মাত্র ১৩ বছর বয়সে সিংহাসন লাভ করে বাদশাহ হলেন জালাল-উদ-দীন আকবর। পিতামহ বাবরের নসিবই নিয়ে এসেছিলেন যেন। বাবরের পরামর্শদাতা হিসেবে ছিলেন তার মা কুতলুগ নিগার খানম ও নানি আইসান দৌলত বেগম। আকবরের সে সুযোগ ছিল না। মা হামিদা বানু বিচক্ষণ নারী হলেও তার মধ্যে রাজনীতি নিয়ে ছিল এক ধরনের নির্লিপ্ততা। বিশেষত স্বামী বাদশাহ হুমায়ুনের মৃত্যুর পর তিনি নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন। সে সময় আকবরের অন্যতম পরামর্শদাতা হয়ে উঠেছিলেন আকবরের দুধমা মাহাম আঙ্গা। আকবরের সিংহাসন লাভ থেকে শুরু করে মোটামুটি তার ২০ বছর বয়স পর্যন্ত মাহামই ছিলেন আকবরের বহু সিদ্ধান্তের ‘মাস্টারমাইন্ড’। তিনি হতে চেয়েছিলেন পর্দার আড়ালের শাসক। তবে সেক্ষেত্র তার জন্য প্রস্তুত হয়েছিল বহুদিন ধরে। মোগল ইতিহাসের অন্যতম জটিল চরিত্র মাহাম আঙ্গা।
আকবরের জীবনে মাহাম আঙ্গার অবদান অনেক। বলা হয়, তিনি আকবরের হয়ে নিজের বুকে তীর খেয়েছিলেন। কিছুটা অতিরঞ্জিত হলেও আকবরের নিরাপত্তার জন্য মাহামের জীবন সংকটে ফেলার বিষয়টিতে সন্দেহের অবকাশ নেই। আকবরের ছেলেবেলায় মাহাম একবার সত্যিই তার জন্য অস্ত্রের সামনে বুক পেতেছিলেন। পরেও নানা সময়ে আকবরকে পরামর্শ দিয়েছেন মাহাম। হুমায়ুনের এ পুত্রকে দুগ্ধপান করিয়ে তিনি কেবল বাঁচিয়েই রাখেননি, নিজের সন্তানরূপে দেখতেন। কিন্তু অনেকটা বাংলা সিনেমার মতোই নিজের সন্তানের স্বার্থে আকবরের ক্ষতি করার বিষয়ে একসময় মাহামের আর কোনো আপত্তি ছিল না। আকবর ও তার সাম্রাজ্যের নানা ক্ষতি তিনি না দেখার ভান করেছেন, বাদশাকে চালিত করেছেন ভুল পথে। এর কারণ ছিল নিজ সন্তান আদম খানকে ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করা।
মোগল, সুলতানি, অটোমান এমনকি ফরাসি রাজঘরানায়ও অন্দরমহল প্রভাব ফেলত রাজনীতিতে। মোগল আমলের ক্ষেত্রে হারেমের রাজনীতি নিয়ে বিদেশীরা বেশি আগ্রহ দেখিয়েছে। পর্যটক থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে ইংরেজ ‘ইতিহাস লেখক’রা হারেম নিয়ে নানা কেচ্ছা রচনা করেছেন। সে কারণে জাহানারা, জগৎ গোঁসাই থেকে মাহাম আঙ্গা নিয়ে নানা কথা প্রচলিত। তবে ইতিহাস বলে বাদশার দুধমা বিশেষ সম্মানের অধিকারী হতেন। হওয়াই স্বাভাবিক। জনপ্রিয় ইতিহাসে আকবরের দুধমা হিসেবে মাহাম আঙ্গার নাম এমনভাবে উল্লেখ করা হয় যেন তিনিই একমাত্র দুধমা ছিলেন। আদতে মাহাম ছিলেন আকবরের দুধমায়েদের মধ্যে প্রধান। তবে তার প্রতি হুমায়ুনের ছিল খানিকটা পক্ষপাত। এর পেছনেও আছে নির্দিষ্ট কিছু কারণ। কিছু সূত্র থেকে জানা যায়, শের শাহর তাড়া খেয়ে হুমায়ুন যখন সিন্ধে চলে যান সেখানে তার সঙ্গে ছায়ার মতো ছিলেন মোগল ফৌজের এক সেনাপতি নাদিম খান (নাদিম খান হুমায়ুনের দুধ ভাই ছিলেন বলে মনে করা হয়)। মাহাম ছিলেন নাদিম খানের স্ত্রী। সে কারণেই আকবরের প্রধান দুধমা হিসেবে মাহামকে নিয়োগ করা হয়।
আকবরের জন্ম ১৫৪২ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবরে। চৌসার যুদ্ধে শের শাহর কাছে হেরে হুমায়ুন তখন যাযাবরের জীবন যাপন করছিলেন। নাদিম খান সস্ত্রীক রাজ্যহারা বাদশার সঙ্গী হয়েছিলেন। সে সময় অমরকোটে আকবরের জন্ম। হুমায়ুন যাচ্ছিলেন পারস্যে। শাহ তামাস্পের কাছ থেকে সেনা সহায়তা নেয়াই ছিল তার ইচ্ছা। সে যাত্রায় নবজাতককে সঙ্গী করার সুযোগ ছিল না। অমরকোট থেকে এগিয়ে হুমায়ুন আকবরকে রেখে গিয়েছিলেন কান্দাহারে। সে সময় ভারতের মূল ভূমি থেকে উত্তর ছিল মোগলদের জন্য অনেক বেশি নিরাপদ। পারস্যে রওনা হওয়ার আগে আকবরের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল মাহাম আঙ্গার হাতে। কেবল দেখভাল, লালন-পালন করাই না, মাহাম রীতিমতো আকবরের নিরাপত্তার দায়িত্বও নিয়েছিলেন।
মোগল অন্তঃকোন্দলের প্রথম প্রকাশ্য দৃষ্টান্ত ছিল কামরান মির্জার বিদ্রোহ। ইতিহাস বলে বহু ক্ষেত্রে কামরান ছিলেন হুমায়ুনের তুলনায় যোগ্য সৈনিক। মোগল শাসক হওয়ার মতো যোগ্যতা হুমায়ুনের তুলনায় কামরানেরই বেশি ছিল। এক্ষেত্রে অটোমান সুলতান মেহমেদের (ফাতিহ) একটি কথা স্মরণ করা যেতে পারে। ওয়ালাকিয়ার প্রিন্স রাদুকে তিনি বলেছিলেন, শাসককে ক্ষমাশীল হতে হয়। এ ক্ষমার অভাব ছিল কামরানের মধ্যে। ন্যায়-নীতিরও। ক্ষমতা দখল করার জন্য তিনি শিশু আকবরকে কয়েদ করেছিলেন। সেখানেই শেষ না। পারস্য থেকে ফিরে হুমায়ুন যখন কাবুল দখল করতে আসেন, দুর্গের ওপর তিন বছরের আকবরকে কামরান তুলে ধরেছিলেন মানব বর্ম হিসেবে, যেন হুমায়ুন কামান দাগতে না পারেন। মাহাম সেই সময় র্যামপার্টে উঠে আকবরের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন যেন শাহজাদার গায়ে আঘাত না লাগে এবং এরপর তিনিই আকবরকে সেখান থেকে নিয়ে আসেন। হামিদা বানু এরপর নিজের তুলনায় মাহামের কাছেই আকবরকে বেশি নিরাপদ মনে করতেন।
ভরসা করার আরো একটি কারণ আছে। হুমায়ুনের বোন গুলবদন বেগমের লেখা থেকে সে সূত্রটি মেলে। তিনি জানিয়েছেন, মাহাম আঙ্গা ছিলেন হামিদা বানুর আত্মীয়। আর নাদিম খান ছিলেন হুমায়ুনের অন্যতম সেরা ও অনুগত সেনাপতি। ফলে মাহামের একধরনের খুঁটির জোর ছিল। হুমায়ুনের মৃত্যুর পর তিনি আগের ঘটনা ও নিজের অবস্থানের কারণে কিশোর বাদশার নিকটতম পরামর্শদাতা হয়ে উঠেছিলেন। মাহাম আঙ্গা ছিলেন যথেষ্ট শিক্ষিত ও বুদ্ধিমতী। শ্রী ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় তার ‘মোগল যুগে স্ত্রীশিক্ষা’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘সলীমার ন্যায় সমুজ্জ্বল প্রতিভাশালিনী না হইলেও সম্রাট আকবরের হারেমের দ্বিতীয় নক্ষত্র মাহম্ আনগা। ইনি সম্রাট আকবরের প্রধান ধাত্রী। মোগল যুগে যে-সমস্ত মহিলা শিক্ষা-বিস্তারকল্পে স্ব-স্ব নাম সুপ্রতিষ্ঠিত করিয়া গিয়াছেন, তাঁহাদের মধ্যে মাহম্ বিশেষ উল্লেখযোগ্য। ইনি একজন সুশিক্ষিতা রমণী এবং শিক্ষার প্রসারকল্পে দিল্লীতে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন। এই বিদ্যালয় মাহম্ আনগার মাদ্রাসা নামে পরিচিত ছিল। এক্ষণে ইহা ধ্বংসপ্রাপ্ত হইয়াছে।’ (দ্বিতীয় সংস্করণ, চৈত্র ১৩৪২)
আকবরের বাদশাহিতে মাহাম আঙ্গার প্রভাব কোথায় কোথায় ছিল, সে প্রশ্ন করে নির্দিষ্ট করে উত্তর দেয়া কঠিন হবে। তবে গুলবদনের লেখা থেকে বোঝা যায় ক্ষমতার খুব কাছাকাছিই ছিলেন মাহাম। মোগল বাদশাহির রীতি অনুসারে বাদশার প্রধান স্ত্রী কিংবা পূর্ববর্তী বাদশার স্ত্রী (বর্তমান বাদশার মা, কিংবা সত্মা) হারেমের প্রধান হতেন। আকবরের সময়ে হামিদা বানু নামে প্রধান হলেও সেখানে ক্ষমতা প্রয়োগ করতেন মাহাম আঙ্গা। আকবর ডিসলেক্সিয়ার কারণে পড়াশোনা শিখতে পারেননি। এক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে তার সহায়ক হয়েছিলেন মাহাম। তিনি নিজে শাসনের নানা বিষয় শিখেছিলেন। আকবরকে তা শেখাতেন। আর এর মধ্যেই নিজের কিছু মত তার মধ্যে ঢুকিয়ে দিতেন। এর বাইরে নানা কবিতা, গল্প, পৃথিবীর নানা শাসকের কথা আকবরকে শোনাতেন তিনি। ফলে মাহাম আঙ্গার প্রতি আকবরের একধরনের নির্ভরশীলতা তৈরি হয় এবং তার বহু সিদ্ধান্ত মাহামের বকলমেই আসতে শুরু করে। মাহাম এভাবেই চালিয়ে যেতে পারতেন, কিন্তু পারেননি দুটি কারণে। প্রথমত, আকবর কখনো পুতুল শাসক হতে চাননি। দ্বিতীয়ত, বৈরাম খাঁ।
হুমায়ুনের মৃত্যুর পর আকবরের মূল অভিভাবক হয়েছিলেন বৈরাম খাঁ। এ সেনাপতির যুদ্ধকৌশল ও দূরদৃষ্টি আকবরকে বাদশাহি তৈরি করতে সাহায্য করেছিল। দিনে দিনে বৈরাম তাই হয়ে ওঠেন মাহামের প্রধান প্রতিপক্ষ। মাহাম চাইতেন তার পুত্র আদম খান ক্ষমতার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠুক। দুধ ভাই হিসেবে আকবরও আদমকে নানা সুযোগ দিতেন। কিন্তু আদমের ছিল দুর্দম লোভ ও উচ্চাভিলাষ। সম্ভবত তার সঙ্গে মাহামও উচ্চাভিলাষী হয়ে উঠেছিলেন। আকবর বের হতে চাইতেন উভয়ের হাত থেকে। এর মধ্যে বৈরামের সঙ্গে তার দৃশ্যমান বিরোধের পেছনে মাহামের মন্ত্রণার কথা বলতে চান অনেকে। সেটা সম্ভব, কেননা বৈরাম নিজে ক্ষমতার চর্চা শুরু করলেও তা সাম্রাজ্যের জন্য ছিল কল্যাণকর। আদম নিজের ব্যাপারেই ভাবত। এ কারণে আদমের সঙ্গে বৈরামের বিরোধও হয়েছে। আকবর বৈরাম খানতে মক্কা যেতে বলেছিলেন কিন্তু মাহামকে তা বলতে পারেননি। এর পেছনে মাহামের প্রতি তার সম্মান ও প্রভাব টের পাওয়া যায়।
আরো টের পাওয়া যায় কেননা আদম খানের একের পর এক অপরাধ ক্ষমা করে গেছেন আকবর। তবে এর মধ্যে মালওয়া অভিযানে লুণ্ঠন নিয়ে বাদশা রীতিমতো কুপিত হন। এ অভিযানে আদম বাদশার অনুমতি ছাড়াই লুণ্ঠন চালিয়েছিলেন। আর লুণ্ঠিত দ্রব্যের কোনো হিসাব না দিয়ে রেখেছিলেন নিজের দখলে। কথিত আছে বাদশার জন্য পাঠানো দাসীদেরও তিনি ভোগ করেছিলেন। এ নিয়ে আদমকে তিরস্কার করলেও আদমকে কঠিন কোনো শাস্তি দেয়া হয়নি। মাহামের প্রভাবেই তা হয়নি। এছাড়া আকবরকে রক্ষা করতে একদিন বুক পেতে দেয়া মাহামের বিরুদ্ধে আকবরকে হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগও আছে। নিজামউদ্দিন আউলিয়ার দরগা থেকে ফেরার সময় আকবরের দিকে তীর ছুড়েছিল মীর্জা শরফুদ্দিনের (কিংবা শরীফউদ্দিন) ক্রীতদাস। তীরটি ছোড়া হয়েছিল মাহাম আঙ্গার নির্মিত খায়রুল মানাজিল মসজিদ থেকে। এছাড়া শরফুদ্দিনের সঙ্গে মাহাম-আদমের একটি জোট গড়ে ওঠার কথাও বলা হয়।
মাহামের নেতৃত্বে একটি ‘পেটিকোট গভর্নমেন্ট’ তৈরি হওয়ার কথা বলা হয় ইতিহাসে। মূলত আকবর কখনো সে পেটিকোট গভর্নমেন্ট দ্বারা পুরোপুরি চালিত হননি। বাস্তবিক এ জোট তৈরি হয়েছিল আদম-মাহাম-শরফুদ্দিনের সমন্বয়ে। তারা প্রথমে নিজেদের প্রতিপক্ষদের সরিয়েছেন। এর মধ্যে প্রথমেই ছিলেন বৈরাম খান। দ্বিতীয় ব্যক্তিটি ছিলেন শামসুদ্দিন আতগা খান। আকবরের শিক্ষক নিযুক্ত হয়েছিলেন তিনি। আদমের বহু কাজে তিনি বাধা দিতেন। সৎ ও সুফি চরিত্রের এ মানুষটির স্ত্রী ছিলেন জিজি আঙ্গা। লেখার শুরুতেই জানানো হয়েছিল একজন শাহজাদার একাধিক দুধমা থাকতেন। আকবরের দুধমায়েদের মধ্যে ছিলেন জিজি আঙ্গা। কিন্তু জিজি ও শামসুদ্দিন ক্ষমতার চর্চা করেননি। না করলেও শামসুদ্দিন একটি হুমকি হয়ে উঠেছিলেন আদমের জন্য। ১৫৬২ সালে দেওয়ান-ই-আমে কর্মরত শামসুদ্দিনকে হত্যা করে আদম খান।
মাহাম আঙ্গার চরিত্রটি জটিল নানা কারণে। তিনি নিজে তেমন কোনো অপকর্ম করেননি। আদমকে দিয়ে করিয়েছিলেন এমন প্রমাণও পাওয়া যায় না। কিন্তু আদমের সমর্থন না করলেও তিনি নীরব থাকতেন। এটা স্পষ্ট যে তিনি চাইতেন আদমের আরো উন্নতি হোক। কিন্তু আদমকে তিনি বাদশার সিংহাসনে দেখতে চাইতেন এমনটা স্পষ্ট করে বলা মুশকিল। আকবরকে নিজের মতো চালনা করতে চেয়েছিলেন তিনি। পর্দার আড়াল থেকে শাসন করতে চাইতেন। অন্যদিকে, আদমের মৃত্যুর সময় তিনি ছিলেন নির্বিকার। অবশ্য আদমের অপরাধের ক্ষমা ছিল না। কথিত আছে শামসুদ্দিন আতগাকে হত্যার পর আকবরকে হত্যা করতে হারেমেই ঢুকে পড়েছিল সে। মাতাল আদমকে অল্প সময়ে কাবু করেছিলেন আকবর। তাকে কেল্লার ছাদ থেকে দুবার ফেলে দিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। ঘটনার তারিখ ১৬ মে ১৫৬২। এর ৪০ দিনের মাথায়, ২৫ জুন মাহামও মারা যান।
আকবর হয়তো বিশ্বাস করতেন যে তাকে হত্যা, শামসুদ্দিন আতগাকে হত্যার কোনো পরিকল্পনা মাহামের ছিল না। কেননা চাইলে সে সুযোগ মাহামের আগেও ছিল। আসলে ইতিহাসের কিছু বিষয় অমীমাংসিত থাকে। মাহাম আঙ্গার বিষয়টিও সে রকম। তবে আকবর তার ও তার পুত্রের জন্য মকবরা তৈরি করিয়েছেন। মেহরাউলিতে সাদামাটা হলেও বেশ বড় করে নির্মিত হয়েছে আদম খানের মকবরা। সেখানেই আদম খানের পাশে মাহাম আঙ্গাকে সমাহিত করা হয়।
মাহমুদুর রহমান: লেখক






