রাজপুত্র আচার্যের নিকট ধনুর্বিদ্যা শিক্ষা করিতে আসিয়াছেন। সন্নিকটে ঋষিদের তপোবন স্নিগ্ধশীতলা, তপোবনের পাশ দিয়া চলিয়াছে ক্ষীরনদী, ক্ষীরনদী মিশিয়াছে ঢোলসাগরে। ঋষিরা কেহ বাতাহার করিয়া চর্ম্মসার, কাহারও পত্নী শাকান্ন রাঁধিতেছে। ঋষিবালকেরা গভীর নিষ্ঠায় গরু চরায়, আশ্রমের আঙিনা নিকায়, ফলাহারের ফল পাড়ে, কাঠ চিরিয়া গুরুপত্নীর রন্ধনশালায় দিয়া আসে। তাহাদের সুমধুর গীতি দিবারাত্র বনের মর্মরের সহিত মিশিয়া এক অপূর্ব সংগীত রচনা করে, হূদয় শুদ্ধ হইয়া আসে আবার অজ্ঞাত বেদনায় গুরুভার হইয়া আসে। রাজপুত্রের চিত্ত চঞ্চল হয়, চিত্ত পুনরপি শান্তও হয়। ক্ষত্রিয়ের সাধনা কঠিন, আচার্যের শিক্ষা পদ্ধতি কঠিনতর। রাজপুত্রদের তিনি আন্তরিক স্নেহ করেন, তাঁহার ছাত্ররা ত্রিভুবনে শৌর্যে-বীর্যে অসামান্য খ্যাতিমান, কিন্তু তাঁহার নিয়মের ব্যত্যয় হইলে গুরুতর দণ্ড লাভ করিতে হয়। আচার্য তিন-ছত্রিশ গালি দেন, কর্মের ভার বিপুল করিয়া দেন, শঙ্কায় রাজপুত্রের চক্ষের বাষ্পসলিল চক্ষেই শুকাইয়া আসে। ম্লানমুখে কখনো তিনি ক্ষীরনদীর তীরে একটি নদীশিলার সোপানে ক্ষণকাল বসিয়া থাকেন, উত্কর্ণ নিস্তব্ধতায় আপনার হূদয়াবেগ খর হইবার শব্দ ছাড়া আর কিছু শুনিবার নাই, তখন তিনি অতি মিষ্ট একটি মঞ্জীর শুনিতে পান, এমন যেন প্রিয় কেহ আসিতেছে, যেন ধাতব শব্দের আড়ালে কাহারও কলস্বর আহ্বান করিতেছে। অতি ধীরে হূদয়ের শোক শমিত হইয়া আসে, পুনরায় কর্মে মতি হয়।
গ্রাম্য বালিকারা হাঁসের পাল ডাকিতে আসিত ক্ষীরনদীর তীরে, শামুক তুলিয়া আছাড় মারিয়া হাঁসগুলিকে খাওয়াইত। ঋষিবালকেরা সন্ধ্যার বিশ্রম্ভালাপে রাজপুত্রকে সঙ্গ দিত, কেহ পরমান্ন আনিয়া দিত, কেহ চন্দন লেপিয়া দিত, কেহ মায়াগাছে বেঙ্গমা-বেঙ্গমী বাচ্চা ফুটাইয়াছে অথচ একবিন্দু রুধিরের অভাবে তাহাদের চক্ষু ফুটে নাই— এইসব গল্প করিত। তীরের শরবনে কত অপ্সরা লুকাইয়া থাকে, আলোকস্বচ্ছ বস্ত্র পরিধান করিয়া অর্ধস্নান করে, তাহারা কে কেমন এইসব নিয়াও গল্প জুড়িয়া দিত। রাজপুত্রর বালস্বভাব তত্কালে কিঞ্চিদোধিক অবশিষ্ট ছিল, তিনিও ভাবিতেন, অপ্সরারা কুমুদবনে স্নান করিতে নামিলে তিনি বস্ত্র কাড়িয়া আমোদ লাভ করিবেন, নারায়ণের অবতার যদি