বড় একটা গাছের নিচে আমরা দাঁড়িয়ে আছি। ও আর আমি। মাঝখানে আট বছর কেটে গেছে। আমাদের দুজনেরই আট বছর করে বয়েস বেড়েছে। কিন্তু ওর নামটা আর বদলালো না। মেয়েমানুষের নাম ওর—রুনু। রুনু আমার চেয়ে মাথায় উঁচু। খুব শক্ত ওর চেহারা। ওর মেয়েমানুষের নামটা এখনো বদলায়নি। কী গাছ এটা? যে গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে আছি? না, ঝাউগাছ নয়। রুনুকে তা জিগ্যেস করা যায় না। ডান পা-টা একটু তুলে সে দাঁড়িয়ে আছে। এখনো আকাশে আলো রয়েছে, কিন্তু আমি ওর মুখ দেখতে পাচ্ছি না। গাছের ছায়ায় এখানটা অন্ধকার। রুনুর ডান পায়ের ঊরুর মাংসে বুলেট গেঁথে গেছে। সে বলছে, কোনো যন্ত্রণা টের পাচ্ছে না। রুনু কখনো যন্ত্রণা অনুভব করে না। এটা কী গাছ আমার জানা খুব দরকার। মাঠে একটুখানি আলো এখনো দেখতে পাচ্ছি। গাছটার তলা থেকে বেরিয়ে গেলে হয়তো বলা যেত কী গাছ—বট না অশ্বত্থ। যাবো নাকি বেরিয়ে? এটা কী গাছ জানি না, হয়তো আর কখনো জানা হবে না।
রুনু বসবি? বরং বসে পড়।
না, বেশ আছি।
কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে জানি না। দাঁড়িয়ে থাকবি কতক্ষণ।
যতক্ষণ না বাস আসে—রুনু বলে, ঝট করে উঠে পড়তে হবে বাসে, দেরি করা যাবে না।
বাস যদি ফাঁকা থাকে?
তাহলে ওঠা যাবে না, লোকের নজরে পড়ে যেতে পারি।
কিন্তু এই শীতের রাতে বাসে কি ভিড় হবে রুনু?
ভিড় না থাকলে বাসে উঠবো না।
যদি খালি ফাঁকা বাসই আসতে থাকে?
তাহলে বাসে ওঠা হবে না।
গাছতলায় অন্ধকার জায়গাটা থেকে রুনু কথা বলে। ওর মুখ আমি ভালো করে দেখতে পাচ্ছি না।
রুনু কখনো যন্ত্রণা টের পায় না। আমি জানি।
তাহলে বসে থাকাই তো ভালো। যতক্ষণ না বাস আসে। আয় আমরা দুজনেই বসি।
না রে আমি ঠিক আছি। রুনু বলে।
ও না বসলে আমিও বসতে পারি না। ভীষণ শীত করছে আমার। গেঞ্জির ওপর একটা খদ্দরের চাদর আছে আমার গায়ে। রুনুর পরনে নীল রঙের একটা প্যান্ট আর জমাট রক্তবর্ণ একটা জামা। আর একটু পরে তাকে একেবারেই দেখা যাবে না। ওকে নিয়ে আমাকে একটা বাসে উঠতেই হবে আজ।
রুনু।
কী—খুব স্বাভাবিক, খুব সতেজ গলা তার।
এখনো ঝরছে? রক্ত?
ঠিক বুঝতে পারছি না।
ব্যথা করছে?
কেমন একটু শির শির করছে। ও কিছু না, ঘাবড়াবি না।
কী বলি ওকে? মাঠ থেকে আলোটুকু মুছতে মুছতে যাচ্ছে আমি দেখতে পাচ্ছি। আমার পিছন থেকে অন্ধকার এগিয়ে আসছে। আমি তাও দেখতে পাচ্ছি। মাঠে কিছু নেই। ফসল এর মধ্যেই তুলে নিয়ে গেছে। ফাঁকা মাঠ থেকে কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া আসছে। মাঘ মাসে দিনে অনেক সময় ঝড়ো হাওয়া থাকে, রাতে সাধারণত থাকে না। কিন্তু ফাঁকা মাঠের দিকে চেয়ে আমি টের পাচ্ছি একটা জোরালো হাওয়া পাক দিতে দিতে উঠে আসছে। গাছের মোটা গুঁড়িটায় এখন যতটা আটকায়।
বাস আসবে বলে তো মনে হচ্ছে না। ঊরুতে বুলেটধরা রুনু কি সারা রাত এখানে দাঁড়িয়ে থাকবে? এই ঠাণ্ডার মধ্যে, এই হাওয়ার মধ্যে? আমি জানি তা সে পারে। কিন্তু তাতে তো আরও ঘটনা ঘটবে। সকালে আমরা ধরা পড়ে যাবো। রুনু ধরা দেবে না তাও আমি জানি। রিভলভারটা ওর সঙ্গেই আছে। কাজেই আরও ঘটনা ঘটবে। আবার কি আগামীকাল সন্ধেয় ওকে নিয়ে কোথাও অপেক্ষা করতে হবে? অন্য পা-টিতেও বুলেট গেঁথে যাবে? আজকের ক্ষতটি পচতে শুরু করবে কখন থেকে? কতটা সময় লাগে? আমি জানি না।
চাদরটা তুই নে রুনু।
না, আমার শীত করছে না রে ভাই।
ভাই! রুনু আমার চেয়ে অনেক শক্ত। আমাকে ও সব সময় ছাড়িয়ে যায়। বুলেটে ভাঙা ঊরু নিয়ে কোনো আশ্রয়ের কথা না ভেবে যে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, সে আমার চাদর নেবে কেন? আমার তো বাড়তি কোনো চাদর নেই। আমরা অপেক্ষা করতে থাকি।
এইবার আট বছর আগে, একাত্তরের যুদ্ধের সময় যা ঘটেছিল, সেই ঘটনা মনে করি। আট বছর আগে ঠিক এমনি করেই একদিন সন্ধেবেলায় আমরা অপেক্ষা করছিলাম। একটা বুড়ো ঝাউগাছের তলায়। ঝাউগাছটার মোটা একটা ডাল অনেক আগে ঝড়ে ভেঙে পড়েছিল বোধ হয়। গাছটার সেদিকটা কেমন অবশ অবশ। সেই গাছের নিচে সন্ধেবেলায় আমরা দুজন, তখন বর্ষাকাল, একাত্তর সালে সকাল সকাল বর্ষা এসেছিল, বলতে কি মে মাস থেকেই বর্ষা, আকাশ মুখ নামিয়েই ছিল, তাতে বাংলাদেশের নরম মাটিতে পাকিস্তানি বাহিনীর খুবই অসুবিধে হয়েছিল, আমরাও ঝাউগাছটার নিচে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আশা করছিলাম, যে কোনো মুহূর্তে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামবে, সেটা হলেই আমাদের সুবিধে, মেঘও ছিল খুব—অথচ আশ্চর্য, সূর্য ডোবার একটু আগে পশ্চিম দিকের দিগন্তে যেখানটায় তখন সূর্য, ঠিক সেখানের এক চিলতে আকাশ হঠাত্ পরিষ্কার হয়ে গেল, আমার মনে আছে তাতে কি রকম একটা লাল আলো সমস্ত আকাশে কালো মেঘের গায়ে ছড়িয়ে পড়ে, ঝাউগাছটার রং কেমন কটা হয়ে যায়, তবে একটু পরেই বর্ষার ঝড়ো হাওয়া বইতে শুরু করে, সূর্য হয় ডুবে যায়, না হয় মেঘ তাকে ঢেকে দেয়। আজকেরই মতো খুব তাড়াতাড়ি অন্ধকার নেমে আসে। এত অন্ধকার যে ঝাউতলার সোজাসুজি নদীর পাড়ের একটা বাঁকে বাঁধা আমাদের নৌকাটাও আর ভালো করে দেখা যায় না। অন্ধকারের মধ্যে একটা আবছা ছায়াই শুধু ঢেউয়ের তালে তালে দোলে। নদীর পাড়ে ঢেউ ভেঙে পড়ার শব্দ পাই। রুনু এসব নিয়ে কখনো ভাবেনি, মনে করিয়ে দিলেও তার কিছু হয় না, বে-দরকারে সে একটা কথাও বলে না। সে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। অন্ধকার আর একটু ঘন হয়ে এলে শহরের দিক থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে গুলির শব্দ আসে। শব্দ শুনে আমার বুকের মধ্যে গুড়গুড় করে ওঠে, বিনা দরকারে আমি বাজে কথা বলা শুরু করি। কি রে, শেষ পর্যন্ত আনতে পারবে তো ভালোয়-ভালোয়?
