১৬ নভেম্বর ১৯৩২ সাল, ফরাসি লেখক পল ভ্যালেরি ‘লা পুলিটিক দ্যু লিসপ্রি’ শিরোনামে প্যারিসের ইউনিবার্সিতে দেস অ্যানালে এক বক্তৃতা দেন। এ বক্তৃতায় বর্তমান সময়কে তিনি উল্লেখ করেন বিশৃঙ্খল এক অবস্থা হিসেবে, যার কারণে তিনি মনে করেন ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, আমরা বেঁচে আছি এমন এক সভ্যতার মধ্যে, যার ভিত্তি গড়ে উঠেছে এক ধরনের ট্রাস্টিশিপের ওপর। ব্যাংক কেবল ততক্ষণই টিকে থাকবে, যতক্ষণ না তার সব গ্রাহক একযোগে সব টাকা তুলে নিচ্ছেন। সভ্যতা টিকে থাকবে ততক্ষণই, যতক্ষণ না এর কল্পিত পুঁজির স্বীকারোক্তি আচমকা উল্টে যাচ্ছে; সভ্যতাকে ভালোভাবে বোঝা যায় এর বিশ্বাস ও সুনামের ওপর নির্ভরতা দিয়ে। এরপর ভ্যালেরি তার বক্তব্যকে বোঝার জন্য একটা পরীক্ষার প্রস্তাব করেছেন। এ পরীক্ষার ধারণাটি তার নয়, তিনি স্বীকার করেছেন, ধারণাটি তিনি ধার নিয়েছেন এক পুস্তক সমালোচনা থেকে। বইটি ছিল সম্ভবত ইংলিশ কিংবা মার্কিন লেখকের। অনেক আগে সেটা পড়েছিলেন তিনি; লেখক ও বইয়ের নাম দুটোই ভুলে গেছেন। এখন কল্পনা করুন, বলছেন ভ্যালেরি, রহস্যময় এক অনুজীবের আক্রমণে দুনিয়ার সব কাগজ দ্রুত নিঃশেষ হয়ে গেল। ‘প্রতিরক্ষা বা প্রতিরোধ’ কোনো কিছুই করা সম্ভব হলো না। কাগজের সব কোষপুঞ্জ গোগ্রাসে গিলে নিল ওই রহস্যময় অনুজীব। অর্থাৎ অজানা ধ্বংসকারী সব শেষ করে দিল আমাদের। দেরাজ, আলমারিতে সংরক্ষিত চেক বইয়ের সব পাতা, আর সব পাঠাগার, মুদ্রিত-লিখিত সব কাগজ রাতারাতি নাই হয়ে গেল। পল ভ্যালেরি যখন এ বক্তৃতা দিচ্ছেন, তার জানা ছিল না যে কাগজ তৈরিতে ব্যবহূত গাছের মণ্ডের আকাল আসলে তখনই শুরু হয়ে গেছে। তাই ভ্যালেরির অনুজীবের পরীক্ষার প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য কাগজ-মণ্ডের দ্রুততর অপ্রতুলতার বিষয় নয়, তার লক্ষ্য ছিল বরং আধুনিক সভ্যতায় সর্বব্যাপী ও অপরিহার্য হয়ে ওঠা কাগজের শক্তি। যে কারণে তিনি এক নিঃশ্বাসে দেরাজে রক্ষিত চেকবুক আর পাঠাগারের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। তিনি তার চারদিকে কাগজের সর্বব্যাপী আগ্রাসনকে প্রত্যক্ষ করেছেন, তা সামাজিক প্রতিষ্ঠানের চেহারায় কি প্রাত্যহিক কর্মকাণ্ডে।&dquote;&dquote;

চিন্তা করুন কাগজের কোনো অস্তিত্ব নেই, কোনো চেকবই-ব্যাংকনোট নেই, বন্ড, ফাইল, আইন, কবিতা কিংবা সংবাদপত্রের আর কোনো অস্তিত্ব নেই।

