ভূমধ্যসাগরে আধিপত্য লাভের জন্য আরব ও রোমীয়রা পরস্পরের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়, কিন্তু আরবদের নৌ-বিজয়ের সঙ্গে সঙ্গে রোমীয়রা পশ্চাদপসরণ করতে বাধ্য হয়। ২৯৬ হিজরিতে উত্তর আফ্রিকায় উবাইদ ফাতেমিদের শক্তিশালী রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। ক্রমে এরা সিসিলি, মিসর ও সিরিয়ায় সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হন। এ সাম্রাজ্যের স্থায়িত্ব অক্ষুণ্ন রাখার জন্য সমুদ্রপথে অগ্রগতি একান্ত প্রয়োজন হয়ে পড়ে, কারণ সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশ যুক্ত ছিল নৌপথে। কাজেই তিউনিসের পুরনো জাহাজ নির্মাণ কারখানাটির প্রভূত উন্নতি সাধন করা হয়। এ কারখানায় সবসময়ই যুদ্ধজাহাজ প্রস্তুত থাকত।

৩০৩ হিজরিতে ভূমধ্যসাগরের কিনারায় একটি পাহাড় খুঁড়ে এক বড় জাহাজ ঘাঁটি তৈরি হয়, যাতে সেখানে ২০০ যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন রাখা যায়। এ জাহাজ ঘাঁটির নাম ছিল ‘শীনি’ এবং এর একেকটা এত বড় ছিল যে চালানোর জন্য ১৪৩টি দাঁড় টানাতে হতো। এতে একটি ফটক বা বড় দরজা ছিল, সেটি বন্ধ করার তালাও ছিল। প্রতিটিতে আলাদা গোলাঘর ছিল এবং মিঠা পানি মজুদ রাখার আলাদা ব্যবস্থা ছিল।

সিসিলি

সিসিলিতে সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক ও নৌবাহিনীর বন্দর ছিল মেসি-নাতে। এখানে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য দেশগুলো থেকে সওদাগরেরা আসত এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ও লেনদেন করত। সিসিলির আরব সরকার প্রতিষ্ঠিত যুদ্ধের নৌবহর নির্মাণের জন্য জাহাজ কারখানাটি এখানে অবস্থিত ছিল। পালেরমোয় ছিল আরেকটি বিশাল বন্দর ও জাহাজ কারখানা। এ পালেরমো ছিল একটি উপকূলবর্তী শহর এবং সিসিলির রাজধানী। লোহা ও কাঠ সরবরাহ হতো স্থানীয় খনি ও বন থেকে। হাজার হাজার শ্রমিক জাহাজ নির্মাণের কাজে নিযুক্ত ছিলেন।

স্পেনের বন্দরগুলো

আরবদের কালে দুটি বিখ্যাত বন্দর ছিল আলমেরিয়া (মারিয়া) ও পেচিনা (বিজ্জানা), স্পেনীয়রা এ দুটিকে বলত প্রাচ্যের দরজা। ইয়াকুত তার ‘মুজামুল-বুলদান’ গ্রন্থে মারিয়া সম্বন্ধে লেখেন:

মারিয়া (আলমেরিয়া) স্পেনের ভেরা জেলায় অবস্থিত একটি বড় বন্দর। সওদাগরেরা এখান থেকে সমুদ্রযাত্রা করে, সওদাগরি জাহাজ এখানে নোঙর করে। জাহাজ ও সাগরের ঢেউ নগর দুর্গের দেয়ালে এসে আছড়ে পড়ে। এখানে খুবই উন্নতমানের রেশম ও ব্রোকেড কাপড় তৈরি হয়। এ শিল্প-কারখানা আগে কর্দোভায় ছিল, কিন্তু মারিয়া কর্দোভাকেও ছাড়িয়ে গেছে। ৫৪২ হিজরিতে ইউরোপীয়রা নৌ ও স্থলপথে আক্রমণ করে এটি দখল করে নিয়েছিল, কিন্তু ৫৫২ হিজরিতে মুসলমানরা এটি পুনর্দখল করেন। ইউরোপীয়দের মোকাবেলা করার জন্য মুসলিম যুদ্ধ জাহাজগুলো এখানে সারিবদ্ধভাবে সাজানো থাকে। মারিয়া বেল্লিশ (ভেলের মালাগা) স্পেনের অন্য একটি বন্দর, যাত্রীরা সেখানে বারবার এর উদ্দেশে যাত্রা করে।

উত্তর আফ্রিকা ও মরক্কোর সবচেয়ে বিখ্যাত বন্দর ছিল পেচিনা (বিজ্জানা), এটি ভূমধ্যসাগরের আফ্রিকা উপকূলে আলজেরিয়া ও মরক্কোর মাঝপথে অবস্থিত ছিল। প্রথমে এটি একটি সাধারণ বন্দর ছিল। ৪৫৭ হিজরিতে নাসির ইবন আল-নাস সুবিধাজনক স্থানে বিবেচনা করে এর প্রতিষ্ঠা করেন। ক্রমে এটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বন্দরে পরিণত হয়। এখান থেকে বিভিন্ন দেশ অভিমুখে জাহাজ ছাড়ত, সব জায়গা থেকে যাত্রীরাও আসত।

মরক্কোর আরেকটি বিখ্যাত বন্দর ছিল সাবতা (সিউটা), স্পেনের উল্টোদিকে আফ্রিকার উপকূলে এটি ছিল। ইয়াকুতের মতে, এটি ছিল পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ বন্দর।

আফ্রিকার সবচেয়ে বিখ্যাত বন্দর ছিল মাহদিয়া, ৩০০-৩০৫ হিজরিতে ফাতেমি বংশের প্রতিষ্ঠাতা এটি নির্মাণ করেন। আস্ত পাথর কেটে এখানে জাহাজ নির্মাণ ও মেরামত কারখানা তৈরি হয়েছিল। সে কারখানা ছিল অত্যন্ত প্রশস্ত এবং একসঙ্গে ৩০টি জাহাজ সেখানে ভিড়তে পারত। বন্দরের দুদিকেই বিশাল শিকল টানা দেয়া থাকত, জাহাজ এলে সে শিকল খুলে দেয়া হতো।

আবু উবায়েদ বাকরি (ওফাত ৪৮৭ হি. ১০৯৪ খ্রিস্টাব্দে) তার ‘মাসালিক ওয়া মামালিক’ গ্রন্থে প্রসঙ্গক্রমে নিম্নলিখিত বন্দরগুলোর কথা উল্লেখ করেছেন এবং কোনো কোনোটির বর্ণনাও করেছেন:

মারসা’ল উন্দুলুসিন, তাইনি, সানিয়া, খাররাতাইন, আল-খাযার, দার, দাজ্জায, যাবন, মাদফুন, রাহিব, রুম, যয়তুনা, সাবিবা, শাজরা, আমরাহ, কিবতা, মারিফান, মাসাইন, মুগিলা, মালভি, মানিয়া মূসা, জাবাল, দুহরান।

ভূমধ্যসাগরের পথে মুসলমানদের ঘন ঘন চলাচলের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল হজ। প্রতি বছর হজের মৌসুমে স্পেন এবং মরক্কো থেকে হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মুসলমান আলেকজান্দ্রিয়ায় আসতেন। বিখ্যাত স্পেনীয় ভ্রমণকারী ইবন জুবায়ের ৫৭৮ হিজরিতে স্পেন থেকে জেনেভার একটি জাহাজে করে আলেকজান্দ্রিয়া এসেছিলেন। তিনি তার ভ্রমণের পর্যায় সম্বন্ধে নিম্নরূপ বর্ণনা দিয়েছেন:

তিনি ৫৭৮ হিজরির ২৮ শাওয়াল সাবতা (সিউটা) থেকে একটি জাহাজে ওঠেন এবং ইভিজা, মেজকা, মাইনকা সারডিনিয়া, সিসিলি ও ক্রীট দ্বীপ অতিক্রম করে সে বছরেরই ২৯ জিলকদে আলেকজান্দ্রিয়া পৌঁছেন। এ ভ্রমণে সময় লেগেছিল মোট ২৯ দিন।

বারকাতে তুলমিয়া নামে একটি বন্দর ছিল। সেখানে সময়ে সময়ে জাহাজ থামত। কায়রোয়ানে ভূমধ্যসাগরের উপকূলের একেবারে প্রান্তে অবস্থিত ছিল আবি শারিক। সেখানে উমর (রা.)-এর বংশধরদের এবং অন্যান্য আরব ও ইরানি অধিবাসীর বসতি ছিল। এর কাছেই আম-লিবিয়া নামে একটি বন্দর ছিল, সেখান থেকে যাত্রীরা সিসিলি যেত।

মিসরের বন্দরগুলো

হিজরি তৃতীয় শতাব্দীর শেষভাগে তিউনিস সাগরে বড় বড় জাহাজ চলাচল করত। সে সময় একটি সমৃদ্ধশালী বসতি ছিল রশিদ। এখানে বন্দর ছিল, এ বন্দর দিয়ে নীল নদ বয়ে গিয়ে ভূমধ্যসাগরে পড়ত এবং ভূমধ্যসাগর থেকে জাহাজ এ স্থান হয়ে নীল নদে প্রবেশ করত।

মামলুকদের আমলে মিসরের একটি বড় উপকূলীয় শহর ছিল কাউস। দক্ষিণাঞ্চল থেকে জাহাজে আসা সওদাগরেরা এখানে থামত। এডেনের সওদাগরেরাও এখানে থাকত। নৌ-বাণিজ্যের সুফল বওয়া অ-মাপা ধন-সম্পদ ছিল এখানে।

ফারামার কাছে, ভূমধ্যসাগরের উপকূলে কাসতিয়া নামে একটি প্রাচীন বসতি রয়েছে। এরও দামিয়াত নামে একটি বন্দর ছিল এবং সেটি নীল নদ ও ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এটি ছিল খুবই বড় বন্দর এবং জাহাজের ভিড় এখানে লেগেই থাকত। এখানে দুটি বড় উঁচু স্তম্ভ (মিনার) ছিল, এ স্তম্ভের মাঝখানে মোটা লোহার শিকল টানা থাকত। বিনা অনুমতিতে কোনো জাহাজ কিনারায় ভিড়তে গেলে শিকলে বাঁধা পেত।

ভূমধ্যসাগরের যুদ্ধজাহাজ

আরব নৌ-চলাচল এবং যুদ্ধজাহাজগুলোর সবচেয়ে বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন ইবন খালদুন। তিনি লিখেছেন:

আরব সামাজ্য প্রতিষ্ঠিত হলে এবং শক্তিশালী হয়ে উঠলে বিভিন্ন পেশার লোক তাদের অধীনে চাকরি করতে আসে। তারা খালাসি-সুখানি ও নাবিকদের নিযুক্ত করে, এরা তাদের নৌ-অভিযানের জ্ঞান ও কার্যাবলি বৃদ্ধি করে। তখন আরবদের মধ্য থেকেই নৌচালনায় অভিজ্ঞ ব্যক্তি তৈরি হয় এবং তখন তাদের নৌ-জিহাদের আগ্রহ ও আকাঙ্ক্ষা জেগে ওঠে। সওদাগরি ও যুদ্ধ উভয় উদ্দেশ্যেই তারা জাহাজ নির্মাণ করতে থাকে এবং যুদ্ধজাহাজগুলোকে সৈন্য ও অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে সুসজ্জিত করে তোলে। ভূমধ্যসাগরের অন্য পাড়ে, আফ্রিকার উপকূলভাগে যুদ্ধ করার জন্য সেনাবাহিনী পাঠানো হয়। যেসব স্থান যুদ্ধের জন্য নির্বাচিত হয়, সেগুলো সিরিয়া, আফ্রিকা, মরক্কো ও স্পেনের উপকূলে অবস্থিত ছিল। খলিফা আবদুল মালিক আফ্রিকার শাসনকর্তা হাসান ইবন নুমানকে তিউনিসে নৌযুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় একটি অস্ত্র কারখানা গড়ে তোলার আদেশ প্রদান করেন। পরবর্তীকালে যিয়াদত উল্লাহ ইবন ইব্রাহিম ইবন আগলাবের আমলে এখান থেকে সিসিলি অভিমুখে একটি নৌ-অভিযান পরিচালিত হয় এবং দ্বীপটি এরা দখল করে নেয়। কাওসারাও অধিকৃত হয়।...

এরপর আফ্রিকা ও স্পেনের যুদ্ধ-জাহাজগুলো একে একে বিপরীত কূলের ওবায়দিয়া ও উমাইয়া রাজ্যগুলো দখল করে নেয়। আবদুর রহমান ইবন নাসিরের আমলে স্পেনীয় যুদ্ধজাহাজের সংখ্যা ছিল ২০০। আফিকার নৌবহরেও প্রায় সমপরিমাণ যুদ্ধ জাহাজ ছিল। আমিরুল-বহরের নাম ছিল ইবন রামাহাস। এ জাহাজগুলোর কেন্দ্রীয় বন্দর ছিল বিজ্জানা ও মারিয়া। প্রত্যেক বন্দরেই সব জাহাজ একজন প্রধান কর্মকর্তার অধীনে নোঙরাবদ্ধ থাকত। তিনি জাহাজ, নাবিক ও নৌসেনাদের তত্ত্বাবধান করতেন। প্রত্যেক জাহাজে একজন কাপ্তান থাকতেন, তিনি হাওয়ার আকর্ষণ হেতু জাহাজের গতি, দাঁড়ের টান হেতু পালের অবস্থান্তর এবং নোঙর করার কাজ তদারক করতেন। যুদ্ধ বাধলে সব যুদ্ধজাহাজই একটি বিশেষ বন্দরে একত্রিত করা হতো এবং প্রয়োজনীয় অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত করে একজন আমিরের অধীনে পাঠানো হতো।

গৌরবময় যুগে ভূমধ্যসাগরে মুসলমানদের সম্পূর্ণ আধিপত্য ছিল, তাদের শ্রেষ্ঠত্বের তুলনায় খ্রিস্টান নৌবহরের আধিপত্য সামান্যই ছিল। ফলে সবখানে মুসলমানদের নৌ-বিজয় সূচিত হয় এবং তারা প্রায় সব দ্বীপেরই প্রভুত্ব অর্জন করে। যথা মেজকা, মাইনকা, আইভিজা, সার্ডিনিয়া, সিসিলি, কাওসারা, মাল্টা, রুটি, সাইপ্রাস এবং অন্যান্য ইউরোপীয় ভূখণ্ড ।

আবুল কাসিম (একজন শিয়া) ও তার ছেলেরা প্রায়ই মাহদিয়া থেকে জেনেভার উপকূলীয় শহরগুলোয় আক্রমণ পরিচালনা করতেন এবং সাফল্যের সঙ্গে ফিরে আসতেন। দানিয়ার প্রধান আমির তার নৌবহর নিয়ে ৪০৫ হিজরিতে সার্ডিনিয়া দখল করেন, কিন্তু পরে খ্রিস্টানরা সেটা পুনর্দখল করে। মুসলমানরা ছিল এ সাগরের বাদশাহ, তাদের জাহাজ এখানে নিয়মিত চলাচল করত। মুসলিম সেনাদল সিসিলি থেকে এ সাগর দিয়ে মহাদেশের উত্তরাঞ্চলে যেত এবং ইউরোপীয় রাজাদের রাজ্য আক্রমণ করত। সিসিলির সাবেক শাসক বনী হাসানদের আমলেও তারা তাই করত। এ সময় সব খ্রিস্টান শক্তি তাদের নৌবহর সাগরের উত্তর ও পূর্ব দিকে সরিয়ে নেয়। ...মুসলিম নৌবহর এমনভাবে তাদের ওপর গিয়ে হামলা করত, ঠিক যেমন সিংহ তার শিকারের ওপর লাফ দিয়ে পড়ে। সমগ্র ভূমধ্যসাগর এলাকা মুসলিম জাহাজে পূর্ণ ছিল, যুদ্ধ বা শান্তি সবসময় সেগুলো সাগরময় চলাচল করত। একটি খ্রিস্টান নৌকাও এ সাগরে ছিল না। উবায়দি শক্তির অবনতি শুরু হলে তখন খ্রিস্টান শক্তি ক্রমেই সবল হয়ে ওঠে এবং মিসর ও সিরিয়ার উপকূলে প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়। তখন আর মুসলিম নৌবহর ছিল না।

কিন্তু সুলতান সালাহ্উদ্দীন উবায়দি শক্তি উত্খাত করে মিসর ও সিরিয়াকে খ্রিস্টান অধিবাসী মুক্ত করে নৌবাহিনীর উন্নয়ন সাধন করেন। ইমাদ আল-কাতিব তার ‘আল-ফাতাহুল-কিসিস’ বইয়ে লিখেছেন, কেমন করে সালাহ্উদ্দীন সিরীয় উপকূলের প্রতিদ্বন্দ্বী নৌবহরের মোকাবেলা করেছিলেন। তার লেখা থেকে কিছু অংশ উদ্ধৃত করছি:

আলেকজান্দ্রিয়ার কর্মকর্তাদের বড় বড় জাহাজে করে খাদ্যদ্রব্য পাঠানোর জন্য এবং জাহাজে সাহসী তীরন্দাজ মোতায়েন করার জন্য আদেশ পাঠানো হয়। তারা সিরীয় উপকূলের নিকটবর্তী হওয়া মাত্র খ্রিস্টানরা চারদিক থেকে ঘিরে আটক করার চেষ্টা করে, কিন্তু মুসলিম জাহাজগুলো বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করে তীরে পৌঁছে। (পৃ. ২৮৪)

ইবন খালদুন লিখেন:

উবায়দি বংশের পতনের পরে সে এলাকায় ইসলামী নৌবহরও গুরুত্ব হারায়। কিন্তু আফ্রিকা ও মরক্কোয় নৌবহর তেমনি শক্তিমত্তার সঙ্গে রক্ষা করা হয়; সেখানে তাদের শ্রেষ্ঠত্ব ক্ষুণ্ন হয়নি। সে আরব নৌবহরের নেতা ছিলেন বনী মায়মন গোত্রীয়রা, যারা লানাতোনার কাল পর্যন্ত কাদাম দ্বীপের প্রধান ছিলেন। অতঃপর তাদের কাছ থেকে নেতৃত্ব লাভ করেন শাসক মুয়াহিদ আবদুল মমিন। স্পেনীয় ও আফ্রিকা উপকূলে মুয়াহিদগণের যুদ্ধ জাহাজের সংখ্যা ছিল ১০০। হিজরি সপ্তম শতাব্দীতে মুয়াহিদ সাম্রাজ্য যখন গৌরবের সর্বোচ্চ চূড়ায় এবং স্পেন ও মরক্কো উভয় দেশেই তাদের কর্তৃত্ব স্বীকৃত, তখন তারা যুদ্ধ জাহাজের এমন উন্নতি বিধান করে যে সেগুলো হয় তুলনাহীন। নৌবহরের প্রধান কর্তা ছিলেন আহমেদ। তিনি ছিলেন সিসিলি দ্বীপের অধিবাসী।

হিজরি চতুর্থ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় ইসতাখারির আবির্ভাব। তিনি স্পেন ও সিসিলি সফর করেন। তিনি লেখেন :

ভূমধ্যসাগরের চেয়ে সুন্দর আর কোনো সাগর নেই। এর দুই পাড়েই সারি বাঁধা জনবহুল বাসভূমি...

রোমক ও মুসলিম জাহাজ এ সাগরের কিনারা থেকে কিনারায় চলে। মুসলিমদের সঙ্গে রোমীয়দের মুখোমুখি সাক্ষাত হয় ১০০ বা তার বেশি জাহাজ—প্রত্যেকেই নিজ পক্ষে সারিবদ্ধ হয় এবং সাগরে শুরু হয়ে যায় যুদ্ধ। (পৃ. ৭১)

এটা তাহলে বলাই বাহুল্য যে আরবরা উভয় অঞ্চলেই চলাচল করত। স্পেন ও তান্জা হয়ে তারা পশ্চিম ও দক্ষিণ আফ্রিকা পর্যন্ত যেত এবং আরেক দিকে এশিয়া মাইনর, কনস্টান্টিনোপল এবং কিছুসংখ্যক দ্বীপ পার হয়ে সিসিলি, ইটালি ও ফ্রান্সে যেত। আজকের দিনে কথাটা হয়তো বিস্ময়কর শোনাবে যে জিব্রাল্টারের মূল নাম যেমন জাবালুত তারিক ঠিক তেমনি বিখ্যাত ফরাসি বন্দর মাসাইয়েরও মূল নাম মার্সাই আলী, যার অর্থ হচ্ছে আলীর বন্দর। ইদ্রিসির ভূগোল গ্রন্থে এ নাম পাওয়া যায়।

বর্তমান ক্ষুদ্র পরিসরে বিস্তারিত আলোচনা করা অসম্ভব। কিন্তু এ অতি সংক্ষিপ্ত আলোচনার পরও কোনো সং ঐতিহাসিক কি ‘এনসাইক্লোপিডিয়া অব ইসলাম’-এ মার্টিন হার্টমান কর্তৃক ‘চীন শীর্ষক’ প্রবন্ধের নিন্মোদৃ্লত মন্তব্যের সঙ্গে একমত হতে পারেন ?

ইসলাম বরাবরই সমুদ্রকে ভয় পেয়েছে। প্রথম থেকেই ইসলাম মহাসাগরে অবিশ্বাসীদের আধিপত্য সম্বন্ধে সচেতনতার ভাব পোষণ করত। অবিশ্বাসীদের শ্রেষ্ঠত্ব মোকাবেলা করার কোনো চেষ্টাও তারা করেনি। যখনই মুসলমানরা কোনো নৌ-অভিযান করেছে, তখনই তা ভীষণ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। সমুদ্রপথে বাইজেন্টিয়ামের ওপর তারা যতবার আক্রমণ করেছে, ততবারই ব্যর্থ হয়েছে। (পৃ. ৮৪৪ )

তথ্যসূত্র

১. ‘নুযুহাতুল-মুশতাক’ ইদ্রিসি, পৃ-২৬।

২. ‘ইবন হাইকাল,’ পৃ.৮২।

৩. মাসালিক ওয়া মামালিক (আলজেকিরাস সংস্করণ), ১৯১১

৪. ইন্ট্রোডাকশন টু ট্রাভেলস অব ইবন জুবায়ের (গিব) পৃ. ৩৫-৩৮

৫. মুজামুল-বুলদান, ইয়াকুত কৃত, কাউস দ্রষ্টব্য

৬. আল-আনিসুল-মুফিদ, পৃ. ১০০-১০১

[সৈয়দ সুলায়মান নদভী রচিত আরব নৌবহর (অনুবাদ: হুমায়ুন খান) গ্রন্থ থেকে একটি অধ্যায় এখানে সংকলিত হয়েছে। প্রকাশক: ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ]