প্রবলভাবে পুরুষ-প্রাধান্যবিশিষ্ট ভারতীয় ও ইউরোপীয় আর্কাইভস থেকে কীভাবে ফিরিঙ্গি নারীদের কাহিনী উদ্ধার করা সম্ভব? ব্রিটিশ রাজের আমলে ফিরিঙ্গি পুরুষদের জীবনকাহিনী অধরা হয়ে উঠতে চাইলেও সেগুলো সেই সময়ের অল্প টিকে থাকা কয়েকজন নারীর কাহিনীর তুলনায় গতানুগতিক। এমনকি স্থানীয় মোগল নারীদের জীবন সম্পর্কে জানা কত কঠিন, তা থেকেই সমস্যার মাত্রা বোঝা যায়। আকবরের কিংবদন্তি স্ত্রী জোধা বাইকে ঘিরে থাকা বিতর্কের চেয়ে আর কোথাও সেটা এত স্পষ্ট নয়। কিংবদন্তি ও আধুনিক চলচ্চিত্রে আকবরের জীবনের ভালোবাসা ও মুসলিম-হিন্দু সম্প্রীতির মোগল সংস্কৃতির সহস্রষ্টা হিসেবে অমর হয়ে থাকলেও বাস্তব জোধা বাইয়ের কোনো নিশানা মেলে না। রক্তমাংসের মানুষটির খোঁজ করতে গেলেই আলফ্রেড হিচককের ভাষায়, উধাও হয়ে যান তিনি।
সালমান রুশদি এই বিপত্তি নিয়ে তার উপন্যাস দি এনচ্যান্টোরস অব ফ্লোরেন্সে মন্তব্য করেছেন, জোধা বাই উপন্যাসটির সূচনা পৃষ্ঠাগুলোর প্রধান চরিত্র হলেও ফতেহপুর সিক্রি প্রাসাদের অশরীরী এক প্রতিধ্বনিমাত্র। এমনকি মোগল সম্রাটসহ সবার চোখে অদৃশ্য হলেও পারসীয় চিত্রশিল্পী আব্দুস সামাদ ‘চেহারা না দেখেই স্বপ্নের স্মৃতি থেকে তার ছবি এঁকেছিলেন’। রুশদি একেই মোগল নারীদের ঐতিহাসিক ভূমিকা হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছেন বলে মনে হয়। আমরা কেবল অন্যদের গল্পেই তাদের কণ্ঠের ক্ষীণ প্রতিধ্বনি শুনতে পাই, আর আমাদের কল্পনার রঙে তুলি ভিজিয়ে তাদের ছবি আঁকি। রুশদি দেখিয়েছেন মোগল ইতিহাসের কথিত ‘বাস্তব’ নারীরা কীভাবে গল্পে বা গল্পের গল্পে পরিণত হয়েছেন। এক হাজার এক আরব্য রজনীর মতো মোগল নারীদের নিয়ে আমাদের কাহিনী কেবল সত্যিকারের মানুষই নয়, বরং ভিন্ন কাহিনীতেও পৌঁছে দেয়। স্বয়ং জোধা বাই বাস্তব নারী না হয়ে বরং একটা গল্পের সুতো, আবছা স্মৃতিতে থাকা বিচ্ছিন্ন সুতো থেকে বোনা— আকবরের প্রকৃত স্ত্রী হারকা বাই, জাহাঙ্গীরের স্ত্রী জোধ বাই (ইতিহাসের টেক্সটে দেয়া আকার ছাড়া বানান)। কিন্তু তিনি কখনই ছিলেন না।
সন্দেহ নেই রুশদির ব্যাপারটা অতিরঞ্জিত। যেমন ধরুন, বাবরের মেয়ে ও হুমায়ুনের বোন গুলবদন বানু বেগমের কথা (১৫২৩-১৬০৩)। আমরা পুরো আভহাল-ই হুমায়ুন বাদশা’য় (সারকামস্ট্যান্সেস অব এম্পেরর হুমায়ুন) গুলবদনের স্পষ্ট কণ্ঠস্বর শুনতে পাই; বাবা ও ভাইয়ের রাজ্যকাল সম্পর্কে তার উজ্জ্বল স্মৃতি। অন্যান্য মোগল রানী ও রাজকন্যা সম্পর্কেও অনেক কিছু জানি আমরা। তবে এটা নিশ্চিতভাবে সত্যি যে, মোগল ইতিহাসের বেশির ভাগ নারী— আদৌ পুরুষদের বর্ণনা করা তাদের সম্পর্কিত কাহিনীতে তাদের কথা উল্লেখ করা হলেও সেটা স্রেফ চকিত উল্লেখমাত্র। তাহলে মোগল সাম্রাজ্যের ফিরিঙ্গি নারীদের বেলায় কী হবে? খোদ রাজকীয় জোধা বাই-ই প্রতিধ্বনির যোগফল হয়ে থাকলে হিন্দুস্তানে পাড়ি জমানো আরো নগণ্য ফিরিঙ্গি নারীদের জীবনী উদ্ধারের আশা করি কীভাবে? যে কালে মোগল নারীদের মতোই ফিরিঙ্গিরাও প্রায়ই অন্তঃপুরবাসিনী আর নামহীন ছিলেন, সেই সময়ে তাদের সুলুক সন্ধান শুরু করতে পারি কীভাবে?
অল্পসংখ্যক ফিরিঙ্গি নারীই মোগল হিন্দুস্তানে গেছেন। মোগল কারখানায় কোনো ফিরিঙ্গি নারী মান্দু ফিরিঙ্গি বা অগাস্টিন হিরিয়াত হানামান্দের সঙ্গে যোগ দেননি, হরিয়ানাজুড়ে টমাস রচ আর রাবেন সিমিট অভিযান চালানোর সময় কোনো ফিরিঙ্গি নারী তাদের সঙ্গ দেননি। কেবল মোগল নয়, বরং ফিরিঙ্গি পুরুষতান্ত্রিকতাই তুলে ধরে এটা। পর্তুগিজ নারীরা গোয়া, দিউ, কোচিন আর হুগলিতে বসতি করলেও দাক্ষিণাত্যের সুলতান ও মোগল সম্রাটদের ভাড়াটে সৈনিকে পরিণত হওয়া ভবঘুরে পর্তুগিজ পুরুষদের বিপরীতে মোটামুটি সেখানেই রয়ে গিয়েছিলেন। সপ্তম শতকের গোড়ার দিকের দশকগুলোয় ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সাগরপথে নারীদের ভারতে আসা নিষিদ্ধ করেছিল। সাগরপথে চলাচলকারী অন্য দলগুলোও নারীদের বর্জন করত আর মোগল সাম্রাজ্যের জেস্যুইট মিশনগুলো পুরুষদের ছিল। সিল্করুট হয়ে ভারতে আসা ফিরিঙ্গিরাও কেবল পুরুষদের কাফেলা নিয়ে সফরপ্রবণ ছিল।
তবু হাতে গোনা কয়েকজন ফিরিঙ্গি নারী কেবল মোগল ভারত সফরই করেননি, সেখানে বসতিও করেছেন। থাকার জায়গা নিয়ে তাদের কিছু বলার ছিল না। জুলিয়ানা নামে তাদের অন্তত দুজন জেনানা মহল আর হারেম নামে পরিচিত সম্রাটের প্রাসাদের নারী মহলে আশ্রয় খুঁজে পেয়েছিলেন। আমরা দুই জুলিয়ানার জীবনকাহিনী নির্ভুলভাবে তুলে ধরতে পারব না— তারা কখন, কোথায় আর কার সঙ্গে কী করেছেন, রীতিমতো অধরা হয়ে আছে এসব। তবে আমরা ‘জীবনী’র ধরনকে নতুন করে কল্পনা করলে প্রাক-ঔপনিবেশিক আমলের জীবনীগুলো ঢের বেশি পাঠযোগ্য হয়ে উঠবে। জীবনীকে ব্যক্তির জীবনের ঘটনাপঞ্জি হিসেবে না দেখে নতুন পরিবেশগত, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশের চ্যালেঞ্জের প্রতি সাড়া হিসেবে সামগ্রিক পরিবর্তন মনে করতে পারলে উপমহাদেশে ফিরিঙ্গি নারীদের জীবন সম্পর্কে মোগল ও ইউরোপীয় আর্কাইভস যেমনটা ধারণা দিয়ে থাকে, তার চেয়ে অনেক বেশি জানতে পারব। এক্ষেত্রে জেনানার জগত্ আমাদের জন্য অনেক কিছু তুলে ধরছে।