দেখা যাক।
আর একটু রাত বেড়ে গেলে নদীর স্রোতের স্পষ্ট আওয়াজ পাই, ঝাউগাছে একটা শকুন বা চিল বড় পাখি ডানা ঝাপটায়। গুলির শব্দ কখনো খুব বেড়ে যায়। আমার গা ঘেঁষেই রুনু দাঁড়িয়ে, তাকে একটুও দেখা যায় না। সে লুঙ্গি আর গেঞ্জি পরে আছে। আমাদের দুজনের রাইফেল দুটো নৌকোতে, গোটাকতক হাতবোমাও আছে। আমার ইচ্ছে করলেই একলাফে নৌকোর ওপর গিয়ে পড়তে পারি। রুনু খুব ভালো নৌকা বাইতে পারে। লড়াইয়ের শেষের দিকে যখন আমাদের বলেশ্বরের দুপাড়ের গাঁগুলোতে কিছুদিন থাকতে হয়েছিল, তখন সেই মিশমিশে কালো স্রোতওয়ালা নদীতে এমন কি আরও নিচে দিকহীন হরিণঘাটায় রুনুকে অনেক সময় শুধু মাঝির কাজই করতে হয়েছিল।
কি রে, আসবে না নাকি? আর কতক্ষণ দেরি করব? রুনুই জানত কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু আমি জানি তাকে জীবনভর ঝাউতলায় দাঁড়িয়ে থাকতে বললে, সে তা-ই থাকবে। আয়ু শেষ হয়ে গেলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মরে যাবে সে। কাজেই ওকে জিগ্যেস করে আমার কোনো লাভ নেই। রুনু আমার কথার কোনো জবাব দেয় না।
খুব ফাঁক ফাঁক খুব বড় বড় ফোঁটায় হঠাত্ বৃষ্টি শুরু হলো। আকাশ মেঘে ঢাকা, বাতাস নেই, একবারও বিদ্যুত্ চমকায়নি। আমাদের গায়ে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ল না। ঝাউগাছে বৃষ্টি আটকায় না, কিন্তু আমাদের গায়ে এক ফোঁটা পড়ার আগেই বৃষ্টি থেমে গেল। বাতাসের শব্দ পেলাম। হঠাত্ বাতাস উঠে গাছের পাতায় শোঁ-শোঁ শব্দ তুলল বলেই বোধহয় আমরা মানুষের পায়ের শব্দ পাইনি। তিনটে মানুষকে হঠাত্ আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতে পেয়ে আমি ভীষণ চমকে উঠি। সবচেয়ে লম্বা ছায়া বলে, আমরা আলো আনিনি। সে কথা বলে স্বাভাবিক গলায়।
কোনো দরকার নেই আলোর—রুনু বলল।
আমরা কি চলে যাবো? লম্বা ছায়াটি জিগ্যেস করে।
তোমরা কি খালি হাতে?
হ্যাঁ।
আসবার সময় কারো চোখে পড়েছো কি? কেউ তোমাদের দেখেছে বলে মনে হয়?
মনে হয় না।
হেঁটে এলে সমস্ত পথ?
হ্যাঁ। আমরা কি এখুনি চলে যাবো? লম্বা ছায়া আবার জিগ্যেস করে। অন্য ছায়া দুটি চুপ।
আগাগোড়া চাদর জড়ানো একটি ছায়াকে এতক্ষণে মহিলা বলে চিনতে পারি। অন্যটিকেও বোঝা যায়, বারো-চৌদ্দ বছরের একটি ছেলে। পথে কোথাও কোনো মানুষ ছিল না? রুনু জিগ্যেস করে। থাকতে পারে, আমরা দেখিনি।
আপনি আসুন, রুনু চাদর জড়ানো মহিলার দিকে এক পা এগিয়ে বলে। আমার হাত ধরুন—একটা হাত এগিয়ে দেয় সে।
হাত ধরতে হবে না, দেখতে পাচ্ছি—স্পষ্ট পরিষ্কার উচ্চারণে মহিলা বললেন।
আমরা চলি তাহলে?
লম্বা ছায়া তিনবারের বার জিগ্যেস করে। নৌকোর দিকে এগোতে এগোতে রুনু বলল, একটু দেরি করো। আমরা নৌকোয় উঠছি। নৌকো যতক্ষণ পর্যন্ত দেখা যায়, আচ্ছা।
আমি একটাও কথা বলিনি। কঠিন দায়িত্ব ঘাড়ে পড়লে কী করতে হবে, রুনুই ঠিক করে। তাতে আমরা কখনও ঠকি না। মহিলাকে মাঝখানে দিয়ে আমরা নৌকোর দিকে এগিয়ে যাই। খাড়া পাড়। নদীর পানি দেখতে পাচ্ছি না—ঢেউয়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছি। রুনু নৌকোর ওপর লাফিয়ে পড়ল, সেখান থেকে ঝুঁকে সে হাত বাড়িয়ে দেয়, লাফ দেবেন না—আমার হাত ধরে আগে নিচে নামুন—তারেক, ওদিক থেকে ধরে রাখিস।
মহিলাকে আস্তে আস্তে নদীর কিনারায় নামিয়ে দিই আমরা। একটু পানিতে নেমে বেশ কষ্টের সঙ্গে তিনি নৌকোয় উঠতে পারেন। রুনু মুহূর্তের মধ্যে মাঝনদীতে নৌকো নিয়ে যায়।
নৌকো নিচে নেমে যায়। ভাটা শুরু হয়েছে এ-পর্যন্ত সবকিছুই হিসেব মাফিক চলছে।
আপনি ছইয়ের ভিতরে গিয়ে বসুন। নাহলে শুয়ে পড়ুন। আলো জ্বালা চলবে না। বেশি কথা বলাও ঠিক হবে না—রুনু বলল। আমরা খুব তাড়াতাড়ি ভাটার টানে নিচের দিকে যাচ্ছি।
যে বাতাসটা উঠেছিল, সেটা তখনো ছিল। তবে তার জোর কমে এসেছে। ঠাণ্ডা সাঁত্লা বাতাস। আকাশ নদী দুপাড়ের প্রায় কিছুই আলাদা করে ধরা যাচ্ছে না, দুপাড়ের গাঁয়ের ছায়া শুধু একটু বেশি ঘন। বাতাস থাকলেও আমার মনে হলো বৃষ্টি হবে। হলে ভালোই হয়। মহিলা যখন হাতের ওপর ভর দিয়ে ছইয়ের ভেতরে ঢুকছিলেন, আবছা হলেও আমি বুঝতে পারলাম তাঁর নড়াচড়া করতে কষ্ট হচ্ছে। আমি জানতাম, কিছু দিনের মধ্যে বাচ্চা হবে তাঁর। ওঁর মুখ আমি এখনো দেখিনি। রুনুও না। বলতে কি এই কাজটার সঙ্গে আমাদের যোগ আকস্মিক। এটা আমাদের নিজেদের কাজ নয়। ভদ্রমহিলার স্বামী এপ্রিলের মাঝামাঝি আমাদের সঙ্গে সীমান্ত পার হয়েছিলেন। স্ত্রী তখন ছিলেন বাপের বাড়ির গাঁয়ে। পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত থেকে গ্রামটা খুব দূরে নয়। আমরা দেখছিলাম, এখানে বেশ ভালো প্রতিরোধের ব্যবস্থা হচ্ছে। আমরা আমাদের নেতাদের অপেক্ষায় থাকলাম। কোনো নির্দেশ এল না। এমনকি জেলা বা মহকুমা পর্যায়ের নেতৃত্ব থেকেও কোনো কথা নয়। পঁচিশে মার্চের ক্র্যাক ডাউনের আগের তত্ত্ব আমাদের জানা ছিল। তত্ত্ব হয়তো ঠিকই আছে। কিন্তু নতুন পরিস্থিতিতে সব লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল। কী করতে হবে, তা জানা খুবই দরকার ছিল। আমাদের আর ফেরার কোনো রাস্তা ছিল না, হয়তো জায়গাও ছিল না। নিজের বাড়িতে ফিরে যাবার কথা ওঠে না।
আমরা বলছিলাম বাঙালি বুর্জোয়ারা ক্ষমতায় আসার জন্যে আন্দোলন চালাতে গিয়ে বেকায়দায় পড়েছে। ওদের চেনা রাস্তা হলো সংসদীয় রাজনীতি। সেখান থেকে ছিটকে পড়ে অস্ত্রের মুখোমুখি হয়ে এখন বীরদর্পে সীমান্ত পার হচ্ছে। এর সঙ্গে জনগণের বা আমাদের পার্টির কোনো যোগ নেই। কিন্তু এ কথা বলে সুড়-সুড় করে স্কুল-কলেজে ঢোকা বা বাড়িতে ফেরার উপায় ছিল না আমাদের। কারণ স্পষ্টই দেখতে পাচ্ছিলাম আমাদের তত্ত্বগত অবস্থানের এতটুকু তোয়াক্কা না করে পাকিস্তানি বাহিনী নির্বিকার জবাই চালিয়ে যাচ্ছে। যা কিছু হেঁটে চলে বেড়ায়, নড়াচড়া করে, তাই তারা খুন করে। আমরা যত বলি, জনগণের স্বার্থ এর মধ্যে নেই, ততোই তারা জনগণের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রচণ্ড বেগে। পঁচিশে মার্চের পরে এক মাসের মধ্যে দেশের আট কোটি মানুষের সবাই-ব্যক্তি হিসেবে প্রতিটি ব্যক্তি-জড়িয়ে গেল ঘটনার সঙ্গে। কারো রেহাই মিলল না। আমরা অপেক্ষা করছিলাম। আমাদের ছোট্ট গ্রুপটিও। রুনুকে আমি কখনোই ভাবতে দেখিনি। কাজ পেলেই সে স্বস্তি পেত। কাজ না পেলে রুনু অপটু আর অদ্ভুত। কলেজ থেকে যখন তাকে পার্টিতে আনি, আমাকে খুব বেগ পেতে হয়নি। কার বিরুদ্ধে কেন এবং কী ধরনের লড়াই, সে কথাটা সে বেশ দাগা বুলিয়ে বুলিয়ে বুঝে নেয় ছোট ছেলের অক্ষর শেখার মতো। তারপর সে চায় শুধু কাজ। একটির পর একটি কাজ। অ্যাকশনের পর আমি তার মধ্যে কোনো সংকট দেখতে পাইনি। তার মুখের শিশুর সরলতা আমি কখনোই ম্লান হতে দেখিনি। কিন্তু খুব ভালো করে জানি কোনো একটি হত্যাকাণ্ডকে যদি সে নিছক মানুষ খুন বলে মনে করে, সে সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে মেরে ফেলবে।
এই কাজটির দায়িত্ব নেবার সময় রুনু উপস্থিত হলো। মহিলার স্বামী আমাদের ছোট গ্রুপটির সঙ্গে এসেছিলেন। আমি বললাম, আপনি জানেন, আপনাদের রাজনীতি আর আমাদের রাজনীতি এক নয়।
ওঁর নামটা বলব না, ডাকনামটা বলা যায়—মুকুল।
মুকুল বললেন, এর মধ্যে আমাদের রাজনীতি তোমাদের রাজনীতি নেই। বাঙালি জাতি আজ বিপন্ন।
আমি জানতাম ওরা এইভাবেই কথা বলতে অভ্যস্ত। বেশ সাজানো বাক্য—তত্সম, শব্দপ্রধান—অতএব কথাটা গত্, বক্তব্য নয়। গত্ অবশ্য আমাদেরও আছে। একটু অন্য রকম। আমিও আমাদের একটা গত্ বাজিয়েছিলাম, তফাত্ আছে। বুর্জোয়া রাজনীতি আর সর্বহারার রাজনীতি কখনো এক হতে পারে না। শ্রেণীশাসিত সমাজে আপনারা এক শ্রেণীর স্বার্থে রাজনীতি করছেন, আমরা আরেক শ্রেণীর জন্যে করছি।
আমি সত্ভাবে রাজনীতিতে এসেছি, মুকুল বললেন।
তাতে কিছু এসে যায় না—আপনি কোন শ্রেণীর স্বার্থে রাজনীতি করছেন সেটাই আসল কথা। আপনার ব্যক্তিগত মতলববাজিতে কিছু এসে যায় না। ব্যক্তিগতভাবে আপনি একশ ভাগ সত্ হলেও কিছু এসে যায় না।
মুকুল একটু উত্তেজিত হয়ে বললেন, আমরা সমগ্র জনগণের জন্যে রাজনীতি করছি—পশ্চিমারা বাঙালি জাতিকে শোষণ করতে করতে—
এ কথা এখন রাখুন—আমি তাঁকে রুঢ়ভাবে থামিয়ে দিই। ওই মুহূর্তে আমরা নিরস্ত্র ছিলাম না। আমি বলতে থাকি, আপনারা দেশের যদি এতই কল্যাণ চান, তাহলে সমস্ত জনসাধারণকে ফেলে পালাচ্ছেন কেন? আপনাদের রাজনীতিতে কখনো কি অস্ত্র হাতে তুলে নেবার কথা আছে? কোনো দিন কি ছিল? মার্চ মাসের পঁচিশ তারিখ পর্যন্ত, পাকিস্তানিরা যে রাতে এ দেশের মানুষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, সে রাতের আগে পর্যন্ত ইয়াহিয়া আর ভুট্টোর সঙ্গে আপনারা কী করছিলেন? কোনো খবর পাননি, না খবর জেনেও চুপ করে ছিলেন? এ দেশের মানুষের ওপর জেঁকে বসার জন্য দর কষাকষি চালাচ্ছিলেন না কি? বলুন, আপনাদের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অস্ত্র হাতে তুলে নেবার কোনো কথা কোথাও আছে কি? একে কি বিপ্লবী যুদ্ধ বলে? ভোটের বুর্জোয়া রাজনীতি চিরদিন করে এসেছেন—নেহাত শুয়োরের বাচ্চারা আপনাদের ছিটেফোঁটা দানটুকু পর্যন্ত দিতে চায় না বলেই বিপ্লবী সেজেছেন।
আমি কথাবার্তা এইভাবেই বলতাম। সবসময় মনের মধ্যে আওড়াতাম, তুমি যে কমিউনিস্ট, সে কথা কখনোই গোপন করো না। আমি মুকুলের চোখের দিকে নজর রেখেছিলাম। একটা বুনো হিংসা দেখা দিচ্ছিল তাঁর চোখের মণিতে। রিভলবার আলতোভাবে একবার হাত বুলোলাম।
মুকুল বহুকষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, আমরা যদি তোমার কথামতো তথাকথিত বুর্জোয়া রাজনীতিই করতাম, তাহলে পাক-আর্মি আমাদের ওপরেই ঝাঁপিয়ে পড়তো, এ দেশের সর্বস্তরের মানুষ খুন করার জন্য এমন উঠেপড়ে লাগতো না। এ থেকেই প্রমাণ হয়, দেশের সমস্ত মানুষ আমাদের পেছনে আছে, তোমাদের পেছনে নয়। অবস্থা তো বুঝতে পারছো না। প্রকাশ্যে এখন নিজেদের পরিচয় দিলে দেশের লোক তোমাদের ছাল ছাড়িয়ে নেবে—তা জানো? থাকগে, ও নিয়ে তর্ক করার সময় নেই আমার। তোমাদের দলটা যদি এখানেই থাকে, তাহলে আমাদের সঙ্গে কার্জকর্ম করবে তো? মনে রাখো এটা আমার এলাকা। তোমরা কী করবে আমার জানা দরকার। জনগণের কাতারে দাঁড়িয়ে হাতে অস্ত্র তুলে নেবে—না বুর্জোয়াদের সহায়তা করে জনগণের সঙ্গে দুশমনি করবে না বলে পাকবাহিনীর সঙ্গে হাত মেলাবে? দেখলাম, জনগণের কাতার বলতে পেরে মুকুলের খুবই আনন্দ হলো। কিন্তু সত্যি তাঁর প্রশ্নের জবাব দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। বললাম, কি করবো জানি না, তবে পাকবাহিনীর সঙ্গে হাত মেলানোর কোনো কথা ওঠে না। পাকিস্তানি শাসকরা আমাদের দুশমন—এই কথা আমরা এখনই অস্বীকার করি না। ওখান থেকে বেরিয়ে এসে রুনুকে বললাম, রুনু ঠিক আছে?
সে মাথা নাড়ে। এতক্ষণে সে একটিও কথা বলেনি। মুকুলের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আমার অস্বস্তি হচ্ছিল। বর্তমান অবস্থায় কী করতে হবে, তা আমার জানা ছিল না। কিন্তু বাইরে এসে রুনুর মুখের দিকে চেয়ে আমার আত্মবিশ্বাস ফিরে আসে। সে মৃদুকণ্ঠে বলল, মুক্তিযুদ্ধটা আমাদের হাতে নেবার চেষ্টা করা উচিত। গরিব মানুষের গায়ে বুলেট ঢুকেছে—রুনু চুপচাপ হাঁটতে লাগল। এই ঘটনার দু-একদিন পরে মুকুলের স্ত্রীকে তার বাপের বাড়ি থেকে নিয়ে আসার দায়িত্ব নিই আমরা। মুকুল খবর পাঠাবার জন্য বিশ্বস্ত লোক পেয়েছিল। কিন্তু মহিলাকে নিয়ে আসার জন্যে কাউকে পায়নি। আমিও জানতাম রুনু ছাড়া দ্বিতীয় কোনো মানুষ আমাদের ছিল না এই কাজের জন্য।
রুনুর বৈঠা থেকে শব্দ প্রায় কিছুই হচ্ছিল না। দশ দিকভরা ছায়া সমুদ্রে এক পোচ বেশি ঘন ছায়া ভেসে যাচ্ছে। আমাদের নৌকো। নদীর একটা ছলাত্ ছলাত্ শব্দ, পানি কেটে নৌকো ভেসে যাবার অতি মৃদু শন শন আওয়াজ ছাড়া আর কিছুই কানে আসে না।
মনে যখন কিছুই থাকে না, তখন কেমন লাগে? ইন্দ্রিয়কে জাগাবার জন্যে কোথাও কোনো সংবাদ নেই। অন্ধকার লেপ্টে আকাশ-পৃথিবী একাকার। ছইয়ের ভেতরে আমাদের একটি জোরালো টর্চ আছে। হাঁটুতে মাথা রেখে মহিলা চুপ করা বসে। একটা কথাও বলা যাবে না। আলোটা একবারও জ্বালানো চলে না। দুপাশের গাঁ থেকে কুকুরের চিত্কারও নেই। রাজাকার বাহিনী তৈরি হচ্ছে। তারা শহরের গলিঘুঁচিতে, গাঁয়ের আনাচে-কানাচে ঢুকে পড়েছে। যে কোনো মেয়ে তারা ভোগ করে, যে কোনো খাবার তারা নিয়ে যায়, যে কোনো মানুষ তারা মেরে ফেলে, যে কোনো জিনিস তারা ছিনিয়ে নেয়। পাকিস্তানিরা তাদের তৈরি করেছে। আমাদের ভিতর থেকে। গভীর খাদের সামনে আমি দাঁড়িয়ে আছি, নিচে গড়িয়ে পড়িনি। কিন্তু পড়া না পড়ার মধ্যে তফাত কী? আমার মা এখনো ধর্ষিত হয়নি, আমার বোনও নয়। তোমার স্ত্রী বা বোনও নয়। কিন্তু তফাত কী? এই কোটি কোটি মানুষের দেশে যে কোনো মা-বোন-স্ত্রী ধর্ষিত হতে পারে। হচ্ছে না হয়তো, হতে পারে। একটি দেশের জন্যে এর চেয়ে ভয়ানক পরিস্থিতি কল্পনা করা যায়? এই অবস্থাটাকে ঠেকানোর বাস্তব ব্যবস্থা দূরে থাক, তাত্ত্বিক প্রতিকারের কথাও আমাকে কেউ বুঝিয়ে বলেননি। নিশ্চিন্ত মনে বলে দেই, বুর্জোয়ারা এই অবস্থা তৈরি করেছে, কাজেই আপনি হাত গুটিয়ে বসে থাকুন। যখন ফলটি পেকে বোঁটা থেকে খসে পড়ার জন্য একেবারে তৈরি, আপনি চাবি টিপে বিপ্লব সমাধা করে ফেলবেন। আমাদের ট্রেনটাই সবসময় চলে যায়।
কী ভাবছি আমি? আমার মনে নাকি কিছুই নেই? মুকুলের কাছে ওদের রাজনীতির সমালোচনা করছি, তা কি ভুল? আমি তা মনে করি না।
রুনুই প্রথম দেখতে পেয়েছে। উজানে যেদিক থেকে আমার এসেছি, সেদিকে আঙুল তুলে রুনু বলল, একটা জোরালো আলো বলে মনে হচ্ছে না? আমি চেয়ে দেখি উজানে, অনেক দূরে নদীর উপরে একটা জায়গায় অন্ধকার সাদা ধোঁয়ার মতো ফ্যাকাসে হয়ে উঠেছে। এ নিয়ে আমাদের জল্পনাকল্পনা করা দরকার হলো না বেশি। একটু পরেই গভীর মৃদু একটা গুড়গুড় শব্দ শুনতে পেলাম। লঞ্চের শব্দ, এদিকে আসছে—রুনু মোটা নিরুত্তাপ গলায় বলল:
তাহলে?
হ্যাঁ—রুনু একইভাবে বলল, ঠিকই ধরেছিস। নৌকোটাকে কিনারায় ভিড়িয়ে ফেলি। রাইফেল ব্যবহার করার সুবিধে হবে বলে মনে হয় না। রিভলবার ঠিক আছে তোর?
হ্যাঁ।
ভাবী ঘাবড়াবেন না। ঘাবড়িয়ে লাভও হবে না। বেঁচে যাওয়ার যেটুকু সুযোগ আছে, সেটাও নষ্ট হবে?
কী হয়েছে? মহিলা বাতাসের শব্দে বললেন।
লঞ্চ আসছে একটা। ওদের ছাড়া এত রাতে আর কাদের লঞ্চ হবে। মহিলা হামাগুড়ি দিয়ে ছই থেকে বেরিয়ে আসতে থাকেন। নৌকো টলমল করে। রুনুর বৈঠা দ্রুত ছপছপ আওয়াজ তোলে। বেরিয়ে এসে মহিলা দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। নৌকো আরো দুলতে থাকে। তার বিশাল গর্ভ আমি দেখতে পাই। সেখানে একটি পরিণত শিশু। তার জন্যে সময় আছে? সে কি বাইরে আসতে পারবে? ভাবী উঠবেন না, বসে পড়ুন। আমি নৌকো পাড়ে ভেড়াচ্ছি। আমরা দুজনে আপনার দুপাশে থাকবো। আমরা যা করবো, আপনি তাই করবেন। কোনো অবস্থাতেই কথা বলবেন না।
বলতে বলতেই রুনু নদীর পাড়ের ছোট একটি খাঁজ খুজে পেয়ে সেখানে সাঁ করে নৌকো ঢুকিয়ে দিল। লঞ্চের আলো এখন নদীর উপর ঘুরে বেড়াচ্ছে। পরিষ্কার দেখা যায়। নৌকোর পাটা তুলে রাইফেল দুটো ভিতরে ঢুকিয়ে দে তারেক—তাড়াতাড়ি। ছইয়ের মধ্যে আর কিছু নেই তো? ঠিক আছে, বেরিয়ে আয়—রুনু লগি পুঁতে কাছি বেঁধে ফেলল। একটা মুহূর্তের জন্যে দাঁড়িয়ে রইল। ঠোঁটের কাছে আঙুল তুলে পাথরের মূর্তির মতো।
তারপরেই সে লাফিয়ে কিনারায় নেমে হাত বাড়িয়ে দিল, হাত ধরুন ভাবী। আমরা দুপাশ থেকে ধরে ওঁকে তুলে নদীর উঁচু পাড়ে এসে দাঁড়ালাম। লঞ্চের হেডলাইট অস্থির। আমাদের দেরি হয়ে যাচ্ছে। রুনু গুঁড়ি মেরে বসে হঠাত্ টর্চটা জ্বালিয়ে নদীর পাড়টা একবার দেখ নিল। ছোট ঝাঁকড়া খেজুর গাছের আড়ালে নিচু একটা জায়গা। চোখের পলকে রুনু আমাদের ঠেলে সেখানে এনে ফেলল। উবুড় হয়ে মাটিতে শুয়ে পড়েছি। আমাদের দুজনের মাঝখানে মহিলা—খুব কষ্টের সঙ্গে হেঁট হয়ে আছেন। তার নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছি।
মনে হলো লঞ্চের আলো আমাদের পিঠের উপর দিয়ে চলে গেল। রুনু মহিলার ঘাড়ের কাছে হাত রেখেছে, তাঁকে কিছুতেই মাথা তুলতে দিচ্ছে না। আলো ইতস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছে। ইঞ্জিনের শব্দ মৃদু হয়ে এল। লঞ্চ আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছে পাড়ের দিকে। রুনুকে ছুঁয়ে আছি আমি। রুনুর হাত। মহিলার কাঁধের কাছে তার যে হাত, সেই হাতের আঙুলগুলো জড়িয়ে ধরেছি। রুনুর হাত শক্ত ঠাণ্ডা।
এক সুতো এপারে। সেটাকে কোনো তফাত বলা যায় না। তবু কত তফাত। কনুইয়ের নিচে শক্ত সোঁদা গন্ধ মাটি, হাঁটুর কাছে ব্যথা, আমি নাস্তিক, এই মুহূর্তেও, মনের মধ্যে কিছুই নেই, তবু কি সাংঘাতিক তফাত, বেঁচে থাকাটা যে কী! আমাদের পিঠের উপর দিয়ে আর একবার আলোটা চলে গেল। লঞ্চ পাড়ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে। আমাদের থেকে বেশ খানিকটা দূরে। কিন্তু হেডলাইটটা আমাদের দিকে। লঞ্চের ভিতর থেকে বিকট হল্লার আওয়াজ পাচ্ছি।
দুজন মানুষ নদীর পাড় বেয়ে হয়ে আসছে। বারদুয়েক তাদের মাথার উপর দিয়ে আলো চলে গেল। তারা সামনের দিকে ঝুঁকে পাড়ের উপরে উঠছে। পেছনের মানুষটার পা একবার হড়কে গেল। ঘোঁত্ করে আওয়াজ করে উঠল সে। পাড়ের উপর উঠে এলে তীব্র আলো পড়ল তাদের উপর। পেছনের লোকটার গায়ে গেঞ্জি, মালকোচা দিয়ে লুঙি পরা, পিঠে রাইফেল বাঁধা রয়েছে একটা। সামনের লোকটির হাত ধরে তাকে সে লঞ্চের দিকে মুখ করে দাঁড় করিয়ে দেয়। আলো বেশি জোরালো হলে কিছু দেখা যায় না। তার সমস্ত শরীরে আলো পড়েছিল। কিন্তু তার মুখটা ভালা করে দেখতে পেলাম না। শুধু বোঝা গেল একটি বাচ্চা ছেলে, আঠারো-উনিশ বছরের বেশি হবে না তার বয়েস। লুঙ্গির উপর শার্ট পরা। আলোর দিকে চাইতে তার অসুবিধে হচ্ছিল বলে বাবা বারবার সে হাত দিয়ে মুখ ঢাকছিল। কিন্তু পেছনের লোকটি কাছে গিয়ে তার দুহাত টেনে নামিয়ে দেয়, মাথাটা ধরে সোজা করে দেয়—যেন ছবি তোলার জন্য তাঁর পোজ ঠিক করে দিচ্ছে। তারপর সে দুহাত তুলে দাঁত বের করে হাসতে হাসতে চিত্কার করে ওঠে, ঠিক হ্যায়—বলে পিছু হটে তাড়াতাড়ি সরে যায়। কড়াং—বিকট শব্দ উঠল। এক কোপে কাটা চারাগাছের মতো লুঙ্গি-শার্ট পরা ছেলেটি হাঁটু দুমড়ে মাটিতে পড়ছে। আলো তার উপর স্থির রয়েছে। তার মুখটা ভালো করে দেখতে পাই একবার। অপরিচিতের মুখ। কেউ কোনো দিন আমায় জিগ্যেস করবেন না কেমন সেই মুখ। তীব্র টানে আমার আঙুলগুলো রুনু আঙুল থেকে ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে চায়। বোবাচাপা গুমড়ানো দুটি শব্দ শুনতে পাই, আমার ভাই। কেউ জিগ্যেস করবেন না কেমন সেই শব্দ দুটি। আবার টান, মাছের ছিপ টানার মতো। মহিলা উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। পাশবিক শক্তিতে রুনু হাড়িকাঠের জন্তুর মতো মহিলাকে ঠেসে ধরে রয়েছে। আর কোনো টান নেই। বিশাল গর্ভ মাটিতে চেপে উনি উবুড় হয়ে পড়ে আছেন। চষা ছিটানো মাটির স্তূপ।
