প্রাচীনকালে মানুষের
ব্যবহূত বিভিন্ন
ধরনের অলংকারের
মধ্যে পুঁতির
(ইংরেজিতে Bead)
তৈরি অলংকার
ছিল অন্যতম।
তখন পুঁতির
অলংকার ছিল
সামাজিক মর্যাদার
প্রতীক। এছাড়া
প্রাচীন যুগের
মতো আধুনিক
যুগেও বিভিন্ন
কারণে, যেমন
সামাজিক মর্যাদার
প্রতীক হিসেবে
কিংবা ধর্মীয়
কাজে, পুঁতির
তৈরি সৌখিন
বা বিলাসবহুল
পণ্যসামগ্রীর ব্যবহার
দেখা যায়।
ইতিহাস থেকে
জানা যায়
যে পুঁতি
বাণিজ্যের কারণেই
মানুষ ভাষার
উদ্ভাবন করেছে।
বর্তমান নিবন্ধে
প্রাচীন ও
আধুনিক যুগে
দক্ষিণ-পূর্ব
এশিয়ায় পুঁতির
ব্যবহার, উৎপাদন
ও পণ্যসামগ্রীর
ব্যবসা-বাণিজ্য
সম্পর্কে বিস্তারিত
আলোচনা করা
হয়েছে। এছাড়া
বিশ্বের বিভিন্ন
দেশে পুঁতির
ব্যবহার, উৎপাদন
ও বাণিজ্যের
সংক্ষিপ্ত ইতিহাসও
তুলে ধরা
হয়েছে।
প্রাচীন ও
বর্তমান সময়ে
পুঁতির ব্যবহার
প্রাচীন
যুগের মতো
আধুনিক যুগেও
সাধারণত আদিবাসীরা
সামুদ্রিক শঙ্খ,
ঝিনুক, মাড়ির
দাঁত, ছেদক
দাঁত, পশুর
হাড়, হরিণের
শিং ও
গাছের বীজ
দিয়ে পুঁতির
অলংকার তৈরি
করে। পুঁতি
ছিদ্র করে
সুতার সাহায্যে
মালা গেঁথে
নারীরা গলায়
পরিধান করেন।
শুধু অলংকার
হিসেবে নয়,
বরং বিশ্বের
নানা প্রান্তে
পুঁতিকে নানা
কাজে ব্যবহার
করা হয়।
তবে ধর্মীয়
কাজে, ওষুধ
এবং তাবিজ-কবজ
হিসেবে পুঁতির
ব্যবহার লক্ষণীয়।
ধর্মীয় প্রার্থনায়
মুসলমানরা ব্যবহার
করেন বিভিন্ন
ধরনের পুঁতির
তৈরি তসবিহ,
রোমান ক্যাথলিকরা
রোজারি পুঁতি
এবং হিন্দু,
বৌদ্ধ, জৈন,
শিন্তো ও
এক শ্রেণীর
শিখ ব্যবহার
করেন জপমালা।
এছাড়া মুদ্রা
বা অর্থ
হিসেবে ব্যবহার
করা হয়
ঘানার আগ্রে
পুঁতি। সম্প্রতি
(২০১৯ সালের
২৬ ডিসেম্বর)
বিবিসি বাংলা
নিউজের খবরে
বলা হয়,
শিশুদের নিউমোনিয়া
শনাক্ত করতে
কেনিয়ার প্রত্যন্ত
অঞ্চলের একজন
গ্রাম্য চিকিৎসক
পুঁতির মালা
ব্যবহার করেছেন।
তিনি পুঁতির
মালার পুঁতি
গণনা করে
শিশুর শ্বাস-প্রশ্বাসের
মাত্রা নিরূপণ
করেন।
মানবসভ্যতার শুরুর
দিকে পুঁতিকে
বিলাসবহুল বাণিজ্যিক
পণ্য হিসেবে
ব্যবহার করা
হতো। কেননা
আদিকাল থেকেই
পুঁতির দারুণ
চাহিদা ছিল।
বলা হয়,
পুঁতি বাণিজ্যের
কারণেই মানুষ
ভাষার উদ্ভাবন
করেছে। প্রাচীন
সময়ে মুদ্রার
বিকল্প হিসেবে
পুঁতির বাণিজ্য
এবং সাংস্কৃতিক
প্যাটার্ন সম্পর্কে
মূল্যবান তথ্য
জানা যায়।
যা হোক,
সবচেয়ে পুরনো
পুঁতি পাওয়া
যায় দক্ষিণ
আফ্রিকার ব্লমভোস
গুহায়, যেগুলো
৭২ হাজার
বছরের পুরনো।
অন্যদিকে লেবাননের
কেসর আকিলে
পাওয়া পুঁতিগুলো
৪০ হাজার
বছরের পুরনো।
উল্লেখ্য, লেবাননের
কয়েক হাজার
বছরের পুরনো
কাচের কারখানা
এখনো উৎপাদন
করে। মিসরীয়রা
খ্রিস্টপূর্বাব্দ ১৩৬৫
নাগাদ কাচের
পুঁতি তৈরি
করেছে। চীন
শতাব্দীর পর
শতাব্দী ধরে
কাচের পুঁতি
তৈরি করে
রফতানি করেছে,
যা বিভিন্ন
প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে
আবিষ্কৃত হয়েছে।
প্রাগৈতিহাসিক যুগে
পুঁতির ব্যবহার
শুধু মালা
হিসেবে গলায়
ছিল না,
বরং কোমরের
চারপাশে, কানের
ওপর, নাকের
ভেতর দিয়ে
সুতা দিয়ে,
এমনকি চোখের
পাতায় পর্যন্ত।
এছাড়া প্রাচীন
মিসরের অভিজাত
পরিবারে ফ্যাশন
ও আভিজাত্যের
প্রতীক হিসেবে
নারী এবং
মূর্তির গায়ে
পুঁতির-জালি
(bead-net) পোশাকের
হদিস পাওয়া
যায়, যেমন
প্রাচীন মিসরীয়দের
আকাশের দেবী
Nut-এর
মূর্তিতে এ
ধরনের পোশাক
ছিল। মিসরীয়
(বিশেষ করে
ফ্যারোদের) সমাধি,
রোমান ক্যাটাকম্বস,
স্যাক্সন, আফ্রিকান
এবং আদি
আমেরিকানদের কবরস্থানে
কাচ ও
পিতলের পুঁতির
পোশাক এবং
অলংকার পাওয়া
গিয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিক
গবেষকরা ইতালির
Campo
Marchione এলাকার
গোরস্থানে কাচের
পুঁতির সন্ধান
পেয়েছেন, যা
ইউরোপ, মিসর,
মেসোপটেমিয়া ও
এশিয়ার বিভিন্ন
দেশ থেকে
আমদানি করা
হয়েছিল। গবেষণায়
দেখা গেছে
যে সেসব
কাচের পুঁতির
ব্যবহারের নেপথ্যে
ব্যবসায়িক ও
সামাজিক গুরুত্ব
ছিল। এছাড়া
চীন, জাপান
ও কোরিয়ার
অভিজাতদের সমাধি
এবং কবরে
ইন্দো-প্যাসিফিক
পুঁতির মালার
সন্ধান পাওয়া
যায়। পরবর্তী
সময়ে সেগুলো
মৃতদের সামাজিক
মর্যাদার প্রতীক
হিসেবে চিহ্নিত
করা হয়।
হরপ্পা ও
মহেঞ্জোদারো সভ্যতায়
পুঁতির নেকলেস
বা মালার
ব্যবহার সে
যুগের মানুষের
নিখুঁত কর্মদক্ষতাকে
প্রকাশ করত।
প্রাচীন ভারতের
রাজা বা
সম্রাটদের ব্যবহূত
মনোমুগ্ধকর গহনায়
এবং সেরা
শিল্পকর্মের পেছনে
জহুরিদের নিখুঁত
কাজের দৃষ্টান্ত
প্রকাশ পেত।
বর্তমানে বাংলাদেশী তরুণী থেকে শুরু করে মধ্য বয়স্কা নারীদের মধ্যে সৌখিন ও হাল আমলের সাজসজ্জার উপকরণ হিসেবে বিভিন্ন রঙ, আকৃতি ও ডিজাইনের পুঁতির অলংকার জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। ফ্যাশনপ্রিয় অনেকেই পাশ্চাত্য ঘরানার পোশাকের সঙ্গে গলায় দেশীয় ডিজাইনের পুঁতির লহরি মালা এবং কানে ঝোলানো পুঁতির দুল পরে নিজেদের ‘লুক’ বদলাতে আগ্রহী।
দক্ষিণ-পূর্ব
এশিয়ায় পুঁতির উৎপাদন ও
বাণিজ্য
আদিকাল
থেকে শুরু
করে বর্তমান
সময়ে বিভিন্ন
ধরনের এবং
আকৃতির পুঁতি
পাওয়া যায়।
যেমন গোলাকৃতি,
গোলাকার পিপাকৃতি,
ষড়ভুজ পিপাকৃতি,
গোলাকার সিলিন্ডার
ও ষড়ভুজ
সিলিন্ডার আকৃতি,
ডিম্বাকৃতি, চাকতি
আকৃতি, ডায়মন্ড
ও প্রিজম
আকৃতি এবং
পিরামিড আকৃতি।
কেননা পুঁতির
উপকরণ, অর্থাৎ
কী দিয়ে
তৈরি করা
হয়েছে, কোন
প্রক্রিয়ায় বাজারজাত
করা হয়েছে,
কোন জায়গায়
পাওয়া গিয়েছে
বা উত্পন্ন
হয়েছে, পুঁতির
গায়ে কেমন
নকশা রয়েছে,
পুঁতির আকার
কেমন ইত্যাদির
ওপর ভিত্তি
করে পুঁতিকে
বিভিন্ন শ্রেণীতে
ভাগ করা
হয়। উল্লেখ্য,
প্রথম দিকে
প্রাকৃতিক উপাদান
দিয়ে পুঁতি
তৈরি করা
হতো এবং
সেই সব
পুঁতির মধ্যে
ছিদ্র করা
ও আকার
দেয়া সহজ
ছিল। পরবর্তী
সময়ে পুঁতি
তৈরির কাজে
নানা ধরনের
কৃত্রিম উপাদান
ব্যবহার শুরু
হয়।
খ্রিস্টপূর্ব প্রথম
সহস্রাব্দের মাঝামাঝি
সময় থেকে
মালয়েশিয়াসহ দক্ষিণ
ও দক্ষিণ-পূর্ব
এশীয় অনেক
দেশের প্রত্নতাত্ত্বিক
স্থানে কাচের
পুঁতির ব্যবহারের
সন্ধান পাওয়া
গিয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিক
পর্যবেক্ষণ এবং
তথ্যের ওপর
ভিত্তি করে
জানা যায়
যে সেই
কাচের পুঁতির
অধিকাংশই দক্ষিণ
ভারত থেকে
রফতানি হয়েছিল।
তাই ধরে
নেয়া যায়
যে প্রাচীন
পুঁতি বাণিজ্যের
অধিকাংশই এশীয়
সামুদ্রিক বাণিজ্যে
অন্তর্ভুক্ত করা
হয়েছিল। বলাবাহুল্য,
মালয়েশিয়া ও
দক্ষিণ-পূর্ব
এশিয়ার বিভিন্ন
প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে
পাওয়া সবচেয়ে
পরিচিত পুঁতির
নাম ‘মুতি
সালাহ’ বা
‘ফলস
পার্ল’।
এখানে প্রসঙ্গক্রমে
উল্লেখ করা
প্রয়োজন যে
মালয়েশিয়ার দৈনন্দিন
ও সামাজিক
জীবনের সবদিক,
যেমন: জন্ম,
বিবাহ, রীতিনীতি,
ধর্ম ও
অর্থনৈতিক বিবেচনায়
পুঁতির কদর
অত্যন্ত বেশি
ও প্রয়োজনীয়তা
অপরিসীম। এছাড়া
প্রথমদিকে মালয়েশিয়ার
সামাজিক ব্যবস্থায়
মুদ্রার একটি
রূপ হিসেবে
পুঁতি ব্যবহার
করা হতো।
বলা যায়,
সে জন্যই
তারা একটি
ভালো কার্যকর
অর্থনৈতিক ব্যবস্থা
তৈরি করতে
সক্ষম হয়েছিল
এবং প্রাগৈতিহাসিক
সময় থেকে
মালয়েশিয়ায় এক
ধরনের সামাজিক
শ্রেণীবিন্যাসের কাঠামো
উপস্থিত ছিল।
প্রাচীন সময়ে
ভারতের আরিকামেডু
থেকে পুঁতি
নির্মাতারা নতুন
দিকের সন্ধানে
দক্ষিণ-পূর্ব
এশিয়ায় যান
এবং সেখানে
তারা উন্নতমানের
পুঁতি নির্মাণ
শিল্প গড়ে
তোলেন। তাই
পুঁতি উৎপাদন
আরিকামেডু থেকে
মানতাই (শ্রীলংকা),
ওক-ইও
(ভিয়েতনাম), খলংওম
(থাইল্যান্ড) এবং
কুয়ালা সেলিনসিং
(মালয়েশিয়া) পর্যন্ত
ছড়িয়ে পড়ে।
কুয়ালা সেলিনসিংয়ে
প্রত্নতাত্ত্বিক খননের
মাধ্যমে পাথর,
কাচ ও
খোলস থেকে
তৈরি শত
শত পুঁতি
উদ্ধার করা
হয়েছে। পরবর্তী
সময়ে সেই
আবিষ্কারের ফলে
কুয়ালা সেলিনসিংকে
একটি পুঁতি
উৎপাদন স্থান
হিসেবে চিহ্নিত
করা হয়।
যদিও ধারণা
করা হয়
যে পুঁতিগুলো
সেখানেই তৈরি
করা হয়েছিল,
কিন্তু বেশির
ভাগ কাঁচামাল
স্থানীয়ভাবে পাওয়া
যায়নি। তাই
সেগুলো আমদানি
করতে হয়েছিল।
উদাহরণ হিসেবে
বলা যায়,
‘লাপিস
লাজুলি’ পাথরের
আকৃতিহীন টুকরো,
যার প্রাথমিক
উৎস উত্তর-পূর্ব
আফগানিস্তান। তবে
কাচের পুঁতির
কাহিনী ভিন্ন।
রাসায়নিক বিশ্লেষণে
দেখা গেছে
যে পুঁতি
তৈরিতে ব্যবহূত
কাচ সম্ভবত
স্থানীয়ভাবে, অর্থাৎ
কুয়ালা সেলিনসিংয়ে
তৈরি করা
হয়েছিল।
পুঁতি উৎপাদনে
কুয়ালা সেলিনসিংকে
আঞ্চলিক বাণিজ্য
অন্তর্জালের মধ্যে
একটি ছোট
কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ
বন্দর হিসেবে
গণ্য করা
হয়, যা
প্রথমে ফুনান
এবং পরে
শ্রীবিজয় শহরের
মাধ্যমে প্রভাবিত
হয়। সময়ের
সঙ্গে সঙ্গে
পলি জমে
সমুদ্র তীর
বাইরের দিকে
সরে যায়
এবং সমুদ্র
বাণিজ্য পথে
লোকবসতি স্থাপন
করার সুবিধা
বিঘ্নিত হয়।
গবেষকদের ধারণা
যে সম্ভবত
সে কারণেই
কুয়ালা সেলিনসিংয়ের
পতন হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে
পুঁতি উৎপাদন
দক্ষিণ কেদারের
কামপুং Sungai
Mas-এ স্থানান্তর
করা হয়েছিল।
এছাড়া কুয়ালা
সেলিনসিং প্রধান
বাণিজ্য পথে
ছিল না।
কেননা সমুদ্রবন্দর
হিসেবে কুয়ালা
সেলিনসিং ছিল
খুবই ছোট।
তাই সেখান
থেকে ছোট
নৌকায় পুঁতির
পণ্যসামগ্রী উত্তোলন
করে বৃহত্তর
বন্দরে যেমন Oc-Eo ও Sungai
Mas-এ নিয়ে
যাওয়া হতো।
এ ধরনের
নৌকার উদাহরণ
দেখা যায়
‘পন্টিয়ান’
জাহাজের ধ্বংসাবশেষ,
যা নদীর
মুখ থেকে
প্রায় ১
দশমিক ৬
কিলোমিটার দূরে
পন্টিয়ান নদীর
(পাহাং) ডান
তীরে পাওয়া
গিয়েছিল। জাহাজ
থেকে কাঠ
সংগ্রহ করে
কার্বন-তারিখ
নির্ণয় করা
হয়। দেখা
গেছে যে
জাহাজটি ২৬০
থেকে ৪৩০
খ্রিস্টাব্দের মধ্যে
নির্মাণ করা
হয়েছিল এবং
তা ছিল
দক্ষিণ-পূর্ব
এশিয়ার প্রাচীনতম
জাহাজ।
খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ বছর আগে থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো থেকে ‘ইন্দো-প্যাসিফিক বিড’ নামের এক ধরনের পুঁতি, যা সাধারণত মনোক্রোম কাচের পুঁতি নামে পরিচিত ছিল, বিভিন্ন দেশে রফতানি করা হতো। ইন্দো-প্যাসিফিক পুঁতি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে প্রচুর পরিমাণে উৎপাদিত হতো। এছাড়া তখন অন্য ধরনের পুঁতিরও, যেমন চায়না পুঁতি, জাভা পুঁতি ও ভারতীয় পুঁতির আধিক্য ছিল। যা হোক, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পুঁতি বাণিজ্যের প্রকৃতি সম্পর্কে সূত্র পাওয়া যায় খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চদশ শতাব্দীতে ডুবে যাওয়া ‘পান্ডানান’ জাহাজের ভগ্নাবশেষ থেকে। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে গবেষকরা মতামত দিয়েছেন যে সেই জাহাজে করে পুঁতির তৈরি পণ্য ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও চীন থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশে পাঠানো হয়েছিল।
শেষ কথা
প্রাচীনত্বের
পর থেকে
পুঁতির ব্যবহার
বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত
ছিল এবং
এখনো তা
অব্যাহত আছে।
অলংকার কিংবা
ঝলমলে পোশাক
তৈরি ছাড়াও
পুঁতিকে অর্থনৈতিক
ও প্রথাগত
বিনিময়ের মূল্য
নির্ধারক বা
পরিমাপক হিসেবে
গণ্য করা
হয়। কেননা
অনেক সংস্কৃতিতে
দেখা যায়
যে পোশাকের
সঙ্গে বয়স,
লিঙ্গ ও
সামাজিক অবস্থার
প্রতিফলন ঘটে।
এছাড়া পুঁতি
এমন একটি
মাধ্যম যা
ব্যবহার করে
মানুষ সম্পদ
সঞ্চয় ও
আদান-প্রদান
করে। যদিও
সময়ের সঙ্গে
তাল মিলিয়ে
ঐশ্বর্য এবং
ফ্যাশনের চাহিদা
অনুযায়ী পুঁতির
অলংকারের ডিজাইন
ও নির্মাণ
কৌশলের পরিবর্তন
ঘটেছে, কিন্তু
পুঁতির জনপ্রিয়তা
কখনো হ্রাস
পায়নি। বরং
সাম্প্রতিক কালে
পুনরুজ্জীবিত পুঁতির
ব্যবসা-বাণিজ্য
বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে
পড়েছে।
পরিশেষে, প্রাচীন
মিসরীয় কথাসাহিত্যে
পুঁতির-জাল
পোশাকের কথা
এবং আধুনিক
বাংলা সাহিত্যে,
বিশেষ করে
কবিতা এবং
উপন্যাসে, ‘পুঁতির
মালা’ শব্দ
দুটি অনেক
জায়গায় ব্যবহার
করা হয়েছে।
প্রাচীন মিসরীয় কথাসাহিত্যে পুঁতির জাল পোশাক
এবং আধুনিক বাংলা সাহিত্যে পুঁতির মালার
ব্যবহার
প্রাচীন মিসরীয়
কথাসাহিত্যে পুঁতির
তৈরি জালের
পোশাকের কথা
উল্লেখ করা
হয়েছে। উদাহরণ
হিসেবে বলা
যায়, Three Tales of Wonder,
যা Tales from the Westcar
Papyrus নামে
পরিচিত, গল্প
সংকলনের The
Story of the Green Jewel শিরোনামের
গল্পে আছে
যে একদা
রাজা Sneferu
(রাজত্বকাল, খ্রিস্টপূর্ব
২৬১৩ থেকে
২৫৮৯ পর্যন্ত)
রাজপ্রাসাদে আমোদ-বিনোদন
খুঁজছিলেন। তখন
তার প্রধান
লেখক তাকে
পরামর্শ দিয়েছিল
যে রাজা
যেন হ্রদে
নৌবিহারে যান
এবং হারেমের
সুন্দরীরা যেন
নৌকার দাঁড়
টানার জন্য
মাঝি হিসেবে
থাকে। রাজার
আনন্দের জন্য
সেই সব
নারী সাধারণ
পোশাকের পরিবর্তে
পুঁতির তৈরি
জালি পোশাক
পরিধান করেছিল।
বাংলা সাহিত্যে,
বিশেষ করে
কবিতায় ও
উপন্যাসে, ‘পুঁতির
মালা’ অনেকেই
ব্যবহার করেছেন।
তাঁদের মধ্যে
পল্লীকবি জসীমউদ্দীন,
ছন্দের জাদুকর
সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত
এবং ঔপন্যাসিক
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
উল্লেখযোগ্য। উদাহরণ
হিসেবে কয়েকটি
কবিতার আংশিক
উদ্ধৃতি দেয়া
হলো: ‘পুঁতির
মালা এক
ছড়া নিতে
কখনও হত
না দেরি’
(কবর, জসীমউদ্দীন);
‘আজকের
হাটে কুড়ায়ে
পেয়েছি দুগাছি
পুঁতির মালা’
(নক্সী
কাঁথার মাঠ, জসীমউদ্দীন);
‘গলায়
তাহার পুঁতির
মালা, কানে
ফুলের দুল’
(কৃষাণ-দুলালী,
জসীমউদ্দীন) এবং
‘ছেড়ে
গেছে পুতুল,
পুঁতির মালা,
ছেড়ে গেছে
মায়ের কোলের
দাবি’ (ছিন্নমুকুল,
সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত)।
অন্যদিকে বিভূতিভূষণ
বন্দ্যোপাধ্যায় ‘আরণ্যক’
উপন্যাসের এক
জায়গায় গ্রাম্য
মেলার বিভিন্ন
ধরনের পসরার
বর্ণনা দিতে
লিখেছেন—‘তরুণী
বন্য মেয়েরা
আসিয়াছে চুলে
পিয়ালফুল কি
রাঙা ধাতুপফুল
গুঁজিয়া; কারো
কারো মাথায়
বাঁকা খোঁপায়
কাঠের চিরুনি
আটকানো, বেশ
সুঠাম, সুললিত,
লাবণ্যভরা দেহের
গঠন প্রায়
অনেক মেয়েরই—তারা
আমোদ করিয়া
খেলো পুঁতির
দানার মালা,
সস্তা জাপানি
কি জার্মানির
সাবানের বাক্স,
বাঁশি, আয়না,
অতি বাজে
এসেন্স কিনিতেছে
...।’
তথ্যসূত্র:
1. Boschetti
C, Gratuze B and Schibille N 2020, Commercial and Social Significance of Glass
Beads in Migration-Period Italy: The Cemetery of Compo Marchione, Oxford
Journal of Archeology, 39(3), pp. 319-342.
2. Dussubieux
L, Kusimba C M, Gogte V, Kusimba S B, Gratuze B and Oka R 2008, The trading of
ancient glass beads: New analytical data from South Asian and East African soda-alumina
glass beads, Archaeometry, 50(5), pp. 797-821.
3. Eddins
O N 2020, The history of trade beads, Peach State Archaeological Society,
Atlanta, Georgia, USA.
4. Francis
P, Jr. 1990a, Glass Beads in Asia: Part 1. Introduction, Asian Perspective,
28(1), University of Hawaii Press, USA, 21 pages.
5. Francis
P, Jr. 1990a, Glass Beads in Asia: Part Two. Indo-Pacific Beads, Asian
Perspective, Vol. 28, No. 1, University of Hawaii Press, USA, 23 pages.
6. Francis
P 2002, Asia’s Maritime Bead Trade: 300 B.C. to the Present, University of
Hawaii Press, USA, 305 pages.
7. Kaur
M and Isa M 2020, KUALA SELINSING: Bead-Makers Par Excellence (Chapter 4), In:
Between the Bay of Bengal and the Java Sea: Trade routes, ancient ports &
cultural commonalities in Southeast Asia, Published by Marshall Cavendish
International (Asia), Singapore, pp. 98-109.
8. Mingren
W 2017, High Fashion of Ancient Egypt: The Bead-Net Dress, Ancient origins,
Published on 5 March 2017, Dublin, Ireland.
9. Ramli
Z, Shuhaimi N H and Rahman N A 2009, Beads Trade in Peninsula Malaysia: Based
on Archaeological Evidences, European Journal of Social Sciences, 10(4), pp.
585-593.
10. Sciama
L D and Eicher J B 1998, Beads and Bead Makers: Gender, Material Culture and
Meaning, Berg Publishers, 336 pages.
11. Wood M
2020, Glass Beads and Trade in the Western Indian Ocean, Asian History, Oxford
Research Encyclopedias, Oxford University Press, UK.
ফজল হাসান: লেখক ও অনুবাদক





