করপাস সেপারেটাম
লাতিন এ শব্দযুগলের মানে ‘পৃথক করা দেহ’ বা বিচ্ছিন্ন দেহ।
১৯৪৭-এর জাতিসংঘ প্যালেস্টাইন ভাগ পরিকল্পনা অনুযায়ী জেরুজালেম শহরের বিশেষ ধর্মীয় গুরুত্ব বিবেচনায় এনে একে আন্তর্জাতিক অঞ্চল হিসেবে বিশেষ মর্যাদা দেয়া হয়। দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি সদস্য এর সমর্থন করে। এ আন্তর্জাতিক অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ, শাসন ও পরিচালনার দায়িত্ব নেবে জাতিসংঘের ট্রাস্টিশিপ কাউন্সিল (অছি পরিষদ)।
আরবরা চেয়েছিল জেরুজালেমের দখল পুনরুদ্ধার করতে আর ইসরায়েলের চাওয়া ছিল পবিত্র উপাসনালয় ছাড়া পুরো জেরুজালেমের ওপর সার্বভৌমত্ব করপাস সেপারেটাম হিসেবে বিবদমান অংশে কারো সার্বভৌমত্ব রহিত থাকবে। পক্ষগুলো নিজ নিজ সৈন্য প্রত্যাহার করে নেবে, জাতিসংঘ সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করবে।
ইউরোপিয়ান ইউনিয়নসহ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ শেষ পর্যন্ত জেরুজালেমের করপাস সেপারেটাম মর্যাদাকে সমর্থন জানিয়েছে। করপাস সেপারেটামের সমর্থক যুক্তরাষ্ট্রও ছিল। এ সমর্থন যে প্রত্যাহার করে নিয়েছে, তা কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি।
কিন্তু ২৩ অক্টোবর ১৯৯৫ মার্কিন কংগ্রেস ‘জেরুজালেম এম্বাসি অ্যাক্ট’ পাস করে। তাতে বলা হয়: জেরুজালেমকে ইসরায়েল রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হবে এবং ৩১ মে ১৯৯৯-এর মধ্যে সেখানকার যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস জেরুজালেমে স্থানান্তর করা হবে।
আইন পাস করা হলেও বাস্তব কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়নি, কারণ বিষয়টির সংবেদনশীলতা সম্পর্কে ট্রাম্প-পূর্ববর্তী সব প্রেসিডেন্টই সচেতন ছিলেন। আইনি বিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট বাস্তবায়নের সময় ছ’মাস করে বৃদ্ধি করে আসছেন। বছরে দুবার এ নথি প্রেসিডেন্টের কাছে যাচ্ছে এবং তিনি যথারীতি ছ’মাস বৃদ্ধির অনুমোদন দিয়ে যাচ্ছেন। এমনকি ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতেও একবার ছ’মাস বৃদ্ধির অনুমোদন হয়েছে। তিনি প্যালেস্টাইনকে প্ররোচনা দিয়ে সমস্যা জটিলতর করা ঠিক হবে না বলে মনে করেছেন। কিন্তু এরপর একই সঙ্গে ইহুদি চাপ এবং ইভাঞ্জেলিক খ্রিস্টানদের চাপে তাকে তার নির্বাচন প্রতিশ্রুতিতে ফিরে যেতে হয়েছে এবং তিনি মূলত তার রক্ষণশীল ভোটারদের সন্তুষ্ট করতে এ ঘোষণা দিয়েছেন। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ তার ঘোষণার নিন্দা করেছে, এমনকি ব্রিটেনেও বেলফোর ঘোষণার শতবর্ষে পুরো বিষয়টি বিবেচনা করে সংশোধনের দাবি উঠেছে।
জেরুজালেম ’ল ১৯৮০
আন্তর্জাতিক বিধিবিধানের তোয়াক্কা না করে ৩০ জুলাই ১৯৮০ ইসরায়েল পার্লামেন্ট নেসেট দ্য ব্যাসিক ’ল: জেরুজালেম ক্যাপিটাল অব ইসরায়েল পাস হয়। এটি প্রাইভেট মেম্বারস বিল হিসেবে নেসেটে উত্থাপন হয়। এ আইনের বিষয়বস্তু:
১. অখণ্ড ও বৃহৎ জেরুজালেম হবে ইসরায়েলের রাজধানী।