আলো এখন অন্যজনের উপর স্থিত। দুহাত তুলে নাচের ভঙ্গিতে লোকটা আর একবার বিকট চিত্কার করে বলল, খতম, ঠিক হ্যায়। আলো ধীরেসুস্থে সরে যেতে থাকে, একটা উঁচু করা পায়ের আক্ষেপ টেনে সমান করতে করতে আলো নেমে যাচ্ছে। ইঞ্জিনের আওয়াজ জোরালো হতে শুরু করে। লঞ্চ পিছু হটে ঘুরে মাঝনদীতে পড়ে এগোতে থাকে। এদিকে লোকটা মরা ছেলেটার দুহাত ধরে টানতে টানতে তাকে নিয়ে আমাদের দিকে আসতে শুরু করে। আমার সমস্ত ভাবনা বন্ধ হয়ে যাক, মরাদেহটি সে কি এই গর্তেই ফেলতে চায়? মরিয়া জানোয়ারের মতো রুনুর দিকে চেয়ে থাকি। আমার হাত সে ছেড়ে দিয়েছে। তাকে দেখা যায় না। লঞ্চ এখনো বেশি দূর যায়নি। লোকটা মরা টানতে টানতে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। তার ফোঁস ফোঁস নিঃশ্বাস শুনতে পাচ্ছি। লোকটা খেজুর গাছের কাছে এসে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে থাকল। তারপরই সে ফিরল আমাদের দিকে, আমাদের দেখতে পেয়ে পাথরের মতো জমে গেল। ঠিক তক্ষুনি চিতাবাঘের মতো রুনু লাফিয়ে পড়ল তার উপর। সে যতটা লম্বা, তাকে তার চেয়ে অনেক বেশি লম্বা লাগলো। রুনুর শরীরের অদ্ভুত আকার বিদ্যুত্ চমকের মতোই আমি একবার মাত্র দেখেছি। আমি অন্ধকারে তাদের জড়াজড়ি করতে দেখতে পাচ্ছি। বারবার ওরা মৃতদেহটির উপর গিয়ে পড়ছে। একটু পরেই দম বন্ধ হয়ে যাবার একটা গা শিউরানো আওয়াজ আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে রিভলবারের শব্দ আমার কানে আসে। রুনু উঠে দাঁড়িয়ে আর একবার গুলি করে।
লঞ্চ চলে গেছে। ভীষণ হাঁপাতে হাঁপাতে রুনু বলে, মহিলার জ্ঞান নেই। পানি ছিটে দিলেই জ্ঞান ফিরে আসবে মনে হয়। নৌকো থেকে মগটা নিয়ে একটু পানি নিয়ে আয় তারেক। ভাবীকে আমাদের কাছে পৌঁছে দিয়ে আর ওর ভাইটা বাড়ি ফিরে যেতে পারল না। নৌকো যতক্ষণ দেখা যায়, আমি ওকে দাঁড়াতে বলেছিলাম। হাঁপাচ্ছিল বলেই রুনুর গলা এমন বিকৃত শোনাল যেন সে হু হু করে কাঁদছে। কিন্তু কান্না রুনুর পক্ষে সত্যিই অসম্ভব। একটু পরেই সে তার শান্ত মোটা গলায় বলল, ছেলেটার লাশ আমরা নিয়ে যেতে পারি—কোনো অজুহাত নেই। আর ওই লোকটার লাশ—একটু চুপ করে থেকে রুনু বলল, রাইফেলটা খুলে নেব।
আট বছর আগের এই ঘটনা। এতকাল পরে আবার আজ রুনু আর আমি একসঙ্গে। রাত হয়ে গেছে অনেকটা। এর মধ্যে দুটি বাস পার হয়ে গেল। প্রায় ফাঁকা। একটি বাসের ভিতরে লোহার খুঁটির গায়ে হেলান দিয়ে কন্ডাক্টর পয়সা গুনছে দেখতে পেলাম। দুটি বাসেই কিছু যাত্রী ছিল।
দুটি বাসই এখানে থেমেছিল। শেষ বাসটি থেকে দুজন যাত্রী এখানে নামল। তারা আমাদের দেখতে পায়নি।
আসলে আমরা অনেক কম নিরাপদ।
কম নিরাপদ? কিসের থেকে কম?
ফাঁকা বাসে উঠলে যতটা ঝুঁকি আছে, সাধারণভাবে সর্বক্ষণ আমাদের ঝুঁকি তার চেয়ে বেশি।
আরো বেশি নিরাপত্তা চাওয়া স্বার্থপরতা।
স্বার্থপরতা নয় রুনু সাবধানতা।
একই কথা।
হঠাত্ বিভ্রমে ভেবে বসি, আট বছর আগের সন্ধ্যারাতের সেই ঝাউগাছের পাখিটাই আমাদের মাথার উপরে ডানা ঝাপটাল। শুকনো ডাল ভাঙার শব্দ পাই। কিন্তু ভুল তখুনি ভাঙে। এদিকে নদী নেই। এটা শুকনো অঞ্চল।
রুনু, আমরা স্বার্থপর কিসে? তোর কথা ছেড়ে দে—তোর মতো মানুষ আমি দেখিনি, দেখব তেমন আশাও করি না। আমার কথাই ধর, আমি স্বার্থপর কি? আমি ওর খুব কাছে এগিয়ে যাই। যে কাজে আমরা আছি, সেই কাজের দিক থেকে বলছিলাম কথাটা।
এই কাজে এলে তো আর নিরাপত্তার কথা ভাবা চলে না।
হ্যাঁ, তিক্ত কর্কশ চাপা গলায় আমি বলি, তোর রক্তে বাসের পাটাতন ভিজে যাবে বলে তুই বাসে উঠতে পারিস না।
না, বন্ধ হয়ে গেছে।
বন্ধ হয়ে গেছে? কী বন্ধ হয়ে গেছে? কথাটা ধরতে না পেরে আমি অবাক হয়ে যাই।
রক্ত।
গা শিউরে উঠে দু-তিনবার আমার সারা শরীর ঝাঁকি দিয়ে ওঠে, রক্ত পড়ছে না এই অন্ধকারে তুই কেমন করে বুঝতে পারছিস?
