পবিত্র পরিবার

মার্কস তার ‘পবিত্র পরিবার’ (Holy Family) গ্রন্থে বলেছেন: সমাজবাদী তাত্ত্বিকরা যে সর্বহারাদের মধ্যে যুগান্তকারীর সন্ধান পেয়েছেন, তার কারণ এই নয় যে, তারা সর্বহারাকে দেবতা ভাবেন। বরং তার উল্টোটাই। মানুষ বলতে যা বোঝায়, এমনকি মনুষ্যত্ববোধ পর্যন্ত সর্বহারাদের মধ্য থেকে লুপ্ত হয়েছে। বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় সর্বহারারা মানুষেতর জীব। তার পরিবর্তে অবশ্য তার চেতনা জাগ্রত হয়েছে, এই অমানুষ সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণার শক্তি পেয়েছে।... এই শক্তির জন্যই সর্বহারারা নিজেদের মুক্ত করতে পারবে।....

দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো, সর্বহারারা কোন প্রক্রিয়ায় বিপ্লবী হয়ে ওঠে? অনেক মার্কসবাদীর মতে, পুঁজিবাদের মধ্যেই বিপ্লবী শ্রেণী নিহিত, যে প্রক্রিয়া পুঁজিবাদের সৃষ্টি ও গঠন করে সেই প্রক্রিয়াই সর্বহারার জন্ম দেয়। এদের মতে, এ প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ— যাকে মার্কস বলেছেন মূলধন গড়ে তোলার আদিম পর্যায় (pimitive Accumulation)— যখন উৎপাদনের হাতিয়ার শ্রমিকের হাত থেকে জোর করে রক্তপাত ঘটিয়ে, ছিনিয়ে আনা হয়। পুঁজিবাদের সম্প্রসারিত উৎপাদনক্ষমতা ক্রমেই বাড়তে থাকার ফলে সর্বহারার সংখ্যাও বাড়তে থাকে, তারাই সংখ্যায় প্রবল হয়ে ওঠে, আধিপত্য বিস্তার করে। এই সম্প্রসারিত উৎপাদনক্ষমতার মূল কারণ আপনারা জানেন, মজুরি শ্রমিকের সৃষ্ট উদ্বৃত্ত মূল্য পুঁজিপতিরা সঞ্চয় করতে থাকেন এবং এই সঞ্চয় ক্রমেই বাড়িয়ে আরো পুঁজি গড়ে তোলেন।

মার্কসীয় তত্ত্বের এই ব্যাখ্যা, সর্বহারার জন্ম ও সংখ্যাগত (quantitative) আধিপত্য সম্পর্কে কোনো আপত্তি থাকতে পারে না। কিন্তু এই ব্যাখ্যা কি সে বিষয়ে কোনো আলোকপাত করে যে, পুুঁজিবাদ ধ্বংস করার বৈপ্লবিক ভূমিকা সর্বহারাদের মধ্যে কী করে এল? এই ব্যাখ্যা যদি সে বিষয়ে কোনো আলোকপাত করে তাহলে বুঝতে হবে, সর্বহারারা জন্মমুহূর্ত থেকেই বিপ্লবী, বিপ্লব ঘটানোর জন্য প্রয়োজন শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতা। কারণ উৎপাদনক্ষমতা সম্প্রসারণের মধ্যে এমন কিছু নেই, যা সর্বহারাদের মধ্যে গুণগত (qualitative) পরিবর্তন আনতে পারে। এখানে বোঝা প্রয়োজন, মার্কসীয় দর্শনে সর্বহারা জন্মমূহূর্ত থেকেই বিপ্লবী নয়, পুঁজিবাদের ক্রমবিকাশের সঙ্গে সঙ্গে এই গুণ ক্রমেই তার আয়ত্তে আসে।

পুঁজিবাদ সম্পর্কে মার্কসীয় বক্তব্যের একটা দিক, যা অনেকেই জানেন, তবু এ প্রসঙ্গে মনে রাখা প্রয়োজনীয়। মার্কস বলেছেন: পুঁজিবাদ বিকাশের দুটি যুগ। ‘ক্যাপিটাল’-এর প্রথম খণ্ডের প্রথম ইংরেজি সংস্করণে সম্পাদকীয় ভূমিকায় এঙ্গেলস বলেছেন: অর্থনীতির ইতিহাসে দুটো বিরাট ও বিভিন্ন যুগ আছে: উৎপাদনের (Manufacture) যুগ, যখন কায়িক পরিশ্রম প্রধান; আর আধুনিক যন্ত্রশিল্পের (Modern Industry) যুগ, যখন যন্ত্রই প্রধান। দুই যুগকে আলাদা করে আছে শিল্পবিপ্লব— যে শিল্পবিপ্লবের কথা মার্কস বারবার বলেছেন— তার শুরু ১৭৩৫ সালে উইয়াটের সুতোকাটা যন্ত্রের উদ্ভাবনের সময় থেকে এবং যা ১৮২৫ সাল থেকে শিল্পজগতে বিরাট পরিবর্তন আনতে শুরু করে। এই ১৮২৫ সালে শিল্পের সংকট দেখা দেয়, যাতে ‘আধুনিক যন্ত্রশিল্প... এই প্রথম তার আধুনিক জীবনচক্র শুরু করল।’ (কের সম্পাদিত ‘ক্যাপিটাল’-এর প্রথম খণ্ড, পৃ.-১৮)।

পুঁজিবাদের বিকাশে এই দুই যুগের মূলগত পার্থক্য আমাদের আলোচনায় বিশেষ তাত্পর্যপূর্ণ। প্রথমটির বৈশিষ্ট্য উৎপাদন প্রক্রিয়ার নিজস্ব স্বরূপ, দ্বিতীয়টির বৈশিষ্ট্য এক যুগ থেকে আরেক যুগে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সর্বহারার চরিত্রের পরিবর্তন। এ প্রসঙ্গে এটা মনে রাখতে হবে, মার্কসীয় অর্থনীতি-তত্ত্বের স্থূল প্রত্যয়গুলো (Formal conceptions), যথা— স্থির ও পরিবর্তনশীল মূলধন, উদ্বৃত্ত মূল্য, সম্প্রসারিত উৎপাদনক্ষমতা ইত্যাদি দুই যুগেই প্রযোজ্য। তত্ত্বের বিচারে দুই যুগে কোনো পার্থক্য নেই, সেজন্যই বোধহয় দুই যুগের পৃথকীকরণ সম্পর্কে মার্কসবাদী অর্থনীতিকেরা উদাসীন থেকে গেছেন।

উৎপাদনের যুগ প্রাচীন কারিগরি শিল্পেরই উন্নত রূপ। এর লক্ষণ হলো, বহু দক্ষ শিল্পী একই সংস্থানে জড়ো হন এবং সেই সংস্থানে এমন সব বৃত্তিবিষয়ক উন্নত ব্যবস্থা চালু করেন, যা ‘গিল্ডে’র যুগে অকল্পনীয় ছিল। উৎপাদন যুগের সবচেয়ে বড়ো তাত্ত্বিক অ্যাডাম স্মিথ, যাকে বলেছেন শিল্পের বিশেষায়িত দক্ষতা (specialization of crafts) বা শ্রমবিভাগ— শিল্পের পৃথক পৃথক অংশ পৃথক পৃথকভাবে উত্পন্ন করা। এই ব্যবস্থা শ্রমের উৎপাদনক্ষমতা অনেক বাড়িয়ে দিল এবং সভ্যতার ইতিহাসে এটা একটা বিশিষ্ট ধাপ। কিন্তু এটা মনে রাখতে হবে, উৎপাদন পদ্ধতিতে প্রযুক্তিবিদ্যা (technology) ব্যবহারের ব্যাপারে উৎপাদনের যুগ কিন্তু রক্ষণশীল ছিল। তৎকালে চালু প্রযুক্তিবিদ্যার অধিকতর কুশলী ব্যবহারেই উৎপাদনক্ষমতা বেড়েছিল, নতুন প্রযুক্তিবিদ্যার সৃষ্টিতে নয়। যাকে আমরা প্রায়ই বলি উদ্ভাবনা, সেই নতুন প্রযুক্তিবিদ্যার ব্যবহার উৎপাদন যুগের সৃষ্টি নয়। তাই মার্কসের কথায়, ‘ইতিহাসে দেখি, শ্রমবণ্টন হচ্ছে উৎপাদনের যুগের বৈশিষ্ট্য, যা অভিজ্ঞতার পৌনঃপুনিক ব্যবহারে সার্থক হয়ে ওঠে। অনেকটা যেন অভিনেতার অজান্তেই ঘটনাটা ঘটে গেল। যদিও গিল্ডের কারিগররা সেই ব্যবহারকে আঁকড়ে ধরে শতাব্দীর পর শতাব্দী কাটিয়ে দিলেন। (ঐ, পৃ.-৩৯৯)। এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে, উৎপাদন যুগে উদ্ভাবনা মোটেই হয়নি অথবা এ যুগের সংস্কৃতি বা চিন্তাধারা নতুন উদ্ভাবনার উপযোগী ছিল না। যদি তা সত্য হতো, তাহলে যেখানে যে সময়ে শিল্পবিপ্লব হয়েছিল, তা কখনই হতো না। এর অর্থ শুধু এই, নতুন উদ্ভাবনা উৎপাদন পদ্ধতি থেকে অনিবার্যভাবে আসেনি, বরং পুরনো পদ্ধতির ভক্তদের কাছ থেকে নতুন উদ্ভাবনার বিরুদ্ধে প্রবল বাধাই এসেছে। আবিষ্কারের গতিতে এই অনুকূল ও প্রতিকূল আবহাওয়া থেকেই অ্যাডাম স্মিথের এ ধারণা জন্মায়, যেটা ন্যাথান রোজেনবার্গ (Nathan Rosenberg, ‘Adam Smith on the Division of Labour’, Economica, May 1965) দেখিয়েছেন, তাত্পর্যপূর্ণ উদ্ভাবনা শ্রমিক বা পুঁজিপতির অবদান নয়, এ হলো সেই ‘দার্শনিকদের’ অবদান, যারা উৎপাদন পদ্ধতি থেকে বহুদূরে অবস্থিত।

উৎপাদন যুগের শ্রমিকরা এই যুগের বিশেষ উৎপাদনক্ষমতার সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছিলেন। নানা ধরনের কারিগরি জ্ঞান এদের ছিল, বহুসংখ্যায় জড়ো হয়ে এরা এক সংস্থানে কাজ করতেন, পিতা থেকে পুত্রের মধ্যে এই জ্ঞান সঞ্চারিত হতো। এ যুগের সর্বহারার বৈশিষ্ট্য হলো তার শ্রেণী সম্পর্কে চেতনা নয়, বরং কারিগরি জ্ঞান সম্পর্কে চেতনা। এই কুশলী কারিগররা প্রায়ই সংস্কারাচ্ছন্ন, উদ্ধত, অসংযত, দাম্ভিক হতেন, পুঁজিবাদের সঙ্গে যুদ্ধ করার ক্ষমতা এদের ছিল না। তাদের দৃষ্টি সংকীর্ণ, উৎপাদন ব্যবস্থার পুরো চিত্র সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না, সেখানে তাদের স্থান কোথায় সে বিষয়েও কোনো বোধ ছিল না। সুতরাং এর পরিবর্তন সাধনের জন্য যে অবিরাম যুদ্ধের প্রয়োজন, তা করার যোগ্যতাও তাদের ছিল না। উৎপাদন যুগে পুঁজিবাদ উৎপাদন পদ্ধতির ব্যাপারে রক্ষণশীল এবং রাজনীতিক ও সামাজিক পরিবর্তনবিরোধী ছিল।

মার্কসের মতে, যন্ত্রপাতির নিয়োগ শুরু হয় তখনই, যখন যন্ত্র মানুষের হাত থেকে বিযুক্ত হয়ে একটা যান্ত্রিক পদ্ধতির সঙ্গে যুক্ত হয়। (দ্র. পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃ.-৪০৮)। এই যন্ত্র সবকিছুই পাল্টে দিল। শিল্পের এক শাখায় যন্ত্রের আমদানি হলে, অন্যান্য শাখায়ও তা ক্রমেই যুক্ত হতে থাকল এবং শেষের দিকে যন্ত্রই উৎপাদন ব্যবস্থার প্রধান অঙ্গ হয়ে উঠল। এ সম্পর্কে মার্কসের বক্তব্য: শিল্পের এক অংশে উৎপাদন পদ্ধতির আমূল পরিবর্তন এলে অন্যান্য অংশেও পরিবর্তন আসতে বাধ্য। এটা প্রথম ঘটে শিল্পের সেইসব অংশে, যেসব অংশে, শ্রমবণ্টনের ফলে, একই ক্রিয়ার বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরস্পরের সঙ্গে সংযোগবিহীন উপক্রিয়া আছে। প্রত্যেকটি উপক্রিয়া আলাদাভাবে পণ্যের অংশগুলো উৎপাদন করে। যেমন যন্ত্রে সুতো কাটা হলে সুতো বোনাও শেষ পর্যন্ত যন্ত্রে হতে বাধ্য। সুতো বোনায় যন্ত্র এলে কাপড় সাদা করায়, ছাপায়, রঙ করায়ও আমূল যান্ত্রিক ও রাসায়নিক পরিবর্তন আসে। সুতোকাটায় পরিবর্তন আসার ফলে জিন আবিষ্কারে উৎসাহ এল— জিন দিয়ে তুলো থেকে বীজ আলাদা করা সুসাধ্য হলো, সুতোর উৎপাদন বর্ধিত পরিমাণে করা সম্ভব হলো। কিন্তু তার থেকেও বড় কথা হলো, শিল্প ও কৃষিতে উৎপাদন পদ্ধতিতে এই বিপ্লবের ফলে উৎপাদনের অন্যান্য অঙ্গে, যাতায়াতের পথে, যোগাযোগসূত্রেও আমূল পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠল। জাহাজ ইত্যাদি তৈরিতে পরিবর্তন এল, বার্তা প্রেরণ, যাতায়াতে এই নতুন যান্ত্রিক কৌশল যন্ত্রশিল্পের প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী গড়ে উঠল, যথা— স্টিমার, রেল, জাহাজ, টেলিগ্রাফ। কিন্তু বৃহৎ পরিমাণে লোহা তৈরি করতে হলে, তাকে পিটিয়ে, কেটে, ছেনে, নতুন আকারে গড়তে হলে যে বড় বড় যন্ত্রের দরকার, উৎপাদন যুগের কারিগরিবিদ্যা সেসব বিষয়ে অচল।

আধুনিক শিল্পে সেজন্য দরকার যন্ত্র এবং যন্ত্র তৈরি করার যন্ত্র, যা পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার হাতিয়ার। যতদিন এটা আসেনি, ততদিন যন্ত্রশিল্পের— প্রযুক্তিবিদ্যার দিক দিয়ে— ভিত তৈরি হয়নি, স্বাবলম্বন ঘটেনি। ক্রমবর্ধমান ব্যবহারের মধ্য দিয়ে যন্ত্র এই শতাব্দীর প্রথম কয়েক দশকে অন্যান্য যন্ত্রের উদ্ভাবনায় সাহায্য করল। বিশেষ করে রেল এবং সমুদ্রগামী জাহাজে বিরাট উন্নতির ফলে, ১৮৬৬ সালের পূর্ববর্তী দশকে, দানবাকৃতি যন্ত্র (পুপষড়ঢ়বধহ সধপযরহবং) অপরিহার্য হয়ে উঠল। এই যন্ত্রপাতি হয়ে উঠল নতুন যুগের দিকনির্দেশক। (দ্র. পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃ. ৪১৯-৪২০)।

প্রযুক্তিবিদ্যার দিক থেকে পুঁজিবাদ উৎপাদন যুগে ছিল সংরক্ষণশীল এবং বিপ্লবের পরিপন্থী। আধুনিক যন্ত্রশিল্প এই দুয়েরই বিপরীত। দক্ষ কারিগরের কৌশল বা কোনো উদ্ভাবকের দাক্ষিণ্যের ওপর নির্ভর না করে প্রযুক্তিবিদ্যা এসে গেল নতুন বৈজ্ঞানিকের অধিকারে। মার্কসের পাণ্ডিত্যপূর্ণ ‘যন্ত্র ও আধুনিক শিল্প’ অধ্যায়ে এটাই মূল বিষয়বস্তু এবং এ অধ্যায়টিই ‘ক্যাপিটাল’-এর প্রথম খণ্ডকে যুগান্তকারী আখ্যা দিতে যথেষ্ট ছিল: কারখানায় অনুসৃত এই পদ্ধতি, যে পদ্ধতি উৎপাদন পদ্ধতিকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে বিভক্ত করে— এবং তজ্জনিত সমস্যা জন্মালে তার সমাধান করে যান্ত্রিক রাসায়নিক প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের নতুন নতুন পদ্ধতির মাধ্যমে— সেই পদ্ধতিই যন্ত্রশিল্পের উৎপাদন ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য। (দ্র. ঐ, পৃ.-৫০৪)।

যে পর্দা উৎপাদন ব্যবস্থার সামাজিক পদ্ধতিকে, শুধু বাইরের মানুষের কাছ থেকে নয়, শ্রমিকের কাছ থেকেও আড়াল করে রাখে, যার ফলে উৎপাদন ব্যবস্থার বিভিন্ন ক্ষুদ্র অংশকে আপাতদৃষ্টিতে ধাঁধা মনে হয়, যন্ত্রশিল্প সেই পর্দাকে ছিঁড়ে ফেলল। প্রতিটি ধাঁধা সমস্যার পথ হলো, সেটা মানুষের হাতে কীভাবে তৈরি হবে, সে বিষয়ে নির্ভর না করে উৎপাদনের বিভিন্ন ভাগগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে তৈরি করা। ফলে জন্ম হলো নতুন প্রযুক্তিবিদ্যার। এই বিচিত্র, আপাতদৃষ্টিতে পরস্পরের সঙ্গে সংযোগবিহীন, নিষ্প্রাণ উৎপাদন পদ্ধতির লক্ষ হলো, সচেতনভাবে, পরিকল্পিতভাবে কীভাবে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানকে মানুষের কাছে লাগান যায়। (দ্র. ঐ, পৃ.-৫৩২)।

এর থেকে সিদ্ধান্ত হলো: আধুনিক শিল্প কোনো চলতি পদ্ধতিকে চরম বলে গণ্য করে না, স্বীকার করে না। সুতরাং এই শিল্পের প্রকরণগত (ঃবপযহরপধষ) ভিত্তি বিপ্লবাত্মক; আর পূর্ব-অনুসৃত পদ্ধতি ছিল রক্ষণশীল। (দ্র. ঐ, পৃ.-৫৩২)।

এই উৎপাদন পদ্ধতির সামাজিক ভিত্তি সম্পর্কে মার্কস মনে করতেন, আধুনিক যন্ত্রনির্ভর পুঁজিবাদী সমাজও কম বিপ্লবী নয়— উৎপাদন যুগের পুঁজিবাদী শিল্প ব্যবস্থার ঠিক বিপরীত। উৎপাদন যুগের ভিত্তি যে কারিগরি শিল্প তা উত্খাত করে দিল এই যন্ত্র, ফলে কারিগরদের নানাবিধ দক্ষতাও অকেজো হয়ে দাঁড়াল। দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল কারিগরি শিক্ষাও প্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়াল, বয়স্ক পুরুষ শ্রমিকের শ্রমমূল্য সস্তা হয়ে পড়ল। অন্যদিকে দ্রুত কাজ করার ক্ষমতার, যন্ত্রের সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার ক্ষমতার মূল্য বাড়ল— মেয়েদের ও শিশুদের পক্ষেও কাজ পাওয়া সহজ হয়ে উঠল। শ্রমিক সংখ্যা অগণিত হয়ে উঠল। এটা আরো বাড়ল, তার কারণ: ১. শিল্পসংস্থায় যন্ত্রের ভিত পাকা হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতির নতুন শাখা-প্রশাখা বাড়ল, পুরনো শ্রমিকরা অপ্রয়োজনীয় হয়ে উঠল এবং তারা বেকারদের বাজারে মিশে গেল; এবং ২. শিল্পক্ষেত্রে যন্ত্রের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে চালু চাকরির সংখ্যা কমতে লাগল। মূলধন যদি বাড়তে না থাকে, তাহলে সম্ভাব্য চাকরির হারও কমতে থাকল।

সংক্ষেপে, যন্ত্রপাতির ফলে একদিকে শ্রমিকের উৎপাদনক্ষমতা বর্ধিত, সমশ্রেণীভুক্ত (যড়সড়মবহরুবফ) ও উৎপাদনে ব্যয়হ্রাস ঘটল, অন্যদিকে শ্রমিকের শ্রমের চাহিদার হার কমে গেল। ফলে পুঁজির সঙ্গে শ্রমের সম্পর্কে আমূল পরিবর্তন এল, পুুঁজির তাতে সুবিধাই হলো। মজুরির হার কমতে কমতে যা নেহাৎ না হলেই নয় বা তারও নিচে নেমে এল, কাজের সময় অভাবনীয়রূপে বাড়তে লাগল; যন্ত্রের গতির সঙ্গে তাল রেখে চলতে শ্রমিক বাধ্য হয়ে উঠল। এভাবে পুঁজির আদিম সংগঠন (primitive accumulation) দিয়ে যে বলিদান শুরু হয়েছিল, পুঁজির চাপে যন্ত্র এসে শ্রমের সেই বলিদান সম্পন্ন করল। শুধু মার্কসের চিন্তা অনুযায়ী সর্বহারার জন্মদাতা পুঁজিবাদই নয়, একে বলা চলে পুঁজিপতি কর্তৃক যন্ত্রের ব্যবহার। [সংক্ষেপিত]

 

অনুবাদ : নিত্যপ্রিয় ঘোষ