ভ্যালেরি যখন এ বক্তৃতা দিচ্ছেন, তখন রেডিও আর গ্রামোফোন প্রযুক্তি সবেমাত্র এসেছে। শিশু অবস্থায় টেলিভিশন পরীক্ষামূলক অনুষ্ঠান প্রচার শুরু করেছে মাত্র। অন্যদিকে ছবি, সংখ্যা ধারণ-সংরক্ষণ, বার্তা প্রচার ও সংরক্ষণের মূল মাধ্যম হিসেবে ততদিনে সিনেমা, টেলিগ্রাফ আর টেলিফোন চরমভাবে ব্যর্থ হয়ে গেছে।

ভ্যালেরি ভয়ঙ্কর ধ্বংসাত্মক কল্পিত ওই অনুজীব হাজির করে আসলে নজরে আনতে চেয়েছেন আধুনিক সভ্যতায় কাগজের শক্তি, এর সর্বব্যাপকতা আর বিশ্বজনীনতাকে।

ফরাসি দার্শনিক জাঁক দেরিদাও কোনোভাবে পল ভ্যালেরির এ বক্তৃতা শুনে থাকবেন। গত শতকের একেবারে শেষভাগে, ১৯৯৭ সালে কায়্যে দে মিজ্জোরিজিতে প্রকাশিত তার এক দীর্ঘ ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় ভ্যালেরির অনুজীবের মাধ্যমে প্রকাশ করা দর্শনকেই একটু যেন পরিবর্তিত আকারে হাজির করেন। তিনি বলেন, কাগজ ধীরে ধীরে ব্যাপকতা হারাবে, কারণ আমরা এখন এমন এক সময়ে বসবাস করছি, যা এক ধরনের সংকোচন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যে রকম বালজাক তার উপন্যাস লাপু দ্যু সায়ঘাতে দেখিয়েছেন, জাদুকরী পার্চমেন্ট কাগজ তার আরবি বর্ণমালা ফিরিয়ে নিচ্ছে, কাগজ সংকুচিত হয়ে আসছে, সঙ্গে সংকুচিত হয়ে আসছে আমাদের জগৎও।

দেরিদা চতুর। তিনি কাগজের চূড়ান্ত বিনাশ বা বিলুপ্তির কথা বলেননি, বরং কাগজের কিঞ্চিৎ মৃত্যু দেখেছেন কেবল। তিনি ডিজিটাল মিডিয়ার বিস্ফোরক উত্থানের মধ্যেও কাগজের প্রভূত উপস্থিতি প্রত্যক্ষ করেছেন। তিনি স্বীকার করছেন কাগজের কাঠামোগত কর্তৃত্বের দিন অর্থাৎ কাগজের সচিত্রিত সর্বত্র উপস্থিতির দিন ফুরিয়ে এসেছে এবং তিনি একে বলছেন কাগজের পশ্চাৎপসারণ। তিনি মঞ্চ থেকে কাগজের চূড়ান্ত পশ্চাৎপসারণ ঘটার কথা কিন্তু বলছেন না; কাগজের এ পিছিয়ে আসা, তার মতে, শুধু গুরুত্বপূর্ণ কিছু স্থান থেকে পিছু হঠা।

দেরিদা সারা জীবন কাটিয়েছেন লিখিত শব্দের কারবার করে। সাক্ষাত্কারে তিনি বর্ণনা করেছেন কীভাবে তার হাত এক খণ্ড সাদা কাগজের ওপর অনায়াসে লিখে গেছে একটা দীর্ঘ সময়। স্মৃতিচারণ করেছেন ম্যানুয়াল টাইপরাইটারে লেখার অভিজ্ঞতার কথা। কীভাবে ম্যানুয়াল টাইপরাইটারের জায়গা একদিন দখল করে নিল বৈদ্যুতিক টাইপরাইটার, তারপর সর্বশেষ তিনি লেখা শুরু করলেন কম্পিউটারে। দেরিদা বলছেন, এই লিখিত অভ্যাসে একের পর এক অধিক্রমণের ঘটনা আসলে লাফ দিয়ে দিয়ে স্থান বদলের মতো এবং এ অভিজ্ঞতা দিয়েই তার প্রজন্মকে ব্যাখ্যা করা যায়।&dquote;&dquote;

দেরিদা ও ভ্যালেরি— দুজনের কাছেই কাগজ শুধু লেখালেখির উপরিতল নয়, এর চেয়েও বেশি কিছু। দেরিদাও কাগজ ও কাগজের টাকা হয়ে ওঠা এবং ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে এর যুক্ত হওয়ার কথা বলেছেন। কাগুজে টাকার আবার অবস্থান হারানো এবং তার জায়গায় ক্রেডিট কার্ড বা প্লাস্টিকের আবির্ভাবের কথাও তিনি উল্লেখ করছেন।

পল ভ্যালেরির পরীক্ষণ প্রস্তাবনার গুহ্য অর্থ যেমন কাগজের সর্বব্যাপকতার সমার্থক, তেমনি দেরিদার কাগজের পশ্চাৎপসারণ মানে কাগজের চূড়ান্ত বিলুপ্তি— তা কিছুতেই নয়। কাগজের শক্তি পুরোপুরি খর্ব করা বুঝি কোনোদিনই সম্ভব হবে না।

আমরা যখন বই, চিঠিপত্র আর সংবাদপত্র নিয়ে কথা বলি, আমরা মনে করি আমরা আমাদের জগত্টাকে বেশ চিনি। আমরা জানি কাগজের প্রাচীনতা ছাপাখানার চেয়েও অনেক প্রাচীন। পল ভ্যালেরি তার বক্তব্যের এক জায়গায় বলছিলেন, ‘কাগজ একই সঙ্গে বিশাল এক সংরক্ষক আবার এক বিরাট পথপ্রদর্শকও। এটা শুধু এক মানুষ থেকে আরেক মানুষকেই পথনির্দেশনা দেয় না, এক সময় থেকে আরেক সময়েরও নির্দেশক, কাগজ একই সঙ্গে বহন করে অতি চঞ্চল মাত্রার প্রামাণিকতা কিংবা বিশ্বাসযোগ্যতাও।

২.&dquote;&dquote;

