জোলা কথাটি সব শ্রেণীর মুসলমান তাঁতিদের কাছেই নিন্দনীয়। শুধু তাই বা কেন, জোলা শব্দটি গালিগালাজ হিসেবেও ব্যবহৃত। আরবি শব্দ আহম্মক মানে বোকা, জোলা শব্দের সমার্থক। জোলাদের আহম্মকির অনেক মজার মজার গল্প চালু আছে। ঢাকায় বহুল প্রচলিত গল্পটি হচ্ছে, ঢাকার অনতিদূরে ড্যামরার তাঁতিপাড়ার একদল লোক রাতের বেলায় পালাতে গিয়ে কী করে বোকামির জন্য পারেনি।

রাতের অন্ধকারে সবাই গ্রাম থেকে পালাবে। কিন্তু নৌকাটি যে কিনারে দড়ি দিয়ে লগির সঙ্গে বাঁধা আছে, এটা খেয়াল করল না। রাতভর দাঁড় বইল। কিন্তু সকালে দেখে তারা যেখানে ছিল সেখানেই আছে। তাজ্জব ব্যাপার। অনেক মাথা খাটিয়ে তারা বের করল, তারা পালাতে চাইলে ডি হবে, ড্যামরা তাদের ছাড়তে চাইছে না। ভারতে দল বেঁধে লোকের বোকামি করার কথা শুনলে মনে করতে হবে, হয় তারা জংলি গাড়ল আর নয়তো কোনো ধর্মে নবদীক্ষিত। এ রকম মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে যে অতীতে এরা ছিল অবহেলিত বর্ণের হিন্দু। তারপর কোনো একসময়ে একত্রে মুসলমান ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছে সবাই। নতুন ধর্মে দীক্ষিত লোকেরা নব আচার অনুষ্ঠান পালনে যে রকম মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করে, এরা শিয়া রীতিনীতি অনুসরণেও সে রকম বাড়াবাড়ি করে। মহররম মাসে তারা চুল আঁচড়ায় না, পান খায় না কিংবা মাছ রান্না করা হাঁড়ির রান্না খায় না। এছাড়া মহররম মাসের পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম দিনে তারা দুই শহীদানের স্মৃতিতে বন্ধি ও কাফনি পট্টি বাঁধে হাতে। এদের সম্প্রদায়ের দলপতিকে বলা হয় মাতব্বর। মালিক, মণ্ডল, কারিগর ও শিকদার হলো এদের পদবি। আগের দিনে এদের মধ্যে এক রেওয়াজ প্রচলিত ছিল, সাধারণত যা মুসলমানদের মধ্যে নজরে পড়ে না। মুসলমানদের বিয়েতে কাজির সামনে চুক্তিনামা হিসেবে যে “কাবিন” করতে হতো তা এরা করত না। তবে পরবর্তীকালে ওই প্রথা তো চালু হয়ই। তার ওপর মহরনামা প্রথাও চালু হয়।

জেমস ওয়াইজ: ব্রিটিশ সিভিল সার্জন ও লেখক

(লেখাটি সুবর্ণ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত ‘পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন জাতি, বর্ণ ও পেশার বিবরণ’ বই থেকে নেয়া)