ঔপনিবেশিক আমলে প্রতিষ্ঠা হয়ে যে অভিজাত ক্লাবগুলো এখনো দেশে টিকে আছে, ঢাকা ক্লাব তার মধ্যে অন্যতম। ঢাকার প্রাণকেন্দ্র শাহবাগে এর অবস্থান। ১৯১১ সালে ক্লাবটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর আজ অবধি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। সে আমলে ভারতবর্ষের অন্যান্য ক্লাবের মতোই শ্বেতাঙ্গদের সামাজিক মেলামেশা ও অবসর বিনোদনের জন্য ঢাকা ক্লাবের সূচনা। ইংরেজদের অন্যতম বিলাস ঘোড়দৌড়ের জন্য রমনার রেসকোর্সের উন্নতির পাশাপাশি এখানেই ক্লাব স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ১৯ আগস্ট ১৯১১ সালে স্যার ল্যান্সলট হেয়ার এ ক্লাবের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন ঢাকার সিভিল সার্জন ও মিটফোর্ড হাসপাতালের সুপারিনটেনডেন্ট লে. কর্নেল ডব্লিউ হল, নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ী সিআর ডব্লিউ ব্রায়ান, মিলিটারি ব্যাটালিয়নের কমান্ড্যান্ট এইচজি ব্যালি, পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্টের এক্সিকিউটিভ জে ও রেনি, ভারতীয় পুলিশের দুই সদস্য জেএস উইলসন ও এটি হ্যালিডে।

ঢাকায় ক্লাব সংস্কৃতি শুরুর ইতিহাসে একটু পেছনের দিকে গেলে বর্তমান বাহাদুর শাহ পার্কের আর্মেনিয়ান ক্লাবের কথা পাওয়া যায়। আর্মেনিয়ানদের বিলিয়ার্ড ক্লাব থেকে বর্তমান বাহাদুর শাহ পার্কের নাম হয়েছিল আন্টাঘর ময়দান। উনিশ শতকের শেষ দিকে ক্লাবঘরটি ইংরেজরা কিনে নেয়। ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন সূত্রাপুর মৌজার খতিয়ান দেখে জানিয়েছেন, আন্টাঘর ময়দানের কাছে বর্তমান ক্লাবের এক একর জমি ছিল। কিন্তু সে সময় ঢাকা ক্লাব নামটি পাওয়া যায় না। ঢাকা ক্লাবের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ১৮৫১ সালে। ঢাকা ক্লাব একটি বিতর্ক আয়োজন করেছিল বলে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু উল্লিখিত এ ঢাকা ক্লাবের সঙ্গে আলোচ্য ঢাকা ক্লাবের কোনো সংযোগ নেই।

১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ হলে ঢাকা নতুন প্রদেশের রাজধানীর মর্যাদা পায়। স্বাভাবিকভাবে ঢাকার অবকাঠামোগত উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে এখানে নানা শ্রেণী-পেশার মানুষের আগমন ঘটে। দেশীয় ব্যবসাদার থেকে শুরু করে সিভিল সার্ভিসের ব্রিটিশ কর্তারা ঢাকায় কাজ করতে শুরু করেন। ব্রিটিশরা সে সময় ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের মতো ঢাকায়ও একটি ক্লাব স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। ইংরেজদের অন্যতম বিলাস ঘোড়দৌড়, গল্ফ, ক্রিকেট খেলার মতো প্রশস্ত জায়গার পাশাপাশি শহরের কেন্দ্রস্থল রমনাই ক্লাবের জন্য উপযুক্ত বলে বিবেচিত হয়। আজকের রমনার সঙ্গে সেকালের রমনাকে মেলালে চলবে না। রমনা ছিল নতুন ঢাকার কেন্দ্র।

বিশ শতকের গোড়ার দিকে ঢাকা পুরোপুরি নগর হয়ে ওঠেনি। বঙ্গভঙ্গের পরপর ঢাকা দ্রুত বিকশিত হতে শুরু করে, কিন্তু ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হয়ে সে প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। কলকাতা বা মাদ্রাজের তুলনায় (এ তুলনার কারণ শহর দুটির ক্লাব বিখ্যাত) ঢাকা তখন একটি কম জমজমাট শহর ছিল এবং ঢাকা ক্লাবকে মফস্বল ক্লাব বলা হতো। কিন্তু মফস্বল ক্লাব হলেও ঢাকা ক্লাব ছিল উপমহাদেশের অন্যতম সেরা ক্লাব। ঔপনিবেশিক ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় ঢাকার রমনার পরিবেশ ছিল সুন্দর। বিশ শতকের শুরুর দিকে রমনা মূলত ঢাকার নবাবদের বিনোদন ও প্রমোদের স্থানে পরিণত হয়। ব্রিটিশরা পুরনো ঢাকার নবাবদের এলাকা থেকে সরে এসে ঢাকার এ অংশ নতুন করে নিজেদের মতো সাজানোর চেষ্টা করেন। সে উদ্দেশ্যে রমনাকে নতুন করে গড়ে তোলা হয়।

রমনার সৌন্দর্যের মধ্যে গড়ে ওঠা ঢাকা ক্লাবের কোষাগারও ছিল পরিপূর্ণ। ব্রিটিশ কর্মকর্তা স্যার আর্থার ড্যাশের (১৮৮৭-১৯৭৪) মতে, জলপাইগুড়ি ও চিটাগং ক্লাবের চেয়েও ঢাকা ক্লাবের সম্পদ বেশি ছিল। ক্লাবের সম্পদের উৎস ছিল মূলত ঘোড়দৌড়। সাধারণত অন্যান্য ক্লাবে রেসের কারণে সম্পদ নষ্ট হয়, কিন্তু ঢাকা ক্লাবই একমাত্র ক্লাব যারা রেসের মধ্য দিয়ে সম্পদ বাড়িয়েছে। ৯৯ বছরের জন্য ঢাকা ক্লাব রেসকোর্স লিজ নেয়। এর মধ্যে ক্রিকেট ও গলফ গ্রাউন্ডও যুক্ত ছিল। মজার ব্যাপার হলো ঘোড়দৌড় থেকে অর্জিত অর্থ দিয়ে এসব অবকাঠামোর উন্নয়ন করা হয়। আর্থার ড্যাশের স্মৃতিকথা অনুসরণ করে মুনতাসীর মামুন লিখেছেন, ‘সবুজ ঘাসে ঢাকা মাঠ, গ্র্যান্ড স্ট্যান্ডের চারদিকে ফুলের বাগান, সাজানো ঝোপঝাড়। রেসের দিন সেখানে ব্যান্ড বাজে আর স্ট্যান্ডে সদস্যদের বিনা পয়সায় চা সরবরাহ করা হয়। ঘোড়দৌড় থেকে যে আয় তা শুধু ক্লাবের উন্নয়নেই নয়, শহরের বিভিন্ন হাসপাতাল ও দাতব্যলয়েও দান করা হতো। ক্লাবের ভেতরে ছিল সুইমিং পুল ও পানি বিশুদ্ধকরণের ব্যবস্থা। এতসব খরচ সত্ত্বেও লাভের অংশ শুধু বাড়তেই লাগল এবং একপর্যায়ে সদস্যরা চাঁদা হার হ্রাস ও অন্যান্য ভর্তুকি প্রদানের দাবি জানাল।’

প্রতিষ্ঠার পর থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত ক্লাবের বৈশিষ্ট্য এক রকম ছিল। এখানে টেনিস খেলার প্রচলন ছিল। পোলো ততদিনে উঠে গেছে। নিয়মিত ক্রিকেটও খেলা হতো। এছাড়া ব্রিজ, নানা রকম তাস, সুইমিং ঠিক অন্যান্য ক্লাবের মতোই প্রচলিত ছিল। প্রাথমিক পর্যায়ে ক্লাবটি ব্রিটিশদেরই সদস্য হিসেবে গ্রহণ করত। নিজেদের দেশ ও পরিবার থেকে দূরে থাকা কর্মকর্তারা এখানে এসে নিজের পরিমণ্ডলের মানুষের সঙ্গে মিশতে পারতেন। তারা তাদের জীবনাচরণের সঙ্গে ক্লাবকে মিলিয়ে নিয়েছিলেন। মূলত এটি তাদের অবসর যাপন ও সাধারণ বিনোদন কেন্দ্র হয়ে ওঠে। আর্থার ড্যাশ লিখেছেন, ‘এটি অবশ্যই সংস্কৃতি বা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার জগৎ ছিল না। সাধারণ প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া ছিল মূলত মফস্বলী, খুব গভীর নয় আবার একদম হালকাও নয়। প্রচলিত ব্রিটিশ ক্লাবের চরিত্র অনুসারেই ক্লাবটি চলত।’

ক্লাবের সান্ধ্যকালীন আড্ডা, তাসের সঙ্গে মদ্যপান ছিল একটি সাধারণ বিষয়। এমনো হতো যে কিছু সদস্য সবান্ধব কিংবা একাকী কেবল মদ্যপানের উদ্দেশ্যে ক্লাবে আসতেন। এ সময়ের রমনা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলকে বুদ্ধদেব বসু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। ত্রিশের দশকে এ অঞ্চলের অবস্থা সম্পর্কে তিনি লিখেছেন—

‘উত্তর অংশটি সরকারি কেষ্টবিষ্টুদের বাসভূমি, মধ্যিখানে আছে বিলেতী ব্যসন ঘোড়দৌড়ের মাঠ, আছে ঢাকার নাগরিকদের পক্ষে অপ্রবেশ্য ঢাকা ক্লাব, যেখানে মদ্য বিলাসী বল নৃত্যপ্রিয় শ্বেতাঙ্গ রাজপুরুষ ও নারায়ণগঞ্জের পাটকল চালক ফিরিঙ্গিরা নৈশ আসরে মিলিত হন।’

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রভাবে শহরের অবস্থার সঙ্গে সঙ্গে ক্লাবের কার্যক্রমে কিছু বাধা আসে। ঢাকায় বড় বড় বেস স্টেশন এবং টারমাক তৈরি হয়। ফাঁকা জায়গা হওয়ায় রমনায় সৈন্যদের তাঁবু পড়েছিল। ফলে গিজগিজ করা সৈন্যের মধ্যে ক্লাবের সাধারণ সভ্যদের স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ হলো। গলফ ও ক্রিকেটও উঠে গেল। টিকে থাকল ঘোড়দৌড়। ড্যাশ লিখেছেন, এ অবস্থায় ক্লাবের দশা রেলওয়ের রিফ্রেশমেন্ট রুমের মতো হলেও ক্লাবের আয় বেড়েছিল। কেননা ঘোড়দৌড়ে কোনো পরিবর্তন আসেনি। এমনকি রেসকে কেন্দ্র করে জকি, খেলুড়ে ও অন্যান্য ফড়েদের মধ্যে নানা ব্যবসা শুরু হয়। ফলে ক্লাবের পুরনো সেই স্ট্যান্ডার্ড আর ছিল না। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ক্লাবের অবস্থা পরিবর্তন করার মতো সময় পাওয়ার আগেই দেশভাগ হলে ক্লাবে মনোযোগ দেয়ার মতো সময় কারো হয়নি।

দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানের অংশে থাকা ঢাকা ক্লাবে প্রথম পর্যায়ে সাবেক ব্রিটিশ অফিসারদেরই বেশি দেখা যেত। কিন্তু তাদের চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর এখানে আস্তে আস্তে পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা, সিভিল অফিসার ও অভিজাত পরিবারের লোকদের দেখা যায়। প্রাথমিকভাবে ক্লাব প্রতিষ্ঠার পর নবাব পরিবারের মুষ্টিমেয় সদস্যদের নেয়া হয়। কিন্তু দেশভাগের পর পাকিস্তানের অভিজাতরা ক্লাবে আসা শুরু করেন। প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন তার স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে মাঝে মাঝে আসতেন। তিনি মূলত ছিলেন মাদ্রাজি। এ সময় ক্লাবের প্রেসিডেন্ট ছিলেন মাইক স্টুয়ার্ট। ইংরেজ ও পাকিস্তানি উভয় সদস্যদের সঙ্গে তিনি সদ্ভাব বজায় রাখতেন।

পরবর্তী সময়ে ক্লাবের সদস্য পরিচয় ধীরে ধীরে পরিবর্তন হয়। নতুন সদস্যরা মূলত ব্যবসায়ী এবং তারা নানাভাবে ক্লাবের সুযোগ-সুবিধার অন্যায় ব্যবহার করারও চেষ্টা করেন। ক্লাবের সদস্যদের মধ্যে নানা ‘বড়লোকি কেচ্ছা কাহিনী’ও তৈরি হয়। যেমন তত্কালীন নবাবের বেগমের উচ্ছৃঙ্খল জীবন, পরকীয়া সম্পর্কে লিখেছেন আর্থার ড্যাশ। বেগমের কর্মকাণ্ডের অনেক কিছুই ঢাকা ক্লাবকে কেন্দ্র করে ঘটত। আরো অনেক ধনী ও অভিজাত ব্যক্তির ক্ষেত্রেও এমনটা শোনা যেত।

শতবর্ষ পার করে এখনো টিকে আছে ঢাকা ক্লাব, বরাবরের মতো সমাজের প্রভাবশালীদের জমায়েতের কেন্দ্র হয়ে। ঢাকা ক্লাবকে নিয়ে প্রচলিত একটি প্রবাদ হলো, ‘অস্থিরতার সময়ে ঢাকা শাসন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং শান্তির সময়ে এ শহর নিয়ন্ত্রণ করে ঢাকা ক্লাব।’

 

আসরার আবেদিন: প্রাবন্ধিক