ইতিহাস সবাইকে
অধিকার দেয়
না। বিজয়ীদের
দ্বারা ইতিহাস
লিখিত হয়—এ
তো সবারই
জানা কিন্তু
বিজয়ী পক্ষে
থাকার পরও
ইতিহাসের পাতায়
অনেকেই স্থান
পায় না।
এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক
বা স্থানীয়
রাজনীতির প্রভাব
থাকতে পারে।
কখনো কখনো
সামাজিক বা
ধর্মীয় কারণেও
তারা আড়ালে
পড়ে যান।
ভারতের ইতিহাসে
ঝাঁসির রানী
লক্ষ্মীবাই জায়গা
করে নিয়েছেন
কিন্তু তার
পাশেই ব্রিটিশদের
বিরুদ্ধে লড়ে
যাওয়া ঝলকারি
বাইয়ের নাম
ইতিহাস মনে
রাখেনি। এর
কারণ হিসেবে
তার সামাজিক
অবস্থান একটি
অন্যতম কারণ।
দলিত হওয়ার
কারণে ব্রাহ্মণ
বা অন্যান্য
ইতিহাসবিদ তার
কথা উল্লেখ
করেননি। পরবর্তী
সময়ে ঝলকারির
নাম কোথাও
না কোথাও
এসেছে কিন্তু
তার সম্পর্কে
বিস্তারিত আর
জানা যায়
না। পুপলার
কালচারে এ
ধরনের চরিত্রগুলো
স্থান পায়
না তবে
একাধিক সিনেমায়
ছোট করে
এসেছে ঝলকারি
প্রসঙ্গ।
বলিউডে ও
সমগ্র ভারতে
পিরিয়ড ফিল্ম
তৈরির একটি
আগ্রহ দেখা
যাচ্ছে। সে
সূত্রেই ২০১৯
সালে মুক্তি
পায় মণিকর্ণিকা: দ্য
কুইন অব
ঝাঁসি।
কঙ্গনা রানাওয়াত
পরিচালিত ও
অভিনীত সিনেমায়
ঝাঁসির রানীর
প্রসঙ্গটি এসেছে।
তিনি কীভাবে
ঝাঁসিকে নিজের
করে নিয়েছিলেন
এবং ব্রিটিশদের
বিরুদ্ধে লড়েছিলেন,
সিনেমায় সে
গল্পটি পাওয়া
যায়। এ
সিনেমায় লক্ষ্মীবাইয়ের
পাশে এসেছে
ঝলকারির কথা।
চরিত্রটিতে অভিনয়
করেছেন অঙ্কিতা
লোখান্ডে। সিনেমাতেও
তাকে দলিত
নারী হিসেবেই
দেখানো হয়েছে।
অর্থাৎ ইতিহাসের
এ জায়গায়
ঐতিহাসিক সত্যতা
রক্ষা করেছে
সিনেমাটি। কিন্তু
ইতিহাস যেমন
ঝলকারিকে খুব
বেশি জায়গা
দেয়নি, এ
সিনেমায়ও ঝলকারি
ততটা জায়গা
পাননি।
ঝলকারির শুরুটা
হয় ব্রিটিশদের
অত্যাচার দেখানোর
মধ্য দিয়ে।
সিনেমার ঝলকারির
সময় কাটে
তার গাই
নিয়ে। ব্রিটিশ
সৈন্যরা তার
আদরের প্রাণীটি
নিয়ে নিতে
চাইলে সে
প্রতিবাদের চেষ্টা
করে। কিন্তু
প্রতিরোধ করা
সম্ভব হয়
না। সে
পরিস্থিতিতে লক্ষ্মীবাইয়ের
আগমন। তিনি
রীতিমতো যুদ্ধ
করে সৈন্যদের
হাত থেকে
প্রাণীটিকে রক্ষা
করেন। এরপর
লক্ষ্মীবাইকে ঝলকারি
তার গৃহ
প্রাঙ্গণে আমন্ত্রণ
জানান। সেখানে
বসলে রানীকে
কী দিয়ে
আপ্যায়ন করবে
এ নিয়ে
মুশকিলে পড়ে
যান ঝলকারি।
লক্ষ্মীবাইয়ের তৃষ্ণা
নিবারণের জন্য
এক ঘটি
দুধ একটি
টুলের ওপর
রেখে নিবেদন
করে ঝলকারি।
লক্ষ্মী জানতে
চান ঝলকারি
সব সময়ই
এভাবে তার
অতিথিদের আপ্যায়ন
করে কিনা।
এরপর ঝলকারি
ঘটিটি সরাসরি
লক্ষ্মীর হাতে
তুলে দেয়।
এ দৃশ্যের
মাধ্যমে খুব
অল্প সময়
ও চেষ্টার
মাধ্যমে দলিতদের
অবস্থাটা বুঝিয়ে
দেন নির্মাতা।
অর্থাৎ একজন
দলিত যেকোনো
সময়ে তার
অবস্থান ও
অধিকার নিয়ে
সন্দেহে থাকেন।
দলিতদের ছোঁয়া
নিষিদ্ধ। তারা
উঁচু বর্ণের
মানুষকে অন্ন-জল
দিতে পারেন
না। অন্যান্য
নাগরিক সুবিধার
কথা তো
বাদ। এখানে
মণিকর্ণিকা তথা
লক্ষ্মীবাইকে বড়
করে দেখানোর
একটি চেষ্টা
নিঃসন্দেহে দেখা
যায় কিন্তু
দলিতদের অবস্থানও
স্পষ্ট। লক্ষ্মীবাইকে
নিয়ে যারাই
লিখেছেন তাদের
লেখায় ঝলকারির
প্রসঙ্গ আসেনি
বা এলেও
তা সামান্য।
সে হিসেবে
মণিকর্ণিকা সিনেমার
রচয়িতা, নির্মাতারা
তাকে বেশি
গুরুত্ব দিয়েছেন
কিন্তু তাও
আসলে মাত্র
৫ থেকে
৭ মিনিট।
এর মধ্যে
একটি আইটেম
সংও রয়েছে।
সেটা কতটা
ঝলকারির স্মরণে
আর কতটা
সিনেমার স্বার্থে
তা বলিউড
নিয়ে আগ্রহীদের
আলাদা করে
বলে দিতে
হয় না।
ঝলকারি বাই
সম্পর্কে জনমনে
ধারণা নেই
বললেই চলে।
উদাহরণ হিসেবে
এ সিনেমায়
ঝলকারির চরিত্রে
অভিনয় করা
অঙ্কিতা লোখান্ডের
কথাই ধরা
যাক। তিনি
এক সাক্ষাত্কারে
বলেছেন যে
এ সিনেমায়
অভিনয় করার
প্রস্তাব পাওয়ার
আগে ঝলকারি
বাই সম্পর্কে
তার কোনোরূপ
ধারণা ছিল
না। এ
সিনেমার মাধ্যমেই
তিনি ঝলকারি
নাম ও
তার বীরত্বের
সম্পর্কে জানতে
পারেন। ঝলকারির
চরিত্রে অঙ্কিতাকে
বুন্দেলখন্ডের স্থানীয়
সাজ দেয়া
হয়েছিল। সেখানে
ঝাঁসির অন্যান্য
যেকোনো নারীর
মতোই তাকে
দেখা যায়।
অবশ্য ঝলকারির
দৈনন্দিন জীবন
ও তার
বাড়িঘর, সব
মিলিয়ে তার
সামাজিক অবস্থান
সম্পর্কে একটি
ধারণা দিয়েছেন
সিনেমার নির্মাতারা।
এ অংশটুকু
বাদে সিনেমায়
ঝলকারির একটি
সিকোয়েন্স রয়েছে।
সেখানে ঝলকারিকে
ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর
সঙ্গে লড়তে
দেখা যায়।
সিকোয়েন্সটি খুব
বেশি বড়
নয়। বিস্তারে
ঝলকারিকে প্রকাশ
করা হয়নি।
তিনি ব্রিটিশ
সৈন্যদের হাতে
ধৃত হন
এবং একটি
বারুদের বস্তা
বিস্ফোরণ ঘটান।
ফলে বেশকিছু
সৈন্যের মৃত্যু
হয়। এর
মধ্যখানে ঝলকারির
সঙ্গে মণিকর্ণিকা
অর্থাৎ লক্ষ্মীবাইয়ের
যোগাযোগের কিছু
সূত্র পাওয়া
যায়। লক্ষ্মী
উঁচু বর্ণের
কিন্তু দলিত
হলেও মানুষ
হিসেবে তিনি
তাদের সম্মান
করতেন। সম্মান
দিতেন বলেই
ঝলকারি লক্ষ্মীর
পাশে থেকে
যুদ্ধ করতে
পেরেছেন—সিনেমায়
এমন একটি
বার্তা দেয়া
হয়। এতে
যতখানি না
ঝলকারিকে উপস্থাপন
করা হয়
তারচেয়ে লক্ষ্মীবাই
ও ঝাঁসি
মুখ্য হয়ে
ওঠে।
ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে
লক্ষ্মীবাই যুদ্ধ
করেছিলেন কেননা
সেখানে তার
কিছু স্বার্থ
ছিল। তিনি
ঝাঁসির রানী।
কিন্তু ঝলকারি
কেন এ
যুদ্ধে নিজেকে
নিবেদন করলেন?
