ভাতই বাঙালির প্রধান খাদ্য। এ অভ্যেস ও সংস্কার অস্ট্রিক ভাষাভাষীদের কাছ থেকে বাঙালিদের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। চতুর্দশ শতাব্দীর প্রাকৃত পৈঙ্গল গ্রন্থের বর্ণনায় আছে—

ওগ্গরা ভত্তা রম্ভ পত্তা গাইক ঘিত্তা দুগ্ধ সজুক্তা।

মৌইলি মচ্ছা নালিতে গচ্ছা দিজ্জই কান্তা খা-ই পুনবন্তা।।

অর্থাৎ ঘি দিয়ে কলার পাতায় গরম গরম ফেনা ভাত আর সুস্বাদু দুধ, সাথে মৌরেলা মাছ এবং পাটের শাক; কান্তা (রাঁধুনি বা গৃহিণী) রান্না করে পরিবেশন করছে আর পুণ্যবানে খাচ্ছে। এখানে প্রাচীন বাঙালি খাবারের স্বাভাবিক পরিচয় ও ধান সংস্কৃতির মণিকাঞ্চন যোগাযোগ দেখা যায়। 

ধানের উৎপত্তিস্থলগুলোর মধ্যে বাঙালি অধ্যুষিত ব্রহ্মপুত্র ও নিম্ন গাঙ্গেয় অববাহিকা অন্যতম। তাই ধানবৈচিত্র্য বাঙালিদের ঐতিহ্য ও কৃষ্টির অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রাচীন বাংলার বর্ধমান, বীরভূম (খ্রিস্টপূর্ব ১৩০০-৮০০) আর নরসিংদীর (খ্রিস্টপূর্ব ৪০০-১০০) পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন দেখে তাই বলতে হয়। নিশ্চয়ই এ জল-জংলার বাংলায় ধান নিয়ে ওই সময়গুলোর অনেক আগে থেকেই গবেষণা শুরু হয়েছিল। যদিও সমসাময়িক কোনো প্রত্যক্ষ রেফারেন্স গ্রন্থ নেই। তবে উত্তর ভারতের আর্য ঋষিদের রচিত ঋগ্বেদ (খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০), অথর্ব বেদ (খ্রিস্টপূর্ব ১২০০), মহাভারত (খ্রিস্টপূর্ব ১২০০), চরক সংহিতা (খ্রিস্টপূর্ব ৭০০), সশ্রুত সংহিতা (খ্রিস্টপূর্ব ৬০০-৪০০), কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র (খ্রিস্টপূর্ব ৩০০) গ্রন্থগুলোতে ধান নিয়ে অনেক কথাই আছে। পরবর্তী সময়ে কৃষি-পরাশরের কৃষিতত্ত্ব (খ্রিস্টপূর্ব ৪০০-১০০), কালিদাসের রঘুবংশম (চতুর্থ শতক), বাণভট্টের হর্ষচরিত (সপ্তম শতক), সন্ধ্যাকর নন্দীর (খ্রিস্ট ১০৮৪-১১৫৫) রামচরিতম ইত্যাদি গ্রন্থেও কমবেশি ধান, ধানবৈচিত্র্য ও আবাদ-পদ্ধতির উল্লেখ দেখা যায়। উল্লেখ্য, আর্যরা প্রথমে কৃষিকাজ জানত না। সময়ে তারা অনার্য জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে কৃষিকাজ জেনে-বুঝে এবং চর্চা করে ওই গ্রন্থগুলোতে সংযোজন করেছে। এখানে শুধু যে আর্য-ঋষিরাই এ কৃতিত্বের দাবিদার এমন নয়। কৃষি-পরাশর, কালিদাস ও সন্ধ্যাকর নন্দী বাঙালি ছিলেন। এসব গ্রন্থ রচনায় কৃষকের গবেষণালব্ধ জ্ঞানই তারা ব্যবহার করেছিলেন বলা যায়।

উপর্যুক্ত গ্রন্থকার বা বিজ্ঞানীদের রচনার ভাষা ছিল সংস্কৃত। খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতকে পালি ভাষায় রচিত বৌদ্ধদের জাতক-কাহিনীতে ধানের বিষয় আছে। খ্রিস্টীয় অষ্টম-দ্বাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে প্রণীত খনার বচনের প্রধান প্রধান বিষয় ছিল ধান ও কৃষি। কিন্তু সেগুলো প্রাচীন বাংলায়। কিছু বোঝা যায়। যেমন: জ্যৈষ্ঠে খরা, ধানের ভরা। আবার কিছু বোঝা যায় না। যেমন : কর্কট ঝরকট সিংহে শুখা কন্যা কানে কান, বিনা বায় তুলা বর্ষে কোথা রাখবি ধান। ত্রয়োদশ শতাব্দীর কবি রামাই পণ্ডিত তার ‘শূন্যপুরাণ’ গ্রন্থে লোকজ ধারায় ধানের জন্ম, চাষ ও জাত সম্বন্ধে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন (সারণি-১)। প্রায় এক হাজার বছর আগে উল্লেখিত ধানের জাতগুলোর মধ্যে কেবল ঝিঙাসাল, দুগ্গাভোগ, বাজাল, শিবজটা, খেজুরছড়ি, বাঁকই, কালাকাত্তিক, বাগনবিচি, কনকচুর, বাঁসমতি, পব্বত জিরা এখনো কোথাও টিকে আছে। সপ্তদশ শতাব্দীর কবি কৃষ্ণরাম দাস তার ‘কমলামঙ্গল’ কাব্যে ধনের দেবী লক্ষ্মীকে সাজানোর বর্ণনায় কিছু ধানের জাত উল্লেখ করেছেন। এখানে উল্লিখিত পারিজাত, জামাইনাড়ু জাত দুটো এখনো চাষীরা অল্পবিস্তর চাষ করেন। বাকিগুলো মাঠ থেকে অনেক আগেই উঠে গেছে। 

