অবিভক্ত ভারতে
১৮৫৭ সালের
যুদ্ধ ছিল
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক
শাসনের বিরুদ্ধে
বিদ্রোহ, যা
প্রথম স্বাধীনতাযুদ্ধ
হিসেবে চিহ্নিত
করা হয়।
সে সংঘর্ষের
বিশেষত্বের মধ্যে
ছিল ইস্ট
ইন্ডিয়া কোম্পানির
কাছ থেকে
অবিভক্ত ভারতের
স্বাধীনতা অর্জন
করা এবং
ব্রিটিশদের শোষণের
বিরুদ্ধে সমাজের
সব অংশের
জনগণকে একত্রিত
করা।
সেই প্রথম
স্বাধীনতাযুদ্ধে অচ্ছুত
দলিত সম্প্রদায়ের
এক কিংবদন্তি
ও দুঃসাহসিক
নারী যোদ্ধা
ছিলেন ঝলকারি
বাই। তিনি
ছিলেন ঝাঁসির
রানী লক্ষ্মীবাইয়ের
উপদেষ্টা ও
নারী সেনাবাহিনীর
কমান্ডার। তিনি
সিপাহি যুদ্ধে
লক্ষ্মীবাইয়ের ছদ্মবেশ
ধারণ করে
খুবই গুরুত্বপূর্ণ
ভূমিকা রেখেছিলেন
এবং সাহসিকতার
সঙ্গে লড়াই
করে শহীদ
হন। কিন্তু
দলিত সম্প্রদায়ের
হওয়ায় তার
মহান আত্মত্যাগ
ও অবদানের
কথা যথার্থভাবে
ইতিহাসের পাতায়
স্থান পায়নি।
উল্লেখ্য, তিনি
ছাড়া সে
বিদ্রোহে আরো
কয়েকজন দলিত
নারীর গুরুত্বপূর্ণ
অংশগ্রহণ ছিল
এবং তারা
সবাই শহীদ
হয়েছেন। ঝলকারি
বাইয়ের মতো
দলিত সম্প্রদায়ের
হওয়ার কারণে
সেসব বীরাঙ্গনাও
(সাহসী নারী
যোদ্ধা) ইতিহাসে
উপেক্ষিত।
এ নিবন্ধে
ঝলকারি বাই
ও অন্য
কয়েকজন বীরাঙ্গনার
সংক্ষিপ্ত পরিচিতির
সঙ্গে কেন
তারা উপেক্ষিত
এবং ইতিহাসের
পাতায় অনুপস্থিত,
সে প্রসঙ্গে
আলোচনা করা
হয়েছে।
সিপাহি যুদ্ধে ঝলকারির অবদান
নিঃসন্দেহে
ঝলকারি বাই
ছিলেন বুদ্ধিমতী
ও অনন্যা।
তিনি ঝাঁসির
রানী লক্ষ্মীবাইয়ের
নারী সেনাবাহিনীর
একজন নিম্ন
পদমর্যাদার সৈনিক
ছিলেন। কিন্তু
অসীম সাহসিকতার
জন্য তিনি
অল্প সময়ের
মধ্যে রানীর
বিশ্বস্ত সহযোগী
ও পরামর্শদাতাদের
মধ্যে একজন
হয়ে ওঠেন।
এছাড়া তিনি
রানীর বিশেষ
নারী বাহিনী
‘দুর্গা
দল’-এর
সেনা কর্মকর্তা
হিসেবে নিজেকে
প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন
এবং প্রায়ই
রানীর পক্ষ
থেকে গুরুত্বপূর্ণ
সিদ্ধান্ত নিতেন।
যখন ১৮৫৭
সালের বিদ্রোহ
শুরু হয়,
তখন স্থানীয়
শাসকরা বেশির
ভাগই তাদের
সিংহাসন বাঁচাতে
উদগ্রীব ছিল
এবং তাদের
জন্য সেই
বিদ্রোহ স্বাধীনতা
সংগ্রাম ছিল
না। অচ্ছুত
নিম্ন সম্প্রদায়
দলিতরাই বিদ্রোহকে
স্বাধীনতা সংগ্রামে
পরিণত করেছিল।
ব্রিটিশরা যখন
ঝাঁসির দুর্গ
অবরোধ করে,
