মরুভূমির বেদুইনদের খাদ্য হয়ে উঠেছিল খেজুর, উট, ভেড়া, ছাগলের দুধ ও মাংস। সুপ্রাচীনকালে বেদুইনরা সমুদ্র থেকে মাছ ধরত বলেও প্রচলিত। এখনো উপকূলের আরব ও বেদুইনদের খাদ্যতালিকায় মাছ দেখা যায়। এসবের পাশাপাশি প্রধান খাদ্য হয়ে উঠেছিল রুটি। ভ্রাম্যমাণ জীবনের উপযোগী করে রুটি তৈরির ব্যবস্থা করত তারা। যেমন ময়দার সঙ্গে লবণ এবং কখনো সামান্য পরিমাণে পনির মিশিয়ে রুটি তৈরি হতো। আমাদের মতো বেলন-চাকিতে নয়, হাতের তালুতে যথাসম্ভব গোল করে নিয়ে কয়লার আগুনে সরাসরি সেঁকা হতো রুটিগুলো। এর সঙ্গে থাকত উট কিংবা ছাগলের দুধ, দই, পনির, মাখন ইত্যাদি। সিনাই উপত্যকার অধিবাসীরা ‘সামেন সাহি’ নামে মাখন তৈরি করে।

খাদ্যের উপযোগিতা দুই ধরনের—জীবনধারণ ও রসনা বিলাস। মরুভূমির কঠিন জীবনের মধ্যে বেদুইনরা রসনা বিলাসের ব্যবস্থা করে নিত। এক্ষেত্রে নানা প্রকার মাংসের পদ তৈরি তাদের জন্য সহজ ছিল। কেননা প্রায় সবাই পশু পালন করত। মাংসের পদগুলো কখনো রুটি, কখনো ভাতের সঙ্গে খাওয়া হয়। সেকালে অবশ্য ভাত ততটা সহজলভ্য ছিল না। পাশাপাশি অস্থায়ী আবাসের কারণে সহজে রান্না করার কিছু পদ্ধতি তারা আবিষ্কার করেছিল। ‘মাকলুবা’ নামক খাবারটি তেমনই। মাকলুবা অর্থ মূলত উল্টে নেয়া। এ খাবার কিছুটা বিরিয়ানি ধাঁচের। প্রধানত বিভিন্ন মসলা দিয়ে ছাগলের মাংস রান্না করা হয় এবং পরে ভাত তৈরি করে এর ওপর দিয়ে উল্টে নেয়ার কারণে খাবারটির এমন নামকরণ করা হয়েছে। পশুর মাংসের পাশাপাশি মুরগি, এমনকি মাছ দিয়েও মাকলুবা তৈরি হয়। আজকাল উটের মাংস বিভিন্ন পদ্ধতিতে রান্না করে স্বাদে বৈচিত্র্য আনা হয়।


উত্তর আফ্রিকার বেদুইনদের ঐতিহ্যবাহী একটি খাবার ‘তাজিন’। ‘স্টু’ ঘরানার খাবারটিতে ভেড়া কিংবা ছাগলের মাংসের সঙ্গে নানা ধরনের সবজি ব্যবহার করা হয়। জলপাই তেল ব্যবহার করে খাবারটির স্বাদ বাড়ানো হয়। তাজিনের প্রস্তুত প্রণালি অঞ্চলভেদে বিচিত্র হতে পারে। বেদুইনদের খাবার তৈরিতে কয়লার ব্যবহার লক্ষণীয়। ‘মান্দি’ নামে একটি ইয়েমেনি পদ যেটি মূলত চাল ও মুরগির মাংস বিভিন্ন মসলা মেখে মাটির নিচে কয়লার আগুনে সেদ্ধ করে তৈরি হয়। ‘মাদফুন’ও প্রায় একইভাবে মুরগি ম্যারিনেট করে বালিতে গর্ত করে চারপাশে কয়লা দিয়ে রান্না করা হয়। খাবারটি উপসাগরীয় এলাকা, বিশেষত সৌদিতে জনপ্রিয়। ইয়েমেনের আরেকটি খাবার ‘চিকেন মাজবি’ খানিকটা আলাদা। মান্দি ও মাদফুনে মুরগির মাংস সেদ্ধ করা হলেও চিকেন মাজবিতে তা ঝলসানো হয়। এছাড়া পোলাও, কাবসা, বিরিয়ানিও বেদুইনদের পছন্দ। রুটির ক্ষেত্রে কয়লায় সেঁকা ছাড়াও তন্দুরেও তৈরি করা হয়।

বেদুইনদের পছন্দের পানীয়র মধ্যে কফি, কাওয়া, ছাগল ও উটের দুধ প্রধান। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের চা তাদের পছন্দ। একটা সময়ে বেদুইনদের মধ্যে মদ্যপান প্রচলিত ছিল। পরবর্তী সময়ে ইসলামের আগমনে তা নিষিদ্ধ হয়। দৈনন্দিন জীবনে সকালের নাশতায় সাধারণত বেদুইনরা খেজুরসহ নানা ধরনের শুকনো ফল প্রভৃতি খেতে পছন্দ করে। দুপুর ও রাতে রুটির সঙ্গে মাংসের নানা পদ। আজকাল সবজিও পাওয়া যায়। মিষ্টিজাতীয় খাবারের ক্ষেত্রে বেদুইনরা ততটা আগ্রহী নয়। তবে দুধ থেকে তৈরি দই, লাচ্ছির মতো পানীয় তারা তৈরি করে। বিশ্বায়নের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের খাদ্যাভ্যাস বদলে যাচ্ছে। বেদুইনদের ঐতিহ্যবাহী খাবারের পাশাপাশি আধুনিক খাবারও তাদের খাদ্যতালিকায় থাকে।