ভারতের জেলখানায় নকশাল বিপ্লবী অমলেন্দু বসুর স্ত্রী ম্যারি টাইলরকে পাঁচ বছর কাটাতে হয়েছিল। সে সময়ের অভিজ্ঞতা টুকে রেখেছিলেন তার দিনলিপিতে, যা ১৯৭৭ সালে বই হিসেবে বাজারে আসে। দিনলিপিটির নাম— মাই ইয়ার্স ইন অ্যান ইন্ডিয়ান জেল। সে সময়কার জেলের ভেতরে-বাইরে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ, তাদের অব্যাহত লড়াই ও তাদের ওপর চলমান নির্মম নিপীড়ন— এসবেরই বর্ণনায় ভরে উঠেছিল তার দিনলিপির প্রতিটি পাতা। লিখেছিলেন, কীভাবে সে সময় জেলখানাগুলো উপচে উঠছে উপবাসী মানুষে। তখনকার দিনে সংবাদপত্রগুলো দিন দিন খারাপ হতে থাকা পরিস্থিতির খবর কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই প্রকাশ করে বসত। একদিকে রাজনৈতিক নেতাদের ক্ষমতার তুমুল দ্বন্দ্ব, অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলে অভাব, উপবাস তীব্র হচ্ছে, আর এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মৃত্যু। ডাকাতি কিংবা চুরির মতো ‘অপরাধের’ সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হচ্ছে অভাবি খেটে খাওয়া মানুষ। দিন দিন তা বাড়তেই থাকে। তখন যারা ক্ষমতায় বসে ছিলেন, তারা একে কেবল ‘আইন-শৃঙ্খলার’ সমস্যা হিসেবে দেখেছিলেন। ভাবছিলেন, শক্ত হাতে আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পারলে সমাধান হয়ে যাবে।
সে সময়ের গরিব মানুষের দুর্ভোগ আর যেসব ক্ষমতাসীন নেতা এই গরিবদের প্রতিনিধিত্ব করেন, তাদের নিয়ে ১৯৭৩ সালে টাইলার যে নিরাবেগ মন্তব্য করেছিলেন, আজো সমানভাবেই মূল্যবান। তিনি লিখেছিলেন, ‘বেশকিছু রাজ্যে মৃত্যুর কারণ উপবাস, নাকি অপুষ্টি— এ নিয়ে দিল্লির সংসদে বিতর্ক চলছিল। প্রতিবারই যখন দুর্ভিক্ষ আঘাত হানে, এ একই বিতর্কের পুনরাবৃত্তি চলে। যেন উপবাস আর অপুষ্টির মধ্যে সত্যি কোনা মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। সরকার যেন বোঝাতে চায়, অপুষ্টিতে মৃত্যু এখন গ্রহণযোগ্য। কারণ উপবাসের পরিস্থিতি এরই মধ্যে কাটিয়ে ওঠা গেছে।’
সে সময় বেশকিছু অভিযোগ এনে ম্যারি টাইলারকে জেলখানায় নিক্ষেপ করা হয়েছিল। ম্যারি নকশাল বিপ্লবী অমলেন্দু সেনের স্ত্রী আগেই বলেছি। বিহারের হাজারীবাগ জেলে পাঁচ বছর আটকে থাকতে হয় তাকে। কখন তার অভিযোগ আদালতে উঠবে, সে অপেক্ষায় প্রতিটি দিন পার করছিলেন ম্যারি। যেসব নারীর সঙ্গে জেলে ছিলেন, তারা জেলের ভেতরে কী অবস্থায় ছিলেন, আর জেলের বাইরেই বা তাদের জীবন কেমন ছিল, সেসব তথ্যও তুলে ধরেছেন ম্যারি। জেলের বাইরে কোন পরিস্থিতিতে আর কোন সামাজিক কাঠামোয় এসব নারীর অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামই হয়ে উঠেছিল ‘ফৌজদারি অপরাধ’, সেই ট্র্যাজিক বর্ণনাও রয়েছে ডায়েরির পাতায় পাতায়।
ম্যারিকে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ দিয়ে ডায়েরির শুরু। সেখানে দেখা যায়, ম্যারির মুখের ওপর পুলিশ একের পর এক প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে। তারা ম্যারি সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য গ্রহণযোগ্য করার সব রকম চেষ্টা চালাচ্ছে।
‘তুমি একজন চীনা নাগরিক।’
‘না, আমি ব্রিটিশ নাগরিক।’
‘আমি তো বললাম, তুমি চীনা। কোথায় তোমার পাসপোর্ট?’
‘কলকাতায়।’
‘তুমি মিথ্যা বলছ। আমার কাছে তোমার পাসপোর্টটি আছে। তুমি কি সেটা দেখতে চাও?’
পুলিশ কলকাতা থেকে তার পাসপোর্ট জব্দ করে। জিজ্ঞাসাবাদের পর সংবাদ সম্মেলনে চূড়ান্ত বিকৃত একটি প্রতিবেদন তুলে ধরে পুলিশ।
ম্যারি তার জেলজীবন, রাজনৈতিক কয়েদিদের ওপর নির্যাতনের যে ছবি দেখেছেন, জেলখানার যে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি, জেলবন্দিদের যেসব নাগরিক ও আইনি অধিকার রয়েছে, তা পুলিশ কর্মকর্তা কীভাবে পায়ে দলে চলেন, তার সবকিছুই টুকে রেখেছেন ডায়েরির পাতায়। পাতার পর পাতা যতই পার হয়ে যাবেন, আপনার চোখের সামনে একটি রাক্ষুসে কাঠামোর যুক্তিবিধ্বংসী ও নিষ্ঠুর চেহারাটাই ফুটে উঠতে থাকবে। বুঝতে পারবেন, এ কাঠামো কীভাবে মানুষকে গিলে খায়, আর একদম হাওয়া করে দেয়। আপনাকে ভয়ে অবশ করে দেবে এ ভয়ঙ্কর চোহারা। তিনি কেবল জেলজীবনের রোমহর্ষক পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়েই কাজে ইতি টানেননি, সেখানকার নারীদের নিত্যদিন নিমর্ম নিপীড়িত হওয়ার কথাও লিখেছেন।
জেলের বাইরে বিশাল বিস্তৃত যে ভারত, সেখানকার জীবনের পরিপ্রেক্ষিতে জেলের ভেতরের বন্দিদের জীবন তুলনামূলক বর্ণনায় তুলে ধরতে ভোলেননি ম্যারি টাইলার। তিনি লিখেছেন, ‘দেয়াল ও ছাদ চুইয়ে কয়লা, জ্বালানি কাঠ, কম্বল, বস্তা সব ভিজিয়ে দিচ্ছে বৃষ্টি। বাইরে বিহারের বিশাল এলাকা কয়েক সপ্তাহ হয়ে গেল পানিতে ডুবে গেছে। ধ্বংস হয়ে গেছে ফসল। আমাদের প্রতিদিনের সবজি হলো শুধু কালো হয়ে যাওয়া আলু। মুখে দেয়ামাত্র বিস্বাদে গুমরে ওঠে জিভ।’
তবে তিনি বলতে ভোলেননি বন্দিদের যে অমানবিক পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে রাখা হয়েছে। জেলের বাইরে ওই বন্দিদের যে দরিদ্র জীবন ছিল, তার ছুতা দিয়ে এ পরিস্থিতিকে কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য করে তোলার সুযোগ নেই। জেল কর্তৃপক্ষ বাইরের দুর্দশাকে ভেতরের বন্দিদের ওপর তাদের অব্যাহত নিষ্ঠুরতার ছুতা হিসেবে ব্যবহার করত। তাদের দুর্নীতির পেছনে যুক্তি হিসেবে কাজে লাগাত। অবস্থাসম্পন্ন কোনো বন্দিকে ভালো পোশাক দিলেও গরিব নারীদের দেয়া হতো ন্যাকড়া-কাপড়। ম্যারি একদিন প্রতিবাদ জানান। তখন জেল কর্মকর্তা তাকে বলেন, তার সঙ্গীরা জেলে আসার আগেই গরিব ছিল। বাইরেও তাদের প্রায় সবসময় ন্যাকড়া-কাপড় পরেই থাকতে হতো। তাই জেলের ভেতরেও আশা করার সুযোগ নেই যে, তারা ‘ধনী’ হয়ে যাবে। জেলের বাইরে আসলেই সারা দেশে অনেক মানুষকেই খালি পায়ে আর প্রয়োজনীয় জামাকাপড় ছাড়াই প্রচণ্ড শীত পার করতে হয়। আর এ বিষয়টাই যেন জেলবন্দিদের বঞ্চিত করার বড় যুক্তি হয়ে উঠল জেল কর্মকর্তার কাছে। এ ছুতায় তিনি জেলের নিয়ম অনুযায়ী ন্যূনতম যেসব সুযোগ বন্দিদের জন্য নির্ধারিত রয়েছে, তাও দিচ্ছেন না। আর ট্র্যাজেডি হলো, তখনকার কংগ্রেস সরকার কিনা নির্বাচনে জয়ী হয়েছে দেশ থেকে ‘দারিদ্র্য হটাও’ স্লোগান পুঁজি করে!
ডায়েরির পাতা যত এগোতে থাকে, ততই নিষ্ঠুরতার পরিবেশ তার ঘা খুলে দেখাতে থাকে। ম্যারি যথারীতি পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে চলেন। লিখেছেন, ‘প্রতিদিনের নিরামিষ সবজি একটা লোহার ড্রামে সিদ্ধ করা হয়, যতক্ষণ না ড্রামটা কালো ও চকচকে হয়ে ওঠে। সবচেয়ে খারাপ হলো, প্রায়ই ড্রামের ভেতর মোটা লাল কেঁচোর দেখা মেলে। শীত যত ঘন হয়ে আসে, পোশাক আর কম্বলের অভাবে সমস্ত বন্দি ততই কুঁকড়ে যেতে থাকে। শুষ্ক শীত যতই জেঁকে বসে, ততই আমাদের পায়ের গোড়ালি ফাটতে থাকে। একসময় রক্তপাত হতে থাকে। আমাদের বন্দিদের অধিকাংশেরই কোনো জুতা নেই। যাদের আছে, সেসব জুতার তলির পরিস্থিতি এত বাজে, পায়ে তীব্র যন্ত্রণা হয়। পাথুরে মেঝে আরো কষ্টদায়ক হয়ে ওঠে। শিশুরা প্রায়ই ঠাণ্ডায় কান্নাকাটি করে। পায়ের ক্ষতের ব্যথায় কাঁদতে থাকে। অথচ ক্ষত সারার কোনো আশাই নেই। আমাদের পানির সরবরাহ অনিশ্চিত। প্রায় দিনই কয়েকটি হলুদ ফোঁটার বেশি পানি মেলে না পাইপে। আমাদের সব ট্যাপের মুখ একসঙ্গে শুকিয়ে যায়। আর প্রতি চারজনের একটা দল বড়জোর দুই বালতি পানি পায়। এ দিয়ে গোসল, জামাকাপড় ধোয়া, রান্নাবান্না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সমস্ত কাজ সেরে নিতে হয়। ওয়ার্ডেনের কাছে প্রায় সবসময় এক বালতি জলের জন্য কাকুতিমিনতি করে যেতে হয়।’
মাড় ভরা ভাত, আধা সিদ্ধ চাপাতি রুটি এবং পচা সবজি— এই হচ্ছে প্রতিবেলার খাবার। এসব খাবার স্বাস্থ্যগত দিক দিয়ে খাওয়ার যোগ্য নয়। হজমযোগ্যও নয়। এসব খাবারে মশা বসে, তেলাপোকা হাঁটে, অসংখ্য ইঁদুরে মুখ দেয়, বলতে গেলে রোগজীবাণুর অভয়ারণ্য। মারাত্মক রোগ বাসা বাঁধে প্রায় সব নারীর শরীরেই। রোগই হয়ে ওঠে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। টাইলার অসুস্থতার প্রসঙ্গে আরো লিখেছেন, ‘সাধারণত প্রতিদিনই এক-দুজন বন্দি অসুস্থ হয়ে পড়ত। অধিকাংশ নারী সবসময় বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগত। লিভার ও কিডনির সমস্যার লক্ষণ ছিল অনেকের মধ্যে। বলতে গেলে সবাই কোনো না কোনো শারীরিক যন্ত্রণায় ভুগত। রক্তাল্পতা (অ্যানিমিয়া) বলতে গেলে সবারই সাধারণ রোগ। পেটের মধ্যে পরজীবীর বাসা— যা তাদের ক্লান্তি ও বিষাদে ডুবিয়ে রাখত। ফুসকুড়ি, ফোঁড়া, অপুষ্টির লক্ষণ আর ভিটামিনের অভাবে সবার শরীরেই নানা সমস্যা ছিল। তবে কারোই এসব সমস্যা লক্ষ করার সুযোগ ছিল না...।’
ডাক্তার আর জেল কর্মচারী, সবার কাছেই, বন্দিরা মানুষ নয়। তারা এমন সৃষ্টি, যাদের কাছ থেকে যত বেশি সুবিধা আদায় করে নেয়া যায়। তিনি এ নিয়ে ডায়েরিতে লিখেছেন, ‘জেলের ডাক্তার আর সবার মতোই কেবল নিজের চাকরিটা কোনো রকম করে চলে। আর ধান্দায় থাকে এ থেকে যতটা সম্ভব সুবিধা লুটে নেয়ার। চারপাশের এ চলমান দুর্ভোগের মধ্যে কেউ কেউ একেবারেই নিষ্ক্রিয় বা বধির হয়ে পড়েন। অন্যরা গণহারে কৃমির ওষুধ বা ব্যথানাশক ট্যাবলেট দিয়েই দায়িত্বে ইতি টানেন। আমার প্রায়ই মনে হতো, জেলখানা হয়তো নতুন ওষুধের পরীক্ষাকেন্দ্র। কারণ কোনো রোগীর জন্য একই ওষুধ দ্বিতীয়বার লিখতে ডাক্তারদের আমি খুব কমই দেখেছি।’
ম্যারি ডায়েরিতে জানান, ‘রোগের আরো অনেক উেসর দিকে ঠেলে দেয়া হয় নারীদের। হাজারীবাগ জেলের গেটে নোংরা, ঘামের দুর্গন্ধ, উকুন ভরা, পরিত্যক্ত কাপড়ের বান্ডিল আসত। নারীদেরই এসব বাছাই করতে হতো, ধুতে হতো। স্যানিটারির কাজে এসব ন্যাকড়া ব্যবহার করতে হতো নারীদের। জামশেদপুরে এ ধরনের কাপড়ের সরবরাহও ছিল না। নারীরা সেখানে নিজের কাঁথার ব্যবহূত শাড়ির কানি টুকরো টুকরো করে স্যানিটারির কাজে ব্যবহার করতে বাধ্য হতো...।’ সন্তান জন্ম ও গর্ভপাতের ফলে অবিরাম রক্তপাতে নিম্নবর্ণের নারীর মৃত্যু হয়েছে— এমন দুর্ভোগের কথাও লিখেছেন ম্যারি। কারণ হিসেবে লিখেছেন, ব্রাহ্মণ ডাক্তাররা তাদের ছুঁতে রাজি হননি।
প্রশ্ন হলো, ভারতের জেলে আটক নারীরা কারা, যাদের নিয়ে ভাবাই হয় না। বাস্তবতা হলো, অদৃশ্য এ নারীদের দোষী ঘোষণা করা হয়েছে। নিক্ষেপ করা হয়েছে দৃষ্টির বাইরে, জেলখানায়। তাই বলে কি ভাবনারও বাইরে? জেলে এ নারীরা কোন ভয়ঙ্কর অপরাধ করেছে যে এমন শাস্তি হয়েছে? এ বইয়ের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে এসব নারীর জীবন ও সংগ্রামের কাহিনী। এর মধ্য দিয়ে একটা নির্দিষ্ট প্যাটার্নও ফুটে উঠতে শুরু করে। ম্যারির ভাষায়, ‘জেলের বারের সবচেয়ে কাছেই ঘুমাত বুলকানি— বয়স্ক, চর্মসার, হাঁফানি-জর্জর, কয়লাখনিতে কাজ করত, সে কাজ ছেড়েও দিয়েছিল। এরই মধ্যে জেলের ভেতর তার তিন বছর পার হয়ে গেছে, ট্রায়ালের খবর নেই। সে একটা ছিঁচকে চুরির ঘটনায় ধরা খেয়ে জেলে এসেছিল।’ জেলের এসব নারীর অনেকেই ভূমহীন শ্রমিক, যারা অবৈধভাবে মদ বানানো, অত্যাচারী ভূমি মালিকদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর মতো ‘অপরাধের’ কারণেই জেলে বন্দি জীবন যাপন করছে। আরেক নারীর কথা বলেন ম্যারি, ‘বারসি, চামড়ায় ভাঁজ পড়া বুড়ো মানুষের মতো দেখতে। এ নারী খুবই নিরীহ গোছের। প্রতিদিনের ভিড়ে ঠেলাঠেলিতে নিজেকে সামলে ধরে রাখতে পারে না। দীর্ঘ সারিতে সবার পেছনে তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। জমি নিয়ে বিরোধের নিষ্পত্তির অপেক্ষায় তার স্বামীও জেলেই মারা গেছে। তার স্বামী যখন মারা যায়, তখন তাদের জেলে চার বছর কেটে গেছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা যে ছোট এক টুকরো জমিতে ধান লাগিয়েছিল, তা একজন ধনী চাষী নিজের বলে দাবি করেছে। বারসি ও তার স্বামীও এ জমি নিজের বলে দাবি করে থাকে।’ এবার গোলাবির কথা বলা যাক। তার কেসটা আরো নাটকীয়। সে বেশ কয়েক বছর ধরেই জেল খাটছে। দুই জমি মালিকের ক্ষমতার সংঘর্ষের জেরে তাকে জেলে আসতে হয়েছে। ‘আরো চারজন দিনমজুরের সঙ্গে এক মালিকের জমিতে ধান কাটতে গিয়েছিল। তারা জানত না, এ জমির মালিকানা নিয়ে ওই মালিকের চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে বিরোধ চলছে। ওই চাচাতো ভাই এসে তড়িঘড়ি করে জমি থেকে তাদের ধান লুটপাটের অভিযোগে গ্রেফতার করে। পরিহাসের বিষয়, এরই মধ্যে জমির মালিকানার দুই দাবিদার তাদের বিরোধ নিষ্পত্তি করে ফেলেছে। কিন্তু এ নারী ও অন্য মজুররা এখনো ঠিকই জেল খাটছে।’ এভাবে একের পর এক নারীর কাহিনী যতই ভাঁজ খুলতে থাকে, নারীদের ওপর যে সবসময় সবখানে দ্বিগুণ নিপীড়ন চলতে থাকে, তাও একপর্যায়ে ডায়েরিতে দৃশ্যমান হতে থাকে। উদাহরণ হিসেবে পানোর কথাই বলা যায়। পানো সাঁওতাল নারী। গ্রামের সর্দার পানোর মেয়েকে গর্ভবতী করে ফেলে। গ্রামের অন্যদের জ্বালাতন আর নিপীড়নে পানো নিজের রাগ আর সামলে রাখতে পারেনি। নিজের মেয়েকেই খুন করে বসে। এরপর তার ২০ বছরের জেল হয়। ম্যারি টাইলার এ নারীর পরিস্থিতি সম্পর্কে লিখেছেন, ‘রাতে ঘুমের ভেতর সে কাঁপতে থাকে, বিড়বিড় করে এবং একসময় চিত্কার করে কাঁদতে থাকে। তার মেয়েকে নিয়ে ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন দেখে।’
আরেক আদিবাসী মেয়েও জেলে আছে। ম্যারি জানান, ‘একজন সুদখোরকে হত্যা করে সে জেলে এসেছে। ওই লোক তাকে ধর্ষণের চেষ্টা করছিল। তারপর নিজেকে ধর্ষণের শিকার হতে না দিয়ে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধে ঘুরে দাঁড়ালেও রেহাই পায়নি। ঠিকই শায়েস্তার শিকার হয়েছে। একের পর এক মামলায় নারী যখন তার সুস্থতা, স্বাভাবিকতা, শান্তি ও জীবন দিয়ে মূল্য শোধ করে, তখন আসল অপরাধীরা শুধু ছাড়াই পায় না, সমাজে মুক্তভাবে শুধু ঘোরাফেরাই করে না, তারা বিচারকের আসনেও চড়ে বসে। এমনকি তাদের হাতে অত্যাচারের শিকার যারা হয়েছে, তাদেরই দোষী ও অপরাধী বলে ঘোষণা দেয়। এ আদিবাসী নারীও একইভাবে দোষী সাব্যস্ত হয় নিজের গ্রামে।’
ডায়েরিতে ম্যারি লিখেছেন, ‘কেবল বর্ণ আর শ্রেণীর বাধা নয়, বরং তীব্র দুর্ভোগের মাঝেও সহযোগিতার চরম অভাব নারীদের বিভক্ত করে রেখেছে। প্রায়ই আমরা আমাদের রাগ-ক্ষোভ-ঘৃণা আরেকজন নারীর ওপরই ঢেলে দিই। কারণ নিপীড়নকারী শক্তি মনে হয় বিশাল বড়, আর আমাদের নাগালের একেবারে বাইরে। উল্টোদিকে একই সময় আমাদের মতো অন্য নারীরা নিজের নাজুক অবস্থার জন্য ঘৃণার পাত্র হয়ে ওঠে। অথচ এ নাজুকতা আমাদের সবার, আমাদের নিজেদের। সে কারণেই একজন আদিবাসী কিশোরী হীরা প্রতিবেশী এক নারীর ফাঁদে পড়ে গর্ভবর্তী হলে সেই নারীকে সে হত্যা করে বসেছে। তার প্রেমিক এক ধনী নারীকে বিয়ে করেছে। আর হীরা হয়েছে গ্রেফতার। গ্রামের বয়স্করা হীরাকেই নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। তাই তার পরিবারও সাহস করতে পারছে না তার জামিনের আবেদন করতে। হীরা ও তার ছোট ছেলেটি দুজনই এখন জেল খাটছে।’ টাইলার হীরা সম্পর্কে লিখেছেন, ‘সে কখনো হাসত না, কখনো কখনো তার ঠোঁটের কোণে যদিও মৃদু হাসির ছলে অনিশ্চয়তা আর আত্মযন্ত্রণার আভাস খেলে যায়।’
সত্যি বলতে এসব নারীর আসল অপরাধ তাদের দারিদ্র্য। কোনো কোনো ক্ষেত্রে খুবই স্পষ্ট, বুধনির ক্ষেত্রে যেমন। ২৫ বছর বয়সী এ নারী এবং তার বুড়ি শাশুড়ি তাদের জমি, ঘরবাড়ি, আসবাব এবং সমস্ত অলঙ্কার বেচে দিয়েছে দুজনের জন্য জামিনের আবেদন করতে। অবৈধ বন্দুক রাখার অভিযোগে তারা অভিযুক্ত। দৈহিক প্ররিশ্রম করে কোনো রকমে দুই বছর পার করেছিল বউ-শাশুড়ি। এর পরই তাদের শুনানির তারিখ পড়ল। কিন্তু বাড়ি থেকে আদালতে আসার প্রয়োজনীয় ৬ রুপি বাসভাড়া জোগাড় করতে পারেনি। আর ‘জাম্পিং বেইল’-এর জন্য তারা আবারো গ্রেফতার হলো।
ম্যারির নিজের অভিজ্ঞতার কথা লিখতে গিয়ে ডায়েরিতে জানিয়েছেন, জেলখানায় নারীরাই অন্য নারীদের হাতে সবচেয়ে সরাসরি নিপীড়নের শিকার হয়। পরিবারে যেমন বয়স্ক নারীরা কর্তৃত্ব করার অবস্থানে থাকে, তবে ক্ষমতা তাদের হাতে থাকে না। অনেকটা সেভাবেই ম্যাটিনেস (নারী কয়েদি, যে কিনা নজরদারির পদবিতে উন্নীত হয়েছে) আর ওয়ার্ডেসেস— উভয়ই নিজেরা নির্যাতিত মানুষ হলেও তাদের হায়ারার্কি অনুযায়ী অন্য নারীদের ঠিকই শোষণ-পীড়ন চালায়। ম্যারি টাইলার ও তার বান্ধবী কল্পনা সাধারণত ম্যাটিনেসদের ছোটখাটো চুরিচামারি নিয়ে কোনো অভিযোগ করতেন না। কারণ তারা মনে করতেন, বন্দিদের একে অন্যের বিরুদ্ধে লেগে ভেদ-বিভেদ বাড়ানো ঠিক নয়। টাইলারের কথায়, ‘যখন কিনা সবাইকে গিলে খেতে বসে আছে এক মহাহাঙ্গর, ছোট মাছের সঙ্গে তখন ঝগড়া করে কী লাভ?’ তিনি লিখেছেন, ‘ওয়ার্ডেসরা নিজেরাও কয়েদিদের সঙ্গে নারী ওয়ার্ডে তালাবদ্ধ থাকত— জেলের ভেতরে আরেক জেল যেন। তারা কোনো ওয়ার্ডার এসে বাইরে থেকে খুলে না দিলে কখনো বের হতে পারত না। তারা সবাই খুবই গরিব মানুষ। তাদের কাজ বলতে গেলে নেহাতই দাসীগিরির চেয়ে একটু ভালো। তারা কখনো ছুটি পায় না। এমনকি বাজার করতে যেতেও অনুমোদন লাগে। শুধু জেল কর্মকর্তাদের সঙ্গেই নয়, তাদের পুরুষ সহকর্মী ওয়ার্ডারদের সঙ্গেও তাদের প্রায়ই গালাগালি করতে দেখা যায়। দিনরাত আমাদের তালাবদ্ধ রেখে মনে হয় অনেক সময় তাদেরও মন খরাপ হয়। কখনো শক্তিশালী কেউ আমাদের কক্ষের তালা খুলে দেয় এবং বাইরে ঘণ্টাখানেকের জন্য কারো সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেয়।’
তবে এ নারীরা সবসময় নির্বিচারভাবে সাসপেনশনের ঝুঁকিতে থাকে। ম্যারি লিখেছেন, এক নারী সাসপেন্ড হয়েছিল। কারণ সে এক কয়েদির শিশুকে সুযোগ করে দিয়েছিল, যাতে সে ম্যারিকে দুটি ফুল দিতে পারে। আরেক নারী সাসপেন্ড হয়, সে একসময় ম্যারির বন্ধু হয়ে গিয়েছিল। সে ছিল এক আদিবাসী কিশোরী— নাম লিওনি। তার কাছ থেকেই ম্যারি জানতে পেরেছিল, ওয়ার্ডেসরা কেমন ধরনের জীবন যাপন করত। আর কীভাবেই বা তারা কয়েদিদের চেয়ে একটু ভালো অবস্থায় থাকার সুযোগ পায়। ম্যারি সে বর্ণনাও দিয়েছেন: ‘যেসব নিজস্ব কোয়ার্টারে তারা থাকত, তাদের অবস্থা তা যাই হোক না কেন, সত্যি বলতে জেলখানার ভেতরের পরিবেশের চেয়েও খারাপ। একটি ছোট ও নিচু মানের রুম, একটি ক্ষুদ্র বারান্দা আর ছোট উঠানের মধ্যেই গোটা একটি পরিবারকে বাস করতে হতো। এমন একটা বাসায় আট-নয়জনের একটি পরিবারকে বস্তুত বন্দিজীবনই যাপন করতে হতো। মাছি-মশার ভিড় আর উঠানের সামনে দিয়ে ছুটে চলা উন্মুক্ত নালার দুর্গন্ধ সত্ত্বেও তার ছোট্ট অন্ধকার কোয়ার্টারে থাকতেই লিওনি আসলে আমাদের ওয়ার্ডে ডিউটি করতে পছন্দ করত।’ আর এসব নারীকে, বলাই বাহুল্য, সবসময়ই তাদের অলঙ্ঘনীয় নিপীড়নের অংশ হিসেবে যৌন হয়রানির মোকাবেলা করতে হতো। ‘একবার লিওনি রাতের ডিউটিতে ঘুমিয়ে পড়েছিল। আর চিফ হেড ওয়ার্ডার তার সম্ভাব্য সাসপেন্ড হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে এগিয়ে এসেছিল। পরবর্তীতে লিওনির পক্ষ নেয়ার ‘মূল্য’ হিসেবে তার সঙ্গে ঘুমাতে চাইল ওই ব্যক্তি। যখন সে তাকে ফিরিয়ে দিল, লিওনির এ চাকরি খাওয়ার হুমকি দিয়ে তার জীবন ঝালাপালা করে ছাড়ল।’
টাইলার তার ডায়েরিতে আমাদের জানিয়েছেন, চিফ হেড ওয়ার্ডার পাটনা জেলে স্থানান্তর হলে তাকে খোঁচা দিতে অভিনন্দন জানান। বলেন, সেখানে গেলে তো আপনার যত শীর্ষ ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্ক হবে। এ কথায় চিফ ওয়ার্ডার কোনো রাখঢাক ছাড়াই বললেন, ‘আমি শীর্ষ ব্যক্তিদের দিয়ে কী করব? গরিব মানুষের কাছ থেকেই তো আমি আসলে টাকাপয়সা পাই।’ জেলখানার ভেতরে কীভাবে কাজকারবার চলে আর কোন সামাজিক কাঠামো একে অনিবার্য করে তোলে, তার পুরো চেহারাটাই এ কথায় ফুটে ওঠে। শীর্ষ পদ থেকে সবচেয়ে নিচের পদে থাকা প্রত্যেক ব্যক্তি তার ঊর্ধ্বতনকে ভয় পায়। আর ঊর্ধ্বতনরা সারাক্ষণই স্বৈরাচারী আচরণ করতে থাকে অধস্তনদের ওপর। আর এ প্রক্রিয়ায় স্বাভাবিকভাবেই যারা সবচেয়ে শীর্ষে বসে আছেন, তাদেরই সুবিধা। কারণ এর ফলে নিচে যারা আছে, তারা একে অন্যের সঙ্গে ঝগড়াঝাঁটিতে মেতে থাকে। তাদের নিপীড়কদের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়াতে যে শক্তি দরকার, একতাবদ্ধ হয়ে তা অর্জনের পথে এ বিভেদ বড় বাধা হয়ে কাজ করে। তাই ওয়ার্ডেসেস ঊর্ধ্বতনের একটু কৃপা পেতে কয়েদিদের রেশন থেকে একটা অংশ লোপাট করে দেয়, হাসপাতালের কর্মীরা ওষুধ এবং অসুস্থদের জন্য যে বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা থাকে, তা মেরে দেয়। জেল কর্মকর্তা (জেলার) ও হেড ওয়ার্ডার নিয়মিতভাবে তাদের অধস্তনদের কাছ থেকে নগদ চাঁদা পায়। আর বিনিময়ে এসব চুরিচামারি তারা দেখেও দেখে না। আর এসব লুটপাট থেকে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয় চিফ হেড ওয়ার্ডার। এরই মধ্যে সে বেশ কয়েকটি ট্যাক্সি কিনেছে। কিনেছে অন্তত ৩০ একর জমি। অথচ তার বেতন মাত্র ৩০০ রুপি। এ দিয়ে সংসারের খাদ্যের জোগানই কষ্টকর। কিন্তু নিচের পদে যারা সরাসরি এ চুরিচামারির সঙ্গে যুক্ত, তারা কোনোমতে খেয়ে বেঁচে থাকার সুযোগ পায় মাত্র।
জেলের সবচেয়ে বড় কর্মকর্তা জেল সুপারিনটেনডেন্ট। সে সমস্ত কয়েদিকে নিজে ব্যক্তিগত ঘরোয়া কাজের মানুষ হিসেবে খাটায়। নিজের জেলরাজত্বের ওপর শাসনত্রাসনের অতি লাভজনক ব্যবসা চালিয়ে ফুলেফেঁপে উঠেছে। যাই হোক, ম্যারি জানাচ্ছেন, ‘দুর্নীতি জেল সুপারিনটেনডেন্ট পর্যন্ত পৌঁছেই শেষ হয়ে যায় না। এক সুপারিনটেনডেন্ট আমাকে বলেছে, মন্ত্রী বা অন্য কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার নির্দিষ্ট সময় পরপর পরিদর্শনে আসার বিষয়টাকে সে ঘৃণা করে। আমি জানতে চাইলাম, কেন? সে বলল, তারা সবসময় টাকা টাকা করে। আর আমি যদি তাদের এ চাহিদা পূর্ণ করতে না পারি, আমাকে দূরবর্তী এলাকার কোনো জেলে স্থানান্তর করে দেবে। সেই জেলখানা মাইলের পর মাইল দূরে হওয়ায় আমি আমার পরিবারকে দেখতে পাব না কখনো। সেখানে সামাজিক জীবন বলেও কিছু থাকবে না। এখানে যদি থাকতে চাই, তাহলে আমাকে তাদের চাওয়া অনুযায়ী টাকা দিয়ে যেতে হবে। সুপারিনটেনডেন্টের কথায় জেল আর এর বাইরের সুবিস্তৃত নেটওয়ার্কের মধ্যে ব্যাপক ও ঘভীরভাবে শিকড় গাড়া এ দুর্নীতি স্পষ্টভাবেই ধরা পড়ে। মন্ত্রীর মতো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা যখন জেল পরিদর্শনে আসেন, জেলখানাকে বাহ্যিকভাবে কসমেটিক দেয়ার মতো রঙটঙ মেখে চোখের কাছে কিছুটা সহনীয় করে তোলা হয়, যাতে বন্দিদের তীব্র দুর্দশা আর বিনামূল্যে দেয়া বস্তুগুলোর জরাজীর্ণ অবস্থা পরিদর্শকের চোখে খুব একটা আঘাত না করে। বন্দিরা নিজের দুর্দশার কথা তুলে ধরতে খুবই ভয় পায়। যদি ভুলে কোনো তেজি নারী কথা বলে ওঠে, তাহলে জবাবে তাকে বলা হবে, খুবই ভালো বলেছেন, আমরা বিষয়টা দেখছি। সুপারিনটেনডেন্ট মজা করে বলে বসবেন, ‘এখান থেকে আমাদের শিগগিরই বেরিয়ে পড়া উচিত। আপনারা জানেন, এসব নারী খুবই বিপজ্জনক, খুনি, হত্যা করার অভ্যাস রয়েছে। আমাদেরও আক্রমণ করে বসতে পারে।’ এ কথা বলেই সেখান থেকে চলে যেতে পারে পরিদর্শক দলের সবাই। আর পেছনে ওইসব নারীর জন্য দুর্ভোগের পরিবেশ তৈরি করে রেখে যায়। পরিদর্শন শেষ না হওয়া পর্যন্ত নারীদের রান্না করার সুযোগ দেয়া হয় না। কঠোর পরিশ্রম করে যেসব ফুল জেলখানার বাগানে ফুটিয়েছিল, সেসব ছিঁড়েখুঁড়ে এসব পরিদর্শকদের জন্য গলার মালা বানানো হয়। ম্যারি ডায়েরিতে লিখেছেন, নারীদের দমিয়ে রাখতে, নিশ্চুপ রাখতে বিভেদ তৈরির বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করা হয়। কোনো নারীকে একটু তথাকথিত স্বজনপ্রীতি দেখালে সেই সুবিধাটুকু হারানোর ভয়ে কোনো ধরনের প্রতিবাদ থেকে বিরত থাকে সে। অন্যদিকে বিদ্রোহের সামান্যতম আভাস বা এমনকি ছোটখাটো কোনো অবিশ্বাস বা নির্দেশ অমান্যের ঘটনা ঘটলেই শুরু হয় বৈষম্যমূলকভাবে দমন-পীড়ন। অসহায় কয়েদিদের এ নিপীড়নের বিরুদ্ধে কোথাও কথা বলার সুযোগ নেই। ম্যারি এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনার কথা লিখেছেন: ‘১৯ জুন ১৯৭৩, জামশেদপুর জেলে পুরুষ রাজনৈতিক কয়েদিকে নিষেধ সত্ত্বেও চা বানানোর কারণে ব্যাপকভাবে মারধর করা হয়। শিকলে বাঁধা এসব কয়েদিকে নতুন করে হাতকড়াও পরানো হয় এবং টেনেহিঁচড়ে জেলখানার প্রাঙ্গণে নিয়ে আসা হয়। যেন জেলের সবখানে সবাই আর্তনাদের শব্দ শুনতে পায়। এটা করা হয় অন্য কয়েদিদের হুঁশিয়ার করতে। মারধরের ঘটনায় এক বালকের হাত মচকে গেছে। আরেকজন চোখে ব্যাপক আঘাত পেয়েছে।’ প্রায়ই কয়েদিদের ওপর সহিংসতার ঝড় ছাড়াও প্রতিদিনই কয়েদিদের লাথি খেতে হয়। লাঠিপেটা তো আছেই। গোলাবি এক বৃদ্ধ নারী। ম্যারি তার সম্পর্কে জানান, ওয়ার্ডার তাকে পিটিয়েছে। মারের চোটে পড়ে গিয়ে তার কাঁধের হাড় নড়ে গেছে। আরেক নারী মতি, তাকে এত বেশি পেটানো হয়েছে, তার সারা শরীরে দাগ আর ফোসকায় ভরে গেছে। দুদিন হাঁটতে পারেনি।
এবার ম্যারি জানাচ্ছেন, নারীদের জেলে বাইরের জগত্টা কেমন ছিল। জমি আছে এমন পরিবারের এক উচ্চবর্ণের নারী গ্রেফতার হয়ে জেলে এলেন। বিহারের গান্ধীবাদী সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতা জয়প্রকাশ চক্রবর্তীর নেতৃত্বে জেপি মুভমেন্টে যোগ দিয়েছিলেন— এই তার অপরাধ। এ নারী ম্যারিকে পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘তুমি কি এটাকে জেলখানা বলতে চাও? এটা জেলখানা নয়। কারণ আমি আমার বিয়ে হওয়ার পর প্রথম আট বছর বাড়ির পেছনে দুটি ঘর ও একটি উঠানের মধ্যে বন্দি ছিলাম।’
বাড়ি, পরিবার ও তার বর্ণগোত্রের মানুষের চাপ জেলেও অনুভব করতে হতো নারীদের। বাড়ি ও বাড়ির মানুষজন নিয়ে দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ আর দায়িত্ববোধ তাদের সবসময় পীড়া দিত। জেলের মধ্যে যাদের সঙ্গে শিশু ছিল, নিজের চোখের সামনে দেখতে হতো সন্তানদের ক্ষুধার্ত থাকা এবং দিন দিন অসুস্থ ও দুুর্বল হতে থাকা। আর যাদের শিশু বাড়িতে রেখে আসা হয়েছে, সেসব নারীকে তাড়া করত সারাক্ষণ দূরে থাকা শিশুকে নিয়ে দুশ্চিন্তা। ম্যারি বেশকিছু ঘটনার কথা বলেছেন। তিনি জানান, যখনই উত্সব বা বিশেষ দিবস উপলক্ষে বিশেষ খাবার দিত, এসব নারী বসে বসে কাঁদত। দূরের দুর্ভিক্ষপীড়িত গ্রামে তাদের শিশুরা ক্ষুধায় মরছে, কিংবা তাদের দাস বা পতিতা হিসেবে হয়তো এত দিন বিক্রি করে দেয়া হয়েছে— এসব ভেবে ওই খাবার তারা মুখে দিতে পারত না। সব নারীই ছিল ওজনের দিক থেকে কম ও স্বাস্থ্যহীন। তারা একেই স্বাভাবিকতা মনে করে। ম্যারি এ সম্পর্কে লেখেন, ‘জেলের বাইরে থাকার সময়েও তারা জীবনের শুরু থেকেই এ খারাপ স্বাস্থ্য নিয়ে বেড়ে উঠেছে, এতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। অপুষ্টির বড় কারণ পরিবারে প্রোটিনের চাহিদা মেটায় এমন সব ধরনের খাদ্য কেবল পুরুষদের জন্য সংরক্ষিত থাকে। তাই অবিচার ও নিপীড়ন কাপড়ে সুতার মতো নারীর জীবনে বোনা। দরিদ্রতর চাষী পরিবারগুলোর প্রায় সব নারীরই শিশুকালে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়। এর ব্যতিক্রম নেই। আর প্রথম দিনই তারা এক অচেনা পুরুষের মুখোমুখি হয়। আর যে নিজের পছন্দের কোনো পুরুষের সঙ্গে পালায়, তাদের শাস্তিস্বরূপ ভেড়ার রক্ত পান করতে হয়, সবার সামনে দিয়ে গাধার পিঠে চড়ে সারা গ্রাম ঘুরতে হয়, মাথা ন্যাড়া করে দেয়া হয়। ম্যারির সঙ্গে জেলে থাকা অনেক নারী জানায়, বাড়িতে থাকার সময় স্বামী তাদের নিয়মিত পেটাত। কারণগুলো খুবই তুচ্ছ। ভাত ঠাণ্ডা কেন, কিংবা খাদ্যে লবণ বেশি কেন— মার খাওয়ার ক্ষেত্রে এসব ছুতাই যথেষ্ট ছিল। যত ক্ষুধার্তই হোক না কেন, নারীরা ঘরে স্বামী না খাওয়া পর্যন্ত খেতে পারত না। যাদের অবস্থা একটু ভালো, সেসব পরিবারের নারীর বাড়িতেই বা বড়জোর তার আশপাশে বন্দি অবস্থায় জীবন পার করতে হতো। তবে যারা খুব দরিদ্র, তাদের ঠিকই বেঁচে থাকার বিকল্প না থাকায় কাজের সন্ধানে বাইরে যেতে হতো। কাজের কারণেই তারা হয়তো কোনো জমিতে বা কোনো ভবন নির্মাণের জায়গায় যাওয়ার সুযোগ পেত। তাই জেলখানায় এসে ‘উপরওলাদের’ অবিচার, বৈষম্য, লুণ্ঠন নারীদের কাছে নতুন কিছু বলেই মনে হয় না। তাদের সমস্ত আশা-আকাঙ্ক্ষা পরিবারের ছাঁচে গড়া। তাদের চাহিদাও একজন ভালো হিন্দু নারী তার ধর্মানুযায়ী যা চাইতে পারে, তার বেশি কিছু নয়। তারা জেলে উপবাস করে, কিছু একটা জমিয়ে রাখার চেষ্টা করে, যাতে ভিজিটিং ডেতে কোনো আত্মীয়স্বজন এলে তাদের কিছু রেঁধে খাওয়াতে পারে, বা ছোট কিছু উপহার দিতে পারে। তবু জেলখানায় কারো কারো মাঝে নতুন আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়। যেমন রোহিনী, একজন কিশোরী চাষী পরিবারের নারী। সে ম্যারিকে জানায়, তার গোপন ইচ্ছে হচ্ছে, পড়তে লিখতে শেখা। জেলের বাইরে সবকিছুর সঙ্গে যোগাযোগ বিছিন্ন হওয়ার পর তাকে মাসের পর মাস বাড়িতে চিঠি লেখার সুযোগ দেয়নি জেল কর্তৃপক্ষ। তাকে লেখার কাগজ দেয়া হয়নি। পত্রিকাও পড়তে দেয়া হতো না, যদিও সে পড়তে পারে না। জেলে এ নারীরা সবাই যেন এক মানসিক জগতে বন্দি। তাদের বেশির ভাগই জীবনে কখনো সংবাদপত্র দেখেনি। তারা সবসময় তার পাশে এসে ভিড় করত, জানতে চাইত, কী লেখা রয়েছে পত্রিকায়। কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা দেশে ঘটেছে কিনা। কেউ কেউ নিজের গ্রামের খবর নিতে চাইত। গ্রামের কথা পত্রিকায় লেখা হয়েছে কিনা। তবে তারা সবাই জানত, সরকার কীভাবে দেশ চালায়, তা কেউই তাদের বলবে না। তারা ম্যারির কাছে জানতে চাইত, কোত্থেকে কেরোসিন আসে, সংবাদপত্রই বা কীভাবে ছাপা হয়— এমন আরো অনেক বিষয়। যতই বইটির পৃষ্ঠা পার হতে থাকবে, একজন পাঠক বিস্মিত হয়ে লক্ষ করবে, এ বন্দি অবস্থায়, নিঃস্ব ও নিপীড়িত অবস্থায় নারীরা একে অন্যকে কিছু দিয়ে সহায়তা করতে কতটা ব্যাকুল হয়ে থাকত।
অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে লেখা এ বই সাহিত্যগত দিক থেকে অনন্য এক আবেদন ধরে রাখতে সক্ষম। আর এ আবেদন সর্বজনীন। যেকোনো দেশের পাঠককেই তা টানবে। আজকের প্রেক্ষিতেও এ ডায়েরি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। বইটি উত্সর্গ করা হয়েছে তাদের, ‘যারা ভারতে এবং অন্যা কোথাও নেহাতই কোনো কারণে জেলে রয়েছেন।’ পাঠক যখন ডায়েরির শেষ দিকে, তখন ১৯৭৭ সাল। তবে এপ্রিল ১৯৭৮ সাল উল্লেখ করে একেবারে শেষদিকে তিনি খুবই ভয়ঙ্কর একটি তথ্য যোগ করেছেন। তিনি আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, নিপীড়ন এখনো বন্ধ হয়নি। লিখেছেন, ‘অজানাসংখ্যক রাজনৈতিক কয়েদি এখনো জেলে আটক রয়েছেন।’ তবে এ তথ্যে যে প্রশ্নটির উদয় হয়, তা নিয়ে কথা বলেননি ম্যারি। বইটি পড়তে গিয়েও অনেক প্রশ্নের জন্ম নেবে পাঠকের মনে। একদিকে লেখিকা দেশের ভেতরে চলমান ভয়ঙ্কর অসন্তোষ ও বিশৃঙ্খলার মধ্যে আশার আলো দেখতে পেয়েছেন। টাইলার লিখেছেন, ‘ভারতীয় মানুষজন নীরবে দুর্ভোগ সহ্য করে না। দেশটি এখন বিশাল ফুটন্ত এক কড়াই। সরকার চেষ্টা করছে জাদুকরী কবিরাজ দিয়ে মন্ত্র পড়িয়ে কড়াইয়ের বলক ওঠা নিয়ন্ত্রণ করতে। কিন্তু কড়াইয়ের নিচে যে আগুন, তা কমাতে পারছে না ওই কবিরাজ। চলছে খাদ্য সংকট, জ্বালানি সংকটও। খাদ্যের অভাবে দাঙ্গা বাধিয়ে দিচ্ছে জনগণ। চলছে ধর্মঘট আর পাল্টা অন্তর্ঘাত। জমির মালিকদের শস্যগুদামে হামলা হচ্ছে। আর তা রক্ষা করতে পুলিশ ছুটে আসছে। বাজার বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে বাড়ছে সংকট। দেশের সবখানে খাদ্য, কয়লার অভাবে দাঙ্গা বেধে যাচ্ছে। হরতাল ও প্রতিবাদ, ছাত্রদের বিক্ষোভ, পুলিশ ও পাবলিকের সংঘর্ষ, শিল্প-কারখানা বন্ধ। আর সরকারেও বিভক্তি। সরকারের বিভিন্ন পদ থেকে পদত্যাগের ঘটনাও চলছে সমানতালে।’
ম্যারি অবশ্য তার ডায়েরিতে নকশাল বিপ্লবীদেরও দেখেছেন, দেখিয়েছেন আশার প্রতীক হিসেবে। কারণ তারা এ পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তিত ও সতর্ক। এ সুযোগে তারা দেশের পালাবদল ঘটাতে চাইছে। তিনি লিখেছেন, ‘অমলেন্দুর অপরাধ, কল্পনার অপরাধ আসলে ভিক্ষার পাত্র নিয়ে শিশু ধুলায় গড়াগড়ি খায় এমন এক ভারত থেকে যারা চোখ ফেরাতে পারেননি এবং নিষ্ক্রিয় থাকতে পারেননি, তাদেরই অপরাধ।’ যাই হোক, বইটি পাঠে পাঠকের মনে আরেক ধরনের আশা দানা বাঁধবে। তবে এ আশা আসলে তাদের ঘিরে নয়, যারা নিজেরা চূড়ান্ত দুর্ভোগের শিকার না হলেও দুদর্শার কথা ভেবে উদ্বিগ্ন আছেন। এ আশা বরং যারা একসঙ্গে নিপীড়ন ভোগ করছেন, তাদের সংহতি ঘিরে। ম্যারি আশা করেন, তারা একদিন দুর্ভোগ পোহাতে আর রাজি হবে না। নারী ঐক্য টাইলার যাকে বর্ণনা করেছেন এক ধরনের পারিবারিক আবেগপ্রবণতার মতো, তার মতে, কারগারের ভেতরেও এ নারীরা তা গড়ে নিতে পারে। নিরাপত্তা আর দুশ্চিন্তার একটি সুপ্ত অনুভূতিও গড়ে দিতে পারে একটা কমিউনিটির আবহ। নারীদের যে অসহায়ত্বের বোধ আচ্ছন্ন করে ফেলে, এটা সেই শক্তি নয়। বিভিন্ন জেলে যারা অবিরাম লড়াই করে যাচ্ছে, জেলে প্রবেশমাত্রই একেকজন নারী ভারতের সেই নারীদের শক্তির মুখোমুখি হচ্ছে। ম্যারি মনে করেন, তারাই সেই নারী ঐক্য গড়ার ক্ষমতা রাখে। তবে কারো মনে প্রশ্ন আসতেই পারে, দুর্ভোগের এই যে মিল, তাকে ঘিরে যে সংহতি, তাকে কীভাবে সাধারণ লড়াইয়ের সংহতিতে বা সশস্ত্র প্রতিরোধে পরিণত করা যায়? শুধু পরস্পরের জন্য সহযোগিতা নয়, কীভাবে তা নিপীড়কদের বিরুদ্ধেও সংহত হয়ে একটি অভেদ্য দেয়ালে পরিণত হতে পারে?
বইটি বিশ্বস্তভাবে ভারতীয় নারী হিসেবে তাদের ভুলগুলোর ছবিও তুলে ধরে; যারা একটি শোষণমূলক কাঠামোয় বন্দি, এর শিকার হয়ে দুর্ভোগের মধ্যে দিন পার করছে। কিন্তু এ সমাজ কাঠামোর নিয়ন্ত্রণ তাদের নাগাল থেকে যোজন যোজন দূরে। এমনকি নারীর প্রতি আরেক নারীর স্বভাবগত টান থাকলেও তারা আজো ঐক্যবদ্ধ হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। এখনো তারা পুরুষ নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর প্রতিই সবচেয়ে বেশি ও সর্বাগ্রে নতজানু। অথচ পরিবার হিসেবে হোক, গোষ্ঠী হিসেবেই হোক কিংবা বর্ণ হিসেবে, এ কাঠামোতেই নারীরা সবসময় নিপীড়িত।






