ঈশ্বর মৃত মানুষের চোখে মরিচের রস ঢেলে তার দৃষ্টি ফেরান এবং পরবর্তী জীবনে প্রবেশ করে মানুষটি। পশ্চিমের পুবো জাতির (দক্ষিণ-পশ্চিম আমেরিকায় বসবাস) ক্ষেত্রে মরিচ হলো সুস্বাস্থ্য ও শক্তির প্রতীক। ইনকাদের মধ্যেও মরিচকে দেবতার সমতুল্য সম্মান দেয়া হয়। মূলত ঝাঁজ ও খাবারে স্বাদ বৃদ্ধি করার কারণে মরিচ এ ধরনের স্থান পেয়ে যায় মানুষের কাছে। মূলত পুরাণ মিলে যায় জীবনাচরণের সঙ্গে। খাদ্য ও ব্যবসার ক্ষেত্রে জনপ্রিয় হওয়ার কারণে জায়গাটি মরিচের হয়ে যায়।

পুরাণের পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবনেও কেবল খাবার নয়, এর বাইরেও মরিচের থাকে বিশেষ একটি স্থান। প্রাথমিক পর্যায়ের মেসো-আমেরিকানদের জীবনাচরণে মরিচ একটি ভিন্ন স্থান অর্জন করে নিয়েছিল। গুয়েতেমালায় বসবাসকারী Tz’utujil জাতির মানুষের মধ্যে একটি কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। সবজিদের আত্মা যখন ঈশ্বরের কাছে মানুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিল, তখন মরিচ আর টমেটোই বলেছিল সব মানুষ খারাপ নয়। এটা স্পষ্টভাবেই বোঝা যায়, মানুষের তৈরি এ কিংবদন্তিতে মূলত মানুষের মধ্যে মরিচ ও টমেটোর জনপ্রিয়তার কারণে এ রকম একটি মিথ বা কিংবদন্তি তৈরি হয়েছে। Bernardino de Sahagún তার লেখায়ও উল্লেখ করেছেন, সমাজে মরিচ বিক্রেতারা বিশেষ সম্মানের অধিকারী ছিলেন। এমনকি মরিচের নানা রঙের কারণেও এর ছিল বিশেষ আবেদন। সবুজ, লাল, হলুদ, সোনালি হয়ে ওঠা মরিচ কৃষক ও বিক্রেতার মধ্যে আলাদা রঙ তৈরি করত। সমাজে তাদের তৈরি হতো বিশেষ অবস্থান। আজ মরিচ খেতে গিয়ে ঝালে মুখ পোড়ায়, সেখানে একটি তথ্য হয়তো পাঠককে অবাকই করবে। মরিচ এতই জনপ্রিয় হয়েছিল যে মেক্সিকো ও আমেরিকায় একসময় মরিচ দিয়ে ধূমপানও করা হতো। অপরাধী ও অবাধ্য সন্তানদের শাস্তি দিতে নিশ্বাসের সঙ্গে মরিচ পোড়ানো ধোঁয়া নিতে বাধ্য করা হতো।

 

মাহমুদুর রহমান: লেখক