এর পেছনে
লক্ষ্মীর প্রতি
ঝলকারির কোনো
দায়বদ্ধতা বা
কৃতজ্ঞতা ছিল
কিনা তা
স্পষ্ট নয়।
সিনেমায় তা
স্পষ্ট করার
চেষ্টাও করা
হয় না।
তবে ঝলকারি
সম্পর্কে খুব
বেশি না
জানলেও চরিত্রটির
প্রতি সুবিচার
করেছেন অঙ্কিতা।
ঝলকারির চরিত্রের
যে দৃঢ়তার
কথা ইতিহাস
থেকে জানা
যায় তা
অঙ্কিতার অভিব্যক্তিতে
প্রকাশ পেয়েছে।
যে সামান্য
সময় তিনি
অভিনয় করেছেন
সে সময়ের
মধ্যেই তিনি
চরিত্রের তীব্রতা
ধরতে পেরেছেন
ও তা
প্রকাশ করেছেন,
যে কারণে
সিনেমায় অঙ্কিতাকে
দেখার পর
ঝলকারি সম্পর্কে
দর্শকের আগ্রহ
জাগে।
ঝলকারি সম্পর্কে
দলিতদের সাহিত্যে
কিছু কিছু
উল্লেখ আছে।
যেমন জগন্নাথ
প্রসাদ শাক্য
তার কবিতায়
ঝলকারির বীরত্ব
সম্পর্কে বলেছেন।
যুদ্ধে ঝলকারি
বীরত্ব প্রদর্শন
করেছেন এবং
জগন্নাথের মতে,
তার মধ্যে
পৌরুষ প্রকাশ
পেয়েছে। জগন্নাথের
বলা এ
পৌরুষের সঙ্গে
পুরুষত্বের যোগ
নেই। এখানে
ঝলকারির বীরত্ব
বোঝানো হয়েছে।
কবি স্পষ্ট
বলেছেন, ‘রানী
কি তু
সাথি বান
কার, ঝাঁসি
ফাতাহ কারানি
থি’।
অর্থাৎ রানীর
সাথী হয়ে
ঝাঁসি জয়
করতে চেয়েছিলেন
ঝলকারি।
ইতিহাসের মতো
পপুলার কালচারে
স্বাভাবিকভাবেই মূল
চরিত্রের নাম
ও গুণকীর্তন
বারবার আসে।
ইতিহাসের নানা
‘ইভেন্ট’
ও ব্যক্তি
নিয়ে আলোচনা
হয় আর
বর্তমানে সিনেমা
তাদেরকে মুখ্য
করে তৈরি
হয়। ঝাঁসির
রানীকে উপস্থাপনের
ক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদী
একটি ন্যারেটিভ
নেয়া হয়
এবং এ
কারণে তাকে
নিয়ে সিনেমার
অভাব হয়নি।
১৯৫৩ সালে
সোহরাব মোদীর
মতো নির্মাতা
তাকে নিয়ে
যেমন সিনেমা
তৈরি করেছেন,
গত দশকে
ভারতে তৈরি
হয়েছে একাধিক
সিনেমা ও
টেলিভিশন সিরিজ।
সেখানে ঝলকারিকে
খুঁজতে হলে
আতশ কাচ
নিতে হয়।
এর মধ্যে
মণিকর্ণিকা বাদে
২০১৯ সালে
নির্মিত দ্য ওয়ারিয়র কুইন অব
ঝাঁসিতে
ঝলকারিকে পাওয়া
যায়। এ
সিনেমায় ঝলকারির
চরিত্রে অভিনয়
করেছিলেন অরোশিকা
দে। অঙ্কিতা
লোখান্ডের মতোই
তিনিও সিনেমা
করার আগে
ঝলকারি সম্পর্কে
কিছুই জানতেন
না। একটি
সাক্ষাত্কারে তিনি
বলেন, ‘সিনেমাটি
করতে গিয়ে
আমি তার
বীরত্বের কথা
জানতে পারি।
যে সাহসিকতার
সঙ্গে তিনি
যুদ্ধ করেছিলেন
এবং ঝাঁসির
রানীর ছদ্মবেশ
নিয়ে তাকে
বাঁচিয়েছিলেন তা
অনুসরণীয়। আমি
তার গল্পটা
দর্শককে বলতে
চাই।’
এমন ছোট
ছোট অংশেই
আছেন ঝলকারি,
বড় একটি
ঘটনার পার্শ্বচরিত্র
হয়ে। রানীকে
নিয়ে তৈরি
সিনেমা বা
সিরিজে তার
সরাসরি উল্লেখ
কম। কিছু
কিছু সিনেমায়
তার ছায়া
অবলম্বনে অন্য
নামে চরিত্র
তৈরি করা
হয়েছে। অর্থাৎ
রুপালি পর্দায়ও
তাকে খুব
বেশি স্থান
দেয়া হয়নি।
ছদ্মবেশ নিয়ে
রানীকে রক্ষা
করার গল্পটা
বলার জন্য
ঝলকারিকে তৈরি
করা হয়েছে
লক্ষ্মীবাইয়ের মতো
করে। অর্থাৎ
রক্ষিত হয়নি
ঝলকারির স্বাতন্ত্র্য।
তবে মণিকর্ণিকা
যতটুকু জায়গা
তাকে দিয়েছে,
ইতিহাসে বা
পপুলার কালচারে
এর আগে
ঝলকারি তা
পাননি। সেখান
থেকে বলা
যায়, সিনেমায়
ঝলকারির উল্লেখ
বা উপস্থাপনা
তাকে জনমানুষের
কাছে পরিচয়
করিয়ে দিয়েছে।
পরবর্তী সময়ে
তাকে নিয়ে
আলোচনার পথ
সুগম হলো
এর মাধ্যমে।
আসরার আবেদিন: প্রাবন্ধিক





