ভারতে ইউরোপীয়দের আগমন ঘটে পঞ্চদশ শতাব্দীতে। তার বহু আগে থেকে আরবের সঙ্গে ছিল ভারতের বাণিজ্য সম্পর্ক। আরব থেকে বাণিজ্য জাহাজ ভারতে আসত এবং প্রয়োজনীয় পণ্য নিয়ে সেসব ফিরে যেত। কেবল ভারত নয়, ইউরোপের সঙ্গেও ছিল আরবের নৌ-যোগাযোগ। মূলত দীর্ঘদিন ধরেই আরব নির্ভর করে জাহাজের ওপর। যুদ্ধ এবং বাণিজ্য উভয় কারণেই জাহাজ তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। উমাইয়া আমলে বহু যুদ্ধ ঘটেছে আরবের নৌবহরের ওপর নির্ভর করে। এরপর বাণিজ্যের ক্ষেত্রে স্থলপথের তুলনায় নৌপথে পরিবহন সহজ হওয়ার কারণে সেক্ষেত্রেও জাহাজ শিল্পের দিকে মনোযোগী হয়েছিল আরব। তাই স্বাভাবিকভাবেই আরবে গড়ে উঠেছিল জাহাজ নির্মাণ কারখানা। আর জাহাজ নির্মাণ, চালনা কৌশলে যুক্ত হয় নতুন নতুন যন্ত্রপাতি।
উমাইয়া শাসনামলে আরবের নৌবাহিনী, নৌবহরের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়। ফলে এ সময়েই জাহাজ নির্মাণে বিশেষভাবে মনোযোগী হয়েছিল আরব। অবশ্য এর আগে থেকেই জাহাজ নির্মাণ হতো এবং তা নিয়ে আলাদা গবেষণাও চালু ছিল। জাহাজ মূলত তৈরি হতো বন্দরে এবং আরবের সোনালি সময়ে সব বন্দরেই জাহাজ নির্মাণের জন্য কারখানা ছিল। আরবে জাহাজ নির্মাণ কারখানার সাধারণ নাম ছিল ‘দারুস সানা’। ছোট-বড় নানা কারখানার মধ্যে পূর্বে পারস্য উপসাগরের তীরে ওবুল্লা ও সিরাফের কারখানা দুটি বিখ্যাত। সেকালে জাহাজ নির্মাণ শিল্প এতটা আধুনিক ছিল না। জাহাজ ছিল তুলনামূলক দুর্বল। ওবুল্লা ও সিরাফে জাহাজ তৈরির কিছু বিশেষত্ব ছিল। এসব জাহাজের খোলের অংশগুলো দড়ি দিয়ে বাঁধা হতো এবং জাহাজের গায়ে তেল দিয়ে পলিশ করা হতো।
উমাইয়া শাসকরা জাহাজ নির্মাণের জন্য স্পেনের আশবিলিয়া অঞ্চলে একটি কারখানা চালু করেছিল। দানিয়াতে ছিল আরেকটি কারখানা। ইতালির পালেরমোতেও জাহাজ নির্মাণ শিল্প গড়ে উঠেছিল। অন্যদিকে উত্তর আফ্রিকার জাহাজ নির্মাণের কেন্দ্র ছিল তিউনিস। সিরিয়ার উপকূল অঞ্চলের আক্কাতে থাকা কারখানাটি আব্বাসীয় আমলে সুর অঞ্চলে সরিয়ে নেয়া হয়। সুলতান সালাউদ্দিনের আমলে জাহাজ নির্মাণ শিল্পের কেন্দ্র হয়েছিল বৈরুত। মিসরও পিছিয়ে ছিল না। সেখানেও সপ্তম হিজরিতে জাহাজ নির্মাণ কারখানা চালু হয়। ফাতেমী শাসকদের সময়ে মিসরে বহু যুদ্ধজাহাজ তৈরি হয়েছে। এসব জাহাজ তৈরির জন্য কায়রো, আলেকজান্দ্রিয়া ও দামিয়াতে জাহাজ নির্মাণ কারখানা তৈরি হয়। ক্রুসেডের সময় মিসরের অন্যান্য অঞ্চলেও কারখানা স্থাপন করা হয়।
