দারোগাগিরির শুরু

প্রাচীন যুগে বঙ্গদেশে পুলিশ তথা অভ্যন্তরীণ সমাজজীবনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত কোনো বাহিনী ছিল কিনা, সে ব্যাপারে সুস্পষ্ট তথ্য সেভাবে ইতিহাস-পুস্তকে পাওয়া যায় না। সুলতানি আমল থেকে প্রতিটি পরগনাকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আকারে ভাগ করে সেসব ভগ্নাংশ-এলাকাকে ‘থানা’ আখ্যা দিয়ে সেখানে ‘থানাদার’ পদধারী দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ও অস্ত্রধারী পদাতিক সিপাহি নিযুক্ত করা হয়েছিল। কার্যত সেই সময় থেকেই অবিভক্ত বাংলায় একটি সুসংগঠিত পুলিশি ব্যবস্থা গড়ে ওঠার শুরু— এমনটা বলা তাই অত্যুক্তি হবে না। পরে মোগলাই জামানায় থানাদার-সিপাহিরা রাতের বেলায় বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তার স্বার্থে টহল দিতেন ও প্রয়োজনে সন্দেহভাজন অপরাধীদের ঘরবাড়ি তল্লাশি করতেন— এমন তথ্যও মেলে। তবে তখনও তা ছিল মূলত দরবারি ও বিচারিক— প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত একটি শাখামাত্র। স্বতন্ত্রভাবে গড়ে ওঠার সুযোগ তার ঘটেনি।

১৭৫৭-র পালাবদল ও বাংলায় ইংরেজদের কর্তৃত্ব স্থাপনের পরও পুলিশ প্রশাসন একটি স্বতন্ত্র ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে সময় নিচ্ছিল। কোম্পানি অধিকৃত ভারতের দুই গভর্নর জেনারেল— ওয়ারেন হেস্টিংস ও লর্ড মার্কুইস চার্লস কর্নওয়ালিসের উদ্যোগে বিবিধ আইনি সংস্কার সাধিত হওয়ার পর এবং বিচার বিভাগের আমূল পরিবর্তনের ফলে পুলিশি ব্যবস্থা একটা আপাত নিটোল আকার ধারণ করে। যদিও এর মধ্যে ফাঁকফোকর কম ছিল না, তবু তত্কালীন বাংলায় উদ্ভূত বিশৃঙ্খলা সামলানো ও সমাজে শান্তি নিশ্চিত করার কাজে তা ভূমিকা পালন করতে স্বল্প হলেও সক্ষম ছিল। বিশেষত কর্নওয়ালিসের বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার পুলিশি কাঠামো নতুন করে সাজানোর উদ্যোগটি ছিল বেশ বৃহত্ ও পূর্ণতর। আঠারো শতকের শেষার্ধে পুলিশ প্রশাসনে দুটি নতুন পদও তৈরি হয়— দারোগা ও কোতোয়াল। শব্দ হিসেবে এগুলো বাংলায় তথা ভারতীয় উপমহাদেশে অপরিচিত ছিল না, তবে উক্ত সময়ে এই দুই পদবাহকের দায়িত্ব ও মর্যাদা নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন কোম্পানির শাসককুল। কোতোয়ালরা ছিলেন দারোগাদের তত্ত্বাবধায়ক, আর দারোগারা ছিলেন একেকটি অঞ্চল তথা থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান কর্মকর্তা। তখন সুলতানি আমলের থানা ব্যবস্থাকেই নতুন করে সাজিয়ে নেয়া হয়েছিল। কর্নওয়ালিস প্রত্যেক ৪০০ বর্গমাইলের জন্য একটি করে থানা স্থাপনের নীতি গ্রহণ করেছিলেন। থানাদার পদ বিলুপ্ত করে গ্রামীণ চৌকিদারদের দারোগাদের অধীনে রাখা হয়েছিল। দারোগারা আবার ছিলেন স্থানীয় জেলা ম্যাজিস্ট্রেটদের অধীনে। দারোগাদের মূল কর্তব্য হিসেবে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা, ফৌজদারি অপরাধ প্রশমন, অপরাধীদের গ্রেফতার ও খুঁজে বের করা, স্থানীয় ম্যাজিস্ট্রেটের হুকুম পালন— ইত্যাকার কর্মগুলো নির্ধারিত হয়। 

যাহোক, অবিভক্ত বাংলায় ইংরেজ আমলে আধুনিক পুলিশি ব্যবস্থার প্রাথমিক যুগে গোরা (শ্বেতাঙ্গ) কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বাঙালিরাও কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন বলে নথিপত্রে সাক্ষ্য মেলে। তবে তখন শিক্ষিত বাঙালি পরিবারের সন্তানেরা এই পেশায় এসেছেন, এমন তথ্য নেই। নিজে সইটুকু করতে পারলে দারোগার চাকরি পেতেন স্থানীয় বাঙালিরা, এ রকমটাও খুব দুর্লভ ঘটনা ছিল না। তাই উনিশ শতকের প্রথমার্ধে কর্মরত বাঙালি পুলিশ কর্তাদের অভিজ্ঞতার কথা খুব একটা সুলভ নয়। এমনকি অন্যদের লেখনীতেও।

তবে মরূদ্যানের মতো দুটি ব্যতিক্রমী আখ্যানের কথাও জানা যায়। কাকতালীয়ভাবে দুটিরই লেখক অজ্ঞাতনামা এবং দুই আখ্যানের মূল ‘প্রটাগনিস্ট’ তথা কথকই মফস্বলের বাঙালি। তবে মিল মাত্র এটুকুই, বিপরীতে দুই চরিত্রের মধ্যে ফারাকই অধিক। মিয়াজান রীতিমতো লাজহীন দুর্নীতির পরাকাষ্ঠা আর বাঁকাউল্লা বিবেকবান, কর্মঠ ও সত্ ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তবে দুই ব্যক্তিই আকর্ষণীয় চরিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত শেষমেশ, সে ইতিবাচক দিক থেকে হোক বা নেতিবাচক। উক্ত পুস্তকদ্বয়ের একটির প্রকাশ ইংরেজি ভাষায়— দ্য কনফেশনস অফ মিয়াজান। দ্বিতীয়টি বাংলায়, বাঁকাউল্লার দপ্তর। এই দুই দারোগা মিয়াজান ও বাঁকাউল্লার কর্মকাণ্ড বিচারের খেয়াল নিয়েই এই নিবন্ধটি ফাঁদা হয়েছে।

 

মিয়াজানের বয়ান : অলজ্জ স্বীকারোক্তি, ক্লেদাক্ত সমাজচিত্র

বেঙ্গল লাইব্রেরির ক্যাটালগ অনুযায়ী দ্য কনফেশনস অফ মিয়াজান বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৬৯ সালের এপ্রিল মাসের ১০ তারিখে। ১৪৮ পৃষ্ঠার বইটি ছাপা হয়েছিল মাত্র ২০০ কপি। কলকাতার হেয়ার স্ট্রিটের ‘Messers Wyman and Company’ থেকে ছেপে বেরুনো বইটি  খুব বেশি পাঠকের হাতে যায়নি কার্যত স্বল্প পরিমাণে ছাপা হওয়ার কারণে।

অজ্ঞাতপরিচয় লেখক বইটির সংক্ষিপ্ত ভূমিকায় জানিয়েছেন, ‘দক্ষিণ বাংলায় ঘুরতে ঘুরতে হঠাত্ একজন লোকের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। লোকটির তখন মধ্যযৌবন। থাকত এক দরগায়।... গ্যালভানিক ব্যাটারির সাহায্যে আমি তার সাময়িক বধিরতা সারিয়ে তুলি ও এরপর আমরা রীতিমতো বন্ধু হয়ে যাই। ধীরে ধীরে লোকটি তার বিচিত্র জীবনের ইতিবৃত্ত আমাকে খুলে বলে। সেই বৃত্তান্তই আমি আজ আপনাদের জানাচ্ছি। লোকটির কাছে আমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলাম যে, সে বেঁচে থাকতে তার জীবনের কথা প্রকাশ করব না। আজ সে আর জীবিত নেই। তাই আমিও আমার প্রতিজ্ঞা থেকে মুক্ত।’ এই ভূমিকা রচয়িতা ও লিপিধারক তথা অনুলেখক বাঙালি নাকি ভিনদেশি— তার কোনো হদিস গ্রন্থটিতে নেই। আর মিয়াজান আসল নাম কি ছদ্মনাম তারও ফয়সালা বেহাজির। শুধু বলা হয়েছে, বইটিতে লিপিবদ্ধ সকল কাণ্ডই প্রকাশকালের ৩০ বছর আগে ঘটেছিল। অর্থাত্ উনিশ শতকের ষাটের দশকে প্রকাশ পাওয়া বইটির মধ্যকার ঘটনাসমূহ সম্ভবত উক্ত শতকের তিরিশের দশকের— এমনটা আন্দাজ করা খুব একটা ভুল কিছু হবে না।

বইটির বাকি অংশ নির্মিত হয়েছে মিয়াজানের বয়ানেই। প্রথম অধ্যায়ে মিয়াজান জানাচ্ছেন, তার জন্ম পূর্ববাংলার একটি জেলায়, যার আদ্যক্ষর ‘ফ’ (বলে রাখা ভালো— ১৮৩০-এর দশকে পূর্ব বাংলায় ‘ফ’ আদ্যক্ষরধারী মাত্র একটি জেলাই ছিল, তা হলো ফরিদপুর)। পরিবার বলতে কৃষক পিতা, মা, বড় দুই ভাই (মিয়াজানই ছিলেন ভাইবোনদের মধ্যে সবচাইতে ছোট) ও এক সুন্দরী বোন। এই বোনের সঙ্গে ওই জেলার কালেক্টর সাহেবের এক বয়স্ক আর্দালি ফকিরের বিয়ে হয়। একসময় কালেক্টর সাহেবের বদলির হুকুম আসে, মিয়াজানের ভগ্নিপতি ও বোনও তার সঙ্গে অন্য এক জেলায় চলে যান। বছরখানেক বাদে মিয়াজানের ভগ্নিপতি নিজের শ্বশুরবাড়িতে একা ফিরে আসেন, ফেরার সময় সঙ্গে করে তরুণ মিয়াজানকে নিয়ে যান। পৌঁছে গিয়ে মিয়াজানকে এক অন্যরকম বাস্তবতার মুখে পড়তে হয়। এখন তার বোন ভিন জায়গায় গিয়ে সেই কালেক্টর সাহেবের রক্ষিতায় পরিণত হয়েছে। বোনের সুবাদে কালেক্টর সাহেবের চাপরাশি বনে যেতেও তাই চালাক-চতুর মিয়াজানের বেশি সময় লাগে না। বছর দুই ঘুরতে না ঘুরতেই সে হয়ে যায় চার টাকা মাসিক বেতনের আর্দালি।

মিয়াজান একেবারে দারোগার পদে কী করে নিয়োগ পেলেন, সেই আখ্যান বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। জেলার তেজপুর নামের কোনো এলাকার এক অমীমাংসিত ডাকাতি মামলার কিনারা হচ্ছিল না, ধুরন্ধর বোন-জামাইয়ের পরামর্শে কালেক্টর সাহেবের কানে সে কথা তুলেছিলেন মিয়াজান। পরে ফকির সেই কথার সূত্র ধরে কালেক্টর সাহেবকে বলেন, যদি তার শ্যালককে দারোগার পদে নিয়োগ দেয়া হয়, তাহলে ওই ডাকাতির একটা কিনারা হবেই হবে। সাহেব ভরসা দেন যে তাই হবে। আর দায়িত্ব নেবার পর সাতদিনের মাথায় ডাকাতদের গ্রেফতার করতে পারলে চাকরিও পাকা হয়ে যাবে। অতঃপর কালেক্টর সাহেব মিয়াজানকে দারোগা পদে নিয়োগের অনুরোধ জানিয়ে অত্র এলাকার ম্যাজিস্ট্রেটকে এক চিঠি লেখেন। আবার সেই চিঠি পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব মিয়াজানের বোন-জামাইয়েরই।

কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে চিঠি পেশ করতে গিয়েও তার খাসবেয়ারা গোপালকে ১০০ টাকা ঘুষ দিতে হলো।  আর শর্ত ধার্য হলো, মিয়াজানের জন্য কালেক্টরের দপ্তর থেকে যে মাসিক বেতন ধার্য হবে তা কার্যত গোপালকেই মাসে মাসে দিয়ে যেতে হবে। বিনিময়ে বিভিন্ন বিপদে সে দারোগাকে ঝামেলার হাত থেকে রক্ষা করবে। গোপাল বেয়ারার শর্ত মেনে নেয়াতে ম্যাজিস্ট্রেটের দরবারে মিয়াজানকে কোনো ঝামেলায় পড়তে হয়নি, কেননা আগেই সে তাকে পটিয়ে রেখেছিল। তাই তিনি অল্প কটা প্রশ্ন করেই মিয়াজানের নিয়োগপত্র মঞ্জুর করে দিলেন। তবে মিয়াজান পা ফেলার বেলায় সতর্ক ছিলেন, আদালতের পেশকার-নাজির-সেরেস্তাদারদের তাই আগেভাগেই কিছু ঘুষ দিয়ে রাখলেন। উল্লেখ্য, নিয়োগপত্র মিয়াজানের হাতে আসার পর ওই তেজপুর থানার তত্কালীন বৃদ্ধ দারোগা ভুবন বন্দ্যোপাধ্যায়কে ‘ব্যর্থতার দায়ে’ বহিষ্কার করা হয়েছিল। এই খবর শুনে খুশিমনে মিয়াজান রওনা দেন তেজপুরের উদ্দেশে।

নিজের দারোগাগিরির শুরুটাকে জৌলুসদার করার জন্য মিয়াজান তেজপুরে গিয়েছিলেন পালকি চড়ে, আর সঙ্গে দুটো ঘোড়ায় করে নিয়েছিলেন দুজন সাগরেদকে। দারোগা হতে হলে নাকি সঙ্গে জনাকয়েক কর্মঠ ও আস্থাভাজন সাগরেদও থাকা আবশ্যক— বোন-জামাইয়ের এমন উপদেশে প্রভাবিত হয়ে মিয়াজান এদের নিজের সঙ্গে নিয়েছিলেন। পায়ে হেঁটে পেছনে একদল সাজপোশাকওয়ালা খিদমতগারও চলছিল। এমন বাহারি বেশভূষাময় বহর নিয়ে থানায় হাজির হওয়ার ফলে এলাকায় শোরগোল পড়ে যায়। চৌকিদারদের পাঠিয়ে দুধ, মুরগি হাজির করা হলো মিয়াজানের সামনে। এক গরিব ব্রাহ্মণীর ঘরের কচি ছাগলকেও পাকড়াও করে আনা হয়। মিয়াজান নিজের চতুর বুদ্ধি দিয়ে ঠিক করেন, এলাকাবাসীর সামনে মহত্ সাজার এটাই সুযোগ। তাই ঘোষণা করেন, ছাগলটা বাদে বাকি সব যেন এলাকার লোকজন ভাগবাটোয়ারা করে নেয়। সঙ্গে সঙ্গে আশপাশের লোকজনও খুশিতে ফেটে পড়ে, কিন্তু তার ধূর্ত ফন্দি আর টের পায় না। 

