ব্রিটেনের মতো ভারতবর্ষেও মেমসাহেবদের সামাজিক মর্যাদা নির্ধারিত হতো তাদের স্বামীদের চাকরির র্যাং কের ভিত্তিতে। এক্ষেত্রে যে কোনো লিখিত নিয়ম ছিল এমন নয়, তবে অলিখিত এক শর্তে স্বামীর সামাজিক পরিসর তার স্ত্রীর চলাফেরা, সামাজিক জীবনকে নির্ধারণ করে দিত। কোনো একটি জেলাকে যদি বিবেচনায় নেয়া হয়, তাহলে সেখানে প্রধান কর্মকর্তা হলেন কমিশনার। একই সঙ্গে তিনি সরকারের তরফে স্থানীয় রাজনীতিরও প্রধান নেতা। এরপর আসেন সামরিক কর্মকর্তারা—সাধারণত কোনো কর্নেল বা ব্রিগেডিয়ার। এক্ষেত্রে নিয়মিত ব্রিটিশ সেনা আর স্থানীয় রেজিমেন্টের শ্বেতাঙ্গ কর্মকর্তাদের মধ্যে রেষারেষি কম ছিল না। এদের পরে ছিলেন নানা র্যাং কের সিভিল কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, মিশনারি, পুলিশ, রেলওয়ে প্রকৌশলী, টি প্লান্টার, পাট-নীল প্লান্টার, কেরানি, সাধারণ সৈনিক। 

মেমসাহেবরা ছিলেন এ সামাজিক কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভিনদেশে অবশ্য সামাজিক রীতির পরিবর্তন এসেছিল। জন্মদিন বা এ ধরনের অনুষ্ঠান ব্রিটেনে উদযাপিত হতো পারিবারিক গণ্ডিতে। কিন্তু ভারতে তা ছিল স্থানীয় ব্রিটিশদের গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক অনুষ্ঠান। এ রকম কিছু বিষয় মেমসাহেবদের অন্দরের জীবনে হাজির হয়েছিল। মেমসাহেবদের জীবনে সন্তান জন্মদান ও লালনপালন নিয়ে খুব বেশি তথ্য যেমন পাওয়া যায়নি, তেমনি এ নিয়ে আলোচনাও হয়েছে কম। তাদের কিছু স্মৃতিকথাতেই কেবল এ-সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়। উনিশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত ব্রিটেনে নারীরা সন্তান জন্ম দিতেন দাইদের সহায়তায়। পরবর্তী সময়ে চিকিৎসকদের সহায়তা নেয়া শুরু হয়। কিন্তু ভারতে পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। একদিকে মেমসাহেবদের সহায়তার জন্য স্বগোত্রীয় নারীরা তেমন ছিলেন না, আর এখানে চিকিৎসা ব্যবস্থার কাঠামোও সে রকম কিছু ছিল না। উনিশ শতকে পুরুষ ডাক্তারদের চেয়ে ধাত্রীরাই ছিলেন মেমসাহেবদের পছন্দ। তবে দুর্গম, প্রত্যন্ত স্থানে বাস করা ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের স্ত্রীদের জন্য এমন দাইয়ের সেবা পাওয়াটাও কঠিন ছিল। ১৮৮১ নাগাদ অনেক সৈনিকের স্ত্রীদের ধাত্রী হিসেবে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছিল। পুরুষ চিকিৎসকদের সঙ্গে ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আলাপে যথেষ্ট অস্বস্তি ছিল মেমসাহেবদের। তারা এজন্য তাদের স্বামীর মাধ্যমে চিকিৎসকদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। তেমন একটি উদাহরণের কথা জানা যায় ফ্লোরেন্স মার্শম্যান বেইলি (১৮৪৭-১৯২৩) জীবন থেকে। ফ্লোরেন্স ১৮৮৩ সালে দ্বিতীয়বার মা হন। শারীরিক গঠন ফিরিয়ে আনতে তিনি স্টেস পরতে আগ্রহী ছিলেন। এজন্য তিনি চিকিৎসকের মতামত নিতে তার স্বামী রয়াল ইঞ্জিনিয়ারদের লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফ্রেডরিখ বেইলিকে অনুরোধ করেন।

১৮৫০ সালের পর থেকে চিকিৎসক ও ধাত্রী—উভয়ের সহযোগিতা নেয়ার প্রবণতা দেখা যায়। এক্ষেত্রে দুজনের স্মৃতিচারণ উল্লেখযোগ্য। ফ্লোরা অ্যানি স্টিল (১৮৪৭-১৯২৯) ও অ্যানেট অ্যাকরয়েড বেভারিজ (১৮৪২-১৯২৯)—এদের মধ্যে ফ্লোরা লেখক হিসেবে নাম করেছিলেন। তিনি কমপ্লিট ইন্ডিয়ান হাউজকিপার অ্যান্ড কুক গ্রন্থের সহলেখক। ২০ বছর বয়সে তার বিয়ে হয়, ১৮৬৭ সালে তিনি ভারতের মাটিতে পা রাখেন। তিনি তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ভারতে তার প্রথম সন্তানের জন্মের সময় তিনি একজন নার্স ও চিকিৎসকের সহায়তা নিয়েছিলেন। বেভারিজ ছিলেন ব্রিটেনের এক ব্যবসায়ীর কন্যা। তিনি লন্ডনের কর্মজীবী নারীদের জন্য প্রতিষ্ঠিত একটি কলেজে শিক্ষকতা করতেন। সেখানে তার সঙ্গে সাক্ষাত্ হয় ভারতীয় সংস্কারক কেশব চন্দ্র সেনের সঙ্গে। কেশবের প্রেরণায় বেভারিজ বাংলায় আসেন ভারতীয় নারীদের জন্য বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে। ১৮৭৩ সালে তিনি কলকাতা পৌঁছেন। তিনি প্রতিষ্ঠা করেন হিন্দু মহিলা বিদ্যালয়। ১৮৭৫ সালের ৬ এপ্রিল তিনি বিয়ে করেন বাংলার ডিস্ট্রিক্ট ও সেশন জজ হেনরি বেভারিজকে। বিয়ের পর পুরো মনোযোগ দেন পরিবারে। ১৮৭৭ সালে তার প্রথম সন্তান এক কন্যা জন্ম নেয়। ১৮৭৯ সালে দ্বিতীয় সন্তান। এবার ছেলে শিশু। হেনরি বেভারিজ এ সময় পূর্ববঙ্গের রংপুরের জেলা জজ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। দুবার সন্তান জন্মের সময় তাকে সহায়তা করেছেন নার্স মিসেস টুমি। তাকে কলকাতা থেকে রংপুরে নিয়ে আসা হয়েছিল। সে সময় সেটা ছিল পাঁচদিনের পথ। তবে দ্বিতীয়বার মিসেস টুমি রংপুরে এসে পৌঁছনোর আগেই সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন মিসেস বেভারিজ। তিনি তার স্মৃতিচারণে ডাক্তারের কোনো উল্লেখ করেননি। তবে তার ছেলে ও জীবনীকার উইলিয়াম হেনরি বেভারিজ লিখেছেন, এ সময় একজন চিকিৎসক জরুরি প্রয়োজনে সেবা দেয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় তখনকার দিনে ডাক্তার উপস্থিত থাকলে মেমসাহেবরা নার্স কিংবা ধাত্রীর সেবা নিতে আগ্রহী ছিলেন।

ভারতে মেমসাহেবদের অনেকের ক্ষেত্রে মিসক্যারিজের ঘটনা ঘটত। এক্ষেত্রে মুখ্য কারণ ছিল শারীরিক ও মানসিক সমস্যা। পরিবার থেকে দূরে থাকার কারণে মানসিক অবসাদ, বিষণ্নতা আবার বিভিন্ন সামাজিক পার্টিতে অনেক সময় অবস্থান, ভারী বস্তু তোলা, ঘোড়ায় চড়া ছিল ভারতে মেমসাহেবদের মিসক্যারিজের অন্যতম কারণ। স্বামীর চাকরি সূত্রে বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণ অনেক নারীদের মিসক্যারিজের কারণ হয়েছিল। 

মেমসাহেবদের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল তাদের নিকটজনের অভাব, বিশেষত তাদের মায়েদের অনুপস্থিতি। ব্রিটেনে মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েরা কিশোরী বয়স থেকে বিশের কোটায় পৌঁছনোর মধ্যে গৃহস্থালি বিষয়াদি শিখে নিত তাদের মায়ের কাছ থেকে। বিয়ের পর সন্তান জন্মদানের সময়টায় তারা বাবার বাড়িতে থাকতেন। ১৮৬৯ সালে সুয়েজ খাল চালুর আগে ব্রিটেন থেকে মায়েদের চিঠি ভারতে মেমসাহেবদের কাছে আসতে চার-ছয় সপ্তাহ লাগত। কিন্তু চিঠি তো আর মায়ের উপস্থিতির অভাব পূরণ করতে পারত না। তবে বিশেষ সময়ে মায়েদের পরামর্শসমৃদ্ধ চিঠিগুলো তরুণী মেমসাহেবদের জন্য খুবই প্রয়োজনীয় ছিল। মিনি উডের চিঠি এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। ১৮৫৬ সালের ৯ ডিসেম্বর মাকে এক চিঠিতে তিনি লিখেছেন, ‘প্রিয় মা, আমি তোমার দেয়া সব উপদেশ অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলছি। আমি নিশ্চিত সবকিছু তোমার কথা মতোই ঘটবে...প্রতি সকালে আমি একটু হাঁটি এবং তোমার উপদেশগুলো মেনে চলার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকি।’ এ চিঠির ভাষা মা-মেয়ের সম্পর্ক এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে মায়ের ওপর মেয়ের আস্থার সম্পর্ক ফুটে উঠেছে। তরুণী মেমসাহেবদের প্রায় সবার জীবনেই ছিল এমন চিত্র।

সন্তান জন্মের পর মেমসাহেবরা আক্রান্ত হতেন আরেক আশঙ্কা দিয়ে। তখন ভারতে ব্রিটিশ শিশুদের মৃত্যুহার ছিল অনেক বেশি। অনেক তরুণী মাকে সন্তানের অকালমৃত্যু বড় মানসিক ধাক্কা দিত। হিট স্ট্রোক, ডায়রিয়া থেকে বাঁচাতে অনেক মেমসাহেব পুরো গ্রীষ্ম সন্তানকে নিয়ে হিল স্টেশনে কাটাতেন। এটা ছিল প্রায় চার-ছয় মাসের ধাক্কা। সন্তান জন্মের পর পরই স্বামীর থেকে বিচ্ছেদ। তাই দূরে গিয়ে তাদের দরকার হতো নারীদের নেটওয়ার্কের। সন্তান পালনের জন্য মেমসাহেবদের নির্ভর করতে হতো ভারতীয় আয়াদের ওপর। তবে এ আয়াদের বর্ণ, ধর্ম, জাত নিয়ে সবসময়ই ব্রিটিশ সমাজে টানাপড়েন কাজ করত।

কখনো স্বামীর উচ্চপদ, কখনো ভৌগোলিক দূরত্ব—মেমসাহেবরা এক রকম নিঃসঙ্গই ছিলেন। ব্যক্তিগত অনেক বিষয়, সমস্যার ক্ষেত্রে এ পরিস্থিতি তাদের দৈনন্দিন জীবনকে বেশ কঠিন করে তুলেছিল।

মেমসাহেব তাদের উপনিবেশ ভারতে হাজির হতেন এখানে একটি ব্রিটিশ হোম তৈরি করতে। অনেক চাকরবাকর, আয়া থাকলেও তাদের ব্যক্তিগত জীবন সবসময় সহজ ছিল না। বিশেষত মধ্যম বা নিচের সারির কর্মচারীদের স্ত্রীদের। সন্তান জন্ম দেয়া তাদের জন্য কঠিন ও বিপদের ঘটনা হয়ে উঠেছিল। একদিকে ছিল না যথেষ্ট স্বাস্থ্যসেবা, অন্যদিকে তাদের পরিবার-পরিজনও কাছে ছিল না। সাম্রাজ্যবাদী ও বর্ণবাদী আদর্শ, শ্রেণীবিভক্তি তাদের স্থানীয় বা ব্রিটিশ সমাজের মধ্যে নারী নেটওয়ার্ক তৈরিতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে রেখেছিল। এ কারণে মা, বোন কিংবা বান্ধবীর অভাব তারা ভিনদেশে এসে পূরণ করতে পারতেন না। আবার মা হওয়ার পরও ছিল বিড়ম্বনা। গ্রীষ্মে গরম থেকে বাঁচতে তারা সন্তানসহ যেতেন পাহাড়ি শহরে। এ সময় স্বামীদের থেকে দূরে থাকতে হতো। আবার সন্তান একটু বড় হলে তাকে শিক্ষার জন্য ব্রিটেনে পাঠানো হতো। তখন দীর্ঘকাল দূরে থাকতে হতো সন্তান থেকে।

এসএম রশিদ: লেখক