‘মালাক্কার
বন্দরে মানুষ
৮৪ ভাষায়
কথা বলে।’
এটা পঞ্চদশ
শতাব্দীর হিসাব।
একালের কবি
টেরেজ পিপিনস
তার কবিতার
নাম দিয়েছেন
মালাক্কা প্রণালি:
এই প্রণালি
মাটি ঘুঁটে
পোর্সেলিনের ফুলদানি
ও পাত্র
বানায়
স্ফটিক-স্বচ্ছ
কামপার্ড সৈকত
পর্যন্ত জাপানি
মর্টার
একেবারে সোজা
সামনে সুমাত্রা
পেছনে শতাব্দীর
স্মৃতি
প্রতিটি সড়কে
প্রতিটি জিহ্বায়
পুরনো গল্প
পুরনো যাতনা
তেল ও
সলতের বাতিতে
জ্বলে।
দ্য কনকোয়েস্ট অব মালাক্কা—মালাক্কা
বিজয় নামের
মহাকাব্য রচিত
হয়েছে সপ্তদশ
শতাব্দীতে। পর্তুগিজ
কবি ফ্রান্সিকো
দ্য সা
দে মেনেসেস
১৫১৯ সালের
মালাক্কা যুদ্ধ
নিয়ে এ
কবিতা লেখেন।
পর্তুগিজ বাহিনীর
প্রধান ছিলেন
ভারতের গোয়ায়
নিযুক্ত পতুগিজ
গভর্নর আফনসো
দি আলবুকার্ক।
মালাক্কার সুলতান
মাহমুদ শাহ
৭০০ পর্তুগিজ
সৈন্য ও
মালাবার থেকে
আসা ৩০০
সহযোগীর বহরকে
শুরুতে পাত্তা
দেননি। ১৫১১
সালের আটদিনের
যুদ্ধে ১৫
আগস্ট পর্তুগিজরা
মসলা ও
পোর্সেলিনের অন্যতম
উৎপাদন ঘাঁটি
দখল করে
নিতে সমর্থ
হয় মূলত
সেখানকার অমুসলিম
নাগরিকদের পর্তুগিজদের
দলে যোগ
দেয়ার কারণে।
সুলতান মাহমুদ
শাহ পালিয়ে
গভীর অরণ্যে
চেলে যান।
আফনসো তার
সৈন্যদের শহর
লুটের সময়
বেঁধে দেন।
মুসলমান ছাড়া
অন্য কারো
ক্ষতি করা
থেকে সৈন্যদের
প্রতিহত করেন।
এ বিজয়
নিশ্চিত করতে
২৮ জন
পর্তুগিজ সৈন্যদের
প্রাণ দিতে
হয়।
জীবনানন্দ দাশের
হাজার বছর
ধরে পথ
হাঁটা প্রেমিক
পরিব্রাজক পৃথিবীর
পথে হাঁটতে
হাঁটতে মসলার
ঘ্রাণে এ
অঞ্চলেও এসেছেন
এমন ইঙ্গিত
কবিতায় রয়েছে।
পঞ্চদশ শতাব্দীতে
একটি বন্দরে
যদি ৮৪
ভাষাভাষী মানুষের
আগমন ঘটে
যাচ্ছে, তাহলে
সেখানেই বিকশিত
হয়েছে প্রকৃত
মেট্রোপলিটন সংস্কৃতি।
মানচিত্রে মালয়েশিয়া
ও ইন্দোনেশিয়ার
মধ্যে বিভাজক
সরু ও
দীর্ঘ নীল
বিভাজক অংশটিই
মালয় প্রণালি—এ
জলরাশির এক
প্রান্তে আন্দামান
সাগর অন্য
প্রান্তে জাভা
সাগর যথাক্রমে
ভারত মহাসগর
ও প্রশান্ত
মহাসাগরে পড়েছে।
কাজেই মালাক্কা
প্রণালি পৃথিবীর
অন্যতম প্রধান
সংযোজক। এর
দৈর্ঘ্য ৫৮০
মাইল বা
৯৩০ কিলোমিটার।
দৈর্ঘ্য বরাবর
অধিকাংশ জলরাশির
প্রস্থ ৫০-৩০০
কিলোমিটার। তবে
সবচেয়ে সরু
অংশে ২
দশমিক ৮
কিলোমিটার প্রশস্ত।
আর সবচেয়ে
