ব্রিটিশের পরাধীনতার
শৃঙ্খলমুক্ত হওয়ার
প্রাক্কালে অবিভক্ত
ভারত হিন্দু-মুসলিম
বিভেদ ক্রমেই
প্রবল হয়ে
উঠল। তৎকালীন
ভারতবর্ষের বিভিন্ন
স্থানে শুরু
হয়ে যায়
ভয়াবহ ভ্রাতৃঘাতী
সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা।
কলকাতার পর
১৯৪৬ সালের
অক্টোবরে নোয়াখালীতেও
শুরু হয়
দাঙ্গা। মহাত্মা
গান্ধী শান্তি
মিশন নিয়ে
ছুটে আসেন
নোয়াখালীতে। ১৯৪৭
সালের ৭
নভেম্বর নোয়াখালীর
চৌমুহনী রেলস্টেশনে
পদার্পণ করেন
এবং সেখানেই
গান্ধীজি প্রথম
জনসভা করেন।
এরপর দত্তপাড়া
গ্রামের (বর্তমান
লক্ষ্মীপুর জেলাধীন
সদর উপজেলায়)
সভার মধ্য
দিয়ে শুরু
হয় তার
গ্রাম পরিক্রমা
এবং সেই
সঙ্গে শুরু
হয় দাঙ্গায়
ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য
পুনর্বাসন কার্যক্রম,
হিন্দু-মুসলিম
সৌভ্রাতৃত্ব স্থাপন,
অস্পৃশ্যতা বর্জন,
বিশুদ্ধ পানি
সরবরাহ ও
পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা,
মানবাধিকার ও
সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড
এবং শিক্ষামূলক
কর্মকাণ্ড। মহাত্মা
গান্ধী ১
জানুয়ারি থেকে
মার্চ ১৯৪৭
পর্যন্ত নোয়াখালীর
গ্রামাঞ্চলে পদযাত্রা
সফরে ৪৭টি
গ্রামে এক
একটি করে
পর্যায়ক্রমে মোট
৪৭টি শান্তি
ক্যাম্প স্থাপন
করেন। গান্ধীর
গ্রাম পরিক্রমার
একপর্যায়ে ১৯৪৭
সালের ২৯
জানুয়ারি জয়াগ
গ্রামে আগমন
করেন। জয়াগ
গ্রামের তৎকালীন
জমিদার এবং
নোয়াখালীর প্রথম
ব্যারিস্টার শ্রী
হেমন্ত কুমার
ঘোষ জয়াগে
গান্ধীজির আগমন
এবং তার
বাড়িতে অবস্থানের
স্মৃতিকে অম্লান
রাখতে এবং
গান্ধী আদর্শে
জাতি-ধর্ম-বর্ণ-দলমত-পেশা-ভাষা-আঞ্চলিক-ভৌগোলিক
সীমারেখা-নারী-পুরুষ
নির্বিশেষে উন্নয়ন
কর্মকাণ্ড পরিচালনার
জন্য যাবতীয়
স্থাবর-অস্থাবর
সম্পত্তি মহাত্মা
গান্ধীর নামে
উৎসর্গ করেন
এবং তার
সহযোগিতায় ১৯৪৯
সনে ‘অম্বিকা
কালীগঙ্গা দাতব্য
ট্রাস্ট’ গঠনের
মধ্য দিয়ে
শুরু হয়
সমাজসেবামূলক কার্যক্রম।
মহাত্মা গান্ধী
‘অম্বিকা
কালীগঙ্গা দাতব্য
ট্রাস্ট’ প্রাঙ্গণে
৩০ জানুয়ারি
উদ্বোধন করেন
একটি বুনিয়াদি
বিদ্যালয়, যা
বর্তমানে ‘গান্ধী
মেমোরিয়াল ইনস্টিটিউট’
নামে পরিচিত।
যার মধ্যে
মাধ্যমিক অংশটি
এমপিওভুক্ত ও
প্রাথমিক ভাগটি
সরকারীকরণ হয়েছে।
২ মার্চ
১৯৪৭ গান্ধী
বিহারের উদ্দেশে
কলকাতার পথে
রওনা হন,
সঙ্গে ছিলেন
শ্রীমতী মৃদুলা
সারাভাই, শ্রীমতী
মানু গান্ধী
ও শ্রী
চারু চৌধুরী।
হাওড়া স্টেশনে
চারু বাবু
বিদায় চাইলে
গান্ধীজি বলেন,
‘নোয়াখালীতে
গিয়ে শান্তি
মিশনে কাজ
করতে থাকো,
আমি তো
আবার আসব।’
এ নির্দেশ
অনুসরণ করে
যারা নোয়াখালীতে
থাকার সিদ্ধান্ত
নিলেন তাঁরা
হলেন সর্বশ্রী
দেবেন্দ্র নারায়ণ
সরকার, মদন
মোহন চট্টোপাধ্যায়,
সাধনেন্দ্র নাথ
মিত্র, বিশ্ব
রঞ্জন সেন,
রঞ্জন কুমার
দত্ত, অজিত
কুমার দে,
জীবন কৃঞ্চ
সাহা, শ্রীনিবাস
সিংহ, রেড্ডি
পল্লী সত্য
নারায়ণ এবং
নারী সহকর্মী
আমাতুস ছালাম
প্রমুখ। বর্তমানে
এদের মধ্যে
কেউ আর
জীবিত নেই।
১৯৪৭ সালের
দেশভাগের পর
নোয়াখালীতে শান্তি
মিশনের অন্যতম
সদস্য শ্রী
চারু চৌধুরী
বিভিন্ন সময়ে
কারাভোগ করেন;
সর্বশেষ ১৯৬৩
সালে কারাবরণ
এবং বাংলাদেশ
স্বাধীন হওয়ার
পর জেল
থেকে মুক্ত
হন। বাংলাদেশে
স্বাধীনতা যুদ্ধ
চলাকালীন মহাত্মা
গান্ধীর সহযোগী
শ্রী মদন
মোহন চট্টোপাধ্যায়
ও শ্রী
দেবেন্দ্র নারায়ণ
সরকার প্রার্থনারত
অবস্থায় এবং
শ্রী অজিত
কুমার দে
ও শ্রী
জীবন কৃঞ্চ
সাহা অন্যত্র
পাক হানাদার
বাহিনী ও
বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী
চক্রের হাতে
নির্মমভাবে নিহত
হন। পাকিস্তান
আমলে গান্ধী
আশ্রম প্রতিকূল
সময় অতিক্রম
করেছে।
স্বাধীন বাংলাদেশে
গান্ধীর নোয়াখালী
আগমন ও
শান্তি পরিক্রমা
স্মরণীয় করে
রাখতে বঙ্গবন্ধুর
নির্দেশে এবং
বিচারপতি দেবেশ
ভট্টাচার্য ও
চারু চৌধুরীর
অক্লান্ত পরিশ্রমে
‘গান্ধী
আশ্রম ট্রাস্ট’-এর
আইনের খসড়া
তৈরি হয়।
পরবর্তী সময়ে
এক বিশেষ
অধ্যাদেশের মাধ্যমে
‘অম্বিকা
কালীগঙ্গা দাতব্য
ট্রাস্ট’ পুনর্গঠন
করে ‘গান্ধী
আশ্রম (বোর্ড
অব ট্রাস্টিজ)’
গঠন করা
হয় এবং
একটি স্বায়ত্তশাসিত
প্রতিষ্ঠানের মর্যাদায়
আইনানুগ স্বীকৃতি
প্রদান করা
হয়। প্রধানমন্ত্রী
শেখ হাসিনার
নির্দেশে ২০১৩
সালে এ
অধ্যাদেশ জাতীয়
সংসদে রেটিফায়েড
হয় এবং
২০২১ সনে
এটিকে পূর্ণাঙ্গ
আইনে রূপান্তরিত
করা হয়।
গান্ধী আশ্রম
ট্রাস্টের উন্নয়ন
কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে
প্রত্যক্ষ ও
পরোক্ষভাবে প্রায়
১২ লাখ
পরিবার উপকৃত
হচ্ছে। নোয়াখালী,
লক্ষ্মীপুর, ফেনী,
কুমিল্লা ও
চাঁদপুর জেলায়
বিভিন্ন ধরনের
প্রকল্পের মাধ্যমে
দরিদ্র ও
অসহায় জনগোষ্ঠীর
কল্যাণে প্রতিষ্ঠানটি
কাজ করে
চলেছে।
প্রতিষ্ঠানটির উল্লেখযোগ্য
কার্যক্রমের মধ্যে
রয়েছে পানি
ও পয়োনিষ্কাশন,
মানবাধিকার ও
সুশাসন, বিরোধ
নিষ্পত্তি, শিক্ষা,
কৃষি, স্বাস্থ্য,
হস্ত ও
কুটির শিল্প,
শান্তি ও
সম্প্রীতি প্রচারাভিযান
ইত্যাদি। গান্ধী
আশ্রম ট্রাস্টের
চত্বরে অবস্থিত
‘গান্ধী
মেমোরিয়াল মিউজিয়াম’-এ
প্রতিদিন শত
শত দর্শনার্থী
তার জীবন
ও দর্শন
সম্পর্কে ধারণা
পেয়ে থাকেন।
পুরো গান্ধী
আশ্রম বর্তমানে
দর্শনীয় স্থানে
রূপান্তরিত হয়েছে।
রাহা নব কুমার: পরিচালক, গান্ধী আশ্রম ট্রাস্ট





