মনোজগতে চলমান বিভ্রাট আর শারীরিক অসুস্থতা দিন দিন বেড়েই চলেছে তার। শিল্পী হিসেবে শৈল্পিক সাফল্যের জন্য তার অন্তরও একদিকে যেমন ক্ষুধিত, তেমনি মগজ ক্রমেই ছেয়ে যাচ্ছে ভোঁতা অন্ধকারে, শহুরে জীবনের টানাপড়েন অযুত জটাজাল হয়ে বিষণ্নতার সঙ্গে মিশে আরো, ফেনিল আরো তরঙ্গায়িত করে তুলছে তাকে। অথচ যশ-খ্যাতি-সাফল্য ইত্যাদি যখন তার পদতলে, তখন ভিনসেন্ট মিথের ডামাডোলে ‘অত্যাচারিত প্রতিভা’ ও ‘ভুখা শিল্পী’ হিসেবে পোস্টারবয় বনে গেছেন, আর সেসব সর্বনামেরই চৌম্বকীয় আকর্ষণ তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। নানা মাধ্যমে যেমন— চলচ্চিত্র, বই, প্রদর্শনী, গবেষণা, বহুমাত্রিক উপস্থাপনা ইত্যাদিতে ভিনসেন্ট পরিবেশিত হচ্ছেন, পুনঃসৃজিত হচ্ছেন, যা এখনো চলমান, হয়তো এ প্রয়াস অনিঃশেষও বা!
কিন্তু ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের এই যে কিংবদন্তিতুল্য সৃষ্টি আর তার জন্য আমরা যতখানি পাগলপারা, তারই ফাঁকতালে এমন কিছু কি আমাদের অগোচরে রয়ে যাচ্ছে বা আমরা ভুলে গেছি? ভিনসেন্টের শিল্পকর্ম ও শিল্পী হিসেবে তার গল্প, যা বেশির ভাগই তার সহোদর থিওর সঙ্গে অসংখ্য চিঠিপত্র আদান-প্রদানের হাত ধরে সঞ্জাত, ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ বেঁচে থাকতেই কি সেসব গল্প তাদের কুরে কুরে খায়নি? শিল্পীর সৃষ্টির প্রতি এমন মাতোয়ারা ভাব কি আমাদের অজানাভাবে তার গল্পের অন্য আরেক কুশীলবের কথা ভুলিয়ে দিচ্ছে, যার জন্য ভিনসেন্ট কেবলই ‘অত্যাচারিত প্রতিভা’ ও ‘ভুখা শিল্পী’র খ্যাতি আর গৌরবে পর্যবসিত হয়ে যাননি, সেই কুশীলব যিনি তার জীবদ্দশায় ‘রেড ভিনিয়ার্ড’কে হাতছাড়া করেননি।
ভিনসেন্টের সঙ্গে জোহান্না বঙ্গারের খুব যে গাঁটছড়া কিছু ছিল তেমন নয়, সম্পর্কে দেবর ছিলেন, এটুকুই। বস্তুত জোহান্নার সঙ্গে ভিনসেন্টের জীবদ্দশায় হাতেগোনা দুয়েকবারই সাক্ষাৎ ঘটেছিল। কিন্তু এ যোগাযোগই ভিনসেন্টকে বিশেষায়িত করে তোলে, কালে।
ভালোবেসে সবাই তাকে ‘জো’ ডাকত। জোহান্নার বেড়ে ওঠা এমন একটি পরিবারে, যে পরিবারের সন্তানদের শিক্ষা-দীক্ষা ও শিল্প-শিল্পী বিষয়ে উৎসাহের কোনো কমতি ছিল না। এটি সেই সময়ের কথা, যখন বেশির ভাগ নারীরই লক্ষ্য ছিল ভালো স্ত্রী হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে থাকা। অথচ এমন বাতাবরণেও তিনি ইংরেজি ভাষায় ডিগ্রি অর্জন করে ফেলেছেন। ২২ বছর বয়সেই যোগ দিয়েছেন শিক্ষকতায়। লন্ডনের ব্রিটিশ জাদুঘরের গ্রন্থাগারিকের পদও অলঙ্কৃত করেছেন একসময়। পেশাজীবনের বাইরে তিনি ছিলেন অত্যন্ত নিপুণ জীবনীকার এবং তার দিনলিপি যাকে বলে চোস্ত তরিকায় লিখে রাখতেন। অবশ্য বিয়ের পর কিছুদিনের জন্য এ অভ্যাস মুলতবি থাকলেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে মাত্র ২৮ বছর বয়েসে বিধবা হয়ে পড়লে