তখন ঝলকারি
বাই অসীম
সাহসিকতার সঙ্গে
লড়াই করেছিলেন
এবং তার
নিজের সেনাবাহিনীকে
নির্দেশনা দিয়েছেন।
তিনি রানীর
ছদ্মবেশ ধারণ
করেছিলেন, কেননা
তার শরীরের
গঠন ও
চেহারা রানী
লক্ষ্মীবাইয়ের মতো
ছিল।
যাহোক, সিপাহি
যুদ্ধের চরম
সময়ে ঝলকারি
বাই যে
কাজ করে
সবচেয়ে বেশি
পরিচিতি লাভ
করেছেন, তা
ছিল রানীকে
ছোট সন্তানসহ
রাজপ্রাসাদ থেকে
পালিয়ে যাওয়ার
সুযোগ করে
দেয়া এবং
জীবনের ঝুঁকি
নিয়ে রানীর
অনুস্থিতিতে যুদ্ধ
পরিচালনার দায়িত্ব
গ্রহণ করা।
এছাড়া তিনি
রানীর পাশাপাশি
যুদ্ধের বিশ্লেষণ
ও কৌশল
তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ
ভূমিকা পালন
করেছিলেন।
আরো যত
দলিত বীরাঙ্গনা
সিপাহি
যুদ্ধে নিম্ন
বর্ণের অসংখ্য
নারী সৈনিক
ছিলেন, যারা
উঁচু শ্রেণীর
ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের
মতে অচ্ছুত।
এরা দলিত
সম্প্রদায়ের ‘বীরাঙ্গনা’
নামে পরিচিত।
তাদের অনেকের
নামের শেষে
দেবী বা
বাই রয়েছে।
তারা অত্যন্ত
নৈতিক, প্রচণ্ড
সাহসী ও
তুখোড় জাতীয়তাবাদী
দলিত নারী
হিসেবে পরিচিতি
লাভ করেছিলেন।
বলা হয়,
তারা ছিলেন
অসীম শক্তির
প্রতীক। তাদের
মধ্যে কোরি
গোষ্ঠীর ঝলকারি
বাই, উদা
দেবী (পাসি
গোষ্ঠী), অবন্তি
বাই (লোদি
গোষ্ঠী), মহাবিরি
দেবী (ভাঙি
গোষ্ঠী) ও
আশা দেবী
(গুরজারি গোষ্ঠী)
উল্লেখযোগ্য।
ইতিহাস থেকে
জানা যায়,
সাহসী যোদ্ধাদের
মধ্যে কেউ
কেউ কোনো
নির্দিষ্ট দলিত
সম্প্রদায়ের কাছে
গর্বের প্রতীক
হিসেবে পরিচিতি
লাভ করেছেন।
যেমন উদা
দেবী পাসি
গোষ্ঠীর কাছে
সমাদৃত ও
শ্রদ্ধেয়। তিনি
পাসি গোষ্ঠীর
সম্মান, মর্যাদা,
গর্ব, সংহতি
ও অধিকারের
প্রতীক হিসেবে
আবির্ভূত হয়েছেন।
অন্যদিকে ঝলকারি
বাইকে সব
দলিত সম্প্রদায়ের
প্রতিনিধি হিসেবে
প্রশংসা করা
হয়েছে। তিনি
সব গোষ্ঠীভিত্তিক
বিভাজন নির্বিশেষে
দলিত সম্প্রদায়ের
ঐক্য ও
সাহসিকতার প্রতীক
হয়ে উঠেছেন।
যেহেতু ঝলকারি
বাই সম্পর্কে
আগেই বলা
হয়েছে, তাই
নিচে অতি
সংক্ষেপে অন্য
কয়েকজন বীরাঙ্গনার
পরিচয় দেয়া
হলো।
অবন্তি বাই
রামগড়ের
রানী ছিলেন
এবং মধ্যপ্রদেশের
মান্ডলা জেলার
লোধি সম্প্রদায়ে
জন্মগ্রহণ করেন।
তিনি ১৮৫৭
সালে ব্রিটিশদের
নিপীড়নের শিকার
হন। প্রতিশোধ
নেয়ার জন্য
তিনি সিপাহি
যুদ্ধে তীব্রভাবে
লড়াই করেন।
যখন ব্রিটিশ
সৈন্যরা তাকে
ঘিরে ফেলেছিল,
তখন তিনি
আত্মসমর্পণ করার
পরিবর্তে আত্মঘাতী
হওয়ার সিদ্ধান্ত
নেন। শেষ
মুহূর্তে তার
কামনা ছিল,
ব্রিটিশরা ভারতের
মাটি ছেড়ে
তাদের দেশে
ফিরে যাক।
উদা দেবী
লক্ষৌর
উজারিয়াওন গ্রামে
জন্মগ্রহণ করেন।
তিনি মাক্কা
পাসির সঙ্গে
বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ
হন। মাক্কা
পাসি ছিলেন
বেগম হযরত
মহলের সেনাবাহিনীর
একজন সৈনিক।
ব্রিটিশ প্রশাসনের
বিরুদ্ধে ভারতীয়
জনগণের ক্রমবর্ধমান
ক্রোধের উদ্গীরণে
শামিল হয়ে
উদা দেবী
যুদ্ধে তালিকাভুক্ত
হওয়ার উদ্দেশ্যে
রানী বেগম
হযরত মহলের
কাছে যান
এবং রানীর
সহযোগী হয়ে
ওঠেন। রানীর
আন্তরিক সহযোগিতায়
তিনি নারী
সেনাবাহিনী গঠন
করে নিজে
কমান্ডারের দায়িত্ব
গ্রহণ করেন।
ব্রিটিশরা যখন
অওধ আক্রমণ
করে, তখন
তিনি ও
তার স্বামী
সশস্ত্র প্রতিরোধে
শামিল হন।
তার স্বামী
চিনহাটের যুদ্ধে
শহীদ হন
এবং উদা
দেবী প্রতিশোধ
নেয়ার সিদ্ধান্ত
নেন। পরবর্তী
সময়ে ১৮৫৭
সালের নভেম্বরে
সিকান্দার বাগের
যুদ্ধে উদা
দেবী অংশগ্রহণ
করেন। সিকান্দার
বাগ আক্রমণ
করেছিলেন ব্রিটিশ
সেনাপতি ক্যাম্পবেল।
তিনি দলিত
নারীদের বাহিনীর
আক্রমণের মুখে
পড়েছিলেন। এ
নারী যোদ্ধাদের
নিয়ে লোকমুখে
প্রচলিত আছে—
কোই উনকো
হাবসি কেহতা,
কো-ই
কেহতা নীচ
অচ্ছুত।
অবলা কোই
উনহে বাতলায়ে,
কোই কাহে
উনহে মজবুত।
(কেউ তাদের
বলে কৃষ্ণাঙ্গ
আফ্রিকান নারী,
কেউ বলে
অচ্ছুত। কেউ
বলে তারা
দুর্বল, আর
কেউ বীর)
উদা তার
ব্যাটালিয়নকে নির্দেশ
দেয়ার পরে
একটি পিপুল
গাছে চড়েন
এবং ব্রিটিশ
সৈন্যদের লক্ষ্য
করে গুলি
চালান। কথিত
আছে, তার
গুলিতে ৩২
জন (কারোর
মতে ৩৬
জন) ব্রিটিশ
সৈন্য নিহত
হয়। শেষ
পর্যন্ত ব্রিটিশ
সৈনিকরা তাকে
গুলি করে
হত্যা করে।
মহাবিরি দেবী
মুজফফরনগর জেলার মুন্ডভর গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। যদিও তিনি অশিক্ষিত ছিলেন, কিন্তু তিনি ছিলেন খুবই বুদ্ধিমতী ও প্রচণ্ড সাহসী। তিনি অল্প বয়স থেকেই যেকোনো ধরনের শোষণের বিরোধিতা করতেন। ব্রিটিশদের আক্রমণ করার জন্য তিনি ১৮৫৭ সালে ২২ জন মহিলা নিয়ে একটি দল গঠন করেন। তিনি সহযোদ্ধাদের নিয়ে সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলেন এবং বেশ কয়েকজন ব্রিটিশ সৈন্যকে হত্যা করেছিলেন। অবশেষে তিনি ও তার সহযোদ্ধা সবাই শহীদ হন।