আখ্যানের এই অংশে এসে উনিশ শতকের প্রথমার্ধে মফস্বল এলাকার একটি থানা কীভাবে পরিচালিত হতো, তার বেশ সরস বিবরণ পাওয়া যায়। থানায় তখন দারোগার পরের পদই হলো ‘বক্সি’, দারোগা অনুপস্থিত থাকলে থানা সামলানোর দায় তারই। আর সবসময়ের কাজ হলো প্রতিবেদন দাখিল করা। বিনিময়ে বেতন মাসে আট টাকা। একই বেতন, কিন্তু একটু নিচু পদমর্যাদা নিয়ে থানার আরেক কর্মকর্তা ‘জমাদার’-এর  কাজ ছিল থানায় থাকা অস্ত্রপাতি ও জিনিসপত্র দেখেশুনে রাখা। তেজপুর থানার বক্সি বিক্রমপুরের আদি বাসিন্দা নব চক্রবর্তীর সঙ্গে অবশ্য মিয়াজান দারোগার ভাবসাব খুব একটা জমেনি। বরং গাঁজাখোর জমাদার ছকুর সঙ্গে অধিক ভাব জমিয়ে নিয়েছিলেন তিনি।

অতঃপর পদে বসেই যে কাজটি প্রথম মিয়াজান সারলেন তা হলো থানার আওতাধীন প্রত্যেক গ্রামের চৌকিদারদের কাছ থেকে এক টাকা করে নজরানা আদায় করা। একজন দারোগার বেতন তখন মাত্র পঁচিশ টাকা হলেও এই কুরীতির কারণে দ্রুতই তাদের পকেট ফুলে-ফেঁপে উঠত। তেজপুরের ১ হাজার ২০০ গ্রাম থেকে তাই ১ হাজার ২০০ টাকা মাসে মাসে আদায় করা ছিল নেহাতই ছেলেখেলা। এছাড়া নীলকররা বছরান্তে ফসলের হিসাব করার পর মণপ্রতি চার আনা করে ধরে নিয়ে বখশিশও দিয়ে যেত।

তেজপুর এলাকার যে ডাকাতির সমাধান বের করার আশ্বাস দিয়ে দারোগা হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন মিয়াজান, পরে তিনি সেই ঘটনার সুরাহা করেন বড় নির্মম প্রক্রিয়ায়— সে এক বিষম আখ্যান। ডাকাতি মামলার বাদীকে ভয়ানক অত্যাচার করে মিয়াজানের জমাদার ছকু তাকে মেরেই ফেলে। পরে ডাক্তারকে অন্ধকারে রেখে রিপোর্ট করানো হয়, সে হূদরোগে মারা গেছে। কথাটা ছিল আংশিক সত্য, কেননা হূদযন্ত্র বন্ধ হয়েছিল নির্যাতনের ফলেই, তার উল্লেখ ওই রিপোর্টে গরহাজির। পরে মিয়াজানের বোন-জামাই ফকির তাকে জানায়, হাকিম নাকি বলেছেন ফরিয়াদির মৃত্যুর ফলে দারোগার তদন্তের সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে, এ তো আর তার দোষ নয়, কাজেই তাকে চাকরিতে স্থায়ী করা হলো। মিয়াজানের তো তখন পোয়াবারো।

সেকালের থানায় অপরাধীর থেকে স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য বেশ কিছু কুিসত অত্যাচার-প্রক্রিয়া, এ যুগের ভাষায় যাকে বলে ‘থার্ড ডিগ্রি’— তারও বর্ণনা পাই মিয়াজানের মুখে। একটি অত্যাচারের বিবরণ পড়লে তো গা রীতিমতো শিউরে ওঠে। গ্রামাঞ্চলে ‘ঘুরঘুরে পোকা’ নামের এক ধরনের কীট পাওয়া যেত, যে কিনা নিজের শক্ত করাতের মতো ধারালো চোয়াল দিয়ে মাটি খুঁড়তো। পুলিশি কায়দা অনুযায়ী যার পেট থেকে কথা বের করা দরকার তাকে খালি গা করে হাত-পা বেঁধে মাটিতে শুইয়ে নাভির ওপর সেই ঘুরঘুরে পোকা ছেড়ে দিয়ে নারকেলের মালা দিয়ে চাপা দিয়ে দেয়া হতো। মাটির বদলে পোকাটা খুঁড়তে শুরু করত অসহায় মানুষটির নাভিমূল! কী ভয়ানক যন্ত্রণা তখন হতো সে তো বলাই বাহুল্য।

অবশ্য মিয়াজানের দারোগাগিরির গোটা সময়টাই তার জন্য খুব সুখপ্রদ ছিল না। কাঠ চুরির দায়ে ফেঁসে গিয়ে তাকে বরখাস্ত হতে হয়। আর তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয় তারই সহযোগী ছকু। সেই পরে দারোগা পদে নিযুক্ত হয়। পরে অবশ্য নিজের এক সাগরেদকে খুনের দায়ে তাকে জেলে যেতে হয়। আর মিয়াজান অতঃপর ফকিরি ভেক ধরে জীবিকা নির্বাহ করতে থাকেন। এক সময়ের প্রতাপশালী ও দুর্নীতিবাজ দারোগার এই-ই হয় শেষ পরিণতি।

দ্য কনফেশনস অফ মিয়াজান কার্যত এক অলজ্জ বা নির্লজ্জ স্বীকারোক্তির দারুণ উদাহরণ। নিজের জীবনের বা পরিবারের গ্লানি ও অপরাধসমূহ নিয়ে বলতে মিয়াজানের কোনোই দ্বিধা নেই যেন। নিজের বাবাকে ‘হাবাগোবা’ বলে উপহাস করতে যেমন তিনি স্বচ্ছন্দ, তেমনি নিজের আপন বোন কালেক্টর সাহেবের রক্ষিতা বলেও তার গর্বের শেষ নেই। ঘুষ খেয়ে অর্থকড়ি কামিয়ে পরে দরবেশ সেজে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করতে নামাটাকেও জীবনযুদ্ধে নিজের টিকে থাকার সাফল্য হিসেবে তিনি গণ্য করেন। অপরদিক থেকে মিয়াজানের এই বয়ান উনিশ শতকের প্রথমার্ধের বাংলার সমাজজীবনের ক্লেদাক্ত চালচিত্রও বৈকি। ইংরেজ শাসনের ফলে বাহ্যিক শৃঙ্খলা এলেও সমাজজীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে তখন কী করে আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি ও অপশাসনের বিষাক্ত বীজ প্রবেশ করেছিল তার জলজ্যান্ত প্রমাণ মিয়াজান দারোগার জীবনকাহিনী। এদিক থেকেও তাই এই আখ্যানের মূল্য কম নয়। 

বাঁকাউল্লার অভিযান: দুঁদে দারোগা বনাম চতুর অপরাধী

একদা বেশ জনপ্রিয় হওয়া বাঁকাউল্লার দপ্তর বইটি প্রথম কবে প্রকাশিত হয় ও কে এর লেখক, তা নিয়ে মতভেদ আছে। গ্রন্থ-গবেষক অশোক উপাধ্যায় বেঙ্গল লাইব্রেরি ক্যাটালগের ভুক্তি দেখে জানিয়েছেন, বইটি লিখেছিলেন জনৈক কালীপ্রসন্ন চট্টোপাধ্যায়, এটি প্রথম প্রকাশ পায় কলকাতা থেকে, ১৮৯৬ সালের ১৪ই জুলাই তারিখে। প্রকাশক ছিলেন নগেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, যার পরিচয়ও সহজলভ্য নয়। কিন্তু অধ্যাপক সুকুমার সেনের ধারণা, এই পুস্তকখানা ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দের আগেই ছাপা হয়েছিল এবং বইটির লেখক কে তা নির্ধারণ করা মুশকিল— অবশ্য এই তথ্যদ্বয়ের পক্ষে নিজের যুক্তি তিনি তুলে ধরতে পারেননি। এর পাশাপাশি বাঁকাউল্লার প্রকৃত নাম বরকতউল্লা— এমন তথ্যও তিনি দিয়েছিলেন। গ্রন্থের প্রকাশকাল ও প্রকৃত লেখকের পরিচয় নিয়ে এমন চাপান-উতোর থেকে নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে আসা মুশকিল। তবে বাঁকাউল্লা বলে যে আদতেই একজন দুঁদে পুলিশ কর্তা সেকালে ছিলেন, সে বিষয়ে বিখ্যাত সমাজ-গবেষক সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুসন্ধান থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়। দিল্লির মহাফেজখানা থেকে প্রাপ্ত একাধিক নথিপত্রে তিনি বাঁকাউল্লা নামের এক বাঙালি পুলিশ কর্তার সন্ধান পান। ওইসব নথিতে বাঁকাউল্লার পেশাদারি দক্ষতা ও অপরাধীকে গ্রেফতারের ক্ষেত্রে তাঁর সাফল্যের কথা বারংবার উল্লেখিত হয়েছিল। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয়, বাঁকাউল্লার দপ্তর বইতে বর্ণিত একাধিক ঘটনা ও কাহিনী নথিতে থাকা বিবরণের সঙ্গেও অনেক ক্ষেত্রে হুবহু মিলে গিয়েছে। তাই ধারণা করা যায়, বাঁকাউল্লার কর্মকাণ্ড নিয়ে তৈরি হওয়া পুলিশি নথিগুলো কোনো একজন বটতলার লেখকের হাতে পড়েছিল। সেই অনামা লেখকই হয়তো নিজের পুলিশি নথির বর্ণনা আপন মনের মাধুরীর সঙ্গে মিশিয়ে লিখেছিলেন বাঁকাউল্লার দপ্তর বইটি। শুরুর পূর্বাভাষ তথা ভূমিকা অধ্যায় বাদ দিলে এখানে মোট এক ডজন পুলিশি অভিযানের কাহিনী লভ্য।

বাঁকাউল্লার দপ্তর-এর প্রথম অধ্যায় ‘পূর্বাভাষ— আত্মকথা’য় বাঁকাউল্লার জবানিতে জানা যায়, লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের আমলে ঠগির উত্পাতের কারণে পুলিশি লোকবল বাড়ানোর প্রয়োজন হয়েছিল। সময়টা উনিশ শতকের প্রথমার্ধ। ওই সময় থেকেই ঠগিবিষয়ক বিশেষ কমিশনার হেনরি শ্লিম্যান স্থানীয় অবস্থাপন্নদের চালাক-চতুর ছেলেদের খুঁজছিলেন দারোগাপদে নিয়োগ দেয়ার জন্য। এ জন্য প্রশাসনের দায়িত্ববানরা গ্রামদেশের পাঠশালায়ও ঘুরতেন বলে বাঁকাউল্লার মন্তব্য। ‘চালাক-চতুর ছোকরা’দেরও নাকি এ ব্যাপারে কম আগ্রহ ছিল না। কারণ ‘যাহারা লায়েক, তাহাদের পক্ষে এ বড় সুসময়’। তবে কোনো ব্রিটিশ কর্তার সুনজরে পড়ে নয়, কোনো এক জেলা সদরের বাসিন্দা তরুণ বাঁকাউল্লা দারোগা পদে নিয়োগ পান তার মক্তবের মুনশি সাহেবের প্রস্তাবে। তিনিই বাঁকাউল্লাকে প্রথম জিজ্ঞেস করেন যে, দারোগা হতে তার কোনো আপত্তি রয়েছে কিনা। ইতিবাচক জবাব পেয়ে মুনশি সাহেব তাকে স্থানীয় পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে দেখা করতে বলেন। তার পরের দিনই গোয়েন্দা পুলিশের দারোগা পদে নিযুক্ত হয়ে বাঁকাউল্লার ঘর ছাড়া। সময়টা মাঘ মাস। গবেষক-প্রাবন্ধিক সৌম্যেন পাল ও প্রসেনজিত্ দাশগুপ্ত ধারণা করেছেন, লর্ড হার্ডিঞ্জের আমলে তার এই নিয়োগপ্রাপ্তি। কারণ বইয়ের শুরুতেই লেখা হয়েছিল ‘লর্ড হেস্টিংস হইতে হার্ডিঞ্জ... বাঙ্গালা দেশে শান্তি-সংস্থাপনের জন্য বিস্তর চেষ্টা করিয়াছিলেন...’— ওই সময় নিয়োগ না পেলে  হার্ডিঞ্জ-প্রসঙ্গে এসে তার থামবার কথা নয়, আর ঠগি দমন শেষ হতে হতে উনিশ শতকের সত্তরের দশক অব্দি সময় লেগেছিল।

যাহোক, বাঁকাউল্লা নিয়োগ পেয়েই চললেন নবদ্বীপ। সঙ্গে নিয়োগপত্র ও কমিশনার বাহাদুরের সইসমেত হুকুমনামা। সেখানে গিয়ে ধরলেন ছদ্মবেশ। সাজলেন বৈষ্ণববেশে, অপরাধী অনুসন্ধানের স্বার্থে। তখনই হরিশভট্ট নামের এক দেহধারী ব্রাহ্মণের সঙ্গে দেখা, যার আবার দক্ষিণ হাতখানা নেই। সঙ্গে তার এক পাহাড়ি চাকর, যে কিনা বাংলা বলতে পারে না। কিন্তু লোকটির নানা আচরণে বাঁকাউল্লার মনে সন্দেহ জাগে। এর মাঝে হরিশ নবদ্বীপ ছেড়ে চলে যান। তার পরই সেখানে এক বিধবা নারী বিধুমখী খুন হন। কিন্তু বাঁকাউল্লা প্রাথমিক তদন্তে এর কিনারা করতে পারেন না, অগত্যা নবদ্বীপ ছেড়ে শান্তিপুরে চলে আসতে হয় তাকে। সেখানে এসে কাকতালীয়ভাবে আবার সেই হাতকাটা হরিশের দেখা পান। কিন্তু ভালোমতো তখন খেয়াল করে বাঁকাউল্লা বুঝতে পারেন, লোকটি আদৌ হাতকাটা নয়— তার দক্ষিণ হাতটি বহাল তবিয়তেই রয়েছে— কিন্তু কী এক কারণে তা তুলোমোড়া জামার তলায় লুকোনো। উপরন্তু হরিশের বাক্সে বহুরূপীর সাজপোশাকে ব্যবহূত একাধিক জিনিসপত্র দেখে সন্দেহ আরো ঘনীভূত হয় বাঁকাউল্লার। যদিও হরিশের মন্তব্য, তীর্থযাত্রার জন্য এসব সাজভূষার দরকার হয়েই থাকে। পরের দিন শান্তিপুরেও আরেক বিধবা নারী শশীমুখী খুন হয়ে যান। আগের ঘটনার মতোই খুনের রকম। তার ওপর আবার নিহত মহিলা নবদ্বীপে হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া সেই রমণী বিধুমুখীর আপন বোন। বাঁকাউল্লা হরিশ বাবুর বাড়িতে খোঁজ নিতে গিয়ে দেখলেন, তিনি ওখানে আর নেই। জানা গেল, তিনি কালনা গেছেন ঘোড়ার গাড়ি চেপে। বাঁকাউল্লা সেখানে যাওয়ার পর নিহত শশীমুখী-বিধুমুখীর আরেক বোন, কালনারই নিবাসী সুধাময়ীও খুন হয়ে যান। বাঁকাউল্লার মনের সন্দেহ অতঃপর চারপাশের ঘটনাপ্রবাহ বিচার করে সিদ্ধান্তেই পরিণত হয়— হরিশকেই এই তিন খুনের নেপথ্য কারিগর বলে তিনি চিহ্নিত করেন। একাধিক চৌকিদার-বক্সি-দারোগাকে ডেকে এনে আশপাশের এলাকায় চিরুনি অভিযান চালিয়ে হরিশ ও তার সহযোগী চাকরটিকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়। বাঁকাউল্লার জেরার মুখে হরিশ নিজের অপরাধ স্বীকার করেও নেন। পরে আদালতে তার সাজা হয় প্রাণদণ্ড। খুনের সহযোগী হিসেবে চাকরটিকেও জেল খাটতে হয়। আর চাকরিজীবনের প্রথম অনুসন্ধানেই সাফল্যলাভের কারণে সুখ্যাতি ও পুরস্কার— দুই-ই পেলেন বাঁকাউল্লা।

আগেই বলেছি, ঠগি দমন অভিযানের প্রভাবে বাঁকাউল্লার দারোগা পদপ্রাপ্তি, কিন্তু মূলধারার ঠগিদের নিয়ে বাঁকাউল্লার জবানিতে কোনো কাহিনী আমরা এই বইতে পাই না। তবে এক জলচর ঠগির যুগপত্ নির্মম ও কৌতূহলোদ্দীপক কাহিনীর দেখা মেলে।  রুকুনপুর নামের এক গ্রাম থেকে খবর এল, নদীর ঘাটে গয়না পরে স্নান করতে গিয়ে এক নারীকে কুমিরে টেনে নিয়ে গিয়েছিল, পরের দিন তার লাশ পাওয়া যায়, গায়ে একটিও ক্ষতচিহ্ন নেই, কিন্তু গায়ের গয়নাগুলো সব উধাও। সেই থেকে ওখানে খবর রটে গেছে, এমন এক কুমিরের আবির্ভাব হয়েছে, যে কিনা মানুষ খায় না, বদলে সোনার গয়না খায়! কয়েকদিন পর রুকুনপুরের পাশের এক গ্রাম থেকে একই রকম আরেকটি ঘটনার খবর এল। গয়না গায়ে নিয়ে স্নান করতে গিয়েছিলেন সেখানকার বসুবাড়ির বড়মেয়ে, ফিরেছেন লাশ হয়ে, গায়ে একটিও গয়না মেলেনি। বাঁকাউল্লার মনে সন্দেহ জাগল— আগের ঘটনার সময় তিনি লাশ দেখতে পারেননি, এ যাত্রা তাই তাড়াতাড়ি করে  ঘোড়ায় চেপে লাশের সুরতহাল করতে রওনা দিলেন। দেখলেন, লাশের বাম পায়ে কেবল একটি কালো দাগ, যেমনটা দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছিল। কিন্তু কুমির কামড়ালে তো দাঁতের দাগ থাকার কথা। বাঁকাউল্লা অনুমান করেন, এ কোনো কুমিরের কীর্তি নয়, মনুষ্যকৃত কাণ্ড। অতএব কুমিরবেশী অপরাধীকে ধরার জন্য তিনি টোপ ফেললেন। গা ভর্তি করে গয়না পরিয়ে তিন মহিলা গোয়েন্দাকে রুকুনপুরের এক ঘাটে নাইতে নামালেন। আশপাশে রাখলেন কয়েকজন দক্ষ জেলেকে। মহিলা গোয়েন্দারা স্নান করতে নেমেছেন, এমন সময় দেখা গেল একটা উপুড় হওয়া হাঁড়ি জলে ভাসছে। বাঁকাউল্লার ক্ষিপ্রগতির মগজ তখনই ধরে ফেলল, ওটার নিচেই রয়েছে কুমিরবেশী জলঠগি! জাল ফেলে সেই মুশকো জোয়ান জলঠগিকে তিনি পাকড়াও করেও ফেললেন। পরে জানা গেল, ওই জলঠগি হাঁড়ি মাথায় করে নদীর ঘাটে এসে মহিলাদের পা শেকল দিয়ে বেঁধে ফেলে জলে টেনে নিয়ে যেত। দম বন্ধ হয়ে যখন মহিলারা মারা যেতেন তখন তাদের পরনের গয়না লোপাট করে লাশ ভাসিয়ে সে পালাত। অতঃপর বাঁকাউল্লার দ্রুততম উদ্যোগে অপরাধী ধরা পড়ায় পরে গ্রামবাসীর গয়নাখেকো কুমিরের ভয় কেটে গিয়েছিল।

আরেক অভিযানে অন্য ধরনের এক জলচর অপরাধীর মুখোমুখি হতে হয়েছিল বাঁকাউল্লাকে। সিরাজগঞ্জ এলাকার ঘটনা সেটি। এক পাটের আড়তদার বেচাবিক্রি শেষে সমস্ত লাভের ১০ হাজার ৭০০ টাকা একটি বিরাট সিন্দুকে ভরে নৌকায় নিয়ে যাচ্ছিলেন। এমন সময় একটি ছিপনৌকা তার কিস্তির পাশে ভিড়ে এবং ‘একটা লোক চকিতে কিস্তির উপর লাফাইয়া পড়ে... দ্বিতীয় লাফে লোহার সিন্দুকটা টানিয়া বাহির করিয়া, তৃতীয় লাফে ছিপে তুলিয়া লইয়া নক্ষত্রবেগে চলিয়া যায়।...’ পরে তাড়িখোর সেজে কী করে মামুদ নাম্নী সেই পালোয়ান চোরকে ধরেছিলেন বাঁকাউল্লা— সেই কাহিনী রীতিমতো রোমাঞ্চকর ও বুদ্ধির দীপ্তিতে পূর্ণ। তাড়িতে তিনি মাতাল ভেবে তার সামনেই মামুদের এক সহযোগী চুরির মালের কথা পেড়ে বসেছিল। জানা যায়, জলপথ থেকে লুট করা সিন্দুক মামুদ এক নদীর ঘাটেই লুকিয়ে রেখেছে। পরে সেখানে সরেজমিন গিয়ে বাঁকাউল্লা দেখতে পান, মামুদ তার  আরেক চ্যালাকে নিযুক্ত করেছিল মাছ ধরার নাম করে জলমগ্ন চুরির মালের দিকে নজর রাখতে। ঠা ঠা রোদ্দুরের মধ্যে জড়সড় ও অন্যমনস্ক হয়ে কেউ মাছ ধরছে, এমন ঘটনা বাঁকাউল্লা আগে দেখেননি। পরে সেই চ্যালাকে জেরা করে সিন্দুক উদ্ধার হয়, জলঠগি মামুদও ধরা পড়ে।

