পিটার সিঙ্গার। ভাষান্তর : জিএইচ হাবীব

কার্ল মার্কসের জন্ম জর্মন রাইনল্যান্ডের ত্রিয়েরে ১৮১৮ সালে। তার বাবা হেইনরিশ ও মা হেনরিয়েট প্রেসবার্গ ইহুদি ছিলেন। তবে হেইনরিশ যাতে আইনজীবী হিসেবে সহজে তার পেশা চালিয়ে যেতে পারেন, সেজন্য তারা নামকাওয়াস্তে প্রোটেস্ট্যান্ট হন। পরিবারটি ধনী না হলেও যথেষ্ট সচ্ছল ছিল এবং ধর্ম ও রাজনীতি সম্পর্কে তারা উদারপন্থী ছিলেন, যদিও র্যাডিক্যাল নন।

কার্ল মার্কসের বুদ্ধিবৃত্তিক ক্যারিয়ারের শুরুটা খুব একটা সুবিধার ছিল না। ১৭ বছর বয়েসে তিনি বন বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন নিয়ে পড়াশোনা করতে গিয়েছিলেন, কিন্তু এক বছরের মধ্যেই মাতলামির অপরাধে তাকে কারাগারে যেতে হয়েছিল। তাছাড়া একটা দ্বৈরথে আহতও হয়েছিলেন সামান্য। শৈশবের প্রেমিকা জেনি ফন ভেস্টফ্যালেনের উদ্দেশে এ সময় তিনি কিছু প্রেমপত্রও লিখেছিলেন। তার বাবার চোখে এসবই ছিল ‘উন্মত্ত তাণ্ডব’। ফলে তিনি দ্রুতই কার্লকে আরো ওজনদার বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন।

বার্লিনে সেখানে মার্কসের আগ্রহ আরো বুদ্ধিবৃত্তিক হয়ে উঠল। তার বাবা এতে মোটেই খুশি হলেন না: ভর্ত্সনাসূচক একটা চিঠিতে তিনি লিখলেন, ‘বিয়ারের গেলাস হাতে অধঃপাতের জায়গা নিয়েছে এখন পাণ্ডিত্যসুলভ ড্রেসিং গাউন আর উসকোখুসকো চুলসহ অধঃপাত।’ তবে আয়-রোজগারের একটা পথ দেখার জন্য যে মার্কস গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে বাধ্য হলেন, তার কারণ এসব তিরস্কার নয়, বরং তার বাবার মৃত্যু। কারণ সেই ভদ্রলোকের আয়হীন অবস্থায় পরিবারটির পক্ষে অনির্দিষ্টকালের জন্য মার্কসের লেখাপড়া চালানোর খরচ জোগানো সম্ভব ছিল না। কাজেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক পদে যোগ দেয়ার লক্ষ্যে মার্কস একটা ডক্টরাল থিসিস রচনার কাজে মন দিলেন। কিন্তু সেই থিসিসটির বিষয়ও ছিল বেশ প্রাচীন ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ— ডেমোক্রিটাস ও এপিকিউরাসের দর্শনের মধ্যে প্রতিতুলনা।

১৮৪১ খ্রিস্টাব্দে মার্কসের থিসিস গৃহীত হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো প্রভাষক পদ তাকে দেয়া হলো না, উল্টো তার তখনকার বন্ধু ও মেন্টর ব্রুনো বাওয়ারকে তার উদারপন্থী ধ্যান-ধারণার জন্য চাকরিচ্যুত করা হলো। মার্কস সাংবাদিকতার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়লেন। নতুন স্থাপিত একটি উদারপন্থী সংবাদপত্র Rhenish Gazette (Rheinische Zeitung)-এ তিনি সামাজিক, রাজনৈতিক ও দর্শনবিষয়ক সমস্যা নিয়ে লিখতে শুরু করলেন— সেন্সরশিপ, বিবাহবিচ্ছেদ, বন থেকে মরা গাছপালার ডালপালা ও কাঠ সংগ্রহের ওপর নিষেধাজ্ঞামূলক একটি প্রুশীয় আইন, মোজায়লা উপত্যকার মদ্য উৎপাদনকারীদের আর্থিক দুর্দশা ইত্যাদি। তার লেখাগুলো বেশ প্রশংসিত হলো এবং সংবাদপত্রটির সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা এতটাই বেড়ে গেল যে, ১৮৪২ খ্রিস্টাব্দে সেটার সম্পাদক পদত্যাগ করলে মার্কস ছাড়া তাকে প্রতিস্থাপন করার মতো যোগ্য আর কাউকে পাওয়া গেল না।

সম্পাদক হিসেবে অবশ্য বেশি দিন দায়িত্ব পালন করা হলো না মার্কসের, যদিও তাতে তার কোনো দোষ ছিল না। পত্রিকাটির ব্যাপারে পাঠকের আগ্রহ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে প্রুশীয় সরকারের সেন্সরের মনোযোগও বাড়ছিল। মোজায়লা উপত্যকার মদ্য উৎপাদনকারীদের দারিদ্র্যের ওপর লেখা মার্কসের ধারাবাহিক লেখাটিই সম্ভবত বিশেষ করে বিস্ফোরক বলে মনে করা হয়েছিল। সে যা-ই হোক, একপর্যায়ে সরকার পত্রিকাটির মুখ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিল।