আশা দেবী
১৮৫৭
সালের ৮
মে বাল্মীকি
মহাবিরি দেবী,
রহিমি গুরজারি,
ভগবতী দেবী,
হাবিবা গুরজারি,
ইন্দ্রকৌর, কুশল
দেবী, নামকৌর,
রাজকৌর, রণবীরি
বাল্মীকি, সেহেজা
বাল্মীকি ও
শোভা দেবীর
মতো অনেক
নারী সৈনিক
নিয়ে ব্রিটিশ
সেনাবাহিনীকে আক্রমণ
করেছিলেন এবং
যুদ্ধের ময়দানে
তিনি মারা
যান।
ইতিহাসে উপেক্ষিত ঝলকারি বাই
ও অন্যান্য বীরাঙ্গনা
যদিও
ওপরে উল্লেখিত
দলিত সম্প্রদায়ের
বীরাঙ্গনারা ‘সুপারওম্যান’,
সাহসিকতায় পূর্ণ
এবং ‘অসম্ভব’
কাজ করার
জন্য দক্ষ
কর্মী হিসেবে
নিজেদের পরিচয়
দিয়েছেন, কিন্তু
সিপাহি যুদ্ধে
তাদের আত্মত্যাগ
ও অবদান
ইতিহাসের পাতায়
উপেক্ষিত এবং
রীতিমতো অনুপস্থিত।
পরিতাপের বিষয়,
১৮৫৭ সালের
সিপাহি যুদ্ধের
বীর নারী
যোদ্ধাদের কথা
বললে প্রথমেই
মনে আসে
ঝাঁসির রানী
লক্ষ্মীবাই ও
পদচ্যুত নবাব
ওয়াজিদ আলী
শাহের স্ত্রী
বেগম হযরত
মহলের নাম।
কেননা তাদের
দুজনের নাম
ব্রিটিশ তালিকায়
অন্তর্ভুক্ত ছিল।
তবে কি
তারা দুজনই
সিপাহি যুদ্ধের
বীর নারী
মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন?
না, সিপাহি
যুদ্ধে শুধু
তারা দুজন
নারী যোদ্ধা
ছিলেন না।
রানী লক্ষ্মীবাই
ও বেগম
হযরত মহল
ছাড়াও সিপাহি
যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী
দলিত সম্প্রদায়ের
অসংখ্য অদম্য
সাহসী বীরাঙ্গনা
মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন,
কিন্তু তাদের
আত্মত্যাগ যথার্থভাবে
ইতিহাসে উল্লেখ
করা হয়নি।
তবে ১৮৫৭
সালের দলিত
সম্প্রদায়ের বিভিন্ন
আখ্যান সাধারণত
দলিত পুরুষরা
আবেগপূর্ণ ভাষা
প্রয়োগ করে
রচনা করেছেন।
তারা কেউ
প্রশিক্ষিণপ্রাপ্ত ইতিহাসবিদ
ছিলেন না
এবং সম্পূর্ণ
গোষ্ঠীগত অনুভূতি
দ্বারা অনুপ্রাণিত
ছিলেন। এছাড়া
তাদের লেখায়
দলিত সম্প্রদায়ের
রাজনীতির অভ্যন্তরীণ
গতিশীলতাও প্রকাশ
পেয়েছে। এ
ধরনের অনুপ্রেরণামূলক
ইতিহাস লেখার
ক্ষেত্রে তাদের
অন্যতম উদ্দেশ্য
ছিল দলিত
সম্প্রদায়ের জাতীয়তাবাদ,
দেশাত্মবোধ ও
তাদের গর্বকে
উদ্দীপিত করা।
এছাড়া বিজয়ীরা
(অর্থাৎ ব্রিটিশরা)
তাদের নিজেদের
স্বার্থের সঙ্গে
খাপ খাইয়ে
নেয়ার জন্য
১৮৫৭ সালের
