১৯৭৩ সালে কাজে ইস্তফা দেন ব্রাজিলীয় লেখক রাদুয়ান নাসার। ছয় বছর ব্রাজিলের সামরিক শাসনবিরোধী প্রভাবশালী বামধারার পত্রিকা জার্নাল দো বায়ররো প্রধান সম্পাদকের পদে থাকার পর সহপ্রতিষ্ঠাতাদের একজন, বড় ভাইয়ের সাথে এক ধরনের অচলাবস্থার মুখোমুখি হন তিনি। তখন অবধি বিনা পয়সায় বিলি করা হতো পত্রিকাটা। গ্রাহকদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করা ঠিক হবে কিনা সে বিষয়ে একমত হতে পারেননি দুই ভাই। নাসারের বয়স তখন সাঁইত্রিশ, পত্রিকা ছেড়ে সাও পাওলোর নিজের অ্যাপার্টমেন্টে দিনে বার ঘণ্টা ‘সারাক্ষণ কাঁদতে কাঁদতে’ একটা উপন্যাস লেখার পেছনে খরচ করেন। তাঁর লেখা এই অদ্ভুত সংক্ষিপ্ত উপন্যাস ‘অ্যানশেন্ট টিলেজ’-এ এক তরুণ গ্রামের বাড়ি আর পরিবার ছেড়ে পালিয়ে গিয়েও আবার ছেলেবেলার জায়গায় ফিরে আসে সংযত আর কিছুটা বিনয়ী হয়ে।

১৯৭৩ সালে প্রকাশিত ‘অ্যানশেন্ট টিলেজ’ নিমেষে সমালোচকদের প্রশংসা লাভ করে। সেরা প্রথম রচনা পর্যায়ে ব্রাজিলের প্রধান সাহিত্য পুরস্কার ‘জাবুতি প্রাইজ’ পায় এটি, ব্রাজিলিয়ান একাডেমি অব লেটারস থেকেও আরেকটি পুরস্কার লাভ করে। ১৯৭৮ সালে ছাপা হয় দ্বিতীয় উপন্যাস; ১৯৭০ সালে শহরের উপকণ্ঠে এক গ্রামীণ মহল্লায় থাকতে ‘আ কাপ অব রেইজ’-এর প্রথম খসড়া লেখেন নাসার। সাও পাওলো আর্ট ক্রিটিকস’ অ্যাসোসিয়েশন প্রাইজ লাভ করার ভেতর দিয়ে সানন্দে গৃহীত হয় এটাও। ‘ওই বই দুটোর খুবই জোরালো প্রভাব ছিল,’ আমাকে বলেছেন নাসারের ঘনিষ্ঠ বন্ধুতে পরিণত কবি-সমালোচক আন্তোনিও দে ফ্রানচেশি। ‘ছোট ছোট কঠিন পাথর ওগুলো। সবকিছুই ওখানে নিরেট।’ গেল বছর পেঙ্গুইন ক্লাসিক সিরিজের জন্যে নাসারের দুটি উপন্যাস প্রথমবারের মতো ইংরেজিতে তর্জমা হয়েছে— চলতি মাসে নিউ ডিরেকশন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বের করবে এগুলো— এবং ম্যান বুকার ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজের জন্যে হ্রস্ব তালিকাভুক্ত হয়েছে স্তেফান টবলার অনূদিত ‘আ কাপ অব রেইজ’।

দ্রুত ফ্রান্স ও জার্মানির প্রকাশকদের নজরে পড়ে নাসারের উপন্যাসগুলো। উনিশ শ আশির দশকের গোড়ার দিকেই একসাথে মিলে তিনশ পাতার কিছু বেশি আয়তনের ছোট দুটো বইয়ের মাধ্যমে ইতিমধ্যেই ব্রাজিলের অন্যতম মহান লেখক হিসেবে প্রশংসিত হয়ে উঠেছিলেন তিনি। ক্লারিস লিসপেক্তর আর হোয়াও গিমারেসের সাথে একই তালে উচ্চারিত হচ্ছিল তার নাম। প্যারিস সফরের সময় সরবোর্নে ভাষণ দেয়ার জন্যে আমন্ত্রিত হয়েছেন তিনি এবং প্রকাশনা উত্তরসূরি ক্লদ গালিমার্দ এবং নাম করা কাতালান লিটারেরি এজেন্ট কারম্যান বালসেলিসের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন। গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস, মারিও বার্গাস ইয়োসা ও পাবলো নেরুদার ঘনিষ্ঠ বন্ধু বালসেলিসকে অনেক সময় অস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত কিন্তু দারুণ বিপণনযোগ্য ধারণা— উনিশ শ ষাট ও সত্তরের দশকে এ অঞ্চলের সাহিত্যের প্রতি বৈশ্বিক চাহিদা বৃদ্ধি— লাতিন আমেরিকান বুমের নেপথ্য ব্যক্তি ভাবা হয়। এদের লেখালেখির ব্যবস্থাপনা করছেন তিনি। তখন ওই দলে যোগ দেয়ার জন্যে নাসারকে খুঁজে বের করেছিলেন। ‘বিরাট কিছু আশা করেছিলেন তিনি,’ গত বছর সাও পাওলোতে আমরা প্রথমবারের মতো পরিচিত হলে আমাকে বলেছেন তিনি। ‘খুবই উদার মানুষ।’

১৯৮৪ সালে আটচল্লিশ বছর বয়সে সাহিত্য খ্যাতির তুঙ্গে থাকতেই দেশের সর্ববৃহত্ সংবাদপত্র ফোলহা দে সাও পাওলোয় দেয়া এক সাক্ষাত্কারে অবসরে যাওয়ার ঘোষণা দেন নাসার। কৃষক হতে চেয়েছিলেন তিনি। ‘এখন নানান জিনিসে ঝলসে উঠেছে আমার মন; কৃষিকাজ আর পশুপালন করছি আমি,’ সাক্ষাত্কারগ্রহণকারীকে বলেছিলেন তিনি। অনেকেই হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল। কথা রেখেছিলেন নাসার। পরের বছর মোটামুটি ষোল শ একর জমি কিনে সয়া, ভুট্টা, শিম আর গমের চাষ শুরু করেছিলেন।

‘তখন অনেক কিছুই ত্যাগ করেছিলাম আমি, ধারণাও করতে পারবে না তুমি,’ সেদিন বিকেলে আমাকে বলেছেন তিনি। এখন একাশি বছর বয়সে শহরের পশ্চিম প্রান্তে এক বোহেমিয়ান মহল্লা ভিলা মাদালেনার নিরিবিলি একটা অংশে জীর্ণ লাল ইটের বাড়িতে একাকী থাকছেন। প্রায় তিনটি দশক কষিকাজে কাটানোর পর ২০১১ সালে নাসার তাঁর জমি গ্রামীণ লোকজনকে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা দেয়ার শর্তে ফেডারেল ইউনিভার্সিটি অব সাও কার্লোস-কে দান করে দিয়েছেন। ক্যাম্পাস নির্মাণ হয়ে গেছে, এখন ক্লাস চলছে। একজন সাবেক খামার শ্রমিকের কথা বলেছেন নাসার, যার মেয়ে এখন পড়াশোনা করছে ওখানে।

দেয়ালে সাঁটা একটা পুরনো হলদে হয়ে আসা ঘড়ি আর ডেস্কের মাথার উপর তাঁর বাবা-মায়ের একটা শাদা-কালো পোর্ট্রেট নিয়ে মামুলিভাবে সাজানো নাসারের লিভিং রুমটা। লিভিং রুমে কোনো বুকশেলফ নেই। তবে ম্যান্টেলপিসের উপর ছোট এক সারি বই ছিল: আঁদ্রে জিদ, দস্তয়েভস্কি (তাঁর বিশেষ পছন্দের একজন লেখক) এবং পর্তুগিজ অভিধান কালদাস অলেতে’র অনেক পুরনো সব খণ্ড। টেবিলের পাশে ও কাউচে ঝকঝকে তকতকে নতুন সব বই এলোমেলো পড়ে থাকতে দেখেছি। ‘ওগুলো উপহার,’ বলেছেন তিনি। ‘লোকজনকে বলি আমি পড়ি না, কিন্তু আমার কথা ওরা বিশ্বাসই করে না।’

যেসব লেখক তাদের মেধার চর্চা না করার সিদ্ধান্ত নেন, পাঠক ও সতীর্থ লেখকদের মনে ঈর্ষা থেকে শুরু করে বিস্ময় পর্যন্ত নানা প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিতে পারেন তারা। নাসারের আগাম অবসরকে ব্রাজিলে এক ধরনের অপমানের ছোঁয়াসহ কৌতূহলের সাথে দেখা হয়েছে। কৃষক হওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে— অলস কোনো বাসিন্দা নয়, বরং একটা উত্পাদনশীল মাঝারি আকারের ফাজেন্দার মালিক— সাহিত্যের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করেছেন তিনি।

তিনি পুরোপুরি থেমে যাননি বলে সন্দেহ পোষণ করেছিলেন প্রকাশকরা। ‘বিগত এই দশকগুলোয় ড্রয়ারে কোনো গোপন কবিতা বা গল্প লুকিয়ে রেখেছেন কিনা জানাটা পত্রিকাঅলাদের অন্যতম বড় বিকার ছিল,’ দেশের প্রধান প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান কোম্পানহিয়া দাস লেত্রাসের প্রধান সম্পাদক লুইয শোয়ার্য বলেছেন আমাকে। অংশত নিজের কথাই বলছিলেন তিনি। আশির দশকের শেষ দিকে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের গোড়াপত্তনের সময় নাসারকে ফোন করেছিলেন তিনি। ‘আমি তাকে বলেছি, ‘লুইয, দেখ, তোমার জন্যে আমার কাছে কোনো বই নেই,’ আমাকে বলেছেন নাসার। ‘তত দিনে আমি গ্রামীণ জীবনে গভীরভাবে মিশে গেছি।’

সেই ছোটবেলা থেকেই কৃষিকাজে নাসারের আগ্রহ। বিশের দশকে লেবানন থেকে ব্রাজিলে চলে আসেন তাঁর বাবা-মা, বসতি করেন সাও পাওলো রাজ্যের ক্ষুদে গ্রামীণ শহর পিন্দোরামায়। নাসার এবং তার নয় ভাইবোন ছোট এক খণ্ড জমিনে বড় হয়েছেন। ওই জমিনে কমলা, চেরি, আর জাবুতিকাবা গাছ লাগিয়েছেন তাঁর বাবা এবং পাখি ও খরগোশ পুষেছেন। তাঁর মা ছিলেন দারুণ মুরগি পালক, আমাকে বলেছেন তিনি, কিন্তু টার্কিই ছিল তার আসল বিশেষত্ব। ‘বাবা একবার দুটো গিনি মুরগি দিয়েছিলেন আমাকে,’ সুখকর স্মৃতিতে কোঁচকানো চেহারায় আমাকে বলেছেন তিনি। ‘কী যে উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলাম।’

তাঁর বাবা ছিলেন সনাতনী খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী আর মা প্রটেস্ট্যান্ট, কিন্তু বৈষম্য ঠেকাতে শিশুদের ক্যাথলিক হিসেবে বড় করে তোলা হয়। কমিউনিয়নের জন্যে রোজ ভোর ঠিক পাঁচটায় ঘুম থেকে জেগে উঠতেন অল্টার-বয় নাসার। নাসারের বয়স যখন ষোল, রাজধানী সাও পাওলোতে চলে আসেন তিনি, এখানে সাও পাওলো ইউনিভার্সিটিতে দর্শন নিয়ে পড়াশোনার আগে ভাষা ও আইন বিষয়ে পড়েন। ১৯৬৭ সালে জার্নাল দো বায়ররো প্রতিষ্ঠা করেন তিনি এবং তাঁর চার ভাই।

উড়নচণ্ডী ছেলের কিংবদন্তির একটা ভাষ্য ‘অ্যানশেন্ট টিলেজ’ জমিন ও পরিবারের সাথে আন্দ্রের বাঁধন উদযাপনের পাশাপাশি আবার এইসব বন্ধনের প্রায় নাস্তিবাদী নিন্দাবাদও। গ্রামীণ ভূস্বামীর ছেলে আন্দ্রে বোনের প্রতি অজাচারী অনুভূতির কারণে যন্ত্রণাক্লিষ্ট। পরিবার থেকে পালিয়ে একটা লজিংয়ে গিয়ে ওঠে সে, মদ পান করে বেশ্যাদের কাছে যাতায়াত করে। ভাই পেদ্রো ওকে বাড়ি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে। গল্পের বাইবেলীয় ভাষা যুগপত্ আন্তরিক ও পরিহাসমূলক হয়ে উঠেছে; গ্রামীণ জীবনের নিজস্ব নস্টালজিক ভাষ্যে এক ধরনের অশুভ অস্বস্তিকর ছায়া ছুড়ে দেয়ার বেলায় নাসার বিশেষ দক্ষ। একটা দৃশ্যে আন্দ্রে পরিবারের ‘নাইটগাউন আর পাজামার কোঁচকানো স্লিপ’ গোছানোর অভিজ্ঞতার কথা মনে করতে গিয়ে ‘সেগুলোর ভাঁজে হারিয়ে যাওয়া কুণ্ডলী পাকানো সবচেয়ে কোমল যৌনকেশের শক্তি চাপা পড়ে আছে’ বলে আবিষ্কার করে।

‘আ কাপ অব রেইজ’-এ নামহীন বক্তা ব্রাজিলীয় পশ্চাত্ভূমির এক নিঃসঙ্গ কৃষক। একদিন সকালে প্রেমিকা সাংবাদিক বেড়াতে আসে তার ওখানে। খামারবাড়িতে মিলিত হয়ে সকালটা কাটায় ওরা, তার পর একসাথে স্নান করে। বলতে গেলে কোনো কথাই হয় না। তার পর নাশতার জন্যে তৈরি হওয়ার সময় সিগারেট খেতে বাইরে এসে কৃষক দেখতে পায় একঝাঁক পিঁপড়ে খামারের বেড়া নষ্ট করে ফেলছে। সহসা মেজাজ বদলে যায়, দুজনের ভেতর শুরু হয় তর্ক— কিংবা আরো ঠিক করে বললে, নাটকীয় বুলির বিনিময়— গল্প এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে প্রবল হয়ে ওঠে সেটা। কৃষক সম্পর্কে পাঠকের ধারণা হলো, সে এমন কেউ যার দুনিয়ার সমস্ত অভিজ্ঞতা আছে কিন্তু যা দেখেছে, সেটা তার মনঃপূত হয়নি। ১৯৭০ সালে উন্মাদনার দুটি সপ্তাহে প্রথম খসড়াটি লিখেছিলেন নাসার, আমাকে বলেছেন তিনি। ‘হাসি থামাতে পারিনি,’ ‘অ্যানশেন্ট টিলেজ’ লেখার সময়কার অনুভূতির সাথে তুলনা করে বলেছেন।

আমরা লাঞ্চ করার সময়— চিকেন পাই, ভাত, ওয়াইন, ফ্যাশন ফ্রুট মাউসি— বেশ কয়েকবার কথোপকথনে বাদ সেধেছেন নাসার। ‘সত্যি ছিল ব্যাপারটা,’ কোনো চরিত্র বা অনুচ্ছেদ কিংবা এমনকি নিজের জীবন সম্পর্কে বলেছেন তিনি, ‘বইতে আছে ওটা।’ সাহিত্যিক জগতের কৃত্রিমতার প্রতি এক ধরনের উপেক্ষা তুলে ধরা বিচিত্র এবং ভালো লাগার একটা স্বভাব ছিল ওটা। এখন উপন্যাস দুটি পড়তে গিয়ে ভবিষ্যতের আত্মজৈবনিক বর্ণনার মতো উদ্ভিদবিদ্যার ছবি আর প্রকৃতির উপমার বর্ণনার অনুপ্রবেশ লক্ষ না করা কঠিন। পাগুলো ভেজা, ‘যেন বা ওই মুহূর্তেই জমিন থেকে তুলে আনা হয়েছে’; সুখনিদ্রা পেকে গেছে, ‘জমানো ফলের ভক্তিময় ইন্দ্রিয়সুখে জোগাড় করা’; বয়ানকারীর চেতনায় সংসারের ভার ‘প্রবল পানির জোয়ারের মতো।’

নাসার বলেছেন যে, কৃষিকাজই ছিল তার মূল পেশা আর লেখালেখি ‘স্রেফ অন্য একটা কাজ।’ কিন্তু কৃষিক্ষেত্রে মসৃণভাবে তার জীবন শুরু হয়নি। ‘খুবই কঠিন ছিল। দারুণ খারাপ দশায় ছিল জমিন। প্রথমে আমরা শিম ফলাতে শুরু করি, দারুণ সব শিম,’ বলেছেন তিনি। ‘এলাকার আরো কিছু খামারিকেও পেয়েছিলাম আমরা, কীভাবে কাজটা করা দরকার তার কিছু সূত্র দিয়েছে ওরা।’ দ্রব্যমূল্য তখন একেবারেই কম ছিল, এমনকি বাইরের সাহায্য নিয়েও মুনাফা করতে পারেননি তিনি। গবাদিপশু পালনের একটা প্রয়াসও বাদ দিতে হয়েছে। ‘প্রথম ছয়টি বছর মরতে বসেছিলাম আমরা। খালি লোকসান আর লোকসান।’ আমি লক্ষ করেছি নিজের কৃষিকাজের কথা বলার সময় প্রায়ই উত্তম পুরুষে বহুবচন ব্যবহার করছেন নাসার, যদিও বেশির ভাগ সময় একাকী বাস করেছেন তিনি। নিজের এককালের দীর্ঘ সম্পর্ক নিয়ে কথা বলতে চাননি, একে ‘উত্তাল’ বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। নিজের চরিত্রগুলোর মতোই দৈহিক পরিশ্রমে তিনি সান্ত্বনা পান বলে মনে হয়েছে। ‘আমার জীবন এখন কাজ, কাজ আর কাজ,’ লেখালেখি থেকে অবসর নেয়ার পর কেমন চলছে জানতে চাইলে ১৯৯৬ সালে সাক্ষাত্কারে এক সাংবাদিককে বলেছিলেন তিনি।

১৯৯১ সালে কৃষিকাজে ভাগ্য ফিরতে শুরু করে তাঁর। এই সময়েই সমালোচকদের প্রশংসা পেলেও বৃহত্তর পাঠকদের নাগালে না পৌঁছানো নাসারের বইগুলো বর্ধিত সংখ্যায় বিক্রি হতে শুরু করেছিল। (১৯৯৭ সালে ‘আ কাপ অব রেইজ’ চলচিত্রে রূপান্তরিত হয়; ২০০১ সালে ‘অ্যানশেন্ট টিলেজ’ অবলম্বন করে ছবি তৈরি হয়)। ২০১১ সালে লাগোয়া দো সিনো খামারটা ইউএফএসসিএআর-কে দান করে দেয়ার অল্প আগে ওই সম্পত্তির বিনিময়ে আঠার মিলিয়ন রিয়ালের— মোটামুুটি ছয় মিলিয়ন ডলার— প্রস্তাব পেয়েছিলেন তিনি।

নাসারের অন্যতম ভয় ছিল ব্রাজিল সরকার জনগণকে দেয়া তার জমিন ব্যক্তিমালিকানায় তুলে দিতে পারে। দেশের নতুন ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট মিশেল টেমারের কঠোর সমালোচক ছিলেন তিনি। গত এপ্রিলে সাবেক প্রেসিডেন্ট জিলমা হুসেফের অপসারণের অল্প আগে তার পাশে এক বিরল প্রকাশ্য উপস্থিতি ঘটান। বিপন্ন প্রেসিডেন্টকে আলিঙ্গন করে তোলা নিঃসঙ্গ লেখকের ছবি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। নাসার বলতে গেলে প্রকাশ্যে আসেন না, প্রায়ই ছোটখাটো অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ ফিরিয়ে দেন, কিন্তু গেল বছর এর দরকার আছে বলে মনে হয়েছে, বলেছেন তিনি। ‘আমরা যেন একটা অভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি আমার তাতে কোনো সন্দেহ ছিল না,’ বলেছেন তিনি। ‘গণতান্ত্রিকভাবে জনপ্রিয় ভোট পাওয়া একজন প্রেসিডেন্টকে আপনি স্রেফ সরিয়ে দিতে পারেন না।’

আমরা একসাথে থাকার সময়টুকু অনেক সময় নিজের কাজ নিয়ে গর্ব প্রকাশ করেছেন নাসার, কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে শাসন করেছেন বলে মনে হয়েছে। একপর্যায়ে এক প্রকাশকের ফোন ধরেন তিনি, একটা প্রচ্ছদ নিয়ে জোরালো তর্ক করতে শুনি তাকে; প্রচ্চ্ছদের সিংহভাগই দখল করে নেয়া তাঁর নামের জন্যে ব্যবহার করা হরফের আকার নিয়ে আপত্তি করেছেন। নাসারের ঘনিষ্ঠজনরা তাকে একজন অমায়িক সূক্ষ্ম ব্যবস্থাপক হিসেবে বর্ণনা করেন, এমন একজন লেখক যিনি সম্পাদকীয় প্রক্রিয়ার প্রতিটি ক্ষেত্রেই হস্তক্ষেপ করেন। কোম্পানহিয়া দাস লেত্রাস প্রতিষ্ঠার আগে আশির দশকে নাসারের লেখা সম্পাদনা করেছিলেন শোয়ার্য। ‘প্রতিটি নতুন সংস্করণেই কোনো একটা বাক্য পাল্টে ফেলতে চাইতেন তিনি, কিংবা লেখকের জীবনী বদলাতে চাইতেন, কিংবা কালির বৈশিষ্ট্য নিয়ে অভিযোগ তুলতেন,’ বলেছেন তিনি। অনেক সময় নির্দিষ্ট ধরনের হরফ কিংবা লাইনের মাঝখানে জায়গার দাবি তুলতেন নাসার। ‘অনেক সময় লুইয আমাকে বলেছে, “রাদুয়ান, তুমি যখন তোমার চিরকুটগুলো আমার কাছে ফেরত পাঠাও, বুঝতে পারি না কাঁদব নাকি হাসব,’ আমাকে বলেছেন নাসার। ‘বিক্রি নিয়ে কখনো খুব একটা পরোয়া করিনি, তবে সবসময় চেয়েছি বইগুলো যতদূর সম্ভব সেরা হোক। ওই ছোট ছোট সংস্করণ সহ্য করতে পারি না আমি, যেখানে সবকিছু অল্প জায়গায় ঠাসাঠাসি হয়ে থাকে।’

শোয়ার্যের জন্যে তার কাছে অপ্রকাশিত কোনো লেখা না থাকার নাসারের প্রাথমিক দাবি পুরোপুরি সত্যি নয় বলে আবিষ্কৃত হয়েছিল। অবশেষে পঞ্চাশের দশকের শেষদিকে লেখা একটা ছোট গল্প ‘মেনিমা আ কামিনহো’ তুলে দেয়া হয় এবং শেষ হওয়ার প্রায় চল্লিশ বছর পর ১৯৯৭ সালে সেটি প্রকাশ পায়। ফ্রানচেশিই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি কিনা আনুষ্ঠানিকভাবে অবসরে যাওয়ার পরেও লেখালেখির কাজ হাতে নিতে রাজি করাতে পেরেছিলেন তাকে। তাঁর লেখা ছোট প্রবন্ধ ‘মাওজিনহাস দে সেদা’ কূটনৈতিক সহজাত প্রবণতার গুরুত্বের ওপর তির্যক ভাবনা। সেই সময় ফ্রানচেশি সম্পাদিত সাময়িকীর জন্যে নব্বই দশকের গোড়ার দিকে লেখার দায়িত্ব দেয়া হয়, কিন্তু নাসারের অনুরোধে সাত বছর সেটা প্রকাশ করা হয়নি।

শোয়ার্য এবং ফ্রানচেশি কৌতূহলে ঘাটতির কারণে নয় বরং সাহিত্যিক পারফেকশনিজমের কারণেই নাসার ইস্তফা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে বিশ্বাস করেন। ‘তিনি এমন একজন মানুষ, যিনি কুশলতার দিকে নিজেকে এতটাই ঢেলে দেন যে আমার মনে হয় সন্তুষ্ট হওয়াটা তার পক্ষে কঠিন,’ বলেছেন শোয়ার্য। ‘বিশেষ করে যে দেশে সমালোচনা সেভাবে সক্রিয় নয়।’ ফ্রানচেশিও নাসারের প্রতি সমান সমীহ পোষণ করেন, কিন্তু তার আচরণে কিছু ‘বৈকল্য’ লক্ষ করেছেন। তার চোখে নাসার এমন কেউ যিনি নিজের অহমের চাহিদাগুলোর সাথে বিনয়ী জীবনের আকাঙ্ক্ষাকে সমন্বিত করার প্রয়াসে ‘নিজের অপছন্দের অংশগুলো দারুণ জোরে চেপে ধরেন’।

এই অস্থিরতাই তার উপন্যাসে এক ধরনের ভাষাগত উত্কণ্ঠা বা নির্ভুলতার স্বতন্ত্র সন্ধান হিসেবে আকার লাভ করে থাকে। ইমেজের পর ইমেজ হাজির হতে থাকে, যেন আনন্দময় হাসির চাহিদা সবসময়ই রয়ে গেছে। এই গুণটুকুই নাসারের খুবই ছোট বইগুলো অদ্ভুতভাবে সর্বোচ্চ বোধ জাগায়। ‘খুব কমই ছেঁটে ফেলায় অভ্যস্ত,’ আমাকে বলেছেন তিনি। ‘ব্যাপারটা বরং আরো কিছু জুড়ে দেয়ার মতো।’ কিন্তু বাড়তিটুকু আবার অপর্যাপ্ততার অনুভূতিও দেয়। ‘আ কাপ অব রেইজ’-এ চমত্কার কায়দায় চরিত্রগুলো পরস্পরকে বকাবাদ্যি করার সময় আভাসে সমালোচনার ধারণা পাওয়া যায়। শক্তিশালী উপমা আর অনুপ্রাসগুলো লক্ষ করুন, কেমন বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে সেগুলো! বর্ণনাকারীরা প্রায়ই নিজেদের অসহায়ত্বের কথা বলছে। ‘আর কথা বাড়ানোর কি দরকার?’ একসময় বলে আন্দ্রে। দুটো উপন্যাসেই চরিত্রগুলোর আপাত অন্তহীন ব্যাখ্যা সহিংসতার ভেতর দিয়ে শেষ হচ্ছে।

আমাদের পরিচয়ের আগে, নাসারের কাজের একটা সমালোচনা লিখেছিলাম, তাতে এই ব্যাখ্যা তুলে ধরেছিলাম। এক ধরনের আনুষ্ঠানিক ই-মেইল পাঠিয়ে ‘কথাটা জুতসই’ হওয়ার তারিফ করেছিলেন তিনি। কিন্তু পরে ওই প্রসঙ্গে এলে লেখালেখি বাদ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে তত্ত্ব খাড়া করার বেলায় অনেক সময় বিরক্তি প্রকাশ করেছেন নাসার। স্থানীয় সাময়িকী ভেজা’র সাথে এক সাক্ষাত্কারে বাদ দেয়া বেশ কয়েকটি কাজের কথা বলেছিলেন তিনি: বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষা বিষয়ে পড়াশোনা, আইন, খরগোশ পালন, সাংবাদিকতা। ‘ওই সবই অস্থিরতার তকমা দিয়েছে আমাকে,’ সাক্ষাত্কার গ্রহণকারীকে বলেছেন তিনি। ‘কেন তবে সাহিত্যচর্চা ছেড়ে দেয়ার কারণে এমন আকর্ষণীয় চরিত্রে পরিণত হলাম আমি? ব্যাপারটা অদ্ভুত না?’

গত ডিসেম্বরে এক সকালে আবার তার বাড়ি গিয়েছিলাম। ইস্ত্রি করা পিন-স্ট্রাইপড শার্ট ছিল তার পরনে আর পুরনো একটা হাতঘড়ি; স্বভাবগত মৃদু আন্তরিকতার সাথে রুটি, পনির আর কফি ভর্তি একটা থার্মোয় টেবিল সাজিয়েছিলেন তিনি। আগের সাক্ষাত্কারগুলোও তাকে সহজ করে তোলার একটা কৌশল বলে আত্মপ্রবোধ দিয়ে সবচেয়ে স্পষ্ট প্রশ্নটা তুলতেই দ্বিধা করেছি— কেন লেখালেখি বাদ দিলেন আপনি? কিন্তু সেদিন বিকেলে, এক ধরনের নিস্তব্ধতা ছিল। ভুরু কুঁচকেছেন তিনি, অভিব্যক্তি কিছুটা গম্ভীর হয়ে গিয়েছিল, প্রথমে মনে হয়েছিল রাগ, কিন্তু ধীরে ধীরে প্রশ্নটা যত্নের সাথে বারবার প্রয়াস বলে নিজেকে তুলে ধরেছে সেটা। কিছু সময় নীরবে পরস্পরের সামনে বসে ছিলাম আমরা। তার পর তিনি দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে বললেন, ‘কে জানে? আমি আসলেই জানি না।’

[আলেহাঁন্দ্রো চ্যাকফ রিও দে জেনেইরোর একজন লেখক এবং পিয়াউই সাময়িকীর একজন কর্মী।]

রূপান্তর: শওকত হোসেন