অপরিকল্পিত উন্নয়নের সঙ্গে মহামারীর সম্পর্ক ইতিহাসে বারবার দেখা যায়। ভারতবর্ষে ম্যালেরিয়ায় মহামারী এসেছিল পানি নিষ্কাশনের যথেষ্ট বন্দোবস্ত না রেখে রেললাইন তৈরি করার ফলে। বহু অঞ্চলে তা স্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করেছিল আর এর ফল হয়েছিল ম্যালেরিয়া জ্বরে গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে যাওয়া। শরত্চন্দ্রের উপন্যাসগুলোয় ম্যালেরিয়ায় ধুঁকতে থাকা যেসব জনপদের ছবি আমরা পাই, তা ওই রেললাইন-পরবর্তী সময়ের। নদী বিশেষজ্ঞ কপিল ভট্টাচার্যও দেখিয়েছেন, বর্ষার সময় মাছ ছানাপোনাসমেত ছড়িয়ে পড়ত সব জলমগ্ন অঞ্চলে, পানিতে কিলবিল করা মশার ডিম, শুককীট ও মূককীট এগুলোর দারুণ পুষ্টির উত্স ছিল।
আজ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বহু অঞ্চলে মশা দমনে এই সহজ প্রাকৃতিক যোগসূত্রটি ব্যবহার করা হয়। ছোটখাটো নালার মাধ্যমে মাছের আনাগোনা বৃষ্টির পানিতে ডিম ছেড়ে যাওয়া মশার বংশবিস্তার কমিয়ে দেয়। ভাবুন দেখি, মশাও রীতিমতো আমিষ হয়ে খাদ্যশৃঙ্খলে ঢুকে পড়ছে তেমন উৎপাত না করেই!
ভিন্ন ভিন্ন এলাকার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ীই আবহাওয়া ও ঋতুভেদে কোনো ক্ষতিকর বা বিরক্তিকর পতঙ্গের বিকাশ ঘটবে। এগুলোকে দমন করার জন্য এলাকার বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত পদ্ধতিই গ্রহণ করা সবচেয়ে নিরাপদ ও সাশ্রয়ী। মশার বিষয়েও এ কথাটি খুবই সত্যি।
২.
জলাভূমিময় ঢাকার মশা একটি পুরনো প্রপঞ্চ। বর্ষাকালে ছাড়া ছাড়াভাবে বড় জলাশয়ের যোগাযোগহীন অজস্র জলমগ্ন অস্থায়ী ডোবা তৈরি হয়, ডিমখেকো মাছের অনুপস্থিতির কারণে এগুলো সহজেই মশার প্রজননস্থলে পরিণত হয়। আবার পূর্ণবয়স্ক মশাকে খাবে, এমন শিকারিরও যদি অভাব ঘটে প্রকৃতিতে, তাহলে তো মশার জন্য তা সোনায় সোহাগা। ঢাকা ঠিক তেমনি একটি নগরী। সাল মনে নেই, সম্ভবত আশির দশকে মশা বিষয়ে নাগরিক বিরক্তির জবাবে কোনো এক মন্ত্রী বলেছিলেন, ঢাকার মশা ভদ্র মশা। কামড়ায় না, কামড়ালেও ম্যালেরিয়া হয় না। বিস্তর হাসাহাসির বিষয় ছিল এই মন্তব্যটি। এই নিয়ে দৈনিক ইত্তেফাকে বহু বছর পরও সম্পাদকীয় স্তম্ভ ছাপা হতে দেখেছি। ষাটের দশকেও ঢাকার মশার উৎপাত, বিশেষ করে সন্ধ্যায় এগুলোর ঝাঁকে ঝাঁকে আক্রমণের কথা মীজানুর রহমানের ঢাকাপুরানে আছে, একই অভিজ্ঞতা আমাদেরও বহুবার হয়েছে আশির দশকে খেলার মাঠে, সূর্য ডোবার পর পর এগুলো গোপন স্থান থেকে দল বেঁধে আসত।
ম্যালেরিয়া তেমন না হোক, ঢাকার প্রধান বিরক্তি ছিল মশা। আজকে হয়তো মশার কারণে ম্যালেরিয়ার চেয়েও, চিকুনগুনিয়ার চেয়েও ভয়াবহ আক্রমণের মুখে আমরা পড়তে যাচ্ছি, সেটা হচ্ছে জিকা ভাইরাসের সংক্রমণ। বিশ্বায়নের যুগে দুনিয়ার কোনো প্রান্তের অসুখ অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকে না, প্রতিবেশী ভারতেও জিকায় সংক্রমিত মানুষ একজন-দুজন করে দেখা দিচ্ছে। প্রতিকার না ভাবলে এই মহামারী আমাদেরও গ্রাস করতে পারে।
৩.
