আজ যাদের নিয়ে লিখতে বসেছি, তাদের নিয়ে লিখতে গেলেই আমার মাথায় গুনগুন করে গীতা দত্তের মাদক গলায় সাহেব-বিবি-গোলাম সিনেমার গান। সাদা-কালো স্ক্রিনজুড়ে মায়াময়ী মীনাকুমারী চোখে আঙুল দিয়ে কাজল দিচ্ছেন, উঁচু পালঙ্কে বসে ধূপের ধোঁয়ায় শুকোচ্ছেন কুঞ্চিত কেশ, ডুরে শাড়ি বদলে জরিপাড় শাড়ি পরছেন আর গাইছেন— ‘পিয়া অ্যায়সো জিয়ামেঁ সামায় গায়ো রে’। মনভোলানিয়া সাজগোজ করে স্বামীর প্রতীক্ষা করছে কুলবধূ— পুতুল খেলার বয়সে যেসব মেয়ের বিয়ে হয়ে যেত, গায়ে হলুদের তত্ত্বে যারা প্রচুর পুতুল উপহার পেত, স্বামীই যাদের বাকি পুতুল খেলার একমাত্র উপলক্ষ। কল্যাণী দত্ত লিখেছেন পুরনো দিনের গানের কথা—
‘আয় লো আয় সাধের সই, খেলার সাজ নিয়ে
আর তো খেলব না খেলা পরের ঘরে গিয়ে।’
পুতুলের বিয়েতে আসত রুপার বাসন-সোনার গহনা-নানান তত্ত্ব (পূর্ণিমা দেবী)। রাতভর দাসীর সঙ্গে পুতুল খেলে আর জরির জামা গড়ে সেসব মেয়ের একজন (পটেশ্বরী বৌঠান তথা বাড়ির মেজ বউ) ভুলত স্বামীর বেশ্যাগমনের শোক। এই সেকাল। সেকালের ১৩ বছরের কুন্দনন্দিনীর বর্ণনা দিতে গিয়ে বিষবৃক্ষে বঙ্কিমচন্দ্র লিখছেন, ‘অনেক জিনিসের কাঁচারই আদর। নারিকেলের ডাবই শীতল... স্ত্রীজাতিও বুঝি কেবল কাঁচামিঠে।’ জ্যৈষ্ঠ মাসের ১৫ তারিখে আম পাকে কিনা, এ ধরনের অশ্লীল বাদানুবাদ বাংলার সেরা পণ্ডিতরাই উত্থাপন করে গেছেন, বাঙালির কিশোরীপ্রীতির জুড়ি মেলা ভার। হায়, সদর তথা বৈঠকখানার বাবুরা ছিলেন এ লেখার মূল প্রসঙ্গ, তড়িঘড়ি অন্দরে ঢুকে গেলাম। সদরে যাওয়ার আগে আর ক’টি কথা বলে নিই।
হুইগ হিস্টোরিয়ানরা মনে করতেন, ইংরেজদের লোভ, শঠতা ও নিরপরাধের রক্তপাতই ছিল ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তি। বহু ইংরেজ ঐতিহাসিক ইংরেজ শাসনকে মাহাত্ম্যের পরাকাষ্ঠা হিসেবে দেখাতে ভালোবাসলেও মূল চিত্রটি ভিন্ন। প্রাক-ব্রিটিশ অরাজকতার পটভূমিতে একটি বহিঃশক্তির আগমন ও উপনিবেশ নির্মাণের এ সময়কালটি আন্তর্জাতিক অসহিষ্ণুতা-সংঘাত-অবিমৃষ্যকারিতার সময়। ঔপনিবেশিক শক্তি চায় শক্তিশালী সমর্থক, তাই মধ্যস্বত্বভোগী জমিদার-রাজা বাহাদুর-নবাবদের উত্থান ঘটেছিল এ পথপরিক্রমায়। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে এদের হাতেই গেল জমির মালিকানাস্বত্ব। ঔপনিবেশিক শক্তির মদদে রায়তের রক্ত শোষণ করে গড়ে উঠেছিল এদের পুঁজির পাহাড়। বঙ্কিমচন্দ্রের কৃষ্ণকান্তের উইলে আমরা শুনতে পাই জমিদারের মুনাফালব্ধ আয় প্রায় ২ লাখ টাকা। যেমন প্রজাবশ্যতা, তেমনি টাকা। পল্লীগ্রামের নিস্তরঙ্গ পরিসরে এ উদ্বৃত্ত অর্থ খরচ করার যথেষ্ট সুযোগ ছিল না বিধায় তারা পা বাড়িয়েছিলেন শহরের দিকে, ‘কবুতর উড়িয়ে, মোরগবাজি করে, সতরঞ্জ খেলে বা স্রেফ ঘুমিয়ে’ দিন কাটাতেন। তাদের চরিত্র হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে ছিল একই রকম। মীর মশাররফ হোসেন উদাসীন পথিকের মনের কথায় এসব শোষক জমিদারের চিত্র আঁকতে গিয়ে দেখাচ্ছেন, জমিদার নীলকরকে তারিফ করে ‘দেশের রাজা’ ডাকছেন আর প্রত্যুত্তরে নীলকর জমিদারকে ‘যথার্থ বাবু’ বলে তারিফ করছেন। যথার্থ বাবুরা কেউ মসনদ ধরার কারবার করেন, কেউ সাহেবের ভাবভঙ্গি ধরে দোভাষীর কাজ করেন, আবার কেউ কেউ বিশুদ্ধ ব্যবসা করে বড়লোক হয়েছেন এমনও আছেন। বিনা পরিশ্রমে রোজগার করতে পারলে আরো ভালো। শ্রীপান্থর নিজের ভাষায়, “সর্বত্র এই ‘বাবু’র জয়ঢাক। সাহেবেরা তাঁকে ‘বাবু’ বলেন, মোগলরা (!) তাঁকে ‘বাবু’ বলেন, নর্তকীরা তাঁকে ‘বাবু’ বলেন। তিনি ভিন্ন জগৎ অন্ধকার।”
শ্রীপান্থ আরো জানাচ্ছেন, সেকালের এ বাবুরা স্থায়ী হলেন কলকাতার ব্ল্যাক টাউনে। বিরাট চৌহদ্দিতে বিশাল বিশাল ঘর, বৈঠকখানা, অন্দরমহল, খাজাঞ্চিখানা, তোষাখানা, আস্তাবল। সরু সরু গলি আর এলোপাতাড়ি বাড়ি, অগুনতি ডোবা আর গাছপালা, কাঁচা নর্দমার ঘ্রাণে পরান যায় যায়। এ শহরের নর্দমায় মরে দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষ, তাদের সত্কারের দায়িত্ব শেয়াল আর শকুনের। তার পরও এখানে আসল স্বর্ণের গহনায় সালঙ্কারা দুর্গা প্রতিমা বিসর্জন দেয়া হয় জমিদারের লেঠেলদের তত্ত্বাবধানে; যাত্রা, কবিগান, বুলবুলির লড়াই, বিড়ালের বিয়ে, সঙের মিছিল ইত্যাদি ক্রীড়াকৌতুক চলে। বক্সওয়ালা ডেকে যায় গলি দিয়ে, বাঁদরের খেল দেখিয়ে যায় কেউ, ভিস্তিওয়ালারা পানি ফেরি করে চামড়ার মশকে, কেউ ডাক দেয়— ‘মিশি লেবে গো’, কেউ ‘কুয়োর ঘটি তোলাবে গো’, কেউ বেচে সরাগুড়-তিলকুটো সন্দেশ-মুকুন্দ মোয়া কিংবা ঘোল। মুসলমান ফেরিওয়ালা বেচে বিলিতি চুড়ি-কাচের খেলনা আর সাবান। রসরাজ অমৃতলাল বসু উল্লেখ করেছিলেন গড়ের মাঠের কেল্লা থেকে ভোরবেলা তোপ পড়ার শব্দের কথা, সেই তোপের শব্দের আগে গলিতে গঙ্গাস্নানে চলা বুড়ি গিন্নিদের কোলাহলে জেগে ওঠার কথা। জনহিতকর কাজের শোরগোলও ওঠে সরু গলিগুলোয়, চলে মাতৃশ্রাদ্ধ, গুরুপ্রসাদী আর কুটুমের কাছে বারো মাসই হরেক তত্ত্ব পাঠানো। সাহেবদের পাঠানো হয় ডালি (সাহেবরা তাকে ডাকে ‘ডলি’), সেই ডালিতে ফলমূল-হাঁস-মুরগি থেকে শুরু করে সুরা, হীরার আংটি, কাশ্মীরি শাল ইত্যাদি থাকে। উৎসবে-পার্বণে বাইজি নাচ চলে বাগানবাড়িতে বা নাচঘরে, স্বনামধন্যা বাইজিরা আসেন কাশ্মীর-আগ্রা-লক্ষৌ-ব্রহ্মদেশ থেকে। বাবুর দয়ার শরীর, ননী-মাখন খাওয়া নরম শরীর বলে তিনি ঢাকাই ধুতির একদিকের পাড় ছিঁড়ে পরেন যেন কোমরের চামড়ায় ব্যথা না পান; শৌখিন জমিদার গালিচার তলা মুড়ে দেন সন্দেশে যেন নাচের সময় কঠিন ধরণী বাইজির পায়ের তলায় না বাজে। এদিকে শহরে সতীদাহ নিষিদ্ধ করার পরেও পুড়িয়ে মারা হচ্ছে বিধবাদের, চিতার ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন শহর। কলকাতার ‘বাবু’রা তখন সতীদাহের পক্ষে অথবা বিপক্ষে উভয়ের আর্জিতে দস্তখত করেন। এ বাবুরা মুক্তাভস্মে আর দুধে সিদ্ধ সুপারি কুচি দিয়ে পান খান, কেউ পলাশীর প্রান্তর বেচে দেন, কেউ সারা কলকাতা নিমন্ত্রণ করে দুর্গোৎসবকে প্রমোদোৎসবে পরিণত করেন। সেকালের কলকাতার রাজবাড়িতে দুর্গোৎসবে অভ্যর্থনা করা হচ্ছে ভিক্তর জ্যাকমঁর। তিনি লিখছেন, ‘দেশীয় বাড়ির চেয়ে বিশ্রী হতচ্ছাড়া আর কিছুই নেই; অপরিসর, নিচু, লম্বা লম্বা ঘর ভিতরের দিকে মুখ করা, চত্বরের চারধারে আর ঘরগুলোর সামনে কাঠের খুঁটির উপরে দাঁড়িয়ে আছে অপরিসর বারান্দা। এখানে ওখানে কোনো কোনো দামী আসবাব, কিন্তু বড় নিম্নরুচির। ঘেঁষাঘেঁষি করা জিনিসপত্র, কোনো সাধারণ ইয়োরোপীয়ের ঘরেও যাদের স্থান হবে না।’ গগনেন্দ্রনাথের কন্যা লিখেছেন এসব তিন বা চার কড়ির ঘরের কথা, সদরের দিকে এক দরজা আর অন্দরের দিকে আরেকটি, অন্দরের দিকের অলিন্দ অন্ধকার— চিক ঝোলানো সরু পথ... সেখানে চারুবালা এসে নিজেকে মনে করিয়ে দেয় তার খেলুড়ি প্রেমিক অমল আর আসবে না, সেখানে অতর্কিতে যৌন আগ্রাসনের শিকার হয় শ্যামা কিংবা বিমলা। বৈঠকখানার তিন-চারটে বড় জানালার মাথায় সস্তা লাল-নীল কাচ বসানো; ঘরের সামনে শান বাঁধানো রক, ঘরের দেয়ালে গ্র্যান্ডফাদার্স ক্লক আর রঙতুলিতে আঁকা গোলাপ ফুল আর জোড়া পাখি। আবার বিষবৃক্ষে ফেরত যাই, লোহার ফটক দিয়ে নগেন্দ্র দত্তের বাড়িতে ঢুকতে হয়, ভেতরে লাল বাঁধাই রাস্তা আর বাগান, ডাইনে বাঁয়ে দপ্তরখানা আর কাছারিবাড়ি, তোষাখানা আর ভৃত্যমহল। কাছারির পাশে পূজার দালান, পাকশালা, অতিথশালা। মূল রাস্তার সামনে দেড়তলা বৈঠকখানায় সিঁড়ি দিয়ে উঠতে হয়, সমুখের বারান্দায় ফ্লুটেড স্তম্ভ আর সিংহমূর্তি, মার্বেলের মেঝে। বসবার ঘরে চন্দ্রপুলির আকারের কৌচ আর অটোমান চৌকি, বেলোয়ারি ঝাড়বাতি আর দেয়ালগিরি, পুরু গালিচা মেঝেয়, টেবিলে বিলিতি মূর্তি-ডিক্যান্টার— খাসগেলাসের শৌখিন পানপাত্র।
রবীন্দ্রনাথের চোখের বালিতে শিক্ষিত বাবুদের বাড়ির শোয়ার ঘর নজরে পড়বে। শোয়ার ঘরসংলগ্ন ঢাকা বারান্দায় সস্তায় কোকিল পোষার জন্য ঝুলত চীনে কারিগরের তৈরি খাঁচা, তাতে কোকিল ডেকে ওঠে বারো মাস। সেই পোষা পাখিদের কেউ কেউ ধান আর কাঁকনিদানা খেত, কেউ খেত লুচি-ক্ষীর বা সেঁকে নেয়া ফুলকপির ফুল, কেউ গ্রীষ্মে খেত বেলের পানা। বিনোদিনী টিপাইয়ের দুই ধারে কাঁসার গেলাসে ক’টি ফুল আর পাতার তোড়া সাজিয়ে রেখেছে (‘ঘরে-বাইরে’র বিমলা অবশ্য চুমকি ঘটির কদর বোঝে না, তার ফুলদানি বিলিতি কাচের), চন্দনগুঁড়া ও ধুনার গন্ধে মহেন্দ্রর ঘর আমোদিত, খাটের সামনে দুটি বড় আলনায় কাপড় ঝুলিয়ে দিয়ে আড়াল করে রাতে শোবার খাট আর মেঝেয় বসার খাট আলাদা করা। মেঝেয় অর্থাৎ নিচে বসার বিছানায় শুভ্র জাজিম তকতক করছে, তাতে রেশম ও পশমের ফুলকাটা বিলিতি চৌকা বালিশ সুসজ্জিত। দেয়ালের ফটোগ্রাফের ফ্রেমের চার কোণে রঙিন ফিতে দিয়ে সুনিপুণভাবে চারটি গ্রন্থি বাঁধা। একটি আলমারিতে শখের জিনিস আর চীনে খেলনা সাজানো, তার কাচের দরজায় লাল সালু কুচিয়ে দেয়া পর্দা। মশারিতে গোলাপি রেশমের ঝালর লাগানো, বালিশগুলোর তুলোর সঙ্গে প্রচুর পরিমাণে নাগকেশর ফুলের রেণু আর আতর মেশানো। বিকেলের জলখাবারে দাসী রুপার রেকাবিতে ফল ও মিষ্টি এনে দেবে, সঙ্গে কাচের গ্লাসে বরফ দেয়া আনারসের শরবত। বহু পারিপাট্য আর অভিনব যত্নে রচিত গৃহপট। ঘরে-বাইরেতে এ অন্দরের একটি নিভৃতিতে সোপানশ্রেণি বেষ্টন করে আছে সামান্য আঙিনা, সেই সিঁড়িগুলোয় সারি সারি চন্দ্রমল্লিকা, বাইরের হাতছানিতে বিবশ অন্দরলোকের বাসিন্দাদের একটু আন্তরিক বিশ্রামের অবকাশ সেই প্রাঙ্গণ। মানভঞ্জনে শোয়ার ঘরের দেয়ালে নানান বেশ এবং বিবেশবিশিষ্ট বিলেতি নারীর এনগ্রেভিং টাঙানো, শীলদের ত্রিতল বাড়ির ছাদটি উঁচু প্রাচীর দিয়ে বেষ্টন করা, তবে সেই ইটের দেয়ালের কিছু কিছু ইট সরানো— সেখান দিয়ে গিরিবালা বহির্জগত্টাকে চট করে একটু দেখে নেয়।
এবার আসি অন্দরমহলে, তার যে অপূর্ব বিবরণ বঙ্কিমচন্দ্র দিয়ে গেছেন, তাতে অজস্র জ্ঞাতিকুটুম্ব, আশ্রিতা, ভিক্ষার্থিনী বৈষ্ণবী, আর উচ্ছিষ্টলোভী বেড়াল-কুকুর, অমৃতজ্ঞানে লাউ-কুমড়ো-পটোলের খোসা চিবোতে থাকা গাভী ইত্যাদির সমাহার। যৌথ পরিবারের যে চিত্র সেখানে দৃশ্যমান হয়, তা রবীন্দ্রনাথের স্ত্রীর পত্রের মৃণালের ভাষায় রেশমের কাজ বা এম্ব্র্রয়ডারির উল্টো পিঠের মতো, তাতে অজস্র গিঁট, তাতে সৌন্দর্যের অন্তরালের বেআবরু কুটিলতা। অন্দরের মেয়েরা শীত-গ্রীষ্ম সারা বছর ভোর ৪টায় উঠে বাসি জলে স্নান করতেন, তুলসী গাছে জল ঢেলে ঠাকুর প্রণাম সেরে রান্নাঘরে ঢুকতেন। বেরোতেন বেলা ২টা নাগাদ, ৩টার আগে তাদের ভাত খাওয়ার ফুরসত হতো না। খাওয়ার সময় ভাতের পাতে জুটত ছ্যাঁচড়ার কাঁটা আর অম্বলের তলানি। বিধবাদের কপালে উল্কি, গলায় তুলসীমালা বা রুদ্রাক্ষের মালা, ছোট করে ছাঁটা চুল, তিরিক্ষি মেজাজ, একবেলার বরাদ্দ ভাত— রাতে ছোলাগুড় বা সাবু। সারাদিন কাঁথাখানি সেলাই করে, ধামা-কুলো ইত্যাদি মেরামত করে, অজস্রবার স্নান করে আর ছোঁয়াছুঁয়ি বাঁচিয়ে নানান আচারবিচারের খুঁটিনাটি মেনে এদের জীবন কাটত। মেয়েরা গায়ে জামা দিত না বহুদিন, সুতির ডুরে শাড়ির খুব চল ছিল, যেমন খড়কে ডুরে-চৌখুপি ডুরে-আড়া-গঙ্গাজলি ডুরে; পরে উনিশ শতকের শেষদিকে জমিদারগিন্নি গিরিবালা দেবীর রায়বাড়ি উপন্যাসে মেয়েরা পরছে লেস আর ভেলভেটের জ্যাকেট। রায়বাড়ির মেয়েরা বুটিদার ঢাকাই শাড়ি আর শান্তিপুরি কল্কাদার শাড়ি পরছে, পরছে পার্শি আর বোম্বাই শাড়ি। সেকালের গিন্নিরা বারো-ষোলো-বিশ ভরির মকরমুখো বালা কি অমৃতিপাকের বালা পরে দিব্যি ঘরকন্নার সমস্ত কাজ করছেন। তবু অন্দরে অল্পবয়সী মেয়েদের ব্রত ভরে আছে স্বামী-পুত্রের আকাঙ্ক্ষায়— ‘রাজরাজ্যেশ্বর স্বামী চায়’, ‘হবে পুত্র মরবে না’, ‘পুত্র দিয়ে স্বামীর কোলে মরণ হয় যেন গঙ্গাজলে’, ‘কোলে কমল পুত্র পায়’, ‘সভা-আলো জামাই চাই’ ইত্যাদি। ছেলে সন্তান জন্মালে আটকৌড়ে, ষষ্ঠী পূজা, জন্মতিথি, হাতেখড়ি ইত্যাদি আনন্দ অনুষ্ঠান, কি না! ছেলে জন্মালে মাটি উঁচু হয় সাত হাত আর মেয়ে জন্মালে ভিটেমাটি বসে যায়, তাই মেয়েশিশুর আগমনে শাঁখটুকুও বাজে না। যাদের ঘিরে অন্দরের সেই অনন্ত কর্মপরিক্রমা, তারা সকাল ৬টা নাগাদ বিছানায় চা খেতেন। পরে মুখ ধুয়ে খেতেন চাঁদের মতো ফুলকো লুচি আর চাঁদের সাতাশ স্ত্রীর মতো ভাজাভুজির প্রাতরাশ। ঘুমিয়ে কাটানো বাবুরা রাত জাগতেন, বেলা ৩টা নাগাদ সেই বাবুরা প্রাতরাশ করতেন, অন্তত ২৫ রকমের খাদ্য রুপার পাত্রে পরিবেশিত হতো বাবুর সামনে, খাবারের তালিকায় থাকত চিংড়ির পোলাও, রুই মাছের কালিয়া, গলদার মালাইকারি এবং অবশ্যই ভাপা ইলিশ। চাকরি ও ব্যবসায় আছে এমন বাবুদের ছিল ৮টা বাজলে আপিস-কাছারির তাড়া। মেয়েরা হাতে হাতে জোগান দেবে জল-গামছা-পানমশলা-রুমাল-পালিশ করা জুতো-ডিবে। ভরদুপুরে বাড়ি ফিরলে শুরু হয়ে যেত তোয়াজ, একটু জিরিয়ে তালপাখার হাওয়া খেয়ে নুন-জিরেভাজা দেয়া আমপোড়া শরবত বা কুলফির বরফ দেয়া দইয়ের শরবত বা আতা-লিচু বা তরমুজের শরবত খেতেন বাবুরা। গরমকাল হলে কালো পাথরের বাটিতে আমের মুকুল ছিটিয়ে সুগন্ধি করে তাতে চিনি না দেয়া দই আর ভেজা সরু চিঁড়ে।
বাইরে ‘বাবু’দের দুনিয়ায় অনেক সংঘাতে সংক্ষুব্ধ হচ্ছে কলকাতা, জুরিতে বসার অধিকার-সম্পত্তি রক্ষার তাগিদ-প্রশাসনে শরিকানা ইত্যাদি পাবলিক ইস্যুতে সরগরম শহর; আঠারো শতকের বাবুয়ানা ছিল নবাবিয়ানা, নেশা ছিল তুড়ি-ঘুড়ি-বুলবুলি আর মামলা-মোকদ্দমা, ‘উনিশ শতকীয় বাবুয়ানার (তথা সাহেবিয়ানার) নতুন শর্ত ‘বিদ্যা’ আর নতুন নেশা সভা; কিন্তু অন্দরে এসবের ঢেউ অনুরণন তুলতে ঢের বাকি। রাজা রামমোহন এ শহরে জোব্বার আড়ালে ছুরি নিয়ে ঘুরতে বাধ্য হয়েছিলেন সতীদাহ নিরসনের দাবি তোলার পর থেকে, সহমরণ বা অনুমরণ আইন করে দেয়ার পর অনেক কমছে, বহুগমন কমছে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এসেছেন বাঙালির জীবনে, বিধবা বিবাহের আওয়াজ উঠছে, শিশু বিবাহ রদ করা হচ্ছে। বিধবাকে ঠিক পুড়িয়ে মারা হচ্ছে না, তবে সে তখনো সমাজের চোখে দেবতাকে উৎসর্গীকৃত শিশিরাপ্লুত শেফালি, বাসরসজ্জার ফুল নয় (প্রতিবেশিনী— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)। তাকে প্রণয়ের অধিকার দিয়েও বঙ্কিমচন্দ্র অন্যায়ভাবে তা কেড়ে নিয়েছিলেন (কৃষ্ণকান্তের উইল, বিষবৃক্ষ), রবীন্দ্রনাথ তাকে দিয়ে শেষ পর্যন্ত প্রণয়ীর প্রণাম অব্দি নিতে বাধ্য করলেন (চোখের বালি)। বহু বিবাহ রোধে রবীন্দ্রনাথের কুমু (দৃষ্টিদান) ঠাকুরের কাছে মূর্ছিত হয়ে পড়ে রইল, ঈশ্বর এবং রবীন্দ্রনাথ তার সহায় হলেন, স্বামী দ্বিতীয় দারপরিপ্রহ করলেন না; ‘মধ্যবর্তিনী’-তে অবশ্য স্বামী দ্বিতীয়া স্ত্রী নিয়ে এলেন এবং তার পরিণাম ট্র্যাজিক হলো। মহামায়াকে সতীদাহ করা হলো বটে, কিন্তু সে বেঁচে গেল এবং প্রণয়ীর ঘরে এসে থাকতে লাগল। মানভঞ্জনে অত্যন্ত রূপবতী বালবিবাহিতা স্ত্রী গিরিবালাকে রেখে গোপীনাথ শীল থিয়েটারের নায়িকাকে নিয়ে মজে থাকে, পয়সা ছড়ানোর অভাব থাকলে স্ত্রীর গহনা লুণ্ঠন করে স্ত্রীকে লাথি মারতেও দ্বিধা করে না; স্ত্রী অবশেষে বাপের বাড়ি যাওয়ার নাম করে থিয়েটারে নাম লেখায়, থিয়েটারে নবাগতা সুন্দরী নায়িকা হিসেবে তাকে সারা কলকাতা যখন ধন্য ধন্য করছে, তখন গোপীনাথকে দর্শকসারি থেকে অভব্যতা করার জন্য পুলিশ ডেকে বিতাড়িত করা হচ্ছে, বেশ দুঃসাহসিক পোয়েটিক জাস্টিসের গল্প। ‘ঠাকুরদা’-তে তিনি একেবারে রাখঢাকহীনভাবে জানাচ্ছেন, ‘আমাদের নয়নজোড়ের বাবুরা পাড় ছিঁড়িয়া ফেলিয়া ঢাকাই কাপড় পরিতেন, কারণ পাড়ের কর্কশতায় তাঁহাদের সুকোমল বাবুয়ানা ব্যথিত হইত। তাঁহারা লক্ষ টাকা দিয়া বিড়ালশাবকের বিবাহ দিতেন এবং কথিত আছে, একবার কোনো উৎসব উপলক্ষে রাত্রিকে দিন করিবার প্রতিজ্ঞা করিয়া অসংখ্য দীপ জ্বালাইয়া সূর্যকিরণের অনুকরণে তাঁহারা সাচ্চা রুপার জরি উপর হইতে বর্ষণ করাইয়াছিলেন। ইহা হইতেই সকলে বুঝিবেন, সেকালে বাবুদের বাবুয়ানা বংশানুক্রমে স্থায়ী হইতে পারিত না। বহুবর্তিকাবিশিষ্ট প্রদীপের মতো নিজের তৈল নিজে অল্প কালের ধুমধামেই নিঃশেষ করিয়া দিত।’ এ গল্প ও উপন্যাসের উল্লেখ করার হেতু একটিই, সমাজ বদলাচ্ছিল এবং নির্ভুলভাবে তার পদধ্বনি পাওয়া যাচ্ছে সমসাময়িক সাহিত্যে।
হেয়ার সাহেব ও রাজা রামমোহন রায়ের উদ্যোগে হিন্দু কলেজ স্থাপিত হয়েছে। জোড়াসাঁকোর কমল বসুর বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ব্রাহ্ম সমাজ। রামমোহন আপন ব্যয়ভারে বেসরকারি ইংরেজি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন, সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করে লিখেছেন, ‘বিদ্যার বিকেন্দ্রীকরণে সংস্কৃত ভাষা যুগ যুগ ধরে প্রতিবন্ধক সৃষ্টি করেছে...এই দেশটাকে অন্ধকারের মধ্যে রাখতে হলে সংস্কৃত শিক্ষা পদ্ধতিই হবে শ্রেষ্ঠ পদ্ধতি।’ রামমোহন রায়, ডেভিড হেয়ার, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের পাশাপাশি আরেক উজ্জ্বল নাম হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও। সমাজের অগ্রগতির রথের তিনি এমনই সারথি যে শিক্ষায়তন থেকে বিতাড়িত করেও তার প্রভাবকে দমিয়ে দেয়া যায়নি। নারীশিক্ষা প্রসারের উদ্যোগ উনিশ শতকের আগে তেমন করে দেখা যায়নি। আঠারো শতকের শেষ দিকে কলকাতায় ইউরোপীয় মেয়েদের সামান্য ক’টি শিক্ষায়তন ছিল, পরে কলকাতার ইউরোপীয় নারীরা গঠন করেন ‘ফিমেল জুভেনাইল সোসাইটি’। প্রবল প্রতিকূলতার ভেতর দিয়ে এ সোসাইটি ছয়টি স্কুল প্রতিষ্ঠা করে। রাজা রাধাকান্ত দেবের আহ্বানে এ স্কুলগুলোর মেয়েরা ক্যালকাটা স্কুল সোসাইটির ছাত্রদের সঙ্গে বার্ষিক পরীক্ষায় বসে কৃতিত্ব দেখায়। নারীশিক্ষার প্রসারে ভূমিকা রাখে শ্রীরামপুর মিশনও। এগিয়ে আসেন রাজা দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়, মতিলাল শীল, প্রসন্নকুমার ঠাকুর, প্যারীচাঁদ মিত্র প্রমুখ। ধীরে ধীরে যুগপুরুষদের স্পর্শে প্রাণ পাচ্ছে নবজাগরণ, বাঙালির রেনেসাঁ। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তার সেই সময়ে বাঙালির বাবু কালচার, তার ওপরমহল আর ভৃত্যমহল, তার বিকৃতি, তার সমাজবিধ্বংসী বিলাসব্যসন, তার অচরিতার্থতার এক আশ্চর্য সংবেদ রচনা করে গেছেন। বিমল মিত্র লিখে গেছেন সাহেব-বিবি-গোলামে এ বিলাসস্রোতের অবশ্যম্ভাবী বিনাশী বেগের কথা, ধ্বংসোন্মুখ জমিদারি আর পুঁজিবাদীর নতুন উত্থানকে নিয়ে তারাশঙ্করের লেখা ভারী মিষ্টি জলসাঘরকে সত্যজিৎ নিয়ে এসেছেন চলচ্চিত্রে; বাঙালির চিন্তায়-সংস্কৃতিতে-অভ্যাসে-দাসত্বে এবং মুক্তিতে এক নতুন হাওয়া বইবার এ ক্রান্তিকালকে আরো অনেকে অমরত্ব দিয়ে গেছেন তাদের সৃষ্টিতে।





