সংস্কৃতির সঙ্গে ধর্মের সম্পর্ক নিবিড়। কোনো না কোনোভাবে ধর্ম প্রভাবিত করে সংস্কৃতিকে। আসলে ধর্ম সংস্কৃতিরই অংশ। সে হিসেবে বলা যায়, ধর্ম আসলে শিল্পকে প্রভাবিত করে। শিল্পের প্রতিটি ফর্মে ধর্মের প্রভাব দেখা যায়। সিস্টাইন চ্যাপেলের ছাদের নকশা থেকে শুরু করে তাজিয়া সাজানো পর্যন্ত প্রতিটি বিষয়েই ধর্ম ও বিশ্বাস সম্পর্কযুক্ত। সংগীতের ক্ষেত্রেও একই বিষয়। সেক্ষেত্রে আবার বাংলায় এলে সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে। এ অঞ্চলের সংগীত সবসময়ই ধর্মীয় বিশ্বাস দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। ভক্তি আন্দোলন হোক কিংবা অন্য কোনো ক্ষেত্র—সংগীতে এর প্রভাব বরাবরই ছিল। ইসলামের ক্ষেত্রে এসে বিষয়টি খানিকটা অস্বস্তি তৈরি করে, কেননা ইসলামে সংগীত (চিত্রাঙ্কনও) সিদ্ধ কিনা, তা নিয়ে বিতর্ক দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। ধর্ম যাই বলুক না কেন, বিশ্বাস মানুষের মনের ব্যাপার। আর সে বিশ্বাস থেকেই মানুষ শিল্পে নানা উপাদান নিয়ে আসে। বাংলায় সংগীতের ক্ষেত্রেও এমনই হয়েছে।
সনাতন ধর্ম ও এর নানা ভাগে সংগীতের চর্চা রয়েছে। বৌদ্ধ গান ও দোহার কথাও আমরা জানি। এছাড়া লোকাচারেও গানের কোনো অভাব নেই। আছে ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, নানা পালা-পার্বণের গান। ঘুমপাড়ানি গান থেকে শুরু করে চাল কোটার গানও বাংলার ঐতিহ্য। ফলে বাংলার সংগীতে ইসলামের নানা ঘটনা ঘুরেফিরে আসবে না, তা তো হয় না। মূলত বাংলায় ইসলাম প্রচার হওয়ার পর থেকেই এ অঞ্চলের সংগীতে মুসলমানি ইতিহাস থেকে শুরু করে জীবনযাপন সংগীতে এসে পড়ে। ইসলামী সংগীত হওয়া সেক্ষেত্রে জরুরি ছিল না। ভক্তিবাদী গানেও ইসলামী শব্দ ও ভাবের প্রবেশ ঘটেছিল।
তবে আধুনিক সময়ের সংগীতে ইসলাম বা মুসলমানি প্রভাবের কথা বা আরো সহজ করে ‘বাংলায় ইসলামী সংগীত’ নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রধান হয়ে সামনে আসে জারি গানের কথা। এ ধারার সংগীত বাংলার ঐতিহ্য। তবে জারি শব্দটি ফারসি। এর অর্থ শোক। মুসলমানদের সবচেয়ে বড় শোক কারবালা। মহররমের সেই বিয়োগান্তক কাহিনী বর্ণনা করে যে গান গাওয়া হয়, তাই জারি নামে পরিচিত। বাংলায় ইসলামী সংগীতের ধারায় জারিগান অন্যতম জনপ্রিয় ধারার সংগীত। শোকের আবহকে ফুটিয়ে তোলা ও সেই শোক সঞ্চার করার পাশাপাশি মহানবীর প্রিয় দৌহিত্রদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এ গানের উদ্দেশ্য। সপ্তদশ শতাব্দীতে গানের এ ধারার সূচনা হয়।
শোকের এ গানের ভাবটি হয় আহাজারির। মাতম শব্দটিও ব্যবহার করা যায়। জারিগানের রয়েছে নিজস্ব আঙ্গিক ও রীতি। একটা সময়ে একাধিক রীতিতে এ গান পরিবেশন হতো। আহাজারির সুরের সঙ্গে নৃত্যের মাধ্যমে পরিবেশন হতো জারিগান। নৃত্য বললে আসলে ভুল হয়, মূলত এক ধরনের নাট্য পরিবেশন হতো। কালের বিবর্তন ও নানা কারণে এ ধারায় কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। তবে এখনো নানা স্থানে এভাবে জারি পরিবেশন হয়। তবে জারি কেবল কারবালার কাহিনী নিয়েই পরিবেশন হবে, এমন নয়। কখনো কখনো ইসলামের অন্যান্য বিষয় নিয়েও গান তৈরি হয়। এ ধারার গানকেও জারিগানের অন্তর্ভুক্ত করে আলোচনা করা হয়।
জারির সূচনা হিসেবে পঞ্চদশ শতককে ধরা হয়। এ সময়েই রচিত হয়েছিল ‘জঙ্গনামা’। জারিগানের অন্যতম আদি নিদর্শন হিসেবে ১৬৪৫ সালে মুহম্মদ খান রচিত ‘মকতুল হোসেন’ নামে একটি কাব্যের সন্ধান পাওয়া যায়। মোগল আমলে ভারতে মোগল দরবারে পারস্য থেকে শিয়া মতাবলম্বী বহু অভিজাত উচ্চপদ লাভ করেছিলেন। তারা কারবালার ঘটনা স্মরণ করে দুঃখ করতেন। সেখান থেকে কারবালা ও হাসান-হোসেনকে স্মরণের বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ে। বাংলায়ও ব্যত্যয় হয়নি। তাদের করুণ পরিণতি বাংলার মানুষের মনে প্রভাব ফেলেছিল। জঙ্গনামা পাঠের মাধ্যমে প্রান্তিক মানুষেরাও জানতে পেরেছিল সেই ঘটনা।
কিন্তু সে সময় জঙ্গনামা পরিবেশিত হতো কবিতার মতো করে। এছাড়া জঙ্গনামা পরিবেশনের রীতিটি ছিল বৈঠকি। একে সংগীত বলা যায় না। পরবর্তী সময়ে জঙ্গনামাকে অভিনয়ের মাধ্যমে পরিবেশনের মধ্য দিয়ে সংগীতের ধারায় আনা হয়। এ পদ্ধতিতে এসে জঙ্গনামা নতুন মাত্রা পায় এবং বাংলায় ইসলামী সংগীতের নতুন ধারাও তৈরি হয়। জারিগান সাধারণত পয়ার ছন্দে রচিত হয়। কবিগানের মতো জারিতেও দুটো দল থাকে। প্রত্যেক দলে থাকেন একজন মূল গায়ক বা বয়াতি। সঙ্গে দোহার থাকেন দুই-চারজন। সঙ্গে যন্ত্রী থাকেন অন্তত চারজন। বয়াতি নিজে দোতারা, সারিন্দা, বেহালা, ডুগডুগি বাজিয়ে গান করেন। যন্ত্রীরা বাজান ঢোলক, একতারা, দোতারা, সারিন্দা, বাঁশি ইত্যাদি। বন্দনা, গোষ্ঠগান ও মূল জারি—এই তিন ভাগে গীত হয় জারি। কালের বিবর্তনে এ গানের কথায় অন্যান্য ধর্মের নানা বিষয়ও অনুষঙ্গ হয়ে ঢুকেছে। তবে মহানবী (সা.), তার পরিবার, হাসান-হোসেন, মুসলিম শৌর্য, ইয়াজিদ ও সিমারের নিষ্ঠুরতাই জারির মূল। একটি জারি গানের বন্দনা অংশে আছে—
বন্দিলাম হযরত গো আলী, উমর ও উসমান
আবু বকর সিদ্দিক, বন্দিলাম বিল্লালের আজান\
বন্দিলাম ফাতেমা মাগো জগতের জননী।
ইমাম হাসান দুই ভাই বন্দিলাম, দুইলা চোখের পানি\
জারির সঙ্গে মার্সিয়া যুক্ত। মার্সিয়া শুরু হয়েছিল কারবালার ঘটনা স্মরণ করেই। মার্সিয়া মানেও শোক, কান্না, মাতম করা ইত্যাদি। আরো সুন্দর করে বলা যায়—বিষাদগীতি। বিলাপ করে দুঃখ প্রকাশ করে মার্সিয়া গীত হয়। জারিগান মূলত মহররম মাসের প্রথম দশদিন পরিবেশন হয়। কিন্তু মার্সিয়ার বৈশিষ্ট্য হলো, এ গান প্রধানত আশুরার দিনই গাওয়া হয়। এর বাইরে যে হয় না এমন নয়, তবে তাজিয়া মিছিলে মিছিলের পাশাপাশি মার্সিয়া গাওয়া হয়। যুবকেরা বুক চাপড়ে হাসান, হোসেন ও আলীর (রা.) নাম করে মাতম করে। কখনো মাতম চলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে, আর কখনো পূর্ব রচিত কবিতার মাধ্যমে। উপমহাদেশে মার্সিয়া মূলত উর্দুতে রচিত হতো। দাক্ষিণাত্যে শিয়া শাসনের সময় দরবারে মার্সিয়া রচিত হতো। মোগল সম্রাটদের দরবারের কবি এমনকি তারও আগে কবি আমির খসরু মার্সিয়া রচনা করেছেন। ঊনবিংশ শতাব্দীতে পশ্চিমবঙ্গের ভূরশুই কানপুর পরগনা থেকে মুন্সী জোনাব আলীর ‘শহীদে কারবালা’ প্রকাশ হয়। সাদ আলী ও আব্দুল ওহাব ‘শহীদে কারবালা’র কাব্যধারা সংযোজন করেন। মুসলমানি বাংলায় রচিত পুঁথির আদি কবি ফকীর হাবিবুল্লাহ ফারসি-উর্দু-হিন্দি মিশ্রিত বাংলা ভাষায় কাব্য রচনার যে রীতি চালু করেছিলেন, তা বর্তমান সময়েও হয়ে আসছে। অতি আধুনিক কালের কবিদের মধ্যে রংপুরের মুহাম্মদ ইসহাক দাস্তান ‘শহীদ কারবালা’ এবং চট্টগ্রামের কাজী আমিনুল হকের ‘জঙ্গে কারবালার’ নাম উল্লেখযোগ্য।
মার্সিয়া কেবল বাংলাদেশে গাওয়া হয়, এমন নয়। বৃহত্তর বাংলায় এ ধারার গান প্রচলিত এবং একই ধারায় সব স্থানে মার্সিয়া গাওয়া হয়। পশ্চিমঙ্গের মুর্শিদাবাদে নানা ধরনের লোকগান ও বৈচিত্র্যময় নাটকের ঐতিহ্য রয়েছে। অন্যদিকে সিরাজউদ্দৌলার সময় থেকে সেখানে মুসলিম বসতি ঘন হয়। ফলে মুর্শিদাবাদে তৈরি হয়েছে মার্সিয়ার নিজস্ব ঐতিহ্য। সেখানে মাথায় সাদা পাগড়ি বেঁধে যুবকেরা বুক চাপড়ে মার্সিয়া গায়—
সিমার যখন হোসেন শাহের বুকেতে বসেছিল
সারে জাহান, আসমান জমিন থরোথরো কাঁপিল।
...
খেলার সাথি জিবরিল আমিন কাঁদিছে গো অন্তরে
ওগো আল্লাহ রহম কর ছোট্ট হোসেনের ’পরে।
বাংলার ইসলামী সংগীতে মুর্শিদাও অন্তর্ভুক্ত। এ ধারার গানে সাধারণত গায়ক তার ‘গুরু’কে উদ্দেশ্য করে কথা বলে। এই গুরু সবসময় পীর বা শিক্ষক নন। কখনো গুরুকে মধ্যবর্তী রেখে আল্লাহর উদ্দেশে নিবেদন করা হয় কোনো কিছু। পাঞ্জাবের কাফি ঘরানার গানের সঙ্গে এর মিল রয়েছে। সরাসরি ধর্ম বা ইসলামের কথা এসব গানে থাকে। আবার না থাকলেও গানগুলো কখনো কখনো দরবেশ, পীরের খানকাহে বসেই রচিত। তাই ধর্মীয় ভাব সেখানে থাকেই। মুর্শিদা গান সম্পর্কে পল্লীকবি জসীমউদ্দীন লিখেছেন, ‘সব মুর্শিদা গানেই গুরুর প্রশংসা থাকে না। বহু মুর্শিদা গানে নৌকা, নদী, ঘর প্রভৃতি রূপক হিসেবে ব্যবহূত হয়। মুর্শিদা গানে খোদাতায়ালার কাছে ভক্তের আত্মনিবেদনও আছে।’
বাংলাদেশে বিভিন্ন অঞ্চলে বহু পীর ও দরবেশের নামে বা তাদের উদ্দেশ্য করে গান রচিত হয়েছে। সেসব গানে আল্লাহ, রাসূল (সা.), তার সাহাবা ও অন্যান্য প্রসঙ্গ এসে থাকে। এসব গান বৃহত্তরভাবে মুর্শিদারই অন্তর্ভুক্ত। মাদার পীর, মাইজভান্ডারি থেকে শুরু করে বিভিন্ন সুফি তরিকার অনুসারীরা তাদের পীরের উদ্দেশে যেসব গান পরিবেশন করেন তাও মুর্শিদা। এর বাইরেও নবীদের কাহিনী, ধর্মীয় ইতিহাসের নানা পর্ব, অতিলৌকিক ও অলৌকিক নানা বিষয় নিয়ে রচিত হয় গান। সেসব গান বাংলার ইসলামী সংগীতের অংশ।
বাংলার ঐতিহ্যবাহী আরো অনেক ধারার গানকে ইসলামী সংগীতের সঙ্গে যুক্ত করা যায়। এ অঞ্চলে বহু বছর ধরে গাজী কালুর পুঁথি থেকে শুরু করে, বদর পীরের গান গাওয়া হয়। এমনকি নৌকাবাইচ উপলক্ষে গাওয়া সারি গানেও আল্লাহ-রাসূলের প্রসঙ্গ আসে। ইসলামী সংগীত না বললেও এসব সংগীতে ইসলামের নানা অনুষঙ্গ এসেছে। তবে কাসিদাকে সরাসরি ইসলামী সংগীতই বলতে হয়। মোগল বা সুলতানি দরবারে কাসিদা শাসকের প্রশস্তির জন্য রচিত ও গাওয়া হতো। কিন্তু কাসিদা মূলত আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রশংসা করে। বাংলায়ও রচিত হয়েছে বহু কাসিদা। এর সঙ্গে হামদ ও নাতকেও যুক্ত করা যায়। সুর করেই সেসব গাওয়া হয়। সংগীত ও ইসলামে সংগীত নিয়ে নানা তর্ক থাকলেও বাংলা তার নিজের মতো করে সংগীতে ইসলামকে ধারণ করেছে। বিভিন্ন ধারা নিয়ে বাংলায় তাই তৈরি হয়েছে ইসলামী সংগীতের বিস্তৃত বলয়।
মাহমুদুর রহমান: লেখক