আশির দশকে ঢাকার মশার অন্যতম উত্স ছিল ডোবানালা, বিলঝিল। এগুলো সম্পদ হতে পারত, হয়নি। বরং কর্তৃপক্ষের অবহেলায় সেগুলো কচুরিপানায় ঢাকা থাকত, মাছ এবং অন্যান্য মশাখেকো প্রাণীশূন্য ছিল এগুলোর একটা বড় অংশ। সেগুলো এখন উধাও হয়েছে। কিন্তু মশার পরিমাণ কমেনি, হয়তো বহুগুণ বেড়েছে। বিশেষ করে অসুখের দিক দিয়ে চিন্তা করলে প্রায় এক দশক ধরে ডেঙ্গু এবং সাম্প্রতিককালে চিকুনগুনিয়া নগরীর প্রধান ব্যাধি হিসেবে দেখা দিয়েছে। এর কারণ খানাখন্দ বহুগুণ বেড়েছে। আরেকটা ঘটনাও ঘটেছে, সেটা হলো ঢাকার প্রাকৃতিক পরিবেশের বিপর্যয় হয়েছে।
বনসাই নিয়ে আমরা হাসি-মশকরা করি। বনসাই কিন্তু মূল সমস্যার, অর্থাত্ দৃষ্টিভঙ্গিটার উপসর্গ মাত্র। আশির দশকেই ঢাকায় অদ্ভুত এক সংস্কৃতি শুরু হয়। রাস্তার পাশে সৌন্দর্য বর্ধনের নামে রোপিত হয় দেবদারু আর মেহগনির অন্তহীন সারি। গাছের মতো সবুজ একটা বিষয়কে যে একঘেয়ে বানিয়ে ফেলা যায়, তা তখনকার মিরপুর-নিউমার্কেট সড়কের মাঝখানে লাগানো দেবদারু আর
দেবদারু এবং দেবদারুর সারির দিকে তাকালে বুঝতে পারতেন। বালক বয়সে ওই প্রথম দৃশ্যের একঘেয়েমি বস্তুটার সঙ্গে পরিচয়।
চোখের জন্য বিরক্তিকর শুধু না, এই একক বৃক্ষচর্চা পরিবেশের জন্যও বেশ খারাপ। যত বৈচিত্র্যের গাছ থাকবে, তত ফুল-মধু-ফলের ওপর নির্ভরশীল প্রাণীকুল আশ্রয় পাবে। তত বেশি ভারসাম্যপূর্ণ হয়ে উঠবে পরিবেশ। যেমন ঢাকাতে ফড়িং বিষয়টা প্রায় বিলুপ্ত। পোকাখেকো ফড়িংকে টিকতে হলে যে পরিমাণ পতঙ্গের সরবরাহ লাগে, ঢাকায় তা নেই। অথচ ফড়িংয়ের এই খাদ্য অধিকাংশই আমাদের কোনোভাবে বিরক্ত না করে নির্দিষ্ট গাছপালাকে ঘিরেই দিব্যি থাকতে পারত।
জলজ দশায় ফড়িং বিপুল পরিমাণে মশার শূককীট ও ডিম সাবাড় করে। ফড়িং না থাকায় মশার ডিম নিশ্চিন্তে বংশবিস্তার করতে পারছে। কিন্তু কেবল মশার ওপর নির্ভর করে তো ফড়িং বাঁচবে না। ঢাকাতে ব্যাঙের সংখ্যাও কত কমে গেছে! আমাদের বাসার সামনেই যে গাছগুলো আছে, সেগুলোতে গিরগিটি কিংবা গেছোটিকটিকি ধরনের প্রাণী দেখি না। কারণ একটা দুটো বিচ্ছিন্ন ফলের গাছ এগুলোর ভরণপোষণ করতে পারবে না, এক গাছ থেকে আরেক গাছে এগুলো যেতেও পারবে না।
অন্যদিকে মেহগনি কিংবা দেবদারুতে গিরগিটির পাওয়ার তেমন কিছু নেই, দেশীয় পোকার তেমন কোনো আশ্রয়দাতা সে নয় বলেই। গুবড়ে পোকাদের জাতভাই হয়তো হবে, লাল রঙের একটা ফোঁটাওয়ালা পোকাকে দেখতাম গাছের জন্য ক্ষতিকর জাবপোকা খেয়ে ফেলে। এই পোকাটাও বহুবছর দেখি না। পৃথিবীর সব পোকার যম ফিঙে, একই সঙ্গে এটি কাকের হাত থেকে অন্য পাখির বাসাও পাহারা দিত। ঢাকার বাইরে না গেলে আর দেখা যায় না এটি। টুনটুনি এখনো একটা-দুটো দেখি, কিন্তু এর উপযুক্ত মধু আর পোকামাকড়ের সরবরাহ নেই বলে আর বিদেশী ঝোপঝাড়ের আধিক্যের কারণে নেই হলো প্রায়। গাছে খুঁজে খুঁজে পতঙ্গ খাওয়া ছিল টুনটুনির প্রিয় একটা কাজ।
কিন্তু ভাবুন দেখি, দেবদারুর খোড়লগুলো এবং আর সব গাছের খোড়ল মশার ডিম পাড়ার প্রিয় জায়গা। খাদকদের অনুপস্থিতিতে সেখান থেকে বিপুল মশকবাহিনীর জন্ম হচ্ছে অবারিতভাবে। হাতেগোনা কয়েকটি টিকে থাকতে সক্ষম পাখিই কেবল আমরা দেখি। কিন্তু ভোমরা উধাও হয়েছে, মৌমাছিও। বৃক্ষের বৈচিত্র্য এই প্রাণপ্রাচুর্যকে ফিরিয়ে আনতে পারে, দমন করতে পারে মশাও।
৪.
রমনা আর ওসমানী— এই দুই উদ্যানের তুলনা করলেই বিষয়টা কিছুটা বোঝা যাবে। ওসমানী উদ্যানে অধিকাংশ বিদেশী গাছ সামান্য কিছু প্রাণীকে জায়গা দিতে পারে। রমনাতে প্রচুর বিদেশী গাছ থাকলেও বৃক্ষ বৈচিত্র্য তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। ফলে সেখানে পাখি-পোকা এসবের কিছুটা ভিড় চোখে পড়বে। কিন্তু এই দৃশ্যটা বদলে যেত, যদি সড়কের দুই ধারের গাছগুলো ইউক্যালিপটাস, মেহগনি, অ্যাকাশিয়া না হয়ে আম-জাম-লিচু-কাঁঠাল-ফলসা-গাব-লকট-কমলা-তাল-খেজুর-ডুমুর-ডেউয়া-নিম-কাউ-সফেদা-কাঠবাদাম-চালতার হতো। একঘেয়ে মধুহীন বিদেশী ফুলের ঝোপের বদলে গ্রামবাংলায় গজানো অজস্র সুন্দর ফুল ও ফলওয়ালা ঝোপঝাড়গুলোকেও যদি আমরা সুন্দর বলে চিনতে পারতাম। দেয়াল কিংবা বেড়াগুলো ছেয়ে থাকতে পারত কত শত লতাগাছে, যেগুলোর ফুল-ফল হতো পতঙ্গ আর পতঙ্গভুকদের উত্কৃষ্ট আশ্রয়। বিদেশী গাছ-ফুল-লতার বিরুদ্ধে মূঢ় শত্রুতার কোনো কারণ নেই, সেগুলোর কোনো কোনোটি আমাদের প্রতিবেশে দিব্যি মানিয়ে গেছে। পরিচয়ের জন্যও দুয়েকটা ইউক্যালিপটাস কিংবা মেহগনি থাকলে ক্ষতি কী! কিন্তু পথের দুই ধারে বা সরকারি জায়গাগুলোতে গাছ লাগানোর ক্ষেত্রে অবশ্যই আমাদের ভাবতে হবে তা যেন নগরে একটা ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিবেশেরও জন্ম দিতে পারে।
ফলের গাছের একটা বেষ্টনী থাকলে গোটা ঢাকা শহরে কাঠবেড়ালির মতো চোখজুড়ানো প্রাণীর যেমন ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে, তেমনি আসবে পাখি, আসবে পোকা, আসবে পোকাখেকো। আর এই বৈচিত্র্যকে যত কম ঠাঁই দিতে পারব, তত বেশি সুযোগ পাবে একক কোনো পতঙ্গ, যাদের বাড়বাড়ন্ত রোধে তখন আমাদের আশ্রয় নিতে হবে বিষাক্ত রাসায়নিকের; এখন যা হচ্ছে।
৫.
র্যাচেল কার্সনের ‘সাইলেন্ট স্প্রিং’ বইতে প্রথম মশা কিংবা কীট দমনের প্রযুক্তির ব্যবহারের বিপদ নিয়ে জেনেছিলাম। সাইলেন্ট স্প্রিংকে আধুনিক প্রতিবেশ বিজ্ঞানের দিশারী বলা হয়, সেটা অকারণে নয়। সময় পেলে একদিন এই বইটা নিয়ে অন্য একটা বিস্তারিত লেখা যাবে, আপাতত চিকুনগুনিয়া!
কার্সনের সময়েই মশা কিংবা ইত্যাদি ক্ষতিকর কীট দমনে সস্তা এবং কার্যকর নতুন একটা বুদ্ধি আবিষ্কৃত হয়। যেকোনো রাসায়নিকের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো তা কেবল উদ্দিষ্ট শত্রু প্রাণটাকেই হত্যা করে না, বরং উপকারী বহু পতঙ্গ এমনকি মানুষকেও আক্রান্ত করে। কিন্তু নতুন এই কৌশলটা কেবল একটা নির্দিষ্ট পতঙ্গকেই বিপন্ন করবে। কীটনাশকের দ্বিতীয় বিপদ হলো, পতঙ্গ তা অচিরেই প্রতিরোধের ক্ষমতা অর্জন করে। যেমন ডিডিটি ব্যবহারে একদা এডিস মশা ৫০ দশকে প্রায় বিলুপ্ত হলেও এখন ডিডিটি সহ্যক্ষম এডিস মিলবে। ফলে কীটনাশকের ব্যবহার ক্রমাগত বৃদ্ধি করতে হয় মশা-মাছিকে দমন করতে, কিন্তু এই ক্রমবৃদ্ধিপ্রাপ্ত বিষ অন্য প্রাণীকে বিপর্যস্ত করে।
অন্য প্রযুক্তির পদ্ধতিটা সহজ। সামান্য তেজস্ক্রিয় রশ্মি ব্যবহার করে পুরুষ পতঙ্গকে অনুর্বর করে ফেলা হয়। তার পর বিপুল সংখ্যায় এগুলোকে প্রকৃতিতে ছেড়ে দেয়া হয়। পুরুষ মশা পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে, সংখ্যায় বেশি হলে আনুপাতিকভাবে এগুলোই অধিকসংখ্যক নারীমশাকে নিষিক্ত করার সুযোগ পায়। এভাবে উত্পন্ন ডিম থেকে মশার জন্ম হয় না। ফলে রাতারাতি মশার সংখ্যা কমে আসে। প্রক্রিয়াটা বারংবার চালাতে থাকতে হয়, কেননা বাইরে থেকে নতুন মশা আসতেই থাকবে, কিন্তু তার পরিমাণ স্বাভাবিকভাবেই কম হবে। এতে প্রকৃতিতে ন্যূনতম ছাপ ফেলে সুনির্দিষ্ট একটা পতঙ্গকে দমন করা যায়, অন্যান্য পতঙ্গ তাতে আক্রান্ত হবে না।
৬.
এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে বেশকিছু অঞ্চলে বহু পতঙ্গ এরই মধ্যেই দমন করা সম্ভব হয়েছে। সেগুলোর অধিকাংশই বাণিজ্যিক ফসলের জন্য ক্ষতিকর পতঙ্গ। যেমন একটা হলো ক্ষতস্থানে ডিম পাড়া ঘায়ের মাছি, আমেরিকা মহাদেশজুড়ে এগুলো দমন করা হয়েছে। জাপানে দমন করা হয়েছে তরমুজের পোকা, আফ্রিকাতে ভয়াবহ সেিস মাছি। এই প্রক্রিয়ার আরো জটিল সব সংস্করণ আছে, সেগুলো নানান রকম জেনেটিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এমন সব জিন ও ভাইরাসযুক্ত পুরুষ মশা তৈরি করে, যেগুলো পরবর্তী প্রজন্মের মশাকে নানা পর্যায়ে মেরে ফেলে। কিন্তু তেজস্ক্রিয় রশ্মি ব্যবহার করে পুরুষ মশাকে অনুর্বর করার প্রযুক্তিটাই সবচেয়ে সস্তা এবং এরই মধ্যে বহু পতঙ্গের বেলায় সফল প্রমাণিত হয়েছে।
কারণটা জানা নেই, কিন্তু বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মশা-বিষয়ক আলাপেও দেখলাম এই সবচেয়ে সহজ প্রযুক্তি বিষয়ে সামান্য কথা থাকলেও অন্য প্রযুক্তিগুলো নিয়েই আগ্রহ বেশি। উচ্চপ্রযুক্তির এবং অসহজলভ্য কৌশলের চেয়ে সুলভ এবং বহুবার বহুক্ষেত্রে প্রমাণিত প্রযুক্তির ব্যবহারই বেশি কাম্য। জৈব প্রযুক্তির নানা ঝুঁকির কথাও শোনা যায় জিকা ভাইরাসের বেলায়।
৭.
আমাদের দেশে কীটতত্ত্ব বলি আর জৈবপ্রযুক্তি বলি, সবগুলো বিদ্যাই তো পড়ানো হয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। সরকার বা কর্তৃপক্ষ কি তাদের সাহায্য কোনো কালে চেয়েছে? আমাদের দেশের বিদ্যালয়গুলোকে বলেছে কোনো উদ্যোগ নিতে? নাকি হাত পেতে বসে আছে কবে কোন বিদেশী আব্বা কি টোটকা দেবে, তার আগ পর্যন্ত চিকুনগুনিয়াতে ভুগতে হবে গোটা জাতিকে? তার আগ পর্যন্ত সব দোষ আমজনতার ঘাড়ে চাপিয়ে দিব্যি ফায়িশাহ কথাবার্তা বলে যেতে থাকবেন নগরকর্তারা।
চিকুনগুনিয়া রোধে ব্যর্থতা কি বলব, ন্যূনতম উদ্যোগহীনতা দেখিয়ে দিয়েছে চাইলেই আমাদের গোটা জাতিকে কয়েক মাসের জন্য পঙ্গু বানিয়ে রাখা সম্ভব। চিকুনগুনিয়া মানেও আক্ষরিক অর্থেই পঙ্গু করে দেয়ার ব্যাধি। এই ব্যথা সবার জন্যই অসহ্য। কিন্তু একজন রিকশাচালক, দিনমজুর কিংবা পোশাক শ্রমিক এই ব্যথা নিয়ে কীভাবে কাজ করেন, পরিবার চালান তা সৃষ্টিকর্তাই জানেন। উদ্বিগ্ন না হয়ে উপায় নেই, কেননা চিকুনগুনিয়ার চেয়েও ভয়াবহ জিকার বাহনও একই এডিস মশা।
৮.
প্রকৃতিতে কোনো কিছু সুষম থাকে না সর্বদা। কাজেই প্রযুক্তির আশ্রয় আমাদের নিতেই হবে জরুরি বা বিপজ্জনক কোনো পরিস্থিতিতে। কিন্তু চেষ্টা করে যাওয়া তো উচিত, যতক্ষণ পর্যন্ত পারা যায় প্রাকৃতিকভাবেই একটা নিয়ন্ত্রণের বন্দোবস্ত করা, যাতে কোনো একটা পোকা, কোনো একটা জীবাণু এতটা ভয়াবহ মাত্রা নিয়ে ছড়িয়ে পড়তে না পারে।
ঢাকার এজমালি স্থানগুলোয় জলহাওয়ার উপযুক্ত বিচিত্র এবং ফল-ফুল-মধৃসমৃদ্ধ দেশী গাছপালা লাগালে সৌন্দর্যের বিচারে তা হতো এখনকার অরুচির, অপচয়প্রবণ আর লুণ্ঠনের কৃত্রিম সৌন্দর্যের তুলনায় অপার্থিব কিছু একটা। এমনকি তা ঢাকার তাজা ফল ও মধুর চাহিদার বেশ একটা উল্লেখযোগ্য অংশ পূরণ করতে পারত। ফলে বিষ দেয়া বা আগাম পাকিয়ে ফেলার প্রবণতাও কমত এর কারণে। কিন্তু কেন তা হয় না? যারা সিদ্ধান্ত নেন, এমন লোকদের জিজ্ঞেস করেছি, উত্তরটা তেমনই মজার ছিল: আর বইলেন না, মানুষে খায়া ফেলবে!






