খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতকে ফ্রান্সের ক্লুনি আশ্রমের এক সাধু পিয়েরে লা ভেনেরাবলে স্পেন সফরে গিয়েছিলেন। তিনি দেখেন, সেখানকার আরব ও ইহুদিরা তাদের ধর্মীয় গ্রন্থ লিখতে পশুর চামড়া নয়, বরং পুরনো কাপড় থেকে তৈরি এক রকম পাতা ব্যবহার করছেন। এ পাতাকে আজকের দিনের ‘র্যাগ পেপার’ বলা যায়। পিয়েরের কাছে এ কাগজের ব্যবহার সমাজের অধঃপতন বলে প্রতিভাত হয়েছিল। নতুন প্রযুক্তির প্রতি সমাজে যে কুসংস্কার কাজ করে, সেটা এখানে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কাগজের ইতিহাসেও দেখা গেছে এ সাধারণ প্রবণতা। আজকের দিনে প্রযুক্তি বললেই ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির বিকাশ মনে হয়। কিন্তু জ্ঞানের যেকোনো বাস্তব ব্যবহারকেই প্রকৃত অর্থে প্রযুক্তি বোঝায়। এখন একটি প্রচলিত ধারণা হচ্ছে, প্রযুক্তির আবিষ্কার ও ব্যবহার সমাজকে বদলে দেয়। কিন্তু মার্ক কারলানস্কি মনে করেন উল্টোটা। তিনি বলেন, সমাজের পরিবর্তন ও চাহিদাই বরং প্রযুক্তি বিকাশের পথ উন্মুক্ত করে। তিনি দেখিয়েছেন প্রথমে এসেছে মৌখিক ভাষা, তারপর অংকন, এরপর চিত্রলিখন পদ্ধতি, তারপর বর্ণমালা, সেখান থেকে ফোনেটিসিজম এবং তার পরে কাগজ। কাগজকে অনুসরণ করেছে ছাপাখানা, টাইপরাইটার, প্রিন্টারসহ আরো অনেক যন্ত্র। যখন কোনো প্রয়োজন এসে হাজির হয়, তখন সমাধানও পাওয়া যায়। উদাহরণ হিসেবে চীনের একটি ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে। খ্রিস্টপূর্ব ২৫০ অব্দে মেং তিয়ান উটের চুল থেকে একটি রঙ করার ব্রাশ তৈরি করেন। এ আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গেই কিন্তু চীনারা লেখালেখি, আঁকা ও ক্যালিগ্রাফি শুরু করে দেয়নি; বরং ততদিনে চীনা সমাজে লেখার পদ্ধতি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। তখন শুরু হয়েছে আরো ভালোভাবে লেখা, অলঙ্করণ ও ক্যালিগ্রাফি তৈরির চাহিদা। আগে একটি কাঠি কালিতে ডুবিয়ে লেখা হতো। কিন্তু এ কাঠি দিয়ে আর হচ্ছিল না। তখন মেং তিয়ান আরো দ্রুত লেখা ও ক্যালিগ্রাফি করার জন্য তৈরি করেন ব্রাশ। কাগজের আবিষ্কার ছাড়া স্থাপত্যের বিপ্লব, রেনেসাঁ কিংবা শিল্প বিপ্লব হতো না— এ ধারণাকে কারলানস্কি অতিকথন মনে করেন; বরং তিনি বলেন, সমাজ এমন এক পরিস্থিতিতে বিকশিত হয়েছিল যে, সেখান থেকেই এসব ঘটনা ঘটেছিল। পণ্ডিতরা বলতে পারেন, চীনারাই একমাত্র কাগজ আবিষ্কার করেছিল। যদিও মেসোআমেরিকানরাও হয়তো কাগজ তৈরি করেছিল কিন্তু স্প্যানিশরা তাদের সংস্কৃতি ধ্বংস করে দিয়েছিল বলে আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি না। কাগজের ব্যবহার বিভিন্ন সংস্কৃতিতে বিভিন্ন সময়ে হয়েছিল, সব &dquote;&dquote;সমাজ তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী কাগজ তৈরির কৌশল উদ্ভাবন করেছে। চীনা সরকারি কর্তারা ব্যাপকভাবে কাগজ ব্যবহার করার পাঁচ শতক পরে কোরিয়ার বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা কাগজ ব্যবহারের প্রয়োজন অনুভব করেছিলেন। তাই তারা চীনা কৌশল গ্রহণ করেন। এবং জাপানে বৌদ্ধ ধর্মের বিস্তারে এ কাগজকে ব্যবহার করেন। এর কয়েক শতক পরে আরবরা গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, স্থাপত্যবিদ্যার চর্চা শুরু করলে তারাও কাগজের প্রয়োজন অনুভব করতে শুরু করে। তখন মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা ও স্পেনজুড়ে তারা ব্যাপকভাবে কাগজ উৎপাদন শুরু করে। চীনারা কাগজ আবিষ্কারের পরে এক হাজারের বেশি বছর সময়ের মধ্যে ইউরোপীয়রা কাগজ ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেনি। ব্যাপারটা এমন নয় যে, তারা চীনের কাগজের সন্ধান পায়নি। সেটা তারা জানত কিন্তু কাগজ ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা তখনো তাদের সমাজে তৈরি হয়নি। আরবরা বহু বছর ধরেই ইউরোপে কাগজ সরবরাহ করতে চাচ্ছিল কিন্তু কাজ হয়নি। এরপর যখন আরবদের মতো গণিত, বিজ্ঞানের চর্চা শুরু করে, তখনই তারা কাগজের প্রয়োজন অনুভব করতে থাকে। বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা এবং সেই ধারণা ও বাণিজ্যের বিস্তার ইউরোপকে কাগজ তৈরিতে ধাবিত করল। আজকের দিনের কম্পিউটার, ছাপাখানার চেয়ে কাগজের বিস্তার হয়েছিল অনেক ধীরগতিতে।&dquote;&dquote;