নানাভাবেই জেনানা এর বিদেশী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনকে নতুন রূপ দিয়েছে। এখানকার জীবন বিশেষ কিছু দৈহিক-প্রবণতা দাবি করত এবং সেগুলো পাশ্চাত্য প্রাচ্যবিদদের কল্পনা প্রথাগতভাবে যেমন তুলে ধরে, তেমনি যৌন কুশলতার চেয়ে বেশি কিছু ছিল। দৈহিক আচার আচরণের নৈপুণ্য অর্জন করতেন নারীরা— নাচ, গান, ক্রীড়া। এসব নৈপুণ্যের সঙ্গে দুই ধরনের সজ্জা যোগ হতো। সম্রাটের সেবায় নিয়োজিত পুরুষ শিল্পীদের মতো জেনানাদেরও নতুন নাম দেয়া হতো এবং সমান গুরুত্বের সঙ্গেই নতুন জোব্বাও। দুটো জিনিসই তাদের মোগল সংস্কৃতিতে স্থাপন করত এবং তাদের দেহকে পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার আহ্বান জানাত। মোগল ও ফিরিঙ্গি পর্যটকদের কাছ থেকে পাওয়া নারীর জীবন সম্পর্কে ক্ষীণ ফিসফিসানি অভিবাসী নারীদের কীভাবে আক্ষরিক অর্থেই নিখাদ ভারতীয় হিসেবে নতুন পোশাক পরানো হতো, তার আভাস দেয়। যারা প্রাক-ঔপনিবেশিক যুগের হিন্দুস্তানি নারীদের জীবনী লিখতে চান, রুশদির জোধা বাই তাদের সামনের বাধাগুলো তুলে ধরতে পারে। তবু দৃশ্যমান কল্পনা-প্রবণতা সত্ত্বেও মোগল নারী সম্পর্কিত কিছু কাহিনী আমাদের সামনে অভিবাসী ফিরিঙ্গি ইতিহাসের গোলকধাঁধায় পা রাখার স্পষ্ট দুয়ার খুলে দেয়। আর ওই গোলকধাঁধা মাধ্যাকর্ষণের শক্তিতে বারবার হেরেমের দিকেই ফিরে যায়।
হেরেম আসলে কী? সম্ভবত সবচেয়ে সঠিক উত্তর হচ্ছে, এটা পাশ্চাত্য ফ্যান্টাসির একটি জায়গা। হেরেম আরবি ‘হারাম’-এর ইংরেজি রূপ, যার মানে স্যাঙ্কচ্যুয়ারি; হারাম আবার ‘হারিম’— মানে পরিবারের নারী সদস্যবৃন্দ— আর ‘হারাম’— মানে নিষিদ্ধ-এর সঙ্গেও সম্পর্কিত। কিন্তু আরবি শব্দ ‘হারাম’-এর দ্যোতনা ইংরেজি ‘হেরেমে’ প্রতিস্থাপিত হয়েছে, যার মানে এটা শুধু বাস্তব একটা জায়গাই নয়; বরং কোনো মুসলিম সুলতান বা সম্রাটের মালিকানায় থাকা যৌন আনন্দের জন্য বিশাল নারী দলের কথা বোঝায়। ফলে বাস্তবের হেরেমের আসল অর্থের বদলে পাশ্চাত্য কল্পনায় হেরেম বিলকুল ভিন্ন অর্থে রূপান্তরিত হয়েছে। ইস্তাম্বুলের তোপকাপি প্রাসাদের মতো মোগল হেরেমের বেলায়ও কথাটা সত্যি। রুশদির জোধা বাইয়ের মতো মোগল হেরেমও পুরুষের স্বপ্নের রঙেই মোটামুটি রূপ পেয়েছে।
মোগল হেরেমে বিদেশী পুরুষদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। ফলে এটা তাদের উত্তেজনাময় কল্পনার বিষয়ে পরিণত হয়। হিন্দুস্তান সফরকারীরা হেরেমকে খোজাদের পাহারায় থাকা যৌনতৃষিত স্ত্রী ও দাসীরা সম্রাটদের দানবীয় যৌনক্ষুধা মেটানোর একটা জায়গা ধরে নিয়েছিল। ইংরেজ উইলিয়াম ফিঞ্চ জাহাঙ্গীরকে হেরেমের ‘মোরগ’ কল্পনা করেছেন। সেখানে ‘সবাইকে ছাপিয়ে হাঁক’ ছাড়তেন তিনি। তারই স্বদেশী টমাস কোরিয়েটের বিশ্বাস ছিল, সেখানে ‘নিজের জন্যেই এক হাজার নারী’ রেখেছিলেন তিনি। অন্যরা একে তিন থেকে চার হাজারের কাছাকাছি ধরে নিয়েছেন। তবে অন্য ইউরোপীয়রা মোগল হেরেমকে শাঙ-রি লা বা স্বর্গোদ্যানের মতো কিছু বলেই কল্পনা করেছেন। সব মিলিয়ে হেরেমকে পুরুষদের বলয়ের রাজনীতি এবং সত্যি বলতে ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্নই ভাবা হতো।
এ ধরনের অনুমানগুলো মূলত বাজারের চলতি গুজবভিত্তিক ছিল। শত হোক খুব অল্প ফিরিঙ্গি পুরুষই হেরেমে ঢোকার অধিকার পেত। মোগল নারীদের চিকিত্সার খাতিরে দু-একজন চিকিত্সককে ঢোকার অনুমতি দেয়া হয়েছিল। তবু প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা ও অন্যের কল্পনার ওপরই বেশি নির্ভর করতে হয়েছে। শাহ আলমের সভাসদ হিসেবে অল্পদিন কাজ করেছিলেন নিকোলো মানুচ্চি। একজন খোজা তার চোখে কাপড়ের পট্টি লাগিয়ে নারী মহলে নিয়ে গিয়েছিল বলে তিনি তাদের দেখতেই পাননি বলেছিলেন; অথচ পাঠকদের হেরেমবাসিনীদের তার হাতে ‘চুম্বন আর কোমল কামড়’ দেয়ার খবর দিয়েছেন। একইভাবে আওরঙ্গজেবের ফরাসি চিকিত্সক ফ্রাসোয়াঁ বার্নিয়ে বলছেন, একটা কাশ্মীরি শালে তার মাথা ঢেকে তাকে হেরেমে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলে তিনি কিছুই দেখতে পাননি। তা সত্ত্বেও আস্থার সঙ্গেই জায়গাটা ‘উদ্যান, প্রীতিকর গলি, ছায়াময় পথ, ঝরনাধারা, গুহা’য় ভরপুর থাকার কথা বলেছেন। এ ধরনের বর্ণনা হেরেমের সাধারণ মানুষ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন সম্রাটের একান্ত ব্যক্তিগত বিনোদনের স্বার্থে যৌনতায় ভরপুর স্বর্গ সম্পর্কিত পাশ্চাত্য ধারণাই আরো জোরালো করেছে।
কিন্তু ঐতিহাসিক সাক্ষীসাবুদ মতে, মোগল হেরেম মোটেই যৌনতার আখড়া বা ঘেরাও করা গোপনীয় কোনো জায়গা ছিল না; ঐতিহাসিক পরিবর্তন থেকে মুক্তও নয়। পূর্বপুরুষের যাযাবর সংস্কৃতির অবশেষ ধরে রাখা বাবর ও হুমায়ুনের আমলে দরবারের মতো হেরেমও সম্রাটের নারী আত্মীয়স্বজন এবং স্ত্রী ও উপপত্নীদের আবাস কতগুলো তাঁবুর সমষ্টি ছিল। আসলে আকবরের আমলেই তা ইট-পাথরের স্থায়ী কাঠামো পেয়েছিল। হুমায়ুনের হেরেমে ফতেহপুর সিক্রি, লাহোর ও আগ্রার আকবরের প্রাসাদোপম জেনানাগুলোর চেয়ে ঢের ছোট ছিল। আবুল ফজলের দাবি মোতাবেক এগুলোয় ৫ হাজার নারী থাকতেন। কিন্তু মোগল সম্রাট হুট করেই এমন লাগামহীন স্বেচ্ছাচারিতা আবিষ্কার করেননি। আকবর তার সাম্রাজ্য বিস্তারের পরিকল্পিত কর্মসূচির কারণে রাজনৈতিক আনুগত্য নিশ্চিত করতে পারস্য, রাজস্থান এবং অন্যান্য জায়গায় অসংখ্য বিয়ে করার কারণেই জেনানার জনসংখ্যা বেড়ে গিয়েছিল। এই স্ত্রীদের সবাই আকবরের শয্যাসঙ্গী হননি। কিন্তু প্রত্যেকেই যার যার পরিবারের নারী সদস্য ও দাসীদের নিয়ে এসেছিলেন।
অন্য কথায় আকবরের জেনানার বেশির ভাগ নারীই সম্রাটের স্ত্রী বা উপপত্নী ছিলেন না, খেলার সামগ্রী তো দূরের কথা; বরং নিজেরাই রাজনীতি ও পারিবারিক সম্পর্কেও বিশাল নেটওয়ার্কের কুশীলব ছিলেন। মোগল ইতিহাসবিদ রুবি লাল দেখিয়েছেন যে, রাজকীয় জেনানার নারীরা প্রকাশ্য ও গোপনীয়তার সীমা অস্পষ্ট করে তোলা জটিল সামাজিক বুননের অংশ ছিলেন। রাজকীয় জেনানার অন্যান্য সদস্যের সঙ্গে তারা পারিবারিক সম্পর্ক স্থাপন, রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণ এবং রাজনৈতিক বিরোধ মীমাংসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন। আবুল ফজলের দাবি অনুযায়ী আকবরের জেনানায় পাঁচ হাজার নারী থেকে থাকলেও তারা মোগলদের বহু সংস্কৃতিকে বিন্যস্ত করার বৃহত্তর প্রকল্পে মিশে গিয়েছিলেন। এটা ঠিক যে, নারীদের দেহ বিপুল ক্ষেত্রে সম্রাটের অধিকারে ছিল এবং তারা মোগল প্রত্যাশার কাছে নিজেদের সোপর্দ করবেন বলেই প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু রুবি লালের বর্ণনা অনুযায়ী রাজকীয় জেনানার দৈহিক আচরণ এক বৃহত্তর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল।
জেনানা নারীদের বিনোদনমূলক সময়ের কথা ধরা যাক। মোগল নারীদের নাচ, গান আর বাদ্যযন্ত্র বাদন জানার বিষয়টিই হেরেমের প্রমোদালয় হওয়ার কল্পনাকে জোরালো করেছে। কিন্তু তাদের অবসরগুলো স্রেফ আনন্দময় বিনোদন ছিল না। মোগল সংস্কৃতির রেওয়াজ অনুযায়ী আকবরের দরবারের ধ্রুপদী শাস্ত্রীয় সংগীত স্থানীয় হিন্দু ও তুর্কি-পারসি সংগীত ঐতিহ্যের মিশেল ছিল। আকবরের জাতিগত, ধর্মীয় ও ভাষাগত দিকে থেকে বৈচিত্র্যময় রাজ্যে বহু সাংস্কৃতিক বন্ধন গড়ে তোলার পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই ধ্রুপদী সংগীতের আবির্ভাব হয়েছিল। এ প্রকল্প একটা স্পষ্ট হিন্দুস্তানি পরিচয় গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে। তানসেনের মতো মোগল বাদকদের অনেকেই পুরুষ ছিলেন। আকবর তাকে নবরত্নের একজন বিবেচনা করতেন। কিন্তু জেনানা নারীরাও গান গাওয়া আর বাদ্যযন্ত্র বাজানোর কৌশল রপ্ত করেছিলেন। এজন্য নির্দিষ্ট দৈহিক মেধার দরকার পড়ে।
দরবারে গানের জলসাগুলোর সঙ্গে জেনানার নতর্কীরাও থাকত। এরা পরবর্তী সময়ের অধিকতর যৌনায়িত নতর্কী ছিল না। মোগল নর্তকীদের কেউ কেউ উপপত্নী ও দাসী হলেও শাহ আলমের মেয়ে জাহানারার মতো অনেকেই রাজপরিবারের সদস্য ছিলেন। সম্ভবত তারা নাচের বিভিন্ন ধরনের চর্চা করলেও মূলত কত্থকের মোগল ভাষ্যই ছিল প্রধান।

ফতেহপুর সিক্রিতে এসব শৈল্পিক অভিব্যক্তির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল অন্যান্য দৈহিক বিনোদন। জেনানা নারীরা লুকোচুরি খেলতেন। এজন্য নারী মহলে একটা অংশ তৈরি করা হয়েছিল। নারীরা দাবার ভারতীয় রূপ পচিশি খেলায়ও অংশ নিতেন। তবে ফতেহপুর সিক্রির জেনানা নারীরা ১৫৭০ সালে আকবরের তৈরি বিশাল উন্মুক্ত পচিশি চত্বরে খেলতেন এটা। ছকের মানব ঘুঁটি হিসেবে ভূমিকা পালনকারী হারেম নারীদের ইশারায় চাল হিসেবে নির্দেশনা দিতেন আকবর এবং রানীরা। সামান্য মনে হলেও এসব খেলা গুরুতর সামাজিক প্রয়োজন মেটাত। মানবীয় পচিশি খেলা কেবল রাজকীয় ও মানব ঘুঁটির ভেতরই নয়, বরং খোদ হারেমের অভ্যন্তরেও ক্ষমতার সম্পর্ককে তুলে ধরত।
অপেক্ষাকৃত প্রবীণাদের প্রাধান্য জোরালো করার লক্ষ্যে পরিকল্পিত উপহার দেয়ার আচারের ভেতর দিয়েও সামাজিক মর্যাদাক্রম তীক্ষভাবে তুলে ধরা হতো। এগুলোর মধ্যে প্রধান ছিল খিলা’ত বা সম্মানজনক উর্দি পরানোর অনুষ্ঠান। পোশাকের আরবি প্রতিশব্দ থেকে এর উদ্ভব। বিদেশী অতিথিদের সম্মান দেখাতে আয়োজিত হলেও তা আবার অভ্যন্তরীণভাবে মর্যাদাভেদের কাজও দিত। মোগল দরবারের সদস্যরা সফররত দূত ও গণ্যমান্যদের মূল্যবান জোব্বা উপহার দেয়া অব্যাহত রাখলেও অল্পবয়সীদের কাছ থেকে জেনানারাও খিলা’ত পেতেন। উপহার দেয়ার অন্যান্য আচার এর পরিপূরক ছিল। গুলবদন বানু বেগম তার স্মৃতিচারণে বাবার কাছ থেকে বিভিন্ন পর্যায়ের আত্মীয়স্বজন ও অন্যদের উপহার দেয়ার জটিল আনুষ্ঠানিকতার তালিমের বিবরণ দিয়েছেন।
খিলা’ত আচার আমাদের কাছে রীতিমতো, এমনকি অতিমাত্রায় আনুষ্ঠানিক ঠেকতে পারে। কিন্তু সামাজিক মর্যাদাক্রম স্থির করার জন্যই নয়, বরং বিভিন্ন গোষ্ঠী এবং গুরুত্বপূর্ণভাবে বিভিন্ন জাতিগত ও ভাষাগোষ্ঠীর ভেতর পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ারও বৃহত্তর মোগল প্রয়াসের অংশ ছিল এটা। খিলা’ত উপহার দরবারের নারীদের মোগল রাজনৈতিক ব্যবস্থায় তাদের মর্যাদা ও ভূমিকার সঙ্গে মানানসই পোশাক জোগাত।
দরবার বহু সাংস্কৃতিক হয়ে থাকলে হেরেম বরং আরো বেশি করেই তা ছিল। রাজকীয় স্ত্রী, পারিবারিক সদস্য ও সভাসদদের স্ত্রীদের ভেতর মোগল, উজবেক, রুমি, তুর্কি, পারসি আর রাজপুতরা ছিলেন। তবে জেনানায় অনেক সময় ফিরিঙ্গিরাও থাকতেন— সাধারণত দরবারে থাকা বিদেশীদের স্ত্রী। যেমন হুমায়ুনের তাঁবু হারেম সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য পোল্যান্ডের এক অতিথির স্ত্রীকে স্থান দিয়েছিল। মামলুকদের মতো জেনানা দাসী-সংস্কৃতি আরো বেশি বহু সাংস্কৃতিক ছিল। শাহজাহানের সময় ফিরিঙ্গি দাসীদের বেশ কয়েকজন ছিল পর্তুগিজ। ১৬৩৩ সালে মোগলরা হুগলি দখলের সময় আটক করা হয়েছিল তাদের। মারপিটে উন্নত প্রশিক্ষণ পাওয়া বিদেশী দাসীদের জেনানা প্রহরী হিসেবে কাজে লাগানো হতো। উর্দুবেগি নামে পরিচিত এ প্রহরীরা তীর, ধনুক ও ড্যাগারসহ খিলা’তের দাসী পর্যায়ের পোশাক পরত। গুলবদন বানু বেগম হুমায়ুনের জেনানায় ফাতিমা বিবি নামে এমন এক উর্দুবেগির কথা উল্লেখ করেছেন। সে তুর্কি বংশোদ্ভূত ছিল বলেই মনে হয়। তবে পরবর্তী কালের মোগল সম্রাটরাও হাবসি, রোমান ও সিরাকাসীয় দাসীদের নিয়োগ দিয়েছেন। শেষের এরা জেনানার চৌহদ্দিতেই বন্দি ছিল না: উর্দুবেগিরা প্রায়ই রাজকীয় নারীরা পালকিতে চেপে শিকার অভিযান বা অন্য সফরে যাওয়ার সময় তাদের সঙ্গী হতো। মোটের ওপর প্রাক-উপনিবেশ ফিরিঙ্গি নারীরা স্ত্রী, অতিথি কিংবা দাসী হিসেবে মোগল হেরেমে জায়গা পেতে পারতেন।
