সব সংবাদই এক রকমের আনন্দ বা কষ্টের। কোনো কোনো সংবাদ জানার পর তার শুরু কেন হয়েছিল ও শেষ কীভাবে হলো, কেউ কেউ জানতে চায়। না জানা পর্যন্ত অস্থিরতা অনেক মানুষকে হাঁটায়, কথা বলায়, শিশুর সঙ্গেও দুর্ব্যবহার করায়। এবং অনেকে জিনিসপত্র ভাঙে। আর যারা নির্বিকার, তারা একপ্রকার কাঁথাবিলাসের সহনীয় স্নেহে ভাতঘুম দেয়।
হাসান শরীফ পাশের ঘরে গিয়ে মোবাইল হাতে নিল। একটি এসএমএস এসেছে। বিষয়: আপনার বন্ধু জনাব আবিদ গত রাত ১১টায় মারা গেছে (ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না...), তার লাশ সুনামগঞ্জ হাসপাতালে, আত্মীয় ও বন্ধুদের খবর দিন।’ আবিদের মোবাইল থেকেই সকালে পাঠানো হয় এসএমএস। পাঠাবার সময়, সকাল ৬টা ৪২ মিনিট ১২ সেকেন্ড।
এড়ানো যায় না এমন কর্তব্য ও দায়িত্বের মধ্যে কোনো কাজ পড়লে প্রায় সাতান্ন বছর বয়সী প্রেস ব্যবসায়ী শরীফ তা নিষ্ঠার সঙ্গে করে। কমবেশি অভ্যাসের দাস ও প্রতিদাস আমরা সবাই। শরীফ প্রতি রাতে ঘুমাতে যায় সাড়ে এগারোটা থেকে পৌনে বারোটার মধ্যে। বিছানায় যাবার আগে, টিভিতে খবরগুলির স্ক্রল দেখে, টক শো দেখে না, এবং মোবাইল পাশের ঘরের টেবিলে রাখে সাইলেন্ট মোডে। ওই মোডে এবং অন্য ঘরে মোবাইল রাখবার কারণ, যদি কোনো অতি জরুরি ফোন বা এসএমএস আসে; আসতেই পারে, রাত্রি সাড়ে এগারোটার পরে যে-মানুষ জরুরি সংবাদ, ধরা যাক কারো মৃত্যু অথবা গ্রেফতার বিষয়ে জানালো, তার কাছে তখন গিয়ে কোনো উপকার তাকে বা তার পরিবারকে শরীফ করতে পারবে না। তার অভিজ্ঞতা বলে, রাতে মৃতের বাড়িতে গেলে শবের আশপাশে সারা রাত জেগে থাকতে হয়। এবং শুনতে হয় মরে যাওয়া মানুষটার নরম মন, জীবনের কিছু পাওয়া, না-পাওয়া অথবা সাফল্যের গল্প, কখনো কখনো বিভিন্ন কণ্ঠের কান্নার শব্দ; যে বা যারা কাঁদে, চোখ মোছে আর কান্নার স্বরেই এই অঞ্চলের পারিবারিক শোক প্রকাশের এক রীতি, বলে মৃতজনের কোনো না কোনো অভ্যাস বা পছন্দের খাদ্যের কথা এবং চুক্তিভিত্তিক পবিত্র কোরান খতমের তেলওয়াত। এবং কেউ বলবে না লোকটি কোনো না কোনো বিষয়ে খারাপ ছিল। মৃতের প্রতি সম্মান দেখাবার জন্যেই বোধহয় বলে না। এইসব চর্যার মধ্যে না পড়ে, রাতে ভালো ঘুমিয়ে, সকালে মিসড কল বা এসএমএস দেখে নিলে অসুবিধায় পড়া আত্মীয় বা বন্ধুকে কল ব্যাক বা সহযোগিতা করবার থাকলে করা যাবে। শরীফের এই নিয়মের কথা তার আত্মীয় ও বন্ধুরা জানে। কেউ কেউ তাকে বলে, তুমি একজন স্বার্থপর মানুষ। শরীফ তাদের কথা শুনে প্রতিবাদ কখনো করেনি, বলেছে, ‘কোনো বন্ধু বিপদে পড়লে শরীফই কিন্তু আগে যায়।’
প্রতিদিন ঘুম থেকে শরীফ সকাল সাতটায় ওঠে। নয়টার দিকে রওনা হয় নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান প্রেসের কাজে। সিদ্ধেশ্বরী থেকে আরামবাগ যেতে, যদি তার গাড়ি জ্যামে না পড়ে, পনেরো থেকে কুড়ি মিনিটের বেশি সময় লাগে না।
সকালে সিগারেট ধরিয়ে তাকে যেতে হয় টয়লেটে। কিছু ধোঁয়া পেটে গেলে পেটের আবর্জনা পরিষ্কার হয়। কমোডে বসার আগে বাথরুমের আয়নায় শরীফ নিজের মুখ দ্যাখে। এবং নিজেকে বলে, রাত্রে যে-মুখ নিয়ে ঘুমিয়েছিলাম, রাত যাবার পরও তা ঠিক আছে, মানুষ, সমাজ ও রাষ্ট্র-সৃষ্ট অন্ধকার বা দুঃস্বপ্নের চাপে চোখের জায়গা থেকে চোখ, নাকের জায়গা থেকে নাক সরে যায়নি, জানালা দিয়ে কোনো গুলি বা চাপাতি এসে, যা আজকাল প্রায়ই হচ্ছে এবং পুলিশ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অপরাধীকে ধরতে পারছে না, মুখ বা শরীর রক্তাক্ত করেনি; শরীরের গঠন এখন পর্যন্ত বেঁচে থাকার পক্ষে আছে, যা কিছুটা আনন্দের। তবে চোখের কেতর দেখে শরীফ হাসে, সুন্দর চোখও ঘুমের ভেতর সাদাটে পায়খানা করে, স্বপ্নও দেখে। ‘চোখেরও কি পেট খারাপ হয়?’ প্রশ্নটি নিজেকে করে নিজেই বলে ‘হয়’। আবর্জনা ত্যাগের কাজটি সারতে মোটামুটি ১৫-২০ মিনিট সময় লাগে তার। কোনো প্রাণীই এই বিরক্তিকর কাজটি থেকে কখনো মুক্তি পাবে না, এই কথা ভেবে শরীফ নিজেকে মাঝে মধ্যে বলে, ‘বেঁচে থাকা এক যন্ত্রণা ও খরচের নাম, আনন্দের ভাগ খুব কম।’
টয়লেটে কাজ শেষ হলে প্রতিদিন যেমন পাশের ঘরে এসে শরীফ মোবাইল হাতে নেয়, আজো সেই নিত্যকাজ করেছিল। স্ক্রিনে দেখে একটি এসএমএস। বৌ রেখা রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে বলেছিল, ‘চা দেব?’ শরীফ এসএমএসটা খুলতে খুলতে বলেছিল ‘দাও, একটু আদা দিও।’
দু’বার, তিনবার টেক্সটটি পড়ে শরীফ। দুশ্চিন্তার বলক কপালে কেঁপে ওঠে। ‘এই রেখা আবিদ মারা গেছে।’ প্রায় চিত্কার করে শরীফ ছুটে যায় রান্নাঘরে। রেখা হাত থেকে মোবাইল নেয়, পড়ে। ওদের বন্ধুর লাশ হাসপাতালে। দুজনের চোখমুখ থেকে রক্ত সরে যায়। ফ্যাকাশে চোখে পরস্পরকে দ্যাখে। রেখা নিজের অজান্তেই হাত ধরে শরীফের। রেখার হাত শীতার্ত। দুজন রান্নাঘর থেকে এসে খাবার টেবিলে বসে। চুলোয় চায়ের পানি ফুটছিল।
‘তুমি আবিদের ফোনে কল করো।’ ফোন করতে করতে শরীফ বলে ‘ওর ফোন থেকেই তো কেউ ম্যাসেজ পাঠাল, ও ফোন ধরবে কীভাবে?’ রেখা বলে, ‘করেই দেখ না’। আবিদের ফোনের রিংটোন ‘ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা’ আসতে থাকে, কেউ ধরে না, বন্ধও করে না। এক যান্ত্রিক স্বর বলে: গ্রাহক উপস্থিত নেই।’ ‘শুধু রিংটোন শুনলাম’ বলে শরীফ আবিদের বৌ হেলেন ভাবীকে ফোন করে, রিং হলো, কেউ ধরল না। হতে পারে হেলেন ঘুমাচ্ছে।
শরীফ আবিদের সম্বন্ধী ফারুককে ফোন করে। শুধু বেজে গেল। হতে পারে ফারুকও শরীফের মতো রাতে ফোন সাইলেন্ট মোডে রাখে। ‘ফারুক তো ফোন ধরছে না’, শরীফের কথা শুনে রেখা বলে, ‘মিনিট দুয়েক পর আবার করো।’ এবার তিনবার রিংটোন হওয়ার পরই ফারুক ফোন ধরল। ‘এই সকালে কী ব্যাপার?’ ফারুকের প্রশ্নে শরীফ টেক্সটের বিষয় জানায়। ‘অসম্ভব, হতেই পারে না’ ফারুক ভয়ার্ত গলায় কথাটি বলেই বলে, ‘আমি হেলেনের সাথে কথা বলছি।’ হেলেন ফারুকের ছোট বোন। দু’জন তিনদিন আগে গেছে সুনামগঞ্জের দোহালিয়া ইউনিয়নে আবিদদের বাড়িতে।
অনেকগুলো ঘটনার সম্ভাব্যতা নিয়ে কথা বলে রেখা আর শরীফ।
আবিদ দোহালিয়ায় যাবার আগে শরীফকে বলেছিল, এলাকার এক বড় ভাই খুব অনুরোধ করেছে ইউনিয়ন পরিষদের ইলেকশনে আবিদ যেন যায়। আবিদের সহযোগিতা তার দরকার। ওদের পরিবারের একটি প্রভাব আছে সেখানে। বড় ভাই চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী। নিজের দল তাকে নমিনেশন দেয়নি। লন্ডন থেকে কে একজন এসে অনেক টাকা দিয়ে দলের মনোনয়ন নিয়েছে। ইলেকশনের কোন্দলে আবিদকে প্রাণ দিতে হতে পারে।
এক সময় আবিদ কমিউনিস্ট পার্টি করত। অনেক মানুষ মনে করে, যারা কমিউনিস্ট তারা নাস্তিক। দেশে যে-ভাবে ধর্মান্ধ গ্রুপ বাড়ছে, তাদের কেউ আবিদকে খুন করতে পারে এবং ফেলে দিয়ে আসতে পারে হাসপাতালে।
আবিদ দোহালিয়ায় গ্রাম থিয়েটারের শাখা খোলার চিন্তা করছিল। তিন মাস আগে গ্রামে গিয়ে কয়েকজন তরুণের সঙ্গে কথাও বলেছিল। ও মনে করে, যাদের বাড়িতে একটি বাঁশি বা হারমোনিয়াম আছে, তারা কখনো ধর্মান্ধ হয় না, সাংস্কৃতিক চিন্তাচেতনা মানুষকে উদার করে। এই কারণেও ইউনিয়নের কোনো ঘোর মৌলবাদী, তালেবান বা আইএস-আদর্শে বিশ্বাসী কোনো দল আবিদকে খুন করতে পারে।
জমিজমার কোন্দলে কিছু হওয়া সম্ভব না। আবিদরা নিজেদের বাড়ির চারপাশে কিছু জমি ও পুকুর ছাড়া অন্য সব জমি গরিব আত্মীয়দের দলিল করে দিয়ে এসেছিল। ঢাকায় যে সচ্ছল অবস্থায় আবিদ আছে, কখনো দোহালিয়ায় ফেরার কথা না। তার প্রেস ব্যবসা খুব ভালো চলছে। দুটো ছেলেমেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। হেলেন গৃহিণী।
আবিদের কোনো অসুখ ছিল না। ক’দিন আগেই থরো চেকআপ করেছিল। হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক করবার কথা নয়। রোড অ্যাকসিডেন্টে মারা যেতে পারে?
শয়তানরা ওর ফোন থেকেই টেক্সট করেছে, তার অর্থ হচ্ছে ওরাই খুনের সাথে জড়িত হতে পারে।
আবিদ মাঝেমাঝে মদ খেত। হতে পারে লোকাল বন্ধুদের সাথে বসে এই গরমের মধ্যে একটু বেশি খেয়েছিল, হয়তো ছিল ভেজাল মদ, ফলে যা হবার তাই হয়েছে। বন্ধুরা একটা সময় পর্যন্ত ওকে বাঁচাবার চেষ্টা করে যখন ব্যর্থ হয়েছে, রেখে গেছে হসপিটালে এবং সারা রাত শলাপরামর্শ করে সকালে খবর পাঠিয়েছে। শরীফকে খবর পাঠাবার কারণ হতে পারে গতকাল বিকালে, তখনো আবিদ ছিল দোহালিয়ায়, আবিদকে ফোন করেছিল শরীফ। কললিস্ট দেখে লোকগুলো হয়তো শরীফকেই বেছে নেয় খবরটি জানাবার জন্য।
অনুমানভিত্তিক কথা শেষ হয় না।
ফারুককে ফোন করে শরীফ। জানতে চায় আবিদ বা হেলেনের সঙ্গে কথা হয়েছে কি-না। ফারুক জানায়, বারবার কল করছে, দু’জনের ফোনই বাজছে, ধরছে না কেউ। আরো জানায়, আবিদ ও হেলেন দুজনই বোধহয় এখনো ঘুমাচ্ছে।
শরীফ ও আবিদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু কাদির। শরীফ এসএমএসটা কাদিরকে ফরওয়ার্ড করে।
‘সুনামগঞ্জ হাসপাতালে যোগাযোগ করা যায় কীভাবে?’ শরীফের প্রশ্ন শুনে ‘আবিদের সম্বন্ধী নিশ্চয়ই যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে,’ রেখা বলল।
বাংলাদেশে, শুধু বাংলাদেশে কেন, পৃথিবীর সব জায়গায়, এখন খুন, গুম যে-হারে বেড়ে গেছে, কখন কে যে কার শিকার হয়, কেউ আগে থেকে কিছুই অনুমান করতে পারছে না। বন্ধু বন্ধুকে, মা সন্তানকে, পুত্র পিতাকে, প্রেমিক প্রেমিকাকে, স্বামী স্ত্রীকে, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী তার প্রতিদ্বন্দ্বীকে; এই তালিকা আরো বড় হতে পারে, মারছে। আগে যে-সব কারণে খুনোখুনি হতো, যেমন জমিজমা বা টাকাপয়সা নিয়ে, এখন তার সঙ্গে যোগ হয়েছে ধর্মান্ধতা, নেশা, পরকীয়া, যদিও এগুলো আগেও ছিল, তবে এখন বেড়ে গেছে অনেক, এবং তার সঙ্গে যোগ হয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতা, ভোগ, লোভ— এইসব কথা রেখা ও শরীফ বলাবলি করে থেমে গেল, যেন প্রতিদিনই এসব বলতে বলতে সমাধান নেই এজন্যে চোখেমুখে নেমে আসে এক ঠাণ্ডা ক্লান্তি।
কোনো কারণ ছাড়াই শোয়ার ঘরে যায় শরীফ। হাতে মোবাইল। দাঁড়ায় আয়নার সামনে। শরীফের চোখ আছে চোখে, কান আছে কানের জায়গায়। তার পরও মুখটা মানুষের মুখের মতো দেখাচ্ছে না। ভয় পাওয়া এক প্রাণী দাঁড়িয়ে আছে আয়নার সামনে। শরীফ ঘন কালো চুলে আঙুল ঢোকায় এবং দু-তিনবার টান মারে, ব্যথা লাগে না। টিভি খোলে। স্ক্রল দ্যাখে। সুনামগঞ্জে কোনো অস্বাভাবিক মৃত্যুর খবর নেই। আবার ফিরে আসে রান্নাঘরের দরজার সামনে। রেখা চায়ের পানি আবার গরম করছে। আগে দেয়া সব পানি ফুটে বাষ্প হয়ে উড়ে গেছে।
শরীফের হাত ভাইব্রেশনে কেঁপে ওঠে। একটি কল এসেছে। কাদিরের গলা। ‘ফারুক ভাইকে ফোন করলাম, এনগেজড, আবিদকেও করেছি, শুধু রিংটোন, ‘‘ও আমার দেশের মাটি’’, কেউ ধরল না। আমরা কী করব এখন?’ ‘খবরটা সত্য না মিথ্যা কীভাবে যাচাই করব?’ শরীফের কথায় কাদির শুকনো গলায় বলে, ‘অপেক্ষা করা আর একটু পর পর ফারুক আর হেলেনকে ফোন করা ছাড়া এখন আমরা আর কী করতে পারি?’
আবিদের সঙ্গে শরীফ আর কাদিরের বন্ধুত্বের বয়স পঁচিশ বছরের বেশি। একসঙ্গে কলেজে পড়ত। বিভাগ ছিল মানবিক। তিনজনেরই প্রিয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন মার্কস। ওরা দুজন কিছুক্ষণ আবিদকে নিয়ে কথা বলে, ওর হাসি, কথা বলা, মানবিকতা, রসিকতাবোধ, পড়াশোনা ছিল অন্য রকম।
ফারুকের কল। বোন হেলেনের সঙ্গে তার কথা হয়েছে। জানায়, আবিদ নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত। শরীফ জানতে চায়, আবিদের সঙ্গে তার কথা হয়েছে কি না। আবিদের সঙ্গে তার কোনো কথা হয়নি। ফারুক অন্যভাবে আবিদের কথা জানতে চেয়েছিল। হেলেনকে জিজ্ঞেস করেছিল, তোরা ভালো আছিস তো, ঢাকায় কবে আসছিস? হেলেন বলেছে, ওরা ঢাকায় আসবে তিনদিন পর ইত্যাদি।
সুনামগঞ্জ হাসপাতালে আবিদের লাশ যে পড়ে আছে, সে সম্পর্কে তার বোনকে ও কিছুই বলেনি। ফারুক নিশ্চিত আবিদের কিছু হয়নি। ‘ওর মোবাইল হয়তো চুরি হয়েছে, যে চুরি করেছে, মোবাইলটা পছন্দ হয়নি বলে সে রেগে এ রকম টেক্সট পাঠিয়েছে।’ ফারুক হেসে কথাটি বলল।
কাদিরকে ফোন করে শরীফ। জানায় ফারুক যা ওকে বলেছে। কাদির বলল, ‘এটা কী? শরীফ তুই আমাকে হেলেন ভাবির নম্বরটা পাঠা, আমি চেষ্টা করি। যদি পাই জিজ্ঞেস করব, আবিদ এখন কোথায়? আর তুই এক কাজ কর, তোর বন্ধু সেক্রেটারি আদনানকে ফোন কর, ওর বাড়ি তো সুনামগঞ্জ, আবিদকে ও চেনে, ওর বই আবিদের প্রেস থেকে ছাপা হয়েছিল, আদনান সাংবাদিক পাঠাবে হসপিটালে আর সার্জনকে ফোন করে বলবে আবিদের উচ্চতা পাঁচ ফুট আট ইঞ্চির কাছাকাছি, গায়ের রঙ ফর্সা, মাথায় চুল কম, কপালের ডান দিকে কাটা দাগ আছে, কালো ফ্রেমের চশমা পরে, খোঁজ নিতে, পকেটে ওর প্রেসের কার্ড থাকবে।’
শরীফের চোখ ব্যাটারি চালিত দেয়াল ঘড়িতে পড়ে। সকাল ৮টা ৪০ মিনিট। সেকেন্ডের কাঁটা শব্দহীন ঘুরে যাচ্ছে।
কাদিরের কল। শরীফকে ও জানায়, ওর সঙ্গে হেলেন ভাবির কথা হয়েছে। আবিদ গত রাতে গেছে সুনামগঞ্জে। ভাই ফারুকের কলের পর হেলেন ভাবি আবিদের ফোনে কয়েকবার কল করেছে। শুধু শুনেছে: ‘ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা।’
শরীফ আর কাদিরের কথোপকথন।
নিশ্চয়ই আবিদের কিছু একটা হয়েছে।
আমরা তো আবিদের ফোনে ওকে পাচ্ছি না।
ও তো গতকাল বিকালে দোহালিয়া থেকে সুনামগঞ্জে গেছে। হেলেন ভাবি জানিয়েছে, তার সাথে আবিদের শেষ কথা হয়েছে রাত দশটায়।’ আর টেক্সটের তথ্য বলছে, আবিদের মৃত্যু হয়েছে রাত এগারোটায়।
সকাল ৯টা ৪৭ মিনিট।
সেক্রেটারি বন্ধু আদনানের কল। শরীফকে ও জানায়, তিনজন সাংবাদিক সুনামগঞ্জ হাসপাতালে ওর বর্ণনা অনুযায়ী মানুষকে খুঁজেছে, ওই রকম কোনো লাশ নেই। সার্জনের সঙ্গেও সাংবাদিকরা কথা বলেছে, গত রাত থেকে যে কয়টা লাশ মর্গে রাখা হয়েছে, তার মধ্যে আবিদ নামে কেউ নেই। এবং যে-কজন রোগী ইমার্জেন্সিতে এসেছে, তাদের মধ্যেও ওই রকম কেউ নেই। আদনান শরীফকে বলেছে, আবিদের কোনো খবর পেলে জানাতে।
শরীফ বলে, ‘হতে পারে অন্য কোনো ক্লিনিক বা জায়গায় আবিদের লাশ রেখে আমাকে জানিয়েছে সুনামগঞ্জ হসপিটালের কথা।’ রেখা মাথা নাড়ায়, হতে পারে।
ফারুকের কল। কণ্ঠ উদ্বিগ্ন। ফাঁপা। শরীফকে বলল, ‘খুবই চিন্তার ব্যাপার। হেলেনও চিন্তায় পড়ে গেছে। আবিদের ফোন বাজছে, কেউ ধরছে না।’ ফারুক কিছুক্ষণ আগে হেলেনের সঙ্গে কথা বলার সময়ও বলেনি কী টেক্সট এসেছিল শরীফের ফোনে। ‘আবিদের সুনামগঞ্জের দুজন বন্ধুকে হেলেন চেনে কিন্তু তাদের ফোন নম্বর তার কাছে নেই।’ কথাটি হেলেন তার ভাইকে বলেছে।
আবিদ কি জীবিত নাকি মৃত? এই চিন্তা-চক্র এবং অসহায়ত্বের মধ্যে শরীফ, রেখা, ফারুক, কাদির, হেলেন, আদনান এবং সুনামগঞ্জের ক’জন সাংবাদিক পড়ে গেছে। চক্রে কতক্ষণ বা কয়দিন ঘুরতে হবে, ওরা জানে না। কখন, কে আগে আবিদের ব্যাপারে সঠিক খরব জানবে? তার পর জানাবে যারা খোঁজ করছে, তাদের। তার পর গণমাধ্যমকে।
একটি এসএমএস এলো শরীফের ফোনে। বিষয়: এই ঘাতক সময়ে একজন আবিদের বেঁচে থাকা আর মৃত্যুর মধ্যে দূরত্ব কতটুকু?’
এসএমএসটা আবার এসেছে আবিদের মোবাইল থেকেই। সময়: সকাল ১০টা ২১ মিনিট ২৬ সেকেন্ড।
বৈশাখ, ১৪২৩






