নাম তার দিলরাস বানু বেগম—পারস্যের রাজবংশের সন্তান শাহ নাওয়াজ খানের কন্যা। দিলরাসের পিতার পিতামহ ছিলেন পারস্যের রাজা প্রথম শাহ ইসমাইল সাফাভির কনিষ্ঠ পুত্র।

দিলরাসের পিতা শাহ নাওয়াজ খান ছিলেন গুজরাতের ভাইসরয়। মোগল দরবারে তিনি বেশ প্রভাবশালী ছিলেন। শাহ নাওয়াজ জাঁকজমকপূর্ণ জীবন যাপন করতেন। মেয়ের বিয়েতে তিনি তার এ ঐতিহ্য বজায় রেখেছিলেন। অন্যদিকে দিলরাসের মা নওরাস বানু বেগম ছিলেন মির্জা মুহাম্মদ শরীফের কন্যা। দিলরাসের নানা মির্জা রুস্তম সাফাভি সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে ক্ষমতাকেন্দ্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছিলেন।

১৬৩৭ সালের এক শুভদিনে, ৮ মে আগ্রায় মোগল শাহজাদা আওরঙ্গজেবের সঙ্গে বিয়ে হলো দিলরাস বানুর (পরের বছর, ১৬৩৮ সালে দিলরাসের ছোট বোন সখিনা বানু বেগমের সঙ্গে বিয়ে হয় আওরঙ্গজেবের ছোট ভাই মুরাদ বকশের সঙ্গে। দিলরাসের এক ভাতিজির সঙ্গে বিয়ে হয় আওরঙ্গজেবের বড় ভাই শাহ সুজার। এক কথায় দিলরাসের পুরো পরিবার ছিল মোগল রাজপরিবারের সঙ্গে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ)। পাত্রের বয়স তখন ১৯। বিয়ের আয়োজনে সবকিছু দেখাশোনা করেছিলেন যথারীতি বড় বোন জাহানারা। হিন্দুস্তানি রীতি মেনে আওরঙ্গজেবের হাতে-পায়ে মেহেদি দিয়ে রঙিন করা হয়েছিল। বিয়ে করতে যাওয়ার সময় পিতা শাহজাহান নিজ হাতে পুত্রকে মুক্তা আর মূল্যবান পাথরে সজ্জিত সেহরা পরিয়ে দিয়েছিলেন। বরের মুখ ঢেকে রাখা সেহরাও আরেক ভারতীয় রীতি।

বিয়ের পর তিন মাস স্ত্রীসহ আওরঙ্গজেব আগ্রাতেই ছিলেন। তারপর দিলরাসকে নিয়ে চলে যান দাক্ষিণাত্যে।

দরবারের জ্যোতিষ আওরঙ্গজেব ও দিলরাসের বিয়ের ক্ষণ নির্ধারণ করেছিলেন। অনুষ্ঠান হয়েছিল মধ্যরাতের পর। যথারীতি মোগল ঐতিহ্যানুসারে যথেষ্ট ধুমধাম হয়েছিল এ আয়োজনে। কাফি খানের বিবরণীতে পাওয়া যায় বিপুল আতশবাজি পোড়ানো হয়েছিল সেই আয়োজনে। গায়ক আর নর্তকীদের আয়োজন দেখলে নাকি স্বয়ং স্বর্গের দেবীও হিংসা করতেন।

সম্রাট শাহজাহানের উপস্থিতিতে বিয়ে অনুষ্ঠিত হয় এবং দেনমোহর ধরা হয়েছিল ৪ লাখ রুপি। ১৪ মে আওরঙ্গজেবের প্রাসাদের বিবাহোত্তর ভোজ অনুষ্ঠিত হয়।

১৬৫২ সালে আওরঙ্গজেবের বয়স ৩৩। স্ত্রী দিলরাস ও তিন কন্যাকে নিয়ে নির্মাণের পরে প্রথমবারের মতো পা রাখলেন শাহজাহানাবাদে। এ সময় তার আরো কয়েকজন স্ত্রী ছিলেন, যেমন কাশ্মীরি রাজপুত নওয়াব বাই। তাদের গর্ভে আওরঙ্গজেবের কয়েকজন সন্তান ছিল। তবে সম্রাটের উজ্জ্বলতম দুই সন্তান জেব-উন-নিসা ও জিনাত-উন-নিসার জন্ম দিলরাসের গর্ভে। ১৬৫৯ সালে আওরঙ্গজেব ভাইদের হত্যা করে দিল্লির সিংহাসনে আরোহণের কয়েক বছর আগে মারা যান দিলরাস। পুত্রসন্তান মুহাম্মদ আকবরকে জন্ম দেয়ার পর শারীরিক অসুস্থতার কারণে ১৬৫৭ সালের ৮ অক্টোবর দিলরাসের মৃত্যু হয়। তাকে নগরের বাইরে সমাধিস্থ করা হয় এবং তখন তাকে উপাধি দেয়া হয় রাবিয়া-উদ-দুররানি অর্থাৎ এ যুগের সন্ত রাবিয়া।

দিলরাসের সমাধিক্ষেত্র দাক্ষিণাত্যের তাজমহল নামে পরিচিত। আনুষ্ঠানিকভাবে এ সমাধির নাম বিবি কা মাকবারা। পিতা আওরঙ্গজেবের নির্দেশে পুত্র আজম এ স্থাপনার সংস্কার করেন। দিলরাস উন্নত মস্তকের গর্বিত নারী ছিলেন। পারস্যের রাজপরিবারের নীল রক্ত ছিল তার এ গৌরবের উৎস। আওরঙ্গজেব নিজে কঠোর, দৃঢ় চরিত্রের মানুষ হলেও দিলরাসের সামনে কিছুট অপ্রস্তুত হয়ে যেতেন, তাকে দেখতেন বিস্ময় আর সম্মানের মিশেলে।

প্রধান মহিষী হিসেবে আওরঙ্গজেবের ওপর দিলরাসের যথেষ্ট প্রভাব ছিল। সম্ভবত আওরঙ্গজেবকে আর কোনো মানুষ জীবনে এতটা প্রভাবিত করতে পারেনি। এ বিষয়ে দুটো লক্ষণকে আমলে নেয়া যায়—আওরঙ্গজেব তার পুরো জীবনে একটিমাত্র সমাধি নির্মাণ করিয়েছেন এবং সেটি দিলরাসের স্মরণে—বিবি কা মাকবারা। অন্যদিকে দিলরাস ছিলেন শিয়া আর আওরঙ্গজেব নিবেদিতপ্রাণ সুন্নি মুসলিম।

দিলরাসের প্রভাবে হারেম কিংবা দরবার কোথাও আওরঙ্গজেবের অন্য স্ত্রীদের কথা আর সেভাবে শোনা যায়নি। তবে দিলরাস কখনো দরবারের রাজনীতি ও প্রশাসনিক বিষয়ে অংশ নেননি। বলা হয় আওরঙ্গজেবের এ বিষয়ে অনুমতি ছিল না। প্রিয়তম স্ত্রীকে তিনি দরবারি রাজনীতি থেকে দূরেই রাখতে চেয়েছিলেন।

দিলরাসের যতটুকু বর্ণনা পাওয়া যায় তাতে তিনি গৌরবর্ণের এবং যথেষ্ট আকর্ষণীয়া ছিলেন। চরিত্রগতভাবে দিলরাস ছিলেন গর্বিত ও স্বাধীনচেতা। বংশগৌরবে গৌরবান্বিত দিলরাস কিছুটা রগচটা স্বভাবের ছিলেন। শোনা যায় আওরঙ্গজেব নিজেও বিষয়টির উল্লেখ করেছেন, বলেছেন দিলরাস খুব উদ্ধত চরিত্রের হলেও জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আমি তাকে ভালোবেসেছি। তার অনুভূতিকে কখনো কোনো আঘাত দিইনি। আওরঙ্গজেব সব সময়ই দিলরাসের সঙ্গে বিনয়ী, নম্র ছিলেন। তাকে সম্মান ও প্রশংসা করতেন। তবে খেয়াল করলে দেখা যায় চরিত্রগতভাবে আওরঙ্গজেব ও দিলরাসের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য ছিল না। তারা দুজনই ছিলেন দৃঢ়, ধার্মিক এবং বস্তুগত বিভিন্ন মূলবোধে একই আদর্শ ধারণ করতেন।

দিলরাস ছাড়াও আওরঙ্গজেবের আরো দুজন স্ত্রী ছিলেন। কিন্তু বলাই বাহুল্য তারা স্বামীর ভালোবাসা কিংবা হারেম কোথাও উল্লেখযোগ্য কোনো স্থান পাননি। ক্ষমতা, অবস্থান, প্রেম—সবকিছুই বরাদ্দ ছিল দিলরাসের জন্য। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত স্বামীর ওপর তার প্রভাব অব্যাহত ছিল। অকালমৃত্যুর পরও আওরঙ্গজেবের জীবনে অন্য কোনো স্ত্রী বা নারী দিলরাসের স্থান নিতে পারেননি।

আওরঙ্গজেব ও দিলরাসের দাম্পত্য জীবনের একটি ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দিলরাস প্রতিবার গর্ভবতী হয়েছেন বেশ কয়েক বছরের বিরতিতে। অ্যানি ক্রিগার-ক্রিনিকি মনে করেন, অল্পদিনের বিরতি দিয়ে স্ত্রীকে গর্ভবতী করে তার জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে চাননি আওরঙ্গজেব। কারণ নিজের মা মুমতাজ মহলকে তিনি এ বিষয়ে জটিলতায় ভুগতে দেখেছিলেন। ২০ বছরের দাম্পত্য জীবনে আওরঙ্গজেব ও দিলরাস দম্পতি পাঁচ সন্তানের পিতা-মাতা হয়েছিলেন।

তবে শেষমেশ সন্তান জন্ম দিতে গিয়েই মারা গিয়েছিলেন দিলরাস। নিজের পঞ্চম সন্তান মোহাম্মদ আকবরের জন্মের পর শারীরিক জটিলতায় ভুগতে থাকেন তিনি এবং এর এক মাসের মাথায় প্রয়াত হন। দিনটি ছিল ১৬৫৭ সালের ৮ অক্টোবর। দিলরাসের মৃত্যুতে আওরঙ্গজেব যেমন শোকাকুল হয়েছিলেন, তেমনি তাদের প্রথম সন্তান মোহাম্মদ আজম। সদ্যোজাত ভাই মোহাম্মদ আকবরের দায়িত্ব নেন বোন জেব-উন-নিসা। অন্যদিকে মাতৃহারা এ সন্তান শিগগিরই আওরঙ্গজেবের খুব প্রিয় হয় ওঠে।

দিলরাস বানুর মৃত্যুর তিন বছর পর ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে আওরঙ্গজেব স্ত্রীর জন্য সমাধি নির্মাণের কাজ শুরু করেন। আওরঙ্গবাদে অবস্থিত এ সমাধিসৌধ বিবি কা মাকবারা নামে পরিচিত। আওরঙ্গজেব তার অর্ধশতাব্দীব্যাপী শাসনামলে কখনো কোনো সমাধিসৌধ নির্মাণ করেননি। ব্যতিক্রম শুধু বিবি কা মাকবারা। সমাধিসৌধটি আওরঙ্গজেবের জীবনে দিলরাসের ব্যতিক্রমী ভূমিকার কথাই যেন স্মরণ করিয়ে দেয়। বিবি কা মাকবারা আওরঙ্গজেবের জীবনে নির্মাণ করা সবচেয়ে বড় স্থাপনা। আওরঙ্গজেব নিজেও দিলরাসের সমাধির কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে খুলদাবাদে সমাধিস্থ হয়েছিলেন।

বিবি কা মাকবারা নির্মাণে ব্যয় হয়েছিল ছয় লাখ আটষট্টি হাজার রুপি। এর নির্মাণের জন্য আওরঙ্গজেব মাত্র সাত লাখ রুপি বরাদ্দ দিয়েছিলেন। সমাধির মূল দরজায় থাকা একটি খোদাই থেকে জানা যায়, এ সমাধির নকশা করেছিলেন আতা-উল্লাহ রশিদি, তিনি ছিলেন একজন স্থপতি। আর প্রকৌশলী ছিলেন হংসপত রায়। উল্লেখ্য যে আতা-উল্লাহ ছিলেন উস্তাদ আহমেদ লাহোরির পুত্র, যিনি শাহজাহানের তাজমহল নির্মাণের মূল স্থাপত্যবিদ ছিলেন।

বিবি কা মাকবারা নির্মাণের জন্য মার্বেল আনা হয়েছিল জয়পুরের খনি থেকে। তাভের্নিয়েরের মতে, ৩০০টি গরুর গাড়ি ভরে এ মার্বেল আনা হয়েছিল। প্রতিটি গাড়ি ১২টি ষাঁড় দিয়ে টানা হয়েছিল। সুরাট থেকে গোলকুন্ডা যাওয়ার পথে এ দৃশ্য দেখেছিলেন তাভের্নিয়ের। শুরুতে এটি ছিল তাজমহলের মতোই হুবহু একটি স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা। কিন্তু আওরঙ্গজেবের দেয়া বরাদ্দ কম হওয়ায় শেষমেশ এটি তাজমহলের একটি দুর্বল কপি হয়। আকারে তাজমহলের অর্ধেক এবং বাইরের দিকে মার্বেলের পরিবর্তে সুরকি, পাথরের মিশ্রণ বিবি কা মাকবারাকে গরিব কা তাজ (গরিবের তাজমহল) খ্যাতি এনে দেয়।

বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বিবি কা মাকবারা মোগল স্থাপত্য হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এটি দক্ষিণ ভারতের মোগলদের একমাত্র উল্লেখযোগ্য স্থাপনা। সমাধিটিতে মার্বেলের জালি দেখতে পাওয়া যায়, যা মোগল স্থাপত্যের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। মূল গম্বুজটি ভেতরের দিকে ফ্লোরাল নকশায় সজ্জিত। তাজমহলের সঙ্গে বিবি কা মাকবারার নকশায় একটি বড় পার্থক্য আছে। তাজমহলের চারপাশের মিনারগুলো মূল গম্বুজের চেয়ে উঁচু নয়, কিন্তু বিবি কা মাকবারার মিনারগুলো মূল গম্বুজের চেয়ে উঁচু।

 

শানজিদ অর্ণব: লেখক ও অনুবাদক