এমনই বৈচিত্র্যময় জেনানা গোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ করতে খিলা’তের সামাজিক বন্ধন নির্মাণের আচারকে পূর্ণতা দিতে ভাষা-বিষয়ক সামঞ্জস্যের একটি সামগ্রিক নীতিমালার দারকার ছিল। দরবারের মতো নারী মহলের অনেকের মাতৃভাষা নিশ্চিতভাবে বাবেলের মিনারের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল বলে এখানকার লিঙ্গুয়া ফ্রাংকা হয়ে উঠেছিল পারসি। জেনানার রাজকীয় ও দাসী নির্বিশেষে সবারই পাইকারিভাবে পারসি খেতাবে নতুন করে নামকরণও সমান কার্যকর ছিল। রাজপরিবারের বেশির ভাগই এমন সব নাম পেয়েছিলেন, যেগুলো মূলত সম্মানসূচক। আকবরের পারসি মা মারিয়াম মাকানি (দুই জাহানের মেরি) নামে পরিচিত ছিলেন। তার হিন্দু স্ত্রী পরবর্তী কালের গল্পগাথায় কেবল জোধা বাইতেই পরিণত হননি, বরং মারিয়াম-উস-জামানি (মহাবিশ্বের মেরি) নামেও পরিচিত ছিলেন। এসব পারসি নাম পদমর্যাদা ও উচ্চ অবস্থানের ইঙ্গিতবহ ছিল। বিপরীতক্রমে কোনো কোনো রাজকীয় খেতাব দৈহিক সৌন্দর্যেরও প্রকাশ ঘটাত: জাহাঙ্গীরের সঙ্গে বিয়ের পর নূর মহলের নাম বদলে নূরজাহান রাখা হয়েছিল। উপপত্নীদেরও অনেক সময় তাদের অবস্থানের ভিত্তিতে নাম রাখা হতো: শাহজাহানের প্রিয়তমদের নাম ছিল আকবরাবাদী মহল (আগ্রার প্রাসাদ) আর ফতেহপুরি মহল (ফতেহপুরের প্রাসাদ)। আবার সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব পালনকারী নারীদের তাদের নৈপুণ্য অনুযায়ী নাম রাখা হয়েছিল। নিচু পর্যায়ের রাজপরিবারের সদস্য ও দাসীদের বোঝাতে বানু ব্যবহার করা হতো। রাজকীয় কিতাবখানার নতুন নাম পাওয়া চিত্রকর ও অলঙ্কার নির্মাতাদের মতো হেরেমের নারীদের নামও বিশেষ কায়দায় পোশাক পরার তাগিদ দিত। এবং এসব দৈহিক ভাবভঙ্গি খোদ হেরেমের সম্পর্কের ক্ষেত্রেই নয় বরং বৃহত্তর মোগল রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের অখণ্ড অংশ ছিল।
আমরা রাজকীয় হেরেমের নির্দিষ্ট নারীর জীবনকাহিনী গড়ে তুলতে পারব না। কিন্তু খিলা’তের মতো মোগল আচারের দিকে নজর ফিরিয়ে আংশিকভাবে হেরেম-নারীদের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে তাদের দেহ অলঙ্কৃত ও পরিবর্তিত করার বৈচিত্র্যময় কায়দাগুলো নতুন করে নির্মাণ করতে পারি। এমনকি রুশদির জোধা বাইয়ের অশরীরী সত্তাকে এই অধিকতর আক্ষরিক জীবনী অর্থে রক্ত-মাংসের রূপ দেয়া সম্ভব। প্রকৃতপক্ষে খোদ ‘জোধা বাই’-ই অংশত মোগল দরবার ও হেরেমের ঐতিহ্য থেকেই জন্ম নেয়া একটা নাম। প্রবীণতর বা উচ্চমর্যাদার নারীদের জন্যে ‘বাই’ খেতাব নির্দিষ্ট ছিল বলে ধরে নেয়া যায় যে, এর বাহক এবং তার সহচরদের ভিন্ন ধরনের পোশাক ও আচরণ অন্যদের চেয়ে ভিন্ন ছিল। আমরা হেরেমের ফিরিঙ্গি নারীদের খেতাব থেকে একই ধরনের দৈহিক অভিজ্ঞতা খুঁজে বের করতে পারি। কিন্তু সবার আগে জোধা বাইয়ের মতো মোগল যুগের নারীদের নিয়ে পুরুষ মহলের কাহিনী আর ফ্যান্টাসির মোকাবেলা করতে হবে আমাদের।
আসলে জনপ্রিয় ভারতীয় কিংবদন্তি জোধা বাইয়ের একজন ফিরিঙ্গি প্রতিপক্ষের জোগান দিচ্ছে বিবি জুলিয়ানা নামে এক নারী। জোধা বাইয়ের মতো বাস্তবিকই একাধিক স্ববিরোধী কাহিনী, যেগুলোর বেশির ভাগই কোনো একক ঐতিহাসিক সত্তার দিকে নিয়ে যাওয়ার মতো যেকোনো প্রমাণবর্জিত। জোধা বাইয়ের মতোই বিবি জুলিয়ানাও তার কথিত রাজকীয় স্বামীর প্রেমকাহিনীতে রোমান্টিক চরিত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। এই পুরুষটির গল্প ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে উপস্থাপিত। কিন্তু কোনো রোমাঞ্চ উপন্যাসের সব উপাদান মিলিয়েই এটা তৈরি করা হয়েছে: সাগর অভিযান, জলদস্যু, অপহরণকারী এবং বিপদাপন্ন সুন্দরী নারী। এরল ফ্লিনের আদলে তৈরি আমাদের নায়ক জাঁ-ফিলিপে বুরবো দে নাভারে নামে এক দুঃসাহসী রাজপুত্র।
এ কাহিনীর আর্মেনীয়-ভারতীয় ইতিহাসবিদ মেসরোভ জ্যাকবে শেঠের বিশ শতকের গোড়ার দিকে এক ভাষ্যে জাঁ ফিলিপে বুরবো দে নাভারে ১৫২৬ সালে ফরাসি রাজপরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। মাত্র ১৫ বছর বয়সে এক দ্বন্দ্বযুদ্ধে হেরে গিয়ে ইউরোপ থেকে এক জাহাজে করে পারিবারিক পুরোহিতের সঙ্গে পালিয়ে যান। কিন্তু সেটা ছিল ভোগান্তির শুরুমাত্র। রওনা হওয়ার পর পরই ভূমধ্যসাগরে তুর্কি জলস্যুদের হাতে বন্দি হন তিনি। জলদস্যুরা তাকে বিক্রি করতে মিসরে নিয়ে যায়। কিন্তু সেখানে, শেঠের ভাষায়, ‘অচিরেই অমায়িক ব্যবহারের সুবাদে তরুণ রাজপুত্র দেশের অধিপতির আস্থা অর্জন করেন। তিনি তাকে নিজ সেবায় নিয়ে সেনাবাহিনীর দায়িত্ব দেন।’ ইথিওপিয়ায় এক মিসরীয় অভিযানের সময় আরো একবার আটক হন তিনি। হ্যাঁ, শেঠ আমাদের জানাচ্ছেন, ‘তার খ্রিস্টান ধর্মবিশ্বাস, অভিজাত পরিচয়, সজীব বুদ্ধিমত্তা আর প্রভূত জ্ঞান অচিরেই তাকে ওই ক্রিশ্চিয়ান দেশের অত্যন্ত উচ্চপদে আসীন করে।’
১৫৫০-এর দশকের মাঝামাঝি কোনো একটা সময়ে জাঁ-ফেলিপে ইথিওপীয় নৌবহর নিয়ে ভারতের পথে রওনা হয়েছিলেন। কোরোমাণ্ডেল উপকূলে পৌঁছানোর পর তার চিরবিশ্বস্ত পারিবারিক পুরুতকে ফেলে বাংলার উদ্দেশে রওনা হন। কিন্তু আগ্রার মোগল দরবারের জাঁকজমকের কথা জেনে আকবরের অধীনে কাজের খোঁজে চলে যান সেখানে। বরাবর বিদেশীদের সঙ্গে পরিচিত হতে আগ্রহী মহান মোগল— শেঠের ভাষায়, ‘তার মোহনীয় আচরণ, সম্ভ্রান্ত বংশপরিচয় আর সজীব বুদ্ধিমত্তায় চমকিত হন’ (জাঁ-ফিলিপের সম্ভ্রান্ত বংশপরিচয়ের প্রতি বিদেশী রাজন্যের আকৃষ্ট হওয়াটা স্পষ্টতই এ গল্পের অন্যতম মূলভাব)। ফরাসি এ যুবরাজকে আকবর তার সেনাবাহিনীর অধিনায়কের পদে নিয়োগ দেন এবং পরে তীরন্দাজ বাহিনীর প্রধান হিসেবে নিয়োগ দিয়ে তাকে মানসাবদার বা গভর্নর পদে পদোন্নতি দেন। ‘সম্ভ্রান্ত বংশের মর্যাদা’ রক্ষা করে রাজকীয় কর্মকর্তা ও দক্ষ যোদ্ধা-প্রশাসক হিসেবে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ রাখেন জাঁ-ফিলিপে। তাকে দরবারে ধরে রাখতে মরিয়া আকবর নানাভাবে উপহার দিয়েছিলেন। আর এখানেই বিবি জুলিয়ানার প্রবেশ ঘটছে কাহিনীতে।
