বাংলাদেশে এখন প্রতিটা জেলা শহরেও আছে নানা জাতের খাবারের দোকান। রেস্টুরেন্ট বলে কেউ, ফুড কোর্ট বলে কেউ। এসব রেস্টুরেন্টের খাদ্যতালিকায় ভাতের অবস্থান সর্বনিম্নে। কোনো কোনোটিতে হয়তো থাকেই না। দিনকে দিন ভাত খাওয়ার প্রতি অনীহা দেখা যাচ্ছে। স্বাস্থ্যগত কারণ যেমন আছে, তেমনি আছে পশ্চিমা খাবারের প্রচারও। তবু এখনো এ দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর প্রধান খাদ্য ভাত। আর সে ভাত আসে ধান থেকে। যদিও ভাত বা ধান নিয়ে একালের মানুষের তেমন কোনো উচ্ছ্বাস দেখা যায় না, কিন্তু ধান ভাস্বর হয়ে আছে পৃথিবীর ইতিহাসের সঙ্গে। জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ধান কেবল ইতিহাসের পাতায় না, মিশে গেছে সংস্কৃতি ও ধর্মের সঙ্গেও।
ধানের সঙ্গে ধর্মের যোগ আছে বা ধর্মের সঙ্গে ধানের। লোকায়ত আচারে দেখা যায় নানা সময় দেবতার থানে উৎসর্গ করা হয়েছে ধান। কেইন অ্যান্ড আবেলের পুরনো গল্পটাও স্মরণ করা যেতে পারে এক্ষেত্রে। ভক্তির নিদর্শন হিসেবে আবেল এক গোছা শস্য নিবেদন করেছিল ঈশ্বরকে। সেটা ধান না যব তা নিয়ে কথা হতে পারে, তবে ওই একই ধারায় স্রষ্টার উদ্দেশে বহু সময় ধান্য নিবেদন করেছেন কৃষক, গোত্র বা সমাজপতি। ধর্মের পাশাপাশি আছে সিম্বল ও আর্টে। হ্যানয়ের ওয়াটার পাপেটের দিকে তাকালে দেখা যায় ফসল কাটার বিষয়টি রাখা হয়েছে সেখানে। থাইল্যান্ডের Mae Posop ধানের দেবী। ভারতীয় উপমহাদেশেও আমরা দেখি দেবী অন্নপূর্ণাকে। কোনো সন্দেহ নেই ভারতে অন্ন মানে ভাত আর ভাত আসে ধান থেকে।
পৃথিবীর মানুষ একসময় ছিল শক্তির উপাস্য। তখনো দেবদেবী তৈরি হয়নি। কিন্তু মানুষ বিশ্বাস করত বড় কোনো শক্তি তাদের প্রয়োজনীয় উপকরণ দিয়ে থাকে। দেবতাদের শুরু মূলত সেখান থেকেই। এরপর দিনে দিনে তৈরি হয় বিশেষায়িত দেবতা—কেউ বর্ষার, কেউ সৃষ্টির, কেউ খাদ্যের। মানুষ এটা জানত যে ফসল তাদের সরাসরি বাঁচিয়ে রাখে। কিন্তু তা দেয় বড় কোনো শক্তি। তাই এদের প্রতিমা তৈরি করে মানুষ উপাসনা শুরু করে মন্দিরে। মনে রাখা দরকার, ধান কেবল তাদের বর্তমান প্রয়োজন মেটানোই নয়, কৃষিসমাজে তা হয়ে উঠেছিল ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার উৎস। পাশাপাশি ক্ষমতাও উৎসও হয়ে উঠেছিল ধান। কেননা এর মাধ্যমে সমৃদ্ধি অর্জন করত গোত্র বা গোষ্ঠী।
দেবতাদের ইতিহাস লক্ষ করলে দেখা যাবে তাদের মধ্যে কেউ কেউ ছিল রীতিমতো প্রতিশোধপরায়ণ। এদের তুষ্ট করার প্রতি মানুষের মনোযোগও ছিল বেশি। স্মরণ করা যায় জাভার একটি লোককথা। সেখানকার এক চরিত্র তিষ্ণাবতী একজন দেবতার কন্যা। প্রেমে পড়েন জকসুদন নামে এক মানুষের। দেবতা-পিতা তাকে মেনে নেন না। শাস্তি হিসেবে পিতা তিষ্ণাবতীকে ধান গাছে পরিণত করেন। এ ঘটনায় জকসুদন পাগলপ্রায় হয়ে ওঠে। দুই প্রেমীর এমন দশা দেখে তিষ্ণাবতীর পিতা জকসুদনকেও ধান গাছে পরিণত করে এবং তাকে তিষ্ণাবতীর সামনে রোপণ করে। এভাবেই তাদের মিলন হয়। এ কথা জাভায় এখনো ফসল কাটার উৎসবের সময় স্মরণ করা হয়। উৎসব করে তুষ্টি কামনা করা হয় দেবতার।
অন্য অনেক দেবদেবী আবার মানুষের প্রতি উদার। তামিলনাড়ুর ধান্যদেবীর নাম পোনিআম্মা। এটি মূলত পোনি ও আম্মার যুক্তরূপ। পোনি অর্থ ধান, আম্মা একদিকে মা অন্যদিকে দেবীর সম্বোধন হিসেবে ব্যবহার করা হয় (খুব সহজেই এ নামের সঙ্গে মিল পাওয়া যায় অন্নপূর্ণার)। তামিলনাড়ুতে মাঝে মাঝেই বড় ধরনের বন্যা হয়। সে কারণে পোনিআম্মার একটি প্রতিমা তৈরি করা হয়েছিল এবং তার সামনে ধান উৎসর্গ করার পাশাপাশি ভালো ফসলের জন্য নানাভাবে প্রার্থনা করা হয়।
দেবদেবী ছাড়াও ধান নিয়ে রয়েছে নানা লোককথা ও উপকথা। এমন একটি চীনা উপকথা উল্লেখ করার মতো। চীনে একবার বড় ধরনের একটি বন্যার পর মানুষ আশ্রয় নিয়েছিল পাহাড়ে। সে সময় একটি কুকুর তাদের কাছে আসে। কুকুরের লেজে ছিল বীজধান। সে ধান জমিতে পড়ে সেখান থেকে নতুন করে ধান গাছ হয় এবং ওইসব মানুষ নতুন করে বসতি গড়ে তোলে। ধানের ইংরেজি নাম পেডি হওয়ার পেছনেও আছে একটি চীনা মিথ। হো জির নামে এক শিকারির ছিল পাঁচ পুত্র। শিকারি সে পুত্রদের পাঁচটি বস্তা দিয়ে বলেছিলেন শণ, গম, বজরা, শিম ও ধান দিয়ে পূর্ণ করে আনতে। যে সন্তান ধান দিয়ে বস্তা পূর্ণ করে এনেছিল তার নাম ছিল ফাদি। চীনা লোককথা অনুসারে ফাদি থেকেই এসেছি পেডি।
দেবদেবীর ক্ষেত্রে একটা সাধারণ পরিচিত প্যাটার্ন দেখা যায়। তামিল হোক, বাংলা বা জাভা—ধানের ক্ষেত্রে দেবীই প্রধান। তবে ফিলিপাইনে খানিকটা বৈচিত্র্য আছে। ফিলিপাইনের ইফুগাওয়ে বুলোল (বুলুল নামেও পরিচিত) নামে নারী-পুরুষ জুটির প্রতিমা দেখা যায়। তারাও সেখানকার ফসলের দেবদেবী। অন্যদিকে জাপানের ধান্য দেবতার নাম ইনারি। জাপানি পুরাণ অনুসারে তিনিই প্রথম