মারা যাওয়ার সময় তার সম্পত্তির পরিমাণ ছিল ৪৪ লাখ রুপি। তা থেকে মাত্র ১ লাখ ৬০ হাজার রুপি তার উত্তরাধিকারীরা পেয়েছিলেন। বাকি সম্পত্তি তিনি দান করে দিয়েছিলেন। একটি উল্লেখযোগ্য অংশ গিয়েছিল বিভিন্ন শিখ মন্দিরে। বলা হয়ে থাকে যে ইংল্যান্ডে অনেক চ্যারিটি স্থাপনেও বিপুল পরিমাণ অর্থ দান করেছিলেন তিনি। লন্ডনের ফাউন্ডলিং ও ম্যাগডালেন হাসপাতাল নির্মাণের জন্য তিনি অর্থসহায়তা দিয়েছিলেন। মুর্শিদাবাদ তখন গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যনগরী। তিনি ছিলেন মুর্শিদাবাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়ী। তিনি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে ব্যবসা করতেন। সল্টপিটার ও আফিম সরবরাহ করতেন কোম্পানিকে। এ দুটি পণ্যে তার বাণিজ্যিক দখল ছিল একপ্রকার একচেটিয়া। ১৭৫০ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছ থেকে তার পাওনা ছিল ১৬ লাখ রুপি। কলকাতার সবচেয়ে সুন্দর বাড়িগুলো ছিল তার মালিকানায়। কর্মচারীর সংখ্যা ছিল ৩০০। ব্যবসা তিনি ভালো বুঝতেন। কিন্তু নবাব সিরাজউদদৌলার সঙ্গে ষড়যন্ত্র করার কারণে ইতিহাসে তিনি নেতিবাচক চরিত্র হিসেবে ঠাঁই পেয়েছেন। এ কারণে তার অন্য সব পরিচয় ম্লান হয়ে যায়।
তার নাম নিয়ে বিতর্ক আছে। সাধারণত তিনি উমিচাঁদ নামে পরিচিত। সমসাময়িক ইউরোপীয়দের লেখায় তাকে ‘অমিচাঁদ’ নামেও অভিহিত করা হয়েছে। তবে তিনি সম্ভবত ‘আমিরচাঁদ’ নামে নিজের পরিচয় দিতেন। তৎকালীন একটি নথিতে তিনি নিজের পরিচয় হিসেবে লিখেছিলেন ‘আমিরচাঁদরাজির’। সম্ভবত তিনি ছিলেন নানকপন্থী তথা শিখ ধর্মের অনুসারী। তার ধর্ম নিয়েও নিশ্চিত হওয়ার উপায় নেই। অনেকের মতে, তার পরিচয় নিয়ে ধোঁয়াশা ছিল। তাকে হিন্দু বা মুসলিম বলে চিহ্নিত করা যাচ্ছিল না। তাই সমসাময়িক টীকাকাররা অনেকটা অনুমানের ওপর ভিত্তি করে তাকে শিখ বলে ধরে নিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে সে পরিচয়ই প্রতিষ্ঠিত হয়। তৎকালীন মুসলিম শাসনাধীন বাংলায় শিখ ব্যবসায়ীরা বেশ প্রভাবশালী ছিলেন। তারা প্রভূত অর্থবিত্তের অধিকারী হয়েছিলেন। তাদের অধিকাংশই এসেছিলেন পাঞ্জাব থেকে। তারা পাঞ্জাবের ক্ষত্রি গোত্রের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। ক্ষত্রিরা বাণিজ্যের জন্য বিখ্যাত ছিল। এ গোত্রের অধিকাংশ সদস্য হিন্দু হলেও একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল শিখ ধর্মের অনুসারী। একপর্যায়ে শিখরা ‘খালসাপন্থী’ ও ‘নানকপন্থী’ নামে দুটি ভাগে ভাগ হয়ে যায়। আঠারো শতকে শিখ সম্প্রদায়ের বড় একটি অংশ ছিল নানকপন্থী। ক্ষত্রি শিখ ব্যবসায়ীরা ছিলেন নানকপন্থী। রফতানি বাণিজ্যে তারা গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেছিলেন। অর্থনীতিতে প্রাধান্য অর্জনের পর তাদের অনেকে রাজনীতিতেও নাম করেছিলেন। বলা হয়ে থাকে যে ক্ষত্রি গোত্রভুক্ত নানকপন্থী এসব শিখ ব্যবসায়ীরই অন্যতম ছিলেন আমিরচাঁদ ওরফে অমিচাঁদ কিংবা উমিচাঁদ। এ লেখায় আমরা তাকে উমিচাঁদ নামেই অভিহিত করব।
উমিচাঁদের প্রাথমিক জীবন সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না। ধারণা করা হয়, তিনি পাটনার আজিমাবাদ থেকে কলকাতায় এসেছিলেন। তবে তিনি নিজেকে ‘আগ্রাওয়ালা’ হিসেবেও পরিচিত করাতেন। তাই কিছু ঐতিহাসিকের মতে, তিনি আগ্রা থেকে এসেছিলেন। অন্যরা তাকে চিহ্নিত করেছেন ‘উমিচাঁদ আগারওয়াল’ হিসেবে। পাঞ্জাবের অভিজাত বেনিয়া সম্প্রদায়ের উপাধি ছিল আগারওয়াল। তাই অনেক ঐতিহাসিক ‘আগ্রাওয়ালা’র পরিবর্তে ‘আগারওয়াল’কেই অধিকতর সহিহ ও যুক্তিযুক্ত মনে করেছেন। তবে উমিচাঁদের দেশ-জাতি-গোত্র নিয়ে ঐতিহাসিকদের খুব বেশি মাথাব্যথা ছিল না। তারা বরং আরেকটি দিকে মনোনিবেশ করেছিলেন। তা হলো উমিচাঁদের বাণিজ্য বিশ্লেষণ। বাংলায় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যের প্রধান মধ্যস্বত্বভোগী হিসেবে উমিচাঁদের ভূমিকাই তাদের অধিকতর আকর্ষণ করেছিল।
তৎকালে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অনেক বাণিজ্যিক প্রতিনিধি ছিলেন। তাদের মাধ্যমে ভারত থেকে বিভিন্ন পণ্য কিনে পশ্চিমে রফতানি করা হতো। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও দেশীয় সরবরাহকারীদের বাণিজ্যিক লেনদেনের মাঝামাঝি ছিলেন কিছু ব্যবসায়ী। তাদের সঙ্গেই মূলত কোম্পানির চুক্তি হতো। তারা ‘দাদনি’ ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কোম্পানির সঙ্গে ব্যবসা করে তারা বিপুল অর্থসম্পদ গড়ে তুলেছিলেন। দাদনি ব্যবসায়ীদের কেন্দ্র ছিল কলকাতা ট্রেডিং হাউজ। প্রথমে এ হাউজের সহযোগী হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন উমিচাঁদ। পরে অংশীদার হলেন। উমিচাঁদ দ্রুত অংশীদারত্ব ছেড়ে একাই ব্যবসা শুরু করলেন। ১৭৩০ সালের মধ্যে একজন নেতৃস্থানীয় ব্যবসায়ী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেন উমিচাঁদ। এজন্য তিনি অনেক অসদুপায় অবলম্বন করেছিলেন বলে অভিযোগ আছে। বিভিন্ন নামে তিনি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে দাদনি চুক্তি নিজের একচেটিয়া দখলে নিয়েছিলেন। কোম্পানিও তাকে হাতে রাখতে কসুর করেনি। অন্যথায় উমিচাঁদের ফরাসি বা ডাচদের সঙ্গে হাত মেলানোর সম্ভাবনা ছিল। ব্রিটিশরা সে ঝুঁকি নিতে চায়নি। কোম্পানির চাহিদার গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ সরবরাহ করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন উমিচাঁদ। সে প্রস্তাব পর্যালোচনা করার ভার পড়েছিল কোম্পানির দুই কাউন্সিল সদস্যের ওপর। তাদের মধ্যকার আলোচনায় এক সদস্য বলেছিলেন, ‘তার স্বভাবজাত ও অর্জিত ব্যবসায়িক সক্ষমতা, অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যে তার অগাধ জ্ঞান এবং অর্থনৈতিক প্রাচুর্যের কারণে আমি তাকে উপযুক্ত মনে করি।’ কাউন্সিল সদস্যদ্বয়ের সুপারিশের ভিত্তিতে উমিচাঁদ কোম্পানির অনুমোদন পেয়ে গেলেন। পর্যায়ক্রমে তার ব্যবসা ও সম্পত্তির পরিমাণ তার পুরনো সহযোগী ও বর্তমান প্রতিদ্বন্দ্বীদের ছাড়িয়ে গেল। ব্রিটিশ ঐতিহাসিক রবার্ট ওরমে উমিচাঁদকে একজন বিচক্ষণ ও বুঝদার ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তার ভাষ্য অনুসারে, ব্যবসায়িক জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে ৪০ বছর ধরে নিজের ভাগ্য গড়ে তুলেছিলেন উমিচাঁদ। তার শানশওকত যতটা না শেঠদের মতো ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল একজন যুবরাজের মতো। সশস্ত্র একটি দল সর্বদা তার পাহারায় থাকত। বাংলা ও বিহারের প্রতি কোনায় তার ব্যবসা বিস্তৃত হয়েছিল। হাদিয়া ও সেবা প্রদানের মাধ্যমে তিনি মুর্শিদাবাদের নবাব পরিবারের সঙ্গে চমৎকার সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। নবাবের দরবারে বেশ প্রতিপত্তি অর্জন করেছিলেন উমিচাঁদ। তাই বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির ইংরেজ কর্মকর্তারা সংকটের সময় তাকে নবাবের সঙ্গে আলোচনা করতে পাঠাতেন। একপর্যায়ে কোম্পানির বিরাগভাজন হন উমিচাঁদ। অভিযোগ উঠেছিল যে তার সরবরাহকৃত পণ্যের দাম অনেক বেশি। সে তুলনায় মান কম। তাই ১৭৩৪ সালে কোম্পানি তাকে ‘দাদনি ব্যবসায়ী’র তালিকা থেকে বাদ দিয়েছিল। উমিচাঁদ তখন নবাবের সঙ্গে তার সুসম্পর্ককে কাজে লাগান। আলিবর্দি খানের ভাইয়ের অনুরোধে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাকে পুনরায় তালিকাভুক্ত করেছিল। এমনকি তিনি উমিচাঁদের জন্য জামিনও হয়েছিলেন। নবাব আলিবর্দি খান ও পরবর্তী সময়ে নবাব সিরাজউদদৌলার সঙ্গে উমিচাঁদের এ সম্পর্ককে পুঁজি করেছিল ইংরেজরা। সিরাজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে উমিচাঁদ ছিলেন তাদের তুরুপের তাস। তবে তিনি এমনিতেই ইংরেজদের সাহায্য করেননি। ইংরেজরা যুদ্ধে জয়ী হলে নবাবের সমুদয় সম্পদের ৫ শতাংশ তাকে দিতে হবে, এমন শর্তে তিনি রাজি হয়েছিলেন। না হলে নবাবের কাছে সব ষড়যন্ত্র ফাঁস করে দেয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। তাই ইংরেজরা তার এ দাবি মেনে নিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে রবার্ট ক্লাইভ জালিয়াতি করে তাকে প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করেছিলেন। এসব ক্ষেত্রে উমিচাঁদের ভূমিকা বিশ্লেষণ করলে মনে হয়, তিনি আসলে ব্যবসা ছাড়া কিছুই বুঝতেন না। অর্থবিত্ত তৈরির জন্যই তিনি সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতেন। প্রয়োজনে তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র কিংবা তাদের ব্ল্যাকমেইল করতেও দ্বিধা করতেন না। নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র কিংবা ইংরেজদের ব্ল্যাকমেইল করা, দুটোর পেছনেই উদ্দেশ্য ছিল একটাই—ব্যবসা। কলকাতার বণিক সম্প্রদায় প্রায় সবকিছুরই ব্যবসা করত। তবে উমিচাঁদের বিশেষত্ব ছিল সল্টপিটার ও আফিমে। রংপুরের ফৌজদারের সঙ্গে এক অবৈধ চুক্তির মাধ্যমে আফিম সংগ্রহ করতেন তিনি।
ইংরেজদের প্রধান বণিক হিসেবে উমিচাঁদের ছিল বর্ণিল জীবন। তবে জমিদার হিসেবে তার বদনাম ছিল। কলকাতার চমৎকার সব বাড়ির মালিক হলেও তিনি সেগুলোর সংস্কার করাতেন না। সে অভিযোগে প্রায়ই তাকে আদালতে হাজিরা দিতে হতো। ১৭৫৫ সালের বিচারিক নথিপত্রে তার নামে এসব মামলার উল্লেখ আছে। তেমনই একটি নথিতে লেখা আছে, ‘কলকাতা শহরে উমিচাঁদের অনেক বাড়ি আছে। কিন্তু তিনি সেগুলোর যথাযথ যত্ন নেন না। কয়েকটি বাড়ি একেবারেই সংস্কারের অযোগ্য। শহরের অধিবাসীদের জন্য ধ্বংসপ্রায় বাড়িগুলো উপদ্রবে পরিণত হয়েছে। যারা অনন্যোপায় হয়ে এসব বাড়িতে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন, তাদের জীবনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। পথচারীরাও আতঙ্কে আছেন। যেকোনো সময় এসব দালান ধসে পড়ে তারা চাপা পড়তে পারেন। ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে পাশের ভবনগুলোও। উমিচাঁদের অবহেলার কারণে এসব আতঙ্ক ও উপদ্রব শুরু হয়েছে বলে বিচারকরা রায় দিয়েছেন। এসব অভিযোগে বিচারকরা প্রায়ই তাকে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেন।’
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, উমিচাঁদ ব্যবসায় নানা ধরনের অসদুপায় অবলম্বন করতেন। বাণিজ্যে তার উত্থানের সঙ্গেও তেমন একটি ঘটনা জড়িয়ে আছে। তিনি তখন বোষ্টম দাস শেঠের পার্টনার ছিলেন। শেঠের মুমূর্ষু অবস্থায় উমিচাঁদ প্ররোচনা দিয়ে তার সম্পত্তি একটি জাল মর্টগেজের মাধ্যমে নিজের দায়িত্বে নিয়েছিলেন। তারপর পর্যায়ক্রমে সেই সম্পত্তি বিক্রি করে শেঠের পাওনাদারদের দিয়েছিলেন উমিচাঁদ। কিন্তু অধিকাংশ অর্থ তার ঝুলিতেই ঢুকেছিল। এ জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুলভাবে লাভবান হয়েছিলেন উমিচাঁদ।
মারা যাওয়ার সময় বিপুল অর্থসম্পদ রেখে গিয়েছিলেন উমিচাঁদ। তা নিয়ে তার উত্তরাধিকারীদের মধ্যে লেগেছিল বিবাদ। সে বিবাদ মামলা পর্যন্ত গড়িয়েছিল। মামলার বাদী ও বিবাদী ছিলেন হিরা সিং ও বুলাকি সিং। হিরা সিং ছিলেন উমিচাঁদের শ্যালক হুজুরি মলের উত্তরাধিকারী। আর বুলাকি সিং ছিলেন উমিচাঁদের দত্তক নেয়া পুত্র দীপচাঁদের ভাতিজা। মামলাটি দীর্ঘদিন চলেছিল।
উমিচাঁদ নিজ গুণ ও দক্ষতায় ব্যবসায়ী হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তার বাণিজ্যের কেন্দ্র ছিল কলকাতা। সব মিলিয়ে ইংরেজদের কাছে তিনি ‘কলকাতার কালো বণিক’ নামে পরিচিত ছিলেন।
নিজাম আশ শামস: লেখক ও অনুবাদক