কাগজের দাম ধীরে ধীরে কমে গেছে কিন্তু আঠারো শতকে উৎপাদিত কাগজের মান উনিশ শতকের কাগজের চেয়ে ভালো ছিল। হাজার বছর ধরে কাগজ ছিল সভ্যতার মানদণ্ড, কাগজ মানে সভ্যতা। সভ্যতাই কাগজের নির্মাতা। কিন্তু স্প্যানিশ আক্রমণকারী হেরনান কর্টেজ ১৫০৪ খ্রিস্টাব্দে আজটেকদের সাম্রাজ্যে পৌঁছে অবাক হয়ে যান। আজটেকরা তখন দুনিয়ার সবচেয়ে বড় নগর গড়ে তুলেছে, গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যায়ও তারা দারুণ অগ্রসর। কর্টেজকে সবচেয়ে অবাক করেছিল আজটেকদের কাগজ তৈরির প্রক্রিয়া। স্প্যানিয়ার্ডদের ধারণা ছিল কাগজ তৈরি মানে উন্নত সভ্যতা। কাগজ মানেই উন্নত সভ্যতা— মৌলনীতিটি এবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ল। এ ধারণা মেনে নিলে সভ্যতার শুরু হয়েছিল এশিয়ায় ২৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এবং এখান থেকে আরবে ছড়িয়ে পড়ে। কয়েক শতকজুড়ে আরব সভ্যতা ছিল দুনিয়ার অগ্রসর সভ্যতা। ইউরোপ তখন অন্ধকার। যে বর্বররা পঞ্চম শতকে রোম ধ্বংস করে দিয়েছিল, একাদশ শতকে তারা বর্বরই রয়ে গিয়েছিল। তারা লিখতে পারত না, তাদের বিজ্ঞানচর্চা ছিল না, এমনকি তারা সামান্য অংকও করতে পারত না, তাই তাদের কাগজেরও প্রয়োজন হতো না। তবে নতুন সব গবেষণায় দেখা গেছে, আগে যতটা অন্ধকার বিবেচনা করা হতো, ইউরোপ মধ্যযুগে ততটা অন্ধকার ছিল না। কিন্তু এটা অস্বীকারের কোনো সুযোগ নেই, সে যুগে ইউরোপ এশীয় ও আরবদের তুলনায় অনেক পিছিয়ে ছিল। খ্রিস্টানরা তখন মুসলিম ও ইহুদিদের জ্ঞানের সমকক্ষ ছিল না। তাই যখন খ্রিস্টানরা মুসলিম স্পেন দখল করে, তখন তারা মুসলিম সভ্যতার একটি কেন্দ্র আল-আন্দালুস ধ্বংস করে দেয়। একই সঙ্গে তারা তখন মেক্সিকোর উন্নত সভ্যতাকেও ধ্বংস করে দেয় তাদের ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি ও গ্রন্থরাজি ধ্বংসের মাধ্যমে।

লিখিত শব্দের গুরুত্ব বিভিন্ন ধর্মে স্পষ্ট দেখা যায়। প্রাচীন মিসরীয়দের ধারণা,  দেবতা থত তাদের লিখতে শিখিয়েছেন। আসিরীয়দের কাছে নাবু হচ্ছে তাদের লিখন দেবতা। মায়া সভ্যতার বিশ্বাস ছিল, সৃষ্টিকর্তার পুত্র ইত্সামা লিখন কৌশল ও বই আবিষ্কার করেন। কাগজ আবিষ্কারের আগে বিভিন্ন ধর্মের পবিত্র রচনাগুলো বিভিন্ন ধরনের বস্তুতে লেখা ও সংরক্ষণ করা হতো। ইহুদিদের অনেক কেন্দ্রে এখনো পশুর চামড়ায় হাতে লিখে তোরাহ সংরক্ষণ করা হয়।

ধর্মীয় কর্মকাণ্ড, বিজ্ঞান, জ্ঞানচর্চা— যত কিছুই প্রভাবক হিসেবে কাজ করুক না কেন, একটা বিষয় প্রযুক্তি বিকাশের ক্ষেত্রে খুবই সাধারণ। আর তা হলো আর্থিক লাভ। কোনো বিশেষ প্রযুক্তি বিকাশে আর্থিক সুবিধার সুযোগ না থাকলে উদ্যোক্তারা কখনই তা ছড়িয়ে দিতে আগ্রহী হবেন না। এ নিয়ম প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে। আবার উল্টোভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য বিকাশের স্বার্থে প্রযুক্তির বিকাশ ঘটে। মার্টিন হাইডেগার তার বিখ্যাত কাজ দ্য কোয়েশ্চেন কনসার্নিং টেকনোলজি-তে বলেছেন, প্রযুক্তি হচ্ছে ‘একটি সমাপ্তির হাতিয়ার।’ তারপর আরেকটু এগিয়ে তিনি বলেছেন, সমাপ্তির হাতিয়ারের চেয়ে ‘প্রযুক্তি হচ্ছে প্রকাশ করার একটি মাধ্যম।’ হাইডেগার বলছেন, এটা বুঝতে হলে আমাদের প্রশ্ন করতে হবে যে, কোনো প্রযুক্তি কেন সৃষ্টি বা বিকশিত হয়। কোনো প্রযুক্তি একটি মৌলিক ও দারুণ ধারণা নিয়ে শুরু করে, যা পরবর্তী আবিষ্কারে প্রকাশিত হয়। যেমন গাড়ি হচ্ছে একটি মৌলিক ধারণা ‘চাকা’র সৃষ্টি। কাগজও তেমনি সৃষ্টি হয়েছে একটি মহান প্রাথমিক আবিষ্কার থেকে। আর সেটা হলো, ভাষার লিখিত রূপ।

কাগজের মার্কিন ইতিহাসবিদ ডার্ড হান্টার মানবসভ্যতার বিকাশকে তিনটি মাইলফলকে ভাগ করেছেন— কথা বলা, অংকন ও ছাপা। তবে তিনি লিখনকে কেন বাদ দিলেন, সেটা এক রহস্য। লিখন পদ্ধতির উদ্ভব ও ছাপাখানা উদ্ভবের মাঝে হাজার বছরের দূরত্ব রয়ে গেছে। আর মানুষ তার উদ্ভবের পর থেকে এখনো বেশির ভাগ সময় কাটিয়ে দিয়েছে লিখতে-পড়তে না জেনেই। পণ্ডিতরা মনে করেন, লিখন পদ্ধতি বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সময়ে স্বাধীনভাবে আবির্ভূত হয়েছে। প্রয়োজন থেকেই দুনিয়ার বিভিন্ন স্থানে মানুষ লিখন পদ্ধতি আবিষ্কার করেছে। মেসোপটেমিয়ায় সুমেরীয়রা খ্রিস্টের জন্মের ৩ হাজার ৩০০ বছর আগে, মিসরীয়রা তিন হাজার বছর আগে, সিন্ধু সভ্যতা আড়াই হাজার বছর আগে লিখন পদ্ধতির উদ্ভব করেছিল। মেক্সিকোয় অবশ্য লেখা এল তুলনামূলকভাবে অনেক পরে, খ্রিস্টের জন্মের ৬০০ বছর আগে। অর্থাৎ বিভিন্ন এলাকার চিত্র ভিন্ন। সুমেরীয়রা লিখত কাদামাটির তৈরি ফলকে, অনেক সময় প্রস্তর খণ্ডে। মাটির ফলকগুলো পুড়িয়ে স্থায়ী করা হতো। এগুলো কয়েক হাজার বছর পরেও আমরা অটুট অবস্থায় পেয়েছি। এ কাদামাটির ফলকের স্থায়িত্ব কাগজের চেয়ে অনেক বেশি। নীল নদের তীরে জন্মাত প্যাপিরাস। এ গাছ মিসরীয়রা নানা কাজে ব্যবহার করত। তবে এ গাছ সবচেয়ে গুরুত্ব পেত লেখার উপকরণ হিসেবে। গাছের পাতায় লেখা লিখন পদ্ধতির অন্যতম পুরনো উদ্ভাবন। কাদার ফলকের চেয়ে অনেক সহজে পাতা বহনক্ষম। ভারত ও শ্রীলংকায় পাতায় লেখার রীতি আধুনিক যুগের ঠিক আগ পর্যন্তও চালু ছিল। বিভিন্ন সভ্যতায় বিভিন্ন গাছের পাতা ও ছাল ব্যবহার হতো। প্রাচীন সভ্যতায় এ রকম একটি বহুল ব্যবহূত &dquote;&dquote;গাছের বাকল হচ্ছে ট্যাপা, যা তুঁত গাছের বাকল। ট্যাপা মূলত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশগুলোর একটি উপকরণ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় খিস্টপূর্ব চার হাজার বছর আগে ট্যাপা ব্যবহারের নিদর্শন দেখা যায় আর পেরুতে খ্রিস্টপূর্ব ২১০০ বছর আগে। চীনে ট্যাপার প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। প্যাপিরাসের মতো ট্যাপাও লেখার উপকরণ হিসেবে ব্যবহারের আগে বস্ত্র ও শোয়ার বিছানা হিসেবে ব্যবহূত হয়েছে। প্যাপিরাসের মতো ট্যাপা দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। তাই ট্যাপার খুব সামান্য খণ্ডিত অংশ উদ্ধার করা গেছে। ট্যাপা এখন আফ্রিকা, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল এবং কেন্দ্রীয় ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোয় তৈরি হয়; যা ব্যবহার হয় বস্ত্র হিসেবে। প্যাপিরাস শুধু মিসরে স্থানীয় ব্যবহারে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং দুনিয়াজুড়ে মূল্যবান রফতানি পণ্য হয়ে উঠেছিল। সবচেয়ে প্রাচীন যে প্যাপিরাস পাওয়া গেছে, সেটা খ্রিস্টপূর্ব ২ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার ৭৭৫ বছর আগেকার। প্যাপিরাসটির অবস্থা এতটা ভালো ছিল যে, ইতিহাসবিদরা মনে করেন, এ প্যাপিরাসের অনেক আগে থেকেই মিসরীয়রা প্যাপিরাস তৈরি করত। অর্থাৎ খ্রিস্টের জন্মের তিন হাজার বছর আগে থেকেই মিসরে প্যাপিরাসে লেখা হতো।

খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে মিসর শাসন করতে এসেছিলেন এক ম্যাসিডোনিয়ান গ্রিক, নাম টলেমি। তিনি আলেকজান্দ্রিয়ায় ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ গ্রন্থাগারটি নির্মাণ করলেন। আলেকজান্দ্রিয়া বন্দরে ভেড়া জাহাজে তল্লাশি করা হতো। কোনো বই পেলে সেটার অনুলিপি তৈরি করে টলেমির গ্রন্থাগারে রাখা হতো। টলেমি তার গ্রন্থাগারে সব বিষয়ের বই রাখতে চাইতেন। তিন শতক পরে টলেমির প্রতিষ্ঠা করা সেই গ্রন্থাগারে সাত লাখ প্যাপিরাসের পাণ্ডুলিপি জমা হলো।

গ্রিক শহর পারগামামের শাসক ইউমেনেজও বিরাট এক গ্রন্থাগার তৈরি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু টলেমি তার গ্রন্থাগারের সমকক্ষ আরেকটি এ দুনিয়ায় দেখতে চাননি। তাই তিনি ইউমেনেজের কাছে প্যাপিরাস রফতানিতে অস্বীকৃতি জানান। ইউমেনেজ তখন বই তৈরির জন্য লেখার বিকল্প উপকরণ খুঁজতে থাকেন। পরবর্তী এক শতকে পারগামামের মানুষ লেখার জন্য প্যাপিরাসের বিকল্প তৈরি করে। এ পদ্ধতিতে তারা পশুর চামড়া ১০ দিন লবণাক্ত পানিতে চুবিয়ে রাখত, তারপর পরিষ্কার করে শুকানো হতো। এক্ষেত্রে সাধারণত অল্প বয়সী পশুদের চামড়া ব্যবহার করা হতো। ভেড়া ও হরিণ ছিল বেশি উপযুক্ত। চামড়ার মাংস ছাড়িয়ে, পাথর দিয়ে ঘষে একেবারে মসৃণ করে তোলা হতো।  যে শহরে এর উদ্ভব, সেই শহরের নামানুসারে লেখার এ নতুন উপকরণ পারগামাম নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। লাতিন ভাষায় এটা এখনো পারগামাম নামেই পরিচিত। তবে ইংরেজিতে বলা হয় পার্চমেন্ট।&dquote;&dquote;

শাং রাজত্বে (খ্রিস্টপূর্ব ১৭৬৩ থেকে ১১২৩ অব্দ) চীনা সমাজে কৃষির পত্তন হয় এবং তারা স্থায়ীভাবে আবাস গড়ে তোলে। তাদের ধর্মে লিখিত উপাদান দেখা যায়। দেবতা বা আত্মার কাছে প্রার্থনা লিখে উপস্থাপন করা হতো। এজন্য সাধারণত কচ্ছপের খোল ও হাড় ব্যবহার করা হতো। ব্রোঞ্জের ছুরি উত্তপ্ত করে তা দিয়ে হাড় বা খোলের ওপর লেখা হতো। এ রকম বহু লিখিত হাড় চীনে উদ্ধার করা হয়েছে। চীনে কাগজের ব্যবহার শুরু হয় খ্রিস্টীয় প্রথম শতকের শেষ নাগাদ। আশ্চর্যের বিষয় হলো, কাগজে লেখার সঙ্গে চীনা বর্ণমালার সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১০০ খ্রিস্টাব্দে চীনা ভাষায় বর্ণ ছিল ৯ হাজার, পঞ্চম শতকে তা হয়ে দাঁড়ায় ২০ হাজার এবং ১০ম শতকে তা হয় ৩০ হাজার। শাং রাজত্বের পর শুরু হয় ঝৌ শাসন, যা খ্রিস্টপূর্ব ২৫৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল। এ শাসনামলে লেখার জন্য হাড়, খোলসের পরিবর্তে শুরু হয় ব্রোঞ্জের পাত, সিল্ক ও বাঁশ। বাঁশের ওপর এ সময়কালে লেখা প্রচুর নিদর্শন পাওয়া গেছে। এ আমলে চীনে আমলাতন্ত্র তথা ‘কাগুজে’ কর্মকাণ্ডের ধারা টের পাওয়া যায়। বিভিন্ন চুক্তিপত্র লেখা ও সেগুলোর কপি উভয় পক্ষের কাছে রাখার প্রমাণ পাওয়া যায়। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বিভিন্ন চুক্তি ও দলিলের লিখিত রূপ সংরক্ষণের রীতি চালু হয়। ঝৌ আমলেই চীনারা তাদের জীবন ও সময়ের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয় লিপিবদ্ধ করে ফেলেছে। চীনা দর্শনের জনক বিবেচনা করা হয় মোজিকে। তিনি খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে লিখেছিলেন, ‘আমাদের জ্ঞানের উত্স হলো বাঁশ ও সিল্কের ওপর লিখিত রচনাগুলো। একই সঙ্গে আছে ধাতু, পাথরে খোদাই করে রাখা কথা।’ এ সময় বিভিন্ন রাজ্য একে অন্যের চেয়ে উন্নত হতে জ্ঞানী মানুষদের তাদের নিজ নিজ দরবারে জড়ো করার চেষ্টা করত। এক সামন্ত রাজা লু বুয়েই খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে তিন হাজার পণ্ডিতকে জড়ো করেছিলেন এবং তাদের সব জ্ঞান তিনি লিপিবদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সব লেখার পরে তা ২০ লাখ শব্দের এক গ্রন্থে পরিণত হয়। এ গ্রন্থ প্রকাশ্যে প্রদর্শন করা হতো এবং কেউ এতে কিছু যোগ করতে পারলে তাকে পুরস্কৃত করা হতো। এ আমলের ৪০ হাজার কাঠ ও বাঁশের লিখিত পাণ্ডুলিপি পাওয়া গেছে। এ সময় কয়লা থেকে কালি তৈরি করে ব্রাশ দিয়ে লেখা হতো। এক কথায় চীনা সমাজ কাগজের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে শুরু করেছিল। বাঁশের পর কাগজ তৈরির আগে লেখার জন্য আরেকটি উপাদান ব্যবহার হয়েছিল, সেটি হলো সিল্ক।&dquote;&dquote;

কাগজ ঠিক কীভাবে উদ্ভব হয়েছিল, সেটা এক রহস্য। কারণ তার পূর্ববর্তী কোনো লিখন উপকরণের বিবর্তন থেকে সৃষ্টি হয়নি। কাগজ তৈরি হয় সেলুলোজ আঁশ থেকে, যা ভেঙে পানিতে মেশানো হয়। এ পানি মেশানো সেলুলোজ একটি পাতলা ছাঁকনির মধ্য দিয়ে চালনা করা হয়, তখন পানি চলে যায় কিন্তু ছাঁকনিতে সেলুলোজ আটকে থাকে এবং এর পাতলা স্তরের নামই কাগজ। শুরুতে কাগজ আবিষ্কারকরা নিশ্চয়ই এসব জানতেন না। সেলুলোজ যেকোনো উদ্ভিদের মৌল উপাদান। কাগজ তৈরিতে তাই কাঠ, গাছের বাকল, ঘাস, কটন, সিল্ক, সামুদ্রিক আগাছা ব্যবহার করা হয়। কাগজ তৈরির এ রসায়ন আবিষ্কার করেন ফরাসি রসায়নবিদ আনসেমে পেয়েন, ১৮৩৮ খ্রিস্টাব্দে। তবে চীনারা এটা বুঝেছিল যে, ওইসব উপাদানের টুকরো থেকে কাগজ তৈরি সম্ভব। এভাবেই তারা কাগজ তৈরি করেছিল। সেলুলোজ কী, সেটা না বুঝেও তারা সেলুলোজের আঁশ পৃথক করার কৌশলটি বুঝেছিল। খেয়াল করার মতো বিষয় হচ্ছে, কাগজ তৈরির আগে লেখার যে উপকরণগুলো ব্যবহূত হতো, সেগুলোর প্রায় সবই ছিল সেলুলোজসমৃদ্ধ— কাঠ, বাঁশ, সিল্ক। অনেকে মনে করেন, সুতাকে মোটা আঁশে রূপান্তরের প্রক্রিয়া থেকেই কাগজ তৈরির ধারণা চীনাদের মাথায় এসেছিল। যেভাবেই হোক, একটা দীর্ঘ বিবর্তনের মধ্য দিয়েই কাগজ সৃষ্টি হয়েছিল।

বহু শতক ধরে চীনের শিশুরা স্কুলে শিখেছে যে, ১০৫ খ্রিস্টাব্দে হান দরবারের এক খোজা কাই লুন কাগজ আবিষ্কার করেন। চীন তাদের চারটি মহান আবিষ্কার হিসেবে যেগুলোকে স্বীকৃতি দেয় সেগুলো হচ্ছে— কাগজ, কম্পাস, বারুদ ও ছাপাখানা। তবে এর মধ্যে শুধু কাগজের ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট একজন আবিষ্কারকের নাম উল্লেখ করা হয়। হান রাজত্বের (২৫-২২০ খ্রিস্টাব্দ) দরবারি ইতিহাস হু হান শু-তে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কাই লুন ছিলেন রাজধানী লুইয়াংয়ের বাসিন্দা। তিনি হান দরবারে কাজ শুরু করেন ৭৫ খ্রিস্টাব্দে। ৮৯ খ্রিস্টাব্দে তাকে অস্ত্র ও যন্ত্রপাতি তৈরি বিভাগের প্রধান কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। হু হান শু-তে বলা হয়েছে, এর ১৫ বছর পরে ‘কাই লুন সম্রাটকে জানান যে, তিনি গাছের বাকল, শণ, ছেঁড়া কাপড় ও মাছ ধরার জাল দিয়ে কাগজ তৈরি করেছেন।’ এর পরই কাগজকে সাধারণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। আর কাই লুনকে মারকুইজ উপাধিতে সম্মানিত করা হয়, যার বিরাট আর্থিক সুবিধা ছিল। তবে তার শেষ পরিণতি ছিল ট্র্যাজিক। রাজদ্রোহের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। ১২১ খ্রিস্টাব্দে গোসল সেরে নিজের সেরা পোশাকটা পরে বিষপানে তিনি আত্মহত্যা করেন।

কাইয়ের আত্মহত্যার ৬০০ বছর পরে পাথরের তৈরি একটি মর্টার রাজকীয় জাদুঘরে স্থান করে নেয়। এ মর্টার দিয়েই কাই কাগজ তৈরির জন্য বিভিন্ন উপাদান পিষতেন। তার সম্মানে মন্দির নির্মাণ করা হয়। কাগজের দোকান, এমনকি মানুষের ঘরে দেবতাদের পাশে তার ছবি স্থান পেত। তারপর আধুনিক যুগে এসে হঠাৎ একদিন যেন কাই লুনের সব গৌরব ধূলিসাৎ হলো। বিশ শতকে এসে প্রত্নতত্ত্ববিদরা কিছু কাগজ খুঁজে পেলেন, যেগুলো তৈরি হয়েছিল ১০৫ খ্রিস্টাব্দের আগে। এসব কাগজ মূলত পাওয়া গেল মধ্য এশিয়ার মরুভূমিতে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, চীনের আদ্র অঞ্চলে হয়তো আরো পুরনো কাগজ পাওয়া যেতে পারে। তবে সেগুলো হয়তো আবহাওয়ার কারণে টিকে থাকেনি। তাহলে এখন প্রশ্ন ওঠে, কাই লুন যদি কাগজ আবিষ্কার না-ই করে থাকেন, তাহলে তাকে এত সম্মানিত আসনে কেন বসানো হলো? এর জবাব হচ্ছে, তিনি হয়তো আগে তৈরি কাগজকে আরো নিখুঁত করেছিলেন এবং এটাকে বাণিজ্যিক উৎপাদনে নিয়ে গিয়েছিলেন। আবার অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, কাই লুন সম্ভবত প্রথম মানুষ, যিনি বুঝেছিলেন কাগজকে লেখার কাজে ব্যবহার করা যাবে। কাগজ হয়তো শুরুতে শুধু ওষুধের মোড়ক হিসেবে ব্যবহার হতো। তবে এ রকম কিছু প্যাকেটের কাগজে লেখা পাওয়া গেছে। তাহলে কি কাইয়ের কাগজ মানে উন্নত ছিল, কম খরচে তৈরি করা যেত? কাই লুনের পুরো গল্প তাই রহস্যেই আবৃত হয়ে রইল।&dquote;&dquote;

কাগজ আবিষ্কারের মূল পর্ব শেষ হতেই সেটাকে আরো পাতলা ও টেকসই করার কাজ শুরু হয়ে গিয়েছিল। হান আমলে চীনে লেখার উপকরণের চাহিদা বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছিল। চীনা দর্শন, সাহিত্য চর্চায় জাগরণ সৃষ্টি হয়, যা কাগজ উৎপাদনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। এ সময় বইয়ের দোকান, প্রচুর ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার তৈরি হয়। খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকে কাগজ দ্রুত বদলে যেতে থাকে— কাগজ আরো পাতলা, শক্ত, সহজলভ্য ও সস্তা হয়ে ওঠে। তৃতীয় শতকে এসে কাগজের আকার নির্দিষ্ট করা গেল, কালি কম শোষণের ব্যবস্থা নেয়া হলো। কাগজ আরো শক্ত হলো। পরবর্তী সময়ে কাগজ উৎপাদনের প্রযুক্তি আরো উন্নত হতে থাকল। কাগজের টুকরা জোড়া দিয়ে কাঠের রোলারে যুক্ত করে তৈরি পাণ্ডুলিপি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ষষ্ঠ শতকে। সরকারি নথির জন্য ব্যবহার করা হতো বেত থেকে তৈরি কাগজ। শিল্পীরা পছন্দ করতেন মালবেরির বাকল বা বাঁশ থেকে তৈরি কাগজ। কারণ এ কাগজের শোষণক্ষমতা বেশি, তাই রঙ ব্যবহারে সুবিধা হতো। ৬৭৪ খ্রিস্টাব্দে চীন সরকার সরকারি কাজের জন্য কাগজ তৈরিতে এক বিশেষ নির্দেশনা জারি করে— এ কাগজ তৈরির জন্য একটি গাছের বিষ ব্যবহার করতে হবে যেন পোকা সেই কাগজকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে।

আবিষ্কারের পর পরই চীন থেকে কাগজ ধীরে ধীরে পূর্ব এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। ১৮৬ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ ভিয়েতনামে চীনা ভাষা পৌঁছে যায়। চীনা ভাষায় লেখালেখির জন্য ভিয়েতনামে কাগজ উৎপাদন শুরু হয়। নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে চীনের ক্রমবর্ধমান চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ভিয়েতনাম থেকে কাগজ চীনেও রফতানি হতো। ২৮৪ খ্রিস্টাব্দে মধুর ঘ্রাণযুক্ত কাগজ মি সিয়াং ঝি’র ৩০  হাজার রোল ভিয়েতনাম থেকে চীনে রফতানি হয়। এ সময় ভিয়েতনামে সামুদ্রিক উদ্ভিদ দিয়েও কাগজ তৈরি শুরু হয়। ভিয়েতনামের লোকেরা কাগজ তৈরিতে বেশ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিল। তাই সেখানে চীনা শাসনের অবসান হলেও ১০ম শতকের পরেও চীন ভিয়েতনাম থেকে কাগজ আমদানি করত।&dquote;&dquote;

সপ্তম শতকে তিব্বত হয়ে চীনের কাগজ ভারতে এসে যায়। ভারতীয়রা তখন পাট, পুরনো পাতার কাগজ, ব্যাগ ইত্যাদি ব্যবহার করে কাগজ তৈরি শুরু করে। তবে দ্বাদশ শতকের আগে ভারতে কাগজের ব্যাপক ব্যবহার দেখা যায়নি। এখানে একটা অদ্ভুত বিষয় দেখা যায়— বৌদ্ধ ধর্মের উদ্ভব ভারতে, আর এ ধর্ম এশিয়ায় কাগজের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল কিন্তু খোদ ভারতে সেভাবে কাগজের ব্যবহার বিকশিত হয়নি। এশিয়ার অন্য সব ধর্মের চেয়ে বৌদ্ধদের লিখিত ধর্মীয় চর্চা বেশি ছিল। কারণ তাদের বিশ্বাস ছিল— বুদ্ধের ছবি এঁকে তার বাণী ও বৌদ্ধ সূত্র লিখলে বুদ্ধের আশীর্বাদ পাওয়া যায়। খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতকে চীনের বই কোরীয় উপকূলে পৌঁছে যায়। চীনের বৌদ্ধ শ্রমণদের হাত ধরে কাগজ কোরিয়ায় পৌঁছে যায়। বাংলা, বিহার ও আসামের দ্বাদশ শতকের কাগজের পাণ্ডুলিপি পাওয়া গেছে।

কাগজের আবিষ্কারের পাশাপাশি এর ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়েও জড়িয়ে আছে চীনের নাম। আরো স্পষ্ট করে বললে, একজন চীনা বন্দির নাম। এ ইতিহাস আমরা পাই ১০ম শতকে এক আরব ঐতিহাসিক আল-থালিবির লেখায়। তিনি সে সময় এক অদ্ভুত শিরোনামে বই লিখেছিলেন। বইয়ের নাম ছিল ‘কৌতূহলোদ্দীপক ও আমুদে তথ্যের গ্রন্থ’। এ গ্রন্থে তিনি জানিয়েছেন, ৭৫১ খ্রিস্টাব্দে তালাসের যুদ্ধে আরব সেনানায়ক জায়াদ ইবন সালিহ চীনের একটি বাহিনীকে পরাজিত করেন। বন্দি চীনা সেনারা তাদের কাছে কাগজ তৈরির পদ্ধতি উন্মোচন করেন। এসব ঘটেছিল সমরখন্দে। আল-থালিবি জানাচ্ছেন, ‘কাগজের গুরুত্ব বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত এবং সবখানের মানুষ কাগজ ব্যবহার শুরু করে।’ কিন্তু এ ইতিহাসে কিছু গলদ আছে। কারণ মধ্য এশিয়ায় কাগজের ব্যবহার শুরু হয়েছিল চতুর্থ শতকে এবং ১৯০৭ সালে হাঙ্গেরীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ মার্ক অরেল স্টেইন সেটা প্রমাণ করে দিয়েছেন। স্টেইন মধ্য এশিয়ায় কাগজে লেখা কিছু চিঠি খুঁজে পান, যেগুলো ৩১৩-১৪ খ্রিস্টাব্দে লেখা হয়েছিল। এক ক্রুদ্ধ স্ত্রী সেই চিঠিগুলো লিখেছিলেন, যার স্বামী কোনো টাকা-পয়সা না রেখেই তাকে ছেড়ে গিয়েছিলেন। চিঠিতে সেই স্ত্রী লিখেছিলেন, ‘আমি বরং কোনো কুকুর বা শূকরের স্ত্রী হব কিন্তু তোমার নয়।’ বিখ্যাত চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং জানিয়েছেন, মধ্য এশিয়ায় কাগজের ব্যবহার শুরু হয়েছে পঞ্চম শতকের শুরুর দিকে। আল-থালিবির বিবরণ এখানেও মিলছে না।

সমরখন্দের অবস্থান সিল্ক রোডের পশ্চিম প্রান্তে। ৩২৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এ অঞ্চল আলেকজান্ডার দখল করে নিয়েছিলেন। বহুকাল ধরেই এ স্থান বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। অষ্টম শতক নাগাদ সমরখন্দের কাগজ মুসলিম দুনিয়ায় জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পূর্ব এশিয়ার বাইরে এ সমরখন্দই হয়ে উঠেছিল প্রথম কাগজ উৎপাদনের কেন্দ্র।

আব্বাসীয় আমলে মুসলিম দুনিয়ায় জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চার জোয়ার এসেছিল। ইসলামী দুনিয়ার ভৌগোলিক বিস্তৃতির সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন অঞ্চলের ধ্যান-ধারণা, জ্ঞান, প্রযুক্তি তার সাম্রাজ্যে যুক্ত হতে থাকে। একই সঙ্গে নতুন নতুন এলাকায় নিজেদের ধর্ম ও জ্ঞানকে ছড়িয়ে দিতে মুসলিম দুনিয়ায় কাগজের ব্যবহার বৃদ্ধি পায়। মার্ক কারলানস্কি মনে করেন, ইসলামী দুনিয়া তার প্রাথমিক বিস্তারের কালে চীন থেকে কাগজ তৈরি ও রসায়নবিদ্যা লাভ করেছিল। আর ইসলাম যখন আরবের সীমানায় সীমাবদ্ধ ছিল তখন যদি তারা কাগজ তৈরি শিখেও থাকে, তাহলেও তার ব্যবহার খুব একটা ছিল না। কিন্তু ভৌগোলিক সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে নিজের ধর্মীয় গ্রন্থ ও বার্তা নতুন মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে কাগজের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক কাজ ও নতুন নতুন বিদ্যাচর্চার জন্য কাগজ ছিল অপরিহার্য। বোস্টন কলেজের ইসলামী ও এশীয় শিল্পের অধ্যাপক জোনাথন ব্লুম মনে করেন, ইসলামী সাম্রাজ্যই দুনিয়ার প্রথম সাক্ষর সমাজ। কারণ মুসলিমরা শিক্ষাকে কেবল সমাজের অভিজাতদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি, তারা সমাজের সর্বস্তরেই শিক্ষাকে ছড়িয়ে দিয়েছিল।

আব্বাসীয় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরেও মুসলিম দুনিয়ায় লেখার জন্য প্যাপিরাসের বিপুল ব্যবহার দেখা যায়। ৬৪১ খ্রিস্টাব্দে আরবরা মিসর জয় করার ফলে প্যাপিরাসের প্রাপ্তি সহজলভ্য হয়েছিল।

সাম্রাজ্য প্রসারের ফলে মুসলিম দুনিয়ায় কাগজের ব্যবহার বৃদ্ধি ও নতুন নতুন ধরনের কাগজ তৈরির প্রয়োজনের পরিপ্রেক্ষিতে ৭৯৪ খ্রিস্টাব্দে মুসলিম সাম্রাজ্যের খলিফা বাগদাদে কাগজ তৈরির কারখানা স্থাপনের জন্য চীনা কর্মী ভাড়া করেন। বাগদাদ ছিল কাগজের কারখানার জন্য উপযুক্ত জায়গা, পাশেই নদী, যথেষ্ট জনসংখ্যা; যাদের কাছ থেকে প্রচুর ছেঁড়া কাপড়ের টুকরো জোগাড় করা যায়। এ কারখানা জলশক্তিতে চলত।

চীন থেকে আরব। এবার যাওয়া যাক ইউরোপের দিকে। একাদশ, দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতকের সৃষ্টিশীল চর্চা ইউরোপকে বদলে দিয়েছিল। বিষয়টি এমন নয় যে, এ সময়ের আগে ইউরোপে চিন্তাবিদ, শিল্পীরা ছিলেন না। কিন্তু সবকিছুই সীমাবদ্ধ ছিল গির্জা আর অভিজাতদের গৃহে। চামড়ার ওপর হাতে লেখা ও আঁকা বইগুলো এতই সুন্দর ছিল যে, অভিজাতরা সেগুলো পড়ার চেয়ে শিল্পকর্ম হিসেবে ঘরে সাজিয়ে রাখতে বেশি পছন্দ করতেন। অনেক রাজা ও যুবরাজও শিক্ষিত ছিলেন না। চার্লস দ্য গ্রেট বা প্রথম চার্লস বই ও শিক্ষার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন, এমনকি তিনিও পড়তে শিখেছিলেন পরিণত বয়সে। অনেক ইতিহাসবিদ এটাও মনে করেন যে, তিনি কখনই খুব ভালোভাবে পড়তে পারতেন না। ইউরোপে ঠিক কখন প্রথম কাগজ ব্যবহার হয়েছিল, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। সিসিলির প্রথম রজারের তৃতীয় স্ত্রী কাউন্টেস অ্যাডেলেইডের একটি চিঠি পাওয়া যায়, যা কাগজে লিখিত এবং সময়কাল ১১০৯ খ্রিস্টাব্দ। স্পেনের বাইরে এটাকেই ইউরোপে ব্যবহূত কাগজের সবচেয়ে পুরনো নিদর্শন বলে গণ্য করা হয়। তবে এ কাগজ সিসিলিতে তৈরি হয়েছিল কিনা, তা নিশ্চিত নয়। কারণ তখন স্পেনের আল-আন্দালুস থেকে কাগজ ইতালিতে রফতানি হতো। তখন স্পেন ইউরোপের অংশ বলে বিবেচিত হতো না। ইহুদি ও মুসলমাদের কোনো অবস্থাতেই ইউরোপীয় বলে গণ্য করা হতো না। আল-আন্দালুসের বাইরে ইউরোপে প্রথম কাগজ তৈরি হয়েছিল ইতালিতে। তবে ততদিনে আল-আন্দালুসের খ্রিস্টানরাও কাগজ উৎপাদন শুরু করেছিল। ইতালিতে কাগজ উৎপাদন শুরু হয়েছিল ত্রয়োদশ শতকে। এর এক শতাব্দী আগেই কাতালোনিয়ায় খ্রিস্টানদের কাগজ কারখানা স্থাপিত হয়েছিল। ইতালিতে কাগজ তৈরির প্রথম কেন্দ্রটি ছিল ফ্যাব্রিয়ানোয়। অনেক ইতিহাসবিদের ধারণা, ফ্যাব্রিয়ানোতে কাগজ তৈরি শুরু হয়েছিল একাদশ শতকেই, যখন আরবরা নিকটস্থ আনকোনা শহরে আক্রমণ করে। সেখানে আরবরা কাগজ তৈরি করত এবং সেখান থেকেই তা ফ্যাব্রিয়ানোতে পৌঁছে যায়। চতুর্দশ শতকের শেষ নাগাদ স্পেন, ইতালি, জার্মানি ও ফ্রান্সে অসংখ্য কাগজের কারখানা গড়ে ওঠে। ১৪১১ খ্রিস্টাব্দে সুইজারল্যান্ডে কাগজের কারখানা স্থাপিত হয়। কিন্তু ততদিন আরবের চিত্রটা পাল্টে গেছে। আরবে তখন কাগজ উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে। উল্টো ইউরোপের কাগজ আরবে রফতানি শুরু হয়েছে। তবে কাগজ ব্যবহারের পাশাপাশি তখনো ইউরোপের অভিজাতরা লেখার ক্ষেত্রে চামড়া বা পার্চমেন্ট ব্যবহার করতেন। ইউরোপের বিখ্যাত লাইব্রেরিগুলোয় এমন অগণিত পার্চমেন্টে লেখা বইয়ের সন্ধান মিলবে। ইউরোপে এখনো অনেকে মনে করেন, মূল্যবান বিষয় বেশি দিন স্থায়ী করে রাখতে পার্চমেন্টে লেখা উচিত। চীনের তিন মহান আবিষ্কার— কাগজ, বারুদ ও কম্পাস ইউরোপ গ্রহণ করেছিল ত্রয়োদশ শতকে। এরপর বইয়ের চাহিদা ইউরোপে এত বেড়ে যায় যে, চীনাদের চতুর্থ মহান আবিষ্কার ছাপাখানাকে গ্রহণের সময় হয়ে যায়।

 

মার্কিন সাংবাদিক ও ননফিকশন লেখক মার্ক কারলানস্কির পেপার: পেজিং থ্রু হিস্টরি গ্রন্থ অবলম্বনে