শহীদ কাদরী মৃত্যুশয্যায়। তার স্ত্রী নীরা কাদরী বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খানকে ফোন করে অনুরোধ করেন— তিনি যেন কবির কথাটি শোনেন আর রাখার চেষ্টা করেন। শামসুজ্জামান খান জানিয়েছেন, ঘটনাটি মৃত্যুর তিনদিন আগের। রোগশয্যায় কবি তার শেষ ইচ্ছা জানালেন, দেশে যেন তার কবর হয়, শহীদ বুদ্ধিজীবী গোরস্তানে। তার কবিতার বইগুলো বেঙ্গল ফাউন্ডেশন বের করছে। অপ্রকাশিত রচনাবলির দায়িত্ব যেন বাংলা একাডেমি নেয়। শামসুজ্জামান খান গভীর আবেগ নিয়ে বলেছিলেন, ‘দেশের জন্য আর্তি আমাকে বিহ্বল করে ফেলেছিল।’ সেখানে উপস্থিত ছিলেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের রামেন্দ্র মজুমদার, হাসান আরিফ, মুহম্মদ সামাদ। ঢাকায় তার লাশ আসবে ৩০ আগস্ট (এই লেখাটি যখন লিখছি) তারপর কী হবে এসব নিয়ে তারা কথা বলছিলেন। মাত্র কয়েকটি বই কবিতার— দীর্ঘ প্রবাস জীবন— তারপরও এই কবি কী রকম ছিলেন। এসব বলার আগে জেনে নিই কবিতা তার কাছে কী ছিল। কবিতা পড়ার অভ্যাস হয়তো নেই, তবু অনুরোধ করি একবার পড়ে দেখুন। প্লিজ!
কবিতাই আরাধ্য জানি
কবিতাই আরাধ্য আমার, মানি, এবং বিব্রত
তার জন্য কিছু কম নই। উপরন্তু আছি পড়ে উপাধিবিহীন, জানি
বাণিজ্যে বসতি যার সেই মা’ লক্ষ্মীর সংসারেই উন্মূল, উদ্বৃত্ত, তবু
কোন মতে টিকে-থাকা, যেন বেঢপ ভূমিকাশূন্য তানপুরা!
উপরন্তু গ্রাম্যজনে যেই গান চায় কিংবা গায়, ইদানীং ওহে
তা’ কেউ জানে না আর, জানার উপায় নেই বলে?
কেননা যে আছে
হাত-পা ছড়িয়ে বেণুবনে, রুক্ষচুলে, শুকেনা মুখে
ফেলে সে দিয়েছে
আনমনে, সোনালি, নিটোল বাঁশিখানি, কোলের ওপরে হাত
ভারি হয়ে পড়ে আছে, মরা, একেবারে মরে-যাওয়া ম্লান খরগোশ।
কিন্তু সতেজ পাতার মতো তার কান, কর্ণকুহরে কুহক, ঘণ্টাধ্বনি
দূর শহরের,
তাই আর খোঁজে না সে কাঁটাবনে, হূিপণ্ডের ত্রস্ত-স্বপ্নে দ্রুত
কি করে ঝরে গেল, পড়ে গেল, নড়ে গেল হাত, হাতে বাঁশরী
—গেঁয়োমুখে নাবালক ভয় শুধু, উদ্বিগ্ন বিস্ময় আর এক
অসম্ভব দাবি,
বোঝে না সে জীর্ণ কাঁথার মতন পচে যায় গ্রাম্যগাথা সব
ম্লান শব্জীক্ষেতে।
ফেরার উপায় নেই, সহযাত্রীর হূদয়ে নেই আর রাস্তার সংকেত,
পুরোনো লণ্ঠন
পিতামহের হা-খোলা, মৃত, হলুদ চোখের মত দ্যুতিহীন,
দেখায় না পথ।
ধ্বংসের বিপুল গুণে দেখা যায় মসজিদের বিদীর্ণ ধাপ
নেবে গেছে খাদে।
আমি শহীদ কাদরীর যে-ক’টি বই পড়েছি, সেগুলো হলো- উত্তরাধিকার (১৯৬৭, ঢাকা), তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা (১৯৭৪ বইঘর, চট্টগ্রাম), কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই (১৯৭৮, ঢাকা), আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও (২০০৯)। আরেকটি বই কি আছে! ...মনে পড়ছে না।
কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই গ্রন্থের ফ্ল্যাপে লেখা হয়েছে, ‘প্রায় অর্ধশতকের সাহিত্য জীবনে তিনি লিখেছেন মাত্র শ’দেড়েক কবিতা। তা সত্ত্বে এ সাত্ত্বিক কবি বারবার নিজেকে নবায়ন করে নিয়েছেন। ...তাঁর আরাধ্য: মানুষ, সমাজ, ভালোবাসা এবং পরবাস। ...কবিতায় বাঙ্ময় জীবনদর্শন অসামান্য এবং সম্পূর্ণ, দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট ও নিঃসংশয়, পর্যবেক্ষণ তীক্ষ ও সূক্ষ্ম, প্রকাশ অনবদ্য ও মেদহীন।’
প্রকাশক এসব কথা তো বলবেনই, কিন্তু তিনি একবর্ণও বাড়িয়ে বলেননি। তার নিজের লেখা বই সম্পর্কে তিনি মৃত্যু নিকটবর্তী জেনেও এ জন্যই ব্যাকুলতা প্রকাশ করেছিলেন।
বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা মারতে ভালোবাসতেন। প্রথম যার নাম বাংলাদেশ টেলিভিশন, তার গোড়ার দিকে প্রযোজকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। রাশিয়ার বাংলা সাময়িকী, অবশ্যই ঢাকা থেকে প্রকাশ করেছেন, দৈনিক সংবাদ-এ কিছু দিন কাজ করেছিলেন। প্রথমে জার্মানি, পরে ইংল্যান্ড হয়ে ’৮৫ থেকে আমেরিকার বোস্টনে ২০ বছর কাটিয়ে নিউইয়র্কে থিতু হয়েছিলেন। বেশকিছু দিন ধরে অসুস্থ, হাসপাতালে ছিলেন, সামান্য একটু ভালো মনে হলে বাসায় নিয়ে আসা হয়। অবস্থা খারাপের দিকে গেলে তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়, সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
যখন লিখছি, তার মরদেহ ঢাকার পথে। আমার ধারণা সঙ্গে তাঁর স্ত্রী নীরা কাদরী ও একমাত্র সন্তান লোবিদও (আসল নাম আদনান কাদরী) আসবেন হয়তো। বাংলা একাডেমি বা শহীদ মিনারে আমার যাওয়া হবে না, ৭১ টিভির সরাসরি অনুষ্ঠানে থাকার জন্য আমাকে স্টুডিওতে থাকতে হবে। জানাজায় যোগ দিতে না-পারলেও আশা রাখি শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে যেতে পারব।
লোবিদের বিয়েতে সপরিবারে অংশ নিয়েছিলাম। তার মা নাজমুন নেসা পিয়ারী জার্মানিতে আমার সহকর্মী ছিলেন। তিনি নিজেও লেখালেখি করেন।
তাঁর একটি কবিতা একসময় আমাদেরকে চমকে দিয়েছিল। কোনো উত্তেজনা নেই, কী সংযম, কী সংযম— শাদামাটা প্রসাধনহীন কবিতা কী পরিমাণ বিদ্রূপ করতে পারে, তার একটি দৃষ্টান্ত এ লেখাটি। জামা-কাপড়গুলো পাল্টে নিল হলি আর্টিজান কি শোলাকিয়ার ঘটনার কথা মনে হতেই পারে। হয়তো আপনার কবিতাটি আগেই পড়া আছে। আরেকবার পড়তে দোষ কী!
হন্তারকদের প্রতি
বাঘ কিংবা ভালুকের মতো নয়,
বঙ্গোপসাগর থেকে উঠে আসা হাঙরের দল নয়,
না, কোনো উপমায় তাদের গ্রেপ্তার করা যাবে না।
তাদের পরনে ছিল ইউনিফর্ম,
বুট, সৈনিকদের টুপি,
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাদের কথাও হয়েছিল,
তারা ব্যবহার করেছিল
এক্কেবারে খাঁটি বাঙালির মতো,
বাঙলা ভাষা। অস্বীকার করার উপায় নেই ওরা মানুষের মতো
দেখতে, এবং ওরা মানুষই,
ওরা বাঙলার মানুষ
এর চেয়ে ভয়াবহ কোনো কথা আমি আর শুনবো না কোনোদিন।