পরবর্তী ইতিহাস
পুনর্লিখন করেছে।
যারা তাদের
বিরুদ্ধে বিদ্রোহে
অংশ নিয়েছিল,
তাদের প্রশংসা
করা বা
মহিমান্বিত করা
অবশ্যই তাদের
এজেন্ডায় ছিল
না।
তবে আশার
বিষয়, সাম্প্রতিককালে ‘বহুজন
সমাজ পার্টি’
ঝলকারি বাইয়ের
প্রাসঙ্গিকতার ওপর
জোর দিয়ে
প্রভাবশালী ব্রাহ্মণ্যবাদী
মতাদর্শে অনুমোদিত
পৌরাণিক কাহিনীকে
উত্খাত করতে
উল্লেখযোগ্য ভূমিকা
পালন করছে।
শুধু তাই
নয়, দেশের
স্বাধীনতায় দলিত
শহীদদের অবদান
উদযাপনের মাধ্যমে
বর্তমানের শিক্ষিত
শ্রেণীর কাঠামোকে
জোরালোভাবে চ্যালেঞ্জ
করছে। উত্তর
প্রদেশে ঝলকারি
বাইয়ের জন্মদিন
‘গৌরব
দিবস’ বা
‘গর্বের
দিন’ হিসেবে
উদযাপিত হয়,
কিন্তু মূলধারার
ব্রাহ্মণ্যবাদী শিক্ষিত
সমাজ, বুদ্ধিজীবী
ও মিডিয়া
আজও দিনটিকে
উপেক্ষা করে
চলেছে।
ঝলকারি বাইয়ের মৃত্যু ও
লিগ্যাসি
ঝলকারি
বাইয়ের মৃত্যু
নিয়ে একাধিক
মতবাদ চালু
আছে। অনেকে
মনে করেন,
সিপাহি যুদ্ধের
সময় (১৮৫৮
সালের ৪
এপ্রিল) হঠাৎ
একাধিক বুলেট
এসে তাকে
আঘাত করে।
তিনি শহীদ
হন এবং
তার আসল
পরিচয় কখনই
প্রকাশ করা
হয়নি।
অন্যদিকে ঐতিহাসিকরা
মনে করেন
রানী লক্ষ্মীবাইকে
দুর্গ থেকে
নিরাপদে সরিয়ে
দেয়ার পরে
তিনি ব্রিটিশ
সৈনিকদের হাতে
ধরা পড়েন
এবং পরবর্তী
সময়ে তাকে
ছেড়ে দেয়া
হয়। তিনি
১৮৯০ সালে
মারা যান।
আজ ঝলকারি
বাই নেই,
কিন্তু তার
লিগ্যাসি রয়ে
গেছে। কেননা
তার সম্প্রদায়ের
মানুষ এখনো
তাকে সম্মানের
সঙ্গে স্মরণ
করে। বুন্দেলখণ্ডের
লোকগান ও
লোককাহিনীতে এখনো
ঝলকারি বাইয়ের
গল্প শোনা
যায়। এছাড়া
বর্তমানে ভারতে
সরকারি ও
বেসরকারি পর্যায়ে
সিপাহি যুদ্ধে
ঝলকারি বাইয়ের
দুঃসাহসিক অংশগ্রহণ,
অবদান ও
ত্যাগকে স্বীকৃতি
ও যথাযোগ্য
মর্যাদা দেয়া
হচ্ছে। নিচে
কয়েকটি উদাহরণ
দেয়া হলো:
n ভারতের
সদ্য সাবেক
হওয়া রাষ্ট্রপতি
রামনাথ কোবিন্দ
২০১৭ সালে
ভোপালের গুরু
তেগ বাহাদুর
চত্বরে ঝলকারি
বাইয়ের মূর্তি
উন্মোচন করেন।
এছাড়া আগ্রা
ও গোয়ালিয়রেও
তার মূর্তি
স্থাপন করা
হয়েছে।
n কথিত
আছে, ব্রিটিশ
জেনারেল হিউ
রোজ ছদ্মবেশের
আড়ালে ঝলকারি
বাইকে চিনতে
না পেরে
খুশি হচ্ছিল
এই ভেবে
যে, অবশেষে
ঝাঁসির রানী
তাদের মুঠোয়
বন্দি হয়েছে।
জেনারেল রোজ
প্রশ্ন করেছিলেন,
‘এখন
তোমাকে কী
করা উচিত?’