রক্ত আপনাআপনি বন্ধ হয়ে যায় তুই জানিস না? কোয়াগুলেট করার স্বাভাবিক শক্তি আছে রক্তের।
দুত্তোরি তোর কোয়াগুলেট করা। শোন, আমি দাবি করছি আমি স্বার্থপর নই। আমি পার্টির অতি সাধারণ একজন কর্মী—দাবি করছি আমি স্বার্থপর নই। আমার কাজের জন্যে আমাকে কেউ তিরস্কার করতে পারে না। পরীক্ষা না দিয়ে কলেজ থেকে আমি চলে এসেছি, আমি এখনো ফিরিনি। আমি মাথা পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে পারব না তোকে বলছি।
তুই তো জানিস, আমি ইচ্ছে করলেও মাথা চালু রাখতে পারি না—বলতে বলতে রুনু এমন স্বাভাবিকভাবে বসে পড়ল যে আমি ভুলে গেলাম ওর ঊরুতে বুলেট গেঁথে আছে। তাকে খুব আবছা দেখতে পাই। সে আমার কানের কাছে মৃদুগলায় বলে, মাথা চালানোর কাজটা তোদের। আমরা কেন এসেছি রুনু?
তোরা আমাকে যা বলেছিস, তাই আমি বিশ্বাস করি। আমরা এসেছি বিপ্লব করতে।
বিপ্লব হবে?
হবে বলে বিশ্বাস না থাকলে এখনো কাজ করব কেন বল?
এই মুহূর্তে তোমার পায়ের মাংসে একটি বুলেট গেঁথে আছে।
বিপ্লবের কথায় সেটা কি এতই জরুরি? আমার কাছে যাই হোক না—বিপ্লবের কথা বলতে গেলে এটা খুব তুচ্ছ।
রুনু, আমরা এখনো আজ রাতে কোথায় আশ্রয় পাবো জানি না। একেবারেই পাবো কিনা, তাও জানি না। একটা হাতুড়ে ডাক্তার পর্যন্ত তোর জখমের জায়গাটা একবার উঁকি দিয়েও দেখেনি। আজ রাতের মধ্যে ঘা-টা বিষিয়ে উঠতে পারে জানিস? চাপা হাসির শব্দ পাই, রুনু বলে, মাথা চালানোর এইটাই দোষ তারেক। যেদিকে ছোটে হুড়মুড় করে ছোটে। ফেরানো যায় না। তাও যদি শুধু বুদ্ধিটা ছুটত—রাগ, আক্রোশ, ক্ষোভ, মায়া সব গিয়ে একসাথে জোটে। খুব ব্যক্তিগত হয়ে যায় তখন। তুইও এটাকে ব্যক্তিগত করে তুলছিস। এর সঙ্গে বিপ্লবের সম্পর্ক কী? আমাদের পার্টির কাজ আছে, সিদ্ধান্ত আছে। তার কিছু কিছু দায়িত্ব আমাদের ঘাড়ে পড়েছে। কখনো দায়িত্ব পালন করতে পারি, কখনো পারি না। সেইজন্যে সাথে সাথে বিপ্লব হয়ে যায় না বা চিরদিনের জন্যে বন্ধও হয়ে যায় না। তুই নাকি মাথা চালাস না কখনো?
না, কখনোই না। চিন্তা করে দ্যাখ— আমার মূল কথাটা খুব সাদাসিধে। পার্টিতে যোগ দিয়েছি বিপ্লবের কাজে।
আমার রাগ হতে থাকে, ভীষণ রাগ হতে থাকে। এমন চড় চড় করে আমার আক্রোশ চড়ে যে, আমি নিজেই অবাক হয়ে যাই। কার ওপর রাগ আমার? কোনো বিশেষ লক্ষ্য নেই আমার আক্রোশের। নিজের অন্ধকার মনের দিকে চেয়ে দেখি। কি যে ধু’ইয়ে উঠছে সেখানে। সমস্ত বাংলাদেশ পিষে গুঁড়ো করে ফেলতে ইচ্ছে হয় আমার।
কেমন পার্টি আমাদের? আমার কথার সুরে কি ছিল আমি জানি না, রুনু যেন রুখে উঠল, তারেক কী বলছিস তুই? তোকে আমি কঠিন কথা বলব। তুই এখন বুলেট খাসনি।
সেটা কোনো সান্ত্বনার কথা নয়। তোকে জিগ্যেস করি, কোনো পিছুটান রেখে আমরা এসেছি কি?
না।
যেখান থেকে এসেছি, সেখানে ফিরে যেতে চাই কি আমরা?
আমাদের মধ্যবিত্ত সংসারে?
না।
ভালো কথা। তাহলে পার্টির ভাষায় আমরা শ্রেণীচ্যুত হয়েছি?
হ্যাঁ। কিন্তু মন-মানসিকতায় এখনো নয় তারেক। এই যে একটু আগে তুই বললি—
মন-মানসিকতার কথা রেখে দে। বচনসার বদমাশরা এইসব বলে।
তারেক—রুনু অসহিষ্ণু গলায় বলে।
বলছি, বচনসার বদমাশরা এইসব বলে। তাদের বেশির ভাগই নেতা। তাদের তুই দেখিসনি নাকি যে অবাক হচ্ছিস? আমি তোকে জিগ্যেস করছি—আমরা সব ত্যাগ করে কি এই কাজে আসিনি? কোনো বইয়ে লেখা নেই—কিন্তু আমি তোকে বলছি আমরা আমাদের সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে বিপ্লবের কাজে নেমেছি। রুনু, তোর চেয়ে বেশি আর কেউ কে সে কথা প্রমাণ করেছে?
বেশ হলো। তা কি বলছিস?
আমরা কিন্তু কেউ নেতা নই।
বেশ তো হলো। কথাটা কি তো?
গত দশ বছর আছি তো আমরা। এই দশ বছর একবার সামনে রাখা যাক। সেইটুকুও হিসেব করবো না? আমরা কি জানোয়ার নাকি? কিছুই হয়নি, বিপ্লব হয়নি, হবার কোনো ভরসাও করা যাচ্ছে না—
পার্টির ভিতর অথচ তিন-চারটে বিপ্লব এর মাঝেই মধ্যেই হয়ে গেছে বলছিস তো?
আমি হাসলাম না, দশ বছর আগে যেসব লোকের কাছ থেকে হুকুম পেয়েছি—সেইসব লোক এখন কে কোথায়?
এটা তো হতেই পারে—ভাঙা-গড়ার প্রক্রিয়া তো চলবেই।
আর সেই প্রক্রিয়ায় আমরা কচুরিপানার মতো ভেসে ভেসে একবার এর গায়ে গিয়ে লাগব, একবার ওর গায়ে গিয়ে লাগব?