আরবের এসব জাহাজ কারখানায় প্রথমত জাহাজের খোল তৈরি হতো। জাহাজ নির্মাণের প্রথম দিকে খোলের অংশগুলো দড়ি দিয়ে বেঁধে যুক্ত করা হতো। পরবর্তী সময়ে পেরেক বা লোহার কী-লক ব্যবহার শুরু হয়। ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী অঞ্চলের কারখানাগুলোয় পেরেক ব্যবহার করা হতো। এসব লোহা পলিশে ব্যবহূত হতো কাঠকয়লা। ওবুল্লা ও সিরাফের কারখানাগুলোতেই প্রথম পেরেক ব্যবহার করা হয়। হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ এ কাজের নির্দেশনা দেন। কিন্তু এ ব্যবস্থাটি সে সময়ের নির্মাতাদের পছন্দ হয়নি। হিজরি তৃতীয় শতকের কিছু সূত্র থেকে জানা যায় সে সময় ওবুল্লা ও সিরাফের বেশির ভাগ জাহাজই পুরনো পন্থায় দড়ি দিয়েই বাঁধা হতো। এক্ষেত্রে সম্ভবত নাবিকরা কম্পাস ব্যবহারে লোহাকে একটি অসুবিধা বলে মনে করতেন।
প্রাথমিক পর্যায় বা পররর্তী সময়ে আরবে নির্মিত জাহাজগুলোর মধ্যে জানুক, বউম, সানবুক ও বাগলাহ আরবের ঐতিহ্যবাহী জাহাজ। এগুলোর নকশার ক্ষেত্রে স্টার্নের (জাহাজের পেছন দিক) গঠনে পার্থক্য রয়েছে। তবে মাস্তুলের সংখ্যা নির্দিষ্ট নয়। যেমন সানবুকে এক থেকে তিন, যেকোনো সংখ্যক মাস্তুল থাকতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জাহাজ নির্মাণে ইউরোপীয়দের অনুসরণ করা হতো। আবার আরবের বিভিন্ন অঞ্চলের জাহাজ নির্মাণ কৌশল ছিল ভিন্ন। মিসর ও কুয়েতের জাহাজের নির্মাণ এক রকম ছিল না। তবে সে সময়ে জাহাজ চালনার মাধ্যম ছিল দাঁড় ও পাল। ফলে সব ধরনের জাহাজে পাল খাটানোর ব্যবস্থা ছিল প্রায় একই ধারার।
পাল ও দাঁড়ে চালানো এ জাহাজগুলো নিয়ে অভিযানে—হোক সে যুদ্ধ অথবা বাণিজ্য—যেতে হলে জাহাজ চালনার জন্য প্রয়োজন হতো আরো কিছু অনুষঙ্গ। যেমন প্রথমেই প্রয়োজন ছিল একটি নকশা। আরবরা নকশা অঙ্কন করতেন বা পূর্বসূরিদের কাছ থেকে নকশা নিয়ে তা হালনাগাদ করে ব্যবহার করতেন। এ নকশা ও মানচিত্রগুলো কাগজ বা কাপড়ের ওপর তৈরি করা হতো। মানচিত্রগুলো তৈরি হতো অভিজ্ঞ নাবিক ও অভিযাত্রীদের হাতে। সরাসরি না হলেও তাদের তত্ত্বাবধানে এ কাজ করা হতো। কিন্তু নকশা মূলত গন্তব্যে পৌঁছানোর একটি অনুষঙ্গ। জাহাজ চালনার যন্ত্র নয়। আজকের দিনে যন্ত্র বলতে যা বোঝায় সে কালের জাহাজে তা ছিলও না। জাহাজ চালনা ও অভিযানের জন্য কিছু নিয়ম পালন করা হতো। নকশা ও পথের হদিস বাতলে দেয়া এসব অনুষঙ্গকেই সে সময় দিক নির্ণায়ক বা দিক নির্দেশক বলা হতো।
আরবরা বাতিঘরের সাহায্য নিতেন। জাহাজ চালনার সুবিধার জন্য সমুদ্রের মধ্যে বিশেষভাবে খুঁটি পোতা হতো। এর ওপরের দিকে থাকত কর্মচারীদের ঘর। সেখানে তারা রাতে বাতি জ্বালাতেন যেন বাতি অনুসরণ করে জাহাজগুলো দূর থেকে চলতে পারে। পারস্য উপসাগরেও বড় বড় খুঁটি গেড়ে তার গায়ে চিহ্ন দেয়া থাকত। আজকাল রাস্তায় যেমন ‘মাইলস্টোন’ বসানো থাকে, সমুদ্রের খুঁটিগুলো একইভাবে দূরত্ব নির্দেশক হিসেবেও ব্যবহার করা হতো। আরবরা পথ চলতেন তারা দেখে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কেবল তারা নয়, তারার আকৃতিও তাদের জন্য দিক ও সময় নির্দেশক হিসেবে সহায়ক হতো। এসব তারা-পরিচিতির জন্য ছিল আবার আলাদা আলাদা বই। সেসব বইয়ে ধ্রুবতারা, সপ্তর্ষি, কৃত্তিকা সব ধরনের নক্ষত্রের কথাই লেখা ছিল। এ বইগুলো অবশ্যই যন্ত্র নয়, কিন্তু জাহাজ চালনার ক্ষেত্রে অন্যতম জরুরি উপাদান হয়ে উঠেছিল।
দিক নির্ণয়, নির্দেশনা ও অন্যান্য কাজে ‘কুতুবনুমা’ নামে একটি জিনিস ব্যবহার করতেন আরবরা। মুসলিম ইতিহাসবিদরা একে কম্পাস বলে নির্দেশ করেছেন। কেননা কুতুবনুমা ছিল দিকনির্দেশক চুম্বক। কুতুবনুমা নামে এ বস্তুর উল্লেখ সর্বপ্রথম করেন ইদ্রিসী (মৃত্যু ৫৪৯ হিজরি)। এছাড়া মিসরীয় লেখক বাইলাক কাবজাকীও সপ্তম শতকের মাঝামাঝি তার বইয়ে চুম্বকের কথা উল্লেখ করেছেন। তবে এ বর্ণনায় থাকা দিক নির্দেশক চুম্বক একালের কম্পাসের মতো নয়। সেকালের চুম্বককে ‘মাছের আকৃতির লোহা’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কাবজাকীর বক্তব্য অনুসারে, এগুলো পানিতে ফেলে দিলে কিছুক্ষণ সাঁতার কেটে উত্তর-দক্ষিণমুখী হয়ে স্থির হতো। তবে নজদের ইবনে মজিদ নামক নাবিকের বর্ণনায় এ যন্ত্রকে কম্পাসের আদি অবস্থা বলে চিহ্নিত করা যায়। তিনি লিখেছেন, ‘নৌ-চালনার জন্য আমরা চুম্বক আবিষ্কার করেছি। এটি একটি বাক্সে রাখা হয় এবং বাক্সেই অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে স্থাপন করা হয়।’ তার মতে কাঁটাটি দুই অগত্য তারার বিপরীত দিকে অবস্থান করে। নিজেকে (বা নিজেদের) দিকনির্দেশক কাঁটার আবিষ্কারক হিসেবে দাবি করলেও তিনি বলেছেন অন্য কেউ পূর্বে এ রহস্য আবিষ্কার করে থাকলে কৃতিত্ব তিনি নিতে চান না।
কুতুবনুমা আধুনিক কম্পাস ছিল না, তবে দিকনির্দেশক চুম্বকই ছিল এতে সন্দেহ নেই। কেননা পারস্য উপসাগর, আরব সাগর ও আবিসিনিয়ার জাহাজের খবর নিতে গেলে জানা যায় জাহাজে পেরেক ব্যবহার না করার কারণ তারা মনে করতেন পেরেক ওই দিক নির্দেশক কাঁটার কার্যকারিতা কমিয়ে দেবে। অর্থাৎ সেটা চুম্বকই ছিল। অন্য যন্ত্রপাতির তেমন কোনো হদিস পাওয়া যায় না। তবে সেক্সট্যান্টের কার্যোদ্ধার হতো এমন কোনো যন্ত্র তারা ব্যবহার করতেন হয়তো। কেননা নক্ষত্র দেখে দিকনির্দেশ, দূরত্ব নিরূপণ ইত্যাদির ক্ষমতা তাদের ছিল। এর বাইরেও সমুদ্রে দূরত্ব, গভীরতা ইত্যাদি পরিমাপের নিজস্ব পদ্ধতি তারা আবিষ্কার করেছিলেন। যন্ত্রপাতিতে না হলেও দক্ষতায় তারা ছিলেন সমুদ্রের সেরা।
মাহমুদুর রহমান: লেখক