কেউ কাহিনীর কোন ভাষ্য পড়ছেন, তার ওপর নির্ভর করে বিবি জুলিয়ানা ও তার বোন মারিয়া আর্মেনীয় বা পর্তুগিজ ছিলেন। মধ্য ষোড়শ শতকে আরবীয় জলদস্যুদের হাতে বন্দি হওয়ার পর ভারতে নিয়ে আসা হয় তাদের (স্পষ্টতই এ অ্যাডভেঞ্চার কাহিনীর জলদস্যুরা ট্রাভেল এজেন্টদের মতো ছিল, ইউরোপীয়দের এমন সব জায়গায় যাওয়ার প্যাকেজ ব্যবস্থার জোগান দিয়েছে, যেখানে নইলে হয়তো তারা কোনো দিনই পা রাখত না)। দুই বোন এর পর মোগল দরবারে হাজির হন; বড় বোন মারিয়ার প্রেমে পড়েন আকবর এবং তাকে স্ত্রীদের একজন হিসেবে গ্রহণ করে নাম রাখেন মারিয়াম-উস-জামানি। একই সময়ে জুলিয়ানার অনুরক্ত হয়ে পড়েন জাঁ-ফিলিপে দে বুরবো। প্রিয় ফিরিঙ্গি যুবরাজকে দরবারে ধরে রাখতে উদগ্রীব আকবর এ সম্পর্ককে উত্সাহিত করেন এবং তাদের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন। জাঁ-ফিলিপে মহান মোগলের ভায়রায় পরিণত হয়েছিলেন। জুলিয়ানার সঙ্গে বিয়ের পর জাঁ-ফিলিপে ফের আকবরের কাছ থেকে পদোন্নতি পেয়ে নবাব হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। এবং তার পরিবারকে স্থায়ী ভিত্তিতে মোগল হেরেমের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব দেয়া হয়। শেঠ ব্যাখ্যা দিচ্ছেন যে, ইউরোপীয় চিকিত্সা পদ্ধতিতে দক্ষতার কারণে জুলিয়ানা হেরেমের প্রধান চিকিত্সক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। নবাব জাঁ-ফিলিপে এবং তার বিবি জুলিয়ানা একসঙ্গে ধর্মপ্রাণ ক্রিশ্চিয়ান থেকে গেছেন। ১৬০৪ সালে শেষ হওয়া আগ্রার প্রথম ক্রিশ্চিয়ান গির্জা নির্মাণের খরচ জুগিয়েছিলেন তারা। দুজনকে ওখানেই সমাহিত করা হয়, যদিও ১৬৩০-এর দশকে পর্তুগিজদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময় শাহজাহানের কথিত গির্জা ধ্বংস করার কারণে তাদের কবর আর এখন দেখা যায় না।
বলা হয় যে, জাঁ-ফিলিপে ও জুলিয়ানার মিলনের ফলে বুরবো উপাধিধারী ফিরিঙ্গি বংশোদ্ভূত ভারতীয়দের একটা পরিবারেরও জন্ম হয়েছিল। মোগলদের কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা পাওয়ার কারণে ১৭৩৭ সালে নাদির শাহর আক্রমণ ও দিল্লির পতনের পর হেরেমের রক্ষক হিসেবে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া দায়িত্ব থেকে বুরবোদের নিষ্ঠুরভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। তবু মধ্য প্রদেশে সমৃদ্ধি লাভ করে তারা। জাঁ-ফিলিপের কথিত প্রপৌত্র ফ্রান্সিস দে বুরবো (১৭১৮-৭৮) গোয়ালিয়রের কাছে নারওয়ারে বসতি স্থাপন করেছিলেন। আকবর তার ফরাসি পূর্বসূূরিকে এই জমিন জমিদারি হিসেবে দিয়েছিলেন বলে কথিত। বুরবোরা তাদের ফরাসি পদবি বহাল রাখলেও ছেলেরা বারবার আর্মেনীয়দের বিয়ে করেছে এবং পরিবারের বহু সদস্যকেই নাকি আগ্রার আর্মেনীয় কবরস্থানে কবর দেয়া হয়েছে। এমনকি উনিশ শতকেও আকবরের কাল থেকে তাদের কথিত পূর্বসূরিদের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্কের বোধ ক্রমেই জোরালো হয়েছে। এ সময় তারা গোয়ালিয়র রাজ্যের সবচেয়ে ধনী রাজপরিবারগুলোর অন্যতম ছিল। ১৮৫৭ সালে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় লখনৌতে বুরবোদের একটা শাখা তাদের কাছে ফতেহপুর সিক্রির প্রথম জেস্যুইট মিশন থেকে ১৫৮০ সালে আকবরকে দেয়া বাইবেলের একটা পারসি তর্জমা থাকার দাবি করে। তার পর সম্রাটের কাছ থেকে বুরবোদের ক্রিশ্চিয়ান পূর্বসূরিদের কাছে হস্তান্তরিত হয়। বিশ শতকের প্রথম ভাগ অবধি বুরবোরা তাদের রাজকীয় মর্যাদা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। অবশ্য ভারতীয় স্বাধীনতার পর রাজকীয় পদের বিলোপ তাদের অবস্থানকে প্রভাবিত করে। এখন তারা কর্মজীবী মধ্যবিত্তেরই অংশ। পরিবারের এখনকার উত্তরসূরি, বালতাসার নেপোলিয়ন বুরবো নামে চওড়া গোঁফের অধিকারী আইনজীবী ভূপালে বাস করছেন। ২০০৩ সালে ভারতে নিযুক্ত ফরাসি রাষ্ট্রদূত তার সঙ্গে দেখা করতে গেলে খবরে পরিণত হন তিনি। ‘আজো এখানে একজন বুরবোর দেখা পাওয়াটা অসাধারণ’ বলে ঘোষণা করেছিলেন তিনি।
স্লামডগ মিলিয়নেয়ারের মতো রোমাঞ্চকর সমাপ্তি নিয়ে একজন সামান্য ভারতীয়কে জাতীয়, এমনকি আন্তর্জাতিক নজরে তুলে দেয়া অসাধারণ কাহিনী এটা। কিন্তু একমাত্র সমস্যা সন্দেহাতীতভাবেই এটি অসত্য। জাঁ-ফিলিপে দে বুরবোর আদৌ কোনো অস্তিত্ব ছিল আভাস দেয়ার মতো কণামাত্র ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই: মোগল ইতিহাস বা ফরাসি আর্কাইভসেও কোনো চিহ্ন রেখে যাননি তিনি। মাইকেল দে গ্রেসের লেখা লে রাজাহ বুরবো নামে এক উপন্যাসে জাঁ-ফিলিপে দে বুরবোর তথাকথিত ‘কনস্টেবল অব বুরবো’ শার্ল দে বুরবোর গোপন ভারতীয় ছেলে হওয়ার কথা বোঝানো হয়েছে। কিন্তু এই অনুমানকে ভিত্তি দেয়ার মতো কিছু নেই। একইভাবে জুলিয়ানা বুরবো এবং মোগল সম্রাটের কথিত স্ত্রী মারিয়ার কথাও নথিপত্রে নেই। আকবর সম্ভবত কোনো ক্রিশ্চিয়ানকে বিয়ে করেছিলেন— আবুল ফজল তেমনটাই দাবি করছেন, কিন্তু ফতেহপুর সিক্রির আধুনিক গাইডরা যেমনটা বুঝিয়ে থাকেন— মারিয়াম-উস-জামানি ছিলেন না তিনি। দর্শকদের বারবার মারিয়াম প্যালেস আকবরের ক্রিশ্চিয়ান স্ত্রীর প্রাসাদ ছিল বলে বলা হয়। প্রমাণ হিসেবে প্রাসাদের ছাদ উদ্বোধনের ছবির কথা উল্লেখ করেন তারা। কিন্তু আমরা যেমন দেখেছি, মারিয়াম-উস-জামানি সম্ভবত হিন্দু রাজপুত রাজকন্যা হারকা বাইয়ের পারসি নাম এবং তার প্রাসাদের ক্রিশ্চিয়ান ছবিটা খুব সম্ভব পারসি কিংবদন্তির ডানাওয়ালা কোনো অবয়ব। মহাফেজখানায় যত বেশি খোঁজ নেয়া যাবে, জাঁ-ফিলিপে দে বুরবো, জুলিয়া বুরবো এবং তাঁর বোন মারিয়া ততই হাওয়ায় মিলিয়ে যান। প্রকৃতপক্ষেই ফ্রান্সিস দে বুরবোর চেয়ে অতীতে বুরবো পরিবারের নাগাল পাওয়া অসম্ভব। ১৭৩৯ সালের পরই নারওয়ারে বসতি করেছিলেন তিনি। রুশদির জোধা বাইয়ের মতো তার কথিত প্রপিতামহ ও প্রমাতামহকে আমাদের স্বপ্নের রঙেই বাস্তব করে তোলা হয়েছে।
তুযুক-ই-জাহাঙ্গীর-এ চকিত উল্লেখ ও ১৬২৬ সালে লেখা জনৈক জেস্যুইট পুরোহিতের একটা চিঠির সুবাদে আমরা এটা জানি যে, লাহোর ১৫৮০ এবং ১৫৯০ দশকের দিকে জুলিয়ানা নামে এক আর্মেনীয় অভিবাসীর আবাস ছিল। প্রায় ১০০ বছর পর আওরঙ্গজেবের স্ত্রী নবাব বাই এবং পরে তাদের ছেলে বাহাদুর শাহের সেবায় নিয়োজিত জুলিয়ানা নামে আরেকজন নারীর কথাও জানি আমরা। এটা প্রায় নিশ্চিত যে, জনপ্রিয় কিংবদন্তির বিবি জুলিয়ানা বুরবো এ দুজনেরই সম্মিলন এবং এ দুজন নারীর একজন উত্তরসূরিরাই বংশধারায় বাড়তি জৌলুস জোগাতে রাজকীয় ফিরিঙ্গি পূর্বপুরুষের কিংবদন্তি আবিষ্কার করেছে। ভারতীয় বুরবোর কিংবদন্তির পেছনের ‘সত্যি’ জানার চেয়ে বরং মোগলি হিন্দুস্তানে বহু ফিরিঙ্গি নারী সম্পর্কে আরো ভালো উপলব্ধি পাওয়ার জন্য এবার আমি প্রথম আর্মেনীয় জুলিয়ানার প্রসঙ্গে ফিরে যাচ্ছি। এমনকি জুলিয়ানা বুরবোর কাহিনীগুলো অন্যান্য গল্পে যেমন বিভক্ত করা সম্ভব তেমনি, সেগুলোর সব কয়টিই ফিরে যায় হারেমে— এবং খিলা’ত আচারে।
তুযুক-ই-জাহাঙ্গীর-এ আমরা সিকান্দার জুল-কারনাইন নামে এক মোগল সভাসদের নাম শুনতে পাই। রাজস্থানের হ্রদ শহর সম্ভাতের ফৌজদার (অধিনায়ক) হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল তাকে। আমাদের বলা হয়েছে, জুল-কারনাইন আকবরের অধীনে কর্মরত ইস্কান্দার নামে এক আর্মেনীয়র ক্রিশ্চিয়ান ছেলে ছিলেন; সম্ভাতের আগের ফৌজদার তার বাবার কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রেই এ অধিনায়কত্ব পান তিনি। তুযুক-ই-জাহাঙ্গীর আরো বলছে, আকবর ইস্কান্দারের সঙ্গে আরেক ফিরিঙ্গি ক্রিশ্চিয়ান আব্দুল হাই ফিরিঙ্গির মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন। (‘হাই’ ছিল আর্মেনীয় ক্রিশ্চিয়ানদের প্রচলিত মোগল নাম)। আব্দুল হাই ফিরিঙ্গির মেয়ে সম্পর্কে আমাদের শুধু এটুকু বলা হয়েছে যে, ‘রাজকীয় হেরেমে তার কাজ করার কথা ছিল’ আর ‘তার মাধ্যমে’ ইস্কান্দার ‘দুটি ছেলের’ বাবা হয়েছিলেন।
আইন-ই-আকবরিতেও আব্দুল হাইয়ের ব্যাপারে আরো আলোকপাত করা হয়েছে। সত্যি সেই একই আব্দুল হাই ইনি, রাজকীয় শিবিরের কাজি— কার্যত আকবরের প্রধান বিচারপতি হিসেবে তার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। খোজা এবং আমির বলেই উল্লেখ করা হয়েছে তাকে, মোটামুটিভাবে যার মানে ‘স্যার’ ও ‘জমিদার’ এবং মোগল দরবারে তার উচ্চ মর্যাদারই ইঙ্গিতবহ। কিন্তু মোগলদের আকবরের আমলের কোনো ইতিহাসেই তার মেয়ের কথা উল্লেখ করা হয়নি। তার সম্পর্কে তথ্য জোগানোর জন্য ১৬২৮ সালে ইতালীয় জেস্যুইট পুরোহিত ফ্রাঁসোয়া কোরসির ভ্যাটিকানে তার কর্তাব্যক্তিদের কাছে লেখা লাতিন একটা চিঠির স্মরণ নিতে হবে আমাদের। ১৬০৪ থেকে ১৬৩৫ সালে মৃত্যু পর্যন্ত আগ্রাতেই ছিলেন কোরসি। আব্দুল হাই ফিরিঙ্গির পরিবারের সঙ্গে ভালো জানাশোনা হয়ে ওঠার কারণে মোটামুটি বিশ্বস্ত প্রতিবেদক ছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত আর্মেনীয়র মেয়ের সঙ্গে কখনই দেখা হয়নি তার। হিন্দুস্তানে কোরসির আগমনের আগেই তার মৃত্যু ঘটে এবং কোরসি আমাদের তার ব্যাপারে তেমনই কিছুই বলছেন না। তবে কোরসি তার নাম জানাচ্ছেন আমাদের, জুলিয়ানা।
উচ্চপদস্থ আমাত্যের মেয়ে হিসেবে রাজকীয় হেরেমের বিলাসবহুল মহলে স্থান পেয়েছিলেন জুলিয়ানা। এটা তাকে আকবরের পরিবারের প্রতীকী সদস্যে পরিণত না করলেও বয়স্কদের বৃহত্তর নেটওয়ার্কের অংশ করে তুলেছিল। এবং সম্ভবত এ মর্যাদাতেই আকবর ১৫৯০ সালের দিকে আর্মেনীয় ক্রিশ্চিয়ান ইস্কান্দারের সঙ্গে তার বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন। ইস্কান্দারকে ‘মির্জা ইস্কান্দার’ হিসেবে উল্লেখ করছেন কোরসি: পারসি সম্মানসূচক মির্জার অর্থ ‘যুবরাজ’, মোগল সম্রাটের বৃহত্তম লবণ খনির পাশেই কৌশলগত অবস্থানের একটা গুরুত্বপূর্ণ শহর সম্ভাতের ফৌজদারির ইস্কান্দারকে দেয়া আকবরের পুরস্কারের সঙ্গে মানানসই উপাধি। ‘সিকান্দার’ আলেক্সান্দার দ্য গ্রেটের পারসি ভাষ্য, যদিও ইস্কান্দার তার স্বনামীর মতো যোদ্ধা নন, বরং বণিক ছিলেন। কোরসির মতে, আলেপ্পোয় জন্মগ্রহণ করলেও ইস্কান্দার পর্তুগিজ ভাষায় সাবলীল ছিলেন বলে সম্ভবত গোয়াসহ ভারতের বিভিন্ন শহরে বাস করেছিলেন। প্রকৃতপক্ষেই আর্মেনীয় বণিকদের লাভান্তে থেকে শুরু করে পারস্য হয়ে পর্তুগিজ ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত বাণিজ্য পথ স্থাপনের পেছনে আর্মেনীয় অভিবাসী সম্প্রদায়ের প্রতি আকবরের জোরাল সমর্থনের বিরাট ভূমিকা ছিল। আকবরের অধীনে কাজের সুযোগ পেয়ে ইস্কান্দার হয়তো লবণের খনিকে সম্রাট ও নিজের জন্য লাভজনক উদ্যোগে পরিণত করে থাকবেন। যা-ই হোক, আকবর ইস্কান্দারের যোগ্যতাকে আব্দুল হাই ফিরিঙ্গি উপাধি দেয়ার পক্ষে যথেষ্ট মূল্য দিয়েছেন। এটা হওয়া খুবই সম্ভব যে দূর দেশের একজন মহান রাজন্যের নামধারী এই ফিরিঙ্গি যুবরাজই জাঁ-ফিলিপে বুরবোর কিংবদন্তির পেছনে প্রেরণার কাজ করেছে।
ইস্কান্দারের সঙ্গে বিয়ের পর জুলিয়ানা ফিরিঙ্গির দুটি ছেলে হয়েছিল। প্রথম ছেলে মির্জা সিকান্দার জুল-কারনাইনের জন্ম হয় ১৫৯২ সালে; এর তিন বছর পর দ্বিতীয় ছেলে মির্জা ইস্কান্দারের জন্ম। (সাবালক হওয়ার পর মির্জা জুল-কারনাইনই আগ্রার গির্জা নির্মাণের খরচ জোগাবেন, এটাই হয়তো ওই শহরে জুলিয়ানা বুরবোর গির্জা নির্মাণের মিথের উত্স হয়ে থাকতে পারে)। উল্লেখ্য, দুটি ছেলেরই নাম স্বয়ং ইস্কান্দারের মতো আলেক্সান্দার দ্য গ্রেটের পারসি ভাষ্য ইস্কান্দার রাখা হয়েছিল। অন্য কথায় তাদের বাবার ছেলে ও উত্তরসূরি হিসেবে দেখা হয়েছে। ছেলেদের সঙ্গে জুলিয়ানার কী ধরনের সম্পর্ক ছিল আমরা জানি না। তবে কোরসি আমাদের বলছেন, জুলিয়ানার প্রতি স্নেহবশত আকবর দুটি ছেলেকেই দত্তক গ্রহণ ও নিজ সন্তানের মতোই পড়াশোনা শেখাতে তার সন্তানহীন রানীদের একজনকে দিয়েছিলেন। মির্জা জুল-কারনাইন সম্পর্কিত মোগল ও জেস্যুইট দলিলপত্র নির্দেশ করে যে, জুলিয়ানার দুই ছেলেই হেরেমে জাহাঙ্গীরের ছেলে ভবিষ্যতের শাহ আলম খুররমের সঙ্গেই বড় হয়েছিলেন। এ ব্যবস্থা সম্পর্কে জুলিয়ানার মতো উল্লেখ করেননি কোরসি। জুলিয়ানার স্বাস্থ্যের অবস্থা এখানে ভূমিকা রেখে থাকতে পারে; ১৫৯৮ সালে মারা যান তিনি। সে বছর লাহোরে জেস্যুইট যাজক জেরোমি হ্যাভিয়েরের লেখা চিঠি থেকে আমরা এটা জানতে পারি। জনৈক আর্মেনীয় ব্যক্তিকে নিয়ে একটা সাম্প্রতিক দরবারি কেলেঙ্কারির কথা বলছেন তিনি। ক্রিশ্চিয়ান স্ত্রীর মৃত্যুর পর তার বোনকে বিয়ে করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন তিনি। আকবর এ সম্পর্ককে সমর্থন দিলেও, জেরোমি হ্যাভিয়ের জাহাঙ্গীরের মদদে একে অসঙ্গত সম্পর্ক হিসেবে নিন্দা জানান এবং এতে বাধা দেন। কোরসির চিঠি এ লোক যে ইস্কান্দার ছিলেন, সেটা নিশ্চিত করে: ‘রাজা আকবর এম সিকান্দারের সঙ্গে মৃতা বিবি জুলিয়ানার বোনের বিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু... ফাদার জেরোমি হ্যাভিয়ের ও অবশিষ্ট পাদ্রিরা আপত্তি তুলেছেন।’
কেবল অন্যদের কথা থেকে অকাল মৃত্যুর আগে কী করেছিলেন, সেটা ছাড়া মোটেরই ওপর জুুলিয়ানা ফিরিঙ্গির মৃত্যু সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না: ওই হারেমে ছিলেন, তার জন্য পছন্দ করা একজনকে বিয়ে করেছেন; সেই মানুষটির নামে দুটি ছেলে হয়েছিল এবং আকবরের এক রানীর হাতে তুলে দিয়েছিলেন তাদের। এসব সামান্য তথ্যকে কি আরো সারবস্তু দিয়ে গড়ে তোলা সম্ভব?
জুলিয়ানা ফিরিঙ্গির জীবনের কিছু বিস্তারিত বর্ণনা চিরদিনের জন্যই অধরা রয়ে যাবে। যেমন— আমরা জানি না তিনি কোথায় জন্ম নিয়েছিলেন। আর্মেনিয়ার কোন অংশ থেকে তার পরিবার এসেছিল, তা-ও জানা নেই আমাদের; তার বাবা সরাসরি আর্মেনিয়া থেকে অভিবাসন করেছিলেন কিনা, নাকি পারসিয়ার তাব্রিজের মতো ভিন্ন কোনো জায়গা থেকে এসেছেন, আগে থেকেই এখানে বৃহত্তর ডায়াসপোরার অস্তিত্ব ছিল, সেই সময় ককেশাসে তুর্কি ও পারসীয় বৈরিতা বহু আর্মেনীয়কে স্বদেশভূমি থেকে পালাতে বাধ্য করেছিল। আব্দুল হাই ফিরিঙ্গি ও তার পরিবার কখন লাহোরে এসেছিল সে ব্যাপারেও আমরা অন্ধকারে আছি। এক বিবরণ বলছে, ১৫৬০-এর দশকে কাশ্মীরে হাকোবিয়ান নামে এক আর্মেনীয় বণিকের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর আকবর তাকে ও তার অনুসারীদের আগ্রায় বসতি করতে উত্সাহিত করেছিলেন। আব্দুল হাই ফিরিঙ্গি অভিবাসনের এই প্রথম ধারার সদস্য হয়ে থাকতে পারেন। ১৫৮০-এর দশক নাগাদ মোগল দরবারে তার পদমর্যাদার বিচারে রাজধানী ফতেহপুর সিক্রিতে স্থানান্তর হওয়ার আগেই হয়তো আগ্রায় আকবরের মনোযোগ আকৃষ্ট করে থাকতে পারেন তিনি। সেটা হলে জুলিয়ানা ১৫৯০ বা এর অল্প পরে ইস্কান্দারকে বিয়ে করার সময় বিশের কোটায় ছিলেন— ফতেহপুর সিক্রির আকবরের নতুন রাজধানীতে জন্মগ্রহণ ও বড় হয়ে উঠতে পারেন। আবার পারসিয়ার খোদ আর্মেনিয়ায় জন্মগ্রহণেরও সমান সম্ভাবনা রয়েছে। আব্দুল হাই ফিরিঙ্গি ১৫৮৫ সালে লাহোরে রাজধানী স্থানান্তর হওয়ার পরই হিন্দুস্থানে পাড়ি জমিয়ে মোগল দরবারে যোগ দিয়ে থাকলে জুলিয়ানা উপমহাদেশের বাইরেই বড় হয়ে থাকবেন।
হারেমে জুলিয়ানাকে কী নামে ডাকা হতো আমরা তাও জানি না। মোগল হিন্দুস্তানে আর্মেনীয় ক্রিশ্চিয়ানদের যুগপত্ পারসি ও ক্রিশ্চিয়াননামা থাকাটা ছিল সাধারণ। জুলিয়ানার ছেলে জুল-কারনাইনের তিনটি ছেলে ছিল; তারা যথাক্রমে মির্জা অবজারভাম/জন ব্যাপ্টিস্ট, ইরেশ/গ্যস্পার আর মির্জা দানিয়েল/মাইকেল। কোরসির কাছে জুলিয়ানা তার ক্রিশ্চিয়ান নামে পরিচিত ছিলেন, যেটা সম্ভবত চতুর্থ শতকের ইস্টার্ন অর্থোডক্স ক্রিশ্চিয়ানিটির জনপ্রিয় শহীদ সেন্ট জুলিয়ানা অব নিকোদিয়াকে সম্মানিত করেছিল। দোহিত্রদের মতো জুলিয়ানা ফিরিঙ্গি সম্ভবত আরেকটা মোগল নামে সাড়া দিতেন। তাকে হয়তো জুলিয়ানার স্থানীয় পারসি রূপ ‘জুলেনা’ ডাকা হতো। কিন্তু মোগলদের মর্যাদাক্রমিক বিশ্বে হয়তো তাকে মর্যাদাসূচক কোনো নাম বা খেতাব অনুযায়ী সম্বোধন করা হতো। এমনকি তাকে তার পদের স্বীকৃতি দেয়া সম্মানজনক তুর্কি/উর্দু উপাধী ‘বিবি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন কোরসি। প্রায় নিশ্চিতভাবেই বেগ বা বে থেকে উদ্ভূত পরিভাষা বেগম বা ‘লেডি’ বলা হতো তাকে। কোনো বেগের স্ত্রী বা মেয়েই বেগম হিসেবে আখ্যায়িত হওয়ার দাবিদার ছিল। বিবি জুলিয়ানা ফিরিঙ্গি দুভাবেই উপযুক্ত ছিলেন।
জুলিয়ানা ফিরিঙ্গির হেরেমজীবন কেমন হয়ে থাকতে পারে? তার শরীরে কেমন করে তা কোনো রকম প্রভাব ফেলে থাকতে পারে?