বাঁকাউল্লার ১২টি অভিযানের কাহিনীর সব কটিতেই নজরে পড়ে বিচিত্র ধরনের সব অপরাধ ও ধুরন্ধর অপরাধীদের অদ্ভুত চালচিত্র। ভয়ানক ডাকাত দলকে যেমন বাঁকাউল্লা আইনের অধীনে এনেছেন, তেমনি অত্যাচারী জমিদারের প্রজাহত্যার ঘটনা উদ্ঘাটন করেছেন নিজের উপস্থিত বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে। আবার পুণ্যের আশায় শিশুবলির মতো ভয়ানক কাণ্ড ঘটিয়ে ভেক ধরে থাকা অপরাধীকেও শনাক্ত করে ছেড়েছেন। এক হিসেবে বলা যায় এ হলো ‘দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন’-এর চিরায়ত ছকের আখ্যানের বহুমাত্রিক রূপায়ণ। তবে নিছক আখ্যান বলাটা ডাহা ভুল, কারণ আগেই বলেছি এই ধরনের কিছু ঘটনা— এত রঙদার গল্পের রূপে না হলেও— পুলিশি নথিতে মিলেছে বটে।

 

দুই দারোগা, দুই দুনিয়া

মিয়াজান ও বাঁকাউল্লা— এই দুই চরিত্রের মধ্যেকার ফারাকই শেষমেশ আমাদের উনিশ শতকের বাংলার পুলিশি প্রশাসনের মধ্যকার অব্যবস্থা ও দ্বিধাদ্বন্দ্বময় অবস্থার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। বাঁকাউল্লার মতো দক্ষ ও বুদ্ধিমান দারোগা যেমন সেই সময় ছিলেন, পাশাপাশি ছিলেন মিয়াজানের মতো ধুরন্ধর ও নিজের আখের গোছাতে ব্যস্ত থাকা কর্তাব্যক্তিও।

কার্যত স্রেফ লোকবল বাড়ানোর আশায় কোম্পানি প্রশাসন যেভাবে প্রশাসনে নিয়োগের ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতিকে প্রশ্রয় দিয়ে এসেছিল, তারই কারণে হয়তো মিয়াজানদের আবির্ভাব। উল্টোপানে, সদ্য অধিকৃত উপনিবেশকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য কর্মঠ পুলিশ কর্তাদের দরকারও তো পড়ত— তাই মনে হয় বাঁকাউল্লার মতো পরিশ্রমী-বুদ্ধিমান ব্যক্তির নিয়োগলাভ ঘটেছিল। একদিকে যেনতেন প্রকারে শাসন চালিয়ে যাওয়া, আরেকদিকে পরিস্থিতি অনুকূলে রাখা— এই দুইয়ের টানাপড়েনে পড়েই কি ঔপনিবেশিক শাসককে নিয়োগের বেলায় বেছে নিতে হয়েছিল সম্পূর্ণ বিপরীত দুই চরিত্রের দারোগাকে? তবে এসব প্রশাসনিক কলকব্জার অন্দরের কাহিনীকে সরিয়ে রেখেও বলা যায়, এই দুই দারোগার মধ্যকার বৈপরীত্য যেন বাঙালি চরিত্রের মধ্যকার বিমিশ্র অবস্থারই প্রতীকী রূপ। যে খিচুড়ি দশা কিনা এখনো সমান তালে চলমান!

 

তথ্যসূত্র:

১. মিয়াজান দারোগার একরারনামা, অরিন্দম দাশগুপ্ত অনূদিত। প্রথম সংস্করণ, চর্চাপদ, কলকাতা, ২০০৯।

২. বাঁকাউল্লার দপ্তর, টীকা ও সম্পাদনা: সৌম্যেন পাল ও প্রসেনজিত্ দাশগুপ্ত। প্রথম চর্চাপদ সংস্করণ, কলকাতা, ২০১৩।

৩. উনিশ শতকের কলকাতা ও সরস্বতীর ইতর সন্তান, সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রথম সংস্করণ, অনুষ্টুপ, কলকাতা, ২০০৮।

৪. অবিভক্ত বাংলার পুলিশের ইতিহাস, কাবেদুল ইসলাম। প্রথম সংস্করণ, অ্যাডর্ন পাবলিকেশন, ঢাকা, ২০১২।

৫. বাংলাদেশের জেলা পুলিশ, কাবেদুল ইসলাম। প্রথম সংস্করণ, অ্যাডর্ন পাবলিকেশন, ঢাকা, ২০১৪।