ঝলকারি বাই
চোখে চোখ
রেখে উত্তর
দিয়েছিলেন, ‘আমাকে
ফাঁসি দিন।’
এতে জেনারেল
তার সাহসিকতার
প্রশংসা করে
বলেছিলেন, ‘ভারতে
যদি তোমার
মতো ১
শতাংশ নারী
থাকে, তাহলে
ব্রিটিশদের ভারত
ছেড়ে চলে
যেতে হবে।’
n ২০০১
সালে ভারত
সরকারের ডাক
ও টেলিগ্রাফ
বিভাগ ঝলকারি
বাইকে চিত্রিত
করে একটি
ডাকটিকিট প্রকাশ
করেছে।
n ঝলকারি
বাইয়ের স্মরণে
আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে
অব ইন্ডিয়া
ঝাঁসি দুর্গের
অভ্যন্তরে অবস্থিত
পঞ্চ মহলে
জাদুঘর স্থাপন
করছে।
n বিভিন্ন
কোরি সংগঠন
ঝলকারি বাইয়ের
মৃত্যুবার্ষিকীকে শহীদ
দিবস হিসেবে
পালন করে।
n বুন্দেলখণ্ডকে
পৃথক রাজ্য
হিসেবে প্রতিষ্ঠিত
করার আন্দোলনের
সময় বুন্দেলি
পরিচয় স্থাপন
করার জন্য
ঝলকারি বাইয়ের
কিংবদন্তিকে ব্যবহার
করেছে।
n রামচন্দ্র
হেরানের ‘মাতাতি’
উপন্যাসে (১৯৫১
সালে প্রকাশিত)
তাকে ‘বীর
ও সাহসী
শহীদ’ হিসেবে
চিত্রিত করা
হয়েছে।
n ঝলকারি
বাইয়ের জীবনী
প্রথম রচনা
করেন ভবানী
শঙ্কর বিশারদ,
যা ১৯৬৪
সালে প্রকাশিত
হয়।
n বিভিন্ন
গবেষক ও
জীবনকাহিনী লেখক
ঝলকারি বাইকে
রানী লক্ষ্মীবাইয়ের
সঙ্গে সমান
মর্যাদা দেয়ার
চেষ্টা করছে।
যাহোক, ঝলকারি
বাইয়ের লিগ্যাসি
সম্পর্কে লেখক
ও গবেষক
বদরি নারায়ণ
তার গ্রন্থে
(Women Heroes and Dalit Assertion in North India: Culture, Identity
and Politics, 2006) উল্লেখ
করেছেন, ‘অন্যান্য
দলিত সম্প্রদায়ের
মতো আজও
কোরি গোষ্ঠী
নিজেদের সম্প্রদায়কে
গৌরবান্বিত করার
জন্য ঝলকারি
বাইয়ের পৌরাণিক
কাহিনীকে ব্যবহার
করে। তারা
তাদের আত্মসম্মান
বাড়াতে এবং
তাদের সম্প্রদায়ের
মর্যাদা বাড়ানোর
জন্য প্রতি
বছর ঝলকারি
বাই জয়ন্তীও
উদযাপন করে।
তবে অত্যন্ত
গর্বের বিষয়,
তিনি কোরি
গোষ্ঠীর জন্মগ্রহণকারী
একজন দলিত
সম্প্রদায়ের বীরাঙ্গনা
ছিলেন এবং
তারা তার
সাহসী কাজগুলো
বর্ণনা করার
সময় বিষয়টি
প্রাধান্য দিয়ে
থাকে’ (পৃষ্ঠা
১১৯)।
শেষ কথা
ঝলকারি
বাইয়ের কিংবদন্তি
বহু দশক
ধরে বুন্দেলখণ্ডের
জনপ্রিয় স্মৃতিতে
উজ্জ্বল অধ্যায়
হয়ে আছে।
যদিও ব্রাহ্মণ্যবাদী
শক্তি ঝলকারি,
উদা দেবী
এবং মহাবিরির
মতো অন্যান্য
দলিত বীরাঙ্গনাদের
নাম ও
আখ্যানকে ভোটারদের
প্রলুব্ধ করার
জন্য গভীর
প্রচেষ্টায় ব্যবহার
ও বিকৃত
করে চলেছে,
তবে ঝলকারির
মতো দলিত
মহিলাদের প্রকৃত
মূল্য উত্তর
প্রদেশের বুন্দেলখণ্ড
অঞ্চলের লোকেরা
গান, গল্প
ও লোক
থিয়েটারের মাধ্যমে
লালন করে
আসছে।
নিঃসন্দেহে বলা
যায়, ঝলকারি
বাই ছিলেন
একজন শহীদ
ও বীরাঙ্গনা।
তাই তার
নাম সর্বোচ্চ
সম্মানে সমুন্নত
রাখা উচিত
এবং ইতিহাসের
পাতায় স্বর্ণাক্ষরে
খোদাই করে
সংরক্ষণ করা
প্রয়োজন। তিনি
ছিলেন একজন
দলিত সম্প্রদায়ের
মহিলা, যার
কোনো রাজ্য
বা প্রাসাদ
ছিল না,
কোনো ব্যয়বহুল
গহনা বা
চকচকে পোশাক
ছিল না,
তিনি রানী
বা কোনো
সামন্ত প্রভুর
কন্যা ছিলেন
না, কোনো
জাইগিরদারের স্ত্রীও
ছিলেন না,
অথচ তিনি
নিঃস্বার্থ ও
নির্ভীকভাবে স্বাধীনতার
জন্য লড়াই
করেছিলেন। তার
আত্মত্যাগ অন্য
যে কাউকে
ছাড়িয়ে যায়।
যদিও দীর্ঘ
সময় তার
নাম ইতিহাসের
পাতায় অনুপস্থিত
ছিল, তবে
বর্তমানে দেশের
স্বাধীনতার জন্য
তাকেসহ অন্যদের
দুঃসাহসিক অংশগ্রহণ,
অবদান ও
ত্যাগকে স্বীকৃতি
দিয়ে সম্মানিত
করা হচ্ছে।
আজও ঝলকারি
বাইয়ের জীবনকাহিনী
ভারতের বুন্দেলখণ্ড
অঞ্চলে বেঁচে
আছে এবং
সর্বত্র দলিত
সম্প্রদায়ের নারীদের
অনুপ্রাণিত করে।
তথ্যসূত্র:
Alok,
Nupur Preeti (2016), Jhalkari Bai: The
Indian Rebellion Of 1857 And Forgotten Dalit History, Indian Women In History,
22 November 2016.
Gupta,
Charu (2007), Dalit ‘Viranganas’ and Reinvention of 1857, Economic and
Political Weekly, 42 (19): 1739~1745.
Lakshmi
(2018), Jhalkari Bai: 5 Mysterious Facts About Another Rani Lakshmibai, Real
Bharat webmag, 14 April 2018.
Narayan,
Badri (2006), Women Heroes and Dalit
Assertion in North India: Culture, Identity and Politics, SAGE
Publications, India.
Singh,
Garima (2017), Jhalkari Bai: A forgotten
warrior who risked her life to help Rani Laxmi Bai escape, Indian Express,
14 April 2017.
Subramanian,
Aishhwariya (2017), The Other Jhansi Ki
Rani: The Woman Who Took on British Forces Disguised as Laxmibai, The
Better India, 21 April 2017.
ফজল হাসান: লেখক ও অনুবাদক