সপ্তদশ শতাব্দীর আরেক কবি আলাওল তার ‘পদ্মাবতী’ কাব্যে বেশকিছু ধানের নাম উল্লেখ করেছেন। যেমন: বগাহী, রায়ভোগ, ঝিনরা, রুদরা, কজরী, কাজর, রতনারী, ঝিলনারী, রামরাস, কুঁবর বিলাস, ঢেলা, মধুকর, ঘিউ কাঁদৌ, বাসমতি, দাউদখানি ইত্যাদি। বরণ (বড়ন), বাসমতী ও দাউদখানি ছাড়া বাকি জাতগুলো এখন আর আবাদে নেই। অষ্টাদশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ কবি ভারতচন্দ্রর ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যে উল্লেখিত বেশকিছু ধানের মধ্যে দলকচু, কৈজুড়ি, বাঁশফুল, মরিচশাইল, শিবজটা জাতগুলোর কথা এখনো টিকে আছে শোনা যায়।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী Watt, G. (1891)-এর হিসাব অনুসারে তখনকার ব্রিটিশ-বেঙ্গলে ৩০ হাজার জাতের ধান চাষ হতো। পরে ঢাকা গবেষণা ফার্মের ধানবিজ্ঞানী ড. জিপি হেক্টর জানিয়েছিলেন ১৮ হাজার আবাদি জাতের কথা। প্রায় ৮০-৯০ বছর আগের হিসাব। এর অনেক পরে ১৯৮২ সালে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) একটি জরিপ করে। ব্রির জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে ১২ হাজার ৪৮৭টি জাতের নাম জানা যায়। এদের সব যে জরিপকালে আবাদে ছিল এমন নয়। হয়তো জাতক্ষয়ের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় অনেকগুলোই সে সময় বিলীন হয়ে গিয়েছিল। চাষীরা উত্তরাধিকারসূত্রে তাদের নামগুলো মনে রেখেছিল মাত্র। ড. হেক্টরের গণনা মোটামুটি সঠিক ছিল বলে মনে হয়। কারণ ১৮ হাজার জাত থেকে পশ্চিমবঙ্গের এক-তৃতীয়াংশ বাদ দিলে বাংলাদেশের ভাগে ১২ হাজারের মতোই থাকার কথা। তখনো ধানের জাতক্ষয় (Genetic erosion) বিষয়টি প্রকট ছিল না। দেশী জাতগুলোর ফলন বেশি নয়। তাই উচ্চ ফলনশীল জাত প্রচলিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দেশী জাতগুলো বিলুপ্ত হতে শুরু করে, অনেকটা দ্রুতগতিতেই। সঙ্গে নামগুলোও হারিয়ে যেতে থাকে। সেই প্রেক্ষাপট বিবেচনা করেই আইআরআরআইয়ের সহযোগিতায় ব্রি ধানের জার্মপ্লাজম সংগ্রহের কাজ শুরু করে। এ পর্যন্ত ব্রির জিনব্যাংকে সংরক্ষিত দেশী জাতের সংখ্যা ৬ হাজার ৩৩৪। বিদেশী ও ব্রিডিং ম্যাটেরিয়াল দিয়ে মোট ৮ হাজার ৮৬৮টি। দেশী জাতের মধ্যে রোপা আমনের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, ৩ হাজার ৬৮৬। জলি আমনের জাত ৭২৯টি। আউশ ও বোরো জাতের সংখ্যা যথাক্রমে ১ হাজার ৪৬৪ ও ৪৯৫। অর্থাৎ মোট ১২ হাজার ৪৮৭টি জাতের অর্ধেক সংখ্যক এরই মধ্যে হারিয়ে গেছে। বর্তমানে কৃষকের হাতে দেশী ধানের সংখ্যা বেশি নয়। ২০০৫-এর এক জরিপ অনুযায়ী মাত্র ১০৭১টি (হোসেন এবং তার সহযোগীরা, ২০১৩)। তারা বোরো, আউশ ও আমন মৌসুমভেদে ‘জনপ্রিয়’, ‘অজনপ্রিয়’ ও ‘সংকটাপন্ন’ জাতগুলো আলাদা করে দেখিয়েছেন। তাদের জরিপ অনুযায়ী আমন, বোরো ও আউশ মৌসুমে ‘জনপ্রিয়’ জাতের সংখ্যা যথাক্রমে মাত্র ৪, ২ ও ১১টি করে। আউশের অধিকাংশ জাত দেশী হলেও সেগুলোর আবাদি-আওতা অন্যান্য মৌসুমে আবাদকৃত জাতের তুলনায় নগণ্য। জরিপকালীন মৌসুম-নির্বিশেষে ‘সংকটাপন্ন’ জাতগুলোর সংখ্যা ছিল ৮১৯ আর ‘অজনপ্রিয়’ ছিল মাত্র ২৪৫টি। এখন ২০২৪ সাল। সম্ভবত ‘‌‌সংকটাপন্ন’ জাতগুলোর বেশির ভাগ এখন আর কৃষকের কাছে নেই। বাকি ‘‌অজনপ্রিয়’ জাতগুলোও মাঠ থেকে হারিয়ে যাওয়ার পথে বা হারিয়ে গেছে এদ্দিন।