লিখিত অক্ষর এবং সংখ্যা কখনই এককভাবে শুধু একটি কোনো সভ্যতার নিজস্ব সম্পত্তি ছিল না। কাগজের আবির্ভাবের কারণে প্যাপিরাসের দ্রুত মৃত্যু ঘটে গেল ঠিক, বিশেষ করে আরব দুনিয়ায়, কিন্তু তাতে আরবের অতি উঁচু মানের ক্যালিগ্রাফি শিল্পের কোনো ক্ষতি-বৃদ্ধি ঘটেনি। কারণ ক্যালিগ্রাফি শুধু যে পার্চমেন্টের মধ্যেই অস্তিত্বমান হয়ে ছিল তা নয়। ক্যালিগ্রাফি উত্কীর্ণ হতো মসৃণ পাথর, কাঠ, গাছের বাকল, তালপাতা, সিল্ক কাপড়, পিতল এবং সোনার পাতে। এছাড়া আরো বেশকিছু উপাদান যেমন উটের চামড়া ও হাড়ে ক্যালিগ্রাফি উত্কীর্ণ হয়েছে। তবে কাগজের আবিষ্কার ক্যালিগ্রাফির উন্নয়নের নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করে। প্রাথমিকভাবে অর্থাৎ প্রথম দিকে কাগজের ব্যবহার ছিল শুধু কোনো কিছুর ছবি নকল করায়, নয়তো কোনো কিছুর খসড়া নকশা নকল করায়। পরে যা স্থানান্তরিত হতো কোনো ধাতুগাত্রে কিংবা অন্য কোনো উপাদানে। কিন্তু ইসলামী দুনিয়ায় কাগজ প্রথম বড় রকমের পরিবর্তনের সূচনা করল কোরআন শরিফ নকল কাজের মধ্যে অর্থাৎ কাগজে তুলে নিয়ে কোরআনের বাণী মকশো করার কাজে, কাগজ দ্রুতই অতি উপযোগী এক মাধ্যম হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে গেল। ফলে প্যাপিরাস আর পার্চমেন্ট থেকে কোরআনের বাণী দ্রুত স্থানান্তর হতে শুরু করল কাগজে। ফলে দশম শতকে ইসলামী দুনিয়ায় আরবি ক্যালিগ্রাফি শিল্পেও বিরাট উৎকর্ষের ঘটনা ঘটে গেল। এ শতকের শুরুর দিকেই আবির্ভাব ঘটল পরে প্রায় কিংবদন্তিতে পরিণত হওয়া ক্যালিগ্রাফার ইবনে মুকলার। তিনি কাগজের বিস্তৃত পরিসর ও লেখার সহজ-স্বচ্ছন্দতাকে পুরোদস্তুর কাজে লাগালেন। তার গোটা গোটা অক্ষর-লিপির নানা রকম আকার-আকৃতির ক্যালিগ্রাফির পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানোর জন্য কাগজই হয়ে উঠল আদর্শ মাধ্যম। তিনি নিরন্তর অক্ষর মকশো করার মধ্য দিয়েই আরবি হরফের নানা আকার-আকৃতি ও লিখন পদ্ধতির জ্যামিতিক কৌশল আবিষ্কার করলেন ওই সময়েই। আর তখন কোরআন নকল করার কাজটিও স্বীকৃত ছিল অতি উচ্চ মর্যাদাপূর্ণ ও পবিত্র কাজ হিসেবে। প্রতিটি শিল্পিত অক্ষর, একটির সঙ্গে অন্যটির সামঞ্জস্য ও সৌকর্য গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়েই ক্যালিগ্রাফি লিখিত হতো। গভীর অভিনিবেশে রচিত এই লিখনশৈলীতে তাড়াহুড়ো ও অসতর্কতার কোনো স্থান ছিল না। পার্চমেন্টের মতো কাগজে উত্কীর্ণ কোরআনের বিশেষ ও মূল্যবান সংস্করণগুলোও হতো রঙিন আর সোনার অলঙ্করণ সজ্জিত। কারণ অলঙ্কৃত কাগজ কোরআনের শক্তিমত্তার কথাই ঘোষণা করে, এ বিশ্বাসের প্রচল ছিল ক্যালিগ্রাফারদের মধ্যে। তবে ক্যালিগ্রাফির পরিচয় লিখিত আকারকে ঘিরে বিস্তৃতি ঘটে হযরত মুহাম্মদ (স.) অর্থাৎ নবীর মৃত্যুর বেশ পরে। তার আগে কোরআনের তেলওয়াত শিল্প ছিল ক্যালিগ্রাফিরই সহোদরা এবং বহুল চর্চিত। তখন কণ্ঠমাধুর্য দিয়ে শিল্পিতভাবে কোরআনের উৎকর্ষময় বর্ণনাই ছিল মূলত শ্রবণজাত ক্যালিগ্রাফি। পরে কোরআন পার্চমেন্ট, প্যাপিরাসে লিপিবদ্ধকরণের কাজ শুরু হলে লিখিত ক্যালিগ্রাফির দ্রুত প্রসার লাভ করতে শুরু করে। এরপর কাগজ এসে ক্যালিগ্রাফির লিখিত ফর্মই মূলে পরিণত করে।

পৃথিবীর বিভিন্ন জাদুঘরে মধ্যযুগের ইসলামিক শিল্প হিসেবে যেসব শিল্পকর্ম সংরক্ষিত আছে, তার বেশির ভাগ নিদর্শনই আসলে ক্যালিগ্রাফির অপূর্ব কারুকার্যময় পাণ্ডুলিপি। এগুলোর বেশির ভাগই প্রকৃতপক্ষে প্রাচীন আরবের অতি মূল্যবান কাগজে অঙ্কিত কোরআন শরিফ।&dquote;&dquote;

