“আমি এখন জীবনের সেই সময়পর্বে প্রবেশ করেছি, যাকে প্রখ্যাত লেখক আলবেয়ার কাম্যু তার কালজয়ী গ্রন্থ ‘দ্য মিথ অব সিসিফাস’-এ অনবদ্য ভঙ্গিমায় বলেছেন: আলো-আঁধারে মাখা এ এমন এক সংবেদী সময়, যখন মানুষ তার ফেলে আসা জীবনের দিকে বারে বারে ফিরে দেখতে চায়, পরিমাপ করতে চায় স্মৃতিপটে অক্ষয় হয়ে থাকা সেইসব ঘটনাবলি, যার দ্বারা নির্ধারিত হয়েছে তার জীবনের পথ চলা এবং অচিরেই মৃত্যুর মাঝে যার যবনিকা পতন ঘটবে।” এ বর্ণনা দিয়ে যিনি কিছু লেখা শুরু করছেন, তিনি যে আমআদমি নন, সেটা বুঝে নিতে বেগ পেতে হয় না। নিজের আত্মকথা লিখতে গিয়ে এভাবেই শুরু করেছেন ঔপনিবেশিক ভারতের একজন ইংরেজ আইসিএস অফিসার মাইকেল ক্যারিট। ক্যারিটের এ আত্মজীবনী প্রকাশিত হয় আ মোল অন দ্য ক্রাউন নামে। ক্যারিট ঠিক আর ১০টা ইংরেজ আইসিএস অফিসারের মতো ছিলেন না। ব্রিটিশ রাজের সবচেয়ে অভিজাত ও ক্ষমতাশালী আমলাদের একজন হয়েও মানুষটা ছিলেন কমিউনিস্ট। সরকারি দায়িত্ব পালনকালেই গোপনে যুক্ত থেকেছেন ভারতের কমিউনিস্টদের সঙ্গে, দিনের আলোয় সরকারের দায়িত্ব পালন করতেন আর রাতের আঁধারে করতেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির গোপন কাজ। একজন প্রথম শ্রেণীর ঔপনিবেশিক আমলার জন্য কাজটা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল, তা বোধহয় আর বলার অপেক্ষা থাকে না। উপরন্তু, নিজের সরকারি ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে কমিউনিস্ট পার্টিকে বহু গোপন খবর পাচার করে অনেক বিপদ থেকে রক্ষা করেছিলেন। ক্যারিট পেশাগত জীবনে মূলত দায়িত্ব পালন করেছেন অবিভক্ত বাংলায়। ১৯৩০-এর দশকের শুরুর দিকে তিনি বাংলায় তার চাকরিজীবন শুরু করেছিলেন— ‘একেবারে আনকোরা একজন আইসিএসের কাছে বঙ্গ প্রদেশে পোস্টিং পাওয়াটা খুব একটা সুখকর ব্যাপার ছিল না। কারণ এ প্রদেশের জলবায়ু ও প্রতিবাদী মানুষজনের জন্য নবাগতরা এখানে আসা পছন্দ করতেন না। ...কার্যত সফল প্রার্থীদের তালিকায় সবচেয়ে তলার দিকে যাদের নাম থাকত, তাদেরই বাংলায় পাঠানো হতো।’ টাঙ্গাইল ছিল তখন জলমগ্ন এক ভূখণ্ড— ‘টাঙ্গাইলে সামজিক জীবন বলে কোনো কিছু ছিল না; ক্লাব নেই, আমোদ-প্রমোদের কোনো ব্যবস্থা নেই, নেই বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষজনের মধ্যে মেলামেশার কোনো ক্ষেত্র।’ তবে ক্যারিটের বর্ণনায় সে সময় টাঙ্গাইলের রাজনৈতিক আবহাওয়া ছিল উত্তপ্ত। তার দায়িত্ব পালনকালে কোনো বড় আন্দোলন না হলেও পুলিশ ভীত-সন্ত্রস্ত থাকত। সরকারি প্রতিবেদনে টাঙ্গাইলে অন্তর্ঘাতের আশঙ্কা ছিল।
তত্কালীন পূর্ব বাংলায় ময়মনসিংহ জেলার টাঙ্গাইল মহকুমার প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। কলকাতায় যখন ক্যারিট কমিউনিস্ট পার্টির গোপন কাজ করেছেন, তখন তাকে সহায়তা করেছিলেন কলকাতার বিশপের প্রধান সহকারী রেভারেন্ড মাইকেল স্কট। এক ইংরেজ প্রশাসক ও গির্জার অন্যতম ব্যক্তি একত্রে কাজ করেছেন ভারতীয়দের পক্ষে, ভারতে ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে ইতিহাসে একে বিরলতম নজির বললে নিশ্চয়ই অতিকথন হবে না।
ক্যারিটের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম নেতা কমরেড মুজফ্ফর আহেমদ এবং পি. সি. জোশী, বি. টি. রণদিভের মতো নেতাদের। তার আগেই সাক্ষাত্ হয়েছিল বিখ্যাত তাত্ত্বিক ও ব্রিটিশ কমিউনিস্ট পার্টির নেতা রজনী পাম দত্তের সঙ্গে। লন্ডনের অভিজাত পরিবারের সন্তান হয়ে ঔপনিবেশিক ভারতে প্রথম শ্রেণীর আমলার চাকরি নিয়ে কমিউনিস্ট পার্টির কাজ করাটা নেহাত সামান্য নয়। ‘ছিলাম অক্সফোর্ড-ক্যামব্র্রিজ আভিজাত্যের মোড়কের মাঝে সংস্কারের নিষ্ঠাবান অনুগামী; আর হয়ে গেলাম ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন, বিশেষ করে কমিউনিস্ট পরিচালিত ট্রেড ইউনিয়ন এবং কৃষক সভার সক্রিয় কর্মী। না, কোনো গুরুর ছোঁয়ায় হঠাত্ এই পরিবর্তন নয়। ব্যাপারটা খুব সহজও ছিল না। আমার বেড়ে ওঠা, আমার সামাজিক পরিবেশ ও চৈতন্যের গভীরে বাসা বেঁধে থাকা নানা সংস্কারের সঙ্গে চলমান জীবন ও ঘটনাবলির অবিরাম সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে এই উত্তরণ ঘটেছে।’ ক্যারিটের কথাই সাক্ষ্য দিচ্ছে, তিনি কোনো রোমান্টিক বা শৌখিন বিপ্লবী ছিলেন না। বরং সমাজজীবনের বিভিন্ন দ্বন্দ্বের অভিঘাতই তাকে কমিউনিস্ট হিসেবে গড়ে তুলেছিল। দুনিয়ায় কমিউনিস্ট সংগ্রামের অভিধানের একটি বহুল ব্যবহূত শব্দ ‘আন্তর্জাতিকতাবাদ’। মাও জে দুংয়ের নেতৃত্বে সংঘটিত চীন বিপ্লবে কানাডীয় চিকিত্সক নর্মান বেথুনের ভূমিকা দুনিয়ায় খ্যাত হয়ে আছে। মাইকেল ক্যারিটও ছিলেন একজন প্রকৃত আন্তর্জাতিকতাবাদী। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির হয়ে কাজ করার সময় তার ছদ্মনাম ছিল ‘বসির’। নিজের জীবন ও চাকরির ঝুঁকি নিয়েই তিনি ভারতের কমিউনিস্টদের সহায়তা করেছেন। তবে এতসবের পরও ক্যারিট ভারতীয় কমিউনিস্টদের কাছে উপেক্ষিতই রয়ে গেছেন, ফলে ইতিহাসে তাকে সেভাবে খুঁজে পাওয়া যায় না। ক্যারিটের আত্মজীবনীর অনুবাদক ও পশ্চিমবঙ্গের কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত থাকা শ্যামল সেনগুপ্ত তাই ক্ষোভের সঙ্গে লিখেছেন, “ক্যারিটের মাধ্যমে প্রাপ্ত একান্ত গোপনীয় সংবাদ এবং তাঁর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পার্টির তদানীন্তন নেতৃত্ব যে কতবার বিপদ এড়াতে সক্ষম হয়েছেন এবং গোপনে কাজকর্ম চালাতে পেরেছেন ও আন্তর্জাতিক নেতৃত্বের সঙ্গে সংযোগ রক্ষায় সমর্থ হয়েছেন তার হিসাব কে রাখে! হিসাব রেখেছিল ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা দপ্তর। তারই পরিণামে একরকম বাধ্য হয়ে বিষণ্ন মনে ক্যারিটকে এ দেশ ছাড়তে হয়েছিল। ব্যবহার করে ফেলে দেওয়ার একটা অলিখিত নীতিহীন নীতি বহুকাল ধরে এদেশের কমিউনিস্ট পার্টিতে চলে আসছে। ক্যারিটও সম্ভবত তারই শিকার হয়েছিলেন। তাঁর আনীত বহু মূল্যবান ‘পাউন্ড’ গ্রহণ করা যায়, তাঁকে বহু কঠিন কাজে ব্যবহার করা যায়। পার্টির অভ্যন্তরীণ মতাদর্শগত সংগ্রামে তাঁকে কাজে লাগানো যায়, সর্বভারতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদকের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ক্যারিটের বাসাকেই বেছে নেওয়াও যায়, বোম্বের জুহু বিচের বালুকাবেলায় বসে পার্টির সর্বোচ্চ নেতারা ক্যারিটের সঙ্গে বিশ্বের তদানীন্তন পরিস্থিতি ও আগামী কর্মসূচি নিয়ে আলোচনাও চালাতে পারেন, মন রাখার জন্য তাঁকে উপদেষ্টা হিসেবে উল্লেখও করা যায়, ক্যারিটের লিখে দেওয়া পার্টির কৃষক ফ্রন্টের প্রতিবেদন ফ্লাউড কমিশনের কাছে পেশ করাও যায়, তবু তাঁকে বিশ্বাস করা যায় না, অন্তরের অন্তস্তল থেকে গ্রহণও করা যায় না!”
ক্যারিটের জীবনদর্শন পরিবর্তিত হয় টাঙ্গাইলের মহকুমা প্রশাসক হিসেবে কাজ করার সময়— ‘ঠিক কবে কোন তারিখে আমার মনের এই আমূল পরিবর্তন ঘটে গেল, আজ আর তা ভালোভাবে মনে পড়ে না। তবে সেটা সম্ভবত ১৯৩৪ সাল। সে সময়ও আমি টাঙ্গাইলের মহকুমা প্রশাসক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছি। সেই ক্লান্তিকর দীর্ঘ বর্ষণমুখর দিনগুলোতে গভীর চিন্তাস্রোতের শেষে সকল দ্বিধাদ্বন্দ্বের অবসানে আমার জীবনে নতুন সূর্যোদয়ের সূচনা হয়।’ এ নতুন সূর্যোদয় ছিল কমিউনিস্ট মতাদর্শে দীক্ষিত হওয়া। অক্সফোর্ডে উচ্চশিক্ষা নেয়া ক্যারিট তখনো মার্ক্স-লেনিন পড়েননি— “অক্সফোর্ডের চূড়ান্ত পরীক্ষায় অবশ্যই ‘রাজনৈতিক তত্ত্ব’ পড়েছি। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে তখনো অক্সফোর্ডের কর্তারা মার্ক্সকে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রবেশাধিকার দেননি।” এ সময় লন্ডনে বসবাসরত ক্যারিটের ভাই তাকে বইপত্র পাঠাতেন। আর ক্যারিট আইসিএস অফিসার হওয়ায় তার কাছে আসা পার্সেল পুলিশ পরীক্ষা করত না। কারণ মার্ক্স-লেনিনের বই তখন ভারতে নিষিদ্ধ। ‘এ দেশবাসীর মাথা যাতে বিগড়ে না যায় সেজন্য এই সময়ে ভারতে শুধু মার্ক্স বা লেনিনের বইপত্রই নিষিদ্ধ ছিল না, প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল অধ্যাপক হ্যারল্ড লাস্কি, কোল প্রমুখ সমসাময়িক সমাজতান্ত্রিক ভারধারার বিশিষ্ট চিন্তাবিদদের রচনাও।’ অর্থাত্ ক্যারিট তখন সরকারি কর্মকর্তা হয়ে আইন ভাঙা শুরু করে দিয়েছেন।
১৯৩৪ সালের শরত্কালে ছুটি নিয়ে টাঙ্গাইল থেকে দেশে ফিরে যান ক্যারিট। এবং প্রকৃতপক্ষে এই সফর ছিল তার কমিউনিস্ট হওয়ার যাত্রা। টাঙ্গাইলের অভিজ্ঞতা ক্যারিটকে নাড়া দিয়েছিল। তিনি লিখছেন, “প্রায় সমাজবিচ্ছিন্ন অবস্থায় দীর্ঘদিন কাটিয়ে টাঙ্গাইল ছেড়ে যখন চলে যাচ্ছি তখন অনেক বেশি বেদনা অনুভব করলাম। কারণ টাঙ্গাইলে আমি ছিলাম মানুষের অনেক কাছাকাছি, হয়তো ভারতবর্ষের হূদয়কে স্পর্শও করতে পেরেছিলাম। ...বিগত ১৮ মাসে ভারতের হতভাগ্য মানুষগুলিকে আমি যতটা জানতে বা বুঝতে পেরেছি তা এর আগে তথাকথিত ‘শিক্ষানবিশি’ কালে সম্ভব হয়নি। যত আমি এ দেশবাসীর সংস্পর্শে এসেছি ততই এইসব দুঃখী মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে উঠেছি। সমব্যথী হয়েছি। অথচ, আশ্চর্যের কথা হলো এই যে, প্রকৃত অর্থে টাঙ্গাইলে আমার কোনো বন্ধু ছিল না। সরকারি কাজের ক্ষেত্র ছাড়া আমি কোনো ভারতীয় ব্যক্তির সঙ্গে কথাও বলতাম না। চারদিকের পরিবেশটাও ছিল বৈরী ও সন্দেহে ভরা, কেমন যেন থমথমে। এর মাঝেও যার কথা আমার বারবার করে মনে আসে এবং যাকে আমি বন্ধু বলেই মনে করতাম, তিনি হলেন সেই যোগেনবাবু। মজার কথা, কোর্টের বাইরে কোনোদিন তার সঙ্গে একবারও আমার বাক্যবিনিময় হয়নি। ...তাই যখন টাঙ্গাইল ছেড়ে ছুটিতে চলে যাচ্ছি তখন আমার মনে একটা মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। ...আমি অনুভব করলাম যে এবার এই সুন্দর দেশটির জনসাধারণের জন্য আমাকে কিছু কাজ করতেই হবে। আমি জানতাম এ কাজ করতে গেলে সরকারি অফিসার হিসেবে আমার ওপর যে দায়িত্ব রয়েছে, তার সঙ্গে সংঘাত সৃষ্টি হবেই।
কিন্তু তার জন্য আমি মোটেই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিলাম না। কারণ ইতিমধ্যেই আমি ঝুঁকির সমুদ্রে অবগাহন করতে শুরু করে দিয়েছি। আমি এখন ইউরোপে ফিরে যাচ্ছি। সেখানে ইতিমধ্যেই হিটলার তার ঘৃণ্য পাগলামি শুরু করে দিয়েছে এবং আমার সব বন্ধু ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন।” ছুটি কাটিয়ে ১৯৩৬ সালে ক্যারিট ভারতে ফিরে আসেন। ছুটিতে থাকার সময় তিনি তার ভাইয়ের বামপন্থী বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এভাবেই তার সঙ্গে পরিচয় হয় মীরাট ষড়যন্ত্র মামলার আসামি বেন ব্রাডলের। এই ব্রাডলেই ক্যারিটকে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা করে দেন। ক্যারিটকে একটা পরিচয়পত্র দেয়া হয় এবং সঙ্গে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের কিছু বিতর্ক বিষয়ক দলিলাদি ধরিয়ে দেয়া হয় ভারতের পার্টির কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য। ব্রিটিশ কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে ক্যারিটকে বোম্বের বাজারের এক ফটোর দোকানে গিয়ে সাংকেতিক নামে একজনকে খোঁজ করতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। এভাবেই শুরু হয় ক্যারিটের ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে কাজ করা।
১৯৩৭ সালে বোম্বের জুহু সৈকতে ক্যারিট এক গুরুত্বপূর্ণ গোপন সভায় উপস্থিত ছিলেন। সেই সভায় ছিলেন অজয়কুমার ঘোষ, যিনি পরবর্তীতে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন। এ বৈঠকে আরো একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা উপস্থিত ছিলেন, যার পরিচয় সে সময় ক্যারিটকে দেয়া হয়নি এবং ক্যারিট পরবর্তীতে তার পরিচয় জানতে পারলেও তা তিনি কখনো প্রকাশ করেননি। এ বৈঠকে কমিউনিস্ট পার্টির সাংগঠনিক কর্মপদ্ধতি এবং দুনিয়ায় ঘনিয়ে ওঠা ফ্যাসিবাদী আক্রমণের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। আলোচনাটি অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ সেই অজ্ঞাত পরিচয় নেতার একটি বিশেষ মন্তব্যের কারণে, যা ক্যারিট তার আত্মকথায় তুলে ধরেছেন। সেই নেতা সেদিন বলেছিলেন, ‘এখন আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় বিপদ হয়ে দেখা দিয়েছেন ভারতীয় কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সভাপতি পদে সদ্যনির্বাচিত সুভাষচন্দ্র বসু। জাতীয় মুক্তি আন্দোলন এবং বিশেষ করে বাম আন্দোলনের পক্ষে তার বর্তমান ভূমিকা বিশেষ বিপজ্জনক। বিভিন্ন দিক থেকে তার অনন্যসাধারণ আত্মত্যাগ এবং বিশেষ যোগ্যতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠে না। মাত্র কিছুদিন আগে গোপনে তিনি হিটলার ও মুসোলিনির সঙ্গে যোগাযোগ করে আগামী দিনে যদি ইউরোপে যুদ্ধ বাধে, সেক্ষেত্রে ভারতের জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম কী ভূমিকা নিতে পারে তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। ...ফ্যাসিজমের সঙ্গে সহযোগিতার পথ জাতীয় মুক্তির পথ নয়, সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠনের পথ তো নয়ই। ...সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শাসনকে উত্খাত করার জন্যও হিটলার বা মুসোলিনির সঙ্গে কোনো রকম সমঝোতা চলতে পারে না।’
সেদিনের সেই আলোচনার পর ক্যারিট ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। কিন্তু বুঝতে পারছিলেন তার চাকরি এবং গাত্রবর্ণ তাকে ভারতে ভালোভাবে কাজ করতে দেবে না। অন্যদিকে তার দুই ভাই স্পেনে ফ্যাসিবাদবিরোধী যুদ্ধে যোগ দিয়েছেন এবং একজন শহীদ হয়েছেন। ‘এ অবস্থায় আমি ভারতে বসে যা করছিলাম তা আমার বিচারে ছিল একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক এবং সম্ভবত এর কোনো মূল্যও ছিল না।’ তাই ১৯৩৮ সালের গ্রীষ্মকালে তিনি ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস থেকে পদত্যাগ করেন। এর পর দেশে ফিরে সরাসরি রাজনীতিতে যোগ দেন। ১৯৪০ সালে তার পেনশন বন্ধ করে দেয়া হয়। কারণ হিসেবে বলা হলো, তার কাজকর্ম ‘চাকরি বিধি’র সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
শেষ বয়সে ক্যারিটের দৃষ্টিশক্তি লোপ পায় এবং দুর্ঘটনায় তার এক পা পঙ্গু হয়ে গিয়েছিল। সে রকম অবস্থায় তিনি তার আত্মজীবনী লিখতে শুরু করেন। আ মোল অন দ্য ক্রাউন নামে তার আত্মজীবনীটি প্রকাশ হয় ১৯৮৬ সালে। ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ নেতা ও পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী প্রয়াত জ্যোতি বসুর সঙ্গে ক্যারিটের যোগাযোগ ছিল। জ্যোতি বসু ক্যারিটের আত্মকথা বাংলায় অনুবাদের জন্য আগ্রহী ছিলেন। তবে গ্রন্থটির বঙ্গানুবাদ প্রকাশ তিনি আর দেখে যেতে পারেননি।
শ্যামল সেনগুপ্ত কর্তৃক মাইকেল ক্যারিটের আত্মজীবনী আ মোল অন দ্য ক্রাউন গ্রন্থের বঙ্গানুবাদ ‘গন্ধমূষিকপুরাণ: এক কমিউনিস্ট আইসিএস’-এর আত্মকথন অবলম্বনে