এহেন আচরণ করিতে পারেন— তাহাতে পুরুষের দোষ কী? কিংবা শব্দসন্ধিত্সু বাণ মারিয়া কাচ-সরোবরে মরাল শিকার করিবেন, সেই মরালী বাণাহত হইবার পর দেখা যাইবে তাহা কোনো শাপভ্রষ্টা রাজকন্যা। ঋষিবালকদের একজন তাঁহাকে সুরতরাসীর গল্প বলিত। রূপতরাসীর কথা তো সকলেই অবগত আছেন, রাজা তাহার মায়ারূপে অভিভূত হইয়া তাহাকে রানী করিয়াছিলেন, সেই রাক্ষসী রাত্রিবেলা উঠিয়া হাতিশালের পাটহাতি এবং ঘোড়াশালের ঘোড়া খাইয়া আসিত। সুরতরাসী রূপতরাসীরই জন্মসহোদরা, হাসনচাঁপার ন্যায় গাত্রবর্ণ, ভুবনমোহিনী তাহার মায়ারূপ, সেই বিষম রাক্ষসী সমুদ্রগামী জাহাজগুলিকে সুরের টানে ডাকিয়া আনিয়া নাবিকদের মচমচাইয়া খাইত। কেহ বলে তাহার নাম সুরতরাসী, কেহ বলে গুণতরাসী। গুণের মধ্যে এই, হতভাগ্য জলচারীরা তাহার হাতে আপনার প্রাণ খোয়ায়।
ক্রমে তাঁহার ধনুর্বিদ্যা ও অস্ত্রচালনা শিক্ষা পুরা হইতে লাগিল, রাজপুত্রের দেহ বলদর্পিত ও বুদ্ধি কুটিল হইল এবং আচার্যের আশ্চর্য সংনম্যতার শিক্ষাবলে হূদয় বিনীত রহিল। দেবাদিদেবকে যেইরূপ শ্রদ্ধা করিতে শিখিলেন, দূরাত্মার তেমনই দর্পচূর্ণ করিতে শিখিলেন। ত্রিলোক ধন্য ধন্য করিতে লাগিল। রাজপুত্র পরম শ্রদ্ধায় গুরু ও গুরুপত্নীর সকল সাংসারিক কর্ম করিয়া দিতেন, কাঠ ফাড়িয়া চেলাই করিতেন, জল তুলিতেন, ঘর নিকাইতেন, এমনকি অন্ন-ব্যঞ্জন ও পদ্মবীজের ক্ষীর রাঁধিতেন। সকল কর্মে তাঁহার মন লাগিত কিনা, তাহা জগদীশ্বর বলিতে পারিবেন, জগদীশ্বরের সাক্ষ্য কেহ লয় না বলিয়া রাজপুত্র গুরুর রোষ হইতে বাঁচিয়া গেলেন বলা যাইতে পারে। শ্রদ্ধাবান ব্যতীত কেহ জ্ঞানলাভ করে না, নিষ্ঠার অভাব যাহাতে কিছুতেই গোচর না হয়, সেইমতো রাজপুত্র চলিতেন, দাসদাসীর কাজ বলিয়া ওই সকল কাজ ফেলিয়া রাখিতেন না। আচার্য তাঁহার গৃহকর্মে ও সেবায় তুষ্ট ছিলেন।
তপোবনে বসন্তোত্সব চলিতেছে, পলাশ ফুল ফুটিয়া প্রান্তরে যেন অগ্নিসঞ্চার করিয়া দিয়াছে। ঋষিবালকেরা বনফুল-দেবদারুপাতা এবং রাঙা পতাকায় আশ্রম সজ্জিত করিয়াছে, শাল্মলী পত্রের দোনায় করিয়া পুষ্পাঞ্জলি দিয়া ক্ষীরনদীর জলে ভাসাইতেছে। রাজপুত্রের মন সেদিন এহেন বালসুলভ আমোদেও লাগিতেছিল না, কর্মেও লাগিতেছিল না। আলস্য সকল দোষের আকর বলিয়া তিনি