উপকূলীয় বাণিজ্য, সমুদ্রপথে আন্তঃদেশীয় বাণিজ্য কিংবা অর্থনৈতিক ইতিহাসের নতুন নতুন দিগন্ত সম্পর্কে আমাদের দেশে চর্চা খুবই কম, এমনকি আলোচনাও খুব একটা দেখা যায় না। বণিক বার্তা পত্রিকার সাময়িকী সিল্করুট ইতিহাসের নানা বিষয় নিয়ে অনেক সংখ্যা প্রকাশের পর এবার বাঙালিদের সমুদ্র অভিযাত্রা নিয়ে একটি সংখ্যা বের করার উদ্যোগ গ্রহণ করায় তাদের সাধুবাদ জানাই। পত্রিকাটির পক্ষ থেকে অতি স্বল্প সময়ে একটি লেখা দেয়ার অনুরোধ করা হলে অনেকটা বাধ্য হয়ে এই বিষয়ে কিছু একটা লেখার জন্য কলম ধরেছি।

১৮ শতকে শিল্প বিপ্লবের হাত ধরে ইউরোপবাসী দুনিয়াকে অনেক পেছনে ফেলে এগিয়ে যায়। ইতিহাসে এই যুগটা হলো আধুনিক কাল এবং বিশ্বব্যাপী ইউরোপীয় উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠার এক জমজমাট গল্প, যা মূলধারার ডিসকোর্স বা বয়ান হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। বিস্ময়কর হলেও সত্য যে একই সময়ে বাঙালিদের সমুদ্র অভিযাত্রার হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস রয়েছে, যা মূলধারার ইউরোপীয় বিশ্বায়ন ও সমুদ্র বাণিজ্যের বহুমুখী বয়ানের নিচে চাপা পড়ে গেছে। বড়জোর সমুদ্র অভিযাত্রা, নাবিকদের ইতিহাস বা সমুদ্র বাণিজ্যের মূল আলোচনায় উপকথা হিসেবে বিবর্ণ হয়ে উপস্থাপিত হয়েছে।

প্রিয় পাঠক, আজকের লেখার পরবর্তী অংশে বাঙালিদের মধ্যে একদল দুঃসাহসী নাবিকের ইতিহাস তুলে ধরা হবে। প্রাক-আধুনিক যুগ থেকে এরা পরিচিত ছিলেন লস্কর হিসেবে এবং ইউরোপীয় ডিসকোর্সে লস্কর কথাটি ব্যবহার করা হতো প্রাচ্যবাদী মানসিকতা থেকে, যেখানে অশ্বেতাঙ্গদের দেখা হতো ভিন্নভাবে। ১৯৩৬ সালে আইএলও সম্মেলনে আইনগতভাবে পৃথিবীর সব নাবিকের পরিচয় হয় এক অর্থাৎ সিমেন (Seamen)। মনে রাখা প্রয়োজন, মানবসভ্যতার ইতিহাস সবচেয়ে বেশি এবং দ্রুততম সময়ে পরিবর্তিত হয়েছে ঔপনিবেশিক শাসনামলে। বিশেষ করে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং সামগ্রিক জীবনধারায় ব্যাপক পরিবর্তন (নগরায়ণ ও স্থানীয় এলিট), আধা-পরিবর্তনের (গ্রামীণ জীবনধারা) প্রভাব মানবজাতির বৃহত্তর অংশের সুদূর অতীত এবং ঔপনিবেশিক অতীতের মধ্যে বিস্তর ফারাক তৈরি করেছে। ১৮ শতক থেকে দুনিয়াজুড়ে উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের এই বহুমুখী অভিঘাত এবং এর প্রতিক্রিয়ায় যে জাতীয়তাবাদী আদর্শ ও আন্দোলনের (এলিট, সংকীর্ণ কিংবা অন্তর্ভুক্তিমূলক) জন্ম সেই রূপান্তরের জানা-অজানা ইতিহাস অবহিত হওয়া অতীব প্রয়োজন। শিল্প বিপ্লব-উত্তর ইউরোপ ‘জ্ঞান-শক্তি’ ও সামরিক শক্তির বলে সমগ্র বিশ্বে এমন জটিল পরিবর্তন এনেছে যে তার ইতিহাসচর্চা আজ কেবল প্রয়োজনীয়ই নয়, মানুষের জীবনধারার সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য অপরিহার্যও বটে। এখানেই প্রাসঙ্গিক বাঙালি লস্কর/নাবিকদের সমুদ্র অভিযাত্রার হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের যোগসূত্র খোঁজার, যার একটি প্রয়াস এ লেখায় নেয়া হয়েছে।

