ভূমিকা

ফরাসি চলচ্চিত্রকার ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো সুইডেনের চিত্রনির্মাতা ইঙ্গমার বারিমানের (বাংলা ভাষায় অনেকেই তাঁকে বার্গম্যান বলে চেনেন) ভক্ত ছিলেন। বারিমানের চেয়ে ত্রুফো প্রায় ১৪ বছরের ছোট। একজন জন্মগ্রহণ করেছেন ১৯১৮ সালের ১৪ জুলাই, অন্যজন ১৯৩২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি। চিত্রনাট্য লেখার মধ্য দিয়ে বারিমান যখন চলচ্চিত্রে কাজ শুরু করেন ১৯৪১ সালে, তখন ত্রুফোর বয়স ৯, মায়ের স্নেহবঞ্চিত, পরিচয়হীন বাবার সন্তান হিসেবে বড় হচ্ছেন নানির কাছে। পরে অবশ্য পালক পিতার সংসারে জায়গা হয় তাঁর। সে সময় ছবি দেখতে দেখতে ত্রুফোর চলচ্চিত্র সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে ওঠার কথা সবারই জানা। কৈশোরে দেশী-বিদেশী অজস্র ছবি গোগ্রাসে গিলেছেন ত্রুফো। একেকটি ছবি চার-পাঁচবার করেও দেখেছেন তিনি। এর কারণ হলো, টিকিট ছাড়া প্রেক্ষাগৃহে ঢুকতেন ত্রুফো, ধরা পড়ার ভয়ে বহির্গমন পথের কাছেই বসতেন। টিকিট পরীক্ষকের হাত থেকে বাঁচতে প্রায়ই ছবির অর্ধেক দেখে পালিয়ে যেতে হতো বালক ত্রুফোকে। ছবির পুরো কাহিনী দেখতে তাই একাধিকবার ওই ছবি দেখতে হতো। আবার অনেক সময় সকালে হয় তো স্কুল পালিয়ে একটি ছবি দেখেছেন, বিকালে বাবা-মায়ের সঙ্গে আবারো সেই একই ছবি দেখতে হচ্ছে, ভান করছেন, এই প্রথম দেখছেন ছবিটি। এভাবে একটি ছবি বহুবার করে দেখতেন ত্রুফো। এমনটা করতে করতে অনেক পরিচালকই প্রিয় হয়ে ওঠেন তাঁর। ত্রুফোর প্রিয় পরিচালকের নামের তালিকায় আছেন চ্যাপলিন, হিচকক, ব্রেসোঁ, রেনোয়া, আছেন ইঙ্গমার বারিমান।

বারিমানের চরিত্রদের মুখে সরল, কিন্তু দার্শনিক ব্যঞ্জনায় পূর্ণ সংলাপই ত্রুফোকে আকৃষ্ট করেছিল বেশি। আর আকর্ষণ করেছিল বারিমানের প্রাণচাঞ্চল্য। ষাটটির ওপর কাহিনীচিত্র, প্রামাণ্যচিত্র ও টেলিভিশনের জন্য ছবি নির্মাণ করেছিলেন বারিমান। নির্দেশনা দিয়েছেন ১৭০টিরও বেশি মঞ্চনাটক। ত্রুফোও কম যান না, ২৫টিরও অধিক চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন তিনি। চিত্রসমালোচক হিসেবেও প্রসিদ্ধি পেয়েছেন। তিনিও বারিমানের মতোই একজন অতর পরিচালক। ১৯৫৮ সালে

ত্রুফো একটি নিবন্ধ রচনা করেন বারিমানকে নিয়ে, অনেকটা শ্রদ্ধাঞ্জলী নিবেদনের ঢংয়ে, ইংরেজিতে যার শিরোনাম হয় ‘বারিমান্থস ওপাস’। এটি পরে সংকলিত হয় ত্রুফোর দ্য ফিল্মস ইন মাই লাইফ বইতে। ফরাসি থেকে বইটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন লেওনার্দ মেহিউ। বইটি ১৯৯৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশ করে ডিএ ক্যাপো প্রেস। এ বইটি থেকেই বর্তমান বাংলা তর্জমাটি করা হয়েছে। শিরোনামটি একটু পাল্টে দেয়া হয়েছে বাংলায়, যোগ করা হয়েছে বোধিনী, আর তর্জমার মাঝে তৃতীয় বন্ধনির ভেতর লেখা কথাগুলো অনুবাদকের। এটা সবাই জানেন, ইঙ্গমার বারিমান, যার এ বছর চল্লিশ হলো, একজন মন্ত্রীর ছেলে। ১৯৪৫ সালে চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করেন তিনি, এর আগে তিনি গোটা কয়েক মঞ্চনাটক ও উপন্যাস লিখেছেন, গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন নাট্যদল পরিচালনায়। সেই দায়িত্ব এখনো পালন করছেন। তিনি আনুই, কামু ছাড়াও ফরাসি ও স্ক্যানডিনেভিয়ার ধ্রুপদী সাহিত্যের সেরা সৃষ্টিগুলো মঞ্চস্থ করেছেন।

তাঁর এই বিশাল কর্মযজ্ঞ কিন্তু তাই বলে তের বছরের মধ্যে ১৯টি চলচ্চিত্র নির্মাণে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। আরো একটা ব্যাপার হতবুদ্ধি হওয়ার মতো, এসব ছবির প্রায় সবগুলোই তাঁর নিজস্ব সৃষ্টি, চিত্রনাট্য থেকে শুরু করে সংলাপ, পাশাপাশি ছবি পরিচালনার কাজ তো আছেই। তাঁর ১৯টি ছবির মধ্যে মাত্র ছয়টি ফ্রান্সে বাণিজ্যিকভাবে মুক্তি পেয়েছে: সিনস ফ্রম আ ম্যারেজ, সামার উইথ মনিকা, স্মাইলস অব সামার নাইট, সডাস্ট অ্যান্ড টিনসেল, দ্য সেভেন্থ সিল ও সামার ইন্টারল্যুড। তবে গত তিন বছরে যে পুরস্কারগুলো তিনি পেয়েছেন, সেগুলোকে ধন্যবাদ, ওগুলোর কারণেই আর্ট হাউজে (প্যারিসে এখন ১৮টি) তাঁর ছবির দর্শক বাড়ছে। আর্ট হাউজের সংখ্যাও বাড়ছে। আসছে মৌসুমে কয়েকটি হাউজে তাঁর অপেক্ষাকৃত পুরনো ছবিগুলো প্রথমবারের মতো চালানো হবে। আমি মনে করেছিলাম, [মুক্তি পাওয়া] ছবিগুলো বোধহয় অনেক দর্শক টানতে পারবে, যেমন স্মাইলস অব আ সামার নাইট ছবিটি [সুইডেনে] দর্শক যেভাবে দেখেছে, লুবিেসর ঢঙে নির্মিত দারুণ কমেডি আ লেসন ইন লাভ, ওয়েটিং উইমেন, বা তিক্ততা মেশানো কমেডি জার্নি ইনটু অটাম। অন্য দুটি ছবি তো, আরো উচ্চাকাঙ্ক্ষী, যদিও ভিন্নধর্মী সডাস্ট অ্যান্ড টিনসেলের মতো হয় তো সাফল্য পেতে পারত: একটি হলো দ্য প্রিজন, ছবির গল্প এক চিত্রনির্মাতাকে নিয়ে, তার পুরনো গণিত শিক্ষক তাকে প্রস্তাব দেয়, নরক নিয়ে একটি ছবি নির্মাণের। আর দ্বিতীয় ছবিটি হলো থার্স্ট, এ ছবিতে একদল সুইডিশ পর্যটক, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ মাত্র শেষ হয়েছে, এমন সময় যুদ্ধবিধ্বস্ত জার্মানিতে যান, তখন নিজেদের দ্বিচারিতা সম্পর্কে সচেতন হন।

সুইডেনে, ইঙ্গমার বারিমান এখন শ্রেষ্ঠ পরিচালক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত, তবে এ জায়গায় পৌঁছাতে কম বেগ পেতে হয়নি তাঁকে। বারিমান প্রথম চলচ্চিত্রের সংস্পর্শে আসেন ১৯৪৪ সালে, ওই বছর তিনি খোবারির টোরমেন্টসের জন্য চিত্রনাট্য লিখেছিলেন (মিস জুলি ছবিটিও পরিচালনা করেছিলেন আল্ফ খোবারি)। টোরমেন্টস ছবির গল্পটি এমন একজন লাতিন শিক্ষক, নাম ক্যালিগুলা, সে শুধু শিক্ষার্থীদের শাস্তি দিত (এ চিত্রনাট্য রচনার কিছুদিন আগেই বারিমান কামুর ক্যালিগুলা মঞ্চস্থ করেন)। পরের বছরই বারিমান নিজে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন ক্রাইসিস, এক দুর্দশাগ্রস্ত মেয়ের গল্প রয়েছে এ ছবিতে, যেখানে দেখা যায় জৈবিক মা ও দত্তক নেয়া মাকে নিয়ে টানাপড়েনের মধ্যে পড়ে মেয়েটি। এ ছবির পর বারিমান বানান ইট রেইনস অন আওয়ার লাভ, এর পর  পোর্ট অব কল।

দুঃখভারাক্রান্ত সংসার আর দ্রোহীভাবের জন্য বারিমানের প্রথম দিককার ছবিগুলো লোকজনকে স্তম্ভিত করে রাখত। সেসব ছবিতে প্রায় সবসময়ই মধ্যবিত্ত সমাজের অসঙ্গিতর মাঝে বয়ঃসন্ধিকালের ছেলেমেয়েদের বিধিনিষেধের বাইরে গিয়ে আনন্দ খোঁজার বিষয়টি ঘুরেফিরে এসেছে। শুরুর ছবিগুলো সাধারণভাবে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পায়নি। বারিমানকে তখন লোকে ভাবতে শুরু করেছিল বিধ্বংসী, ধর্মবিদ্বেষী ও বিরক্তিকর স্কুলবালক হিসেবে।

মিউজিক ইন ডার্কনেস (১৯৪৮) ছবির মাধ্যমেই বারিমান প্রথম সত্যিকারের সাফল্যের মুখ দেখেন। ছবিতে এক পিয়ানোবাদকের কাহিনী বলা হয়, যে সামরিক বাহিনীতে থাকার সময় চোখের দৃষ্টি হারায়।

বেসামরিক জীবনে ফিরে আসার পর তার অবস্থার কারণে আনুকূল্য পান তিনি, স্বাভাবিক জীবন পেয়ে বেশ আনন্দেই কাটছিল সময়, তবে সেটিতে ছেদ পড়ে যখন তার সামনে উপস্থিত হয় প্রেম ও প্রতিদ্বন্দ্বী, তাই ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে পিয়ানোবাদক।

১৯৫১ সালের মধ্যে বারিমানের নামডাক ভালোভাবেই ছড়িয়ে পড়েছিল, কিন্তু সুইডেনের চলচ্চিত্র কারখানায় একটি সংকট চলছিল বলে সেভাবে কোনো ছবি নির্মাণ হচ্ছিল না সে সময়, তখন টিকে থাকার জন্য একটি ব্র্যান্ডের সাবানের কাছে মেধা বন্দক দিয়ে বারিমান নয়টি বিজ্ঞাপনচিত্র তৈরি করেছিলেন।

পরের বছর আরো ভালোবাসা নিয়ে তিনি নিজের আসল কাজে ফিরে যান এবং নির্মাণ করেন ওয়েটিং উইমেন, ছবিটি সম্ভবত জোসেফ ম্যাঙ্কিউবিচের আ লেটার টু থ্রি ওয়াইভস দ্বারা প্রভাবিত। বারিমানের কাজ আদতে একজন জন্মগত চিত্রনির্মাতার শ্রম। যখন তাঁর বয়স ছয়, তখন থেকেই তিনি ছোট প্রোজেক্টর নিয়ে খেলাধুলা করতেন, সেখানে বারবার একই ফিল্ম স্ট্রিপ চালাতেন।

