পালপাড়া নামে ঢাকায় কোনো হিন্দু বস্তি ছিল না, যাতে মার্চ মাসে পাকিস্তানিরা আগুন দেয়: নগর কর্তৃপক্ষ

নগর কর্তৃপক্ষ জানাচ্ছেন, ময়মনসিংহ রোডের পাশে পালপাড়া নামের একটি হিন্দু অধ্যুষিত যে বস্তি ছিল বলা হচ্ছে, তা সঠিক নয়। তবে বেগুনবাড়ী খালসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে কিছু নমঃশূদ্র মানুষের বসবাস ছিল। এতে পাকিস্তানি বাহিনী  মার্চের রাতে আগুন দেয়। এখানে মৃত্যুরও খবর জানা যায়। তবে যারা পালপাড়ায় পরিচিত ও অপরিচিতদের ইদানীং দেখেছেন, যারা ওই রাতে মারা গিয়েছিল তাদের জানানো যাচ্ছে, পালপাড়া বলে কোনো স্থান আগেও ছিল না, এখনো নেই। অন্য ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের কোনো মন্তব্য নেই।

পালপাড়া 

সৈন্যরা আগুন দিতে এলে বস্তিবাসী হৈ-হল্লা শুরু করে দেয়। কিন্তু কাঁচা আগুনের আওয়াজে সব চিত্কার চাপা পড়ে যায়। মানুষজন বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে পালিয়ে যেতে থাকে মগবাজারের দিকে। কয়েকজন আগুনে ঝলসে মারা যায়। হারান পাগলার অনেক নেশা ছিল, তাই সে যায়নি। পরে পুড়ে গেছে বলে তার লাশের চিতারও প্রয়োজন হয়নি।

পাকিস্তানি বাহিনী

পালপাড়ার বাসিন্দা অনেক বেশি হওয়ায় বিশেষ কামিজ পরা সৈন্য আনা হয় লাহোর থেকে। কিন্তু তারা মৃত হিন্দুদের মারতে আপত্তি জানায় এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ না থাকায়। 

নিম্নাঞ্চল

সব সময় কাজের লোক পাওয়া যায় না বিধায় দিলু রোডের অনেক বাসিন্দাই পালপাড়ায় কাজের লোক খুঁজতে যায়। যারা এখনো ওখানে রয়ে গেছে নর্দমা ও জলাশয়ের মধ্যে ঘোরাঘুরি করে, তারা পুরান দামে আগের বাসাবাড়িতে এসে ঠিকা কাজ করে দেয়। খেতে দিলে খায় না, টাকা নেয় না, কেবল মাঝে মধ্যে গাঁজার ধোঁয়া টানে স্বাদ হলে।

নমঃশূদ্র

মরণচন্দ্র দাশকে প্রথম পাগলা কুকুর কামড়ায় ১২ বছর বয়সে। পেটে ১৪টা ইনজেকশন নেয়ার কথা থাকলেও তার ১৩টা নিয়ে সে দেশে চলে যায়। পরে ফিরে এসে আবার ১৪টা নিতে হয়। সে আর কোনো দিন এই ভয়ে দেশে যায়নি। পরে দেশের নাম-ঠিকানা ভুলে যায়। যে বাড়িতে সে মেথর ছিল, তাদের দরজায় কড়া নেড়ে সে গ্রামের নাম জিজ্ঞাসা করে। কিন্তু তারা বলতে পারেনি। দয়ালু ওই বাড়ির মালিক একটি বড় মাইক্রোবাস ঠিক করে, পালপাড়ার সবাই যাতে ওটাতে চড়ে ওপারে চলে যেতে পারে আরামে। কিন্তু মরণচন্দ্র দাশ যায়নি।

পরিচিত

দিলু রোডের মাজারের খাদেম জানায়, পালপাড়ার মানুষের উচ্চৈঃস্বরে কথাবার্তায় তার রাতের ঘুমের ব্যাঘাত হয়। সে একটা চায়ের কাপে পানি ভরে ওদের গোসল করতে বলে। ওরা তাতে ডুব দেয়। পানিতে ভেসে ভেসে এদিক-ওদিক সাঁতার কাটে, খাদেমের নিদ্রা উত্তম হয়। রাতে তার বাড়ি থেকে ঠুনঠান আওয়াজ ভেসে আসে।

পালপাড়া

মগবাজার দিয়ে ছেলেটা তাড়া খেয়ে পালাচ্ছিল। কিন্তু পিছনে লাগা মানুষজন তাকে ছাড়ছিল না। দিলু রোডের কাছে মরণচন্দ্র দাশের সঙ্গে দেখা হলে ছেলেটা জিজ্ঞাসা করে,  ‘পালাব কই?’ মরণ বলে, ‘হারানের সঙ্গে থাকতে পার, ওকে কেউ খুঁজে পায় না। টানায় থাকে, মরা শিমুলগাছের তুলা খায় এদিকে এসে। আর মাসে একবার আকাশে যাওয়ার মাইক্রোবাস পাওয়া যায়। ওখানে ভালো খেতে দেয় শুনেছি। অনেকে আসা-যাওয়া করে। তবে আমি যাই না। গ্রামের নাম ভুলে গেছি তাই।’