ধান চাষ করেছিলেন। জাপানের অনেক পরিবারেই ইনানিরি একটি ছোট মূর্তি থাকে। এছাড়া শিনতো ও বৌদ্ধ বিহারে ইনারির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয়। ইনারিকে দেখা যায় দুই বস্তা চাল নিয়ে একটি খেঁকশিয়ালের পিঠে চড়ে থাকতে। অবশ্য এ থিমে নানা ধরনের প্রতিমাই তার দেখা যায়। এগুলো মূলত নানা অঞ্চলে প্রচলিত মিথ ও লোককথা অনুসারে তৈরি। তারা যেভাবে ধানের সন্ধান পেয়েছিল বা ধানের দেবতাকে কল্পনা করেছিল তা-ই ফুটিয়ে তুলেছে কল্পনা থেকে।
ধান নিয়ে তাই উৎসবও হয় বা উৎসবের সঙ্গে আছে ধানের যোগ। বাংলাদেশের কথাই ধরা যাক। আধুনিক যুগে নবান্ন কেবল কেতাব-সর্বস্ব হলেও একটা সময় নবান্ন ছিল বিশেষ উৎসব। ফসল উঠলে তখনই নবান্ন। নব+অন্ন। নতুন ধানের ঘ্রাণের সঙ্গে কৃষকের ঘরে আসত সমৃদ্ধির বার্তা। আর সে সমৃদ্ধিকে উদযাপন করতে তারা উৎসব করতেন। এর মধ্যে প্রধান ছিল নানা মিষ্টান্ন তৈরি। আজকের দিনে মিষ্টান্ন বলতে মিষ্টি বোঝানো হলেও সেকালে মিষ্টান্ন মানে ছিল মিষ্টি ভাত তৈরি করা। পায়েস তার মধ্যে অন্যতম। এছাড়া চালের গুঁড়া দিয়ে পিঠা তৈরি ও ভাতের নানা মিষ্টি পদও তৈরি হতো। এর বাইরে ছিল আরো কিছু লোকাচার, যা একদমই বাংলার নিজস্ব।
কিন্তু কেবল বাংলা না, এর বাইরেও ধানকে ঘিরে আছে উৎসব। আর উৎসবে যুক্ত হয় ধান ও ধানের দেবী। এর মধ্যে বালিতে ফসল কাটার উৎসবের সময় ধানের দেবীর উপাসনা করে। দেবীর নাম দেবী শ্রী। তিন পর্বে তাকে সম্মান জানানো হয়। এর মধ্যে প্রথমে থাকে তিষ্ণাবতীর উপাসনা, এরপর মে পসপ এবং সবশেষে ধানের দেবীকে মরণশীল একটি সত্তা হিসেবে উপাসনা করা হয়। উৎসবের সময় বালির গ্রামগুলো নানা রকম পতাকা দিয়ে সাজানো হয়। চালের গুঁড়া দিয়ে তৈরি হয় দেবী শ্রীর অবয়ব। এছাড়া অন্যান্য দ্রব্য দিয়ে তৈরি প্রতিমায় চালের গুঁড়া লেপা হয় এবং সেসব স্থাপন করা হয় ফসলের মাঠে। খড় দিয়ে তৈরি প্রতিমা ঝুলিয়ে রাখা হয় ফসলের মাঠে। বিশ্বাস করা হয় দেবী রক্ষা করবেন ফসল।
বালি ও জাভার মানুষের বিশ্বাস ফসলের গোলা আসলে পূর্বপুরুষদের বসতি। সে কারণে তারা গোলা তৈরি করে ঘরের আদলে। তাদের বিশ্বাস পরবর্তী ফসলের মৌসুম আসার আগ অবধি পূর্বপুরুষ যথেষ্ট খাবার পাবে। উৎসবের জন্য হাতে তৈরি করা হয় নানা ধরনের প্রতিমা এবং তা রাখা হয় গোলার ভেতরে। এছাড়া ঝলসানো হাঁস ও শূকর মাংস দিয়ে ভোজ দেয়া হয়। আরো থাকে নাসি গোরেং (বিশেষ ধরনের ফ্রায়েড রাইস), ভাতের তৈরি মিষ্টি পদ ও ডাম্পলিং।
খাবারের বাইরে ধান, চাল, ফসলের দেবী থাকেন নানা শিল্প ধারা, উৎসব ও চিহ্নের মধ্যে। উৎসব ধরেই আগানো যাক। তামিলনাড়ুতে চার দিনব্যাপী ফসল কাটার উৎসব পালন করা হয়। পোংগাল এর নাম। এতে সূর্য, বর্ষা, গৃহপালিত পশু ও ফসলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো হয়। প্রথম দিন অগ্নিকুণ্ঠে ফেলা হয় পুরনো অব্যবহৃত জিনিস। ঘর পরিষ্কার করে গৃহস্থ। এছাড়া দেয়া হয় আল্পনা—রঙ্গোলি। চালের গুঁড়া দিয়ে ঘরের প্রবেশমুখে আল্পনা করা হয়। কৃষকরা তাদের লাঙলে মাখেন চন্দন। দ্বিতীয় দিন সূর্যের উপাসনা করা হয়। উৎসর্গ করা হয় পায়েস। বদল ও গরুকে গোসল করানো হয় তৃতীয় দিন। সেদিন কৃষকের ঘর সাজে নানা ফুলে। এদিন কৃষক পরিবারও পায়েস খায়। চতুর্থ দিন নারীরা ভাতের বল তৈরি করে মাঠে ছড়িয়ে দেয় পাখিদের জন্য। পোংগালের সময়টা বিয়ের জন্যও প্রশস্ত বিবেচনা করা হয়।
জাপানের ওসাকায় ধান রোপণের উৎসবটি হয় পুরনো ধারা অনুসরণ করে। ধান মাড়াই করা হয় পুরনো ধারায় ষাঁড় দিয়ে। আবার এখন অনেক বহুতল ভবনের ছাদে ধান চাষ করা হয়। এছাড়া ফসলের উৎসব করতে নানা ধরনের ঐতিহ্যবাহী নাচের পাশাপাশি পরিবেশিত হয় গান। গানের সময় শিল্পীদের মাথায় থাকে খড়ের তৈরি হ্যাট। এদিকে চীনে লা বা রাইস পরিজ ফেস্টিভ্যাল নামে উৎসব আয়োজন করা হয়। কেবল এশিয়াই নয়, আফ্রিকায়ও ধান ও ভাত বিশেষ মর্যাদা পায়। বিশেষত পশ্চিম আফ্রিকায় বিভিন্ন উৎসবে ভাত খাওয়া ও পরিবেশনের প্রচলন আছে। ধানের সঙ্গে নারীর উর্বরতার তুলনা করে তারা।
কৃষির ইংরেজি এগ্রিকালচার। বলা যায় কালচার শব্দটা এখানে যুক্ত। ফলে সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত ফসল। এ কারণে ধানের খবর পাওয়া যায় সাহিত্যে, গানে, চিত্রকলায় এমনকি নানা নকশা ও সিম্বলে। বাংলাদেশের জাতীয় প্রতীকেই আছে ধান—জাতীয় ফুল শাপলাকে বেষ্টন করে আছে দুটো ধানের শিষ। ধান আরো অনেক স্থানে, অনেক চিত্রে এসেছে। ধান নিয়ে আছে নানা প্রবাদও। এর মধ্যে কয়েকটি উল্লেখ করার মতো।
কম্বোডিয়ায় বলে—একজন ক্রুদ্ধ ব্যক্তিকে বাসন ধুতে দিয়ো না, আর ক্ষুধার্তকে রেখো না ধান পাহারায়।
ইতালিতে বলা হয়—ধানের জন্ম পানিতে আর মৃত্যু মদে।
মাহমুদুর রহমান: লেখক