আরবের শিল্পকলা বুঝতে কাগজের এ আলঙ্কারিক সৌকর্যপূর্ণ ব্যবহার বরাবর আকর্ষণের কেন্দ্রে থাকায় ইসলামের অন্য অনেক ইতিহাসই বহুদিন পর্যন্ত বাইরের দুনিয়ার মনোযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন থেকেছে, যেমন বহুদিন পর্যন্ত সেই সময়ের আরব দুনিয়ার শাসন ব্যবস্থা, আইন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও নৈমিত্তিক জীবনের বর্ণনা এক রকম প্রায় উপেক্ষিতই ছিল। গবেষকরা ক্যালিগ্রাফির সুষমা থেকে অন্যত্র চোখ ফেরানোর প্রয়োজনই মনে করেননি। ফলে উনিশ শতকের আগে ওদিকে কারোর মনোযোগ দেয়ার পূর্ণ ফুরসত হয়নি। তাই প্রায় ছায়াচ্ছন্ন বা চাপা পড়া ইসলামী দুনিয়ার দৈনন্দিন জীবন ইতিহাসের ব্যাপকভিত্তিক আবিষ্কারের ঘটনাটি ঘটে মাত্র উনিশ শতকের শেষভাগে এসে এবং এর উল্লেখযোগ্য একটি অংশ আসে কায়রোর পরিত্যক্ত এবং অচেনা এক কাগজের ভাগাড় থেকে।

কায়রোর প্রাচীন ফুসতাতে বেন এজরা সিনাগগের ধ্বংসস্তূপ থেকে ১৯৬০ সালের দিকে ইহুদি আরব বিশেষজ্ঞ ও ইতিহাসবিদ শেলোমো ডভ গোয়েটিন অত্যন্ত নিয়মতান্ত্রিকভাবে আরবদের দৈনন্দিন ইতিহাসের এক বিশাল ভাণ্ডার, ব্যাপকভিত্তিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ইংরেজিভাষী পাঠকের সামনে পর্বততুল্য ‘গেনিজা ডকুমেন্টস’ নাম দিয়ে হাজির করেন পাঁচ খণ্ডের সুবিশাল এক গ্রন্থ, যাতে সন্নিবেশিত হয়েছে ১০ হাজারের মতো নথির পাতা, টুকরো অংশ, যার বেশির ভাগই এসেছে দশম শতক থেকে শুরু করে ১৩ শতকের দ্বিতীয় ভাগ থেকে। অধিকাংশ নথিপত্রই আরবি ভাষায়, কিন্তু হিব্রু বর্ণমালায় হাতে লেখা কাগজ।

মধ্যযুগের কায়রোয় ইহুদিরা নির্দিষ্ট কোনো পাড়ায় বাস করত না, ফলে দৈনন্দিন জীবনে প্রতিনিয়তই মুসলমানদের সঙ্গে তাদের ওঠাবসা ছিল এবং পরস্পরের মধ্যে যোগাযোগের ভাষাও গড়ে উঠেছিল, যা ছিল আরবি। কিন্তু ইহুদিরা তখনো লেখার কাজ করেন পবিত্র হিব্রু বর্ণমালা ব্যবহার করে। ফলে পবিত্র বর্ণে লেখা আরবি বয়ানে গেনিজা নথিপত্রে ঐশ্বরিক বিষয়াদির উপস্থিতি ছিল খুব সামান্যই, কিন্তু ইহুদিরা সে সময়ে প্রায় আবর্জনায় পরিণত হওয়া কাগজপত্রও সংগ্রহ করেছেন প্রধানত পবিত্রতা জ্ঞানে। তারা বিশ্বাস করতেন হিব্রু ঈশ্বরের নিজের ভাষা, তাই এ ভাষার প্রতিটি অক্ষরে ছড়িয়ে থাকে ঈশ্বরের পবিত্রতা।

তাই বিষয়বস্তু নয় শুধু হিব্রু অক্ষরমালার পবিত্রতাজ্ঞানে সংরক্ষিত হয়েছে ‘গেনিজা’র সব নথিপত্র। পবিত্র হরফ কারো হাতে তুলে দেয়া যায় না, স্রেফ এ সংকোচ থেকেই পরিত্যক্ত হওয়া সত্ত্বেও ধ্বংস না করে সেগুলো সংরক্ষণ করা হয়েছে গেনিজা সিলমোহর দিয়ে। আর গেনিজা— এ হিব্রু শব্দের মানে হলো ‘গুপ্ত’, যা ইঙ্গিত করে সিনাগগের জানালাহীন এক প্রকোষ্ঠকে, যেখানে জমা করে রাখা হতো প্রতিদিনের ব্যবহূত কাগজপত্র, তবে সেটি কোনো মহাফেজখানাও নয়। কারণ মহাফেজখানার সঙ্গে যুক্ত থাকে নিবন্ধভুক্তির ব্যাপার আর গ্রহণ-বর্জনের বিষয়ও। তবে এ সংগ্রহে যদিও নথিভুক্ত হয়েছে অনেক পুস্তকের অংশবিশেষ, বইয়ের তালিকা— মূল্যসহ ও মূল্যবিহীন, আর কর্জ নেয়ার রশিদ, কাজেই গেনিজা যতটা না ছিল মহাফেজখানা, তার চেয়ে বেশি ছিল বইয়ের ভাগাড় কিংবা অপ্রয়োজনীয় কাগজপত্রের গ্রন্থাগার। আর তা নয়তো এটা ছিল স্রেফ ফেলনা কাগজ ফেলার সুবিশাল এক ঝুড়িবিশেষ, যেখানে বিক্ষিপ্তভাবে নানা ধরনের কাগজপত্র ছুড়ে ফেলা হয়েছে শুধু ওই অক্ষরের মিলের কারণে— পবিত্র হিব্রু অক্ষর ধ্বংস করা যায় না এ বিশ্বাস থেকে।

ময়লা ঝুড়ি যেমন আবদ্ধ থাকে না, সিলগালা মেরে বন্ধ করে দেয়া হয় না, তেমনি গেনিজার ভাগাড়ও কারো জন্য দুষ্প্রবেশ্য ছিল না। ফলে দেখা যায় ভাগাড়ে ছুড়ে ফেলা দেয়া কাগজ আবার কুড়িয়ে এনে তার অব্যবহূত সাদা অংশ নতুন করে ব্যবহূত হয়েছে লেখার কাজে। বহু আগে তামাদি হয়ে যাওয়া চুক্তিপত্রের অন্য পৃষ্ঠার সাদা অংশ ছিঁড়ে দুই টুকেরো করে লেখা হয়েছে কোনো টিকাভাষ্য কিংবা মন্তব্য।&dquote;&dquote;

আর সে কারণে গুরুত্বপূর্ণ দলিলের সঙ্গে পাওয়া ওইসব অজস্র টিকাভাষ্য, মন্তব্য, তালিকা, ক্রয় রশিদজাতীয় নানা লেখাপত্র ভাগাড় থেকে উঠে এলেও পরবর্তীতে এর পাঠোদ্ধারে বেরিয়ে এসেছে ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সব উপাদান। মহামূল্যবান পাণ্ডুলিপি। ভাবুন তো এই গেনিজা ভাগাড় থেকেই আবিষ্কৃত হয়েছে দুনিয়া কাঁপানো আরবীয় উপাখ্যানের মূল্যবান আদি পাণ্ডুলিপিও।

২.

‘হাজার এক রাত্রীর উপাখ্যান’ যা ‘আরব্য রজনী (আলিফ লায়লা)’ কাহিনীসূত্র যদি কেউ খোঁজা শুরু করেন, তাহলে প্রায় বিনা কসরতে এসে হাজির হবেন প্রাক ইসলামী, পারস্য-ভারতীয় হাজার রাত্রির উপাখ্যান আলিফ লায়লার কাছে, এটাই আম পাঠকের জ্ঞানে আরব্য রজনীর প্রাচীনতম উত্স। কিন্তু আলিফ ওয়া-লায়লা, সর্বপ্রাচীন সংস্করণের ইতিহাস আরো পুরনো, যার নজির এসেছে কায়রোর সেই প্রাচীন কাগজের ভাগাড়, অর্থাৎ গেনিজা থেকে।

গোয়েটিন এই নজিরের প্রথম সন্ধান পান অক্সফোর্ডের বোদলিয়ান লাইব্রেরিতে, এক ইহুদি ডাক্তারের নোটবুকে, যিনি একই সঙ্গে ছিলেন পুস্তক সরবরাহকারী ও নোটারি। ১১৫০ সালের দিকে ডাক্তার সাহেব তার খাতায় এক ব্যক্তির নামের পাশে লিখেছেন যে তিনি তাকে আলিফ ওয়া-লায়লা ধার দিয়েছেন। আলিফ লায়লার পাঠকের কাছে প্রাচীন কায়রোর গেনিজায় আরব্য রজনীর প্রাপ্তির বিষয়, তাই তেমন কোনো বিস্ময়কর ঘটনা নয়, কারণ পাঠক হিসেবে কায়রো শহর— পশ্চিমের অনুরূপ শহর বাগদাদ কিংবা দূরপ্রাচ্যের চীন— আলিফ লায়লার কাহিনীতেও এসব স্থান অচেনা কোনো জায়গা না। ঘুরেফিরে প্রচুর কাহিনীতে এসব স্থান বা শহরের বিবরণ এসেছে। একই সঙ্গে ইহুদি হেকিম, খ্রিস্টান কারবারি, দালাল যেমন গেনিজার কাগজপত্রে হাজির ছিল, তেমনি তারা শেহেরজাদের হাজার রাত্রীর কাহিনীতেও পরিচিত চরিত্র।

খলিফা হারুন আল-রশিদ ছিলেন এই দুই পরিমণ্ডলের যোগসূত্র। তিনি একই সঙ্গে যেমন ঐতিহাসিক এক চরিত্র, তেমনি হাজার এক রাত্রীর একজন কল্পিত চরিত্র হয়েও অমর হয়ে আছেন। ইহুদি ডাক্তার ১২ শতকে আলিফ ওয়া-লায়লা ধার দেয়ার কথা লিখে গেলেও আরো কিছু সাক্ষ্যপ্রমাণ-নজির বলছে শেহেরজাদের কাহিনী আরো পুরনো, আরো আগেই ওই কাহিনী কাগজে লিখিতরূপে হাজির ছিল। ওরিয়েন্টাল ইনস্টিটিউট অব শিকাগো ইউনিভার্সিটিতেই রক্ষিত আছে নয় শতকের পাণ্ডুলিপির এক খণ্ডাংশ, যা কিনা আন্তর্জাতিক যেকোনো মহাফেজখানা বা পাঠাগারে রক্ষিত সবচেয়ে প্রাচীন আরবীয় কাগজ এবং আলিফ ওয়া-লায়লারও। তবে এই কাগজ ৮৭৯ সালেই যখন পুনর্ব্যবহূত হচ্ছে, তখন ব্যবহার হচ্ছে পরিত্যক্ত কাগজ হিসেবেই, অর্থাৎ ওই কাগজের টুকরোর মার্জিনে লেখা নানা আইনি বিষয়-আশয়ের মকশোকারী জনৈক নকলনবিশ ইবনে মাহফুজ আলিফ ওয়া-লায়লার পাণ্ডুলিপিতে লিখছেন, এটা তার কাছে কোনো ধর্তব্যের বিষয় হিসেবে কাজ করেনি। প্রায় হলদে হয়ে আসা ভঙ্গুর এ পাণ্ডুলিপির টুকরোটি আলিফ ওয়া-লায়লার (হাজার এক রাত্রীর উপাখ্যান) প্রথম পাতা! বিশেষজ্ঞদের বিশ্বাস এ পাণ্ডুলিপি কম করে হলেও ইবনে মাহফুজের ব্যবহারের সময়ের চেয়েও অর্ধশতকের পুরনো, যার অর্থ দাঁড়ায় এই পাণ্ডুলিপি বা আলিফ ওয়া-লায়লা যখন লেখা হয়েছে, তখন খলিফা হারুন আল-রশিদের রাজত্বকাল (৭৮৬-৮০৯) চলছিল। এ অবিষ্কারে কাগজ বিশেষজ্ঞদের দাবি সাহিত্যের ইতিহাসবিদদের যুক্তির সঙ্গেও ভালোই মিলে যায়। দুই পক্ষই মনে করে, কাগজ অর্থাৎ লেখার নতুন উপাদানের আবির্ভাবের ফলে কোরআন আর আরবীয় লোকায়ত, জনপ্রিয় গদ্যের ব্যাপক প্রচার-প্রসার ঘটে। 

এর ফলে আরো কিছু ব্যাপারও ঘটে, হাজার এক রাত্রির কাহিনী একই সঙ্গে যেমন শত শত বছর কাগজের প্রচারের বাহন হয়ে থেকেছে, তেমনি কাহিনী হিসেবেও নানা রকম পরিবর্তন-সংযোজন-পরিবর্ধনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে একে। ফলে মূল আরবীয়, পারস্য-ভারতীয় কাহিনী— সব মিলেমিশে এক সময় একাকার হয়ে গেছে আরব্য রজনীর ভেতরে। পাশাপাশি প্রতিনিয়ত নতুন নতুন কাহিনী, বর্ণনা যুক্ত হয়েছে। আর যেহেতু হাজার এক রাত্রির উপাখ্যানের শনাক্ত করা যায় এমন কোনো লেখক নেই, সংগ্রাহক নেই, সম্পাদকও নেই— কাজেই টেক্সটের এই প্রবহমানতা কখনই থেমে থাকেনি।

তাই কায়রোর ওই গেনিজায় রক্ষিত পুরনো পরিত্যক্ত কাগজ তুলে এনে যেমন নতুন করে লেখালেখি করা হয়েছে, তেমনি পুরনো কাহিনী তুলে এনেও তার ওপর লিখিত হয়েছে নতুন হাজার এক রাত্রির গল্প। যেমন ফরাসি আতোয়ান গালা ইউরোপীয়দের কাছে ১৮ শতকের প্রথম ভাগের যে আরব্য রজনী হাজির করেন, তার মূল পাণ্ডুলিপি রচিত হয়েছে আরো আগে ১৫ শতকের দ্বিতীয় ভাগে।

এ উদাহরণে এটাই স্পষ্ট হয় যে আরব সংস্কৃতিতে কাগজের প্রচার-প্রসার আর হাজার এক রাত্রির কাহিনীজগতের বিনির্মাণের ঘটনা ঘটেছে প্রায় একই সমান্তরালে।

আর কাগজের ওপরই লেখা হয়েছে বিশ্বের কালোত্তীর্ণ সব মহাকাব্য— সে আরব্য রজনী হোক কি আলাওলের পদ্মাবতী কি ইউসুফ-জুলেখা কি মহুয়া-মলুয়া কি জর্মন ভাইদের রূপকথা। কাগজে সওয়ার হয়ে তা পাঠক হূদয়ে স্থায়ী আসন গেড়েছে।

এই প্রশ্নটা শেষ পর্যন্ত করেই যাই, কাগজের বিকল্প হয়ে ওঠার তুমুল কসরত লক্ষণীয় ডিজিটাল ওয়ার্ল্ভ্রে, কিন্তু শত শত বছর কাগজ যে ইতিহাস, মহাকাব্য তার বরফ সাদা বুকে ধারণ করে আসছে, ডিজিটাল প্রযুক্তি কি পারবে কাগজের মতো বিশ্বস্ত সংরক্ষক ও পল ভ্যালেরির বলা পথনির্দেশক হয়ে উঠতে? ফ্লপি ডিস্ক নেই, সিডি-ডিভিডি প্রায় অপস্রিয়মাণ, পেন ড্রাইভ কুড়িয়ে-বাড়িয়ে কাজ চালিয়ে নিচ্ছে, হার্ডড্রাইভের ক্ষমতা পরিসর বাড়ছে, কিন্তু একই সঙ্গে এসবের মুছে যাওয়ার ক্ষমতাও অসাধারণ। এক লহমাতেই ভ্যানিশ। কাগজে ইতিহাস প্রজন্মের পর প্রজন্মের হাতবদল হয়েছে, ডিজিটাল প্রযুক্তি এক প্রজন্মই শত রূপে হাজির হচ্ছে, তাই দেরিদার মতো দ্বিধাগ্রস্ত হয়েও বলতে হয়, কাগজের শক্তি পুরোপুরি কখনই নাই হয়ে যাবে না।