২. প্রেসিডেন্টের কার্যালয়, নেসেট, সরকার প্রধানের কার্যালয় এবং সুপ্রিম কোর্ট জেরুজালেমে অবস্থিত থাকবে।
৩. পবিত্র ধর্মীয় স্থান সুরক্ষিত রাখা হবে, পবিত্র স্থানের সম্ভ্রম রক্ষার জন্য আইন ভঙ্গকারীদের প্রতিহত করা হবে।
৪. ২৮ জুন ১৯৬৭ জারি করা অর্ডিন্যান্সে নির্ধারিত সীমানার অখণ্ড ভূমিই জেরুজালেম বলে বিবেচিত হবে (অর্থাৎ ১৯৬৭-র ছয়দিনের যুদ্ধে দখল করা পূর্ব জেরুজালেমও অন্তর্ভুক্ত)।
আইন স্বাক্ষরকারী প্রধানমন্ত্রী মেনাথেম বেগিন ও প্রেসিডেন্ট ইয়াজাক ন্যাভন।
জেরুজালেম: সংক্ষিপ্ত কালপঞ্জি
৪৫০০-৩৫০০ খ্রিস্টপূর্ব : প্রথম বসতি।
২০০০ খ্রিস্টপূর্ব : শহরের নাম রুসালিমাম।
১৫৫০-১৪০০ খ্রিস্টপূর্ব : মিসরের দখলাধীন করদরাজ্য।
১০১০ খ্রিস্টপূর্ব : বাদশাহ দাউদের আক্রমণ ও দখল।
৯৬২ খ্রিস্টপূর্ব : বাদশাহ সোলায়মানের প্রথম মন্দির নির্মাণ।
৭৩৩ খ্রিস্টপূর্ব : আসিরিয়ান সাম্রাজ্যের করদরাজ্য।
৬০৯ খ্রিস্টপূর্ব : মিসরের রাজ্য।
৫৩৯ খ্রিস্টপূর্ব : পারস্য সাম্রাজ্যের অংশ।
৩৩২ খ্রিস্টপূর্ব : আলেকজান্ডারের দখলে।
৩১২ খ্রিস্টপূর্ব : মিসরের দখলে।
৬৩ খ্রিস্টপূর্ব : রোমান সাম্রাজ্যের অংশ।
৬৪-৬৮ খ্রিস্টাব্দ : ইহুদি ও খ্রিস্টান নিধন।
১১৫ খ্রিস্টাব্দ : ইহুদি বিদ্রোহ।
৩২৫ খ্রিস্টাব্দ : শহরে প্রবেশে ইহুদিদের ওপর নিষেধাজ্ঞা।
৬১০ খ্রিস্টাব্দ : হযরত মোহাম্মদ (স.) টেম্পল মাউন্ট (হারাম শরিফ) গমন। জেরুজালেমে ইসলামের শুরু।
৬১৭ খ্রিস্টাব্দ : খ্রিস্টানদের হাতে ইহুদি গভর্নর নিহত।
৬২৪ খ্রিস্টাব্দ : মক্কা ও মদিনা ইসলামের প্রধান তীর্থ হয়ে যাওয়ায় মুসলমানদের কাছে জেরুজালেমের গুরুত্ব হ্রাস।
৬২৯ খ্রিস্টাব্দ : বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের দখলে।
৬৩৬ খ্রিস্টাব্দ : খলিফা ওমর দখল করে নেন।
৭০৫ খ্রিস্টাব্দ : উমাইয়া খলিফা প্রথম আল ওয়ালিদের মসজিদ আল আকসা নির্মাণ।
১০৯৯ খ্রিস্টাব্দ : খ্রিস্টীয় ক্রুসেডারদের জেরুজালেম দখল।
১১০৪ খ্রিস্টাব্দ : মসজিদ আল আকসাকে জেরুজালেম রাজ্যের রাজপ্রাসাদ করা হয়।
১১৮৭ খ্রিস্টাব্দ : সালাহউদ্দিন জেরুজালেম পুনর্দখল করেন
১২১২ খ্রিস্টাব্দ : ৩০০ র্যাবাই-ইহুদি ধর্মযাজক ইউরোপ থেকে জেরুজালেম এসে বসতি স্থাপন করেন।
১২৬০ খ্রিস্টাব্দ : মামলুক সাম্রাজ্যের অংশ
১৫১৬ খ্রিস্টাব্দ : তুর্কি-ওসমানিয়া সাম্রাজ্যের অংশ
১৮৮২ খ্রিস্টাব্দ : ২৫-৩৫ হাজার ইহুদি অভিবাসীর আগমন ও বসতি স্থাপন
১৯১৭ খ্রিস্টাব্দ : ওসমানিয়া সাম্রাজ্যের পতন, ব্রিটেনের দখলে। ব্রিটিশ জেনারেল অ্যালেনবি ওমরের অনুসরণে হেঁটে জেরুজালেম শহরে প্রবেশ করেন। ১৩০০ বছর আগে ৬১৭ সালে খলিফা ওমরও হেঁটে জেরুজালেমে ঢুকেছিলেন। বেলফোর ঘোষণা। ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি।
১৯১৮-২০ খ্রিস্টাব্দ : জেরুজালেম ব্রিটিশ সেনা শাসনের অধীনে।
১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ : জাতিসংঘ পার্টিশন প্ল্যান এবং জেরুজালেমকে করপাস সেপারেটাম ঘোষণা।
১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দ : আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ। ১৪ মে ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা।
১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দ : ৫-১১ জুন ছয়দিনে যুদ্ধ-পূর্ব জেরুজালেমসহ বিশাল প্যালেস্টানি ভূখণ্ড ইসরায়েলের দখলে। অখণ্ড জেরুজালেমের ঘোষণা।
২০০০ খ্রিস্টাব্দ : দ্বিতীয় ইন্তিফাদা-গণঅভ্যুত্থান
২০১৭ খ্রিস্টাব্দ : ডোনাল্ড ট্রাম্প জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী স্বীকৃতি দিয়ে তেল আবিব থেকে দূতাবাস স্থানান্তরের নির্দেশ দেন।
প্রতিবাদের ঝড়
হামাস নতুন ইন্তিফাদার ঘোষণা দেয়।
জেরুজালেম গ্রন্থ
আগাথা ক্রিস্টির বিখ্যাত উপন্যাস ‘অ্যাপয়েন্টমেন্ট উইথ ডেথ’-এ কাহিনীর প্রেক্ষাপটে রয়েছে জেরুজালেম শহর। অন্তত চারজন নোবেল পুরস্কারবিজয়ী কথাসাহিত্যিক জেরুজালেমকে ভিত্তি করে ফিকশন ও নন-ফিকশন রচনা করেছেন: হোসে সারামাগোর ‘দ্য গসপেল অ্যাকর্ডিং টু জেসাস ক্রাইস্ট’, সেলমা লাগেরলফের ‘জেরুজালেম’, পার লাগেরভিস্টের ‘বারাব্বাস’ এবং সল বেলোর ‘টু জেরুজালেম অ্যান্ড ব্যাক’।
জেরুজালেম নিয়ে কিংবা জেরুজালেমভিত্তিক কয়েকটি গ্রন্থের উল্লেখ এ শহরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনুধাবনে সহায়তা করবে:
বেন হুর: এ টেল অব দ্য ক্রাইস্ট (লিউ ওয়ালেস) ওহ জেরুজালেম (লুরি কিং), দ্য টেস্টামেন্ট অব ম্যারি (কোম টোলবিন), আইখম্যান ইন জেরুজালেম: এ রিপোর্ট অন দ্য ব্যানালিটি অব ইভিল (কোম টলবিচ), এ টেইল অব লাভ অ্যান্ড ডার্কনেস (এমোস ওজ), দ্য লাস্ট টেস্টামেন্ট (স্যাম বোর্ন), লাইভ ফ্রম গোলগোথা: দ্য গসপেল অ্যাকর্ডিং টু গোর ভিডাল (গোর ভিডাল), এ টেইল অব দ্য ফল অব জেরুজালেম (এইচ রাইডার হ্যাগার্ড), দ্য সিজ অব জেরুজালেম: ক্রুসেড অ্যান্ড কনকোয়েস্ট ইন ১৯১৯ (কোনর কস্টিক)। অনস্বীকার্য অধিকাংশ বই-ই অর্ধসত্য ধারণ করছে।
এমনকি সল বেলোর টু জেরুজালেম অ্যান্ড ব্যাক একপেশে হওয়ায় তীব্র সমালোচনা করেছেন নোয়াম চমস্কি।
প্যালেস্টাইনের বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য জ্যা পল সার্ত্রের যে সহানুভূতি, বিশ্লেষকদের মতে, এটা তাঁর মার্কিনবিরোধী ভূমিকার বহিঃপ্রকাশ মাত্র, তাদের জন্য সার্ত্রের স্পষ্ট সমর্থন নয়।
আরো অর্বাচীন বক্তব্য শোনায়: ইসলাম কি পারে না এর ঐতিহ্যের ব্যাখ্যা বদলাতে, গুরুত্বের নিশানা পরিবর্তন করতে এবং ইহুদিদের ‘সামান্য দখল’ মেনে নিতে?
ইসরায়েলের ইহুদিদের মধ্যে যেমন লেখক সংখ্যা বেশি, তেমনি ইহুদিদের প্রতি সহানুভূতিপ্রবণ লেখকের সংখ্যাও বেশি হওয়ায় জেরুজালেম নিয়ে রচিত ফিকশন ও নন-ফিকশনগুলোর অধিকাংশই ইহুদিদের দিকে ঝুঁকে পড়া।
জেরুজালেম-বিষয়ক আরো কয়েকটি বইয়ের উল্লেখ প্রাসঙ্গিক: ডেভিড গ্রসম্যানের সামওয়ান টু রান উইথ, স্যাম বোর্নের দ্য লাস্ট টেস্টামেন্ট, অ্যালটন গ্রানস্কির উপন্যাস ক্রাইম সিন জেরুজালেম, হার্শেল শ্যাংকের দ্য ব্রাদার অব জিসাস, থিওডোর হার্জলের ওল্ড নিউ ল্যান্ড, মার্থা কেনেডির স্যাভিয়র, পল মেয়ারের দ্য থার্ড মিলেনিয়াম, জো সেক্কোর প্যালেস্টাইন, বোডি থনের জেরুজালেম ইন্টারলিউড।