ধানবৈচিত্র্য আমাদের কৃষক-বিজ্ঞানীদের সৃষ্টি। স্থান-কাল-পরিবেশ ও প্রয়োজনভেদে সেটা করা হয়েছে। আমরা জানি মৌসুমভেদে আউশ, আমন ও বোরো তিন ধরনের ধান আছে। আউশ ও আমন বৃষ্টিনির্ভর। আউশ বেশ খরা সহনশীল, তিন-চার মাসে ঘরে তোলা যায়। আমন ধান রোপা ও জলি দুই ধরনের হয়ে থাকে। রোপা আমন আষাঢ়-শ্রাবণে রোপণ করতে হয়। মোটামুটি উঁচু জমির জন্য প্রযোজ্য। আর জলি আমন বন্যাপ্রবণ এলাকায় বৈশাখ মাসে বুনে দিতে হয়। বর্ষার পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ ধান দুই-চার মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। যাহোক রোপা হোক আর জলি হোক ঐতিহ্যবাহী জাতগুলো সবই দিবালোক-সংবেদী। যখনই রোপণ বা বপন করা হোক না কেন কার্তিক মাসের শেষ (নভেম্বর) দিকে ফুল আসবে। ঐতিহ্যবাহী বোরো ধান হাওর এলাকার সেচনির্ভর ধান। স্বাদ-গন্ধ-ব্যবহার উপযোগিতার কথা চিন্তা করেও নানা রকম ধানের জাত সৃষ্টি করা হয়েছে। লোককবিদের ছড়া-কবিতায়ও সেগুলো জায়গা করে নিয়েছে। যেমন: 

ইস্টির মধ্যে মামারা আর ধানের মধ্যে চামারা। কিংবা 


কচ-কচাকচ কচা-কচ ধান কাটিরে

ও ভাই ঝিঙ্গাশাইলের হুড়ুম ভালা

বাঁশফুলেরই ভাত

লাহি ধানের খইরে 

দইয়ে তেলেসমাত

তস্তরী গন্ধের চাইলের আলা

সেই চাইলের পিঠা ভালা

দাও কুটুমের হাতে রে।

অথবা 

কলমকাঠির পাতলা চিড়ে, হামাই ধানের খই, চিনি চালের পায়েস, খাবে এসো সই। 

কণকচূড় ধানের খই, নাজির শাইল, বহুরি ধানের মুড়ি, লতি শাইল, খইয়া বোরোর পিঠা, কাটারিভোগের চিড়া নামকরা। তাড়াতাড়ি রান্নার জন্য সীতাভোগ, বাঁশকাঠি ধানের চাল ভালো। পরমাই শাইল শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি, কবিরাজ শাইল স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের জন্য এক সময়ের প্রচলিত জাত ছিল। শুধু তাই নয়, বালাই ও বৈরী পরিবেশে সহনশীল জাত বাছাইয়ের কাজেও কৃষকরা দক্ষ ছিলেন। এক কথায় তাদের নির্বাচিত প্রতিটি জাতই আলাদা কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিল বা আছে। কিন্তু আজকের বর্ধিষ্ণু জনসংখ্যার চাপে উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবনের তাগিদে ওই সব ঐতিহ্যবাহী জাতের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক এরই মধ্যে হারিয়ে গেছে। অর্থাৎ ধানবৈচিত্র্য সংকুচিত হয়ে গেছে। তবে বিজ্ঞানীরা হিমঘরে রক্ষিত ঐতিহ্যবাহী জাতগুলোর কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্যগুলো আধুনিক জাতগুলোর মধ্যে সংযোজন করে নতুন করে ধানবৈচিত্র্য সৃষ্টির চেষ্টা করছেন। 

পরিশেষে বলতে হয়, ধান তো শুধু আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় নয় আমাদের রাজনৈতিক পরিচয়ও বটে। তাই জসীম উদ্‌দীনের ভাষায়—


মোর ধানক্ষেত, এইখানে এসে দাঁড়ালে উচ্চ শিরে,

মাথা যেন মোর ছুঁইবারে পারে সুদূর আকাশটিরে!

এইখানে এসে বুক ফুলাইয়া জোরে ডাক দিতে পারি,

হেথা আমি করি যা খুশী তাহাই, কারো নাহি ধার ধারি।

হেথায় নাহিক সমাজ-শাসন, নাহি প্রজা আর সাজা,

মোর ক্ষেত ভরি ফসলেরা নাচে, আমি তাহাদের রাজা।

জীবন কৃষ্ণ বিশ্বাস: মহাপরিচালক (ভূতপূর্ব), বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট; নির্বাহী পরিচালক (ভূতপূর্ব)

কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশন