উপেক্ষিত পারস্যে নন, উপেক্ষিত আমাদের কাছে। কেউ কেউ তার নামও শোনেননি। অথচ ফার্সি ভাষার সঙ্গে যাদের পরিচিতি আছে, যারা ফার্সি কবিতার স্বাদ পেয়েছেন, তাদের কাছে আবু সাঈদ আবুল খায়ের ‘সুফি কবিতার জনক’।

ফার্সি সাহিত্য ও সাহিত্যিকদের নিয়ে আমাদের জ্ঞান এখন থেকে ৯৬ বছর আগে প্রকাশিত মোহাম্মদ বরকতউল্লাহর ‘পারস্য প্রতিভা’-তে আটকে আছে। এই গ্রন্থ বা এর অংশ ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ম্যাট্রিকুলেশন বা কলেজ শিক্ষার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসভুক্ত ছিল। দীর্ঘ ভূমিকায় লেখক পারস্যের প্রতিভা হিসেবে যাদের নাম উল্লেখ করেছেন তাদের মধ্যে আবু সাঈদ আবুল খায়ের নেই। এই গ্রন্থে ফেরদৌসী, ওমর খৈয়াম, শেখ সাদি, হাফিজ, জালাল উদ্দিন রুমী এবং ফরিদ উদ্দিন আত্তার সম্পর্কে পৃথক অধ্যায় রচিত হয়েছে। ভূমিকায় জামি ও নেজামির কথা বলা হয়েছে। পারস্যের সাহিত্যের সর্বোত্তম প্রকাশ ঘটেছে গীতিকবিতায়।

ফার্সি ভারতবর্ষে এবং বাংলায়ও সরকারি ভাষা হিসেবে বহুল ব্যবহূত ছিল। ফার্সিতে লিখিত কিছু সরকারি দলিল-দস্তাবেজ দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। এই ভাষার প্রধান তিনটি কেন্দ্র ছিল আজকের ইরান, আফগানিস্তান ও তাজিকিস্তান এবং তাতে প্রভাবিত হয়েছে সংলগ্ন অঞ্চল। ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে ফার্স নামক অঞ্চলে খ্রিস্টের জন্মের আগে এ ভাষার উত্পত্তি। ফার্স-ই পশ্চিমের কাছে পার্সিয়া হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। তৃতীয় থেকে দশম খ্রিস্টাব্দ আরব ও ইসলামের প্রভাবে আরবি হরফভিত্তিক নিউ পার্শিয়ান ভাষা ও সাহিত্য বিকশিত হতে থাকে। ফার্সি ভাষার বিকাশ ইসলামী সাহিত্যে আরবির যে একাধিপত্য তা ভেঙে দেয়। ফার্সি সাহিত্যের মৌলিকত্ব ও ভিন্নধর্মিতা একে বিশ্বসাহিত্যে শক্ত অবস্থানে এনে দেয়। ফেরদৌসির শাহনামা, ওমর খৈয়ামের রুবাইয়াত, হাফিজের দিওয়ান, শেখ সাদির গুলিস্তাঁ, জালাল উদ্দিন রুমীর মসনভি বিশ্ব সাহিত্যে স্থায়ী আসন করে নেয়।

ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উভয় দিক থেকে সুফি ভাবধারার বিকাশ পারস্যে। শেকসপিয়ারও ইরানকে বলেছেন ‘ল্যান্ড অব সোফি’। ধর্মের অতীন্দ্রিয় ব্যাখ্যায় সুফিবাদের প্রধান আকর হচ্ছে আত্মসত্তা ও অহংকে বিলীন করে দেয়া।

অষ্টম থেকে দশম শতকের মধ্যে সুফিবাদের বিকাশ। ইবনে খালদুন মনে করেন সাহাবাদের মধ্যে সুফি চর্চা ছিল। গত সহস্রাব্দের শেষে আরবি ও ফার্সি ভাষাভাষী অঞ্চলে সুফিবাদের জয়যাত্রা লক্ষ করা যায়। ইমাম গাজ্জালি সুফিবাদের উৎস হিসেবে ধর্মগ্রন্থ কোরআনকেই ইঙ্গিত করেন। গাজ্জালির গ্রন্থ দুটি ইংরেজি ভাষান্তরে ‘রিভাইভাল অব রিলিজিয়াস সায়েন্স’ এবং ‘আলকেমি অব হ্যাপিনেস’। চারটি ধারার সুফিবাদ ভারতেও দ্বাদশ শতক ও তারপর থেকে ক্রিয়াশীল। এই ধারা চারটি হচ্ছে চিশতিয়া, নকসবন্দী, কাদিরিয়া ও সোহরায়ার্দিয়া। চিশতিয়া ধারাটিই অধিকতর লক্ষণীয়। পরবর্তী সময় আরো অনেক উপধারার সৃষ্টি হয়েছে। কবিতায় এই সুফিধারার বৃহত্তর পরিমণ্ডলটি সৃষ্টি করেছেন দশম শতকের কবি আবু সাঈদ আবুল খায়ের। তাকেই বলা হয় ‘সুফি পথের সক্রেটিস’। তিনি লিখেছেন:

তুমি এবং আমি—আমার প্রেম, কম্পাসের জোড়া কাঁটা

যদিও দুভাগ দেখা যায়, শরীরে আমরা একই আছি

আমরা এক বিন্দুতে বৃত্তের মতো ঘুরে বেড়াই, কম্পাসের মতো

যদিও অজ্ঞাত, অবশেষে আমাদের দুই মাথা এক হয়ে যায়।

আবু সাঈদ আবুল খায়েরের জন্ম ৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে মধ্য এশিয়ায় ইরান ও আফগানিস্তানের উত্তরে খোরাসানের মেহানেহ গ্রামে। এটি এখনকার স্বাধীন রাষ্ট্র তুর্কমেনিস্তানের অংশ। তুর্কমেনিস্তান ঘিরে আছে কাজাখস্তান, উজবেকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরান ও পশ্চিম কাস্পিয়ান সাগরের উপকূল। শতকের পর শতক ধরে সভ্যতার একটি মিলনক্ষেত্র এই তুর্কমেনিস্তান নগর, সিল্করোডের ওপর অবস্থিত, ইসলামী সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

তিনি শৈশবে আবু মুহাম্মদ আনাজির কাছে ধর্মগ্রন্থ কোরআন এবং আবু সাঈদ আনাজির কাছে আরবি সাহিত্যের পাঠ নেন। পরবর্তী পাঁচ বছর শহরের শ্রেষ্ঠ শিক্ষকদের কাছে বিজ্ঞানের বিচিত্র বিষয় এবং আইন শাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনা করেন। তার কজন স্বনামধন্য সহপাঠীর মধ্যে রয়েছেন আবু সালেহ সেনজি, নাসের মার্ভজি এবং আবু মুহাম্মদ জুয়াইনি। পরবর্তী জীবনে তিনি বারবার যাকেই তার নিজের চেয়ে অধিকতর শিক্ষিত মনে হয়েছে, তিনি তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছেন।

তখনকার সাংস্কৃতিক ধারা অনুযায়ী বিদ্বত্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল শিষ্যদের বলা এবং জ্ঞান সঞ্চালিত করা। আবু সাঈদ আবুল খায়েরের ক্ষেত্রে ১০৪৯ সালে তার মৃত্যুর ১৩০ বছর পর তার দুই দৌহিত্র তার রচনাবলি মন্তব্য, বক্তব্য ইত্যাদি দুটো গ্রন্থে প্রকাশ করেন। একটি বই মুহাম্মদ বিন মুনাওয়ার সংকলিত ও লিখিত ‘সিক্রেটস অব মনোথিজম ইন পজিশনস অব শেখ আবু সাঈদ আবুল খায়ের’ এবং অন্যটি জামাল উদ্দিন আবু রুহ আবদুল্লাহর ‘এক্সপ্রেশন অ্যান্ড ওয়ার্ডস অব আবু সাঈদ আবুল খায়ের।’

তিনি সচেষ্ট ছিলেন যেন সুফিবাদ সাধারণ মানুসের বোধগম্য হয়। যে অহম নিয়ে মানুষ মাথা উঁচু করে দাঁড়ায় তা যে অতি তুচ্ছ তা সাধারণ মানুষকে সহজভাবে বুঝিয়ে দিতে হবে। তিনি সহজবোধ্য কবিতাকে তার সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করলেন। তার প্রধান শিক্ষা, তার কবিতার প্রধান সুর ‘আমি’র বিসর্জন। আমি ও আমরা বিসর্জিত হবে, সমর্পিত হবে সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে। বিখ্যাত ফার্সি কবি ফরিদ উদ্দিন আত্তার বলেছেন কবি আবু সাঈদ হচ্ছেন তার আধ্যাত্মিক গুরু। তার সমকালীন এবং পরবর্তীকালীন অনেক সৃষ্টিশীল মানুষ বাস্তবে মনস্তাত্ত্বিকভাবে তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছেন। তার যত কবিতা নারী প্রেমের কবিতা বলে মনে হয় তার সবই সমর্পণের কবিতা।

তাকে কবরে দাফন করার সময় কী পাঠ করতে হবে সে কবিতাও তিনি লিখে রেখে গেছেন:

পৃথিবীতে এর চেয়ে সুমিষ্ট আর কী আছে

বন্ধু পাবে বন্ধুর দেখা, প্রেমিক মিশবে প্রিয়জনের সাথে।

 

আর সব ছিল বেদনার, এটাই হচ্ছে আনন্দের

আর সব ছিল কেবল কথা, এটাই হচ্ছে বাস্তবতা।

আবু সাঈদের বাবা পেশাগত জীবনে ছিলেন হাকিম—ওষুধ প্রস্তুতকারী, কিন্তু সমর্পিত ছিলেন সুফি চর্চায়। তিনি ছেলেকে সুফি নৃত্য ‘সামা’র সাথে পরিচিত করান এবং সুফি সাধক ও কবি আবুল কাশেম বেছর ইয়াসিনের কাছে নিয়ে যান।

আবু সাঈদ প্রায় পনেরো বছর ধ্যানমগ্ন জীবন কাটান। চল্লিশ বছর বয়সে সুফিবাদের প্রচারক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। হজব্রত পালনের জন্য মক্কা রওনা হলেও শেষ পর্যন্ত পৌঁছতে পারেননি।

আধ্যাত্মিক গুরু হিসেবে বিশেষ সম্মানিত আবু সাঈদের বিরুদ্ধে অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছে: তিনি অনৈসলামিক, ভোজন বিলাসিতায় অপচয়কারী, নাজায়েজ নৃত্য উপস্থাপনকারী, রেশমি বস্ত্র পরিধানকারী ইত্যাদি। তাকে অবিশ্বাসীও বলা হয়েছে—একদিন হাজারবার প্রার্থনা করে তারপর কদিন নামাজই পড়েন না। বিজ্ঞানী ও দার্শনিক ইবনে সিনার সঙ্গে তার সখ্যের যে কাহিনী প্রচলিত আছে তা যথার্থ নয় বলে একালের গবেষকরা মনে করেন। তিনি কখনো নিশাপুর নামক স্থানে ইবনে সিনাকে সাদরে বরণ করেননি। তিনি এখানে বহু বছর কাটান। তার মৃত্যুর এক বছর আগে ১০৪৮ সালে খোরাসানের এই নিশাপুরেই জন্মগ্রহণ করেন বিখ্যাত ফার্সি কবি ওমর খৈয়াম। মৃত্যুর আগে আবুল খায়ের তার জন্মস্থানে ফিরে যান।

১০৪৯ সালে পাঁচ পুত্রসন্তান রেখে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাকে পিতার সমাধি প্রান্তরেই সমাহিত করা হয়।

তার সময়ে সুফিবাদের বিকাশকে কেউ কেউ ‘ইসলামিক রেনেসাঁ’ও বলে থাকেন। আর আবু সাঈদকে রেনেসাঁ গুরু। তবে এর হাজার বছর পর তার কবিতার ধর্মীয় আবেদন যতটা না তার চেয়ে বেশি সাহিত্যিক আবেদন। পারস্য প্রতিভার লেখক বরকতুল্লাহর তাকে এড়িয়ে যাওয়ার প্রধান কারণ শতবর্ষ আগে তার সম্পর্কে ইউরোপীয় ভাষায় লেখালেখি তেমন ছিলই না। বরং বলা যায় তিনি গত শতকে পুনরাবিষ্কৃত হয়েছেন।

আবু সাঈদ আবুল খায়েরের বেড়ে ওঠা দুটি সহস্রাব্দের সন্ধিক্ষণে; হাজার বছর পরে আমরা এখন যারা তাকে নিয়ে লিখছি ও পড়ছি আমরাও দুটি সহস্রাব্দ স্পর্শ করা মানুষ।

আবু সাঈদসহ পারস্যের সুফি কবিদের প্রেমগাথার কয়েকটি বৈশিষ্ট্য: প্রেমিক কিংবা প্রেমিকা যার কাছে প্রেম নিবেদিত হোক না কেন সে থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। কাতর বাসনা থেকে তার দূরত্ব অনেক বেশি। প্রেমিক কিংবা প্রেমিকার জন্য সইতে হয় দুঃসহ ও অমানবিক যন্ত্রণা। এ প্রেম সনাতন নয়, আনন্দের নয়, এমনকি ছুঁয়ে দেখাবার নয়। প্রেমের সুফি-পথের বর্ণনা দিয়েছেন জালাল উদ্দিন রুমী।

যা কিছু লাভজনক মনে হয় তার কাছ থেকে পালাও

কিন্তু পান করো, জীবনের জল ঢেলে ফেলে দাও

নিরাপত্তা বিসর্জন দাও, আতঙ্কের কোনো স্থান বেছে নাও

প্রগতি ছুড়ে ফেলে দাও, অসম্মানিত হও, বেলাজ হও।

আর একটি বৈশিষ্ট্য আত্ম-অহংকারের বিলুপ্তি। মনে করা হতো সুফি কবিতা আল্লাহর আশীর্বাদধন্য। আরো একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সুফি কাব্যের সত্তা ধর্মনিরপেক্ষ ঈশ্বর।

বৈশিষ্ট্যগুলো সবচেয়ে বেশি ধারণ করেছেন কবি আবু সাঈদ আবুল খায়ের। জীবনাচরণের দিগদর্শনও তিনি দিয়েছেন।

যাদের সম্মানজ্ঞান নেই মর্যাদাবোধ নেই

তাদের এড়িয়ে চলো

যারা অবিরাম রঙ বদলায় তাদের

ভুলে যাওয়া সবচেয়ে ভালো

যারা প্রেমিকের গুণাগুণবঞ্চিত

তাদের সাথে থাকতে হলে

নির্জনে নিভৃত আনন্দে তাদের ভুলে থাকো।

 

এম এ মোমেন: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা