ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হওয়া বাঙালি জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই মূলত অনার্য জাতিগোষ্ঠী। কেউ কেউ নিম্নবর্ণের হিন্দু হলেও বড় অংশ ছিল বৌদ্ধ সম্প্রদায়ভুক্ত। পেশার দিক থেকে তারা জড়িত ছিল খেতমজুর, দিনমজুর, জেলে, তাঁতি, নাপিত প্রভৃতির সঙ্গে। কেউ উচ্চ পদ পাওয়ার লোভেও ইসলাম গ্রহণ করেছিল। ফলে ইসলাম ও স্থানীয় সংস্কৃতির একটা মিশেল ঘটেছিল নয়া জীবন ব্যবস্থায়। রামাই পণ্ডিত থেকে ফকির গরিবুল্লাহ পর্যন্ত সাহিত্যিক দলিলে বাংলায় ধর্মীয় সমন্বয় প্রচেষ্টার গভীর প্রবণতা দেখা যায়। স্পষ্ট হয় পুঁথি সাহিত্যেও, যেখানে ইসলামী উপাদানের সঙ্গে দ্বিধাহীনভাবে যুক্ত হয়েছে লোকজ বিশ্বাস ও আচার। জীবনযাপনের তাগিদে সমাজের নিচুতলায় থাকা মানুষ সাংস্কৃতিক বিশুদ্ধবাদ নিয়ে সে অর্থে মাথাব্যথা দেখায়নি। জোলা সম্প্রদায় নিয়ে চর্চার ক্ষেত্রে বিষয়টি সবার আগে জরুরি।
কিতাবি ভিত্তি না থাকলেও সামাজিকভাবে শেখ, মোল্লা, কাজী, সৈয়দ, চৌধুরী সম্প্রদায়ভুক্ত মুসলিমরা বাঙালি সমাজে প্রভাব বিস্তার করে রেখেছিল। অঘোষিতভাবেই অভিজাতরা ছিলেন ‘আশরাফ’ সম্প্রদায়ভুক্ত; আর সাধারণ মজুর, কৃষক, শ্রমিক মুসলমানরা ছিল ‘আতরাফ’। এখনো ভারতবর্ষের এমন কিছু এলাকা আছে, যেখানে নিম্নবর্ণের বা আতরাফদের সঙ্গে উচ্চবর্ণের বা আশরাফদের বৈবাহিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে না। যদিও শিক্ষার প্রসারের কারণে এ ব্যবধান ধীরে ধীরে কমে আসছে। শ্রেণী তালিকায় সে শ্রমিক মুসলমানের তালিকায় রয়েছে জোলা, হাজাম, বেদে প্রভৃতি নাম।
বাংলা প্রাচীনকাল থেকেই তাঁত শিল্পের কেন্দ্র। তাঁতকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল নানা পেশা। ইসলাম আগমনের পর সে শ্রেণী-পেশার মানুষকে প্রভাবিত করেছে। হিন্দু, বৌদ্ধ ও নাথ ধর্মের সঙ্গে ইসলামের উপাদান মিশে গিয়ে নিজস্ব এক স্রোত তৈরি করে। মঙ্গলকাব্য ও পুঁথি সাহিত্যে তার কিতাবি প্রমাণ। আর জোলা, হাজাম ও বেদেরা হলো সে সমন্বয়ী প্রক্রিয়ার চলমান ফসিল।
সাময়িক হলেও মুসলিম সমাজে যে একটা সামাজিক বৈষম্য তৈরি করে রেখেছে, তার প্রমাণ জোলা শব্দটিকে গালি বা ব্যঙ্গার্থে ব্যবহার। জোলা-আনসারি-মোমিন (তাঁতি) সম্প্রদায় ভারতীয় মুসলিমদের এরকমই একটি নিম্ন সম্প্রদায়ভুক্ত জনগোষ্ঠী। জোলা সম্প্রদায়ের মানুষ বংশপরম্পরায় মূলত তাঁত কাপড় ও অন্যান্য বস্ত্র বয়নের সঙ্গে যুক্ত। তাদের বড় একটা অংশ নিম্নমানের তাঁত বস্ত্র বা গামছা বোনার সঙ্গে যুক্ত ছিল। তবে আধুনিক সময়ে এসে অনেকেই ভিন্ন পেশায় চলে যাচ্ছে।
সাংস্কৃতিক পরিচয়ের দিক থেকে জোলারা মুসলমান। কিন্তু বাংলার ধর্মীয় ইতিহাস সমন্বয়ধর্মী। অর্থাৎ এখানে ইসলাম প্রবেশের পর স্থানীয় লোকাচারের মিশেল ঘটেছে ব্যাপকভাবে। ফলে পূর্বতন অনেক বিশ্বাস ও আচার থেকে গেছে মানুষের যাপিত জীবনে। জোলা সম্প্রদায়ের মানুষ অমুসলিম রীতি যে ঠিক কতটা মেনে চলে তার আরো কিছু দৃষ্টান্ত দেয়া যায়। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের জোলারা হিন্দুদের নবান্ন উৎসবের মতোই তারা প্রতি বছর অঘ্রাণ মাসের যেকোনো বৃহস্পতিবার পিঠা উৎসব পালন করে। অঘ্রাণ মাসের শেষ শনিবার বিপদমুক্ত থাকার জন্য ওলাবিবিকে স্মরণ করে ভাত ও মাংস (ফতেহা) রান্না করে। কালী পূজার অমাবস্যা রাত্রিতে হিন্দু সম্প্রদায়ের মতোই ভাত না খেয়ে পালন করে দিনটিকে। শুধু তাই নয়, হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন পূজা অনুষ্ঠানের মণ্ডপে এ সম্প্রদায়ের উপস্থিতিও চোখে পড়ার মতো। এসব থেকে স্পষ্ট তারা পার্শ্ববর্তী হিন্দু সংস্কৃতি সম্পূর্ণ ত্যাগ করতে পারেনি। অবশ্য শিক্ষার প্রসার ঘটায় তারা শরিয়তি ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে জ্ঞাত হওয়ার জন্য তাদের মধ্যে প্রচলিত লৌকিক ইসলামী রীতিগুলো কমতে কমতে প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো পর্যায় পৌঁছেছে।
জোলা পরিচয়কে সামাজিকভাবে অসম্মানজনক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে বছরের পর বছর। পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে তাঁত বস্ত্রের বাজারে তাদের প্রভাবের ক্ষয়িষ্ণুতার গল্প। ফলে পরবর্তী প্রজন্মের মানুষ পেশাটাকে ছেড়ে দিচ্ছে। খোদ জোলা পরিচয়ই যখন সংকটের মুখে, তাদের সাংস্কৃতিক বিবর্তনের ইতিহাস উদ্ধার করা সেখানে সহজ কাজ নয়। তবে এ কথা স্পষ্ট, বাংলায় যে সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে বর্তমান অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে; সেখানে স্বতন্ত্র মাপকাঠি জোলা।
মুহম্মদ আল মুখতাফি: লেখক ও সাংবাদিক