প্রিজন ছবিতে বারিমান নিজের শৈশবের স্মৃতিকেই সাদরে টেনে এনেছেন, দেখিয়েছেন একজন  চলচ্চিত্রপ্রেমীকে, নিজের চিলেকোঠায় সে একটি পুরনো ব্যঙ্গাত্মক ছবি চালায়, যে ছবিতে রাতের  পোশাকপরা স্বপ্নচর, পুলিশ ও স্বয়ং শয়তান একে অপরকে ধাওয়া করছে। এ ধাওয়ার গতি ধীরে ধীরে বাড়ে। বর্তমানে বারিমানের একটি ব্যক্তিগত চলচ্চিত্রাগার আছে, সেখানে ১৬ এমএমে রূপান্তর করা প্রায় দেড়শ ছবি আছে। সেসব ছবি তিনি প্রায়ই তাঁর দোসর ও অভিনয়শিল্পীদের নিয়ে দেখেন।

বারিমান প্রচুর আমেরিকান ছবি দেখেছেন। তিনি যে হিচকক দ্বারা প্রভাবিত, সেটা বোঝা যায়। থার্স্ট ছবিতে দেখা যায় বারিমান একজন নারী ও একজন পুরুষের মধ্যে সংলাপ রচনা করছেন দুর্বোধ্য কিন্তু অর্থ প্রকাশের ব্যঞ্জনা নিয়ে, সেখানে যখন দুজনের মধ্যে বাহুল্যবর্জিত বাক্য ও বিশেষ ঢঙের চাহনি দেখা যায়, তখন আসলে যে কারো হিচককের সাসপিশন ও রিচ অ্যান্ড স্ট্র্যাঞ্জের কথা মনে পড়বেই। ১৯৪৮ সালে শুরুর দিকে, যে বছর দ্য রোপ মুক্তি পেল, তখন থেকে বারিমানও ছবির দৃশ্যে কাটাকাটি প্রায় বন্ধ করে দিলেন, মনোযোগ দিলেন ক্যামেরা সঞ্চালন ও অভিনয়শিল্পীদের ওপর, যেন একটি দৃশ্যকে নিরবচ্ছিন্নভাবে দীর্ঘায়িত করা যায়।

তাই বলে জুয়ান বারডেমের মতো হননি বারিমান, জুয়ানের প্রত্যেকটি ছবি ভিন্ন ভিন্ন পরিচালক দ্বারা প্রভাবিত এবং তিনি কখনই নিজের ব্যক্তিত্ব অথবা সংবেদনশীলতা দিয়ে স্বতন্ত্র ছাপ কাজের মধ্যে রাখতে পারেননি। অন্যদিকে বারিমান ঠিকই যাদের কাজ পছন্দ করতেন ককত্যু, আনুই, হিচকক ও ধ্রুপদী মঞ্চনাটকের উপাদান সুচারুভাবে নিজের কাজের সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন।

ওফুলস ও রেনোয়ার মতো বারিমানের কাজও নারীকেন্দ্রিক, এসব কাজ দেখে রেনোয়ার চেয়ে ওফুলসকেই বেশি মনে পড়বে, এর কারণ সডাস্ট অ্যান্ড টিনসেলের নির্মাতা বারিমান, ওফুলসের মতো, নারী চরিত্রের দৃষ্টিভঙ্গি পুরুষ চরিত্রের তুলনায় অনেক বেশি স্বতঃস্ফূর্তভাবে ধরতে পারেন। নির্দিষ্ট করে বললে, কেউ হয় তো বলতে পারেন, খোনোয়া ছবিতে পুরুষসঙ্গীর চোখ দিয়ে নায়িকাদের দেখার ভঙ্গিটা ফুটিয়ে তোলেন, অপরদিকে ওফুলস ও বারিমান পুরুষকে দেখাতে চেয়েছেন নারীর নজর থেকেই। এটা ফুটে ওঠে স্মাইলস অব আ সামার নাইট ছবিতে, যেখানে পুরুষ চরিত্রগুলো শুধু মজুদ থাকে, অন্যদিকে নারী চরিত্রগুলোকে চিত্রায়ণ করা হয় সূক্ষ্মভাবে।

সুইডেনের এক সাংবাদিক একবার উল্লেখ করেছিলেন, ‘বারিমান নারীদের সম্পর্কে অনেক বেশি জ্ঞানী (পুরুষদের তুলনায়)।’ বারিমান আবার এ মন্তব্যের প্রত্যুত্তরে বলেছিলেন, ‘প্রত্যেক নারীই আমাকে বিচলিত করে বৃদ্ধা, তরুণী, লম্বা, খাটো, মোটা, চিকন, প্রশস্ত, ভারী, হাল্কা, সুন্দরী, আকর্ষণীয়, জীবিত, মৃত। আমি গাভী, বাঁদরী, শূকরী, কুকুরী, ঘটকী, মুরগি, রাজহংসী, টার্কি মুরগি, জলহস্তিনী ও মূষিকাকেও ভালোবাসি। তবে নারী জাতির মধ্যে আমার অধিক পছন্দ বন্য জন্তু ও ভয়ানক সরীসৃপ। অনেক নারীর প্রতি আমার বিতৃষ্ণাও আছে। আমি দু-একজনকে খুনও করতে চাই, অথবা কোনো নারীর হাতে খুন হতে চাই। নারীদের পৃথিবীই আমার বিশ্ব। 

ও রকম আবহেই আমি বেড়ে উঠেছি, হয় তো কোনো বড় কাজের জন্য নয়, তবে এ বিশ্ব থেকে যদি কেউ নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে, তাহলে সে নিজের সত্তাকে জানতে পেরেছে কিনা, তা সত্যিই কোনো দিন সে বুঝতে পারবে না।’

বারিমানকে নিয়ে লেখালেখির পরিমাণ বাড়ছে, এটা ভালো। সমালোচক, যারা বারিমানের পুরোকাজের ভেতর থাকা গভীর নিরাশাবাদ নিয়ে বিস্তারিত আলাপ করতে চান না, তারা বারিমানের আশাবাদ নিয়ে কথা বলেন। বারিমানের পুরো কাজের বিচারে দুটোই যথেষ্ট সত্য [নিরাশাবাদ ও আশাবাদ], কারণ বারিমান ছিলেন সত্যপ্রেমী। জেদি বারিমান তাই সবদিকেই বল প্রয়োগ জারি রেখেছিলেন। স্মাইলস অব আ সামার নাইট ছবির একটি সংলাপে গ্রাহ্যতার দর্শনই (philosophyof caring) যেন ঘনীভূত হয়েছে, যদিও অদিবেখতির কৌশলের সঙ্গে সেটি রঞ্জিত করেই পরিবেশিত হয়েছে, সংলাপটি এমন: ‘একজন মানুষকেও যে আমরা যন্ত্রণাভোগ থেকে এক মুহূর্তের জন্য রক্ষা করতে পারি না, সেটাই আমাদের শেষ পর্যন্ত নিশ্চল হতাশার দিকে ঠেলে দেয়।’

বারিমানের সূচনালগ্নের ছবিগুলো সামাজিক সমস্যা তুলে ধরত; তাঁর কাজের দ্বিতীয় পর্যায়ে যে বিশ্লেষণ দেখি সেটি অনেক বেশি ব্যক্তিগত, চরিত্রগুলোর হূদয়ে বিশুদ্ধ অন্তর্দৃষ্টি নিক্ষেপ; আর বিগত

কয়েক বছরের কাজে তিনি ব্যস্ত ছিলেন ভালো ও মন্দ নিয়ে, অধিবিদ্যা (metaphysics) wনয়ে সডাস্ট অ্যান্ড টিনসেল ও দ্য সেভেন্থ সিল ছবিগুলোতে সেগুলোর ছাপ বেশ ভালোভাবেই আছে। ধন্যবাদ সুইডিশ প্রযোজকদের তাঁকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়ার জন্য (তাঁর সব ছবিই স্ক্যানডিনেভিয়াতে মুক্তি দিয়েছেন এ প্রযোজকরা)। বারিমান তাই এগিয়ে যেতে পেরেছেন সামনের দিকে, বারো বছরে তিনি এতসব সৃজনশীল কাজ করেছেন, যা করতে হিচকক ও রেনোয়ার লেগেছে ত্রিশ বছর।

বারিমানের কাজে কাব্যের একটা বড় ভূমিকা আছে, ছবি দেখা শেষ হলে পরই সেটা আমাদের চৈতন্যে ধরা পড়ে। অবশ্য সত্যের সন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানও খুঁজে পাওয়া যায় তাতে, এটাই সর্বদা সবচেয়ে ফলপ্রসূ পদ্ধতি। বারিমানের প্রধান শক্তির জায়গাটা হলো অভিনয় শিল্পীদের নির্দেশনা দেয়ার ক্ষমতা। ছবিতে তিনি নির্ভরযোগ্য ও নিজের সবচেয়ে পছন্দের পাঁচ কি ছয়জনকেই প্রধান চরিত্রগুলো করতে দেন, তবে একই ধরনের চরিত্র তাঁদের করতে দেন না। তাঁর একটি ছবি থেকে আরেকটি ছবির চরিত্র অনুযায়ী অভিনয় শিল্পী নির্বাচন একেবারেই ভিন্ন, কখনো কখনো বারিমান একেবারে বিপরীত চরিত্রও করতে দেন শিল্পীদের। মারগিট কার্লকুইস্টকে তিনি আবিষ্কার

করেছিলেন একটি পোশাকের দোকানে, হারিয়েট আন্দারসনকে দেখেছিলেন একটি আঞ্চলিক মঞ্চনাটকে, কালো জামা পরে গান পরিবেশন করছিলেন তিনি। বারিমান সাধারণত অভিনয় শিল্পীদের কোনো দৃশ্য পুনরায় করার জন্য বলেন না, আর পূর্বপরিকল্পনা ছাড়া যে প্রথম খসড়া চিত্রনাট্য লেখেন, সেটাতে তাঁর লেখা সংলাপের বাক্য কখনই পরিবর্তন করেন না।

বারিমানের যেকোনো চলচ্চিত্রের শুরুতে দর্শকের ভেতর এক ধরনের অনুভূতি হয়, যাতে মনে হয় বারিমান নিজেই বুঝতে পারছেন না শেষ পর্যন্ত ছবির গল্পটি কীভাবে শেষ করবেন, বাস্তবিকপক্ষে হয় তো সেটাই ঘটনা হয়ে যায়। রেনোয়ার ছবির বেলাতেও, ছবিতে যা ঘটছে, যা ঘটতে যাচ্ছে, সেগুলো দেখার সময় দর্শকের মনে হবে তিনিও বুঝি পরিচালকের সঙ্গে চিত্রায়ণের কাজ করছেন, অনেকটা যেন পরিচালকের সহযোগী হয়ে ওঠেন দর্শক।

নিজের কল্পিত শক্তিমান চরিত্রগুলো দিয়ে যেভাবে আমাদের মুগ্ধ করেন বারিমান, ওটাই আমার কাছে তাঁর সাফল্যের শ্রেষ্ঠ প্রমাণ। তিনি এমনভাবে আটপৌরে সংলাপ চরিত্রদের মুখে বসিয়ে দেন যেটা শুনলে মনে হবে বাকপটু, লোকের স্বাভাবিক মুখের ভাষা। বারিমান প্রায়ই ওনিলের উদ্ধৃতি দেন, তাঁর সঙ্গে একমত হয়ে বলেন, মানুষ ও ঈশ্বরের মধ্যকার সম্পর্ককে কোনো স্বার্থ ছাড়া নাট্যশিল্প আঘাত হানে না। এ ধারণা যথাযথভাবে দ্য সেভেন্থ সিলকে ব্যাখ্যা করে, যদিও আমি বলি, সো ক্লোজ টু লাইফ ছবিটা আমার বেশি পছন্দ। দ্য সেভেন্থ সিল হলো মৃত্যুকে নিয়ে এক অনুসন্ধিত্সু ধ্যান। সো ক্লোজ টু লাইফ হলো জন্ম সম্পর্কিত এক ধ্যানমগ্ন অন্বেষণ। এটি একই জিনিসের ওপর দাঁড়িয়ে; দুটোই জীবন সম্পর্কিত। সো ক্লোজ টু লাইফ ছবির কাহিনী গড়িয়েছে একটি প্রসূতি বিভাগে ২৪ ঘণ্টাকে কেন্দ্র করে। বারিমানের সঙ্গে মিলে উলা ইজাকসন এ ছবির গল্প লিখেছিলেন, সেটার বর্ণনা ও অর্থের বিস্তার আমি করতে পারব না।

জীবন, জন্ম, মৃত্যু এগুলো গোপন গূঢ় বিষয় তাদের জন্য, যাদেরকে বেঁচে থাকার আহ্বান করা হয়, এরই ফাঁকে অন্যদের নিন্দা করা হয় মৃত্যুর জন্য। আমরা স্বর্গ ও বিজ্ঞান উভয়কেই প্রশ্ন দিয়ে আক্রমণ করতে পারি, উত্তর কিন্তু একটাই পাব: যেখানেই জীবন যাপিত, জীবিতরা আনন্দ ও বেদনা দ্বারা পুরস্কৃত।

যে নারী কোমলতার জন্য তৃষ্ণার্ত, সে তার বাসনা দ্বারা প্রতারিত এবং তার অবশ্যই বন্ধ্যত্বকে মেনে নিতে হবে। যে নারী জীবন নিয়ে উদ্ভাসিত, তার অতি আকাঙ্ক্ষার সন্তান দরকার নেই। বয়সে তরুণ কোনো নারী, যার জীবনে সে রকম অভিজ্ঞতাই নেই, হঠাত্ সন্তান ধারণ করলে, নিক্ষিপ্ত হলে সন্তানপ্রসবা নারীর ভিড়ে, তখন সেই নারী ঘটনার আকস্মিকতায় চমকে ওঠে।

জীবন তাদের প্রত্যেককেই ছুঁয়ে যায় কোনো রকম প্রশ্ন চাপিয়ে দেয়া বা উত্তর নিয়ে হাজির হওয়া ছাড়াই, জীবন আপন ছন্দে কোনো রকম বাধা ছাড়াই এগিয়ে যায় নতুন জন্মের দিকে, নতুন জীবনের দিকে। মানুষই কেবল প্রশ্ন উত্থাপন করে।

সেভেন্থ সিলের তুলনায় ছবিটি মধ্যযুগের রঙ লাগা জানালার কাচ দিয়ে দেখা, পূর্ণ সেই যুগেরই চিত্রশিল্প দিয়ে সো ক্লোজ ছবিটি চিত্রায়িত হয়েছে একেবারেই সাদামাটাভাবে। এ ছবিতে তিন নায়িকার কাছে পেছনের প্রেক্ষাপট সবসময়ই কম গুরুত্বপূর্ণ। আর একইভাবে উলা ইজাকসনের গল্প যতটা সম্ভব ততটাই অবিকৃত রাখেন বারিমান। ইভা দলভেচ, ইঙ্গগ্রিদ তুলিন, আর এদের সবার উপরে বিবি আন্দারসন এরা প্রত্যেকেই উল্লেখ করার মতো নিখুঁত অভিনয় করেছেন এবং চরিত্রায়ণে ছিলেন নিবেদিত প্রাণ।

সংগীতের কোনো সঙ্গত নেই সেখানে; সবকিছুই সক্রিয়ভাবে ধাবমান শুদ্ধতার দিকে। বারিমানের সাম্প্রতিক ছবিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে লক্ষণীয় হলো, সেগুলো অতটা কারুকার্যমণ্ডিত নয়। যারাই পৃথিবীতে জন্মেছে এবং এ দুনিয়ায় বাস করছে, তারাই ওসব ছবি বুঝতে পারবে, তারিফ করতে পারবে। আমি মনে করি, পুরো দুনিয়ায় বিপুল পরিমাণ দর্শকের কাছে পৌঁছেছেন বারিমান। এর কারণ তিনি স্তম্ভিত করার মতো সরলতা নিয়ে কাহিনী বলতে পারেন।

বোধিনী

১. পুরো নাম জঁ মাখি লুসিয়াঁ পিয়েখ আনুই (২৩ জুন

১৯১০, ৩ অক্টোবর ১৯৮৭), তিনি ছিলেন একজন নাট্যকার। পাঁচ দশক ধরে সক্রিয়ভাবে লেখালেখি করেছেন। আনুই সর্বাধিক পরিচিতি পান ১৯৪৩ সালে মঞ্চস্থ নাটক আন্তিগোনের জন্য, সফোক্লিসের কাছ থেকেই তিনি অনুপ্রেরণা পান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আনুই হয়ে উঠেছিলেন ফ্রান্সের সবচেয়ে উর্বর লেখক।

২. আর্ট হাউজগুলো মূলত প্রেক্ষাগৃহই, কিন্তু সেখানে বাণিজ্যিক বা জনপ্রিয় ধারার ছবির বদলে উচ্চশিল্প মূল্যের বা নিরীক্ষাধর্মী চলচ্চিত্র প্রদর্শন করা হয়।

৩. স্বেনি এরিক আলফ খোবারি (২১ জুন ১৯০৩, ১৭ এপ্রিল ১৯৮০) একজন সুইডিশ মঞ্চনির্দেশক ও চলচ্চিত্র পরিচালক। তিনি দুবার কান চলচ্চিত্র উত্সবে গ্র্যান্ড প্রাইজ পায় জিতেন। একবার ১৯৪৬ সালে টরমেন্ট ছবির জন্য, আরেকবার ১৯৫১ সালে মিস জুলি ছবির জন্য। একান্ন সালে ভিত্তোরিও ডি সিকার মিরাকল ইন মিলান ছবিটিও যৌথভাবে কান উত্সবে গ্র্যান্ড প্রাইজ পায়।

৪. জোসেফ লিও ম্যাঙ্কিউবিচ (১১ ফেব্রুয়ারি ১৯০৯, ৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৩), মার্কিন চলচ্চিত্র নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার ও প্রযোজক। হলিউডে তিনি দীর্ঘ সময় কাজ করেছেন, আর দুবার একাডেমি অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন। আ লেটার টু থ্রি ওয়াইভস (১৯৪৯) ছবির জন্য পেয়েছেন শ্রেষ্ঠ পরিচালকের স্বীকৃতি আর শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকার খেতাব পেয়েছেন অল এবোভ ইভ (১৯৫০) ছবির জন্য।

৫. আলফ্রেড হিচককের মনস্তাত্ত্বিক অপরাধ-বিষয়ক এক বিখ্যাত সিনেমা রোপ (১৯৪৮)। এ ছবিতে হিচকক দীর্ঘ দৃশ্য ধারণ করেছেন। খুব প্রয়োজন না হলে তিনি এ ছবির দৃশ্যে কাটাকাটি করেননি। ছবির চরিত্ররা মঞ্চনাটকের মতো অভিনয় করে গেছেন, আর ক্যামেরা তাঁদের নানা কৌণিক অবস্থান থেকে শুধু অনুসরণ করেছে।

৬. জাক অদিবেখতি (২৫ মার্চ ১৮৯৯, ১০ জুলাই ১৯৬৫) ফরাসি নাট্যকার, কবি ও ঔপন্যাসিক।

৭. মারগিট কার্লকুইস্ট, জন্ম: ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৩২, সুইডিশ অভিনেত্রী। তিনি পঞ্চাশের দশকে অনেক ছবিতে অভিনয় করেছেন, তবে বারিমানের স্মাইলস অব আ সামার নাইট ছবিতে অভিনয় করে তিনি আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি পান।

৮. হারিয়েট আন্দারসন (জন্ম: ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৩২), সুইডিশ অভিনেত্রী। তিনি শুধু বারিমানের স্টক কোম্পানির অংশীদারই ছিলেন না, প্রেমিকাও ছিলেন। বারিমান সামার উইথ মনিকা (১৯৫৩) ছবির মূল মনিকা চরিত্রটি লিখেছিলেন এ আন্দারসনকে মাথায় রেখেই।

সে ছবিতেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের ছবিতে প্রথমবারের মতো নগ্নদৃশ্য দেখা যায়।

বারিমানের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ক্ষণকাল স্থায়ী হলেও আন্দারসন বারিমানের স্মাইলস অব আ সামার নাইট (১৯৫৫), থ্রু আ গ্লাস ডার্কলি (১৯৬১), ক্রাইস অ্যান্ড হুইসপার্স (১৯৭২) ও ফ্যানি অ্যান্ড আলেক্সান্দার (১৯৮২) ছবিগুলোতে কাজ করেছেন।

৯. ইউজিন গ্ল্যাডস্টোন ওনিল (৬ অক্টোবর ১৮৮৮, ২৭ নভেম্বর ১৯৫৩), একজন মার্কিন নাট্যকার ও সাহিত্যে নোবেলজয়ী।

১০. উলা ইজাকসন, একজন সুইডিশ লেখক ও চিত্রনাট্যকার। ছোটগল্প ও উপন্যাসের পাশাপাশি তিনি নাটক ও চিত্রনাট্য রচনা করেছেন।