অগভীর অংশের
গভীরতা ২৫
মিটার (৮২
ফুট)।
দক্ষিণ-পূর্ব
এশিয়ার তথা
বিশ্ব বাণিজ্যের
এটাই অন্যতম
প্রধান রুট।
এশিয়া ও
পৃথিবীর অন্যান্য
অংশের সঙ্গে
যোগাযোগের এটাই
প্রধান শিপিং
রুট। ১৪০০-১৫১১
পর্যন্ত মালাক্কা
সুলতানাতের শাসনাধীনে
ছিল এ
দ্বীপপুঞ্জগুলো, মালাক্কা
প্রণালি নামটা
সেখান থেকেই
এসেছে।
বর্তমানে এ
প্রণালিতে পাঁচটি
প্রধান আন্তর্জাতিক
বন্দর: সিঙ্গাপুর,
পোর্ট ক্ল্যাঙ্গ
(কুয়ালালামপুর), জোহর,
পেনাং ও
বেলাওয়ান। প্রতি
বছর ৫০
হাজার সমুদ্রগামী
বড় জাহাজ
সব মিলিয়ে
প্রায় এক
লাখ জাহাজ
এ প্রণালি
দিয়ে সারা
পৃথিবীতে পরিবহনকৃত
বাণিজ্যিক সামগ্রীর
প্রায় এক-চতুর্থাংশ
বহন করে
কাঙ্ক্ষিত বন্দরে
পৌঁছে দেয়।
পৃথিবীতে সমুদ্রপথে
যত জ্বালানি
পরিবহন করা
হয়, তার
অর্ধেক এ
পথ অনুসরণ
করে। এ
পথে পূর্ব
দিকে প্রতিদিন
গড়ে ১০
মিলিয়ন ব্যারেল
তেল আসে।
পানামা খাল
দিয়ে যত
তেল পরিবহন
করা হয়,
তার ১৫
গুণ পরিবাহিত
হয় মালাক্কা
প্রণালি দিয়ে
আর সুয়েজ
খালের অন্তত
তিনগুণ।
কৌশলগত কারণে
বিশ্ব বাণিজ্যের
আলোকে দক্ষিণ-পূর্ব
এশিয়ার প্রধানতম
বাণিজ্যিক রুট
হচ্ছে মালাক্কা
স্ট্রেইট। চীন
ও জাপানসহ
দক্ষিণ-পূর্ব
এশিয়ার ইউরোপের
সব সমুদ্রপথের
বাণিজ্য মালাক্কা
প্রণালি দিয়েই
হয়। এ
অঞ্চলের জন্য
প্রয়োজনীয় সব
জ্বালানি উপসাগরীয়
দেশগুলো থেকে
এ পথেই
আসে। জাপান
সম্পূর্ণভাবে এ
প্রণালির ওপর
নির্ভরশীল।
শতাব্দীর পর
শতাব্দী ভারতীয়
উপমহাদেশের সঙ্গে
পূর্ব ও
দক্ষিণ-পূর্ব
এশিয়া এবং
ইউরোপের সংযোগ
ঘটিয়েছে এ
প্রণালি; এমকি
চীনে যাওয়ার
জন্য ও
নর্দার্ন সিল্করোডের
এটাই বিকল্প।
এ প্রণালি
যেসব দেশের
সীমান্ত স্পর্শ
করেছে—ইন্দোনেশিয়া,
মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড
ও সিঙ্গাপুর।
এগুলোই হচ্ছে
আসিয়ানের মূল
অঞ্চল। প্রতিটি
দেশই গ্রোথ
সেন্টার হিসেবে
বিশ্ব বাণিজ্যে
অবদান রেখে
যাচ্ছে।
এ প্রণালির
দুই দিকের
স্থলভাগ প্রাকৃতিক
ও খনিজ
সম্পদে সমৃদ্ধ।
মালাক্কা প্রণালির
তীরে মালয়েশিয়ার
কেদাহ ছিল
পুরনো আমলের
বন্দর। চীনের
গুয়াংজু পৌঁছার
আগে মালয়
উপদ্বীপে পশ্চিম
প্রান্তের বন্দরটিতে
সব ধরনের
জাহাজ থামত।
কিছু বাণিজ্য
হতো, বাকিটা
চীন যাওয়ার
প্রস্তুতি এবং
ফেরার পথে
খানিকটা বিশ্রাম।
ব্যবসায়িক দ্রব্যসামগ্রীর
মধ্যে ছিল
চীনামাটির জিনিসপত্র,
কর্পূর, কাপড়,
আইভরি, চন্দন
কাঠ, পারফিউম,
মূল্যবান পাথর,
ব্রোকেড ইত্যাদি।
স্মরণ রাখা
বাঞ্ছনীয় এসব
স্টিম যুগের
বহু আগেকার
ঘটনা। সমুদ্রের
মেজাজ এবং
বাতাসের প্রবাহ
তখন আন্তঃদেশীয়
বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ
করত। সাধারণত
জুন থেকে
নভেম্বরে মৌসুমি
বাতাস বুঝে
জাহাজ ছাড়ত
আর ফিরে
আসত ডিসেম্বর
থেকে মে
মাসের মধ্যে।
নাবিক ও
ব্যবসায়ীর থাকা
খাওয়ার বন্দোবস্ত
ছাড়াও বাণিজ্যিক
প্রয়োজনে যেসব
সমর্থন প্রয়োজন,
কেদাহ বন্দর
সবকিছুর জোগান
দিতে পারত।
কেদাহ থেকে
বাণিজ্যিক পণ্য
সড়কপথে মালয়েশিয়ার
পূর্বাঞ্চলীয় বন্দর
লঙ্কাসুকা ও
কেলাস্টান নিয়ে
যাওয়া হতো।
এ ধারায়
ষষ্ঠ শতক
পর্যন্ত এগুলোই
ছিল গুরুত্বপূর্ণ
বন্দর। এখনো
যোগাযোগের জন্য
মালাক্কা প্রণালি
ব্যবহার শুরু
হয়নি। সপ্তম
শতাব্দীতে সুমাত্রা
ও পেলেসবভিত্তিক
শ্রীবিজয় রাজত্ব
সমুদ্রের ওপর
অনেকটা নিয়ন্ত্রণ
প্রতিষ্ঠা করে
এবং স্ট্রেইট
অব মালাক্কা
ও সুন্দা
স্ট্রেইট দখলে
নিয়ে নেয়।
প্রায় ৭০০
বছর তাদের
অর্থনৈতিক ও
সামরিক আধিপত্য
বহাল থাকে।
এ সময়
আরব, চীন
ও ভারতের
সঙ্গে মসলা
বাণিজ্যের বিপুল
মুনাফা রাজত্বের
নিয়ন্ত্রণে চলে
আসে। পঞ্চদশ
শতাব্দীতে মেলাকা
সুলতানাত, জোহর
সুলতানাত ও
সিঙ্গাপুরের অভ্যুদয়ে
পুরনো নিয়ন্ত্রণ
শেষ হয়ে
যায়।
ষোড়শ ও
সপ্তদশ শতাব্দীতে
মালাক্কা প্রণালি
জলযানের সংক্ষিপ্ত
ও লাভজনক
রুট হিসেবে
পরিচিতি লাভ
করে। এর
দখল ও
নিয়ন্ত্রণ নিয়ে
স্থানীয় নিয়ন্ত্রকদের
সঙ্গে পর্তুগিজ,
ডাচ ও
ইংরেজদের এবং
তিন বিদেশী
শক্তির নিজেদের
মধ্যে রক্তক্ষয়ী
যুদ্ধ হয়।
সে সময়
মালাক্কার কাছাকাছি
ইন্দোনেশিয়ার রান
দ্বীপ নিয়ে
ইংরেজ ও
ডাচরা জারফল
বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণের
জন্য যুদ্ধ
করে। পরে
ইংরেজদের নিউইয়র্ক
দিয়ে ডাচরা
এ মসলা
দ্বীপ নিয়ে
নেয়।
১৬৪১-১৭৯৮
পর্যন্ত জোহরের
সুলতানের সমর্থন
নিয়ে ডাচরা
পর্তুগিজদের হারিয়ে
দেয়ার পর
এ অঞ্চল
শাসন করে।
১৮২৪ সালে
অ্যাংলো-ডাচ
ট্রিটির শর্তানুসারে
ডাচরা ব্রিটিশদের
হাতে মালাক্কা
অর্পণ করে
সুমাত্রার বেনকুলেন
গ্রহণ করে।
শুধু দক্ষিণ-পূর্ব
না দক্ষিণ
এশিয়ার বাণিজ্য
ও অর্থনীতির
গতিশীলতার জন্যও
এ প্রণালির
ওপর নির্ভর
করতে হয়।
ভারত, থাইল্যান্ড,
ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া,
ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর,
চীন, জাপান,
তাইওয়ান ও
দক্ষিণ কোরিয়ার
অর্থনীতি সচল
ও বেগবান
রাখতে এ
প্রণালিকে হয়ে
উঠতে হয়েছে
পৃথিবীর সবচেয়ে
ব্যস্ত যোজক
খাল হিসেবে।
একসময় জলদস্যুর
প্রকোপ ছিল।
প্যাট্রিক উইন
লিখেছেন, মালাক্কা
প্রণালিই ছিল
সমুদ্র দস্যুদের
স্বর্গ। পিটার
গুইন মনে
করেন, জলদস্যুতার
প্রশিক্ষণের এটাই
শ্রেষ্ঠ জায়গা।
সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ার
জোহর এবং
ইন্দোনেশিয়ার রিয়াও
নিয়ে তিন
দেশীয় গ্রোথ
ট্রায়াঙ্গল গঠিত
হওয়ার পর
উৎপাদন, অবকাঠামো
সবই ব্যাপকহারে
বেড়ে গেছে,
বেড়েছে প্রণালির
গুরুত্ব।
মালাক্কা সমুদ্র
পরিবহনের কৌশলগত
‘চোকপয়েন্ট’।
সিঙ্গাপুরের কাছে
সবচেয়ে কম
প্রশস্ত অংশটি
হচ্ছে একটি
প্রাকৃতিক ‘বটললেক’।
মালাক্কা মালয়েশিয়ার
তৃতীয় বৃহত্তর
অঙ্গরাজ্য।
১৮৮০ থেকে
বর্তমান সময়
পর্যন্ত মালক্কায়
৩৪টি জাহাজডুবির
ঘটনা ঘটেছে।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে
কম গভীরতা
এবং খালের
কম প্রশস্ততার
কারণে দুটি
জাহাজের মধ্যে
সংঘর্ষে এসব
দুর্ঘটনা ঘটেছে।
২০১৭ সালে
যুক্তরাষ্ট্র নৌবাহিনীর
একটি ডেস্ট্রয়ার
একটি বাণিজ্যিক
জাহাজকে ধাক্কা
দেয়ার পর
তাদেরই ১০
জন ক্রু
নিহত হয়েছে।
সাম্প্রতিককালে সৃষ্ট
মৌসুমি ‘হেজ’-এর
কারণে প্রণালি
ধোঁয়াচ্ছন্ন হয়ে
ওঠে, ২০০
মিটার দূরের
জাহাজও দেখা
যায় না।
অতিরিক্ত ট্রাফিক
এ অঞ্চলের
জীববৈচিত্র্য নষ্ট
করে দিচ্ছে
এবং তা
পরিবেশের ওপর
বিরূপ প্রতিক্রিয়া
সৃষ্টি করছে।
একই সঙ্গে
ট্রাফিক জ্যাম
হ্রাস এবং
থাইল্যান্ডের সঙ্গে
৯৬০ কিলোমিটার
দূরত্ব কমাতে
অনেক বছর
ধরে ‘ইস্থমাস
অব ক্রা’
খাল খননের
প্রস্তাব দিয়ে
আসছে থাইল্যান্ড।
অনেক ব্যয়সাপেক্ষ
হলেও চীন
এর অর্থায়নে
সম্মত হয়েছে
বলে খবর
বেরিয়েছে, এদিকে
পরিবেশবাদীরাও নতুন
প্রকল্পের বিরোধিতা
করছেন।
ইবনে মোতালিব: লেখক