আবারো লেখালেখি শুরু করেন। স্বামীর মৃত্যুর পর ছেলেকে স্বাধীনভাবে বড় করে তোলার অভিপ্রায়ে আমস্টারডামে তার পৈতৃক বাড়িতে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্তের বিপরীতে দাঁড়িয়ে তিনি বুশাম নামে ছোট একটি গ্রামে থিতু হবেন বলে মনস্থির করেন। শোকে-কষ্টে তিনি মুহ্যমান ছিলেন ঠিকই, কিন্তু ভেঙে পড়েননি একটুও। ১৮৯১-এর ১৫ নভেম্বর তিনি লিখেছেন:
‘আমি আমার শিশুটিকে নির্মল পরিবেশে বেড়ে তুলতে চাই। ফলে আমাদের বুশামে থাকতে হবে। এখন আমার সাবধানী হতে হবে। আমার চিন্তা-চেতনায় এখন সংসার ঢুকে পড়বে, গেরস্থালির হাজারো সমস্যা আমাকে জেঁকে ধরবে, কিন্তু এতসবের মধ্যেও আমার আত্মাকে জীবিত রাখতে হবে। থিও (থিও ভ্যান গঘ) আমাকে শিল্প সম্পর্কে অনেক কিছু শিখিছে। না, বরং বলা ভালো, সে আমাকে জীবন সম্পর্কে গভীর ধারণা দিয়ে গেছে।’
থিওকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন এবং জানতেন, থিও ভিনসেন্ট আর তার শিল্পের প্রতি কতটা যত্নশীল ছিলেন। ভিনসেন্ট যখন আর্লেস হাসপাতালে ছিলেন, তখন থিও জোকে লেখেন, ‘আমার প্রাণপ্রিয় ভাই ভিনসেন্টের সমস্ত স্মৃতি আমাদের ধরে রাখা উচিত।’ জোহান্না বঙ্গার স্বামীর সেই স্বপ্নটিকে নিজের করে নিলেন, স্বপ্নকে সত্যি করে তুললেন। অন্যত্র তিনি লিখেছেন:
‘ছেলেকে লালন-পালন ছাড়াও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ থিও আমার ওপর দিয়ে গেছে। যতদূর পারা যায়, ভিনসেন্টের শিল্প সৃষ্টিকে দিকে দিকে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করে দেয়া এবং এর যথোচিত সম্মান আদায় করা। থিও আর ভিনসেন্টের মধ্যকার সব ধন-রত্নগুলো (চিঠি) সামলে রাখাও আমার আরেকটি বড় দায়িত্ব ছিল। বৃহৎ এ জীবনে আমি নিজেকে স্রেফ বস্তুর অধিক কিছু মনে করি না। কিন্তু আমি নিঃসঙ্গ ও নির্জন বোধ করি কখনো কখনো। মুহূর্তের জন্য আমার মনে পড়ে সেই অনুধাবনের কথা, আমি যখন হল্যান্ডে ফিরে এলাম, আমি উপলব্ধি করতে পারলাম একজন নিঃসঙ্গ শিল্পীর জীবনের মহিমা ও বিশালতা। আর তখন ভিনসেন্টের সৃষ্টির প্রতি মানুষের উদাসীনতায় কতটা পীড়িত হয়েছি, কতটা হতাশ হয়েছি, তা বলে বোঝানো যাবে না।’
নিজের বাড়িকে ভিনসেন্টের শিল্পকর্মের প্রদর্শনশালায় রূপ দেন তিনি, যা খুব দ্রুতই তরুণ শিল্পীদের পদচারণে মুখর হয়ে ওঠে। প্যারিসে দুই বছর কাটনোর সময় ভিনসেন্টের যে খ্যাতি গড়ে উঠতে শুরু করেছিল, তা পুনরুদ্ধারে নামেন জো। প্যারিসের ওই সময়টায় ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের সঙ্গে তার প্রজন্মের অনেক শিল্পীর সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি হতে থাকে যেমন— এমিলে বার্নার্ড, লুই আকুয়েতিন ও হেনরি দে তুলুস, যিনি প্যাস্টেলে গঘের একটি প্রতিকৃতিও আঁকেন। থিও ছিলেন শিল্প-সংগ্রাহক, যিনি তার প্রজন্মের আভাগার্দ শিল্পীদের সঙ্গে ভিনসেন্টের পরিচয় ঘটিয়ে দিতে সাহায্য করেছিলেন, থিও ভাইয়ের কাজের প্রশংসায়ও ছিলেন পঞ্চমুখ। প্যারিসে থাকাকালে ভিনসেন্ট ইমপ্রেশনিস্ট ধারা ও জাপানি শিল্প দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হন। উল্লেখ্য, ভিনসেন্টের সৃষ্টির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের শুরু এখান থেকেই। আর্লেসে থাকাকালে ভিনসেন্ট সাহচর্য পেয়েছিলেন পল গগাঁ ও এমিলে বার্নার্ডের। গগাঁর কথা আমরা সবাই জানি, ভিনসেন্টের কর্ণহরণের সঙ্গে তার নামটি জুড়ে আছে।
ভিনসেন্টকে যারা ভালোবাসতেন, তেমন অনেক শিল্পীর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করলেন জোহান্না এবং সহসাই সাড়া মিলতে লাগল এমন কিছুর, যার সন্ধানেই ছিলেন জো। বস্তুত, ক্লদ মানে যার কাছ থেকে ভিনসেন্ট ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন, তার কাজ দেখতে এলেন এবং যারপরনাই অবাক হলেন, যে মানুষ ফুল আর আলোকে এত পছন্দ করতেন, তিনি জীবনভর এত অসুখী থাকলেন কী করে! ক্যামিল পিসারো কল্পনাপ্রবণ হয়ে ঘোষণা করেছিলেন, ভিনসেন্টের ফুলগুলো আসলে মানুষের মতোই।
১৮৯২-এর ২৪ ফেব্রুয়ারি ভিনসেন্টের শিল্পকর্মের প্রথম প্রদর্শনীর (আক্ষরিক অর্থে) প্রাক্কালে জোহান্না লিখেছিলেন, ‘‘আগামীকাল রাতে ‘আর্টি’-তে [দ্য আর্টিস্ট অ্যাসোসিয়েশন অব আমস্টারডামের নিজস্ব প্রদর্শনী কক্ষ] ভিনসেন্টের আঁকা ড্রয়িংয়ের প্রদর্শনী। বেশ আশা করে বসে আছি, এ এমন এক অনুভূতি, যার একমাত্র ফসল দর্শকের কাছ থেকে মিলবে, আমার ভাবনা আর চেষ্টা আজ কূলের সন্নিকটে, ব্যাপরটা দারুণ। লোকজন কী বলছে, কী তাদের প্রতিক্রিয়া, তা শুনতে কাল অবশ্যই সেখানে যেতে হবে। আমি পুনর্বার দেখতে চাই তাদের মনোভাব, তাদের অনুভব ধরতে চাই, একদিন যারা ভিনসেন্টের কাজ দেখে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেতেন, মজা করতেন।’’
জোহান্না তত্কালীন আর্ট ডিলারদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে শুরু করেন এবং নিজের বাড়িতেই ভিনসেন্টের শিল্পকর্ম প্রদর্শনের পাশাপাশি সংগ্রহশালা গড়ে তোলেন। এমনকি দুয়েকজনকে আর্থিক সাহায্য দিয়ে কাজে লাগান শিল্পসমঝদার ক্রেতা খুঁজে বের করার কাজে। বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্র প্রমাণ করে, ভিনসেন্টের শিল্পকর্মের সর্বপ্রথম ক্রেতা ফরাসি লেখক অক্তাভ মিরবিউ। অক্তাভ ৬০০ ফ্রাঙ্কের বদলে কিনে নেন ‘দি আইরিসেস’ ও ‘দ্য থ্রি সানফ্লাওয়ার’। ‘সানফ্লাওয়ার’ সিরিজের কাজগুলোর চাহিদা তখন তুঙ্গে, ১৮৯৪ সালে এমিল শুফেনেকার এ সিরিজের টোকিও সংস্করণটি সংগ্রহ করেন।
১৯০১ সালে জোহান্না বিয়ে করেন চিত্রশিল্পী-লেখক কোহেন গশলাককে। বিয়ের বছর দুয়েক পর ১৯০৩ সালে জোহান্না ফের আমস্টারডামে ফিরে আসেন এবং এ নতুন আবাসও হয়ে ওঠে ভিনসেন্টের শিল্পকর্মের নতুন ঠিকানা। ১৯০৫-এর গ্রীষ্মে, তিনি আমস্টারডামের স্টেদেলিজ্ক জাদুঘরের প্রদর্শনশালাটি ভাড়া নিতে সক্ষম হন এবং ভিনসেন্টের কাজের একটি বড় আকারের প্রদর্শনীর আয়োজন করেন, যা দুই হাজারেরও অধিক দর্শক দেখতে এসেছিল। ঠিক কাছাকাছি সময়ে আমস্টারডামের রিজ্ক মিউজিয়াম এক অদ্ভুত প্রস্তাব দেয় যে, তারা ভিনসেন্টের ছবি প্রদর্শন করবে এক শর্তে। শর্তটি এই, যে ক’টি শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হবে, তার সমপরিমাণ শিল্পকর্ম যদি মিউজিয়ামকে উপহার হিসেবে দেয়া হয়, তবেই প্রদর্শনী সম্ভব! যাই হোক, নেদারল্যান্ডসের বাইরে কিছু প্রদর্শনী সংঘটিত করতে সক্ষম হন তিনি এবং ওয়েস্টফেলিয়ার হ্যাগেনের ফোকওয়াং জাদুঘর ভিনসেন্টের প্রথম আন্তর্জাতিক সংগ্রহশালা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। একই বছর ১৯০৫ সালে তিনি জার্মান শিল্প ইতিহাসবিদ ও প্রখ্যাত কিউরেটর হুগো ভন শুদির কাছে ‘দ্য সানফ্লাওয়ার’-এর মিউনিখ সংস্করণটি বিক্রি করেন, যা ভিনসেন্টের শিল্পকর্মের উল্লেখযোগ্য সংগ্রহ হিসেবে সর্বজনবিদিত।
বছর কয়েক পর আরেকজন নারী, যিনি ভিনসেন্ট অনুরাগী ও উৎসাহী, জোহান্নার গল্পের অপরিহার্য অংশ হয়ে ওঠেন। ভিনসেন্টের প্রতিভাকে চিনতে পেরে ১৯০৮ সালে ‘দি এজ অব দ্য উড’ চিত্রটি সংগ্রহ করেন। এরপর একের পর এক ভ্যান গঘের ৯১টি পেইন্টিং ও ১৮৫টি ড্রয়িং নিজের সংগ্রহে অন্তর্ভুক্ত করেন। তার এ সংগ্রহই ক্রলার-মুলার মিউজিয়ামের ভিত্তি হয়ে ওঠে, যা বিশ্বে ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের দ্বিতীয় বৃহত্তম সংগ্রহ। ১৯১০ সালে লন্ডনে প্রথমবারের মতো পোস্ট-ইমপ্রেশনিস্ট প্রদর্শনীতে ভিনসেন্টের শিল্পকর্মগুলো প্রদর্শিত হয়। যদিও তখনো ভিনসেন্টের সৃষ্টিগুলোকে ‘উদ্ভট’ ও ‘মজা’র তকমায় ডাকা হচ্ছে!
ওই একই সময়ে ভিনসেন্টের শিল্পকর্মকে বিশ্বদরবারে ছড়িয়ে দিতে তত্পর থাকেন জোহান্না। পাশাপাশি ভিনসেন্ট ও থিওর চিঠিগুলোর সম্পাদনা ও অনুবাদে নিজেকে যুক্ত রাখেন, যা পরবর্তী সময়ে ভিনসেন্টকে চেনাজানার অন্যতম উৎস হয়ে ওঠে বিশ্বজুড়ে।
ভিনসেন্টের শিল্পকর্মগুলো ‘শিল্পকর্ম’ হিসেবে স্বীকৃতি না পাওয়া ইস্তক তিনি ওই চিঠিগুলো অপ্রকাশিত রাখার সিদ্ধান্ত নেন। বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি জোহান্নাকে। ডাচ সংস্করণে প্রথম খণ্ডটি প্রকাশিত ১৯১৪-এর বসন্তে, ততদিনে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। ১৯১৫ সালের শুরুর দিকে জো পালিয়ে আসেন নিউইয়র্কে। এসেই চিঠিগুলোর অনুবাদে লেগে পড়েন। সে সময় তিনি লিখছেন:
‘‘থিওর অসুস্থতার শুরুর দিকেই চিঠিগুলো আমার জীবনে একটি বড় জায়গা করে নেয়। আমি জানতাম, এ চিঠিগুলোর ভেতরই আমি তাকে (থিও) আবার খুঁজে পাব। আমি কেবল আমার হূদয় দিয়েই চিঠিগুলো পাঠ করি না, আমার গোটা অন্তরাত্মাও এর সঙ্গে যুক্ত হয়। কাজেই ওগুলো আমার সবসময়ের সঙ্গী। আমি চিঠিগুলো বারবার পড়ি, পড়তেই থাকি, যতক্ষণ না ভিনসেন্টের পূর্ণ অবয়বটি আমার সামনে হাজির হয়। কখনো কখনো এটি আমাকে খুব ব্যথিত করে তোলে। মনে আছে, গেল বছর ভিনসেন্টের প্রয়াণ দিবসের সন্ধ্যায় আমি একটু দেরি করে বাড়িতে ফিরলাম। বাইরে তিরতিরে হাওয়া, টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে, মিশকালো অন্ধকার। আমাদের বাড়িটা আলোয় উদ্ভাসিত, লোকজন টেবিলের চারপাশে জড়ো হয়ে আছে। একটা গর্ব বলা ভালো, অহঙ্কারের অনুভব টের পেলাম নিজের ভেতর। জীবনে এই প্রথম আমি বুঝতে পারলাম, যখন ভিনসেন্টকে কেউ গোনায় ধরত না, যখন সবাই মুখ ফিরিয়ে থাকত আর তখন হয়তো মনে মনে সে ভাবত, ‘পৃথিবীতে যেন আমার কোনো স্থানই নেই...’, বুঝলাম সেই অনুভব কতটা প্রাণঘাতী। আমি চাই, লোকে জানুক, ভিনসেন্টের প্রভাব আমার জীবনে কত ব্যাপক। ভিনসেন্ট আমাকে এমনভাবে জীবন যাপন করতে সাহায্য করেছে যে, এখন আমি আমার স্বয়মের কাছে শান্তিতে থাকতে পারি। প্রশান্তি— ঠিক এ শব্দটিই ওদের দুজনেরই প্রিয় ছিল, যা উভয়ই মানবমুক্তির সর্বোচ্চ পর্যায় বলে বিবেচনা করত। সেই প্রশান্তি আমিও পেয়েছি। সেই শীতকাল থেকে, যখনই একা থাকতাম মন বিষাদে ছেয়ে যেত, কিন্তু আমি অসুখী ছিলাম না। ভিনসেন্ট যেমন ভাবত, ‘হয়তো হূদয় ব্যথিত, কিন্তু তাতে আনন্দও সীমাহীন’— এ অভিব্যক্তি এখন খুব বুঝতে পারি আমি।’’
২২ সেপ্টেম্বর ১৯২৫, জোহান্নার যেদিন দেহাবসান ঘটে, ছিলেন ৫২৬ নম্বর চিঠির অনুবাদে। এর এক বছর আগে গঘের ‘দ্য সানফ্লাওয়ার’ সিরিজের একটি চিত্রকর্ম তার হাতছাড়া হয়, যেটির প্রতি তিনি অত্যন্ত অনুরাগী ছিলেন। বেশ কষ্ট পেয়েছিলেন। লন্ডনের ন্যাশনাল গ্যালারি অব ব্রিটিশ আর্টের কিউরেটরদের অন্যতম জিম এডিকে এ পেইন্টিংটি বিক্রি করতে অনাস্থা জ্ঞাপন করে লেখেন,
‘‘আপনার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আমি আমার হূদয়কে যথেষ্ট শক্ত করে বোঝানোর চেষ্টা করেছি। গত ৩০ বছরের প্রতিটি দিন আমি এ ছবির দিকে তাকিয়েছি বারবার। আমি নিজেকে এর কাছ থেকে আলাদা ভাবতে পারি না। আমি বুঝতে পেরেছি, ভিনসেন্টকে এ ছবির বাইরে আর কোনো ছবির মাধ্যমে যোগ্যভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব নয়। সে নিজেও হয়তো চাইত, তার ছবি এমন কোনো গ্যালারিতেই প্রদর্শিত হোক। তাই তার গৌরবের জন্য অবশ্যই আমাকে এটি হাতছাড়া করতে হচ্ছে।’’
জোহান্না বঙ্গার হয়তো শুরু থেকেই ব্যাকরণ মানা অর্থাৎ তথাকথিত শিল্পানুরাগী বা উৎসাহী ছিলেন না। কিন্তু একজন শিল্পীর সৃষ্টিকর্মের প্রেমে ও ভক্তিতে তিনিই ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের শিল্পকর্মের অন্যতম সেরা কিউরেটর, রক্ষক ও প্রবর্তক হয়েছিলেন।
সূত্র: আর্টিস্টোরি





