ইসলামী সংগীত ‘নাশিদ’-এর উৎস যদিও মধ্যপ্রাচ্যে, তবে কয়েক দশক ধরে নাশিদ সংগীতের ধারা বিকাশ ও জনপ্রিয়তা লাভ করেছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোয়, বিশেষ করে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায়।

আধুনিকায়নের মাধ্যমে কখন এবং কীভাবে নাশিদ মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায়, বিশেষ করে তরুণ সমাজে বিস্তার লাভ করেছে এবং জনপ্রিয়তা পেয়েছে, তা এ নিবন্ধে তুলে ধরা হয়েছে।

নাশিদ সংগীতের সূত্রপাত

আরবি নাশিদ শব্দটি ‘আনসিয়েদা’ শব্দ থেকে উদ্ভূত। নাশিদ (বহুবচন: আনাশিদ) শব্দের অর্থ হলো ধর্মীয় সংগীত, গান, কবিতা অথবা স্তোত্র। মূল ক্রিয়াপদ নাশাদা মানে ‘আবৃত্তি করা’ বা ‘গান গাওয়া’। নাশিদ এক ধরনের ‘ক্যাপেলা গান’ (যেসব গানে মূলত ভোকাল হারমোনিয়াম ব্যবহার করা হয় এবং প্রধানত পুরুষ কণ্ঠশিল্পী অংশগ্রহণ করে) হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

জানা যায়, নবী সোলায়মানের (আ.) সংগীতকে আরবি ভাষায় ‘নাশিদ আল-আনাশিদ’ বলা হতো। এছাড়া মদিনার জনগণ নাশিদ গান গেয়ে নবী মুহাম্মদকে (সা.) অভ্যর্থনা জানিয়েছিল, যখন তিনি মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেছিলেন। সেই সময় থেকে মদিনাবাসী আনসারদের গাওয়া ‘তালা আল বাদরু আলাইনা’ (অর্থ্যাৎ ‘অবশেষে আমাদের মধ্যে চাঁদ উত্থিত হয়েছে’) শিরোনামের নাশিদ বা ইসলামী গান হিসেবে জনপ্রিয়তা পেয়েছিল, যা এখনো মিলাদ পড়ানোর মাঝে গাওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে কীভাবে যেন নাশিদ শব্দটি আন্তর্জাতিক (যেমন আল-নাশিদ আল-উমামি) এবং এমনকি সামরিক মিছিলের জন্যও ব্যবহার করার প্রচলন শুরু হয়েছে। বর্তমানে নাশিদ এক ধরনের ইসলামী ভক্তিমূলক গানকে বোঝায়, যা আল্লাহ পাকের প্রশংসা করে এবং ইসলামে সার্বজনীন প্রেম, ভালো নৈতিকতা বা ভ্রাতৃত্বের মতো অন্যান্য ধর্মীয় বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নাশিদ সংগীতের বিকাশ ও জনপ্রিয়তা

আধুনিককালে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিশেষ করে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় নাশিদ সংগীতের বিকাশ এবং জনপ্রিয়তা লাভ করে। তবে মালয়েশিয়ার নাশিদ সংগীত ১৯৫০-এর দশকের গোড়ার দিকে জনসাধারণের সংগীত ছিল। তখন নাশিদ সংগীত রাষ্ট্র ও জাতীয় কোরআন পাঠ প্রতিযোগিতার ফাঁকে বিরতির সময় ব্যবহার হতো। পরবর্তী সময়ে নাশিদ সংগীত সফল বাণিজ্যিক আকারে রূপান্তরিত হয়েছিল।

মিসর, সৌদি আরব, ইয়েমেন, কুয়েত ও জর্ডানে অধ্যয়নরত মালয়েশিয়ান ও ইন্দোনেশীয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে নাশিদ সংগীতের পরিচয় হয়। শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করে তারা স্বদেশে ফিরে এসে নাশিদ সংগীত চর্চা শুরু করে। সেই সময় ‘আল আরকাম’ আন্দোলনকারী কর্মীরা বিভিন্ন কর্মসূচিতে নাশিদ সংগীত পরিবেশন করত। আল আরকাম ছিল ইসলামী সংগঠন, যা মালয়েশিয়ার নাগরিক গোষ্ঠীর নেতৃত্বে ছিল এবং তাদের জীবনে ইসলামী মূল্যবোধ প্রবর্তনের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল। দাওয়াতের মাধ্যমে ইসলামের পথে সংগঠিত করার পাশাপাশি তারা তাদের নিজস্ব ইসলামী পণ্য তৈরি করে ইসলামী অর্থনীতির ব্যবস্থাও তৈরি করেছিল, যার মধ্যে তাদের বাদ্যযন্ত্র গোষ্ঠীর জন্য নাশিদ সংগীতও অন্তর্ভুক্ত ছিল। আল আরকামের প্রথম নাশিদ সংগীত দল ছিল ‘নাদামুরনি’ (বা ধার্মিক ছন্দ), যা পরে জিকির হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। এসব নাশিদ সংগীত গোষ্ঠী আশ্চর্যজনকভাবে তাদের সাফল্য অর্জন করেছিল। কারণ তাদের গানের বিষয়বস্তুতে কেবল জিহাদ, শাহাদাত ও বীরত্ব উল্লেখ করা হয়নি, বরং একই সঙ্গে মাদকদ্রব্য ও স্কুল শেষ করাসহ বিভিন্ন সামাজিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। এছাড়া বাবা-মা, পরিবার এবং অন্যান্য বিষয়ও ছিল, যা প্রাপ্তবয়স্কদের মন জয় করতে সক্ষম হয়েছিল এবং তরুণ শ্রোতাদের কাছে ছিল স্বীকৃত ও গ্রহণযোগ্য। সুতরাং দেখা যায়, নাশিদ সংগীতের অনুসারীদের বেশির ভাগই যুবক ছিল, বিশেষ করে তারা ছিল ধর্মীয় বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও কর্মী। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন নাশিদ ‘বয়-ব্যান্ড’-এর জনপ্রিয়তা থাইল্যান্ড, ব্রুনি, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর এবং বিশেষত ইন্দোনেশিয়ার মতো প্রতিবেশী দেশগুলোয় ছড়িয়ে পড়ে। ইন্দোনেশিয়ায় ১৯৯০-এর দশকে নাশিদ সংগীত চালু হয়েছিল এবং ‘তারবিয়াহ’ নামে দাওয়া গ্রুপের মাধ্যমে আরো জনপ্রিয় হয়েছিল। তারবিয়া হলো একটি ইসলামী সংগঠন, যার আকৃতি ও কার্যক্রম—উভয়ই মিসরীয় মুসলিম ব্রাদারহুড গোষ্ঠীর শিক্ষায় অনুপ্রাণিত।

যা-ই হোক, ইন্দোনেশিয়ায় নাশিদ সংগীতের বিস্তার, প্রক্রিয়া ও জনপ্রিয়তা সম্পর্কে বলা হয়, নাশিদ সংগীত জাকার্তা এবং বিশেষত বান্দুংসহ বিভিন্ন শহরের ছাত্রসমাজের কাছে বিশাল সাফল্য অর্জন করেছিল, যেখানে অসংখ্য নাশিদ সংগীত গোষ্ঠীর আবির্ভাব হয়েছিল। তখন প্রচারের জন্য ইন্দোনেশিয়ায় সরকারি কোনো চ্যানেল ছিল না। তাই নাশিদ সংগীত বাড়িতে ক্যাসেট তৈরি করে বিভিন্ন শহরের বিশ্ববিদ্যালয় এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল, এমনকি ইসলামী বইমেলায় বিক্রয়ের জন্যও প্রচার করা হয়েছিল। উল্লেখ্য, এখনো তারা প্রায়ই তাই করছে। এছাড়া ধর্মীয় অনুষ্ঠানে, যেমন মহররম ও রোজার ঈদের সময়, নাশিদ সংগীত পরিবেশন করা হয়।

এ কথা সত্যি, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় নাশিদ সংগীতের বিস্তারের পদ্ধতি প্রায় একই ধরনের। দুই দেশের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও কর্মীরা এসব ইসলামী সংগীত বিতরণের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছে। মালয়েশিয়ান ও ইন্দোনেশীয় নাশিদ সংগীত বিকশিত হয়েছে এবং শ্রোতাদের পছন্দ পূরণের চাহিদা অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়েছে।

মালয়েশিয়ায় সবচেয়ে জনপ্রিয় নাশিদ সংগীতশিল্পীদের মধ্যে একজন হলেন রায়হান। তিনি হিপ-হপ এবং ‘রিদম অ্যান্ড ব্লুজ’ (সংক্ষেপে আরঅ্যান্ডবি)-এর মতো ক্রসওভার সংগীত নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। জানা যায়, রায়হানের প্রথম অ্যালবাম ‘পুজি-পুজিয়ান’, যা ১৯৯৭ সালে বেরিয়েছিল, সাড়ে ছয় লাখেরও বেশি কপি বিক্রি হয়েছিল এবং সেই সময়ে মালয়েশিয়ায় সর্বাধিক বিক্রীত রেকর্ড সৃষ্টি করেছিল। পরবর্তী সময়ে ২০০০ সালে রায়হানের প্রথম চলচ্চিত্র ‘সুযুকুর ২১’ (ধন্যবাদ ২১) মুক্তি পায়। সেই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে নাশিদ গান ও দাওয়াতের বার্তা বিপণনের আরেকটি কার্যকর উপায় হিসেবে ব্যবহার হতো। এছাড়া অন্যান্য নাশিদ সংগীতশিল্পীদের মধ্যে কেউ কেউ পশ্চিমা বয়-ব্যান্ডগুলোর সাফল্য দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে, যেমন ‘বয়েজ টু মেন’, ‘ব্যাক স্ট্রিট বয়েজ’ বা ‘ওয়েস্টলাইফ’। তবে বলতে হয়, মালয়েশিয়ায় নাশিদ সংগীতের নিজস্ব স্থান ও শ্রোতা রয়েছে।

নাশিদ সংগীতের জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নাশিদ বয়-ব্যান্ডগুলো সুপারস্টারের মর্যাদা লাভ করে এবং তারা রেডিও (বিশেষ করে রোজার সময়) এবং টেলিভিশনে নিয়মিত অনুষ্ঠান করে। একই সময়ে ‘আমেরিকান আইডল’ ও ‘ফেস্টিভ্যাল নাশিদ ইন্দোনেশিয়া’ প্রোগ্রামের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা গানের প্রতিযোগিতা টেলিভিশনে প্রচুর দর্শকপ্রিয়তা অর্জন করে। তবে অনেকে যুক্তি দেন, ইসলামী জনপ্রিয় সংস্কৃতির এসব নতুন শৈলী পশ্চিমা জনপ্রিয় সংস্কৃতির সমতুল্য।

যা-ই হোক, দুই দশক ধরে মালয়েশিয়ায় ইসলামী আধুনিকতাবাদীদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উপস্থিতি লক্ষ করা গিয়েছে। তারা ভিন্নভাবে আধুনিকতার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করছে। তারা এমন একটি সংস্কৃতি উপস্থাপন করছে, যা আধুনিক ও ইসলামিক। তাদের জন্য সংগীত কেবল ইসলামের বাক্য ছড়িয়ে দেয়ার ক্ষেত্রেই নয়, বরং তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, ইসলাম এমন একটি ধর্ম, যা আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে।

ইন্দোনেশিয়ার নাশিদ সংগীত দলের মধ্যে আরো বৈচিত্র্য রয়েছে, যেমন ‘ইজ্জাতুল ইসলাম’ (Izzatul Islam) এবং ‘শটুল হারোকাহ’ (Shotul Haroqah)-এর মতো মার্কিন বীরত্বপূর্ণ সংগীত এবং ‘স্নাডা’ (Snada)-এর মতো পপ সংগীত। তবে মালয়েশিয়ায় নাশিদ সংগীতের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, ইন্দোনেশিয়ার নাশিদ বয়-ব্যান্ডগুলো জনসাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য লড়াই করছে। হয়তো তার জন্য দায়ী অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নীতিনির্ধারণ ও বিভিন্ন কর্মকাণ্ড।

শেষ কথা

বর্তমান শতাব্দীর শুরু থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়, বিশেষ করে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে নাশিদ বা ইসলামী সংগীত, গান বা গজল এক শ্রেণীর ইসলামপন্থী যুবকদের মন-মস্তিষ্কে গেঁথে গিয়েছে। তারা এগুলো নিয়ে নিজেদের ব্যস্ত রাখে। কথিত ইসলামী সংগীত বা গান ছাড়া তাদের জীবন যেন স্থবির। ফলে তরুণদের মধ্যে নাশিদ সংগীতকে রীতিমতো একটি শিল্প বা প্রফেশন হিসেবে গ্রহণ করার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। ফলে সেখানে গড়ে তোলা হচ্ছে নানা শিল্পীগোষ্ঠী। বিভিন্ন ইসলামী অনুষ্ঠান, এমনকি বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে আনা হচ্ছে ভাড়া করা কথিত নাশিদ সংগীতশিল্পী। এছাড়া বর্তমানে নাশিদ সংগীতের বিভিন্ন ব্যান্ড দল কনসার্ট পরিবেশন করছে। ইউটিউবে এসব গান ও গজলের ভিউ সংখ্যা অকল্পনীয়। তাই বর্তমানে দেখা যায়, নাশিদ সংগীত প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে সতর্কতার সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করে চলেছে এবং তার জন্য ইসলামী বিশ্বজুড়ে এত আলোচিত হচ্ছে।

 

ফজল হাসান: লেখক ও অনুবাদক