মার্কস অবশ্য এতে দুঃখিত হলেন না। কারণ এ সময় তার এক বন্ধুকে লেখা একটা চিঠিতে তিনি লিখলেন, ‘কর্তৃপক্ষ আমাকে আমার স্বাধীনতা ফিরিয়ে দিয়েছে।’ সম্পাদকীয় দায়দায়িত্ব থেকে মুক্ত হয়ে তিনি হেগেলের রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে একটি সমালোচনামূলক কাজ শুরু করলেন। কিন্তু তার আরো বেশি জরুরি একটি কাজ ছিল: জেনিকে বিয়ে করা, যিনি সাত বছর ধরে তার বাগদত্তা ছিলেন।

তিনি জার্মানি ছাড়তে চাইছিলেন। কারণ সেখানে তিনি স্বাধীনভাবে তার মত প্রকাশ করতে পারছিলেন না। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, বিয়ের জন্য অর্থের প্রয়োজন, আর তখন তিনি ফের বেকারও বটে। কিন্তু একজন প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ লেখক হিসেবে তার খ্যাতি এ যাত্রা তার সহায় হলো: German-French Annals (Deutsch-Französische Jahrbücher) নামের একটি নতুন প্রকাশনার সহসম্পাদক হওয়ার জন্য তাকে আমন্ত্রণ জানানো হলো। তাতে যেমন বিয়ে করার জন্য যথেষ্ট আয়ের একটা ব্যবস্থা হলো, সেই সঙ্গে তিনি কোথায় যাবেন, সে প্রশ্নেরও একটা সুরাহা হলো। কারণ পত্রিকার নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে, নতুন প্রকাশনাতে জার্মান ও ফরাসি দুই দেশেরই লেখক ও পাঠক থাকবে।

১৮৪৩ সালের শরতে কার্ল ও জেনি মার্কস প্যারিস পৌঁছলেন এবং শিগগিরই প্রগতিশীল চিন্তা-ভাবনার এ কেন্দ্রটিতে এসে জড়ো হওয়া র্যাডিক্যাল ও সমাজবাদীদের সঙ্গে মিশতে শুরু করেন। Annals-এর জন্য মার্কস দুটো লেখা লেখেন। অবশ্য প্রকাশনাটি আগের সেই পত্রিকাটির চেয়েও ক্ষীণ আয়ু ছিল। প্রথম ইস্যুটি কোনো ফরাসি প্রদায়কের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হলো এবং তার ফলে প্যারিসে সেটা প্রায় কারো নজরেই পড়ল না বলতে গেলে। ওদিকে প্রুশিয়ায় পাঠানো কপিগুলো সেখানকার কর্তৃপক্ষ বাজেয়াপ্ত করল। উদ্যোগটির অর্থ জোগানদাতারা পিছু হঠলেন। এদিকে বাজেয়াপ্ত প্রথম সংখ্যায় ব্যক্ত কমিউনিস্ট ও বৈপ্লবিক ধ্যান-ধারণার পরিপ্রেক্ষিতে প্রুশীয় সরকার সম্পাদকদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারের হুলিয়া জারি করল। মার্কসের জন্য এখন জার্মানিতে ফেরাও অসম্ভব হয়ে পড়ল। তিনি একজন রাজনৈতিক শরণার্থীতে পরিণত হলেন। সৌভাগ্যক্রমে Rhenish Gazette-এর প্রাক্তন শেয়ারহোল্ডারদের কাছ থেকে তিনি মোটা অংকের অর্থ লাভ করলেন। ফলে আপাতত তার চাকরির দরকার হলো না।

১৮৪৪ সালের পুরোটা জুড়েই মার্কস তার নিজের দার্শনিক অবস্থানের কথা বলে বেড়ালেন বিভিন্ন পরিসরে। এটা ছিল রাজনীতি, অর্থনীতি, ইত্যাদি মিলিয়ে একটা বৃহৎ পরিমণ্ডলভিত্তিক দর্শন এবং জগতে ক্রিয়াশীল একটা ইতিহাসগত প্রক্রিয়ার ধারণা। ততদিনে মার্কস নিজেকে একজন কমিউনিস্ট বলার জন্য তৈরি হয়ে গেছেন এবং সে সময়ের প্যারিসে ব্যাপারটা খুব একটা অস্বাভাবিক ছিল না। কারণ তখন শহরটিতে সব ধরনের সমাজবাদী ও কমিউনিস্টেরই দেখা মিলত। ওই একই বছর, অর্থাৎ ১৮৪৪ খ্রিস্টাব্দেই মার্কস ও এঙ্গেলসের বন্ধুত্বের সূত্রপাত ঘটে।

ফ্রেডেরিখ এঙ্গেলস ছিলেন একজন জর্মন শিল্পপতির পুত্র; ম্যানচেস্টারেও একটি সুতার কল ছিল ভদ্রলোকের। কিন্তু মার্কস যেসব জার্মান বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডলে ঘোরাফেরা করতেন, তারই সংস্পর্শে এসে এঙ্গেলসও একজন বিপ্লবী সমাজবাদী হয়ে উঠেছিলেন। Annals-এ এঙ্গেলসের একটি লেখা প্রকাশিত হয় এবং অর্থনীতি সম্পর্কে মার্কসের নিজস্ব চিন্তাভাবনার ওপর সেটা গভীর প্রভাব ফেলে। কাজেই এঙ্গেলস যখন প্যারিস সফরে এলেন, তখন যে তার আর মার্কসের সাক্ষাৎ ঘটবে, সেটা কোনো বিচিত্র ঘটনা নয়। শিগগিরই তারা দুজনে মিলে একটি প্যামফ্লেট রচনায় হাত দিলেন অথবা বলা চলে, এঙ্গেলস মনে করেছিলেন, সেটা একটা প্যামফ্লেটই হতে যাচ্ছে। প্যারিস থেকে বিদায় নেয়ার আগে তিনি তার লেখা প্রায় ১৫ পৃষ্ঠা দীর্ঘ অংশটুকু দিয়ে গেলেন। এ প্যামফ্লেটই ১৮৪৫ সালে পবিত্র পরিবার নামে প্রকাশ হলো। ৩০০ পৃষ্ঠা দীর্ঘ এ প্রকাশনাটিই মার্কসের প্রথম গ্রন্থ।

এদিকে প্যারিসে বসবাসরত কমিউনিস্টদের ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়ার ব্যাপারে প্রুশীয় সরকার ফ্রান্সের ওপর ক্রমাগতভাবে চাপ প্রয়োগ করে যাচ্ছিল। শিগগিরই একটি বহিষ্কার আদেশ জারি হলো এবং মার্কস পরিবার— যেখানে ততদিনে মা জেনির নামে নাম রাখা একটি কন্যাসন্তান যুক্ত হয়েছে— ব্রাসেলসে গিয়ে উঠল।

ব্রাসেলসে থাকার অনুমতি পাওয়ার জন্য মার্কসকে কথা দিতে হয়েছিল যে, তিনি রাজনীতিতে জড়াবেন না। কিন্তু বিভিন্ন দেশের কমিউনিস্টদের মধ্যে যোগাযোগ বজায় রাখার উদ্দেশে ‘কমিউনিস্ট করেসপন্ডেন্স কমিটি’ গঠন করার মাধ্যমে শিগগিরই তিনি সেই মুচলেকা ভঙ্গ করলেন। তার পরও তিনি তিন বছর ব্রাসেলসে থাকতে পেরেছিলেন। এ সময় মার্কস অর্থনীতি ও রাজনীতির বিশ্লেষণমূলক একটি গ্রন্থ রচনার জন্য একজন প্রকাশকের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন। কথা ছিল, ১৮৪৫ সালের গ্রীষ্ম নাগাদ বইটি লেখা শেষ হবে। তো পরবর্তীকালে যে বইটি ক্যাপিটালে পরিণত হবে, সেটার ডেডলাইন মিস হওয়ার এই কেবল শুরু। পাণ্ডুলিপির জন্য লেখককে আগাম রয়্যালটি দিয়েছিলেন প্রকাশক এবং কোনো সন্দেহ নেই যে, সেজন্য তাকে দীর্ঘদিন ধরে আফসোস করতে হয়েছে (চুক্তিটি শেষ অবধি বাতিল করা হয় এবং ১৮৭১ সালেও হতভাগ্য লোকটি তার টাকা ফেরত পাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন)। এদিকে এঙ্গেলসও তখন মার্কসকে আর্থিকভাবে সাহায্য করতে শুরু করেছেন, কাজেই পরিবারটির গ্রাসাচ্ছাদনের সমস্যা ছিল না।

মার্কস ও এঙ্গেলসের অন্তরঙ্গতা বেড়ে চলল। এঙ্গেলস ব্রাসেলসে এলেন এবং নতুন শিল্প জগতের প্রাণকেন্দ্র ম্যানচেস্টারে অর্থনীতি অধ্যয়নের জন্য দুজনে মিলে ছয় সপ্তাহের জন্য ইংল্যান্ড ভ্রমণে গেলেন (এদিকে জেনির গর্ভে তখন দম্পতিটির দ্বিতীয় কন্যা লরা বেড়ে উঠছে)। ইংল্যান্ড থেকে ফিরে এসে মার্কস অর্থনীতির ওপর তার বইটির রচনা মুলতবি রাখলেন। নিজের বস্তুনিষ্ঠ তত্ত্ব নিয়ে যাত্রার আগে তিনি সে সময়ে জার্মান দার্শনিক ও সমাজবাদী পরিমণ্ডলে প্রচলিত বিকল্প সব ধ্যানধারণাগুলোকে নস্যাৎ করতে চাইলেন। আর তারই ফল হিসেবে লেখা হলো The German Ideology, একটি দীর্ঘ ও বাগাড়ম্বরপূর্ণ রচনা, যেটা অন্তত সাতজন প্রকাশকের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত এবং শেষ অবধি মার্কসের ভাষায়, ইঁদুরের দাঁতের চর্বণের সমালোচনার কাছে পরিত্যক্ত হয়েছিল। The German Ideology রচনা ছাড়াও মার্কস এ বছরগুলোর একটা উল্লেখযোগ্য সময় সেসব মানুষকে আক্রমণে ব্যয় করেন, যারা হয়তো তার সহযোগী হতে পারতেন। এ সময় তিনি ফরাসি সমাজবাদী প্রুধোঁর সমালোচনা করে আরেকটি বিতর্কমূলক লেখা লেখেন। প্রুধোঁর দ্য ফিলোসফি অব পোভার্টি নামের রচনাটিকে ব্যঙ্গ করে তিনি তার লেখাটির নামকরণ করেন দ্য পোভার্টি অব ফিলোসফি, যেটাকে তিনি ‘কর্তৃপক্ষের প্রতি একটি কুসংস্কারপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। মার্কস তত্ত্বগতভাবে সেটার বিরোধী হলেও নিজের ধ্যানধারণার গুরুত্বের ব্যাপারে তিনি এতটাই স্থির বিশ্বাসী ছিলেন যে, বিরুদ্ধ মত তার সহ্য হতো না। ফলে ‘কমিউনিস্ট করেসপন্ডেন্স কমিটি’তে এবং তার পরে স্থাপিত ‘কমিউনিস্ট লিগ’-এ প্রায়ই বাদ-বিসংবাদের সৃষ্টি হতো।

মার্কস ১৮৪৭ সালের ডিসেম্বরে যখন নব্য গঠিত ‘কমিউনিস্ট লীগ’-এর কংগ্রেসে যোগ দেয়ার জন্য লন্ডন গেলেন, তখন তিনি তার নিজের ধ্যান-ধারণাকে কমিউনিস্ট কর্মকাণ্ডের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার একটি সুযোগ লাভ করেন। কমিউনিজম কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে, সে ব্যাপারে তার বক্তব্যগুলো তিনি দীর্ঘ বিতর্কের মধ্য দিয়ে তুলে ধরেন এবং শেষে লীগের মতবাদগুলোকে সহজ-সরল ভাষায় লিখে ফেলার জন্য তাকে ও এঙ্গেলসকে দায়িত্ব দেয়া হয়। তারই ফল হচ্ছে ১৮৪৮ সালে প্রকাশিত কমিউনিস্ট ইস্তেহার এবং সেটাই মার্কসের তত্ত্বের ধ্রুপদী সারসংক্ষেপ হয়ে ওঠে।

কমিউনিস্ট ইস্তেহার অবশ্য তাত্ক্ষণিক সাফল্য পায়নি। সেটা প্রকাশিত হওয়ার আগেই গোটা ইউরোপে বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডের আগুন ছড়িয়ে দেয়া ১৮৪৮ সালের ফরাসি বিপ্লবের কারণে ইউরোপের পরিস্থিতি বদলে যায়। নতুন ফরাসি সরকার মার্কসের বহিষ্কারাদেশ বাতিল করে এবং বেলজীয় সরকার তাকে স্রেফ ২৪ ঘণ্টা সময় দেয় সে দেশ ত্যাগ করার জন্য। মার্কস প্রথমে প্যারিসে যান, তারপর বার্লিনে বিপ্লবের খবর পেয়ে জার্মানিতে ফিরে আসেন। কোলোনে মার্কস একটা র্যাডিক্যাল খবরের কাগজ The New Rhenish Gazette (Neue Rheinische Zeitung) বের করার জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে থাকেন। যে ব্যাপক গণতান্ত্রিক আন্দোলন বিপ্লবটিকে সংঘটিত করেছিল, পত্রিকাটি সেটার পক্ষ সমর্থন করে। প্রথম দিকে সেটি বেশ ভালোই করে, কিন্তু বিপ্লবটি ভেস্তে যেতে প্রুশীয় রাজতন্ত্র ফের তার দাঁত ও নখর বের করতে থাকে এবং মার্কসকে আবার তার সফরে নামতে হয়। তিনি প্যারিস যাওয়ার চেষ্টা করেন; কিন্তু শিগগিরই তাকে সেখান থেকে আবার বহিষ্কার করা হয়। কাজেই ১৮৪৯ সালের ২৪ আগস্ট তিনি ইংল্যান্ডের উদ্দেশে পাড়ি জমান; আরেকটা সর্বাত্মক বিপ্লব তাকে জার্মানিতে ফিরে যাওয়ার সুযোগ করে না দেয়া অবধি অপেক্ষা করার জন্য।

মার্কসের বাকি জীবন লন্ডনেই কাটে। গোড়ায় পরিবারটি খুবই দরিদ্র ছিল। সোহোতে দুটো কামরার একটি বাড়িতে থাকতেন তারা। জেনি তখন চতুর্থবারের মতো গর্ভবতী (ব্রাসেলসে একটি পুত্রের জন্ম হয়েছিল, তার নাম রাখা হয় এডগার)। তার পরও মার্কস কমিউনিস্ট লীগের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ছিলেন। ফ্রান্সের বিপ্লব ও তার পরিণাম নিয়ে তিনি কিছু লেখালেখি করেন এবং লীগের কোলোন কমিটির সদস্যদের সমর্থন জোগানোর জন্য চেষ্টা চালান। কারণ প্রুশীয় কর্তৃপক্ষ তাদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছিল। পুলিশের দাখিল করা প্রমাণগুলো যে জাল, সেটা মার্কস পরিষ্কারভাবে দেখিয়ে দেয়ার পরও যখন কোলোনের দলটিকে সাজা দেয়া হলো, তখন মার্কস এ সিদ্ধান্তে পৌঁছলেন যে, লিগের অস্তিত্ব ‘আর সুবিধাজনক নয়’ এবং অবশেষে লীগ বিলুপ্ত হয়ে গেল।

সব রকমের সংগঠিত রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্কহীন একটা বিচ্ছিন্ন জীবন কাটালেন মার্কস কিছুদিন। তার সময় কাটল গোগ্রাসে নানা জিনিস পাঠ করে আর অন্যান্য বামপন্থী জার্মান শরণার্থীর সঙ্গে মতবাদভিত্তিক বাদ-বিসংবাদে। এ সময় তিনি বিভিন্নজনকে যেসব চিঠিপত্র লিখেছেন, সেগুলো ‘অন্নচিন্তা চমৎকারা’র একটা উত্কৃষ্ট নিদর্শন: তিনি যে যৎসামান্য রুটি ও আলু ছাড়া পরিবারের জন্য কিছুই জোগাড় করতে পারছেন না, এ অভিযোগ আর খেদোক্তিতে পূর্ণ ছিল সেসব চিঠি। মরিয়া মার্কস এমনকি রেলওয়ের ক্লার্কের পদেও আবেদন করেছিলেন এ সময় একবার, কিন্তু খুবই বাজে হাতের লেখার কারণে সে চাকরিটি তিনি পাননি। এ সময় মার্কসকে নিয়মিতভাবে জিনিসপত্র বন্ধক রাখার দোকানে দেখা যেত। তবে মার্কসের বন্ধুবান্ধব, বিশেষ করে এঙ্গেলস বেশ উদারভাবে তাদের নানা জিনিস উপহার দিতেন আর ব্যাপারটা এমনও হতে পারে যে, মার্কসের দারিদ্র্য আসলে যতটা না অপর্যাপ্ত আয়ের জন্য, তার চেয়ে বেশি ছিল সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবের কারণে। জেনির পরিচারিকা হেলেন ডেমুথ তখনো তাদের সঙ্গে থাকতেন এবং মার্কসের মৃত্যু অবধি তা-ই ছিলেন। উল্লেখ্য, তিনি মার্কসের ১৮৫১ সালে জন্ম নেয়া অবৈধ পুত্র ফ্রেডেরিকের মাও বটে; কেলেঙ্কারিটা চাপা দেয়ার জন্য ছেলেটিকে তার জন্মের পর পরই পালক পিতা-মাতার ঘরে লালন-পালনের ব্যবস্থা করা হয়। এ গোপন কথাটি ১৮৯৫ সালে এঙ্গেলস তার মৃত্যুশয্যায় প্রকাশ করেন। যদিও টি কার্ভার ১৯৮১ সালে প্রকাশিত তার এঙ্গেলস গ্রন্থে তথ্যটির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন।

পরিবারটির জন্য এ বছরগুলো ছিল ব্যক্তিগত করুণ ঘটনার সময়: তাদের চতুর্থ সন্তান শৈশবেই মারা যায়; জেনি আবার গর্ভবতী হন, কিন্তু শিশুটি এক বছরের মাথায়ই মারা যায়। সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসে তাদের পুত্র এডগারের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। সম্ভবত যক্ষ্মা রোগে আট বছর বয়সে বিদায় নেয় সে। ১৮৫২ সাল থেকে মার্কসের আয় আগের চেয়ে অনেকটা নিয়মিত হলো। কোলোনে তার সঙ্গে The New York Tribune-এর সম্পাদকের পরিচয় হয়েছিল। তিনি তাকে পত্রিকাটির জন্য লেখার আমন্ত্রণ জানালেন। মার্কস রাজি হলেন এবং পরবর্তী ১০ বছর Tribune পত্রিকাটিতে প্রায় প্রতি সপ্তাহে তার একটি লেখা বের হয় (অবশ্য সেগুলোর কিছু কিছু এঙ্গেলসের লেখা ছিল, যদিও তা কেউ জানত না)। ১৮৫৬তে জেনি উত্তরাধিকার সূত্রে দুটো জায়গা থেকে বেশকিছু টাকাকড়ি পাওয়ায় পরিবারটির আর্থিক অবস্থার আরো উন্নতি হলো। এবার তারা সোহোর সেই দম আটকানো দুই কামরার বাসা ছেড়ে হ্যাম্পস্টিড হিথের কাছে আট কামরার একটি বাড়িতে উঠে এলেন। এ বছরই মার্কসের তৃতীয় কন্যা— যার ডাকনাম টুসি— জন্ম নেয়। পরে জেনি অবশ্য আরো একবার গর্ভবতী হলেন। তবে সে বাচ্চাটি মৃত অবস্থায় ভূমিষ্ঠ হয়েছিল। এর পর থেকে মার্কস-জেনি পরিবারের সন্তান সংখ্যা ছিল তিন: জেনি, লরা ও এলিনর। আর বাবা হিসেবে মার্কস ছিলেন খুবই আন্তরিক ও স্নেহশীল।

এ সময়টায় মার্কস আশা করছিলেন, অদূরভবিষ্যতেই হয়তো একটা বিপ্লব ঘটবে। একটি অর্থনৈতিক মন্দাকে তিনি পুঁজিবাদের চূড়ান্ত সংকট ভেবে ভুল করেছিলেন। আর তার ফলে ১৮৫৭ ও ১৮৫৮— এই দুই বছর তার কর্মজীবনের সবচেয়ে ফলপ্রসূ সময়ে পরিণত হয়। এঙ্গেলসকে লেখা চিঠি অনুযায়ী তিনি এ সময় ‘রাত জেগে পাগলের মতো’ ছয় মাস কাজ করে ‘নুহের প্লাবন আসার আগেই’ একটি খসড়া পুঁজির ৮০০ পৃষ্ঠা লিখে ফেলেন, যেটা তার জীবদ্দশায় তো প্রকাশিত হয়ইনি, এমনকি প্রায় ৮০ বছর অলভ্য ছিল। Grundrisseder Kritik der Politischen Okonomie (Foundations for a Critique of Political Economy) নামে সেটি ১৯৩৯-১৯৪১ সালে মস্কোয় প্রকাশিত হয় এবং ১৯৬৪ সালে Pre-capitalist Economic Formations নামে সেটার একটা অংশ ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছিল। রচনাটির সম্পূর্ণ ইংরেজি অনুবাদ করেন মার্টিন নিকোলাউস এবং সেটি ১৯৭৩ সালে Grundrisse (খসড়া বা ভিত্তি) শিরোনামে প্রকাশিত হয়। সত্যি বলতে কি, পুঁজির প্রকাশিত সংস্করণের চেয়ে এ খসড়ায় মার্কসের আলোচনার ক্ষেত্র ছিল অনেক বেশি বিস্তৃত।

১৮৫৯ সালে মার্কস অর্থনীতি নিয়ে তার কাজের একটা ক্ষুদ্র অংশ A Critique of Political Economy নামে প্রকাশ করেন। সে বইয়ে অবশ্য এমন কিছু ছিল না, যা আট বছর পর মার্কস পুঁজিতে আরো বিশদ করে ব্যাখ্যা করেননি (কেবল ভূমিকায় তার বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের সারসংক্ষেপ ছাড়া যে অংশটি এখন অত্যন্ত প্রসিদ্ধি লাভ করেছে) এবং সেটা নিয়ে তেমন কোনো উচ্চবাচ্য হলো না। পাণ্ডুলিপিটির বাকি এবং আরো মৌলিক অংশগুলো প্রকাশনার জন্য তৈরি করার বদলে মার্কস কার্ল ভগট নামের একজন বামপন্থী রাজনীতিক ও সম্পাদকের সঙ্গে স্বভাবসুলভ একটা দীর্ঘ খেয়োখেয়িতে জড়িয়ে পড়লেন। মার্কস দাবি করলেন, ভগট ফরাসি সরকারের পয়সা খেয়ে কাজ করছেন। ফলে যা হওয়ার তাই হলো। ভগট মার্কসের বিরুদ্ধে মামলা করলেন এবং তাকে জালিয়াত ও ব্ল্যাকমেইলার বলে অভিহিত করলেন। আর মার্কস কী করলেন? তিনি ২০০ পৃষ্ঠার একটা ভগটবিরোধী ব্যঙ্গাত্মক পোলেমিক রচনা করলেন। বেশ কয়েক বছর পর দেখা গেল, মার্কস ঠিক কথাই বলেছিলেন; কিন্তু ভগটের সঙ্গে এ দ্বন্দ্বের ফলে আর্থিকভাবে মার্কস খুব ক্ষতিগ্রস্ত হলেন এবং ১৮ মাস এমন কোনো লেখা লিখতে পারলেন না, যা দীর্ঘস্থায়ী মূল্যবিশিষ্ট।

অর্থনীতিবিষয়ক রচনাটি সম্পূর্ণ করার ব্যাপারে মার্কসের আলস্যের আরো গুরুতর একটি কারণ ছিল। ‘আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী সংঘ’— পরবর্তী সময়ে যা ‘প্রথম আন্তর্জাতিক’ বা ‘ফার্স্ট ইন্টারন্যাশনাল’ নামে পরিচিত হয়, সেটি ১৮৬৪ সালে লন্ডনে একটি গণসভায় গঠিত হয়। মার্কস সে সভায় যোগদানের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন। সাধারণ কাউন্সিলে মার্কসের নির্বাচন বা অন্তর্ভুক্তি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে তার বিচ্ছেদের অবসান ঘটাল। মার্কস তার অমিত বুদ্ধিমত্তা ও বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বের কারণে শিগগিরই সংঘে বেশ প্রাধান্য বিস্তার করতে সক্ষম হন। তিনি সেটির উদ্বোধনী ঘোষণা রচনা করেন, সেটির বিধিনিয়ম দাঁড় করেন। অবশ্য আন্তর্জাতিকের ইংরেজি অংশ তৈরি করা ইউনিয়নিস্টদের সঙ্গে তার দৃষ্টিভঙ্গির উল্লেখযোগ্য পার্থক্য ছিল বৈকি। কিন্তু এসব মতভেদ কমিয়ে আনার জন্য তিনি বিরল কূটনীতির পরিচয় দেন এবং একই সঙ্গে সংঘের শ্রমিকশ্রেণীর সদস্যদের তার দীর্ঘমেয়াদি পরিপ্রেক্ষিতের আরো কাছাকাছি রাখার নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যান।

১৮৬৩ সালের দিকে মার্কস পুঁজির চূড়ান্ত সম্পাদনা শুরু করলেন (তখন সেটার নাম ছিল A Critique of Political Economy); তিন খণ্ড দীর্ঘ রাফ ড্রাফটটি শেষ হলো দুই বছর পর এবং সেটার প্রথম খণ্ড ১৮৬৭ সালে প্রকাশিত হলো। এবারো প্রায় সবারই প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া ছিল হতাশাব্যঞ্জক। তবে মার্কসের বন্ধুদের উৎসাহের কমতি ছিল না এবং বইটির রিভিউ করার জন্য যা যা প্রয়োজন, তার সবই তারা করলেন। এঙ্গেলস তো একাই সাতটি জার্মান খবরের কাগজে সাতটি অনুকূল রিভিউ লিখলেন। ব্যাপকতর স্বীকৃতি এল আরো পরে।

তবে সত্যি বলতে কি, পুঁজির জন্য নয়, বরং মার্কস প্রথমে বিখ্যাত হলেন ১৮৭১ সালে প্রকাশিত তার ফ্রান্সে গৃহযুদ্ধ রচনাটির জন্য। সেটি হচ্ছে প্যারিস কমিউনের সদস্য তথা কমিউনার্ডদের সংগ্রামের চরিত্র ও গুরুত্ব সম্পর্কে ফার্স্ট ইন্টারন্যাশনালের জেনারেল কাউন্সিলের একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি। আর এ প্যারিস কমিউনটি ছিল ১৮৭১ সালে ফ্রাংকো-প্রুশীয় যুদ্ধের প্রাক্কালে গঠিত একটি স্বল্পস্থায়ী র্যাডিক্যাল সমাজবাদী ও বৈপ্লবিক সরকার, যা প্রুশিয়ার হাতে ফ্রান্সের পরাজয়ের পর ১৮৭১ সালের ২৮ মার্চ থেকে ২৮ মে অবধি মোট দুই মাস প্যারিস শাসন করেছিল।

কমিউনের ওপর নির্দয় দমন-পীড়ন ইন্টারন্যাশনালকে দুর্বল করে ফেলে। তলে তলে ফুঁসতে থাকা অসন্তোষ ও মতভেদ এবার প্রকাশ্যে চলে আসতে থাকে। ১৮৭২ সালের কংগ্রেসে মার্কস আবিষ্কার করেন, তার হাতে আর নিয়ন্ত্রণ নেই। জেনারেল কাউন্সিলের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে উত্থাপিত একটি বিল তার জোরালো প্রতিবাদ সত্ত্বেও পাস হয়ে যায়। সংগঠনটিকে তার শত্রুদের কবজায় চলে যেতে দেখার চেয়ে মার্কস প্রস্তাব করলেন যে, তার চেয়ে বরং এর পর থেকে জেনারেল কাউন্সিল নিউইয়র্কভিত্তিক হোক। প্রস্তাবটি অল্প ভোটের ব্যবধানে পাস হয়ে যায়। আর এটার মানে দাঁড়াল, যেটা মার্কস নিজেও জানতেন, প্রথম আন্তর্জাতিকের মৃত্যু, কারণ তখন যোগাযোগের যে অবস্থা ছিল, তাতে মোটামুটিভাবে ইউরোপীয় সংস্থাটিকে আটলান্টিকের ওপার থেকে চালানো কার্যত অসম্ভবই ছিল।

মার্কসের বয়স তখন ৫৪, স্বাস্থ্য সুবিধার নয়। তার জীবনের বাকি ১০ বছর তেমন ঘটনাবহুল নয়। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া আরো কিছু অর্থকড়ি ততদিনে তাদের দারিদ্র্যের সব ধরনের হুমকি থেকে মুক্তি দিয়েছে। মার্কস পরিবারের জীবন তখন অনেক দিক থেকেই বেশ সচ্ছল কোনো বুর্জোয়া পরিবারের জীবনের মতো: তারা আগের চেয়ে বড় একটা বাড়িতে উঠেছেন, সেটা নানা আসবাবে সাজাতে-গোছাতে বেশ টাকা-পয়সা খরচ করেছেন, বাচ্চাদের মেয়েদের সেমিনারিতে পড়াচ্ছেন, মাঝে মাঝে ফ্যাশনেবল স্পায় বেড়াতে যাচ্ছেন। এমনকি স্টক এক্সচেঞ্জে টাকা খাটিয়েও কিছু পয়সা রোজগার করেছেন বলে মার্কস নিজেই জানিয়েছেন। তাই বলে এঙ্গেলসের কাছ থেকে নানা সময়ে উপহার হিসেবে অর্থ গ্রহণ বন্ধ হয়নি।

এদিকে শেষ অবধি মার্কসের চিন্তাভাবনা মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে লাগল এবং ১৮৭১ সালের মধ্যে পুঁজির দ্বিতীয় সংস্করণের প্রয়োজন দেখা দিল। পরের বছর, অর্থাৎ ১৮৭২-এ একটি রুশ অনুবাদ বের হলো— রুশ বিপ্লবীদের কাছে মার্কস বিপুল জনপ্রিয় ছিলেন— এবং ফরাসি সংস্করণও শিগিগরই বের হলো। মার্কসের জীবদ্দশায় পুঁজি ইংরেজিতে অনূদিত না হলেও (তার অন্যান্য বইয়ের মতো এটাও জার্মানে লেখা হয়েছিল) ‘আধুনিক চিন্তাধারায় অগ্রগণ্য ব্যক্তিত্ব’ শিরোনামের প্যামফ্লেটে মার্কসের অন্তর্ভুক্তি এমনকি অতাত্ত্বিক ইংরেজদের মধ্যেও মার্কসের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তারই সাক্ষ্য বহন করে। মার্কস ও এঙ্গেলস গোটা ইউরোপে তাদের সমমনা বিপ্লবীদের সঙ্গে পত্রযোগাযোগ অব্যাহত রাখলেন। অন্যদিকে মার্কস নিজে খেয়ালখুশিমতো পুঁজির দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ডের কাজ করতে লাগলেন। যদিও কখনই তা প্রকাশের জন্য তৈরি করে যেতে পারলেন না। মার্কসের মৃত্যুর পর সে কাজটি এঙ্গেলসের ওপর বর্তাল। মার্কস তার জীবনের শেষ যে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করলেন তা হলো, ১৮৭৫ সালে জার্মানির গোথায় অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের জন্য রচিত ভাষণ। এ কংগ্রেসের উদ্দেশ্য ছিল প্রতিদ্বন্দ্বী জার্মান সমাজবাদী দলগুলোকে একত্র করা এবং সে উদ্দেশে একটি সাধারণ প্লাটফর্ম দাঁড় করানো। মার্কস বা এঙ্গেলস কাউকেই ‘গোথা প্রোগ্রাম’ নামের এ সাধারণ প্লাটফর্ম তৈরির ব্যাপারে কিছু বলা হয়নি এবং বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র বলে মার্কস যা মনে করতেন, তা থেকে অনেক বিচ্যুতি সেখানে লক্ষ করে তিনি ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন। ফলে প্রোগ্রামটি সম্পর্কে তিনি বেশকিছু সমালোচনামূলক লেখা লিখলেন এবং জার্মান সমাজবাদী নেতাদের কাছে সেগুলো যাতে পৌঁছে, সে চেষ্টা করলেন। মার্কসের মৃত্যুর পর এ রচনাগুলো The Critique of the Gotha Program নামে প্রকাশিত হয় এবং ভবিষ্যৎ কমিউনিস্ট সমাজ সম্পর্কে মার্কসের বিরল ভাষ্যগুলোর অন্যতম হিসেবে তা গণ্য হয়। অবশ্য সে সময় মার্কসের সেই সমালোচনা কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি এবং পরিকল্পিত একীকরণের কাজ এগিয়ে চলে।

জীবনের শেষ বছরগুলোয় মার্কস তার ক্রমবর্ধমান খ্যাতির কারণে যে তৃপ্তি বা সন্তুষ্টি লাভ করতে পারতেন, তা ম্লান হয়ে গিয়েছিল তার ব্যক্তিগত জীবনের কিছু শোকাবহ ঘটনার কারণে। মার্কসের বড় দুই মেয়ে জেনি ও লরা বিয়ে করেছিল, তাদের সন্তানও হয়েছিল, কিন্তু লরার কোনো সন্তানই তিন বছরের বেশি বাঁচেনি। জেনির প্রথম সন্তান শৈশবেই মারা যায়। যদিও তার তখন আরো পাঁচ সন্তান ছিল; অবশ্য তাদের একজন বাদে সবাই পরিণত বয়সে পৌঁছার আগেই মৃত্যুবরণ করেছিল। কিন্তু ১৮৮১ সালে মার্কসের প্রিয়তমা স্ত্রী জেনি দীর্ঘ রোগ ভোগের পর মারা যান। মার্কস নিজেও তখন অসুস্থ ছিলেন; এবার নিঃসঙ্গ হলেন। ১৮৮২ সালে তার কন্যা জেনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ল; ১৮৮৩ সালের জানুয়ারিতে তার মৃত্যু হলো। মার্কস এ শোক আর কাটিয়ে উঠত পারলেন না। ব্রংকাইটিসে ভুগে ১৮৮৩ সালের ১৪ মার্চ তিনি মৃত্যুবরণ করলেন।

মার্কসের মৃত্যুর পর এঙ্গেলস তার বন্ধুর অসমাপ্ত রচনাগুলো— বিশেষ করে পুঁজির দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ড— শেষ করার কাজে নামেন। মার্কস তার ৬৫ বছরের জীবনের ৩৫ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে মোটামুটিভাবে ৫০টি খণ্ড পূর্ণ করার মতো যথেষ্ট পরিমাণ লেখালেখি করে গিয়েছিলেন। এসব রচনার মধ্যে রয়েছে তার জীবদ্দশায় প্রকাশিত আধডজন বই; সেই সঙ্গে তার মৃত্যুর পর প্রকাশিত আটটি গ্রন্থসুলভ দৈর্ঘ্যের পাণ্ডুলিপি; সমাজবাদী জার্নাল ও জনপ্রিয় বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত অসংখ্য আর্টিকেল, অগুনতি প্যামফ্লেট ও রাজনৈতিক পুস্তিকা, যার মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাতটি হচ্ছে কমিউনিস্ট ইস্তেহার; আর অসংখ্য অ্যাক্টিভিস্ট ও আয়োজক, তাত্ত্বিক, প্রকাশক, পরিবারের সদস্য এবং অবশ্যই এঙ্গেলসকে লেখা চিঠিপত্তর। তার এসব লেখা যেমন তৎকালীন বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে রচিত, ঠিক তেমনি সেসব রচনা আবার সেসব ঘটনাকে নানা নির্দেশনাও দিয়েছে। তার রচনাবলিকে এ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ীই বিচার করা জরুরি, যে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে সেগুলো একরকম অবিচ্ছেদ্যই বলা চলে।

 

(লেখাটি মূলত পিটার সিঙ্গার রচিত মার্কস: আ ভেরি শর্ট ইন্ট্রোডাকশন বইটির প্রথম অধ্যায়ের অনুবাদ)