মসজিদের নগরী ঢাকার সম্ভাব্য প্রথম মসজিদটি নির্মাণের সঙ্গে যার নাম জড়িত, তিনি ছিলেন একজন নারী। মুসাম্মাৎ বখত বিনত নামের এ নারী নারিন্দা বা নারায়ণদ্বীপে এ মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। নির্মাণকাল মসজিদে সংযুক্ত স্মারক শিলালিপির উদ্ধৃত পাঠ অনুসারে ১৪৫৭ সাল। তবে বিনত বিবির মসজিদ নামে পরিচিত এই মসজিদ ও শিলালিপির ইতিহাসে বেশকিছু প্রশ্ন এখনো নিরুত্তর রয়ে গেছে।
অধ্যাপক মুহম্মদ ইউসুফ সিদ্দিক তার বই ‘নিদ্রিত শিলার মুখরিত লিপি: বাংলার আরবী-ফারসী শিলালিপি’-তে বিনত বিবির মসজিদের দেয়ালে সন্নিবেশিত শিলালিপির যে পাঠ দিয়েছেন তার বাংলা প্রতিবর্ণীকরণ এমন:
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ। শুদ মাজিন বে-বাং হাইয়া (আলা) আল-ফালাহ, মাসজিদে ইন গারিব লাইল ওয়া সুবহ, মুসাম্মাৎ বখত বিনত দোখতারে মারহামাত, সেন্নেইয়ে ৮৬১।
সিদ্দিক পাঠের যে অনুবাদ দিয়েছেন তা এমন:
পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে। আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, হজরত মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসূল। ‘কল্যাণের দিকে আসো’ (হাইয়্যা [‘আলা’ল-] ফালাহ্) এই আহ্বানে ভূষিত হয় রাতে ও প্রভাতে এই গরিবের মসজিদ, মারহামাতের কন্যা মুসাম্মাৎ বখ্ত বীনত কর্তৃক (এটি নির্মিত হয়েছিল)। তারিখ আটশ একষট্টি (৮৬১) হিজরি।
শিলালিপিতে মসজিদ প্রতিষ্ঠাতার নাম লেখা হয়েছে মোসাম্মাত বখত বিনত। দেশের লোকে নারীবাচক বিবি শব্দটি এর সঙ্গে যুক্ত করে তাকে বিনত বিবি বলে ডাকে। শিলালিপিতে নামের সঙ্গে পরিচয়ে আরো লেখা হয়েছে ‘দোখতারে মারহামত’। এ কথার মানে কি মারহামতের মেয়ে নাকি কল্যাণের মেয়ে তা স্পষ্ট নয়। বিনতের প্রকৃত পরিচয় নিয়ে নানা গুজব শোনা যায়। একটি সুপ্রচলিত কাহিনী হলো তিনি ছিলেন আরাকান আলী নামক এক পারস্যের ব্যবসায়ীর কন্যা। আরাকান আলীই নাকি এ মসজিদ ও বিনতের মাজারটি নির্মাণ করেছিলেন। শিলালিপি কিন্তু বলছে বিনত বিবিই এ মসজিদের নির্মাতা। আরাকান আলীর কথা শিলালিপিতে নেই। আর পঞ্চদশ শতকের কোনো পারসিক ব্যবসায়ীর নাম আরাকান আলী হওয়াটাও আমার সীমিত জ্ঞানে খুব বেশি বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হয় না। মসজিদ নির্মাতা হিসেবে একজন নারীর নাম শিলালিপিতে লেখা থাকলেও সেখানে একজন পুরুষ তথা ওই নারীর পিতাই মসজিদের আসল নির্মাতা এটা প্রমাণ করতে চাওয়া সম্ভবত পিতৃতন্ত্রের একটি চোখা নিদর্শন। আবার মোগল সুবাদার শায়েস্তা খান যেভাবে নিজের কন্যা পরিবিবির মাজার নির্মাণ করেছিলেন এবং সেই সঙ্গে একটি মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন, সেই কাহিনীর ছায়াপাতও এই আরাকান আলী ও বিনত বিবিবিষয়ক পূর্ববর্তী কাহিনীতে আছে কিনা তা নিয়ে বড়জোর জল্পনা করা যেতে পারে। ইতিহাসের প্রথমের তালিকায় রাসসুন্দরী দেবী অথবা হানা ক্যাথারিন মুলেন্সদের মতোই বিনত বিবির স্মৃতির যথোচিত গুরুত্ব পাওয়া এখনো বাকি।
তবে বাপের নামই শুধু নয়। বিনত বিবিকে নিয়ে গুজবের ডালপালা আরো বিস্তৃত হয়েছে। অনলাইনে একটি ক্লিপ পাওয়া যায় ‘পিপাসা’ নামক একটি নাটকের যেখানে বলা হয়েছে বিনত বিবি ছিলেন বারবণিতা। কিন্তু এ ধরনের বক্তব্যের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। কোনো নারীর পরিচয়, বিশেষ করে পিতৃপরিচয় অথবা স্বামীর পরিচয় যখন খুব বেশি স্পষ্টভাবে পাওয়া যায় না তখনই তাকে নিয়ে নানা প্রকার জল্পনা করার প্রবণতা দেখা যায়।
পুরান ঢাকার নারিন্দা পুলের অদূরে স্থাপিত এই মসজিদে সন্নিবেশিত শিলালিপিটি অত্যন্ত অনাড়ম্বর, যদিও ভাষায় সুমিত কাব্য ভাব আছে। কোনো রাজা বাদশা বা আমির-আমলার নাম নেই। এর ভাষাও বিশেষ প্রণিধানযোগ্য। সুলতানি আমলের অধিকাংশ শিলালিপি আরবি ভাষায় রচিত। তবে যেসব শিলালিপি কোনো বিশেষ যুগান্তর, স্থানান্তর বা যুদ্ধবিগ্রহের মতো ক্রান্তিলগ্নে রচিত সেগুলোর কিছু কিছু ফার্সি ভাষায় লেখা হয়েছে বলে দেখা যায়। ১৫ শতকে ঢাকা প্রশাসনিকভাবে খুব কেন্দ্রীয় কোনো অবস্থানে ছিল না বলেই হয়তোবা এখানে বিনত কোনো ধরনের প্রশাসনিক বা রাষ্ট্রীয় নাম উল্লেখ ব্যতীত এই মসজিদের শিলালিপি রচনা করেছিলেন। তবে তিনি যে শিলালিপিতে নিজেকে গরিব বলে উল্লেখ করেছেন তাতে কিছু পরিমাণে এই সম্ভাবনা মনে উঁকি দেয় যে তিনি সম্ভবত সম্ভ্রান্ত ও অর্থশালী কোনো পরিবারের সদস্য ছিলেন। বড়লোক না হলে নিজেকে গরিব বলাটা খুব বেশি মর্যাদাপূর্ণ শোনায় না।
অনেকেই মসজিদ ও মাজারটিকে ঢাকার প্রাচীনত্বের প্রমাণ বা নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করতে পছন্দ করেন। অর্থাৎ ৪০০ বছর নয়, বরং হাজার বছর ধরে ঢাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক কেন্দ্র হিসেবে অধিষ্ঠিত ছিল বলে তারা মনে করেন। পূর্ব বাংলায় চিরকালই ঢাকার আশপাশের অঞ্চলগুলো যথা উয়ারী-বটেশ্বর, বিক্রমপুর, সোনারগাঁও, শ্রীপুর ইত্যাদি বিশেষ গুরুত্ব বহন করত। তবে আজকে আমরা ঢাকা শহর হিসেবে চিনি, তার শহর হিসেবে, অন্তত প্রশাসনিক শহর হিসেবে বিকাশ মূলত মোগল বাদশা জাহাঙ্গীরের আমল থেকে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে ঢাকা প্রথমবারের মতো একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে মর্যাদা লাভ করে। এ বিশেষ কেন্দ্রীয় মর্যাদা লাভের পরিপ্রেক্ষিতে শহরটির ইতিহাস আরো বিশেষ গুরুত্ব অর্জন করে এবং ঢাকার আদি শেকড়ের খোঁজ নিয়ে ইতিহাস-অন্বেষীরা অধীর হয়ে ওঠেন। এসব পরম্পরায়ই এ মসজিদ বিশিষ্টজনদের আগ্রহের বিষয় হয়ে ওঠে। খানিকটা সংশয়বাদী ছুতা ধরে কেউ বলতে পারেন যে মসজিদের শিলালিপিতে যেহেতু কোনো স্থানের নাম উল্লেখ করা নেই ফলে লিপিটি যে আদিতে এ স্থানে অবস্থিত এ মসজিদেই সন্নিবেশিত ছিল, অন্য কোনো স্থান থেকে আনা হয়নি, তার কোনো প্রমাণ নেই। তবে এই সংশয়বাদের পথ ধরে অগ্রসর হওয়ারও তেমন ভিত্তি আপাতত নেই। নারিন্দায়ই ঢাকার প্রথম মসজিদ, বিনত বিবির গড়া, এটাই আপাতত বিশ্বাসযোগ্য।
ঢাকার প্রথম নিদর্শন হিসেবে এ মসজিদ নিয়ে ইতিহাস-অন্বেষীদের যতখানি উৎসাহ দেখা যায় এ মসজিদের পুরনো কাঠামো সংরক্ষণের ক্ষেত্রে আমরা তত মনোযোগ দেখতে পাইনি। মসজিদ ভবনের ভাঙাগড়া-সম্প্রসারণ চলেছে বারবার এই টাইলসবিমুগ্ধ, উন্নয়নকামী জনপদে। স্বল্পালোকিত, প্রায়ান্ধকার মাজার-গর্ভে লাল সালুতে ঢাকা কবরে বিনত বিবি শায়িত। তার জীবনের ইতিহাসও আজ অনেকটাই বিস্মৃতির মোটা চাদরে ঢাকা। কেবল পাথরের শিলালিপিতে জ্বলজ্বল করছে তার অবিস্মরণীয় অবদান।
তাহমিদাল জামি: লেখক ও গবেষক