প্রথমেই একটা প্রশ্ন মনে আসবে, কোন অঞ্চলের মানুষ এ সমুদ্র অভিযাত্রায় অংশ নিয়েছিলেন। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম লেখক শংকর বঙ্গ বসুন্ধরা গ্রন্থে এ প্রসঙ্গে লিখেছেন, আধুনিক কালে বাঙালিদের মধ্যে সমুদ্র অভিযাত্রা ও নৌবাণিজ্যে ব্যাপকভাবে অংশ নিয়েছেন সিলেটের মানুষ। কলকাতার খিদিরপুর বন্দর এলাকাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল সমুদ্রযাত্রী বাঙালি নাবিকদের জগৎ, যা বিশ শতকের প্রথমার্ধে কলকাতার স্থানীয় রাজনীতিকেও প্রভাবিত করেছিল। অবশ্য সবাই সিলেটের লোক ছিলেন তা নয়। অল্পসংখ্যক নোয়াখালী ও চট্টগ্রামের লোকও ছিলেন। অন্যদিকে তখনো চট্টগ্রাম বন্দর ছিল আঞ্চলিক বন্দর এবং কলকাতার বিকল্প হিসেবে ওই বন্দরকে তৈরি করা হচ্ছিল। তবে সন্দ্বীপের এবং নোয়াখালী উপকূলের লোকজন স্বল্পমাত্রায় চট্টগ্রাম বন্দর থেকেও সমুদ্রযাত্রায় অংশ নিয়েছেন বলে কিছু ঐতিহাসিক তথ্য রয়েছে।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র ছিল কলকাতা, যেখানে লন্ডন, প্যারিস বা নিউইয়র্কের পর হালফিল ফ্যাশন, নতুন মডেলের গাড়ি দ্রুত চলে আসত। তদুপরি মহানগরী কলকাতার বহুজাতিক সংস্কৃতিও ব্রিটিশদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল। এখান থেকে পণ্য পরিবহন, পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আনা পণ্য ভারতবর্ষের বহু প্রান্তে রেল ও সড়কপথে পৌঁছে দেয়া যত সহজ ছিল, তা অন্য কোনো শহর বা বন্দর থেকে পৌঁছে দেয়া সম্ভব ছিল না। ফলে কলকাতার খিদিরপুর অঞ্চল বহুজাতিক মানুষের পদভারে মুখরিত হয়ে ওঠে। হাজার হাজার সমুদ্র অভিযাত্রী নাবিকের কর্মচাঞ্চল্যের এক অজানা ইতিহাস বর্তমান সময়ে উদ্ধার করা অসম্ভব না হলেও এক বিরাট চ্যালেঞ্জ বটে। কেন এ কথা বলছি তা নিচের সারণি বিশ্লেষণ করলে অনুধাবন করা যাবে।

সারণি বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, বিশ শতকে এসে ইউরোপীয় বাণিজ্য জাহাজগুলোয় এশীয় নাবিক সংখ্যা ক্রমাগত বেড়েই চলেছিল এবং দুই মহাযুদ্ধের অন্তর্বর্তীকালে তা ইউরোপীয় নাবিকদের সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর ইতিহাসকে মূলধারার বয়ান এবং ইউরোপীয় মহাফেজখানাগুলোর নিচ থেকে বের করে আনা আজ অনেকটাই অসম্ভব।

খিদিরপুরে নাবিকদের সাধারণত দুই বছরের জন্য নিয়োগ দেয়া হতো। জাহাজে কাজ করার পর ওই সময়ের মধ্যে এরা অর্থকড়ি নিয়ে ফিরে আসতেন এবং কলকাতা থেকে সিলেটে ফিরে যেতেন। কলকাতা থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরে তাদের গ্রামের বাড়ি ফিরে যাওয়া এবং নতুন করে আবার সমুদ্রযাত্রায় অংশ নিতে খিদিরপুরে এসে জাহাজের জন্য অপেক্ষা করতে হতো। ফলে তাদের বেশকিছু সময় খিদিরপুরে গেস্ট হাউজে থাকতে হতো। ওই সময় আবাসনের এ কাজও করতেন সিলেট থেকে আসা ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা, যারা নাবিকদের কাছে ‘বাড়িওয়ালা’ নামে পরিচিত ছিলেন। এরা পরিচয়সূত্রে স্বদেশী নাবিকদের বাকিতে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করতেন। বিনিময়ে চুক্তি হতো যে জাহাজ থেকে ফিরে আসার পর অর্জিত অর্থ থেকে বাড়িওয়ালার পাওনা মিটিয়ে দেয়া হবে। সমুদ্রগামী নাবিকদের এ অজানা জগতে কীভাবে সিলেটিরা আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত করেছিল তার একটি সূত্র উপরিউক্ত তথ্য বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যায়। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল ওই সময় সমুদ্রগামী শ্রমিকদের নবগঠিত ইউনিয়নের ভূমিকা। এ ইউনিয়ন গঠন করেছিলেন সিলেটে জন্মগ্রহণকারী বিশ্বখ্যাত ট্রেড ইউনিয়ন নেতা আফতাব আলী। ওই সময় হোসেন সোহরাওয়ার্দী কলকাতায় শ্রমিক রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়েছিলেন এবং খিদিরপুর থেকে নির্বাচিত হয়ে কলকাতা পৌরসভার ডেপুটি মেয়র হয়েছিলেন। উল্লেখ্য, ওই সময় মেয়র পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস। যা হোক, আফতাব আলী ১৯২০-এর দশকের শেষে, ১৯৩০ ও ১৯৪০-এর দশকে কলকাতায় শ্রমিক রাজনীতি, বিশেষ করে সিম্যান ইউনিয়নের  অবিসংবাদী নেতায় রূপান্তরিত হন এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর রাজনৈতিক উত্থানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ১৯৩০ ও ১৯৪০-এর দশকে আফতাব আলীর নেতৃত্বে কলকাতায় এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে শ্রমিক ইউনিয়ন বাম ধারার ট্রেড ইউনিয়নের মাধ্যমে সমুদ্রগামী নাবিক তথা লস্কর শ্রমিকদের সম্পর্কে ‘গত্বাঁধা’ ধারণা পরিবর্তনের প্রচেষ্টা চালান। ১৯৩০-এর দশকে আফতাব আলী অনেকগুলো শ্রমিক ইউনিয়নকে একত্র করে অল ইন্ডিয়া সিম্যান ফেডারেশন প্রতিষ্ঠা করেন এবং তিনি নিজে ওই সংগঠনের সভাপতি নিযুক্ত হন। সংগঠনের শীর্ষ নেতা হিসেবে জেনেভায় আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার একাধিক সম্মেলনে অংশ নিয়ে জোরালো দাবি উত্থাপন করেন এবং এশীয় নাবিকদের পক্ষে বেশকিছু অধিকার ও সমধিকার অর্জনে সক্ষম হন। তিনি আইএলওসহ ব্রিটিশ গণমাধ্যমে ব্রিটিশ ডক ইউনিয়নগুলোর বর্ণবাদী আচরণের বিষয়টি তুলে ধরেন এবং সবার নজরে আনেন। ভারতীয় নাবিকদের প্রতি ব্রিটিশ নাবিকরা তাদের দেশের জাহাজ মালিক বা পুঁজিপতিদের মতোই বর্ণবাদী আচরণ করত। কালো বা বাদামি চামড়ার মানুষের চেয়ে সাদা চামড়ার লোকজন শ্রেষ্ঠ—এমন বদ্ধমূল ধারণা ব্রিটিশ শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যেও প্রোথিত ছিল।

১৯৩৬ সালে আইএলওর জেনেভা কনফারেন্সকে সামনে রেখে আফতাব আলী তার সংগঠনের পক্ষ থেকে বেশ কিছু দাবিনামা উপস্থাপন করেন। তার মধ্যে ছিল—এক. শ্বেতাঙ্গ নাবিক/শ্রমিকদের মতোই ভারতীয় নাবিক/শ্রমিকদের প্রতি একই রকম আচরণ করতে হবে এবং উভয়ের অধিকার হবে সমান। দুই. কোনো অবস্থাতেই ভারতীয় নাবিকদের বিনা বেতনে অতিরিক্ত ঘণ্টা কাজ করানো যাবে না। তিন. অতিরিক্ত সময়ের কাজের জন্য অর্থ প্রদান করতে হবে। ব্রিটিশ সরকার এবং তাদের শ্রমিক ইউনিয়নের তীব্র বিরোধিতার পরও ইউরোপের অন্যান্য দেশের সমর্থনে আফতাব আলী উত্থাপিত দাবিগুলো পাস হয়ে যায়।

১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ভারতীয় নাবিকদের সমুদ্রগামী জাহাজে কাজের চাহিদা বৃদ্ধি পায় এবং সুদূর আমেরিকা পর্যন্ত তাদের গমনাগমন সহজ হয়ে ওঠে। একই সময় বেতনও বৃদ্ধি পায়। তবে জার্মান ইউবোটের আক্রমণে অনেক বাণিজ্যতরী আক্রান্ত হলে বহু ভারতীয় তথা বাঙালি তথা সিলেটি নাবিক সাগর-মহাসাগরে ডুবে মারা যান। দুই মহাযুদ্ধে বাঙালি ও ভারতীয় নাবিকদের আত্মত্যাগ নিয়ে আমি ২০২২ সালে লন্ডন ও নিউইয়র্ক থেকে Routledge/Taylor & Francis Group কর্তৃক একযোগে প্রকাশিত Colonial Globalization and Its Effects on South Asia Eastern Bengal, Sylhet, and Assam, 1874-1971 গ্রন্থের একটি অধ্যায়ে কিছুটা আলোচনা করেছি। দুই মহাযুদ্ধে বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যাপকভাবে আত্মত্যাগের পাশাপাশি বিশ শতকের ত্রিশের দশকের শেষে এবং চল্লিশের দশকের শুরুতে বাঙালি ও ভারতীয় শ্রমিক ও নাবিকরা লন্ডন, গ্লাসগো, লিভারপুল ইত্যাদি বন্দরে আফতাব আলীর নেতৃত্বাধীন ইউনিয়নের আহ্বানে ধর্মঘট করেন। বিশ্বব্যাপী পণ্য পরিবহনে ভারতীয় নাবিকদের ওপর নির্ভরশীল থাকায় যুক্তরাজ্য সরকার বাধ্য হয়ে তখন তাদের অনেক ন্যায়সংগত দাবিও মেনে নেয়। ওই সময় লন্ডনে আইন বিষয়ে অধ্যয়নরত কমিউনিস্ট পার্টির গোপন সদস্য জ্যোতি বসু পার্টির নির্দেশে ভারতীয় নাবিকদের মধ্যে বিভিন্ন কার্যক্রম চালান এবং ধর্মঘটগুলো সফল করতে কাজ করেন বলে তার আত্মজীবনীতে উল্লেখ করেন।

১৯৪০-এর দশকের শুরুতে আফতাব আলী আমেরিকা মহাদেশে যোগাযোগ স্থাপন করেন। তিনি ওই সময় আইএলওর সম্মেলনে অংশ নিতে বেশ কিছুদিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছিলেন। তিনি তখন ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান মার্চেন্ট নেভি ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহিম চৌধুরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় লস্করদের কল্যাণের জন্যে কীভাবে কাজ করা যায়, সে সম্পর্কে আলোচনা করেন। ব্রিটেনের গোয়েন্দা বিভাগ ওই সময় আফতাব আলীর ওপর কড়া নজর রাখে এবং সরকারের কাছে একটি গোপনীয় রিপোর্ট পেশ করে। এতে বলা হয়, আফতাব আলী আইএলওর সম্মেলন উপলক্ষে এখন ফিলাডেলফিয়ায় অবস্থান করছেন, যা ১৯৪৪ সালের মে মাসে শেষ হয়েছে। এখানে তিনি ফোর্ড মোটর কোম্পানির প্রাক্তন কর্মচারী ইব্রাহিম চৌধুরীর সঙ্গে গোপন বৈঠক করেন। আমেরিকায় অবস্থানরত ব্রিটিশ গোয়েন্দারা আরো জানান, এরা উভয়ই পূর্ব পরিচিত এবং লন্ডনে যে ইন্ডিয়া লীগ রয়েছে উভয়ই তার সদস্য। তবে ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রের নৌশ্রমিকদের সংগঠন ন্যাশনাল মেরিটাইম ইউনিয়ন (এনএমইউ) ভারতবর্ষের স্বাধীনতার আন্দোলনকে সমর্থন ও সহানুভূতির চোখে দেখত। এ অবস্থার সুযোগ নিয়ে আফতাব আলী এনএমইউর নেতাদের সঙ্গে একটি কার্যকর সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। আফতাব আলীর এ তত্পরতা ব্রিটিশ সরকারকে রিপোর্ট করে গোয়েন্দারা মন্তব্য করেন, এনএমইউর সঙ্গে আফতাব আলীর এ যোগাযোগ কীভাবে অগ্রসর হয় সে সম্পর্কে তারা কড়া নজর রাখবেন।

সিম্যান ইউনিয়নের মূল নেতা হিসেবে আফতাব আলী কর্তৃক উত্থাপিত অর্থনৈতিক দাবিদাওয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল রাজনৈতিক সংগ্রামের বিষয়টি। বস্তুত রাজনৈতিক মুক্তির বিষয়টি আরো ব্যাপক এবং এটা কেবল ট্রেড ইউনিয়নের মতো কিছু অর্থনৈতিক দাবিনামায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। সেজন্য অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধার বিষয়গুলোকে বৃহত্তর গণ্ডিতে নিয়ে যাওয়ার প্রয়াস ছিল আফতাব আলীর। যেমন তিনি ব্রিটেন প্রবাসী ভারতীয় রাজনৈতিক কৃষ্ণ মেননের আমন্ত্রণ গ্রহণ করে ১৯৩৯ সালের ২৩ আগস্ট গ্লাসগো ট্রেড কাউন্সিলের মিটিংয়ে যোগ দিতে যুক্তরাজ্যে গমন করেন। উল্লেখ্য, কৃষ্ণ মেনন ১৯৩৪ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের অন্যতম প্রধান দল লেবার পার্টির সদস্য হিসেবে সেন্ট প্যানকার্স বরার (Ward) কাউন্সিলর ছিলেন। ১৯৪৭ সালের পর তিনি যুক্তরাজ্যে ভারতের প্রথম হাইকমিশনার নিযুক্ত হন। তবে ১৯৩০ ও ১৯৪০-এর দশকে কৃষ্ণ মেনন যদিও লেবার পার্টির সদস্য ছিলেন তথাপি তার মূল লক্ষ্য ছিল অভিবাসী ভারতীয় বিশেষত লস্কর শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষা এবং তাদের ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা। এ কারণেই আফতাব আলীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়। আফতাব আলী যখন কৃষ্ণ মেননের সঙ্গে লন্ডনসহ ব্রিটেনের বন্দরনগরীতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত, তখন কমিউনিস্ট পার্টি অব ব্রিটেনের নেতা বিএফ ব্রাডলি ম্যানচেস্টারে বৈঠকরত ব্রিটিশ কমিউনিস্ট ও ট্রেড ইউনিয়ন নেতাদের সঙ্গে আলোচনার জন্য আফতাব আলীকে সেখানে আমন্ত্রণ জানান। আফতাব আলী আলোচনায় মিলিত হয়ে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা এবং লস্কর শ্রমিকদের অধিকারের প্রতি তাদের সমর্থন কামনা করেন। এরপর তিনি লন্ডনে ফিরে এসে সুরত আলী ও তশিল মিয়ার সহায়তায় লন্ডনে তার সংগঠনের একটি শাখা প্রতিষ্ঠা করেন।

এদিকে কলকাতার খিদিরপুরে ভারতীয় লস্করদের বিভিন্ন স্তরের মধ্যে একটি অভ্যন্তরীণ সংকট বিরাজমান ছিল। এই স্তর কাঠামোর সর্বোচ্চ শিখরে ছিল ‘বাড়িওয়ালাগণ’। ১৯৩০-এর দশকে আফতাব আলীর নেতৃত্বে সিম্যান ইউনিয়ন এসব বাড়িওয়ালার বিরুদ্ধে বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এসব বাড়িওয়ালা ছিল সিলেটের ব্যবসায়ী যারা খিদিরপুরে বাড়ি ক্রয় করে এগুলোকে একসঙ্গে অনেক লস্করের বসবাসের উপযোগী বোর্ডিং হাউজে রূপান্তর করেন। উনিশ শতকের শেষে এসব বাড়িওয়ালা কলকাতায় তাদের ব্যবসা শুরু করেছিল। ১৮৯৭-৯৮ সালে খিদিরপুরে একজন বিখ্যাত বাড়িওয়ালা ছিলেন আয়েন উল্লাহ নামে, যিনি তার দর্জি দোকানকে একটি বোর্ডিং হাউজে রূপান্তর করেন এবং ক্রয়সূত্রে পরে একাধিক বাড়ির মালিক হয়ে যান। এসব বাড়িওয়ালা সিলেট থেকে কলকাতায় এসে যেসব লস্কর জাহাজে কাজ পাওয়ার অপেক্ষায় থাকত তাদের বিনা অর্থে থাকতে দিতেন এবং ভবিষ্যতে সুদসহ এ অর্থ আদায় করতেন। প্রথম দিকে এ ব্যবস্থা বাড়িওয়ালা ও লস্কর উভয়ের জন্যে মঙ্গলজনক ছিল। এ ব্যবস্থায় একজন লস্করের পেছনে থাকা ও খাওয়া বাবদ জাহাজযাত্রার পূর্ব পর্যন্ত যে খরচ হতো তা বাড়িওয়ালার ‘রেডবুকে’ লেখা থাকত এবং যখন কলকাতায় জাহাজিরা ফিরতি যাত্রায় বেতনসহ ফিরে আসতেন, তখন তারা বাড়িওয়ালাদের পাওনা অর্থ পরিশোধ করতেন। তবে ১৯৩০-এর দশকে বাড়িওয়ালা লস্করদের কাছে উচ্চহারে সুদসহ বেশি অর্থ আদায় করতে থাকেন। এ অবস্থায় আফতাব আলী তার ইউনিয়নকে নিয়ে বাড়িওয়ালাদের এ শোষণের বিরুদ্ধে কতিপয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। এর ফলে বাড়িওয়ালাদের উচ্চহারে সুদসহ অর্থ আদায় বন্ধ হয়ে যায়।

১৯৩৭-৩৮ সালে আফতাব আলীর নেতৃত্বাধীন ভারতীয় শ্রমিক ইউনিয়ন সাফল্যের শীর্ষ শিখরে অবস্থান করে। শিপিং এজেন্ট, শিপিং কর্মকর্তা, সারেং (লস্করদের নেতা) এবং বাড়িওয়ালাসহ সবাই আফতাব আলীর নেতৃত্ব ও পরামর্শকে গুরুত্ব দিত। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো একত্র হয়ে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে লস্কর শ্রমিকদের জন্যে একটি অভিন্ন নীতিমালা থাকবে এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো তা মেনে চলবে। আফতাব আলী তার সংগঠনের পক্ষ থেকে কয়েকজন প্রতিনিধি নির্বাচন করেন, যাদের কাজ ছিল মূলত অভিন্ন নীতিমালা সবাই মেনে চলছে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করা। আফতাব আলী তার কঠোর পরিশ্রম এবং ট্রেড ইউনিয়নের কর্মতত্পরতার ফলে লস্কর শ্রমিকদের কর্মপরিবেশের উন্নতি হয় এবং তাদের আয়-রোজগারও বৃদ্ধি পায়। ১৯৭২ সালে লন্ডনে আফতাব আলীর মৃত্যু হয়।

এ লেখার ইতি টানব একটি ঘটনার উল্লেখ করে। পশ্চিমবঙ্গের অশীন দাশগুপ্ত যিনি ভারত মহাসাগরে মানুষের চলাচল, বাণিজ্য তথা অর্থনৈতিক ইতিহাসের ওপর মৌলিক কাজ করে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন তিনি কয়েক দশক আগে বাংলাদেশের ঐতিহাসিকদের কাছে একটি প্রশ্ন রেখেছিলেন। এটা হলো: খিদিরপুরে অল্প কিছু চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীর লোক ছাড়া প্রায় সবাই সিলেটি নাবিক। চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী তো সমুদ্রের কাছে তাদের বিষয়টা হয়তো বোঝা গেল, কিন্তু সিলেট তো সমুদ্র থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরে, তারা কীভাবে জাহাজের কাজে হাজারে হাজারে সাগর ও মহাসাগর পাড়ি দিল? এ প্রশ্ন উত্থাপনের কিছুকাল পড়ে তিনি প্রয়াত হন। সুখের বিষয় যে ২০২২ সালে প্রকাশিত উপরিউক্ত গ্রন্থে এ প্যারডক্সের জবাব দেয়া হয়েছে, জীবৎকালে তিনি তা জেনে গেলে নিশ্চয়ই পরিতৃপ্ত হতেন। প্রিয় পাঠক, বর্তমান লেখায় তার কিছু ইঙ্গিত রয়েছে, বাকিটা জানার জন্য আপনাকে গ্রন্থটি একবার পড়ে দেখতে হবে।

ড
. আশফাক হোসেন: অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
Colonial Globalization and Its Effects on South Asia Eastern Bengal, Sylhet, and Assam, 1874-1971 (Routledge : London/ New Yrok 2022)  গ্রন্থের প্রণেতা।