জাহাজের সঙ্গে আদার ব্যাপারীর দূরত্ব যতখানি, তার চেয়ে বেশি দূরত্ব ছিল ফতেয়াবাদের মৌলভী ফসিহুদ্দিনের পরিবারের। কিন্তু সেই দূরত্ব অতিক্রম করে নসি মৌলভী কীভাবে সমুদ্রগামী জাহাজের নাগাল পেয়েছিলেন সে একটা বিস্ময়কর ব্যাপার ছিল। নসি মৌলভী ছিলেন মৌলভী ফসিহুদ্দিনের কনিষ্ঠ পুত্র। উনিশ শতকের রক্ষণশীল পরিবারের বৃত্ত ভেঙে মাওলানা পরিচয় ছাপিয়ে তিনি জাহাজের সারেং হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। সেটাই শেষ কথা নয়। সারেং পেশা একটা নিমিত্তমাত্র। তার মূল ভূমিকা ছিল অন্য খানে। নিজের অজান্তেই তিনি উত্তরসূরিদের বাতিঘর হয়ে উঠেছিলেন। বিশ শতকে যে বাতিঘরের আলোয় পথ খুঁজে পেয়েছিলেন তার পরবর্তী বংশধররা। আলোকিত করেছিলেন চট্টগ্রামের শিল্প সাহিত্যের আঙিনা। আজকের চট্টগ্রামে আমরা তাদের চিনি সাহিত্যিক মাহবুবুল আলম কিংবা সাহিত্যিক ওহীদুল আলমের পরিবার হিসেবে। এরা দুজনই ছিলেন নসিহুদ্দিন মৌলভীর সন্তান।
মৌলভী ফসিহুদ্দিনের প্রথম দুই সন্তান সবিহুদ্দিন ও মলিহুদ্দিনও ছিলেন বিখ্যাত মাওলানা। কনিষ্ঠ সন্তান নসিহুদ্দিন জীবনের প্রথম পর্যায়ে মৌলভী হিসেবে বেড়ে উঠলেও পরবর্তীকালে তিনি পরিবারের ধারা থেকে আলাদা হয়ে নিজস্ব জগতে বিচরণ শুরু করেন এবং সমুদ্রের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলেন। সমুদ্রের সঙ্গে মিতালি পাতানোর পরও তিনি মাওলানা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু তার সন্তানদের তুলে দিয়েছিলেন ভিন্ন এক মহাসড়কে। চার পুত্রকে তিনি মাওলানা বানানোর বদলে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এ সিদ্ধান্ত তার বংশে যে নতুন ধারার সূচনা করেছিল তা শতবর্ষ পরেও অব্যাহত আছে। সেই সময়ের যেকোনো রক্ষণশীল মুসলমান পরিবারের জন্য ওটা প্রায় বিপ্লবের শামিল বলা চলে।
নসি মৌলভীর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে তার কনিষ্ঠ পুত্র ওহীদুল আলম লিখেছিলেন—‘বাবা ছিলেন ভিন্ন ধাতের লোক। সংসারে খুঁটিনাটি তিনি বরদাশত করতেন না। বাহিরে ব্যপ্ত পৃথিবী তার করুণাপ্রবণ মনকে হাতছানি দেয়। দৈনন্দিন জীবনের তেলনুনের হিসাব করা তার ধাতে ছিল না। আর দুই ভাইয়ের চেয়ে তিনি শারীরিক গঠনে উন্নত, দৃষ্টিও তার উন্নত। তার মনের পাখি আসমানের নীল সীমানায় ঘুরে বেড়ায়। ঘরের দিকে তার দৃষ্টি ছিল না। ঘরের সাংসারিক প্রয়োজনের কথা স্বামীর সামনে উত্থাপন করার সাহস ছিল না মায়ের। তাই প্রতিবেশী পরিবারের অনেক ঝাল মাকে নীরবে সহ্য করতে হতো।’ [পৃথিবীর পথিক-ওহীদুল আলম]
প্রতিবেশী পরিবার বলতে এখানে নসি মৌলভীর দুই অগ্রজের পরিবারকে বোঝানো হয়েছে। ফসি মৌলভীর বড় আর মেজ পুত্রই ছিল সংসারের আসল কাণ্ডারি। তাদের হাতেই সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ। মৌলভী নসিহুদ্দিনের আয়-রোজগার তেমন ছিল না। সংসারের প্রতি উদাসীন থাকার ফলে পরিবারও ছিল অবহেলিত। কিন্তু এর মাঝে একদিন তিনি একটা যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে পরিস্থিতি বদলে ফেললেন। ওহীদুল আলম লিখেছেন—
‘একবার হাটের দিন বাজার করতে গিয়ে বাবা আর ফিরে এলেন না। পশ্চিমের পার্বত্য পথ দিয়ে বারৈয়াঢালা পথে তিনি সোজা পার হলেন কলকাতায়। খিদিরপুরের জাহাজে তিনি হাজির হলেন। জাহাজের খালাসি সবাই চাটগাঁর লোক। আর চাটগাঁয়ের মৌলভী নসিহুদ্দিনের নাম সর্বত্র। মোল্লগিরি করা ছাড়াও বাবা ছিলেন হরফুনি। ওয়াজের মাহফিলে তার জুড়ি ছিল না। সাহস ও বুদ্ধি এ দুটি নিয়ে তিনি অতি অল্পকালেই জাহাজের সারেংয়ের পাশ দিয়ে ফিরে এলেন দেশে।’ [পৃথিবীর পথিক-ওহীদুল আলম]
জাহাজের সারেং হয়ে ফিরে আসার পর সংসারে একটু স্থিতি আসবে মনে হলেও তা হলো না। টাকা-পয়সার দিকে তার তেমন মন নেই। সারেং হওয়ার পরও উদাসীন অবস্থায় ঘুরে বেড়ান গায়ে বাতাস লাগিয়ে। কিছুদিন পর আবারো জাহাজে চলে গেলেন তিনি। দীর্ঘদিন বিদেশে থাকার পর ফিরে এলেন এবং এবার পরিবারকে নিয়ে একটা নতুন সিদ্ধান্ত নিলেন। পৈতৃক ভিটা ত্যাগ করে ফতেয়াবাদে শ্বশুরালয়ের কাছে একটা বাড়ি তৈরি করলেন তিনি। স্ত্রী-পুত্র সবাইকে নিয়ে সেখানে চলে গেলেন পাকাপাকিভাবে। এবার আর ভাই-ভাবির গঞ্জনা সহ্য করতে হবে না তার স্ত্রীকে। পিত্রালয়ের ছায়ায় ভালো থাকবেন, সেই ভরসায় তিনি এ সিদ্ধান্ত নিলেন। এ পর্যায়ে সংসারে খানিকটা সুখ ও স্বস্তির পরশ দেখা গেল। তখন তার সংসারে এক কন্যা ছাড়াও আলোকিত করে আছে চার পুত্র—শামসুল আলম, মাহবুবুল আলম, দিদারুল আলম ও ওহীদুল আলম।
নতুন বাড়িতে যাওয়ার পর নসি মৌলভী ছেলেদের ভবিষ্যৎ গন্তব্যও বদলে দিলেন। তিনি পারিবারিক রীতিমাফিক পুত্রদের মাদ্রাসায় পাঠানোর বদলে বাংলা স্কুলে পড়তে দিলেন। যার ফলও পেতে লাগলেন শিগগির। বড় ছেলে শামসুল আলম ১৯১২ সালে ফতেয়াবাদ স্কুল থেকে বৃত্তি পরীক্ষায় শীর্ষস্থান অধিকার করে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। মেজ পুত্র মাহবুবুল আলমও দারুণ প্রতিভাবান ছিলেন। অতঃপর হাইস্কুলে ওঠার পর দুই ভাইকে শহরের কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয়া হয়।
বড় দুই ছেলে মেট্রিক পাস করে একটু লায়েক হয়ে উঠতেই তাদের জন্য বউ নিয়ে আসলেন নসি মৌলভী। বড় ছেলে শামসুল আলম খানিকটা উদাসীন দার্শনিক প্রকৃতির। তিনি তখনো তেমন কিছু করেন না। মেজ পুত্র মাহবুবুল ফতেয়াবাদ সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে কাজ নিয়েছিলেন। ছেলেদের সংসারী করার পর নসি মৌলভী আবারো জাহাজে উঠে গেলেন। এবারের গন্তব্য বসরা। তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে।
সেই সময় হঠাৎ করে মেজ পুত্র মাহবুবুল আলম সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি যুদ্ধে যাবেন। শিল্পপতি এ কে খানের পিতা আবদুল লতিফ খান তখন ফতেয়াবাদের সাব-রেজিস্ট্রার। তার সুপারিশে মাহবুবুল আলম মহাযুদ্ধে অংশ নেয়ার জন্য দেশত্যাগ করলেন। তারপর প্রায় এক বছর কেটে গেল। পিতাপুত্র কারো খোঁজ নেই। স্বামী ও সন্তান দুজনকে হারিয়ে ফেলার বেদনায় নসি মৌলভীর স্ত্রী শোকাহত হয়ে শয্যা নিলেন। সে রকম একটা সময়ে নসি মৌলভী হঠাৎ দেশে ফিরলেন। ওহীদুল আলমের ভাষায়—
‘একদিন হঠাৎ পশ্চিম পাড়ার সুবহান পিঠের ওপর এক বিরাট বাক্স হাতে বোঁচকা নিয়ে আমাদের বাড়িতে ঢুকল। আমি আর বুবু অবাক হয়ে চেয়ে রইলাম। খুইল্লাদা স্কুলে গেছেন। বড়দা পা দুটি বেড়ার ওপর দিয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে আছেন। চোখ দুটি উপরের চালে নিবদ্ধ। তিনি ভাবছেন তো ভাবছেন। এ সময়ে সুবহান বাক্সটা নামাল ভেতরের উঠানে। হঠাৎ নজরে পড়ল সামনের পুল পার হয়ে জঙ্গি পোশাক পরে বাবা আসছেন। “বাবা এসেছে, বাবা এসেছে” বলে আমাদের দুজনের সেকি শোরগোল। সত্যি বাবার এ রকম পোশাক দেখে ভয় পেয়ে গেলাম আমি। খাকি প্যান্ট পায়ে মিলিটারি বুট। গায়ে মোটা সোয়েটার। তখন মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চলছিল। সেখানকার জাহাজে সারেংয়ের কাজ করেন বাবা। বেসামরিক হলেও জাহাজের লোকরা সামরিক পোশাক পরিহিত ছিল। বাবা বোঁচকা খুলছিলেন। বোঁচকা খুলতেই মস্কটি হালুয়ার সুগন্ধ বের হলো। কয়দিন হলো মা বিছানা ছেড়েছেন। ঘরের কাজে এখনো হাত দেননি। বড় ভাবি কাজকর্ম করছেন। বাবাকে প্রশ্ন করতে মা চিরদিনই ভয় পান। প্রশ্ন করার আগেই বাবা বললেন, “চিন্তা কোরো না, মাহবুবুল ভালো আছে। তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। একবার কয়েকজন বন্ধু নিয়ে সে আমার জাহাজে এসেছিল। যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে। বাঙালি সৈন্যরা সহসাই ছাড়া পাবে।” বাবার মুখে এ খবর শুনে মার বুক থেকে বিরাট পাথর নেমে গেল। এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন তিনি।’ [পৃথিবীর পথিক-ওহীদুল আলম]
সত্যি সত্যি মেজ পুত্র মাহবুবুল যুদ্ধ সেরে কিছুদিন পরেই দেশে ফিরেছিলেন। সেই সঙ্গে সংসারে ফিরে এসেছিল সুখ স্বাচ্ছন্দ্য।
নসি মৌলভীর চার পুত্রই প্রতিভাবান ছিল। মেজ পুত্র মাহবুবুল আলম ও কনিষ্ঠপুত্র ওহীদুল আলম বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিক হিসেবে গড়ে উঠেছিলেন। তাদের দুই পরিবার চট্টগ্রামের বিশিষ্ট সাহিত্যিক পরিবার হিসেবে পরিচিত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তার অন্য দুই পুত্র অকালে মৃত্যুবরণ করেন। বড় পুত্র শামসুল আলম পরিবারের মধ্যে সবচেয়ে অগ্রসর ও প্রগতিশীল তরুণ ছিলেন। কিন্তু তিনি তার শিশুকন্যার অকাল মৃত্যুতে সংসার বিবাগী হয়ে পড়ে একসময় বার্মা চলে গিয়েছিলেন। বার্মায় তিনি যখন ব্যবসা-বাণিজ্যে মোটামুটি প্রতিষ্ঠা লাভ করতে যাচ্ছিলেন তখনই বার্মিজ-বাঙালি দাঙ্গা শুরু হয়। বার্মিজরা রেঙ্গুন-আকিয়াবে বাঙালিদের বেধড়ক হত্যা করছিল। সে দাঙ্গায় এক বন্ধুকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন। নসি মৌলভীর সেজো পুত্র দিদারুল আলম প্রতিভাবান সাহিত্যিক হিসেবে বেড়ে উঠেছিলেন। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যিক বন্ধু ছিলেন তিনি। দিদারুল আলমও অনিরাময়যোগ্য এক বক্ষব্যধিতে আক্রান্ত হয়ে অকাল মৃত্যুবরণ করেছিলেন।
কবি নজরুল ত্রিশের দশকে যখন চট্টগ্রামে আসেন, তিনি দিদারুল আলমের আতিথ্য গ্রহণ করে তাদের বাড়িতে কয়েকটা রাত কাটিয়েছিলেন। যে বাড়িতে বসে নজরুল তার বিখ্যাত কবিতা ‘বাতায়ন পাশে গুবাক তরুর সারি’ লিখেছিলেন—সেটি ছিল নসি মৌলভীর বাড়ি।
হারুন রশীদ: সভ্যতা ও ইতিহাস অনুসন্ধানী লেখক