এটা নিয়ে রাগ করা চলে না তারেক। সাচ্চা পার্টি যদি একটাই হয়, তাহলে আজ যতগুলো গ্রুপ বা পার্টি দেখছিস, তার মধ্যে একটাই সাচ্চা আর স্বাভাবিকভাবেই আমরা যেটাতে আছি, সেটাই সাচ্চা। জেনেশুনে কেউ তো আর ভুল লাইনে কাজ করে না।
রুনু, তুই লজিক খুব ভালো করে পড়েছিস। কিন্তু লজিকটা বাদ দিয়ে গত দশ বছরের চেহারাটা দ্যাখ—কি একটা সাচ্চা পার্টি হলো দুটো। সঙ্গে সঙ্গে দুটোই সাচ্চা আর দুটোই ভুল লাইনের হয়ে গেল। আসলে হলো একটা সাচ্চা। তারপর দুটো ভেঙে চারটে হলো—তার মানে চারটে সাচ্চা। চারটে ভুল লাইন আর এই চারটের মধ্যে একটা সাচ্চা। এই চলতে-চলতে এখন হচ্ছে ষোলোটা সাচ্চা। ষোলোটাই ভুল লাইন আর তোর যুক্তিশাস্ত্র মানলে ষোলোটার মধ্যে একটা সাচ্চা। তুই বলতে চাস, ওই সাচ্চাটায় আমরা আছি।
নিশ্চয়।
ভাঙা-গড়ার প্রক্রিয়া চলুক আপত্তি নেই। কিন্তু গত দশ বছরে কিংবা পঞ্চাশ-ষাট বছরে এই প্রক্রিয়াটাকে জনসাধারণ কীভাবে নিয়েছে? নেতাদের নাগরদোলার কথা ছেড়ে দে—এত সাচ্চা আর এত ভুল লাইন জনসাধারণ কীভাবে নিচ্ছে এখন? খুব ক্লান্ত গলায় রুনু বলল, কোনো উপায় নেই এটা এড়ানোর। তাহলে ছেড়ে দিতে হয়। আমি ছেড়ে দেবার জন্যে তো যোগ দেইনি। কারো মন জোগানের জন্যে, বাহাদুরি নেওয়ার জন্যে আমি বিপ্লবের কাজে আসিনি। আমি হয় মরে যাবো, না হয় এ দেশের সমস্ত মানুষের মুক্তি দেখব। আশা করি, মরে যাবার আগে মানুষের মুক্তি এসে যাবে।
রুনুর দাঁতে দাঁত লাগার ঠক ঠক শব্দ হচ্ছিল। ওর কি খুব শীত করছে? বাতাসটা বন্ধ হয়েছে বটে, কিন্তু মাঘ মাসের আকাশ থেকে হিম ঝরছে। আট বছর আগের সেই দিনের কথা তোর মনে আছে রুনু, সেই যে মুকুল বলেছিল আমরা কে জানতে পারলে জনগণ আমাদের ছাল খুলে নেবে। সেদিন আমার খুব রাগ হয়েছিল। ওই রকম কথা আর একবার বললে সেদিন ওকে হয়তো মেরেই ফেলতাম। কিন্তু আজ আট বছর পরে একবার দ্যাখ তো আমাদের সেইসব পুরনো নেতারা কে কোথায় রয়েছেন? আমাদের মতো দেশে যত রকম রাজনৈতিক অবস্থান কল্পনা করতে পারিস—পাতি বুর্জোয়া, বুর্জোয়া, গণতন্ত্র, প্রজাতন্ত্র, ধর্মতন্ত্র, সর্বঘটে কোথাও না কোথাও কাউকে তুই ঠিক পেয়ে যাবি। ভালো ভালো যুক্তি প্রত্যেকেরই আছে অবশ্য, তবে কিনা সবকিছু তো ঘটছে সকলের চোখের সামনে। দাঁতে রক্ত লেগে আছে।
এসব কথা তুই কেন বলছিস জানি না—রুনু একই রকম ক্লান্ত গলায় বলল, ঠিক কি কারণে তুই আজ এই কথাগুলো বলতে শুরু করেছিস আমি বুঝতে পারছি না।
প্রচণ্ড রাগ আবার আমাকে অধিকার করল। চিত্কার করতে পারলে ভালো হতো, বহু কষ্টে ক্ষ্যাপার মতো চেঁচানোটা সামলাই। হাত বাড়িয়ে রুনুকে স্পর্শ করে বলি, তোর মতো দেশপ্রেমিক, রুনু তোর মতো দেশপ্রেমিক, একাত্তর সালে তুই লড়তে লড়তে মরবি বলে পণ করেছিলি, অন্যেরা যখন মুরগির রান চিবুচ্ছিল—স্বাধীনতার পরে, আট বছর পরে সেই তোর দেশে তোর রক্ত ঝরল। কেউ না জানুক, আমি তো জানি তুই কী? তোর মতোই দেশকে ভালোবেসে এমন লোক হয়তো এই দেশে আছে— কিন্তু তোর চেয়ে বেশি ভালোবাসা এমন লোক একটিও নেই। সেই তোর মতো।
রুনু ডান হাত বাড়িয়ে আমার কাঁধের কাছে খিমচে ধরে নিষ্ঠুর কঠিন গলায় বলল, একাত্তর সালে স্বাধীনতা কে এনেছিল তুই জানিস না? হাজার হাজার সাধারণ মানুষ যুদ্ধ শেষ করে কী পেয়েছিল, তা তোর জানা নেই? গত আট বছরে স্বাধীনতার ফলটা কারা চেটেপুটে খেলো, তাও কি দেখতে পাস না? এ দেশে যার রক্ত ঝরবে না, সেই বিশ্বাসঘাতক। ওই রক্তটুকুই আমি দিতে পারব ঠিক ততটুকুই আমি মানুষের পক্ষে থাকব। যত খুশি ভুল হোক আমার। আঃ— খুব কষ্টের চিত্কার করে উঠল রুনু। চমকে উঠে আমি ওর কাছে যাই। মাথায় হাত দিয়ে দেখি এই প্রচণ্ড শীতের মধ্যে ঘামে জবজবে হয়ে ভিজে গেছে ওর চুল। কপালে হাত দিয়ে দেখি সেখানেও দর দর করে ঘাম ঝরছে। ভীষণ ভয় পেয়ে যাই আমি। বারবার বলি, কী হলো রুনু তোর কি খুব কষ্ট হচ্ছে? অন্ধকারের মধ্যেই রুনু মাথা নাড়ে।
কাছাকাছি জনবসতি নেই। শূন্য রাস্তার দিকে আমি চেয়ে থাকি। অন্ধকারের মধ্যে কুয়াশা ঘুরে বেড়ায়। তারপরে আলো দেখতে পাই। একজোড়া তীব্র আলো। দ্রুত আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে।
বাস আসছে, রুনু বাস আসছে। ফাঁকাই হোক আর ভিড়ই হোক, এই বাসে আমাদের উঠতেই হবে। কোথাও তো পৌঁছুতে হবে আমাদের।
পাছে এখানে না থামে, তাই বাস থামানোর জন্য আমি রাস্তার মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ানো ঠিক করলাম। উঠে দাঁড়াই আমি। যাস না, রুনু বলে, বাসের দরকার নেই। আমি চলতে পারবো না। কেন রে? আমি অবাক।
কিছুক্ষণ আগে থেকেই মনে হচ্ছিল পা-টা যেন কেমন লাগছে। এখন একবারেই গেছে। তার কথা শেষ হতে হতে আমাদের উপর তীব্র আলো এসে পড়ে। আমি দেখতে পাই বাস নয়, একটা জিপ, আমাদের ছাড়িয়ে বেশ খানিকটা গিয়ে কর্কশ আর্তনাদের শব্দে ব্রেক কষে। তারপর পিছু হটে আমাদের দিকে আসে। রাস্তা থেকে নামে জিপের পেছনের লাল আলোটা জ্বলে-নেভে।
আমি দুহাতে রুনুর হাত চেপে ধরি, না, কোনো লাভ নেই। কোনো মানেও নেই। মরলে কিছুই এগোবে না।
এই প্রথম রুনু আমার কথা শোনে। আমার হাতের মধ্যে তার হাত ঘেমে যায়। লাফিয়ে লাফিয়ে ওরা জিপ থেকে নামছে। ভারী বুটের আওয়াজ পাচ্ছি। মাঘের আকাশ কুচকুচে আলো। অন্য সময়ের চেয়ে আকাশে এখন অনেক বেশি তারা দেখা যায়। বাতাস ঠাণ্ডা। মাটি ভীষণ ঠাণ্ডা। এদিকে নদী নেই। মাঠে বাতাস। হিম। আমরা অপেক্ষা করছি।
১৯৮১।