একসময় তাহা ত্যাগ করিলেন, কুটিরে আসিয়া দেখিলেন গৃহকার্য সমাধা হইয়া আছে। জল ঝারিতে তোলা রহিয়াছে এবং তাহাতে সুগন্ধি পত্র ভিজাইয়া রাখা আছে। কর্পূর ও বনফল দিয়া ক্ষীর রাঁধা রহিয়াছে। গোশালার নিকট রন্ধনের কাঠগুলি সুসমান করিয়া চিরিয়া স্তূপাকার করিয়া রাখা আছে। তাঁহার চমক লাগিয়া গেল। আচার্য বেলাবেলি আসিয়া তাঁহার কর্মপটুতা দেখিয়া ভূয়সী প্রশংসা করিলেন। রাজপুত্র গূঢ় কথা ভাঙিলেন না।
পরদিন তিনি ইচ্ছা করিয়া সূর্যদেব মধ্যাহ্নের রঙ ধরিলে গৃহকর্ম করিতে আসিলেন এবং আশ্চর্য হইয়া দেখিলেন, পুনরায় কর্মসকল সুসমাধা করা আছে। এইভাবে গুটিকয় দিবস কাটিল। রাজপুত্র মনে ভাবিলেন, ইহা মায়া না হইয়া যায় না। একদিন দ্বিপ্রহরে তিনি আচার্যের আহারের আয়োজন করিতে করিতে চক্ষুজলে তিতিয়া অদৃশ্যকে অনুনয় করিয়া কহিলেন, ‘তুমি যেই হও, এইভাবে আমার কাজ করিয়া দিয়া যাইও না, আমার সাধনা সম্পন্ন হইতে আর কিছুকাল বাকি। গুরু যদি জানিতে পারেন, তাহা হইলে আমার শিক্ষা অসম্পূর্ণ থাকিবে, এই বনবাস নিষ্ফল হইবে।’ সুমিষ্ট মঞ্জীরের ধ্বনি হইল, তিনি চমকিয়া তাকাইয়া দেখিলেন বসন্তসমীরে শিশুগাছের পাতাগুলি চঞ্চল হইয়া উঠিয়াছে।
রাজপুত্রের অনুরোধ মায়া শুনিল না। পরদিন আবার একই রূপে সকল গৃহকর্ম সুসম্পন্ন হইয়া রহিল। দিন শেষে গুরুর প্রসাদ খাইতে গিয়া রাজপুত্রের চক্ষে জল আসিল, তিনি ছল করিয়া সন্তর্পণে কহিলেন, ‘কৃপা করিয়া আপন পরিচয় দিয়া যাও। আমি তোমাকে আন্তরিক ধন্যবাদ দিব।’ পুষ্প ও মকরন্দের সুমিষ্ট বাসে কুটির আমোদিত হইল, বাতাস আর্দ্র হইয়া উঠিল, পরমাসুন্দরী এক যুবতী তাঁহার সামনে দৃশ্যমান হইল। যুবতী আকারে দীর্ঘকায়া, রত্নমালাখচিত কুচযুগ, কটি ক্ষীণবদ্ধ অথচ শরীরে বল ও ক্ষিপ্রতার ভঙ্গি রহিয়াছে। তাহার পায়ের সোনার মলে সামান্য অঙ্গসঞ্চালনেই শিঞ্জিনী ধ্বনিত হয়। মুখের ভাবখানি জ্যোত্স্না-কুমুদের ন্যায় ফুল— তাহার মুখখানার হাসি যেন নহবতখানায় সুর বাজাইয়া তুলিবে এখনই, কেশজাল মেঘের মতো বিস্তার করিলে বৃষ্টির আশঙ্কায় ময়ূর কলাপ মেলিবে। রাজপুত্র মনের শঙ্কা গোপন করিয়া তাহার পরিচয় জিজ্ঞাসা করিলেন, “কে তুমি স্বয়মাগতা? অপ্সরা না অপ্সরা-পরিত্যক্তা, রাজদুহিতা না রাক্ষসী?”
