নিজের জীবন লিপিবদ্ধ করার মতো একটা কাজে আমি হাত দিলাম একটা বিশেষ বিষয় ভাবতে গিয়ে। আমার মনে হলো যারা কিছু মানুষের কাছে কিছুটা হলেও পরিচিত, তাদের জীবনের দিনলিপি থাকা উচিত, বিষয়টা হতে পারে লিখিত কিংবা অন্য কোনোভাবে ধারণকৃত। সত্যিকার অর্থে বিষয়টা কি এমন যে আমার মৃত্যুর পর আমাকে কেউ স্মরণ নাও করতে পারে, এই ভেবেই আমার এমনটা করতে ইচ্ছা হলো? তবে আমার মনে হয় সিদ্ধান্ত যখন নিয়ে ফেলেছি, নিজের বিষয়ে কিছু লিখে যাওয়া উচিত। হতে পারে আমার অনুপস্থিতিতে প্রিয় মানুষ, যারা আমাকে স্মরণ করতে চায়, অনেকটা পক্ষপাতিত্ব নিয়ে তাদের মনোভাব জানাল। হতে পারে তাদের কথার ওপর নির্ভর করে কেউ না কেউ আমাকে ভুল বুঝল। আর এভাবে আমার জীবনের অভিজ্ঞতার বিরুদ্ধে তাদের মতামত জানাল। 

স্মৃতিতে আমার অস্তিত্বের সবচেয়ে পুরনো যে ছবিটা আছে তা হলো, আমাদের স্ট্যানফোর্ডের বাড়ির পাথরের ঝোলানো সিঁড়ি ধরে মা আমাকে কোলের মধ্যে ঝুলিয়ে নিচে নামছেন আর আমি নিচতলার হল ঘরের অর্ধবৃত্তাকার জানালার দিকে তাকিয়ে আছি। মনে হতে পারে তখনই প্রথম আমি আমার দৃষ্টিকে চিন্তার সঙ্গে মেলাতে পেরেছিলাম। কিন্তু সত্যি বলতে কী, সেই বিষয়টা আরো আগেই হয়তো করেছি, নাহলে আমি কোথায় আর কার কোলে ছিলাম, বিষয়টা আমার মনে থাকত না। এটা সত্যিই দারুণ ব্যাপার যে মানুষের চেতনা সেই শৈশবের শুরু থেকে কী করে পরতে পরতে একটা পরিণতিতে পৌঁছায়। আর তারপর মানুষ চাইলে সেই পরতগুলো খুলে দেখতেও পারে। 

...

আমরা ডায়ামন্ড হারবারে এসে নোঙর করলাম। যেমনটা বলেছিলাম আগে, নদীর তীর নিচু এলাকা আর কাদায় ভরা। সন্দেহ নেই বাংলার দক্ষিণ দিকের এ এলাকাগুলো বছর বছর পানির সঙ্গে বয়ে আসা পলি মাটি আর কাদা জমে জমে তৈরি হয়েছে। এ এলাকা যেহেতু গঙ্গার মুখেই, তাই এখানে প্রতি বছরে নতুন পলির স্তর জমা অস্বাভাবিক নয়। 

পরের সারাটা দিন তীরে অবতরণের একটা লিখিত অনুমতির আশায় আমরা জাহাজেই বসে থাকলাম। কিন্তু দিন শেষে জানা গেল জাহাজ থেকে তীরে পৌঁছানোর মতো যথেষ্ট নৌকা কলকাতা থেকে পাঠাতে চার-পাঁচদিন লেগে যাবে। মানুষে ঠাসা একটা জাহাজে তীরের কাছাকাছি থকথকে কাদার মধ্যে কয়েকদিন পড়ে থাকা কেবল বিরক্তিকরই নয়, অস্বাস্থ্যকরও বটে। কিন্তু পুরু কাদা আর আধাআধি ডুবে থাকা শ্যাওলার স্তরের ওপর দিয়ে ঘাটে পৌঁছানোর কোনো সুযোগ ছিল না। 

মিস্টার শেরউড তখনই কলকাতা যাওয়ার অনুমতি চাইলেন। অনুমতি মিলতেই যে নৌকাগুলো মানুষ পারাপার করে, আমাদের তখনই কলকাতা নিয়ে যাওয়ার জন্য তাদের মধ্যে একটাকে ডাকা হলো। ডায়ামন্ড হারবার থেকে কলকাতার দূরত্ব ৫০ মাইল। 

নৌকার মাঝি ফোর্ট উইলিয়ামের কাছে এক ঘাটে এনে নৌকা ভেড়াল। সারির মধ্যে দাঁড়িয়ে সে মিস্টার শেরউডকে বোঝাতে লাগল কোথায় দাঁড়িয়েছে। মিস্টার শেরউডও চেষ্টা করলেন বোঝাতে তিনি কোথায় যেতে চান। কিন্তু দুঃখজনকভাবে কেউই কারো কথা বুঝতে পারলেন না। কিছুক্ষণ পরে মিস্টার শেরউড নিজেই নৌকা টানতে লাগলেন শহরের দিকে এবং মুখে বারবার করে কলকাতার নাম উচ্চারণ করতে লাগলেন। তখনো তারা বুঝতে পারল না তিনি কোথায় যেতে চান আর তাই আমরা দুপুরের চড়া রোদে স্রোত ঠেকিয়ে নদীর ওপরই বসে থাকলাম। তখন একটা নৌকায় কিছু শেতাঙ্গ মানুষ যাচ্ছিল। মিস্টার শেরউড চিৎকার করে তাদের ডাকলেন। তারা কাছে এলে দোভাষীর কাজ করল। তাদের কাছে জানা গেল মিস্টার শেরউডকে বাক্সপেটরা নিয়ে কাস্টম হাউজে নামতে হবে আর আমাকে অপেক্ষা করতে হবে কাছের এক পানশালায়। তীরে কাজের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা এক কৃষ্ণাঙ্গ কুলির সঙ্গে আমাকে রওনা হতে হলো।

কৃষ্ণাঙ্গ সেই কুলির  পেছনে  পেছনে হাঁটতে যে আমার কতটা বিভ্রান্ত লাগছিল তা কোনোভাবে প্রকাশ করতে পারব না। এটা কেবল অবাস্তব কোনো স্বপ্নের সঙ্গেই তুলনীয়। তবে পানশালায় পৌঁছতে আমাকে অনেক বেশি হাঁটতে হয়নি, ক্রাউন অ্যান্ড অ্যাংকর নামের পানশালাটি তীরের কাছেই। আমাকে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত লোকটি আমার মাথার ওপর বিশাল এক ছাতা ধরে রেখেছিল। 

পরের দিন সকালে আবারো আমাকে ওই পানশালায় বসিয়ে রেখে মিস্টার শেরউড ফোর্ট উইলিয়ামে গেলেন। সেখানে আমাদের জন্য দুটো বড় ঘরের অ্যাপার্টমেন্ট বরাদ্দ নিলেন তিনি। সাময়িকভাবে থাকা যায় এরকম আসবাবের ব্যবস্থাও করা হলো এক দালালের মাধ্যমে। এ সবকিছু করা হলো যেন রাতের মধ্যে আমি আমার জিনিসপত্র নিয়ে ফোর্ট উইলিয়ামে গুছিয়ে বসতে পারি।

আমরা সেখানে ওঠার আগেই অনেক কিছু তৈরি ছিল। টাকা আর গুরুত্বপূর্ণ জিনিস রাখার সিন্দুক ছিল, যার চাবি দেয়া হলো মিস্টার শেরউডকে। রামহরি নামের একজন সহকারী এল, অতি ভদ্র ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের লোকটি মিস্টার শেরউডের জন্য চুরুট এনে দিল আর আমাদের প্রয়োজনীয় অন্যান্য পরিচারকের ব্যবস্থা করল। আমি যখন ফোর্ট উইলিয়ামে পৌঁছলাম, তখন ঘরে পালঙ্ক রাখা হয়েছে। ছয়জন পরিচারকও হাজির। একজন বাজার করা আর রান্নার তদারকি করার জন্য। আরেকজন তৈজসপত্র পরিষ্কার করা আর বাতির ব্যবস্থা করার জন্য। ঘাড়ের ওপর চামড়ার পাত্রে পানি বয়ে নিয়ে আসার জন্য একজন, যার নাম ভারতের বিরূপ আবহাওয়ায় অর্থপূর্ণভাবে ছিল, বেহেস্তি। একজন মেট্রন বা নারী চাকর, যে দিনে কয়েকবার এসে আমার আদেশ-নির্দেশ জেনে যেত ও পালন করত। বেয়ারাদের প্রধান একজন বেয়ারা ছিল আর ষষ্ঠজন ছিল তার সহযোগী। 

প্রধান বা সর্দার বেয়ারা আরো ছয়জনকে নিয়োগ দিয়েছিল কাপড় ধোয়া, ধুলো ঝেড়ে বাড়ি পরিষ্কার করা ইত্যাদি   কাজে। ১৫ জন কাজের লোকের জন্য মিস্টার শেরউডকে ১০ পাউন্ড খরচ করতে হতো। মিস্টার শেরউড বলতেন, এ লোকগুলোকে আমাদের দরকার, অন্যদিকে, ইংল্যান্ডে তখন এ পরিমাণ টাকা দিয়ে তিনজন কাজের লোকও মেলে না। 

ফোর্ট উইলিয়ামে কেবল বিশ্রাম নেয়া আমার উদ্দেশ্য ছিল না। তাই আমি আমার ডেভনশায়ারে থাকার সময়কার ছাত্র উইলিয়াম ডারহামকে পড়াতে আরম্ভ করলাম। একই সময়ে আমার আরেক ছাত্র জুটে গেল, ক্যাপ্টেন আর মিসেস হুইটস্টোনের পুত্র জর্জ। 

মিস্টার শেরউড অনেক বেশি ব্যস্ত থাকতেন। আমি দিনের বেশির ভাগ সময়ে  ভেতরের দিকের ঘরে থাকতাম। সামনের ঘরটা সূর্যের তীব্র আলোর কারণে উত্তপ্ত হয়ে থাকত। তাপমাত্রা ছিল আমার সহনশীলতার প্রায় বাইরে। মশা আর ঘামাচি পাউডার—জিনিস দুটোর সঙ্গে আমার তখন পরিচয় ঘটেছিল। সব মিলিয়ে নানা  শারীরিক অস্বস্তির মধ্যে ছিলাম। তবে ফোর্ট উইলিয়াম থেকে জানালার বাইরের দৃশ্যের দিকে তাকালে আমার সব অস্বস্তি আর ক্লান্তি দূর হয়ে যেত। এছাড়া আমরা মাঝে মধ্যে বেড়াতে গিয়ে নানা বিনোদনের মধ্যে থাকতাম। 

তবে শেষ পর্যন্ত কলকাতায় গুছিয়ে বসবাসের পাট চুকল, যখন খবর এল মিস্টার শেরউডকে কলকাতা থেকে দেশের ছোট শহর দিনাপুরে যেতে হবে। 

দিনাপুরে গিয়ে আমরা জানতে পারলাম ভারতীয় আভিজাত্য কী! যদিও আবহাওয়া খুব শীতল কিন্তু বাড়িতে ফায়ার প্লেস ছিল। দিনাপুরেই আমাদের প্রথম সন্তান হেনরি আমার কোলে আসে। আমার রাজপুত্র, আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান অর্জন! যতই বেদনার হোক, তার জীবনের ছোট্ট সময়টার কথা আমাকে বলতেই হবে। 

সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে ক্যান্টনমেন্টে একটা চিঠি এসে উপস্থিত হলো। চিঠি এসেছে বাংলার নবাবের পক্ষ থেকে। কাগজের ওপর সোনার পানি ছিটানো অক্ষরে ফারসি ভাষায় লেখা। নবাবের মুর্শিদাবাদের প্রাসাদে আমাদের আমন্ত্রণ। এটা ছিল নদীর পানি বেড়ে ওঠার এক বার্ষিক উদযাপন। 

যথাসময়ে আমরা আমাদের খাবার তৈরির সব লোককে নিয়ে বজরায় উঠলাম। ছোট্ট হেনরি ও তাকে দেখাশোনার লোকেরাও আমাদের সঙ্গে গেল। মুর্শিদাবাদে পৌঁছে নোঙর করার জায়গা পেতে আমাদের বেশ কষ্ট করতে হলো। আমার স্মৃতিতে নবাবের প্রাসাদ যতটুকু মনে করতে পারি, পরিকল্পনাবিহীন উঁচু-নিচু ঘর মিলিয়ে পুরনো ইমারত। নদীর দিকে তেমন কোনো জানালা ছিল বলে মনে পড়ে না। প্রাসাদের পাশে নদীতে হাতির গোসল করানোর দৃশ্য অবশ্য আমরা জাহাজে বসে উপভোগ করেছিলাম। তীরের কাছে প্রায় আধা মাইলজুড়ে বাঁশ দিয়ে তৈরি কিছু কাঠামো দেখছিলাম। এটা কী তা আমরা রাতের আগে বুঝতে পারিনি। রাতের দিকে দেখলাম, দরিদ্র মুসলমান মানুষের দল নানা রঙের কাগজ আর আলো দিয়ে সেগুলো দিয়ে জাহাজ সাজিয়ে পানিতে ভাসাচ্ছে। যতদূর দেখা যায় ততদূর পর্যন্ত হাত দিয়ে স্রোত তৈরি করছে। তাদের মধ্যে কিছু কিছু জাহাজ ময়ূরের আদলে তৈরি।

একসময় আহ্বান এলে অনেক সরু সিঁড়ি আর গলি দিয়ে আমরা প্রাসাদের মূল জায়গায় উপস্থিত হলাম। সেখানে সংগীত বাজছিল। সংগীত সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই, কিন্তু মনে হচ্ছিল নবাবের সংগীত দলের প্রত্যেকের হাতের বাদ্যযন্ত্র বেসুরো আর অতি উচ্চস্বরে বাঁধা। জীবনে এর আগে আমরা এত ভয়ংকর সংগীত শুনিনি।

...

আমরা যখন বজরায় ফিরে আসি, হেনরি চুপচাপ ঘুমাচ্ছিল। ভয়ানক সব শব্দেও সে এতটুকু বিরক্ত করেনি। তাকে যে সেবিকা ও আয়া দেখাশোনা করে তাদের দেখতেও আনন্দিত মনে হচ্ছিল। মেয়েরা তাদের শিশুদের নিয়ে বজরার  ভেতরে আর ছেলেরা বাইরের দিকে ঘুমাল। ঘুমের মধ্যেই আমরা বাড়ি পৌঁছে গেলাম।

পরদিন সেবিকা আর আয়া মিলে হেনরিকে কোনো একটা পূজায় নিয়ে গিয়েছিল। যখন ফিরে এল, দেখলাম তার কপালে একটা তিলক। আমি হয়তো এতটা বিরক্ত আমার জীবনেও হইনি। ঘষে ঘষে তিলকটা ওঠালাম, কিন্তু তার পরও ভয়ে  ভেতরে  ভেতরে কুঁকড়ে গেলাম। মনে আছে কী ভয়ংকরভাবে আমি কাঁদছিলাম আর চিৎকার করছিলাম! ঠিক তখন চ্যাপলিন এল। আমি তাকে বললাম কত বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে। আমরা দুজন মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম হেনরিকে আবারো চার্চে নিয়ে গিয়ে ব্যাপ্টাইজড করতে হবে। তার আশ্বাস শুনে আমি ভয় থেকে অনেকটা বেরিয়ে এলাম। 

...

ফেরুয়ারির শুরুতে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম হেনরিকে স্তন্যদান বন্ধ করব। কেউ আমাকে বলেনি যে এভাবে আসলে আমি তাকে হারাতে যাচ্ছিলাম। যখন বুঝতে পারি তখন অনেক বেশি দেরি হয়ে গেছে। তখন সবকিছুই কেন যেন হেনরির সুস্থ থাকার বিপক্ষে ছিল। প্রকৃতিতে সবকিছু ঘটত তার ক্ষতি হিসেবে। হেনরি তখন ১৪ মাস বয়সের। আমাদের ইংরেজ সমাজের নিয়মে বুকের দুধ ছাড়ানোর জন্য যথেষ্ট বয়স। হেনরির শ্বেতাঙ্গ সেবিকা আর আয়াও দুধ ছাড়ানোর পক্ষেই ছিল। 

একদিন সাজের কক্ষ থেকে আমি হেনরির তীব্র চিৎকার শুনতে পেলাম। পাশেই তার ঘর, তাই দ্রুত ছুটে গেলাম। যখনই বিছানার কাছে গেছি, দেখলাম নার্স হেনরির মুখে কিছু একটা গুঁজে দিচ্ছে। আমি তাদের দুজনকে জিজ্ঞাসা করলাম তাকে কী খাওয়ানো হলো। তারা দুজনই অস্বীকার করল। কিন্তু আমি দেখলাম তার পর পরই আমার বাচ্চাটা ঘুমে ঢলে পড়ল। আমার সন্দেহ হলো। আমি তীক্ষ নজর রাখলাম। হেনরি ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘুমাতে লাগল। ঘুম আগের চেয়েও গভীর হলো। আমার বাচ্চার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে এল। তখন সন্দেহ থেকেই আমি একজন চিকিৎসককে আনতে আদেশ দিলাম। তিনি এসে জানালেন হেনরিকে আফিম খাওয়ানো হয়েছে। বলতে পারব না তখন কেমন অনুভব করেছি। হেনরি সম্ভবত টানা ১২ ঘণ্টা ঘুমিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই তার সেবিকা বদলে আমি কৃষ্ণাঙ্গ একজন সেবিকা রাখলাম। 

আমার দৃঢ় বিশ্বাস, ভারতে যত ইউরোপিয়ান শিশু মারা যায়, তার অর্ধেক শিশুই মারা যায় আফিম প্রয়োগের ফলে। ঠিক জানি না কত কিছু, কত কিছুই না আমার সন্তানের বেঁচে থাকার বিপক্ষে চলে গিয়েছিল! সে পৃথিবীতে আর বেশি দিন থাকবে না বুঝতে পারছিলাম। কিন্তু তাকে হারাব—এটা মেনে নিতে পারছিলাম না। আমার হেনরি অস্বাভাবিক রকমের সুন্দর বাচ্চা ছিল। তার চামড়ার রঙ ছিল পলিশ করা মার্বেলের চেয়েও হালকা, নীল চোখ, সোনালি চুল আর নিখুঁত নাক-মুখের গঠন। তবে সত্যি কথা বলতে কী, ভারতে সে ১ ঘণ্টার জন্যও সুস্থ ছিল না। এ ঘটনাটাই আমার ভারত বসবাসের ক্ষেত্রে এক কাপ শুদ্ধ পানীয়তে এক ফোঁটা তেতো। তা না হলে এটা হয়তো মিষ্টি এক কাপ পানীয় হয়েই থাকত। 

...

বহুদিন বাদে আবারো এক অপূরণীয় ক্ষতির কথা বলব। আমার আরেক সন্তান লুসিকে হারানোর কথা। এক রাতে তার নরম হাতটা আমার গলা জড়িয়ে ছিল। কিন্তু মাঝরাতের পর দেখলাম তার শরীর আগুনের মতো গরম হয়ে গেল। সকাল নাগাদ বুঝতে পারলাম তার ডায়রিয়া হয়েছে। শরীরে পানি কমে গিয়ে আমার চোখের সামনে ছটফট করতে করতে সে মারা গেল। সামান্য সময়ের ব্যবধানে সে বাড়ি থেকে বের হলো কফিনের  ভেতরে ঢুকে। 

বহু ভারতীয় মা তখন আমারই মতো একের পর এক শিশু সন্তান হারিয়েছেন। তখনকার পরিবেশ আর অসুখের আধিক্য কেউ অস্বীকার করতে পারবেন না। তবে অনেকে হয়তো খুব সহজে তা মেনে নিয়েছেন, আমি ততটা সহজে মানতে পারিনি। 

...

এখনো মনে পড়ে মিস্টার মার্টিনের বাংলোয় আমরা প্রচুর সুন্দর সময় কাটিয়েছি। বেশ সকালে বাচ্চাদের, আর পরিচারকদের নিয়ে আমরা নদীর তীরে চলে যেতাম। ঘাসের ওপর তখন বিন্দু বিন্দু শিশির জমত। শীত আসছে, বুঝতে পারতাম। নানা রকম ফুলের সুগন্ধে তখন বাতাস ভরে থাকত।

মার্টিনের সঙ্গে আমরা যে দুটো পরিকল্পনা করেছিলাম, তার মধ্যে একটি হলো, দিনাপুর আর কাউনপুরে অবহেলিত ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য দুটো স্কুল স্থাপন করব। মার্টিনের পরিকল্পনা হলো আমরা স্কুলের জন্য স্থানীয় একজন শিক্ষক নির্বাচন করব, মুসলমান হলে ভালো। স্কুলে একেকজন শিশুকে খুঁজে এনে ভর্তি করানোর জন্য শিক্ষককে ১ আনা করে সম্মানী দেয়া হবে। এ স্কুলে বাচ্চাদের পড়া আর লেখা শেখানোই আমাদের উদ্দেশ্য ছিল। ধীরে ধীরে অন্য বইয়ের পাশাপাশি সেখানে খ্রিস্টানদের বই পড়ানো শুরু হলো। বাইবেলের কিছু অংশ শিশুরা আনন্দ নিয়ে পড়ত। মুসা নবীর কাহিনী পড়াতে মুসলমান শিক্ষকের কোনো সমস্যা ছিল না। হিন্দুরাও কৌতূহলী হতো। 

এ রকম স্কুল আমি আগে কখনো দেখিনি। শিক্ষক মাটির ওপর একদিকে বসত আর তার সামনে সারি বেঁধে বসত ছাত্ররা। তাদের গায়ে কিছু নেই, কেবল কোমরের নিচে বেঁধে রাখা এক টুকরো কাপড় ছাড়া। তবে শিক্ষা গ্রহণে তাতে কোনো সমস্যা হতো না।

আফসানা বেগম: কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক