অ্যারাবিয়ান স্যান্ডস
মরু সাহিত্যের
এক অসামান্য
সৃষ্টি। আরবের
রাব’আল
খালি মরুভূমিতে
পাঁচ বছর
বেদুইনদের সঙ্গে
কাটিয়েছিলেন উইলফ্রেড
থেসিজার। বইটি
তার এ
মরু রোমাঞ্চের
স্মৃতিকথা। উইলফ্রেড
জন্মেছিলেন আদ্দিস
আবাবায়, ১৯১০
সালে। এরপর
পড়াশোনা ইটন
ও অক্সফোর্ডে।
সে সময়ই
তার নেশা
হয়ে ওঠে
বক্সিং। ১৯৩৫
সালে যোগ
দেন সুদান
পলিটিক্যাল সার্ভিসে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ
শুরু হলে
যুক্ত হন
সুদান ডিফেন্স
ফোর্সে। যুদ্ধে
অংশ নেন
আবিসিনিয়া, সিরিয়া
ও পশ্চিমের
মরুভূমিতে। যুদ্ধে
বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার
জন্য ব্রিটেনের
ডিসটিংগুইশড সার্ভিস
অর্ডারে সম্মানিত
হন। তিনি
ছিলেন দ্বিতীয়
বিশ্বযুদ্ধে মিত্রপক্ষের
দুটো বিখ্যাত
ইউনিটের সদস্য।
এর মধ্যে
এসওইর সদস্য
হিসেবে কায়রোয়
পেয়েছিলেন সিক্রেট
এজেন্ট হওয়ার
প্রশিক্ষণ। তারপর
এসএএস গ্রুপে
যুক্ত মরুভূমিতে
এনিমি লাইনের
পেছনে ঝুঁকিপূর্ণ
যুদ্ধে অংশ
নেন। তার
এ কঠোর
জীবন ও
মানসিকতা রাব’আল
খালির ধু-ধু
প্রান্তরে একজন
ইউরোপীয় হয়েও
টিকে থাকতে
সাহায্য করেছিল।
যুদ্ধ শেষে
শুরু করেন
ভ্রমণ—আরবের
সবচেয়ে বিরান
মরুভূমি রাব’আল
খালি, কুর্দিস্তান,
ইরাকের বিখ্যাত
জলভূমি, হিন্দু
কুশ, কারাকোরাম,
মরক্কো, আবিসিনিয়া,
কেনিয়া ও
তানজানিকা। তার
এসব ভ্রমণের
সবচেয়ে স্মরণীয়
হয়ে আছে
ইরাকের জলাভূমি
ও আরবের
রাব’আল
খালি মরুভূমি।
ইরাকের জলাভূমিতে
বসবাসকারী গোষ্ঠীকে
নিয়ে তিনি
লিখেছেন দ্য মার্শ
আরবস
আর রাব’আল
খালি ও
সেখানে বসবাস
করা বেদুইনদের
নিয়ে অ্যারাবিয়ান স্যান্ডস। দুটো
বই-ই
আরব নিয়ে
লিখিত বিবরণগুলোর
মধ্যে বিশেষ
মর্যাদা পেয়েছে।
উইলফ্রেড থেসিজার
মানুষ হিসেবে
ছিলেন রাব’আল
খালির বেদুইনদের
মতোই। নিজের
ব্রিটিশ পরিচয়
তাকে এতটুকু
প্রভাবিত করেনি।
অথচ তিনি
এসেছিলেন এক
অভিজাত ব্রিটিশ
সামরিক পরিবার
থেকে। জুলু
ওয়ারে ব্রিটিশ
সেনাবাহিনীর অধিনায়কের
নাতি ছিলেন
তিনি। এছাড়া
তার এক
চাচা ছিলেন
ব্রিটিশ ভারতের
ভাইসরয়। কিন্তু
এমন পরিবারে
জন্মেও ঔপনিবেশিক
আমলাতন্ত্রকে তিনি
পছন্দ করতেন
না। লালফিতা
কিংবা রাজনীতিকে
তিনি ঘৃণা
করতেন। সুদান
পলিটিক্যাল সার্ভিসে
তার চাকরি
ছেড়ে দেন
যোগদানের দুই
বছরের মাথায়।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক
শাসকরা যে
প্রগতি, বাণিজ্য,
আইন-শৃঙ্খলার
ধারণাগুলো প্রচার
করত তাতে
এক বিন্দু
আস্থা ছিল
না তার।
মরুভূমিতে তার
অনেক সঙ্গী
ছিলেন আইনের
চোখে অপরাধী।
অনেক ইউরোপীয় অভিযাত্রী নিজেদের ভ্রমণ শেষে করে ফিরে গিয়েছেন নিরাপদ জীবনে, মন দিয়েছেন ভ্রমণবৃত্তান্ত লিখতে। উইলফ্রেড কিন্তু সে রকম ছিলেন না। রাব’আল খালির অভিযানের সমাপ্তি টানতে হয়েছিল তাকে অনেকটা বাধ্য হয়ে। সৌদি, ওমান ও ব্রিটিশ সরকার উইলফ্রেড ও তার সঙ্গী বেদুইনদের এ অঞ্চলের শান্তি-শৃঙ্খলার জন্য হুমকি বিবেচনা করছিল। মরুর এ অভিযান সমাপ্তি টেনে তিনি চলে যান ইরাকের জলাভূমির আরবের সঙ্গে বসবাস করতে, সেখানে থাকেন সাত বছর। এরপর যান হিন্দুকুশ, আফগানিস্তান। সেখান থেকে কেনিয়ায়। কেনিয়ায় তিনি স্থানীয় আফ্রিকান গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে বসবাস শুরু করেন। জীবনের একেবারে শেষ কয়েকটি বছর তিনি ইংল্যান্ডে কাটিয়েছেন।
রাব’আল
খালিতে উইলফ্রেড
অতিক্রম করেছেন
প্রায় ১০
হাজার মাইল—তিনি
কোনো যান্ত্রিক
যান ব্যবহার
করেননি। বেদুইনদের
সঙ্গে চলেছেন
বেদুইন হয়ে।
হেঁটে অথবা
উটের পিঠে
তিনি এ
পথ চলেছেন।
সেকালে আরবের
মরুভূমিতে ইউরোপীয়রা
পা রাখত
ভূতাত্ত্বিক, প্রত্নতাত্ত্বিক
অনুসন্ধানে; আবার
কারো লক্ষ্য
হতো মরুভূমির
প্রাণিজগৎ নিয়ে
গবেষণা। অনেকে
আসতেন খোদ
আরব জাতিকে
নিয়ে নৃতাত্ত্বিক
গবেষণার উদ্দেশ্যে।
কিন্তু উইলফ্রেড
মরুর তপ্ত
বালিতে পা
রেখেছিলেন মরুভূমিকে
ভালোবেসে, বেদুইনদের
মুক্ত-স্বাধীন
জীবনের প্রেমে
পড়ে। অন্য
ইউরোপীয়দের সঙ্গে
নিজের আরব
অভিযাত্রার পার্থক্য
টেনে তিনি
নিজেই বলেছেন,
‘তারা
আমার চেয়ে
অনেক বেশি
কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য
তুলে এনেছেন,
কিন্তু তারা
কখনো এ
ভূমির আত্মাকে
অনুভব করতে
পারেননি, আরবদের
মাহাত্ম্যও তারা
দেখেনি।’
উইলফ্রেড লিখেছেন,
বিংশ শতাব্দীর
শুরুর দিকে
আরব পরিচয়টি
ছিল আরবের
অধিবাসীদের জন্য,
অনেক সময়
বেদুর সমার্থক
ছিল আরব।
আরব থেকে
আসা যারা
মিসর কিংবা
অন্যত্র যাযাবর
জীবনযাপন করতেন
তারা আরব
বলে পরিচিত
হতেন। কিন্তু
যারা কৃষিকাজ
বা নগর
জীবন বেছে
নিতেন তাদের
আরব বলা
হতো না।
পরবর্তী সময়ে
আরব জাতীয়তাবাদের
বিকাশ আরবিভাষী
যে কাউকেই
আরব পরিচয়ে
পরিচিত করে।
ইংরেজি বা
বাংলা ভাষায়
বেদুইন শব্দটি
প্রচলিত হলেও
তারা নিজেরা
এটি কদাচিৎ
ব্যবহার করেন।
কারণ শব্দটি
দুবার বহুবচন।
আরবি ভাষায়
‘বেদুই’
একবচন আর
‘বেদু’
হলো বহুবচন।
সহজ কথায়
এ বেদু
বা প্রচলিত
বাংলায় বেদুইন
হচ্ছে আরবের
মরুভূমির উটপালক
যাযাবর সম্প্রদায়।
রোরি স্টুয়ার্ট
অ্যারাবিয়ান স্যান্ডস
বইয়ের ভূমিকায়
লিখেছেন, ‘অনেক
ইউরোপীয় ও
আমেরিকানরা ঐতিহ্যবাহী
সমাজকে বুঝতে
পারেন না,
তাদের কাছে
এমন সমাজ
ভিনগ্রহের কিছু
মনে হয়।
এমন সমাজকে
তারা সম্মানও
করতে চান
না। আধুনিক
রাষ্ট্র অবশ্য
আরবের সেই
ঐতিহ্যবাহী সমাজ
ব্যবস্থাকে ভেঙে
দিয়েছে অনেক
আগেই। উইলফ্রেড
থেসিজার যেসব
দেশ ভ্রমণ
করেছেন—সুদান,
ইরাক, আফগানিস্তান—সবাই
এখন আধুনিক
রাষ্ট্রের ধারণাগুলো
প্রতিষ্ঠিত করতে
ব্যস্ত—আইনের
শাসন, নাগরিক
সমাজ, স্বাধীনতা,
জবাবদিহিমূলক সরকার।
এসবই এখন
বড় চাওয়া।
এসব প্রতিষ্ঠার
উদ্দেশ্য সবখানেই
সৎ ও
ইতিহাসের এ
স্রোত অনিবার্য।
কিন্তু থেসিজার
দেখিয়েছেন আধুনিক
রাষ্ট্রের আগে
কত শক্তিশালী,
তাত্পর্যপূর্ণ সমাজ
ব্যবস্থা ছিল
বেদুইনদের।’
উইলফ্রেড থেসিজার
স্পষ্টভাবে উচ্চারণ
করেছেন বেদুইনরা
কোনো বর্বর
নন, বরং
তারা প্রাচীন
এক সভ্যতার
বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকার।
তারা নিজেদের
সমাজ ব্যবস্থার
মধ্যে ব্যক্তিস্বাধীনতা
ও শৃঙ্খলার
চর্চা করতেন।
তিনি নিজেও
ছিলেন বেদুইনদের
মতোই। তারা
যেমন আরবের
কোনো নগরে
থিতু না
হয়ে মরুর
তপ্ত বালিরাশির
মায়াকেই আপন
করে নিয়েছিলেন,
তেমনি উইলফ্রেডও
কোনো ইউরোপীয়
দেশে নিশ্চিন্ত
জীবনযাপন বেছে
নেননি। বেদুইনরা
স্বাধীনতা, সাহস,
শক্তি, বদান্যতার
চর্চা করত,
উইলফ্রেড নিজেও
ঠিক এসব
গুণের ভক্ত
ছিলেন।
উইলফ্রেড মনে
করেন, তেল
আবিষ্কার ও
আধুনিক প্রযুক্তি
আরবের মরুভূমি
ও জনজীবনকে
দূষিত করেছিল।
মরুর বালিতে
তখন বড়
বড় লরির
চাকার দাগ
আর নানা
জঞ্জাল।
রাব’আল
খালির দীর্ঘ
যাত্রাও দুই
বেদুইন তরুণ
ছায়ার মতো
উইলফ্রেডের সঙ্গী
হয়েছিলেন—সালিম
বিন কাবিনা
ও বিন
ঘাবাইশা। এদের
সঙ্গে উইলফ্রেড
খালি পায়ে,
নয়তো উটের
পিঠে চলতেন।
তার পোশাকও
ছিল বেদুইনের।
রাব’আল
খালির সে
সফরের ৫০
বছর পর
ঘাবাইশাকে বলা
হয়েছিল উইলফ্রেডকে
এক কথায়
বর্ণনা করতে,
তিনি তখন
বলেছিলেন—‘তিনি
বিশ্বস্ত, উদার
এবং কোনো
কিছুকে ভয়
পেতেন না।’
বেদুইনদের ভবিষ্যৎ
নিয়ে থেসিজারের
সব অনুমান
সঠিক হয়নি।
তিনি ভেবেছিলেন
বেদুইনরা সবসময়ই
আধুনিক জীবনের
সুবিধাকে এড়িয়ে
চলবে। কিন্তু
না, অনেক
বেদুইন হাসিমুখেই
জেনারেটর ও
ছোট পিকআপ
ব্যবহার শুরু
করেছিল। এতে
ধীরে ধীরে
শিথিল হয়
বেদুইনদের নিজস্ব
রীতিনীতি, সমাজিক
প্রথা।
আধুনিক সমাজের
কোনো নৈতিকতা
ধারণা না
করেও বেদুইনদের
নিজস্ব রীতিনীতি
কেমন মানবিক,
উন্নত ছিল
তার বহু
উদাহরণ অ্যারাবিয়ান স্যান্ডস বইয়ে
ছড়িয়ে আছে।
একটি উদাহরণ
দিয়ে এ
লেখার ইতি
টানব। থেসিজার,
কাবিনারা প্রায়
মাসখানেক হলো
ভালো কোনো
খাবার খেতে
পাননি। অনাহারে
প্রায় মরণদশা।
এর মধ্যে
একজন একটি
বড় খরগোশ
শিকার করলেন।
পাত্রে অবশিষ্ট
আটা আর
খরগোশের মাংস
চড়িয়ে সবাই
অধীন আগ্রহে
রান্না শেষ
হওয়ার অপেক্ষায়,
এমন সময়
দিগন্তে উদিত
হলেন তিন
আরব। তারা
সবই তাদের
কুশলাদি জানতে
চাইলেন এবং
কফি দিয়ে
প্রাথমিক আপ্যায়ন
করা হলো।
এরপর নিজেদের
সেই খরগোশের
মাংসের খাবার
সবটাই অতিথিদের
দিয়ে দেয়া
হলো। কাবিনা
ও অন্য
বেদুইনরা বারবার
বলছিলেন, অতিথিদের
খোদাই পাঠিয়েছেন।
আজ সৌভাগ্যের
দিন। অতিথিরা
খাওয়ার সময়
যোগ দেয়ার
আহ্বান জানালেও
কাবিনা ও
অন্যরা শুধু
বলছিলেন, আপনারা
আমাদের অতিথি।
উইলফ্রেড এ
ঘটনা উল্লেখ
করে লিখেছিলেন,
ক্ষুধায় তার
অবস্থা ভয়ানক
হলেও অন্যদের
মতো তাকেও
বলতে হয়েছিল
অতিথিরা সৌভাগ্যের
দূত!
শানজিদ অর্ণব: লেখক ও অনুবাদক