বাবার পদমর্যাদার বিচারে জুলিয়ানা শিক্ষিত ছিলেন ভাবাটা অসম্ভব নয়। রাজকীয় হেরেমের বহু নারীই দারুণ শিক্ষিত ছিলেন; গুলবদন বানু বেগমের মতো কেউ কেউ কবিতা লিখেছেন। জুলিয়ানা লিখতে-পড়তে জানলে মোগল আমত্যদের ব্যবহার করা ঐতিহ্যবাহী কলম বা নিব পেন ধরার কায়দা জানার দরকার ছিল তার। রোশানদানি বা কালির দোয়াতে ডুবিয়ে নিতে হতো এগুলো। নিজের লেখার ওপর বালি ছিটানোর কায়দা জানা থাকার দরকার ছিল তার। এসব লেখার সরঞ্জাম প্রায়ই কলমের বাক্স বা কলমদানিতে একসঙ্গে থাকত আর সরকারি লিপিকারদের অধিকারে থাকলেও প্রায়ই মোগল নারী বা অভিজাতদের উপহার হিসেবে দেয়া হতো। ডেস্কে নয় আসন পেতে বসে কলমদানি নিয়ে লিখতে হতো বলে জুলিয়ানাকে এ অবস্থানে বসাও আয়ত্ত করতে হয়েছে। এভাবেই তিনি কত্থক নাচ প্রত্যক্ষ করেছেন বা ধ্রুপদী সংগীতের আনুষ্ঠানেও অংশ নিয়ে থাকবেন। জুলিয়ানা ফিরিঙ্গিকে লেখাপড়া শেখানো হোক বা না হোক, নিশ্চিতভাবেই দরবারি পারসি বলা শিখতে হয়েছিল তাকে। আর্মেনীয় ভাষায়ও সম্ভবত কথা বলতে পারতেন তিনি, বিশেষ করে হেরেমে স্থান পাওয়ার আগে মা-বাবার সঙ্গে বসবাস করে থেকে থাকেন যদি, যাদের সম্পর্কে আমরা বিলকুল কিছুই জানি না। কিন্তু পারসি ভাষায়ই সম্ভবত জুলিয়ানা আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিকভাবে অন্য হেরেম নারীদের সঙ্গে ভাব বিনিময় করে থাকবেন।
লাহোরে মোগল দুর্গের জেনানার ভৌত পরিসর জুলিয়ানা ফিরিঙ্গি অন্য লক্ষণীয় উপায়ে তার দেহ কাজে লাগাবেন বলেই দাবি করে থাকবে। দুর্গ দেখতে আসা পর্যটকদের কমপ্লেক্সের উত্তর-পশ্চিম কোণে দর্শনীয় শিশ মহল বা আয়নার প্রাসাদের কাছে খাটো হয়ে যাওয়া একটা পুরনো হেরেমে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু এ বিলাসী কাঠামো জুলিয়ানার মৃত্যুর পর শাহজাহান কর্তৃক নির্মিত হয়েছিল।
তিনি সবসময়ই বাবা আর দাদার স্থাপত্য রুচিহীনতা বলে মনে করা ভুল শোধরানোর চেষ্টা করে গেছেন। শাহজাহানের কাছে প্রত্যাখ্যাত আকবর ও জাহাঙ্গীরের আগের জেনানাগুলো দুর্গের উত্তরপুব কোণে ছিল। রাজকীয় কিতাবখানার চিত্রশিল্পীদের আঁকা মারিয়াম-উস-জামানিসহ আকবরের স্ত্রীদের জন্য প্রাসাদোপম বিভিন্ন অ্যাপার্টমেন্ট, অন্য প্রবীণ নারীদের জন্য অপেক্ষাকৃত ছোট কামরা এবং কম বয়সী হেরেম সদস্যদের জন্য লাগোয়া সেল নিয়ে নির্মিত হয়েছিল। এ অ্যাপার্টমেন্টগুলো সম্ভবত পানির চ্যানেলসহ বড় আকারের উন্মুক্ত চত্বর দিয়ে সংযুক্ত ছিল। কিন্তু আদি জেনানাগুলো টিকে না থাকায় আমাদের পক্ষে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। টিকে যাওয়া অল্প কিছু অংশের একটি হলো, জটিল জালিতে ঢাকা সুস্পষ্টভাবেই মোগল লাল স্যান্ডস্টোনের জানালাবিশিষ্ট দুর্গের বাইরের দেয়াল। এটাই বহিরাগত কাউকে উঁকি দিয়ে কিছু দেখা থেকে বিরত রাখত। কিন্তু জুলিয়ানা ও অন্য নারীরা লাহোরের ব্যস্ত জীবন প্রত্যক্ষ করার পাশাপাশি দুর্গ প্রাচীরঘেঁষে বয়ে চলা রাভি নদী থেকে ভেসে আসা শীতল হাওয়াও উপভোগ করতে পারতেন। অন্যান্য মোগল শীতলীকরণ কৌশলও উপভোগ করেছেন জুলিয়ানা। আকবরের লাহোর জেনানায় ভূগর্ভস্থ অ্যাপার্টমেন্ট আর করিডোরের গোলকধাঁধা ছিল, এখনো তার কিছু টিকে আছে; প্রবল গ্রীষ্মের মাসগুলোয় নারীরা এখানেই আশ্রয় নিতেন। অসংখ্য সুড়ঙ্গ অ্যাপার্টমেন্টগুলোকে বাইরের দুনিয়ার টাটকা হাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত করেছিল, চাদরের একটা নেটওয়ার্ক বা উপর থেকে নেমে আসা পানি বহন করা সংকীর্ণ ঢালু শ্যুটের মাধ্যমে এগুলোকে শীতল করা হতো। এ সুড়ঙ্গগুলো বাতাস ঢুকতে দিলেও আলো ঢুকতে পারত খুবই কম। ফলে মোমবাতি দিয়ে গ্রীষ্মকালীন অ্যাপার্টমেন্টগুলোকে আলোকিত করতে হতো; অন্ধকারাচ্ছন্ন জায়গা ছিল এসব, যেখানে জুলিয়ানা ও অন্য নারীরা বেশির ভাগ সময়ই ঘুমিয়েছেন, খাওয়া-দাওয়া, হাম্মামে স্নান করে এবং সন্ধ্যায় বৃহত্তর ভূগর্ভস্থ হলে ধ্রুপদী ও কত্থক নাচের অনুষ্ঠান দেখে সময় কাটাতেন।
কিন্তু জুলিয়ানা ফিরিঙ্গি মোগল হেরেমে পুরোপুরি বন্দি হয়েছিলেন বলে মনে হয় না। যেমন— খুব সম্ভব তিনি আকবরের কিছু ও যুবরাজ খুররমের অনেক শিকার অভিযানে সঙ্গী হয়ে থাকবেন। লাহোর থেকে আনুমানিক ৩০ কিলোমিটার উত্তর-পুবের শেখুপুরা ছিল খুররমের প্রিয় শিকারের জায়গা; রাজকীয় নারীরা সেখানে তার সঙ্গে যোগ দিতেন। তাদের কেউ কেউ শিকারে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন। প্রকৃতপক্ষেই তার ভবিষ্যতের স্ত্রী নূরজাহান প্রতিভাময়ী শার্প শুটার হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছিলেন। জুলিয়ানারও স্বামী ইস্কান্দারের সম্ভাত সফরে যাওয়ার সময় তার সঙ্গে হেরেমের বাইরে সফর করার কিছুটা সম্ভাবনা রয়েছে যদিও, তবে মোগল হেরেমের নারী হিসেবে লাহোর থেকে বেশি দূরে তার যাওয়ার সম্ভাবনা কম। কিন্তু লাহোর দুর্গের বাইরে তার কিছু তত্পরতা নির্দিষ্ট কিছু ফিরিঙ্গি আচার পালনের দাবি করার কথা। একটা বৃহত্ আর্মেনীয় ক্রিশ্চিয়ান বণিকদের আবাস ছিল শহরটা, তারা আকবরের অনুমতিক্রমে নির্মিত একটা গির্জায় উপাসনা করতেন। জুলিয়ানা ও তার বোন খুব সম্ভব রোববার ও অন্যান্য পবিত্র দিনে সিরকাসিয়ান বা হাবসি নারীদের পাহারায় পালাঙ্কিতে চেপে গির্জায় গেছেন।
খোদ গির্জায় তাকে হয়তো সাধারণভাবে আর্মেনীয় উপাসক এবং বিশেষত আর্মেনীয় নারীদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত দৈহিক ভঙ্গিমাও পালন করতে হয়েছে। আর্মেনীয় নারীদের বেদির সামনে যাওয়ার অনুমতি না থাকলেও বিভিন্ন তারিখে তাদের কাছে বিশেষ কিছু আচার প্রত্যাশিত ছিল। যেমন— মে মাসে অনুষ্ঠিত হাম্বার্তসুম কিংবা অ্যাসেনশন





