পলাশীর যুদ্ধ শেষ হলো। সিংহাসনে বসলেন মীর জাফর। বিজয়লব্ধ অর্থসম্পদ থেকে কলকাতার ইউরোপীয় সম্প্রদায় ৫ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ড পেল। হিন্দুদের হাতে গেল ২ লাখ ২০ হাজার পাউন্ড। আর্মেনীয়রা লাভ করল ৭৭ হাজার পাউন্ড। সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনী মিলে পেল ২ লাখ ৭৫ হাজার পাউন্ড। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনাবাহিনীর কমান্ডার ইন চিফ হিসেবে রবার্ট ক্লাইভ সিংহভাগের অধিকার নিলেন। তাছাড়া মীর জাফর তাকে ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন উপঢৌকন দিয়েছিলেন। সব মিলিয়ে রবার্ট ক্লাইভ একাই ২ লাখ ৭৫ হাজার পাউন্ড পেয়েছিলেন। কিন্তু পলাশীর যুদ্ধে ইংরেজদের বিজয়ের পর সবচেয়ে বেশি অর্থ যার পাওয়ার কথা ছিল, সেই উমিচাঁদ কিছুই পেলেন না!

নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার জন্য ইংরেজদের কাছে বেশ বড় দাবিই করেছিলেন উমিচাঁদ। ইংরেজরা যুদ্ধে বিজয়ী হলে নবাবের সঞ্চিত অর্থের ৫ শতাংশ তাকে দিতে হবে। সেই সঙ্গে দিতে হবে স্বর্ণালংকারের এক-চতুর্থাংশ। সব মিলিয়ে নবাবের বিরুদ্ধে অন্যতম ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে তার ১০ লাখ পাউন্ড পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তিনি পেলেন অশ্বডিম্ব! এ প্রসঙ্গে নরেন্দ্র কৃষ্ণ সিনহা ‘দি ইকোনমিক হিস্ট্রি অব বেঙ্গল’ বইয়ে উল্লেখ করেছেন, ‘উমিচাঁদের অর্থনৈতিক জুয়া একেবারে মাঠে মারা গেল!’ উমিচাঁদকে ঠকানোর কাজটি করেছিলেন রবার্ট ক্লাইভ। আর দুঃসংবাদটি তাকে দিয়েছিলেন লুক স্ক্র্যাফটন। তিনি মুর্শিদাবাদের নবাবের দরবারে নিয়োজিত ইংরেজ কর্মকর্তা উইলিয়াম ওয়াটসের রাজনৈতিক সচিব ছিলেন। এ ঘটনার সাক্ষী ছিলেন কোম্পানির মাদ্রাজ কাউন্সিলের সদস্য ও ঐতিহাসিক রবার্ট ওরমে। তার বর্ণনা অনুসারে, বিজয়-পরবর্তী সভা শেষ হলো। উমিচাঁদ সুখবর শোনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন। সৌভাগ্যের ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত ছিলেন। তবে তার ভুল ভাঙতে সময় লাগল না। ক্লাইভ স্ক্র্যাফটনকে বললেন, ‘উমিচাঁদকে এখন আসল ব্যাপারটি জানানো যায়।’ স্ক্র্যাফটন তখন উমিচাঁদকে বললেন, ‘চুক্তিপত্রটি কৌশল ছিল মাত্র। আসলে তুমি কিছুই পাচ্ছ না।’ উমিচাঁদের শরীরে যেন কেউ বোমা ফাটিয়ে দিল! তিনি টলে উঠলেন। প্রায় ভূপতিত হচ্ছিলেন। এমন সময় কর্মচারীরা তাকে ধরে ফেলল। তারা তাকে পালকিতে করে বাড়িতে নিয়ে গেল। দীর্ঘ সময় বিষাদাচ্ছন্ন ছিলেন উমিচাঁদ। তার দশা হয়েছিল পাগলপ্রায়। কিছুদিন পর তিনি ক্লাইভের সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। ক্লাইভ তাকে তীর্থে যেতে বললেন। উমিচাঁদ তীর্থে গেলেন। ফিরলেন বদ্ধ উন্মাদ হয়ে। সে অবস্থাতেই তিনি মারা যান। উমিচাঁদকে তীর্থে যাওয়ার উপদেশ দেয়া প্রসঙ্গে এক স্মারকলিপিতে রবার্ট ক্লাইভ লেখেন, ‘উইলিয়াম ওয়াটসের সঙ্গে কাজ করার সময় উমিচাঁদ বেশ দক্ষতা দেখিয়েছিলেন। কিন্তু ব্যক্তিগত স্বার্থ আদায়ের জন্য তিনি তার অবস্থান থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন। তাই আমি তাকে মালদহের তীর্থস্থান পরিদর্শনে যাওয়ার উপদেশ দিয়েছিলাম। সংযত অবস্থায় কোম্পানিকে তিনি অনেক ধরনের সেবা দিতে পারবেন। তাই তাকে একেবারে বাতিল করে দেয়া ঠিক হবে না।’

নবাব সিরাজউদদৌলার বিরুদ্ধে অন্যতম ষড়যন্ত্রকারী ছিলেন উমিচাঁদ। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও নবাব উভয় পক্ষের সঙ্গেই তার ভালো সম্পর্ক ছিল। নিজের বাণিজ্য প্রসারের খাতিরে তিনি দুটি পক্ষকেই সময় ও সুযোগমতো কাজে লাগাতেন। তাই ষড়যন্ত্রকারীদের মধ্যে তার অবস্থান ছিল অনন্য। এ অনন্যতা নিয়ে সচেতন ছিলেন উমিচাঁদ। এটিকে তিনি পুঁজি করেছিলেন। ইংরেজদের প্রতি নবাবের ইতিবাচক মনোভাব তৈরির চেষ্টা করেছিলেন উমিচাঁদ। এ প্রসঙ্গে মুর্শিদাবাদের দরবারে নিয়োজিত ইংরেজ প্রতিনিধি উইলিয়াম ওয়াটস লেখেন, ‘উমিচাঁদ নবাবকে বলেছিলেন যে তিনি ৪০ বছর ধরে ইংরেজদের সঙ্গে কাজ করছেন। এ দীর্ঘ সময়ে তিনি কখনই তাদের কথার খেলাপ করতে দেখেননি। নবাবকে বিশ্বাস করানোর জন্য এক ব্রাহ্মণের পা ছুঁয়ে শপথ করেছিলেন উমিচাঁদ। নবাবকে তিনি আরো জানান, যদি ইংল্যান্ডে কারো বিরুদ্ধে মিথ্যা বলার অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তার দিকে থুতু নিক্ষেপ করা হয়। কেউই তাকে আর বিশ্বাস করে না।’ উমিচাঁদ একদিকে নবাবকে ভুল বোঝালেন। অন্যদিকে তিনি রবার্ট ক্লাইভসহ সব ষড়যন্ত্রকারীকে ব্ল্যাকমেইল করা শুরু করলেন। উমিচাঁদ তাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থসম্পদ দাবি করলেন। তার দাবি মানা না হলে নবাবের কাছে সব ফাঁস করে দেয়ার ভয় দেখালেন। দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন রবার্ট ক্লাইভ। উমিচাঁদকে চুপ করাতেই হবে। আবার তার দাবিও মানতে চান না ক্লাইভ। অনেক ভেবে একটি উপায় বের করলেন তিনি। চাতুরীর আশ্রয় নিলেন। তিনি দুটি চুক্তিপত্র তৈরি করলেন। একটি সাদা কাগজে। অন্যটি লাল কাগজে। লাল চুক্তিপত্রটি ছিল জাল। সেখানে উমিচাঁদের সব দাবি মেনে নেয়া হলো। আর সাদা চুক্তিপত্রটি ছিল ক্লাইভ ও অন্য ষড়যন্ত্রকারীদের অনুকূলে। সেখানে উমিচাঁদের জন্য কিছুই বরাদ্দ ছিল না। প্রতারণাটি আরো নিখুঁত করার জন্য সুরার আসরে উমিচাঁদের সঙ্গে দরকষাকষি পর্যন্ত করলেন ক্লাইভ। লাল চুক্তিপত্রে অ্যাডমিরাল চার্লস ওয়াটসনের সই নকল করেছিলেন তিনি। তার ফাঁদে খুব সহজেই বন্দি হলেন উমিচাঁদ।

ভারতে বিভিন্ন প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডের জন্য রবার্ট ক্লাইভকে যুক্তরাজ্যের সংসদের নিম্নকক্ষ হাউজ অব কমনসের তোপের মুখে পড়তে হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের মধ্যে উমিচাঁদের সঙ্গে প্রতারণার বিষয়টি ছিল। ১৭৭৩ সালের ১০ মে হাউজ অব কমনসে আত্মপক্ষ সমর্থন করে বক্তব্য দিয়েছিলেন রবার্ট ক্লাইভ। সে বক্তব্যে উমিচাঁদের সঙ্গে তার প্রতারণামূলক আচরণের ব্যাখ্যাও ছিল। এ লেখায় আগ্রহী পাঠকদের জন্য রবার্ট ক্লাইভের ইংরেজি বক্তব্যের কিছু অংশের বঙ্গানুবাদ করা হলো। ক্লাইভ বলেন, ‘উমিচাঁদ নবাবের বিশ্বস্ত অনুচর ছিলেন। তিনি নবাবকে বলেছিলেন যে ইংরেজ ও সেনাপতি মঁশিয়ে ডুপ্রের মধ্যে একটি চুক্তি হয়েছে। তারা সম্মিলিতভাবে নবাবকে আক্রমণের পরিকল্পনা করছে। এ তথ্য জানানোর জন্য নবাব তাকে চার লাখ রুপি দিয়েছিলেন। এ ঘটনায় আমরা বুঝতে পারলাম যে নবাব তাকে অত্যন্ত বিশ্বাস করেন। তাই নবাবের বিরুদ্ধে আমাদের বিপ্লব সফল করার ক্ষেত্রে আমরা তাকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করেছিলাম। তাই তার সঙ্গে এমন একটি চুক্তি সে সময় প্রয়োজনীয় ছিল। আমরা তার সব দাবি মেনে নিয়েছিলাম। সবকিছু প্রস্তুত হলো। চুক্তিপত্র স্বাক্ষরের সময় নির্ধারিত হলো। এমন সময় বেঁকে বসলেন উমিচাঁদ। তার দাবি আরো বেড়ে গেল। উইলিয়াম ওয়াটস তখন নবাবের দরবারে ছিলেন। উমিচাঁদ তার কাছে ৩০ লাখ রুপি দাবি করলেন। সেই সঙ্গে জানালেন যে নবাবের যেসব অর্থসম্পদ পাওয়া যাবে তার ৫ শতাংশ তাকে দিয়ে দিতে হবে। তার দাবি তৎক্ষণাৎ না মানা হলে সব ষড়যন্ত্র নবাবের কাছে ফাঁস করে দেয়ার ভয় দেখান তিনি। আরো জানান যে নবাব ষড়যন্ত্রের কথা জানতে পারলে ভোর হওয়ার আগেই মুর্শিদাবাদের দরবারে অবস্থানরত ওয়াটস ও আরো দুই ইংরেজের মাথা কাটা যাবে। ওয়াটস তৎক্ষণাৎ আমাকে সে ব্যাপারে অবহিত করলেন। তাদের প্রাণ বাঁচাতে কৌশলের আশ্রয় নিতে আমি কোনো দ্বিধা করলাম না। আমি মনে করি, যখন কোম্পানির অস্তিত্ব সংকটের মুখে, তখন উমিচাঁদের মতো খলনায়কের সঙ্গে প্রতারণা করা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী নয়। আশা করি, এ ব্যাপারে হাউজ আমার সঙ্গে একমত হবেন।’

এতে কোনো সন্দেহ নেই যে প্রতারণার শিকার হয়ে উমিচাঁদ খুবই কষ্ট পেয়েছিলেন। কিন্তু তার পাগল হয়ে যাওয়ার গল্পকে অনেক ঐতিহাসিক অতিরঞ্জন মনে করেন। তাদের মতে, ১৭৫৮ সাল পর্যন্ত ইংরেজদের সঙ্গে সল্টপিটারের ব্যবসা করেছিলেন উমিচাঁদ। তারপর ইংরেজরা বাংলার পুতুল নবাব মীর জাফরের কাছ থেকে একচেটিয়া ব্যবসা করার অধিকার আদায় করে নেয়। 

পলাশীর যুদ্ধের পর উমিচাঁদের পরিণতি কী হয়েছিল, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। কিন্তু এটি নিশ্চিত যে তিনি ভূত হয়ে রবার্ট ক্লাইভকে ভয় দেখাননি। তবে শিল্পীর কল্পনায় নিজের পাওনা বুঝে নিতে ভূত হয়ে ক্লাইভকে ভয় দেখিয়েছিলেন উমিচাঁদ। ১৭৭৩ সালের জানুয়ারি মাসে ওয়েস্টমিনস্টার ম্যাগাজিনে একটি ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে দেখা যায়, মেঘের ভেতর থেকে হঠাৎ করে ক্লাইভের সামনে আবির্ভূত হয়েছে উমিচাঁদের ভূত। তাকে দেখে ভীত ক্লাইভ। তাকে ধরে রেখেছেন দুই ইংরেজ কর্মকর্তা। চিত্রকর্মটির নাম ‘দ্য ঘোস্ট অব উমিচাঁদ’। এটি উমিচাঁদের সঙ্গে ক্লাইভের প্রতারণার একটি চমৎকার নমুনা হয়ে আছে।

মোহাম্মদ রবিউল হোসাইন: লেখক