মে মাসের শুরুতে এনসাইন রিচার্ডসকে কুরেসা নদী এবং রাঙ্গামাটি অঞ্চলের সমীক্ষা শেষ করার জন্য পাঠানো হয়। ১ জুন আমি ঢাকা থেকে লক্ষ্মীপুর রওনা হলাম এবং ৩ জুন রাতে সেখানে পৌঁছলাম। ৪ জুন আমরা মালপত্র বহনের জন্য কুলি সংগ্রহে ব্যস্ত থাকলাম এবং ৫ জুন লক্ষ্মীপুর থেকে ফেনী নদীর দিকে রাস্তা পরিমাপ শুরু করলাম।

লক্ষ্মীপুর থেকে ফেনী পর্যন্ত রাস্তা প্রায় সমতল। লক্ষ্মীপুর থেকে প্রায় ৪ দশমিক ৭ মাইল দূরে আমরা একটি নুল্লা (ছোট খাল) পার হলাম, যা পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়ে মেঘনা নদীতে মিলিত হয়েছে। এটি কোম্পানির পূর্বাঞ্চলের জমির সীমানা নির্দেশ করে। এলাকাটি উন্মুক্ত এবং ‍কৃষি চাষাবাদে পরিপূর্ণ। তবে সেখানে গাছের দারুণ অভাব রয়েছে। কোম্পানির জমির আয় এখানে বছরে প্রায় ৮ হাজার রুপি। রুম্মুতকল্লি নুল্লার প্রস্থ ৫০ গজ এবং এটি এত গভীর যে পার হওয়া সম্ভব নয়।

নালার পর এলাকা কিছুটা ঘন এবং রাস্তা ভাঙাচোরা। অঞ্চলটি অত্যন্ত নিম্নভূমিতে, বর্ষার সময় প্রায় পুরো অংশ পানিতে ভেসে থাকে। লক্ষ্মীপুর থেকে প্রথম উল্লেখযোগ্য গ্রাম চান্দেরগঞ্জ, যা আমিদাবাদ পরগনার অংশ (সমকালে বর্তমান লক্ষ্মীপুর-নোয়াখালী অঞ্চলের প্রশাসনিক এলাকা)। এটি একটি বড় ও উর্বর অঞ্চল। এলাকাটি পানের বাগানে পূর্ণ এবং রাস্তা সাধারণত ভাঙাচোরা।

পরবর্তী উল্লেখযোগ্য গ্রাম কলিন্ডা বা কয়লিন্ডি, চান্দেরগঞ্জ থেকে ১৪ দশমিক ৫ মাইল দূরে। এই দুই গ্রামের রাস্তা সাধারণত খুব খারাপ। এ এলাকাও নিম্নভূমি এবং বর্ষাকালে প্রায় এক ফুট পানি থাকে। তবু এটি অত্যন্ত উর্বর। এখানে ধান এবং কিছু পান উৎপাদন হয়। তুলোর চাষ খুব কম, ফলে স্থানীয় কাপড় তৈরির জন্য প্রচুর তুলো দূর থেকে আনা হয়। কলিন্ডায় একটি ছোট কারখানা রয়েছে, যেখানে মোটা কাপড় সংগ্রহ করা হয় এবং এ অঞ্চলে প্রচুর কাপড় উৎপাদন হয়।

e3

বাংলা ও বিহারের মানচিত্র (১৭৭৬ খ্রি.) ছবি: রেনেলের বেঙ্গল অ্যাটলাস

কলিন্ডা থেকে ফেনীর রাস্তা ক্রমশ আরো খারাপ। প্রায় ছয় মাইল দূরে আমরা ডাডদানাচেররা (স্থানীয় খাল) খাল পার হলাম, যা শুধু অর্ধজোয়ার সময়ে পার হওয়া যায়। এরপর ছোট ফেনী নদী পার হলাম, যা সারা বছর জোয়ার-ভাটার সঙ্গে প্রবাহিত হয়। এই নদীর উৎস ত্রিপুরা প্রদেশে। নদীর পরের এলাকা ঘন এবং এখানে কম চাষাবাদ হয়। এ অঞ্চলে বাঁশের খুবই অভাব আছে বলে মনে হয়।

কাসিদ্যা বাজার গ্রাম ছোট ফেনী নদীর পাশে অবস্থিত। এর চারপাশে পানের বাগান ও গাছের ঝোপ রয়েছে। এরপর পাঁচ মাইল দূরে মিরাজাপুর। এলাকা নিম্নভূমি, বর্ষার সময় পানি জমে। ফেনী নদী পারাপারের স্থান বর্তমানে ১ দশমিক ২৫ মাইল প্রশস্ত এবং ক্রমশ আরো প্রশস্ত হচ্ছে। কিছু মাইল উপরের দিকে নদী সংকীর্ণ। নদী প্রায় পাঁচ মাইল দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরে মিলিত হয়।

নদীর দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্ত থেকে একটি দ্বীপের একটি অংশ দেখা যায়। যদি আমি ভুল না করি, সন্দ্বীপের অংশও দৃশ্যমান, যা সাগরের প্রবাহের শুরুতে অবস্থিত।

ফেনী নদী থেকে ইসলামাবাদ (চট্টগাম শহর) পর্যন্ত সমুদ্রতীর সাধারণত দক্ষিণ-পূর্ব দিকে বিস্তৃত, কোনো বড় খাড়া বা উপসাগর নেই। মি. প্লেইস্টেড বলেছিলেন, তিনি লক্ষ্মীপুর ও ইসলামাবাদের মধ্যবর্তী সব তীর ও দ্বীপ সমীক্ষা করেছেন। আমি নিজে সেখানে সমীক্ষা শুরু করিনি, যাতে সময় এবং শ্রমের অপ্রয়োজনীয় ব্যয় এড়ানো যায়, কারণ এটি সে মৌসুমের জন্য অনুপযুক্ত ছিল।

তবে ইসলামাবাদের কাছে পৌঁছে আমি মানচিত্র সংগ্রহ এবং প্রদেশের অবশিষ্ট সমীক্ষা সম্পর্কে তথ্য জানার সিদ্ধান্ত নিলাম। ফেনী ও ইসলামাবাদের মধ্যবর্তী রাস্তা বহু নুল্লা দ্বারা বিভক্ত, যাদের অধিকাংশে সেতু নেই। পুরো রাস্তা পূর্ব দিকে ছোট পাহাড় দ্বারা সীমাবদ্ধ, যা কখনো কখনো রাস্তার এক-অর্ধমাইলের মধ্যে চলে আসে। সমুদ্র চার-ছয় মাইল দূরে এবং প্রায়ই দৃশ্যমান; পাহাড় ও সমুদ্রের মধ্যবর্তী নিম্নভূমি খুব উর্বর এবং প্রদেশের সবচেয়ে উর্বর অংশ।

এ পাহাড়গুলোর উচ্চতা ২৪০ গজের বেশি নয়। এর মধ্যে সিট্টাকুন (সীতাকুণ্ড পাহাড়) সবচেয়ে উঁচু, যা ফেনী ও চট্টগ্রামের মধ্যবর্তী প্রায় অর্ধপথে অবস্থিত। এই পাহাড়ের শীর্ষে একটি ছোট প্যাগোডা (চন্দ্রনাথ মন্দির) আছে। এটি হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে খুবই জনপ্রিয়। তারা অত্যন্ত উৎসাহীভাবে এ মন্দিরের ওপরে ওঠে পূজা অর্চনা করার জন্য।

বারাকুন নামক একটি গ্রাম, যা সীতাকুণ্ড থেকে দক্ষিণে প্রায় তিন মাইল দূরে, সেখানে প্রসিদ্ধ প্রাকৃতিক গ্যাস উদ্গিরণস্থল অবস্থিত। এটি প্রথম পাহাড়ের শৃঙ্গের মধ্যে, সেখানে একটি সংকীর্ণ ও খারাপ রাস্তা দিয়ে পৌঁছা যায়।

পাহাড়ের নিচে একটি ঝরনা রয়েছে। ঝরনার ওপর একটি ছোট ঘর বা প্যাগোডা বানানো আছে। সেখানে ছয়-সাতটি পাথরের সিঁড়ি দিয়ে নিচে যেতে হয়। ঝরনার পানি একটি ছোট চৌকোনা ট্যাঙ্কে জমা হয়, যার আকার প্রায় ছয় ফুট চওড়া এবং পাঁচ ফুট গভীর। সেখান থেকে পানি একটি পথ দিয়ে নিচের উপত্যকার দিকে চলে যায়।

যে জায়গা দিয়ে পানি বের হয়, তার পাশে প্রায় চার ফুট উঁচু একটি ইটের দেয়াল করা আছে। দেয়ালটি খুব শক্ত করে গাঁথা নয়, তাই নিচের দিক দিয়ে পানি সহজে ট্যাঙ্কে ঢুকে পড়ে।

অদ্ভুত বিষয় হলো—পানির সঙ্গে সঙ্গে সেখান থেকে আগুনও বের হয়। প্রায় চার ফুট জায়গাজুড়ে আগুন জ্বলতে দেখা যায় এবং শিখা প্রায় তিন ফুট পর্যন্ত উঁচু হয়। দেখতে অনেকটা বড় চিমনির ভেতরে আগুন জ্বলার মতো লাগে।

যখন পানি বুদ্বুদ করে ওঠে, তখন আগুন ট্যাঙ্কের পানির ওপর প্রায় এক ফুট পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু পানি একেবারে স্থির থাকলে বা না নড়লে আগুন দেখা যায় না।

আমি লক্ষ করেছিলাম, যখন ট্যাঙ্কের পানি বেড়ে উঠত বা যারা সেখানে লোকজন গোসল করতে নামত তাদের কারণে পানি বেশি নড়াচড়া করত, তখন আগুনের শিখা কয়েক সেকেন্ডের জন্য নিভে যেত। কিন্তু অল্পক্ষণ পর তা আগের চেয়ে আরো বেশি জোরে জ্বলে উঠত। দিনের বেলাতেও শিখাগুলো খুব স্পষ্টভাবে দেখা যেত। আমি আগুনের খুব কাছে দাঁড়িয়েও কোনো রকম গন্ধকজাতীয় পদার্থের (সালফারের) গন্ধ টের পাইনি।

১৭৬৬ সালের ১১ জুন। ঘরের ভেতরটি খুব গরম ও অস্বস্তিকর ছিল, কারণ সেখানে বাতাস চলাচলের সঠিক ব্যবস্থা ছিল না। তার ওপর ব্রাহ্মণরা জায়গাটিকে রান্নাঘর হিসেবেও ব্যবহার করত; দেয়ালের ওপরে ছোট একটি ছিদ্র রাখা ছিল হাঁড়ি-পাতিল বসানোর জন্য।

কূপের পানি ছিল খুব ঠাণ্ডা এবং মোটামুটি স্বচ্ছ। পানির ওপর যে তেলতেলে আস্তরণ দেখা যাচ্ছিল, তা পানির সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে উঠছে নাকি এত লোকের গোসলের ফল—তা বোঝা আমার পক্ষে কঠিন ছিল।

e4

গঙ্গাকে কেন্দ্র করে রেনেলের আঁকা মানচিত্র, ১৭৮৬ খ্রি. ছবি: ডেভিড র‍্যামসে ম্যাপ কালেকশনস

ইসলামাবাদ নগরী ফেনী নদী থেকে প্রায় ৪৯ মাইল দূরে অবস্থিত এবং এর অক্ষাংশ প্রায় ২২° ২০’ উত্তর। এটি বাংলার অন্যান্য শহরের মতোই একটি বিস্তৃত ও ছড়ানো শহর। ঘরবাড়িগুলো সাধারণ মানের এবং রাস্তাগুলো কোনো সুপরিকল্পনা ছাড়াই তৈরি। শহরটির পশ্চিম ও উত্তর দিকে ছোট ছোট পাহাড় এবং পূর্ব দিকে একটি নদী রয়েছে।

সেখান থেকে আমি দূরে অত্যন্ত উঁচু এক পর্বতমালার দৃশ্য দেখতে পাই, যা মগ পর্বত নামে পরিচিত। বলা হয়, এগুলো প্রদেশের পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব সীমানা নির্ধারণ করে, আর ত্রিপুরার দিকে উত্তরের সীমানা হলো ফেনী নদী। মগ পর্বতমালা প্রায় ৫০ থেকে ৭০ মাইল দূরে অবস্থিত এবং উত্তর-উত্তর-পূর্ব থেকে দক্ষিণ-দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে কয়েকটি সারিতে বিস্তৃত। ইসলামাবাদ ও মগ পর্বতের মাঝখানে আরো কয়েকটি ছোট পাহাড়ের সারি রয়েছে, যার নিকটতমটি সম্ভবত ২০ মাইলের মধ্যে।

আমাকে জানানো হয় যে এখানে একটি নদীপথ প্রায় ৫০ মাইল পর্যন্ত নৌ-চলাচলের উপযোগী, তবে ফেনী নদীর সঙ্গে তার কোনো সংযোগ নেই। চট্টগ্রাম প্রদেশ দক্ষিণ দিকে প্রায় ২১° ২৮’ অক্ষাংশ পর্যন্ত বিস্তৃত, যেখানে ক্রুজকলি (সম্ভবত বর্তমান কক্সবাজার-টেকনাফ উপকূলবর্তী কোনো স্থান) অঞ্চলটি চট্টগ্রাম ও আরাকান রাজ্যের সীমানা নির্ধারণ করে।

ইসলামাবাদ থেকে ঢাকার পথে ফেরার সময় ২৭ তারিখে আমি জ্বর ও কাঁপুনিতে আক্রান্ত হই এবং জুলাইয়ের মাঝামাঝি পর্যন্ত অসুস্থ থাকি। ১ জুলাই আমি পুনরায় ফেনী নদী পার হই এবং ৫ জুলাই লক্ষ্মীপুরে পৌঁছি। সেখানে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের জন্য অবস্থান করি।

সন্দ্বীপ, হাতিয়া, বাবনী প্রভৃতি দ্বীপের অবস্থান দেখে মনে হয়, উভয় মৌসুমি বায়ুতেই—বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমে—এগুলো জাহাজের জন্য আশ্রয়স্থল হিসেবে উপযোগী হতে পারে। কারণ জোয়ারের কারণে সে সময় যাতায়াতের পথ সহজলভ্য থাকে।

এ উপকূলে পৌঁছার আরেকটি সুবিধা আছে, যা বালাসোর রোড থেকে মেঘনা পর্যন্ত উপকূলে নেই। তা হলো স্থলচিহ্নের উপস্থিতি। সীতাকুণ্ড পাহাড় চট্টগ্রামের জন্য একটি উৎকৃষ্ট চিহ্ন হিসেবে পরিচিত। এছাড়া চট্টগ্রামের পতাকাদণ্ড (উঁচু খুঁটি, যার মাথায় পতাকা ওড়ানো হতো), পাহাড় ও ঘরবাড়িও উপকূল চিহ্নিত করার জন্য নির্ভরযোগ্য দিকনির্দেশনা প্রদান করতে পারে।

[টি এইচ ডি লা টাচ সম্পাদিত, এশিয়াটিক সোসাইটি কলকাতা থেকে ১৯১০ সালে প্রকাশিত ‘দ্য জার্নাল অব মেজর জেমস রেনেল, ফার্স্ট সার্ভেয়র জেনারেল অব ইন্ডিয়া (১৭৬৪-১৭৬৭)’ শীর্ষক গ্রন্থের অংশবিশেষ।]

ভাষান্তর: নীরব হাসান