সুন্দরী সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারিল না, সেও একই ব্যাকুলতায় জিজ্ঞাসা করিল, কে তুমি স্বয়মাগতা? অপ্সরা না অপ্সরা-পরিত্যক্তা, রাজদুহিতা না রাক্ষসী?
রাজপুত্র দেখিলেন, এ তো বড় রঙ্গ। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘ভাঙিয়া বলিতে কী ভয়?’
সুন্দরীও প্রতিধ্বনি করিল, ভাঙিয়া বলিতে কী ভয়? এইবার তাহার মুখের হাসি মুছিয়া গিয়া চক্ষে শিশিরের মতো অশ্রু উদ্গত হইল। রাজপুত্র ভাবিলেন, এই তাহা হইলে মায়ারাক্ষসী? নাকি কোনো শাপগ্রস্তা ঋষিপত্নী? আপন দুঃখের কাহিনী স্মরণ করিয়া কাঁদিতেছে? ঋষিবালকদিগের মুখে তিনি কত গল্প শুনিয়াছেন, জলে আশ্রয় নেয়া কালকেয়রা বশিষ্ঠ মুনির আশ্রমে সাতশত ঋষিকে খাইয়াছিল, চ্যবন ঋষির আশ্রমের তিনশত এবং ভরদ্বাজ মুনির আশ্রমের বিশজন মুনিকে; জলে-স্থলে সর্বত্র ইহারা বিরাজমান, কাহার সাধ্য আছে ইহাদের অনিষ্ট হইতে পলায়ন করে? এতকাল অপ্সরার রূপের প্রশংসা শুনিয়াছেন, মায়ারাক্ষসীর রূপে যেন তাহার অধিক কিছু রহিয়াছে, ক্ষত্রিয়ের চোখে যেই তেজ দেখিতে ভালো লাগে, সেই তেজ।
এ স্থলে ডরে সাধারণ লোকের মূর্ছা যাইবার উপক্রম হইত, ঘরে তেলের প্রদীপ দপদপ, রাজপুত্রের মন ছব্ছব্... রাজপুত্র মনোভাব গোপনে রাখিয়া স্নেহবাক্য বলিলেন, ‘আমি তোমার নাম রাখিলাম গুণবতী।’
রহস্যময়ী তাহারও প্রতিধ্বনি করিল।
রাক্ষসীর মতিগতি ঠাহর করিতে রাজপুত্র যথাবিহিত সতর্কতা অবলম্বন করিলেন। কিছুকাল যাইতে তাঁহার মনে হইল, সূর্পনখার নাসিকা কর্তন করিয়া লক্ষ্মণ বড় একটি নির্দয় কর্ম করিয়াছেন, প্রেমার্থীকে ফিরাইয়া দিলেই সে আহতহূদয় হয়, তাহার ওপর এই শারীরিক লাঞ্ছনা! কেন বৃকোদর ভীম তো রাক্ষসীকে বিবাহ করিয়াছিলেন, রাক্ষসী ভিন্ন এহেন ক্ষত্রিয়ের রতিতৃষ্ণা মিটাইবে কে আর? হিড়িম্বানন্দনও তো বীরই হইয়াছেন। রাক্ষসী খারাপ কিসে? মনুষ্যসন্তানের হাড়মাস অম্বল রাঁধিয়া কেহ কি তাহাদের খাইতে স্বচক্ষে দেখিয়াছে? নাকি রাক্ষসী সতীনপোয়ের রক্ত চক্ষু দিয়া শুষিত, সতীনের ছেলেকে খাইতে দিয়া আপন মুখের লালা নিঃসরণ থামাইতে পারিত না, সপত্নীবাদ মানুষের সংসারে নাই? মনুষ্য পৃথিবীই কি রাক্ষসের হাট হইয়া উঠিতেছে না? ইহ পৃথিবীর মাতৃস্থানীয়াদের স্নেহ কি পূতনার স্তনের ন্যায় বিষময় হইয়া উঠিতেছে না?
গুণবতী প্রতিদিন আসিয়া রাজপুত্রের কাজ করিয়া দিয়া যায়। রাজপুত্র দুরন্ত গ্রীষ্মের উত্তাপে শিশুগাছতলায় নিদ্রা যাইতেছেন, স্বেদপাতে তাঁহার বসনধূলি কর্দমে পরিণত হইতেছে— ঘুমঘোরে শুনিতে পান মঞ্জীরধ্বনি, শীতল সুরভিত বাতাসে এবং স্তনচ্ছায়ায় তাঁহার দেহ জুড়াইয়া যায়, কে তাঁহার গায়ে হাত বুলায়-ঢুলায়, কে তাঁহার শরীর হইতে চোরকাঁটা তুলিবার মতন করিয়া ব্যারামকাঠি তুলিয়া ফেলিয়া দেয়, পদ্মগন্ধে নিদ্রাবিজড়িত হইয়া ঘুমের ভিতরই তিনি অস্ফুটস্বরে প্রশ্ন করেন, ‘কে জাগে, গুণবতী?’
আর একজন ফিসফিস করিয়া প্রতিধ্বনি করে, কে জাগে, গুণবতী? কই রাক্ষসীর গন্ধে তো তাঁহার নাড়ি উল্টাইয়া আসে না! রাজপুত্র নিঃসংকোচে গুণবতীর সমাদর গ্রহণ করেন, একদা যেরূপ সভয়ে তাহার সঙ্গ পরিহার করিতেন, সেইরূপ সতর্কতা আর কাজ করে না। ক্ষত্রিয়ের জীবনে আলস্য বিষবত্, রাজপুত্র তাহা সম্যক অবগত আছেন কিন্তু রাজপুরী হইতে আসিবার পর বহুদিন তিনি এইরূপ আদরযত্ন পান নাই, পুরুষ নারীর হস্তের আদর তত্কালেও ফেলিতে পারিত না। ঋষিবালকেরা আর তাঁহার সঙ্গসুখ তেমন লাভ করিতে পারিত না, ছাগল চরাইতে গিয়া গুনতিতে কম পড়িতেছে, পারাবতের জোড়া মিলিতেছে না, তালগাছে কেন আর পক্ষী আসিয়া বসে না— এইসব রাজপুত্র জানিতে পারিতেন না, জানিলেও তিনি কতটা শঙ্কিত হইতেন বলা যায় না। যাহা হউক, গুণবতীর যত্নে তাঁহার শরীর কমনীয় এবং শিথিল হইতে লাগিল, অন্তরেও যত্নের প্রচ্ছায়া গাঢ় হইল। কে এই রমণীরত্ন? কোন অপ্সরা তাহাকে ক্রোড়বঞ্চিত করিয়া বটমূলে ফেলিয়া গিয়াছিল? তাহার দুই চক্ষে কোন ঋষির একাগ্র ধ্যান ভাঙিবার বেদনা? কিসের নিমিত্ত দিবারাত্র এক করিয়া গুণবতীর এই প্রেমসাধনা? প্রতিধ্বনির সহিত প্রেমালাপ তাঁহারই বা কত দিন ভালো লাগিবে? যাহা কিছু করিতে রাজপুত্রের রুদ্ধশ্বাস পরিশ্রম করিতে হয়, তাহা এত স্বল্প আয়াসে কেমন করিয়া গুণবতী সুসম্পন্ন করে? অপরের প্রতি বেদনা প্রেমের ক্ষেত্রকে প্রস্তুত করে, জলসেচনে যেমন করিয়া কৃষিক্ষেত্র প্রস্তুত হয়। বেদনার সহিত মিশিল কামনা, গুণবতীর দেহ দেবলোকের অসামান্য প্রসাদধন্যা। রাজপুত্র প্রলয়ের পথে ভাসিয়া গেলেন।
রাজপুত্রের দীক্ষা শেষ হইয়াছে, রাজপুরীতে ফিরিবার সময় হইল। রাজপ্রাসাদের হাজার ধাপে সুবর্ণকলসে গোছা গোছা ফুল সাজানো হইতেছে, প্রাসাদের সম্মুখের পথের ধুলায় চন্দন মিশাইয়া জল সেচন করা হইতেছে, গৃহচূড়ায় ও পথে মশাল জ্বলিতেছে, লক্ষ কাড়া লক্ষ ঢোল বাজিয়া উঠিতেছে, রাজপুত্রের চক্ষে ঘুম নাই, গুণবতীকে ফেলিয়া তিনি কী করিয়া যাইবেন? পাষাণ প্রাসাদে এই মায়ারাক্ষসীকে কে বুঝিবে? মায়ারাক্ষসী না হইয়া যদি এ অপ্সরার ক্রোড়জাত কন্যা হইয়া থাকে? একদা মাতৃপরিত্যক্তা হইয়া হয়তো সে জগতের উদ্বৃত্ত প্রীতিতে প্রতিপালিত হইয়াছে, আজ প্রেমাষ্পদও তাহাকে পরিত্যাগ করিয়া যাইবে? অসহায় যুবতীর দুঃখে বড় বেদনায় তাঁহার চক্ষে জল আসিল, অশ্রুমোচন করিতে তিনি আশ্চর্য হইয়া দেখিলেন গুণবতী কথা কহিতেছে, এইবার প্রতিধ্বনি নহে। কী তাহার ভাষা, কী ভঙ্গিমা! বৈদর্ভী এমন করিয়া কথা কহিতে পারিতেন কিনা সন্দেহ! রাজপুত্র সম্মোহিতের ন্যায় বাকসিদ্ধার কথা শুনিলেন। বাগবলে সাবিত্রী ধর্মরাজকে হারাইয়াছিলেন, সত্যবানকে ফিরাইয়া আনিয়াছিলেন, নারীর বাগ্মিতা এমনই শক্তিধর।
গুণবতী আপন সুন্দর স্বভাবে সুললিত বচনে আপনার কাহিনী বয়ান করিয়া গেল, সে পরিত্যক্তা নয়, পরিত্যাজ্যাও নয়, শাপগ্রস্তা। কামার্ত ঋষিকে একদা সন্ধ্যার যমুনার তীরে ফিরাইয়া দিয়াছিল গুণবতী, ঋষির বীর্যধারণ করিয়াছিল বীজপ্রসূ ধরিত্রী। ক্রুদ্ধ ঋষি একটায় পঁচিশটা হইয়া অভিশাপ দিয়া গেলেন, গুণবতীর কথা বলিবার ক্ষমতা হারাইয়া গেল, কণ্ঠ হইতে প্রসন্নকর সংগীত কোথায় গেল, ইহজগতে নিঃশব্দ মনোরম ছায়া ব্যতীত সে আর কিছুই রহিল না। তাহার আকুল ক্রন্দনে তিতিবিরক্ত হইয়া ঋষি বর দিলেন, ‘আচ্ছা তোমার প্রতিধ্বনি করিবার ক্ষমতা রহিবে, যে কেহ যাহাই বলুক, তুমি তাহার প্রতিধ্বনি করিতে পারিবে, সূতাশঙ্খের শঙ্খনাদও নকল করিতে পারিবে!’ হায় হায়, এত দিনের বাগেদবীর সাধনা কেবলই প্রতিধ্বনিতে পর্যবসিত হইবে? গুণবতীর কান্না থামাইতে অবশেষে ঋষি বর দিয়া গিয়াছিলেন যে, কাহারও পরম ভালোবাসায় বিগলিত অশ্রুচয়ই তাহার মুখের কথা ফিরাইয়া দেবে। ঋষির বরদানও হইল, শাস্তিবিধানও হইল। বর শুনিয়া গুণবতী দ্বিগুণ কাঁদিয়াছিল, তপ্তকাঞ্চনবর্ণা স্তনভারনম্রা বরারোহা স্ত্রীলোককে কে প্রকৃত ভালোবাসা দিবে? কামনার ইন্ধন দিবার ষড়যন্ত্র করিয়া স্বয়ং ঈশ্বর তাহাকে গড়িয়াছেন।
রাজপুত্র এইসব শুনিতেছেন, আর ভাবিতেছেন— প্রাণ ভরিয়া যে মুখের সলজ্জ সুষমা দেখিতেন, আধো প্রতিধ্বনি শুনিতেন, সেই মুখের বিদ্যাগর্ভ সুললিত বাণী শুনিয়া তাঁহার আপন বিদ্যার গরিমায় ঠেস লাগিতেছে। যাহা কিছুর আভাসমাত্র ছিল, যাহা কিছু মধুর ও বিধুর ঠেকিত, তাহার সব ভাস্বর হইয়া যেন আপনার জ্যোতিতে জ্বলিতেছে। এমনকি গুণবতীর চক্ষুর ভাবও যেন বদলাইয়া গিয়াছে, সেই মুক্তাফলের আভা নাই, বুদ্ধির তেজে সতেজকৃষ্ণ যুগল চক্ষু— ইহাদিগে দিশাহারা নাবিকের ঠাঁই নাই, নিস্তার নাই, সপ্তডিঙ্গা ডুবিয়া যাইবার গহীন ঘূর্ণি রহিয়াছে। গুণবতী রাজপুত্রের দক্ষিণহস্ত ধরিয়া ধীরগম্ভীর ভাষায় আপনার প্রীতি ব্যক্ত করিতেছে, হর্ষালাপের সময় তাহার কেশলহরী গণ্ডে আসিয়া পড়িতেছে, রাজপুত্রকে সে আড়াল হইতে কত দিন ধনুকে জ্যা রোপণ করিতে দেখিয়া ভালোবাসিয়াছে, কত দিন গুরুর হস্তে শিষ্যের লাঞ্ছনায় সেও কাঁদিয়াছে আর আচার্যের শিক্ষা দেখিতে দেখিতে সেও ধনুর্বিদ্যায় পটুত্বলাভ করিয়াছে। যাহা কিছু রাজপুত্র নির্ঘুম রজনীর ক্লেশ স্বীকার করিয়া শিখিয়াছেন, তাহার সকলই গুণবতী শিখিয়াছে। শুধু অগ্নিবাণ ছুড়িবার বিদ্যা ছাড়া বাণ ছুড়িবার সকল পন্থা গুণবতী আড়াল হইতে অদৃশ্য হইয়া শিখিয়া ফেলিয়াছে। প্রিয় প্রসাদ হিসেবে এই বিদ্যাও সে রাজপুত্রের অনুগ্রহে লাভ করিতে পারে—
কথার তোড়ে ভাসিয়া যাইতে যাইতে হঠাত্ শির উদ্যত করিয়া রাজপুত্র জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘তুমি কি ভাবিয়াছ আমি মায়ারাক্ষসী চিনিতে পারি না? তুমি শাপগ্রস্ত মনুষ্যা হইলে অদৃশ্য হইতে কী রূপে? আপন ইচ্ছায় দৃশ্যমানই বা হইতে কী করিয়া?’
দুগ্ধের সরল ধারায় ঝকমক করিতে করিতে যেন গরল মিশিল। গুণবতী সবিস্ময়ে তাঁহার দিকে চাহিয়া রহিল, ততক্ষণে তূণীর হইতে তীর বাহির হইয়া গিয়াছে— তাহা আর তীরন্দাজের নিকট ফিরিবে না। রাজপুত্র যেমন ভাবিয়াছিলেন, তেমন করিয়া কই রাক্ষসী আপন সংহারমূর্তি ধারণ করিল না তো। রাক্ষসী এতকাল রাজপুত্রকে যে শূলপক্ক ছাগাদি খাওয়াইয়াছে, কই তাহাদের নাম ধরিয়াও ডাকিয়া উঠিল না, ছাগরূপী রাক্ষস কই রাজপুত্রের পেট চিরিয়াও বাহির হইয়া আসিল না। গুণবতী স্তব্ধ হইয়া রইল।





